স্বামীর পরকীয়ার ব্যাপারটা অনেক আগেই আঁচ করেছিল বলে আজ সাজিদের শার্টে অন্য নারীর লিপস্টিকের দাগ দেখে একটুও অবাক হলো না বিপা। দু’ বছরের দাম্পত্য আর সাত বছরের সম্পর্কে চেনা সাজিদের একটু একটু করে পাল্টে যাওয়াটা তো ও লক্ষ্য করেছিল ভালোমতনই। ব্যস্ততার অজুহাতে কেমন করে ধীরে-ধীরে সাজিদ ওর থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল টের পেয়েছিল বিপা। ওর কষ্ট হলো না; বুকের ভেতর হতাশাও জন্ম নিলো না; কেবল অনুভূতিহীন শূন্য চোখে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলো গোল হয়ে বসা টুকটুকে লাল রঙা ঠোঁটের ছাপটার দিকে!
বাথরুম থেকে তিরতির করে পানির শব্দ আসছে। গত সপ্তাহে নতুন লাগানো হয়েছে ট্যাপটা। নব ঘুরালেই এতো আওয়াজ আসে! সাজিদ গোসল সারছে। অফিস থেকে ফিরেই সে গোসলে ঢুকে যায়। ওর এটা নিত্যকার অভ্যাস। দিনভর ক্লান্তির পর ঠাণ্ডা পানিতে অবগাহন না করতে পারলে বেচারার স্বস্তি হয় না না-কি। বিপা একঝলক তাকালো দরজায়। পানির শব্দের সঙ্গে সাজিদের গুনগুনানিও বেশ শোনা যাচ্ছে। বোধ হয় মনে আজ খুব ফূর্তি ওর!
শার্টটা বারান্দার তারে ঝুলিয়ে রান্নাঘরে চলে এলো বিপা। ভীষণ শান্ত ভঙ্গিতে। দেখে মনেই হচ্ছে না, মাত্র কিছুক্ষণ আগেই মেয়েটা জানতে পেরেছে তার স্বামী তার সঙ্গে প্রতারণা করছে। ঘরে বৌ রেখে বাইরের মেয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটাচ্ছে। কতোবড় ধোঁকা দিয়ে কি সুন্দর হেসে-খেলে বেড়াচ্ছে লোকটা! বিপা শ্বাস ফেললো। মিটসেলফ থেকে দুপুরের রান্না করে রাখা খাবারগুলো বের করলো একে একে। এগুলোকে গরম করতে হবে। সুনিপুণ দক্ষতার সঙ্গে সব কাজ সেরে বাটিগুলো খাবার টেবিলে পরিবেশন করলো। সাজিদ ততক্ষণে চলে এসেছে। চুল মুছে ভেজা তোয়ালেটা ওর হাতে ধরিয়ে এগিয়ে এলো টেবিলের দিকে,
--- দেখি আজ কি রান্না করেছ? রুইমাছ দিয়ে ঝিঙের ঝোল! এটা কিছু হলো?
মুখটা বাঁকা হলো ওর। চিরকাল শান্ত, স্থিরমতি বিপা চট করে উত্তর দেয় না। কেউ মুখের উপর মন্দ বললেও রা করে না। আজও সরলমুখেই বললো,
--- মাছ তো ভেজে দিয়েছি। দো-পেঁয়াজার মতো। খেয়ে দেখ! খারাপ লাগবে না।
উত্তরটা মনঃপুত হয় নি। কপালের ভাঁজ দেখেই তা বোঝা যাচ্ছে। আরেকটা বাটি এগিয়ে নিলো নিজের দিকে। চামচ দিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে বললো,
--- এটা কী পালংশাক! পালং শাকে মাষকলাই দেয় কে? নাকি কলাইয়ের ডালে পালংশাক ছেড়ে দিয়েছ! এসব সবজি আমি খাই না জানোই তো ভালো করে!
কটাক্ষ শুনে বিপার ইচ্ছে করলো দেয়ালের সঙ্গে মাথা ঠুকে মরে যেতে। বাজার করবার অভ্যাস তার কোনোদিনই ছিল না। করেও নি। ইদানীং যে সাজিদ বাজারও ঠিকঠাক করে না, সে খেয়াল কি ওর নেই? নিচে ভ্যানের সবজিওয়ালা যা নিয়ে আসে ও তো আজকাল তাই কিনে রাঁধে।
--- আজ সবজিওয়ালা অন্য কিছু আনেনি। যা ছিল…
--- তুমি বাজারে যেতে? নাকি যেতে পারো না?
কি অবলীলায় ওকে এসব শুনিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। বিপার ভারী অবাক লাগে। সে আর দাঁড়ায় না, তোয়ালে নিয়ে প্রস্থান করে নিঃশব্দে। যেতে যেতে কানে গেল সাজিদের গজগজানি,
--- সারাদিন বাড়ি বসে করো কি? সামান্য ক’ হাত দূরে বাজার থেকে কিছু কিনতে গেলে তুমি মlরে যাবে? রোজ সেই একঘেঁয়ে ঝোল-ঝাল! নাহয় সবজি এটাই রইলো, তাই বলে রান্নাও এক? এছাড়া আর কিছু জানো না? হাতে ফোন আছে, ইউটিউবে সার্চ দিলেই হাজার হাজার রেসিপি — কোনোদিন তো শখ করে রাঁধতে দেখলাম না! সারাদিন হাড় ভাঙা খাটুনি করে অফিস থেকে আসি; সে কি এই ঝিঙের ঝোল আর কলাইয়ের ডাল গেলার জন্য? স্বামীর পছন্দ মতো কিছু করতে জাত চলে যায় তোমার?
সব উপেক্ষা করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো বিপা। আর সঙ্গে সঙ্গেই একরাশ শীতল সমীরণ এসে ছুঁয়ে দিলো ওর সারা দেহমন। চনমনে হলো মস্তিষ্ক। একটু আগের উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে এলো। গল্প সবার আগে পেতে ফলো করুন ‘মৌরিন আহমেদ’ পেইজে।বারান্দা থেকেই নজর গেল নিচে, সামনের বিল্ডিংয়ের লনে; অফিস ফেরতা মি. এবং মিসেস. সাইফ দম্পতির দিকে। হাত ধরাধরি করে সুখী মানুষের ন্যায় তারা হেঁটে আসছে। লন পেরিয়ে সেভাবেই অন্তর্ধান করলো ভবনের ভেতর। বিপা চেয়ে রইলো অনিমেষ!
দৃশ্যটা আজকের নতুন নয়। প্রায়ই রাতে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে সদৃশ কিছু চোখে পড়ে বিপার। গত এক বছর ধরে এই বিল্ডিংয়ে থাকছে ওরা। ওদেরও আসবার আগে থেকেই সামনের বিল্ডিংয়ের তেতলায় ভাড়া থাকে সাইফ দম্পতি। প্রতিবেশী হিসেবে পরিচয় আছে বিপার। তাই জানে, বিবাহিত জীবনের অষ্টম বছরে পদার্পণ করেও ওদের ভেতর ‘ভালোবাসা’র একটুও ঘাটতি আসে নি। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকুরিজীবী, অথচ ভিন্ন অফিস হয়েও রোজ তাদের যাতায়াত হয় একসঙ্গেই। সকালে যেমন হাসিমুখে বেরোয় তেমনই ফিরে আসে হাস্যজ্জ্বল চেহারায়। ইসস, এমন দেখলেও যেন চোখ জুড়ায়। বিয়ের কতোদিন পরেও কি ভাব-ভালোবাসা ওদের!
অথচ তার!
বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোয়…
--- কি হলো? তোয়ালে নাড়তে গিয়ে হাওয়া হয়ে গেলে নাকি?
সাজিদের খ্যাটখ্যাটে রুক্ষ গলা কর্ণগোচর হতেই ধীর পায়ে এগোয় সেদিকে। ইতোমধ্যেই লোকটার অর্ধেক খাওয়া শেষ। টেবিলে তরকারির বাটিগুলো ছড়ানো ছিটানো। বলেছিল বটে একঘেঁয়ে খাওয়া ভালোলাগে না, কিন্তু খেতে বসে ওগুলোই হাপুস করে খেয়েছে। সঙ্গে নোংরা করেছে সবকিছু। ভাতের হাতে চামচ নেড়েছিল, মাখা ভাতের দাগ স্পষ্ট হাতলে। বিপা খাওয়া বিষয়ে বেশ খুঁতখুঁতে। চামচের ওই দাগ আর এলোমেলো টেবিল দেখেই তার রুচি উঠে গেল।
--- টেবিলটার এ হাল করেছ কেন? একটু গুছিয়ে তরকারি উঠালে কি হতো?
রাগ নয়, মৃদু অনুযোগ। সাজিদ বিরক্ত হলো,
--- সে খেয়াল তোমার রাখা উচিত ছিল না? স্বামী খেতে বসছে, তার জন্য প্লেট বেড়ে রাখবে— আজকাল তোমার সবকিছুতেই উদাসীনতা। কোনকিছুতেই মন নেই। সংসার না করতে ইচ্ছে করলে, বলে দিলেই হয়! আমি কি বেঁধে রেখেছি?
শেষটায় এসে ভেতরের উষ্মা প্রকাশ পেয়েই গেল। বিপা জবাব না দিয়ে কাজ করতে লাগলো, নিজমনে। সাজিদ হাত ধুয়ে উঠে গেল। ঘরে ওর ফোন বাজছে। কলটা জরুরি। এ-সময় ঘরে যাওয়া নিষেধ বিপার। গেলে সাজিদের ‘অফিসিয়াল গুরুত্বপূর্ণ কাজ’-র ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা। তাই ও নিজেই মানা করেছে।
বিপা ঘরে এলো ঘণ্টা দেড়েক পরে। ততক্ষণে লাইট নিভিয়ে সাজিদ ঘুমিয়ে পড়েছে। ভুসভুস করে নাক ডাকারও আওয়াজ আসছে। বিপা নিশ্চুপে এসে শুয়ে পড়লো পাশে। কোলবালিশটা বুকে চেপে ধীরে ধীরে ডুবে গেল অতীতের অতল থেকে অতলে…
*****
মফস্বলে বেড়ে ওঠা বিপার। উচ্চ মাধ্যমিক দিয়ে ঢাকা শহরে পা দিয়েছিল মেয়েটা। একা একা। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে মায়ের তখন ভরাট সংসার। বিপাকে নিয়ে আলাদা করে ভাববার অবকাশ নেই। বড় মেয়ে বলে ছোট থেকেই নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে শিখে নিয়েছিল ও, ঢাকায় এসে পুরোপুরি ভাবেই তা বহাল হলো।
নতুন শহর, নতুন পরিবেশে একা একা মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল খুব। তখনই দেখা মিললো বরিশালের মেয়ে পৃথার। বরিশালের মানুষ মানেই অন্যরকম ব্যাপার। অন্যকে নমঃ নমঃ করে চলা এদের ধাঁতের মধ্যে নেই। এরা নিজেরাই স্বয়ম্ভু, একাই একশো।গল্প সবার আগে পেতে ফলো করুন ‘মৌরিন আহমেদ’ পেইজে। পৃথার হাত ধরে নতুন করে পথচলার শুরুটা হলো বিপার। ক্লাস - টিউশন - আড্ডা --- জমজমাট সব। পৃথার ভাইয়ের বন্ধু ছিল সাজিদ। ওদেরই ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র। গল্প সবার আগে পেতে ফলো করুন ‘মৌরিন আহমেদ’ পেইজে।সেই সূত্রে পরিচয়। একসময়ে পরিচয় গড়ায় প্রণয়ে, আর প্রণয় থেকে পরিণয়ে!
সাত বছরের বৃহৎ স্মৃতির ঝুলিটা যেন চোখের সামনে উপুড় করে ফেলে দিলো কেউ। বেরিয়ে এলো রঙিন এক ডায়েরি। যার প্রতিটা পাতায় পাতায় হাসি-আনন্দে ভরা!
---এতো নড়তেছ কি জন্য? ঘুমাইতে কি সমস্যা?
নিদ্রালু স্বরে বিরক্তি উপচে পড়ছে যেন। বিপা চমকে উঠলো খানিক। আচমকা বাস্তবে ফিরে অপ্রস্তুত হলো,
--- ঘুম আসছিল না, স্যরি!
--- ঘুম না আসলে উঠে যাও। শুয়ে শুয়ে ঘটঘট করে নড়বা আর আমার ঘুম হারাম করবা? কি মনে করো তুমি? তোমার মত সারাদিন ঘরে বসে তো আমার দিন কাটে না। অফিসে পরিশ্রম করা লাগে… একটু ঘুমাবো যে শান্তিমত; তোমার জ্বালায় তাও হয় না!
দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে ধরলো বিপা। নড়াচড়া বন্ধ করে নিঃশব্দে অসাড় হয়ে পড়ে রইলো। আর কোনো কথা হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সাজিদ। নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া গেল। নিদ্রাহীন বিপার দুটি চোখ নিশাচরের মতো চেয়ে রইলো, খোলা জানালা দিয়ে বাহির পানে। বিদ্যুতের তারে বসে আছে দু’টো মিশমিশে কালো পাখি। কি নাম ওদের? ফিঙে?
গহীন রাত্রির নির্জনে তারা দুটি প্রাণী বসে আছে নিভৃতে। কী যেন গোপন আলাপন সারছে চোখে - চোখে, ঠোঁটে - ঠোঁটে।
ঠিক কতটা সময় পেরোলো বিপা জানে না। আজ পুরোনো দিনের কথা খুব করে মনে পড়ছে ওর। ইউনিভার্সিটির সেই রঙিন দিনগুলো, পুরোনো সাজিদ, পুরনো বন্ধুবান্ধব— পৃথার কথাও মনে আসছে। কতগুলো দিন হয়ে গেল দেখা হয় না ওর সঙ্গে!
তীব্র নারীবাদী মেয়ে ছিল পৃথা। প্রচণ্ড রকমের জেদি, বেপরোয়া ছিল ওর চালচলন। নিজের ক্ষতি হবে জেনেও অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস পুষত বুকে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল মেয়েটা। ওকে বেশ ভরসাও করতো বিপা। প্রতিটা কাজের আগে ওর কাছ থেকে পরামর্শ নিতো। সাজিদের সাথে সম্পর্কের শুরুতে যদিও ওর বেশ সায় ছিল; কিন্তু পরবর্তীতে সেটা আর থাকে নি। অদ্ভুৎ কারণে সাজিদকে ও ঠিক দেখতে পারতো না। বিপাকে প্রায়ই বলতো, সর্ম্পকটা নিয়ে ভালো করে ভাবতে। বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সব খতিয়ে দেখতে। বিপা সেভাবে গুরুত্ব দিত না। কখনো হয় তো মন দিয়ে শোনেও নি ওর কথা। এখন বুঝতে পারে, ওর ভুলটা। পৃথার কথাটা অগ্রাহ্য করে নিজের হাতে নিজের কতবড় সর্বনাশ করেছে সে। ‘হাহ্! তখন যদি ভাবতাম!’— দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাশ ফিরে শোয় বিপা।
ক’দিন হলো প্রচণ্ড গরম পড়েছে। ফ্যান ছাড়া একমুহূর্ত টেকা দায়। বাসায় এসি লাগানোর কথা অনেকদিন থেকেই। নানা কারণে লাগানো হয়ে ওঠে নি। ফ্যান অবশ্য ঘুরছে তার সর্বোচ্চ গতিতে, তবুও গা ঘামছে বিপার। হাঁসফাঁস করে ওঠে বসলো সে। একটু ভয় ভয় চোখেই তাকালো পাশে; গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন সাজিদ। গরমের দরুণ ইদানীং খালি গায়ে শোয় লোকটা। ফ্যানের বরাবর শুয়েছে বলে শরীরে ঘামের রেশ অবধি নেই। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বড্ড সুখের ঘুম ঘুমোচ্ছে ও! হঠাৎ করেই বিপার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আজন্ম বিবাদহীন নির্লিপ্ত মস্তিষ্ক অকস্মাৎ বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। তীব্র রোষের ঝড় উঠলো অন্তরে,
--- আমার দু’ চোখের ঘুম কেড়ে নিয়ে কি দিব্যি ঘুমাচ্ছ তুমি! বোকাসোকা আমাকে পেয়ে কি সুখেই না প্রতারণা করে যাচ্ছ দিনের পর দিন। আচ্ছা, তোমার মত প্রতারকের কি কোনো অধিকার আছে বেঁচে থাকার? কোনো অধিকার আছে এই পৃথিবীর আলোবাতাস খেয়ে একে দূষিত করার? নেই তো—
হাতের শুভ্র বালিশটা ধীরে-ধীরে নেমে এলো ঘুমন্ত সাজিদের মুখের উপর…