সাজিদ অফিসে চলে গেলে বাড়িতে সারাদিন একাই থাকে বিপা। আজ শূণ্য বাড়িতে বিষণ্ণতা যেন গ্রাস করছে ওকে। মাথার ভেতর দুশ্চিন্তার পোকারা কিলবিল করছে। কি করবে ও?
সাজিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে? তাতে কি আদৌ কোনো লাভ হবে? সাজিদ কি স্বীকার করবে কিছু? নাকি ধমকে চুপ করিয়ে দেবে?
আচ্ছা, যদি বিপা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়? ওকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়? তবে?
সাজিদের কি কিছু যাবে-আসবে? ও তো বিপাকে নিয়ে পুরোপুরিই উদাসীন। বিপার কোনকিছুতেই আর ওর মাথাব্যথা নেই। বরং বিপা ওকে ছেড়ে গেলে লাভটা ওরই। এতদিন যার সঙ্গে ঘরের বাইরে প্রেম করেছে এখন তাকে ঘরে ঢুকাতে পারবে; সুবিধা না? কে জানে, হয় তো বিয়েও করে নেবে ডিভোর্সের পরপরই!
কিন্তু সবকিছুর পর বিপার কি হবে? ডিভোর্সীর তকমা গায়ে মেখে ও কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কার ছায়াতলে হবে ওর আশ্রয়? মায়ের বাড়ি? বিপার বাবা মারা গিয়েছে গতবছর। সংসারের হাল ধরবার মত উপযুক্ত ছেলে নেই। বিপা বড় মেয়ে, সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ওর ছোট নিপা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। বাপ-ভাইহীন সংসার কি করে চলছে সে ওর অজানা নয়! এমন অবস্থায় ওর সেখানে গিয়ে উপস্থিত হওয়া, ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ ছাড়া আর কি?
কিন্তু এখানে থেকেই বা কি করার আছে? ক্রমশ সাজিদের চক্ষুশূল হয়ে উঠছে সে। স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রীর কোনো সম্পর্কই যেন ওদের মধ্যে নেই আর। আছে শুধুই তিক্ততা জড়ানো একগাদা বিlষবাক্য!
মাঝে মাঝে বিপার খুব রাগ হয়। সাজিদের এই ঘৃণ্য কর্মের শাস্তি দিতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে গলা টিপে মেরে ফেলে ওকে। তারপর নিজে ঝুলে পড়ে সিলিংয়ে। কিন্তু মৃত্যুই কি সব সমস্যার সমাধান?
বিশ্বাস ভাঙবার শাস্তি মৃত্যুই হওয়া উচিত। অন্তত পরকীয়ার মত জঘন্য ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন একটা মেয়েকে ভালোবেসে, তাকে তার নিজস্ব জগৎ থেকে আলাদা করে একটা স্বপ্ন দেখিয়ে, সুখী করবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, শেষকালে এসে সেসব ভেঙে দেয়া জগতের নিকৃষ্টতম অন্যায় নয়?
কলিং বেলের শব্দে চটকা ভাঙলো। বিপর্যস্ত মনে কিছুতেই সায় দিলো না গিয়ে দরজা খুলতে। তবুও যেতে হলো। মনের বিপরীতে আমাদের কতো কিছুই তো করতে হয় রোজ!
দরজার ওপাশে ছোটবোন নিপাকে দেখে অবাক হলো। অনেকগুলো দিন পর নিপা এসেছে বাসায়। আগে জানিয়েও দেয়নি। বিস্মিত বিপাকে দু’হাতে জাপটে ধরলো নিপা। উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো,
---কেমন আছিস, আপা? কতদিন পর তোকে দেখলাম!
ওর পিঠে সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিলো বিপা। আর্দ্র গলায় বললো,
---এইতো ভালো। তুই? ভার্সিটি ছুটি দিলো, বুঝি?
---আমিও ভালো। তোর কথা মনে পড়ছিল, তাই চলে এলাম। ভার্সিটি খোলা। ক্লাস আছে কাল।
---ভালো করেছিস। আয়, ভেতরে।
বোনকে সঙ্গে নিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা আটকে দিলো বিপা। আচমকাই আবিষ্কার করলো তার মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। অস্থিরতা কমে যাচ্ছে!
_____
আজ বেশ তাড়াতাড়িই ফিরলো সাজিদ। সন্ধ্যার পরপরই স্বাভাবিক ভাবে চলে এলো বাসায়। যেমনটা রোজ ফেরে। হাবভাবে মনেই হলো না, এই লোক দু’দিন সম্পূর্ণ নিখোঁজ হয়ে ছিল। রোজকার অফিস ফেরত স্বামীর মতন ঘামে ভেজা শরীর, দু’ হাত ভর্তি বাজার নিয়ে এসেই হাঁক ছাড়লো,
---বিপা, জলদি আসো। মাছ এনেছি। এসে বোলে তোলো, মাছের পানিতে ভেসে গেল…
বলতে বলতেই নজর গেল কামড়ার দরজায়। নিপা বেরিয়ে এসেছে, পেছনে উঁকি দিচ্ছে বিপার মুখ। দু’ বোনের দিকে তাকিয়ে বিগলিত হাসলো সাজিদ,
---আরে নিপা ভাইরাস নাকি? কি অবস্থা? কখন এলে?
নিপা বোনের দিকে তাকালো একঝলক। তারপর ফিরে তাকিয়ে শান্ত সুরে বললো,
---বিকেলে এসেছি, দুলাভাই।
---ইউনিভার্সিটি বন্ধ নাকি?
---জ্বি না। আপাকে দেখতে এসেছি।
থমথমে মুখে জবাব দেয় নিপা। সাজিদ ঘাড় নাড়ায় বুঝদার ভঙ্গিতে,
---বাহ্, বাহ্। ভালো করেছ। মাঝে মধ্যে বড় বোনকে দেখতে আসা ভালো। তুমি তো আসোই না। বোন-দুলাভাইয়ের খোঁজ-খবর নাওই না।
ওর অনুযোগের কোনো জবাব দিলো না নিপা। বোনের মুখের দিকে চেয়ে চুপ করে রইলো। সাজিদ আবারও হাঁক ছাড়লো,
---কই, বিপা? বোল আনতে বললাম না? কতবড় মাছ আনছি দেখছ? জলদিই বোল আর বটি আনো। সাইজ করি…
বিপা বটি এনে দিলে সাজিদ বসে বসে ‘সাইজ’ করতে লাগলো মাছটাকে। বিরাট বড় বোয়াল। বিপার বেশ পছন্দের মাছ। সাজিদ যদিও তেমন একটা পছন্দ করে না। তবে বিয়ের পর শুরুর দিকে, বৌয়ের খাতিরে নিয়মিতই কিনে আনতো। এখন তো বাজার করাই ছেড়ে দিয়েছে!
শালা-শালীদের সামনে বরাবরই নিজেকে ‘কুল’ হিসেবে উপস্থাপন করবার প্রবণতা সাজিদের। হালকা ধরনের রসিকতা করবে, একটু পর পর পিঞ্চ করবে— বহু পুরোনো অভ্যাস। সকালবেলা নাশতার টেবিলেও তাই শুরু করলো। রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললো,
---তারপর বলো, নিপা ভাইরাস! কাল সারারাতে আমার নামে কি কি দুর্নাম করলো তোমার আপা? কিসের বিচার করবে তুমি?
বিপা ডিমভাজি দিতে এসেছিল পাতে, আড়চোখে তাকালো নিপার দিকে। গতরাতে বিপা সাজিদের সঙ্গে ঘুমোয়নি। গেস্টরুমে শুয়ে দু'বোন একসঙ্গে গল্প করে রাত পার করেছে। অবশ্য এটা আগে থেকেই হয়ে আসছে। নিপা এলে দুজনে একসাথেই ঘুমোয়। এ জন্য নিপার আসাটা কখনোই ভালো চোখে দেখতে পারতো না সাজিদ। সবসময় অভিযোগ করত বিপার কাছে ---- ‘সারাদিন গল্প করছ, তাতে হচ্ছে না? আবার ঘুমোতে হবে কেন? আমার বৌ, আমি কারো সঙ্গে ভাগ করবো না!’
ওর ছেলেমানুষিতে খুব হাসতো বিপা। হাহ্, পুরোনো দিন!
নিপা মাথা নিচু করে খাচ্ছে। ইতঃস্তত করে বললো,
---তেমন কিছু নয়, দুলাভাই। আমরা গল্প করছিলাম।
---তোমরা মেয়েরা যে কি এতো গল্প করো!
শ্লেষ মিশ্রিত স্বরে বললো। অতঃপর নিঃশব্দে খাওয়া সারলো তিনজন। সাজিদ অফিস যাবার পরপরই নিপাও বেরিয়ে গেল। ইউনিভার্সিটির ক্লাস আছে ওর। অবশ্য সাজিদ বলেছিল সঙ্গে যেতে, নামিয়ে দিত ভার্সিটিতে। সংগত কারণেই না করে দিয়েছে নিপা।
বোনকে বিদায় দিয়েই ঘরে এসেই কাঁদতে বসলো বিপা। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে, বালিশে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কাঁদলো।
____
নিপার আগমনে সাজিদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল বটে, কিন্তু তা স্থায়ী হয় নি। সেদিনও অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বাজিয়ে ফেলল সাজিদ। এসেই রাগারাগি শুরু করলো বিপার সঙ্গে। যেন সকালবেলার সাজিদ আর এ সাজিদ এক নয়! ভিন্ন কেউ। যে কখনো বিপাকে দেখেনি!
বিপা অবাক হলো না। সাজিদের বহুরূপিতায় সে অভ্যস্ত। পরদিন যথারীতি সাজিদ সকাল সকাল অফিসের জন্য বেরোল। বিকেলে বাড়ি আসবার বদলে বিপাকে ফোন করে জানাল, অফিসের কাজে শহরের বাইরে যাচ্ছে। হয়তো দু’দিন পরে ফিরবে। শুনেই বিপার মুখ কালো হয়ে গেল। ও স্পষ্ট জানে সাজিদের কাজকারবার। অফিসের নাম করে ও অন্যকোথাও যাবে! কিন্তু সেটা কোথায়?
বিপা ফোন করলো অফিসে। সাজিদের ডেস্কে নয়, রিসেপশনিস্টের কাছে। দুবার রিং হতেই রিসিভ হলো। সুকণ্ঠী নারী সালাম দিয়ে জানতে চাইলো,
--- কীভাবে সাহায্য করতে পারি? বলুন।
--- এটা কি সাজিদ সাহেবের অফিস? ম্যানেজার সাজিদ হোসেন?
--- জ্বি। স্যারের সঙ্গে কোনো প্রয়োজন ছিল?
--- অফিসে আছেন? উনাকে দেয়া যাবে একটু?
মহিলাটি চমৎকার করে হাসলো। একটু সময় চেয়ে নিয়ে অতঃপর কায়দা করে বললো,
--- দুঃখিত, ম্যাম। স্যার নেই। উনি মেডিক্যাল লিভে আছেন। আপনার প্রয়োজনটা জরুরি হলে স্যারের অফিসিয়াল নাম্বারটা প্রোভাইড করতে পারি। লাগবে?
--- না, থাক।
উদাস বিপা কল কেটে দিতে চাইলো। মহিলাটি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
--- ম্যাম, আপনার পরিচয়টা? স্যার এলে কি বলবো তাকে?
--- আমি একচুয়ালী উনার ক্লাসফেলো ছিলাম। অনেকদিন পর খোঁজ নিতে চেয়ে… কিছু বলতে হবে না। বাদ দিন, প্লীজ।
অপরপক্ষকে কিছু বলতে না দিয়েই ফোন রেখে দিলো বিপা। সাজিদ মেডিক্যাল লিভ নিয়েছে? কীসের অসুস্থতা ওর?
ফোন রাখতেই ফ্ল্যাটের কলবেল বেজে উঠলো। বিপা অবাক হয়ে একবার ফোন আরেকবার দরজার দিকে তাকালো। অসময়ে কে আসবে? সাজিদ এসেছে?
দরজা খুলে আগন্তুককে দেখেই চমকিত হলো বিপা। হাত থেকে সশব্দে খসে পড়লো গ্লাসটা। চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মেঝেতে পড়ে চারপাশে ছড়িয়ে গেল কাঁচখন্ড। তড়িতাহতের ন্যায় সেদিকে একবার দিকপাত করেই দৃষ্টি ফেরালো সম্মুখে; অভ্যাগতের মুখপানে। অজান্তেই ঠোঁটের ফাঁক গলে বেরিয়ে এলো দু’টো শব্দ,
--- জুবায়ের তুমি?