বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে খুব আটপৌরে মেয়ে ছিল বিপা। আশৈশব বেড়ে উঠেছে মফস্বলের একান্নবর্তী পরিবারে। চালচলনে সেই সাদাসিধা ভাব লক্ষণীয় ছিল সর্বদাই। ফলশ্রুতিতে কখনোই সকলের সঙ্গে মেলামেশা করবার সুযোগ মেলেনি ওর।
পরিবারের রক্ষণশীল মনোভাব --- ওর ভেতরেও কঠিন করে খুঁটি গেড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে এসেও তা বিসর্জন দেয়া সম্ভব হয়নি; কিংবা সে চেষ্টাও করেনি। স্বভাবতই গুটিকতক বন্ধুবান্ধব জুটেছিল ওর ভাগ্যে। তন্মধ্যে পৃথার কথা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। সংস্কারমনষ্ক বিপার যা কিছু পরিবর্তন তা এই মেয়েটির সংস্রবে এসেই। আরও একজন ছিল অবশ্য। সে মানুষটি জুবায়ের। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ওর একমাত্র ছেলে বন্ধু যাকে প্রকৃত অর্থেই বন্ধু বলা যায়। ভীষণ পড়ুয়া এই ছেলের জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিল কীভাবে প্রতি সেমিস্টারে টপ করে গ্র্যাজুয়েশন শেষে ভালো একটা সরকারি চাকরি বাগিয়ে নেয়া যায়। বন্ধুদের ভাষায় পাক্কা ‘আঁতেল’ যাকে বলে। অবশ্য ওর আঁতেলগিরি বেশিদিন ছিলনা। থার্ড ইয়ারে এসে আচমকা তার অনুধাবন হয় এদেশে চাকরি পেতে হলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের টপার হওয়া জরুরি নয়। পলিটিক্যাল পাওয়ার আর মামা - চাচার সুপারিশও প্রয়োজন! যার একটাও জুবায়েরের ছিলনা। তারপর ইমিডিয়েট সিনিয়র কিছু ভাই - ব্রাদারের কথা শুনে ও বিদেশ যাওয়ার চেষ্টায় নেমে পড়ে। শেষমেশ বহু কাঠখড় পুড়িয়ে মাস্টার্স করতে চলে যায় জার্মানি।
ঘটনা এই অবধি বেশ স্বাভাবিক মনে হলেও এরমধ্যে কিছু ‘কিন্তু’ আছে। কথায় আছে ছেলে-মেয়ে নাকি কখনো ‘শুধু বন্ধু’ হতে পারেনা। হয় তারা দুজনেই প্রেমে পড়বে; নয়তো যেকোনো একজন। হয় ঠিক সময়ে; নয়তো অসময়ে --- কিন্তু প্রেমে তারা পড়বেই! এই গল্পে জুবায়েরও পড়েছিল বিপার প্রেমে; যখন সে জানে সাজিদের সাথে বিপার সম্পর্ক অনেক গভীরে চলে গেছে।
জুবায়ের দেশ ছাড়ার কিছুদিন আগে পৃথা এসব বলেছিল বিপাকে। তখন বাস্তবিক অর্থেই ওর কিছু করার ছিলনা। বরং বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেয়েছিল মেয়েটা। সেই ধাক্কার জোরে খুব কাছের বন্ধুকে হারিয়ে ফেলেছিল হঠাৎই; বিদেশযাত্রার পূর্বে আর সাক্ষাৎ হয়নি দু’জনের। জুবায়ের হয়তো জানে না; বিপা তার মনের কথা জেনে ফেলেছে। কিংবা জানে বলেই বিদেশে গিয়ে আর যোগাযোগ করেনি?
কিন্তু এতোদিন পর ওকে হঠাৎ নিজের বাসার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক না হয়ে পারল না বিপা,
--- তুমি এখানে কীভাবে এলে?
জুবায়ের হাসলো। হাসলে ওর দু’গালে টোল পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সবসময় ক্লিন শেভ করতো বলে খুব সুন্দর দেখাতো; আজ মুখ ভর্তি ঘন দাড়ির ফাঁকে টোলগুলো ঠিক চোখে পড়লো না বিপার। ও বড়বড় চোখ মেলে তাকিয়ে রইলো জুবায়েরের দিকে। ওশান ব্লু শার্ট আর হোয়াইট প্যান্টে ওর বেশভূষা চমকপ্রদ।
--- গাড়িতে করে। হেঁটে হেঁটে তো আসা সম্ভব না!
বিপা অপ্রস্তুত ভাবে তাকিয়ে রইলো। আজ সকালেও কল দিয়েছিল পৃথা। টুকটাক কথার পর আবারও তুলেছে জুবায়েরের প্রসঙ্গ। জুবায়ের বিপার কথা জানতে চায়, যোগাযোগ করতে চায়। বিপা তেমন কিছু বলেনি। সত্যি বলতে বলবার মত কিছু পায়নি। কিন্তু আজই যে জুবায়ের এসে হাজির হবে ওর বাড়িতে, সে কথা কে জানতো!
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জুবায়ের বললো,
--- চিনতে পেরেছ তবে? আমি তো ভয়েই ছিলাম; চিনতে পারো কিনা . .
--- চিনতে পারব না কেন? তুমি কি প্লাস্টিক সার্জারি করিয়েছ? চেহারা তো একই আছে . .
বিপাও হেসে হেসে বললো। ও যে অবাক হয়েছে, জুবায়েরের আকস্মিক আগমন যে এখানে একেবারেই প্রত্যাশিত নয়; কিছুতেই তা প্রকাশ করলো না। জুবায়ের লজ্জা পেল,
--- ঠিক তা নয়।
--- ভেতরে বসবে এসো। বাইরে দাঁড়িয়ে আর কতো. .
জুবায়ের ড্রয়িং রুমে বসলো। চা - নাশতার আয়োজন করলো বিপা। জুবায়ের দেশে আসার পর প্রথমেই খুঁজে খুঁজে সব বন্ধু - বান্ধবদের সাথে দেখা করার মিশনে নেমেছে। পৃথার বাড়ি থেকে গিয়েছিল ওদের আরেক বন্ধুর বাড়ি। সেই বন্ধু অবশ্য সাজিদের কলিগ; কথায় কথায় ঠিকানা পাওয়া গেছে। তারপরেই জুবায়ের এসে পড়েছে বিপা - সাজিদের সঙ্গে দেখা করতে!
টুকটাক কথাবার্তার পর আচমকাই জুবায়ের বলে বসলো,
--- তুমি ভালো আছো তো, বিপা?
কেমন অন্যরকম শোনালো কণ্ঠটা। ক্ষণিক আগের হাস্যোজ্বল বিপার চেহারা মলিন হলো তখন; অস্পষ্ট কণ্ঠে নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলো,
--- ভালো থাকবো না কেন? যাকে ভালোবেসেছি; তার সাথেই সংসার করছি। তিনবেলা ভালো খাচ্ছি - দাচ্ছি; একে কি ভালো থাকা বলেনা?
জুবায়ের ওর কথা ঠিক বুঝতে পারলো না। নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
দু’দিন হলো সাজিদ বাড়ি ফেরেনি। অফিসে যদিও মেডিক্যাল লিভের কথা বলেছে; কিন্তু আজ বাড়ি ফিরে জানালো অফিসিয়াল ট্যুরে চট্টগ্রামে গিয়েছিল। আসলে কোথায় ছিল কে জানে! বিপা তাই উত্তর না করে চুপচাপ শুনেছে। রাতে প্রায় আড়াইটার দিকে বাসায় এসে পৌঁছে। ওই সময় এই নিয়ে উচ্চবাচ্য করাও যায়না!
রাতে দেরি হওয়ায় আজ আর অফিসে যায়নি সাজিদ। লম্বা জার্নির ধকল কাটাতে ঘুম প্রয়োজন।
দশটার দিকে ঘুম ভাঙলো ওর। আকাশটা তখন গুমোট - মেঘলা। খোলা জানালা দিয়ে সরসর করে বাতাস আসছে। সাজিদ হাতমুখ ধুয়ে এসে দেখলো বিপা বাসায় নেই। সম্ভবত বাজারে গিয়েছে। টেবিলে খাবার বাড়া ছিল। ও খেতে বসতেই বৃষ্টি শুরু হলো। ঝমঝম বৃষ্টি দেখে মনটা একটু উদাস হলো।
খাবার ফেলে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। পশ্চিমমুখী জানালায় বৃষ্টির ছাঁট আসছে প্রচুর। মুহূর্তেই ভিজে উঠলো সাজিদ। সাথে প্রচন্ড বাতাস। তখন ফোন বাজলো। ‘নি’ কল করছে,
--- হ্যালো, বাবু। অফিসে এসেছ?
--- না। ছুটি নিয়েছি।
--- ছুটি নিয়েছ? সেকথা আগে বলো নি কেন? খামাখা তাড়াহুড়ো করে চলে গেলে! আমরা আরও একদিন থাকতে পারতাম!
ওপাশ থেকে অনুযোগের সুর ভেসে এলো। সাজিদ ঠোঁট কামড়ে ধরলো; একটু বিরক্ত লাগছে তার। নিচে তাকাতে দেখলো বাড়ির গেটে এসে দাঁড়িয়েছে বিপা; হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেল টিপছে। সারা শরীর ভিজে উঠেছে ওর। সেদিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে বললো,
--- আগে নেইনি। শরীরটা খারাপ লাগছিল; তাই ভাবলাম…
--- ওহ্। নিজের একটু কেয়ার করবা না তুমি? কি যে করো না!
সাজিদ উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলো। দৃষ্টি এখনো নিচের দিকে। বিপা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আর দেখা যাচ্ছে না। সাজিদ চটজলদি কল কাটলো। উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলো ফ্ল্যাটের দরজায়।
মিনিট দুয়েক পর দরজা খোলার শব্দ হলো; ভিজে জবুথবু বিপা বাজারের ব্যাগ নিয়ে ছুটলো রান্নাঘরে। ওর মেজাজ বেশ খারাপ; অসময়ে বৃষ্টির প্রতি তীব্র রোষে গজগজ করছে। ফ্ল্যাটময় ছুটে কি কি যেন করছে!
একবার সাজিদের সঙ্গে চোখাচোখি হলো; পরক্ষণেই ঢুকে গেল বেডরুমে। সাজিদ এগোলো পিছুপিছু।
অনেকদিন পর বিপাকে দেখে বড় ভালো লাগছে। কেমন একটা উথালপাথাল অনুভূতি হতে লাগলো সাজিদের ভেতর। ও এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো বিপার পেছনে। ভেজা শরীর নিয়ে বিপা আলমারিতে কাপড় খুঁজছে। গায়ের পানিতে ইতোমধ্যেই ভিজে উঠেছে মেঝে। এই নিয়েও রাগের শেষ নেই ওর!
‘এতো পানি! এতো পানি আমি কখন মুছবো, আল্লাহ্! কত কাজ বাড়লো!’ --- আচমকা ওর ঘাড়ে চুমু খেল সাজিদ। দুহাতে ওর কোমড় আঁকড়ে ধীরে ধীরে চুমু দিতে লাগলো ওর সারা ঘাড় - পিঠে। বিপা থমকে গেল হঠাৎ!
মুখে কথা যোগালো না সহসা। সাজিদ সুযোগ পেলো যেন। একহাতে ধরে ওকে ঘুরিয়ে ধরলো নিজের দিকে। অনেক দিন পর ওদের কাছাকাছি আসা; তাও এমন সময়ে যখন বিপা জেনে ফেলেছে তার স্বামী তাকে ঠকাচ্ছে! এমন অবস্থায় কি করবে ও ঠিক বুঝে আসলো না। কেবল নির্জীব পাথরের মতো একটা হাত উঁচিয়ে সাজিদকে থামালো। কঠিন গলায় বললো,
--- সামন থেকে সরো।
সাজিদ সরলো না; অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। বিপা ওকে এড়িয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলো। জোরে ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে আচমকাই হাউমাউ কান্নায় ভেঙে পড়ল তারপর!