ভবিষ্যতী

পর্ব - ৯

🟢

মুনির চিৎকারে সোনালী মা-বাবা ছুটে চলে আসে।ততক্ষণে সোনালী ঠিক হয়ে গেছে।সোনালীকে মাটিতে শুয়ে থাকতে দেখে,তার মা-বাবা চিন্তায় পড়ে যান।তার হাত ধরে টেনে উঠায়।এরপর বাড়িতে নিয়ে আসে।তাকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়।

সোনালীর পড়ার জায়গায়,ফুচকাগুলো এখনও পড়ে রয়েছে।ফুচকার টকগুলো মাটিতে মিশে যাচ্ছে।হঠাৎ ফুচকাগুলো খাওয়ার শব্দ হয়।কেউ মনে হয়, সেগুলো খাচ্ছে।খাওয়ার শব্দের সঙ্গে, টক চুসে খাওয়ারও শব্দ শোনা যাচ্ছে।

-কী হয়েছিল ওর?( কুলসুম বেগম মুনিকে বলে)

-আসলে চাচী,ও হঠাৎ করেই মাথা ঘুরে পড়ে যায়।( মুনি আসল কথা লুকায়)

-মাথা ঘুরে পড়ে গেল কেন?( কুলসুম বেগম)

-বেশি রৌদ্রে ছিল।তা-ই হয়তো এমন হয়েছে।এত চিন্তার করার কিছু নেই।( মুনি )

-তাহলে তুই চিৎকার করে উঠলি কেন?( কুলসুম বেগম)

-ভয় পেয়ে গেছিলাম।তা-ই তো চিৎকার করেছি।( মুনি মুখে চাঁপা কথা রেখে)

এই নিয়ে কেউ আর কোনো মন্তব্য করলো না।মুনিও সোনালীকে বিদায় দিয়ে চলে গেল।যাওয়ার সময় তার কানে কানে বললো,

" কালকে ভোরবেলা তুই আমার বাড়িতে যাস,তোর সঙ্গে গুরত্বপূর্ণ কথা আছে।"

মুনি চলে যায়।তার এমন কথা,সোনালীর মনে প্রশ্ন জাগায়।কী এমন কথা,যা সে আজ বলবে না।অদ্ভুত! আজ বললে কে-ই বা হতো?নানা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।সেই সঙ্গে এক অজানা ভয়ও,এবার সে যখন খিঁচুনি খেয়েছিল।তখন সে এক অন্ধকার জায়গায়, নিজেকে আবিষ্কার করেছিল।

---------

রাসেল বাড়ি ফিরে।সে তার মা-বাবাকে ডাক্তারের বলা কথাগুলো বলে।সেগুলো শুনে তার মা-বাবা, সোনালীর সঙ্গে বিয়ে দিতে চায় না। রাসেলও বার বার বলে,সে ওকেই বিয়ে করবে।রাসেল নিজের ঘরে গিয়ে,দরজা বন্ধ করে দেয়।

----

কবিরাজ বাড়ি আসেন।রত্মা বাসায় নেই।সে পুরো বাড়ি খোঁজে তাও পায় না।যখন সব জায়গায় খোঁজা শেষ।তখন রত্মা বাড়িতে আসে।তাকে দেখে কবিরাজ ঘাড় ঘোরায়।শুধু ঘাড়,শরীর নয় কিন্তুু!রত্মা ভয় পেয়ে যায়।কবিরাজ ভয়ংকর কন্ঠে বলে,

"তোকে না বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করেছি।তাহলে বের হলি কেন!আর কোথায় বা গেছিলি তুই?"

রত্মা কিছু বলে না।তার চোখে মুখে ভয়।হাত পা কাঁপছে।কবিরাজ দুই হাত ও পা দিয়ে তার কাছে আছে,মাকড়সার মতো করে।রত্মা এবার প্রচন্ড ভয়ে যায়।সে ভয়ে চিৎকার করে ফেলে।তখন-ই কবিরাজ তার একটা পায়ে কামড় দেয়।এরপর তাকে টেনে নিয়ে ঘরে যায়।

রত্মার চিৎকার শুনে পাড়া প্রতিবেশী ছুটে আসে।

-কী হয়েছে কবিরাজমশায়,রত্মা ওভাবে চিৎকার করলো কেন?( প্রতিবেশী)

-ওর কথা,ও তেলাপোকা দিয়ে ভয় পেয়ে চিৎকার করেছে।( কবিরাজ হেঁসে)

তার কথা শুনে সকলে চলে যায়।রত্নার পা দিয়ে রক্ত ঝরছে।অতি ভয়ে সে জ্ঞান হারিয়েছে।কবিরাজ ঘরে প্রবেশ করে।তখন-ই কেউ একজন দরজায় ঠকঠক করে।

-কে?( কবিরাজ)

-আমি মা,আপনার ছেলের বউ।( অচেনা এক মহিলা মাথায় গোমটা দিয়ে)

কবিরাজ মুঁচকি হাঁসি দেয়।এরপর তার দুই শরীর থেকে আলাদা করে।তারপর দরজা খোলে।

------

স্বপ্ন রাজবাড়ির কর্ত্রী সোহানা ( বয়োজ্যেষ্ঠ) সকলকে বসার ঘরে ডাকে।তিনি সকলকে রাজবাড়ির ঐতিহ্যর কথা বলেন।আগে তারা পুরো গ্রামকে খাওয়াতেন,তাই তিনি এবারও পুরো গ্রামকে খাওয়াতে চান।এ জন্য, তিনি সবাইকে আলোচনার জন্য ডেকেছে।প্রত্যেকেই রাজি আছে বলে এবং কী খাওয়ানো হবে, সেগুলো নিয়ে মন্তব্য করে।

শুধু সবুজ কিছু বলে না।যখন সবাই তার দিকে তাঁকায়।তখন সে শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি জানায়।এতেই প্রত্যেকে খুশি হয়।আগামীকাল খাওয়ানোর দিন নির্ধারণ হলো।খাওয়ানোর ঘোষণা দেওয়ার জন্য শান্ত,নীলা আর সজল বেরিয়ে পড়ে।তারা ভ্যানে চড়ে মাইক দিয়ে বলে,

" একটি দাওয়াতের ঘোষণা।আগামীকাল রাজবাড়িতে সকলে দাওয়াত।গুরুর মাংস,মুরগির মাংস,হাঁসের মাংস,খাসির মাংস,কয়েক ধরনের মাছ ভাঁজা,মাছের ঝোল,ডিম ভাজি,ডিম ভুনা,সাদা ভাত,খিচুড়ি,বিরিয়ানি,পোলাও আর একশো ধরনের মিষ্টি থাকবে,এই বিশেষ ঐতিহ্যর দাওয়াতে।সবাই আগামীকাল ঠিক বিকাল ৪:০০ দিকে চলে আসবেন।কারণ,আগামীকাল বিকাল ৪ টায় হবে রাজভোজন,উম, আমার জিভেই জল চলে আসলো।

রাস্তায় তাদের মুনি আর সোনালী দেখে।সোনালী আর মুনি দাওয়াতের ঘোষণা শুনে হাঁসতে থাকে।তারা যেভাবে ঘোষণা দিচ্ছে,তাতে না হেঁসে থাকা যায় না।তাদের দুজন দেখে নীলা,সজল আর শান্ত হাই দেয়।এরপর তাদের ভ্যান উঠতে বলে।তারা উঠতে না চাইলে,তারা তাদের টেনে ভ্যানে তোলে।এরপর সকলে মিলে দাওয়াত দিতে থাকে।

-সোনালী কালকে কিন্তুু সকাল সকাল তুই আমাদের বাড়ি যাস।সঙ্গে মুনিকেও নিয়ে যাস।তুই করে বললাম,এতে আবার কিছু মনে করিস না। ( নীলা)

-না,না ঠিক আছে।( সোনালী হেঁসে)

-তোরা দুজনও আমাদের এখন থেকে তুই করে বলবি,ঠিক আছে?( শান্ত হেঁসে)

-হুম,ঠিক আছে।( সোনালী)

-তাহলে কালকে সকালবেলা আসিস।( সজল মুনির দিকে তাঁকিয়ে)

-কালকে সকালেই আমরা চলে যাবো।( মুনি হেঁসে সজলের দিকে তাঁকিয়ে)

মাঝপথে রাসেলকে দেখে, সোনালী ভ্যান থামাতে বলে।ভ্যান থেকে সোনালী নেমে পড়ে।মুনি থেকে যায়।রাসেল সোনালীকে বাইকে করে নিয়ে চলে যায়।যাওয়ার সময় মুনি হেঁসে বলে,

" এত ভালো যদি আমায় কেউ বাসতো।তাহলে আমি তার পা ধুয়ে পানি খেতাম।"

ভ্যানে থাকা সকলে হাঁসতে থাকে।সোনালী পিছনে হাত দিয়ে মার দেবে, ইশারা দেয়।ভ্যান করে তারা এগোতে থাকে।হঠাৎ ভাঙা রাস্তা আসলে,মুনি পড়ে যেতে বসে।তখন তাকে সজল ধরে নেয়।দুজনকে এমন অবস্থায় দেখে সকলে মিটমিট করে হাঁসে।

সজল যে মুনি পছন্দ করে।সেটা সকলে আগেই টের পেয়েছিল।মুনি নিজে সামলে নিয়ে, ঠিক হয়ে দাঁড়ায়।দুপুরের সময় তাদের মাইকিং করা শেষ হয়।মুনি নিচে নেমে পড়ে।

-বলছি,আমি তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি।( সজল একটু আমতা করে বললো)

-হ্যাঁ,আমি একাই চলে যেতে পারবো।এখন রাত নয়,দুপুর।( মুনি হেঁসে চলে যায়)

-পাগল, দুপুরের সময় কেউ বলে, আমি তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি।( শান্ত সজলের মাথায় মেরে বলে)

-----

বিকেলবেলা,

সোনালীর বাসায় মুনি আসে।সকালবেলা গত সন্ধ্যার কথা বলতে গিয়ে,বলতে পারেনি মুনি।তাই সে এখন বলতে এসেছে।মুনি ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়।সোনালী খানেকটা অবাক হয়।

-কীরে দরজা বন্ধ করলি কেন?( সোনালী)

-তোকে বলেছিলাম না,একটা গুরত্বপূর্ণ কথা বলবো। সেটাই বলতে এসেছি।যাতে কেউ শুনতে না পায়।তাই জন্য ঘরের দরজা লাগিয়ে দিয়েছি।( মুনি)

-কী এমন গুরত্বপূর্ণ কথা, যেটা তুই গতকালকে বলতে পারিসনি!আবার আজকে গোপনে বলতে হচ্ছে!( সোনালীর মুখে চিন্তা)

------

মাইকিং করে রাজবাড়ি ফিরেছে সকলে,তাদের জন্য শান্তা লেবুর শরবত তৈরি করেছে।এই গরমে লেবুর শরবত খেলে ভালো লাগবে।সে প্রত্যেকে বাড়িতে প্রবেশ করার পূর্বে,এক গ্লাস শরবত দিচ্ছে।সোফায় বসে শরবত পান করছে আর কালকের বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে,যে কী কী করা যায়।তারা কালকের দিনকে সকলের জন্য স্মরণীয় করে রাখতে চায়

-কেমন হয়,যদি কালকে রাজ ভোজনের সঙ্গে, রাজ নৃত্য ও গান পরিবেশ হয়?( নীলা একটু ভেবে বললো)

-বাহ্,বুদ্ধিটা দারুণ।এতে খাবার পর সকলে বিনোদনও পাবে আর আমরাও আনন্দ করতে পারবো।( শান্ত খুশি হয়ে)

-আমাদের সঙ্গে মুনি আর সজলও একটু আনন্দ করে নেবে।( নীলা মুঁচকি হেঁসে)

-এই তুই কিন্তুু এবার বেশি বাড়াবাড়ি করছিস।ভূলে যাস না আমি তোর এক মাসের হলেও বড়।তাই সম্মান দিয়ে কথা বল।( সজল রেগে)

নীলা মুখ ভেঙানো শুরু করে।তখন সজল রেগে তার পিছে তাড়া দেয়।নীলাও দৌড় দেয়।কখনোও নীলা বাম দিকে যায়,তো কখনোও সজল ডান দিকে।এভাবেই তাদের না ধরার,ধরাধরি শুরু হয়েছে।সোহানা বেগমের ( বয়োজ্যেষ্ঠ) এসব দেখে ভালোই লাগছে।

কিন্তুু হঠাৎ সকলের আনন্দ শেষ হয়ে যায়।নেমে আসে আতঙ্কের আর ভয়ের ছায়া।রাজাবাড়ির সবচেয়ে ঝাঁরবাতি খুলে পড়ে যায়।

-----

-কী গুরুত্বপূর্ণ কথা বল?( সোনালী)

-গতকালকে তুই বরাবরের মতোই খিঁচুনি দিচ্ছিল।পরে খিঁচুনি বন্ধ হয়ে যায়।তুই চোখও খুলিস তবে,তোর চোখ দুটো কালো হয়ে গেছিল।( মুনি)

-একদম স্বপ্নের মতো।( সোনালী আতঙ্ক বলে উঠলো)

তার কথার আগামাথা, কিছুই বুঝতে পেল না, মুনি।

তবে তার মুখে ছিল অজানা আতঙ্ক।যার বিষয়ে,সে নিজেও অবগত ছিল না।

Story Cover