ভবিষ্যতী

পর্ব - ৮

🟢

সবুজের চিৎকারের আওয়াজ, পুরো রাজবাড়িতে ছড়িয়ে যায়।প্রত্যেকে খাবার ছেঁড়ে দ্রুত উপরে ছুটে আসে।সবুজের রুম ভেতর থেকে বন্ধ করা।তার উপর সে কারো কথার কোনো জবাব দিচ্ছে না।তাই বাধ্য হয়ে সবুজের চাচতো ভাই সজল আর আপন ভাই শান্ত দরজা ভেঙে ফেলে।

ভেতরে গিয়ে দেখে,সবুজ অজ্ঞান হয়ে নিচে পড়ে রয়েছে।সজল আর শান্ত দুজনে, সবুজকে তুলে বিছানায় শোয়ায়।সবুজের মা ( আয়না বেগম) কাঁদছেন।তার দাদী( সোহানা বেগম) পানি আনতে বলে।নীলা দৌড় দিয়ে পানি নিয়ে আসে।এরপর পানির ছিঁটে সবুজের চোখে দেয়।

একটু পরেই সবুজ চোখ মিলে তাঁকায়।সে উঠে বসে।তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে।

-আমি প্রচুর ভয় পেয়ে গেছিলাম।( আয়না বেগম কেঁদে বলেন)

-এখন কাঁদছো কেন!সবুজ তো ঠিক আছে।( সোহানা বেগম বকা দিয়ে)

-হ্যাঁ মা,এখন কান্না থামাও।ভাইয়া তো ঠিক আছে।( শান্তা আয়না বেগমর কাঁধে হাত রেখে)

-তোমরা সবাই আমার ঘর নোংরা করে দিয়েছো।বের হয়ে যাও সকলে,এখুনি। ( রেগে বললো সবুজ)

-কী অদ্ভুত! ওর জন্য সবাই চিন্তা করছিল আর ও কেমন ব্যবহার করছে দেখো।( নীলা আস্তে আস্তে বললো)

আয়না বেগম তার কথায় কষ্ট পায়।তিনি চোখের পানি মুছে ফেলে,উঠে দাঁড়ায়।বাকি সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যায়।সবশেষে আয়না বেগম বের হতে লাগলে,সবুজ তাকে ডাক দিয়ে আটকায় আর বলে,

" এত চিন্তা করো না মা,আমি ঠিক আছি।শুধু আমায় বরাবরের মতো একা ছেঁড়ে দাও।"

এই কথা বলে সবুজ তার মা'কে বের করে দেয়।এরপর দরজা লাগিয়ে দেয়।এই কথা শুনে আয়না বেগমের মুখে হাঁসি চলে আসে।সকলেও খুশি হয়,একটু হলেও ভালো কথা বলেছে।

সকলে আবার নিচে চলে আসে।প্রত্যেকে অবাক হয়ে যায়।টেবিলে রাখা সকল খাবার, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।এসব কে করলো!কীভাবেই বা হলো?হঠাৎ নীলা লক্ষ্য করলো,দূরে একটা বিড়াল বসে।কালো কুচকুচে বিড়াল।বিড়ালটি লেজ গুজে বসে আছে।নীলা তার দিকে তাঁকালে, বিড়ালটিও তার দিকে তাঁকায়।

তবে বিড়ালের চাহনি ছিল বেশ অদ্ভুত।মনে হচ্ছিল,সে বিড়াল নয়, কোনো মানুষ। নীলা সকলে বিড়ালের কথা বলে।সবাই বিড়ালের দিকে তাঁকালে,বিড়ালটি দৌড় দেয়।সবাই বুঝতে পারে,বিড়ালই এভাবে খাবার নষ্ট করেছে।

------

সোনালীর চোখ কালো হয়ে গেছে।তা-ই দেখে মুনি ভয় পেয়ে যায়।তার চিৎকারের আওয়াজে কিছু লোক, নার্স আর রাসেল আসে।ততক্ষণে সোনালী ঠিক হয়ে গেছে।রাসেল সোনালীর হাত শক্ত করে ধরে।

-তুমি ঠিক আছো!( রাসেল ভয়ে)

-হ্যাঁ,আমি ঠিক আছি।( সোনালীর রাসেলের হাতের উপর হাত রেখে)

-এ আমি কী দেখলাম!যা দেখলাম,তা সবই সত্যি দেখলাম নাকি মনের ভূল।( মুনির মনোলগ)

-চলো আমরা এখন বাড়ি চলে যাই।দুঃখিত আপনাদের বিরক্ত করার জন্য। ( রাসেল সোনালীকে উঠিয়ে)

-সমস্যা নেই।( নার্স আর লোকগুলো চলে যায়)

তারা সকলে বাইকে উঠে পড়ে।এরপর হাসপাতালে চলে আসে।ডাক্তার তার চ্যাপ করে এবং তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে।যা শুনে স্বপ্নের মতোই,তিনি তাকে মানসিক রোগী মনে করেন।যেটা তিনি সোনালীকে বলেন না।ডাক্তার রাসেলকে ডেকে একান্তভাবে কথাগুলো বলে।

রাসেল ডাক্তারের বলা কথাগুলো লুকিয়ে রাখে।

-ডাক্তার কী বললো?( সোনালী হাসপাতালে দাঁড়িয়ে)

-বললো,আরও কিছু চ্যাপআপ করতে হবে।তবে, সেগুলো এখানে করা যাবে না।সেই চ্যাকআপ গুলো করাতে শহরে যেতে হবে।( রাসেল হেঁসে)

-তার মানে আরও টাকা।( সোনালী)

-আবার টাকা!এই টাকার কথা ভাবতে গিয়েই তো এত দেরি হলো।যদি আগে বলে দিতে,তাহলে হয়তো আজ শহরে যেতে হবে না।( রাসেল একটু রেগে)

-আমি আর এমন করবো না।( সোনালী মাথা নিঁচু করে)

-আমি আজ গিয়ে শহরের ডাক্তারের সাথে কথা বলবো।এরপর দিন পাচেঁকের মধ্যে আমরা শহরে যাবো।সেখানে আমার চাচা থাকেন।আমরা দুজন তার বাড়িতেই থাকবো।

-আচ্ছা।

মুনি তাদের কথোপকথনের মধ্যে কিছু বলে না।সে শুধু তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে।বাইকে উঠে তারা রওয়ানা দেয়।মাঝ রাস্তায় ফুচকাওয়ালাকে দেখলে,সোনালীকে বাইক থামাতে বলে।রাসেল বাইক থামিয়ে দেয়।সোনালী রাসেল আর মুনির হাত টেনে নিয়ে যায়।

-কতদিন হলো ফুচকা খাই না।মামা,ফুচকা কত করে?( সোনালী)

-ফুচকা ১০ টাকা, ২০ টাকা,৫০ টাকা আর ১০০ টাকার প্লেট আছে।তুমি কোনটা নেবে,তাই বলো।( ফুচকাওয়ালা)

-যেটা ভালো সেটা দেন,তিন প্লেট। ( সোনালী)

-ঠিক আছে,তাহলে ৫০ টাকার প্লেট দিচ্ছি।( ফুচকাওয়ালা)

তিনজনে মিলে ফুচকা খায়।মুনি আর সোনালী প্রচুর টক নেয়।টক খেয়ে তাদের চোখ মুখ অন্যরকম হয়ে যায়।যা দেখে রাসেল হাঁসতে থাকে।সোনালী মুখ ভেঙচি দিয়ে, রাসেলের মুখে ফুচকা ভরে দেয়।মুনি তো হাঁসতে হাঁসতে পড়েই যাচ্ছিল।সে পড়ে না গেলেও, তার প্লেটের ৩ টা ফুচকা নিচে পড়ে যায়।মুনি মুখ ঘোমড়া করে ফেলে।ফুচকাওয়ালাসহ সেখানে উপস্থিত সকলে হেঁসে ফেলে।

চারপাশ হাঁসিতে ভরে যায়।সুখের সুবাশ ছড়িয়ে যায় চারিদিক।কিন্তুু সে সুবাশ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।কবিরাজ সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল।সোনালীকে থেকে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে।কবিরাজকে দেখে সবাই চুপ হয়ে যায়।

তিনি সোনালীর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।

-কী খাবেন কবিরাজ?ফুচকা,চটপটি নাকি ঝালমুড়ি। ( ফুচকাওয়ালা)

-ফুসকা দাও ২০ টাকার।( কবিরাজ)

-কত দিন হলো আপনার সঙ্গে দেখা হয় না।কথাও হয় না,আগে দেখা হলে কত কী বলতেন।এখন আর দেখাও হয় না আর কিছু বলেনও না।

কবিরাজ মুঁচকি হেঁসে বলে

" বলতে তো কত কিছুই চাই। কিন্তুু বলার সুযোগ আর পাই কই?"

সোনালীর দিকে তাঁকায়।কথাগুলো শুনে সোনালী কবিরাজের দিকে তাঁকায়।কথাগুলো স্বপ্নে বলা কথাগুলোর মতো।কিন্তুু স্বপ্নের মতো নয়।কবিরাজ ফুচকা প্যাকেটে নেন।এরপর তিনি বাড়ি চলে যান।

সোনালী আর বাকিরাও ফুচকা খাওয়া শেষ করে।তাদের সঙ্গে কিছু প্যাকেট করেও নিয়ে যায়।এগুলো সকলের পরিবারের জন্য।সব টাকা রাসেল নিজে দিয়েছে।

-শালী, আমি কেমন দুলাভাই?( রাসেল টাকা দেখিয়ে)

-আপনি আমার টাকাওয়ালা দুলাভাই।( মুনি হাত থেকে টাকা নিয়ে)

রাসেল মুনি আর সোনালীকে বাড়ি দিয়ে যায়।সন্ধ্যা হয়ে গেছে,সূর্যের অল্প কিরণে চারপাশ হলুদ হয়ে রয়েছে।ফুচকা নিয়ে আসার সময়, তাদের পথের সামনে রত্মা আসে।রত্মা হলো কবিরাজের মেয়ে।চোখে মুখে তার ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।হঠাৎ সে সোনালীর হাত ধরলো।ধরে বললো,

" বিপদ,বিপদ আসছে।তোমার সামনে ভীষণ বিপদ,সোনালী।এর বেশি কিছু আমি বলতে পারবো না।"

রত্মা আর কিছু না বলে না।সে সোনালীর হাত ছেঁড়ে দেয়।সোজা দৌড় দেয়।মুনি আর সোনালী ওর কথায় কোনো গুরত্ব দেয় না।কারণ রত্মা ছোটবেলা থেকেই পাগল।তাই কেউ তার কথার তেমন কোনো গুরত্ব দিল না।তারা দুজন চলে যায়।মুনি তার রাস্তায় আর সোনালী তার রাস্তায়।সোনালী অবাক হয়ে যায়।তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়।দোকানে কবিরাজ বসে।

কিন্তুু কবিরাজ তো উল্টো পথে গেছিল।তাহলে তিনি এখানে এলো কী করে!এটা তো স্বপ্নের সঙ্গে মিলে গেল।তাহলে তার স্বপ্নের কোনো মানে আছে!নানা চিন্তায় সে দ্রুত হেঁটে চলে গেল।কবিরাজ তার চলে যাওয়ার পথে, তাঁকিয়ে মুঁচকি হাঁসি দিল।

সোনালী প্রায় বাড়ি চলে এসেছে।তাদের বাড়ি যাওয়ার আগে কলাবাগান আসে।সে কলাবাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।তখনই তার সামনে কালো বিড়াল আসলো।স্বপ্নের কালো বিড়াল,বিড়ালটি অদ্ভুত ভাবে তার দিকে তাঁকালো।এরপর এক দৌড় দিয়ে ঝোঁপের মধ্যে চলে যায়।

সোনালী এবার ভয় পেতে শুরু করেছে।স্বপ্নের প্রায় সবকিছুই হচ্ছে।শুধু উল্টো ভাবে,এছাড়া সবই একই রকম।সোনালী দ্রুত হাঁটা শুরু করে।তখনই কেউ তার কাঁধে হাত দেয়।সে ভয়ে থেমে যায়।হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে যায়।

সে পিছনে ঘুরে দেখে মুনি।হঠাৎ সোনালী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।সে আবারও খিঁচুনি দিতে শুরু করে।মুনি ভয় পেয়ে যায়।সে কী করবে,কিছু বুঝতে পারে না।মুনি সোনালীর হাত শক্ত করে ধরে।

সে আরও ভয় পেয়ে যায়।যখন সোনালী খিঁচুনি দেওয়া বন্ধ করে দেয়।কিন্তুু তার চোখ দুটো কালো হয়ে যায়।মুনির সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।সে অনেক কষ্ট করে চিৎকার করে বলে,

" সা..হা..য্য করো।কেউ সাহায্য করো।চাচী,চাচা সোনালীর কী যেন হয়েছে।"

বিঃদ্রঃ চারপাশ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে।মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।হঠাৎ কলাগাছ দ্বারা তৈরি নৌকায়,এক অদ্ভুত প্রাণী আক্রমণ করে।পানিতে পড়ে যায় মুনি।নৌকা ডুবে যায়।মুনিকে বাঁচানোর জন্য লাফ দেয়,সজল আর সোনালী। সোনালী খিঁচুনি দিয়ে দেখে,সজলকে প্রাণী আক্রমণ করবে।একটু পরেই তা-ই হয়।রাজবাড়ি থেকে সবুজও মুনির বাঁচাও চিৎকার শুনতে পায়।

Story Cover