উদাস পূরবী হাওয়া

পর্ব - ২

🟢

সকাল থেকে আকাশটা আজ মেঘলা। কালচে মেঘে ছেয়ে আছে নীলাকাশ, আড়াল থেকে তেজ ছড়াচ্ছে দিবাকর। ভ্যাপসা গরম ছেড়েছে আজ। বায়ুর আদ্রতা বেশি। গায়ের ঘাম শুকোচ্ছে না কিছুতেই। মেঝেতেও পা ফেলা যাচ্ছে না, ঘেমে একাকার। পা ফেললেই একটা প্যাঁচ প্যাঁচে অনুভূতি হচ্ছে। খেয়াল না রাখলে মাঝে মধ্যে পিছলেও যাচ্ছে। কাজ করতে করতেই দু’বার আছাড় খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে বিপা। মিটসেলফ আর তাক, অবলম্বন যা পেয়েছে তাই আঁকড়ে ধরেছে বলে বাঁচোয়া। নয়তো নিচে পড়লে কোমরটাকে আর দেখতে হতো না! এতে যদিও শেষ রক্ষে হয় নি, মিটসেলফের সঙ্গে টক্কর খেয়ে কপালটা আহত হয়েছেই। ফলস্বরূপ সেকেন্ড ত্রিশের মধ্যেই ফুলে-ফেঁপে নিয়েছে ঢোলের রূপ!

‘উহ্! মা গো! কি ব্যথাটাই না হয়েছে।’—- আঘাতের জায়গাটায় হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করলো বিপা। স্যাভলন ক্রিমটা নিয়ে পা বাড়ালো ঘর অভিমুখে। বেশ সন্তর্পণে। আধভেজা টাইলসে হুড়মুড় করে না ছুটে, পা টিপে টিপে এগোলো। বেডরুমে এসে ফুলস্পিডে ফ্যান ছেড়ে, পা তুলে বসলো বিছানায়।

মলমটা লাগানো হতেই ফোন বেজে উঠলো ওর; অপরিচিত একটা নাম্বার। রিসিভ করে সালাম দিলো নম্রসুরে,

--- আসসালামু আলাইকুম। কে?

--- ওয়ালাইকুম আসসালাম। বিপা রহমান বলছিলেন?

--- জ্বি, আপনি? পরিচয়টা ঠিক-—

--- কেমন আছিস, দোস্ত্? আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি পৃথা!

উত্তেজনায় কণ্ঠরোধ হয়ে আসবার উপক্রম। সেই উদ্বেল যেন ফোনের এপাশে থাকা বিপাকেও স্পর্শ করে। অবিশ্বাস্যভাবে কাঁপতে থাকে ওর স্বর,

--- পৃথু?

কতদিন পরে কল দিলো ও? তিনবছর? না তারও বেশি?

বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীনই বিয়ে হয়ে যায় পৃথার। পরিবারের অমতে গিয়ে পছন্দের মানুষটাকে বিয়ে করে সংসার সাজিয়ে ফেলে। তখনও বিপার বিয়ে হয়নি। মাস্টার্স শেষ করে চাকরিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সাজিদ; বিপারা অনার্স ফাইনাল দিয়ে ঘরে বসে। সবার আগে গল্প পেতে ফলো করুন ‘মৌরিন আহমেদ’ পেইজে। এরমধ্যেই একদিন বান্ধবি মারফৎ খবর এলো,

‘পৃথা ভেগে গেছে কোন ছেলের সাথে!’

ওর সম্পর্কের কথা জানতো বিপা। পরিবার যে মানবে না সেও আগেই বিদিত ছিল। শুধু জানা ছিল না, পৃথা হুট করেই বিয়ে করে নেবে। পালিয়ে গিয়ে সেই যে নিখোঁজ হলো, তারপর আর কোনদিন দেখা হলো না। না হলো কোনো খবর পাওয়া!

আজ এতদিন পর হঠাৎ!

কিছু বলবার আগেই ওপাশ থেকে শোনা গেল নিলাশার হাস্যোজ্জ্বল স্বর,

--- কেমন আছিস রে? বিয়ে-শাদী করে ফেলেছিস? বরটি কে, হু?

বরের প্রসঙ্গ এলেই চেহারাটা মলিন হয়ে গেল ওর। বর? বিয়ে-শাদী? জোর করেই হাসলো; রহস্য করে বললো,

--- যার হবার কথা ছিল, সেই।

--- সেই? বাহ্ রে বাহ্! সাজিদ ভাইকে তো ভালো করেই আঁচলে বেঁধেছিলি তবে। সাত বছর আগের বজ্র আঁটুনি, এখনো টিকে আছে? সাব্বাস্!

বজ্র আঁটুনি? সত্যিই? নিজের উপর নিজেই কটাক্ষ করে মেয়েটা। অদৃষ্টের লিখনের কথা ভেবে মনে মনে বিদ্রুপের হাসি হাসে। তারপর কথা পালটে জিজ্ঞেস করলো,

---তোর কি খবর? কোথায় আছিস এখন? রবিন ভাই কেমন আছে?

---সে তো ভালোই। বিয়ের পর থেকেই তো গাজীপুরে থাকছি দু’জন। টোনাটুনির সংসার আমাদের। ছেলের বয়স ছ’ মাস চলছে।

--- ও বাবা! খালা হবার খবরটুকুও দিলি না? তুই এত খারাপ রে…

অনুযোগ করে বললো। বিপা কেবল হাসলো প্রত্যুত্তরে,

--- এইতো খবর দিলাম। শুধু আমাকে দোষ দিস কেন, তুইও তো খোঁজ করিস নি। তোর আর সাজিদ ভাইয়ের প্রেমে কি আমার কোনো অবদানই ছিল না? পরিচয় হয়েছিলি এই পৃথার মাধ্যমেই। অথচ বিয়েতে কাচ্চি খাওয়া তো দূর, খবরও পেলাম না!

--- জানাতে চেয়েছিলাম রে। ইনফ্যাক্ট ব্যাচের সবাইকেই ডেকেছিলাম। শুধু তোর নাম্বারটাই আনরিচেবল ছিল।

--- ওহ্ রে! ভুলেই গিয়েছিলাম। ওই সিমটা ভেঙে ফেলেছিলাম। বাবার এনআইডি দিয়ে তোলা; পড়ে আর ইস্যু করা হয় নি। স্যরি রে…

তারপর নানান কথা হয়। অনেকদিন পর প্রিয় সহচরীকে পেয়ে স্মৃতির ডায়েরি খুলে বসে দু’জন। সাংসারিক জীবনের সুখ-দুঃখের আলাপ থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই পুরোনো দিনের গল্প— সবকিছুই উঠে আসে কথা প্রসঙ্গে। একসময়ে হঠাৎ বলে ওঠে পৃথা,

--- জুবায়ের দেশে এসেছে, জানিস? কাল হুট করেই আমার বাড়ি এসে উপস্থিত। ব্যাচের কারো সাথে আমার যোগাযোগ নেই। দু’ একটার সাথে ফোনালাপ হয়, বাড়ি অবধি কেউ আসে নি। ও শালা আমার বাসার হদিস বের করলো কী করে? এতো অবাক হলাম…

‘জুবায়ের’! নামটা শুনে এতো বিস্মিত হয়ে বিপা! বুকের ভেতর অজানা একটা ঢেউ তোলপাড় করে বেড়ায় সেই পুরোনো দিনের মত··…

উদাস পূরবী হাওয়া বাংলা গল্প ইমেজ ২

রাত এগারোটা বেজে ত্রিশ মিনিট। রাজধানী শহরের একটি পাঁচ তারকা হোটেলের বিলাসবহুল কক্ষে বিব্রত অবস্থায় দু’জন নারী-পুরুষ। ক্ষণিক আগে যেন ঝড় উঠেছিল; ঘরময় তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে। সবার আগে গল্প পেতে ফলো করুন ‘মৌরিন আহমেদ’ পেইজে। এদিক-ওদিকে ছড়িয়ে আছে তার নিদর্শন। দীর্ঘ উন্মত্ততার পর ক্লান্ত হয়ে পড়ে আছে দু’টো শরীর। কিয়ৎক্ষণ পর মুখ তুলে তাকালো তরুণী,

--- ক’টা বাজছে?

অবসাদ মাখা দেহে তন্দ্রা ঘনীভূত হচ্ছিল সাজিদের। ঝিমোনি আসছিল। তরুণীর কথায় হাত বাড়িয়ে বেডসাইড টেবিলে ফোনটা খুঁজলো। হাতড়ানোর পর পাওয়া গেলেই স্ক্রিনে চোখ বুলালো,

--- বেশি না, মাত্র এগারোটা পঁয়ত্রিশ।

--- কীই? এতরাত হয়ে গেছে তুমি আমাকে বলবে না?

উৎকণ্ঠিত হয় তরুণী। তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে বিছানা ছাড়ে। হাত বাড়িয়ে মেঝে থেকে নিজের পোশাক তুলে নিলেই বাধা দেয় সাজিদ,

--- ও কি? তুমি চলে যাবে নাকি?

--- নয় তো? সারারাত তোমার সঙ্গে ফূর্তি করবো?

ঝাঁঝের সহিত উত্তর করে। সাজিদ উঠে বসে বিছানায়। একহাতে ওর হাতের জামাকাপড় টেনে ধরে দুষ্টুমির হাসি হাসে,

--- তুমি চাইলে করতেই পারো। আমি তো আছিই। ক্ষতি কি?

--- ইসস! খুব যেন সারারাত থাকবার মানুষ তুমি!

ভেংচি দিলো তরুণী। ওর হাত থেকে পুনরায় নিজের বস্ত্র উদ্ধার করে, গায়ে চাপাতে চাপাতে আরও কয়েকটা টিপ্পনী কাটলো। সাজিদ হাসলো সেসব শুনে। পেছনে হেডবোর্ডে হেলান দিতে দিতে জানালো,

--- বিশ্বাস না হলে একরাত থেকে দেখই না। এমনিতেই রাত হয়ে গেছে। এখন আর হোস্টেলে ফেরবার উপায় নেই তোমার।

এ-যাত্রায় ক্ষণকাল ভাবতে হলো ওকে। খুব দ্রুত কিসব হিসেব-নিকেশ করে বললো,

--- সে হোক গে। সমস্যা নেই। আমি ম্যানেজ করে নেব। কিন্তু তুমি কি করে ম্যানেজ করবে? তোমার বৌ আছে না? কি বলবে তাকে?

--- বলে দেব, ব্যস্ত আছি। অফিসের কাজে থাকতে হচ্ছে।

আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললো সে কথা, ওর নিয়মিত অজুহাতটা। গত ক’ মাসের বাঁধাধরা মিথ্যে বাহানা তো এটাই। লাস্যময়ী তরুণী হাসলো ওর জবাবে। লোকটা কি চমৎকার মিথ্যুক! বোকা স্ত্রীকে কীভাবে ঘোল খাওয়াচ্ছে! সে হতভাগী তা হয়তো জানতেও পারছে না—

ও এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো সাজিদের গলা, আহ্লাদে গদগদ হয়ে বললো,

--- তোমার বৌটা কি বোকা গো! এই এক অজুহাত দেখিয়ে দেখিয়ে কতোদিন পার করলে, বেচারি টেরও পেল না। ভাগ্য করে বৌ জুটিয়েছিলে কপালে। কিন্তু হ্যাঁ, আমার সাথে কিন্তু ওসব চলবে না। তোমার চালাকি ঠিক ধরে ফেলব… আর ধরলে না, একদম হুহ্! খাতাম!

বলেই হাত দিয়ে গলায় কৃত্রিম ছুরি চালানোর ভঙ্গি করে দেখায়। যেন খুব আমোদ পেয়েছে; হো হো করে হাসতে থাকলো সাজিদ। একসময়ে হাসির দমক কমে এলে বললো,

--- বাব্বাহ! ম্যাডাম তো দেখি পুরাই বাঘিনী। না, না ম্যাডাম। কথা দিচ্ছি আপনার সাথে কোনো চালাকি চলবে না। আড়ালে আবডালেও কিছু হবে না। যা হবে সব মুখোমুখি, ঠিক আছে?

--- হুঁ। এখন চলো তো, আমাকে এগিয়ে দেবে।

আরেকবার ওর বাহুলগ্না হয়ে আবদার করে তরুণী। ঠাট্টার পর এবার সিরিয়াস দেখায় সাজিদকে। মুখ তুলে শুধায়,

--- সত্যি সত্যিই থাকবে না? থেকে গেলে কিন্তু ভালো হতো। এমনিও আজ বাসায় ফেরার ইচ্ছে নেই আমার। রেন্ট তো করাই আছে, এখানেই থাকতাম। তুমিও…

সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে মেয়েটা। দ্বিধাগ্রস্থ চেহারায় বলে উঠে,

--- বুঝছি না কী করব। তুমি আবার থাকতে যাবে কেন? বাসায় গেলেই তো পারো। এতক্ষণ আমার সঙ্গে ছিলে, এখন যাও না হয় বাসায়… আমি কেন…

--- তুমি থাকলে আমার ভালো লাগবে, নি। আমরা আরেকটু সময় কাটাবো। অন্তরঙ্গ হয়ে নিরিবিলি থাকবো কিছুক্ষণ। প্লিজ থেকে যাও, সুইটহার্ট?

আদরের ডাককে এবার উপেক্ষা করতে পারে না ‘নি’ খ্যাত তরুণী। প্রিয়তমের এই আহ্বানকে স্বাগত না জানিয়ে সে স্বস্তি পায় না। নীরবে-নিভৃতে নিজেকে সঁপে দেয় আরও একবার!

_________

গহীন রাত্রি। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে বারোটা একচল্লিশে। ব্যালকনিতে একা দাঁড়িয়ে বিপা। বাইরের নিকষ কালো আকাশে দৃষ্টি ন্যস্ত। চাঁদহীন, মেঘমুক্ত অন্তরীক্ষ। অনেকদূরে দূরে কিছু নক্ষত্র ইতঃস্তত ছিটিয়ে আছে কেবল।

অনেকটা সময় পার হয়ে গেলেও এখনো সাজিদের দেখা নেই। ক’বার ফোন করলো, সুইচড অফ্ দেখাচ্ছে। ডাইন ইনে রাখা গরম ভাত এতক্ষণে শুকিয়ে বোধ হয় কড়কড়ি লাগলো। সবজিগুলো ঠাণ্ডা হিম হয়ে গেল। কতক্ষণ ওর খাবার বেড়ে পাশে বসে ছিল বিপা! ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল। শেষটায় না টিকতে পেরে উঠে এসেছে। ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল করলো সাজিদের নাম্বারে, রিং হলো। সৌভাগ্যক্রমে রিসিভও হলো। ওপাশ থেকে ঝাঁঝালো স্বর ভেসে এলো,

--- কি হইছে? এতবার করে কল দিতেছ কি জন্য? সমস্যা কি?

--- কই তুমি? কতোরাত হয়ে যাচ্ছে, আসবা কখন?

ওর কঠিন ভাষার বিপরীতে যথাসম্ভব কোমল কণ্ঠে শুধালো। স্ত্রীর প্রশ্নে যারপরনাই বিরক্ত হলো সাজিদ। ধমক দিয়ে বললো,

--- আসবো না আমি। অফিসের চাপ কি তুমি বুঝবা ক্যামনে? কাজ করতে করতে আমি অস্থির হয়ে যাচ্ছি, আর উনি এসে ঘণ্টায় ঘণ্টায় কল দিয়ে যন্ত্রণা শুরু করছে! রাখো ফোন।

--- এতো রাতে তুমি অফিসে?

ওর অনাবশ্যক জেরটানা একেবারেই পছন্দ করলো না সাজিদ। তিক্ততা নিয়ে থু করে একদলা থুথু ফেললো আশেপাশে। মুখ খারাপের চূড়ান্ত করে বললো,

--- নয় তো কি? অফিসে না থাইকা নটিপাড়ার নটি নিয়ে থাকব? আজাইরা বাল-ছালের কথা…

রাগ করে কল কেটে দিলো তারপর।

এতোটা তিক্ততা আশা করে নি বিপা। ওর বুকটা ভার হয়ে আসে অজানা ব্যথায়। শ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে। বড্ড অক্সিজেনের অভাব হয় যেন। হাঁসফাঁস অনুভূতিতে ছেয়ে থাকে সারা দেহমন। ভেতর থেকে একটা বিদ্রোহী স্বর শুনতে পায়,

--- কেন পারলি না? কেন ছেড়ে দিলি ওকে? কালরাতেই যদি সব শেষ করে দিতি, আস্তে করে চেপে ধরতি বালিশটা ওর মুখের উপর! কালই সব মিটে যেত। হয়ে যেত সব যন্ত্রণার অবসান…

হয় তো হতো। কিন্তু… কিন্তু… । সব জানে বিপা। সাজিদ প্রতারক, পরনারীতে আসক্ত। ঘরে স্ত্রীকে একা ফেলে বাইরে অন্য নারীর সঙ্গে সময় কাটায়, স্ফূর্তি করে। কিন্তু সব জেনেও কেন যে ওকে ওর যোগ্য শাস্তি দিতে পারলো না বিপা, কেন যে শেষ মুহূর্তে হাত সরিয়ে নিলো…

Story Cover