সজল মেইন সুইচের যেখানে আছে,সেই ঘরে চলে আসে।পুরো ঘর অন্ধকার,এখানে কিছু দেখার আশা, শুধুমাত্র আশাই,বাস্তবতা নয়।সজল দেখে লিভার নিচে নামানো।সে লিভারকে উপরের দিকে উঠাতে চায়।সে তার সমস্ত বল সেটাতে লাগিয়ে দেয়।কিন্তুু তাও সে লিভারকে উপরে উঠাতে পারে না।
হঠাৎ তার মনে হয়, তার বাম পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।ফোনের ফ্লাশ লাইটের আলো সেদিকে দেয়।এক অদ্ভুত চেহারার একজন দাঁড়িয়ে।বয়স আনুমানিক ৩৫ বা ৪০ হবে।মুখে রয়েছে চাপা দাঁড়ি,চেহারায় তার অনেক ক্ষত।এত ক্ষত যে, তার চেহারাই ভালো করে বোঝা যাচ্ছে।
সজল ভয় পেয়ে যায়।সে প্রথমে লোকটাকে চোর ভাবলেও, পরে তা ভূল প্রমাণিত হয়।যখন সে লোকটার পায়ের দিকে লক্ষ্য করে।
লোকটার পা নেই,সে শূন্যে ভাঁসছে,আর যা-ই সে মানুষ নয়।কোনো ভূতই হবে।লোকটা এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাঁকিয়ে রয়েছে।চোখের এক পলকও ফেলছে না।সে কী বড় বড় চোখ!দেখেই সারা শরীরে শিহরণ জেগে গেল।ভয়ে সজল স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আস্তে আস্তে লোকটার ক্ষত দাগ গুলো বড় বড় হতে লাগলো।ভয় সজলকে গ্রাস করেছে।তার কানে ভেঁসে এলো নীলার চিৎকারের আওয়াজ।হাজার ভয় থাকা সত্ত্বেও নীলাকে বাঁচাতে চায় তার মন।।সেই বাঁচানোর ইচ্ছা থেকেই তার সাহস জাগে,সে দ্রুত লিভারকে উপরের দিকে উঠায়।এবার লিভার খুব সহজেই উপরে উঠে।বিদ্যুৎও চলে আসে।তখনিই সকল অশুভ আত্মা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
চিৎকারের আওয়াজে দাদীর ( সোহানা) ঘুম ভেঙে যায়।তিনি দ্রুত বিছানা উঠে যায়।এরপর ড্রইং রুমে চলে আসেন।সজলও দৌড় দেয়।নীলার মাথা থেকে এখনও রক্ত বের হচ্ছে।সজল দ্রুত ঔষধ নিয়ে আসে।এরপর নীলার ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দেয়।
-এসব কী করে হলো!( সোহানা আতঙ্কে)
-এ বাড়িতে কিছু একটা আছে।( নীলা ভয়ে কাঁপা স্বরে বললো)
-কিছু আছে মানে!কী আছে?( সোহানা)
-ভৌতিক কিছু। তাই না!(সজল ভয়ে নীলার দিকে তাঁকিয়ে)
-কী!( সোহানা)
-তুইও দেখেছিস?( নীলা সজলকে বললো)
-হুম,আমিও দেখেছি।( সজল)
-ভৌতিক কিছু!মনে পড়েছে।( সোহানা আতঙ্ক হয়ে)
-কী মনে পড়েছে?( নীলা)
-আমাদের এখুনি এই বাড়ি ছেঁড়ে চলে যেতে হবে।(সোহানা আতঙ্কে বাইরে যেতে লাগলো)
-কিন্তুু কেন!আর জিনিসপত্র?আর তাছাড়া সবুজ আর চাচী হাসপাতালে! ( সজল)
-কোনোকিছু নিতে হবে না আর যাওয়ার পথে ওদের নিয়ে যাবো।বাকি কথা আমি পড়বে বলবো।( পিছু ফিরে সোহানা)
-কিন্তুু...( নীলা)
-আমি চুপচাপ যেতে বলেছি।( সোহানা নীলার কথা থামিয়ে রেগে বললো)
প্রথমবার তারা দুজন সোহানকে বেগমকে রাগতে দেখলেন,কেউ আর কিছু বললো না।সজল নীলাকে ধরে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো।সদর দরজার সামনে আসতেই, দরজা আপনাআপনিই খুলে যায়।সোহানা এবার আরও ভয় পেয়ে যায়।তিনি দ্রুত তাদের বের হতে বলে।তারা বের হয়ে গাড়িতে উঠে পড়ে।সজল গাড়ি চালু করার চেষ্টা করে।কিন্তুু কিছুতেই গাড়ি চালু হয় না।সজল ভয় পেয়ে যায়।
তাদের গাড়ি একটা কালো ছায়া টেনে ধরে রেখেছে।যা গাড়ির আয়নায় দেখা যাচ্ছে।ছায়াটি আয়নার দিকে তাঁকিয়ে, দাঁত বের করে হাঁসি দিল।
-আমি যা দেখছি,তুইও কী তাই দেখছিস?( নীলা ঢগ গিলে সজলকে বললো)
-হুম( সজল)
-শুধু তোরা দুজন না, আমিও দেখছি।এখন তাড়াতাড়ি কিছু কর।না হলে আমরা কেউই বাঁচবো না।( সোহানা আতঙ্কে বললো)
-এসব ভূত টুত আমি তো কিছুই বুঝছি না।এসব কী হচ্ছে আমার সঙ্গে?( নীলা ভয়ে)
-কেন হচ্ছে, সেটা নিয়ে কথা বলতে গেলে রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে যাবে।তাই ওসব নিয়ে না ভেবে,কীভাবে এই বিপদ থেকে বাঁচা যায়,সেটা ভাবো।( সোহানা)
ঘড়ির কাঁটায় রাত বারোটা,একযোগে সকলের ঘুম ভেঙে যায়।এতক্ষণ যাবৎ যা হচ্ছিল সকলে তা স্বপ্নে দেখছিল।সকলের একসঙ্গে খাবার খাওয়া।এরপর রাকিবের হঠাৎ অসুস্থ হওয়া।তারপর সোনালীর কবিরাজ দেখা,রাসেল আর মুনির সঙ্গে হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা দেওয়া।সবশেষে সেই অদ্ভুত সব কালো ছায়া।সবই তারা স্বপ্নে দেখছিল।
অদ্ভুত না!একই স্বপ্ন,যা কীনা তারা প্রত্যেকে দেখেছে।
সকালবেলা,
সোনালীর মা আর বাবা তার রুমে হাজির হয়।এরপর তাকে বকাঝকা করে,নিজের অসুস্থতার কথা লুকানোর জন্য।সোনালী তো অবাক।স্বপ্নের মতোই মিলে গেল।শুধু দৃশ্য আর সংলাপ ভিন্ন।
সোনালীকে বকাবকি করার পর, তাকে আম তলায় যেতে বললো,সেখানে আগে থেকেই রাসেল আর মুনি রয়েছে।তাকে নিয়ে তারা দুজন হাসপাতালে যাবে।স্বপ্নের মতো অনেক কিছুই মিলে যাচ্ছে।
সোনালীকে দেখে রাসেল জড়িয়ে ধরলো।এরপর তার মাথায় চুমু দিল।মুনি মুখ ঘুরিয়ে হাঁসতে লাগলো।
-লজ্জা সরম কিছু নেই।রাস্তা ঘাটে সব জায়গায় সব করে।ছি...ছি..ছি,বাসর রেখে এখানে এসব করছে।( হেঁসে মুনি বললো)
-তুই এসব কী বলছিস!আর তুমি কী একটু সংযত হতে পারো নাকি?( সোনালীকে রাসেলকে ধাক্কা দিয়ে)
-ঠিক আছে,এখন যা করবো সব বাসর ঘরেই করবো।( রাসেল )
মজা ঠাট্টা শেষে তারা বাইকে উঠে পড়ে।রাসেল সবার আগে,ওকে জড়িয়ে ধরে তার পিছনে বসে আছে সোনালী,তার পিছনে মুনি।রাসেল সোনালীকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওয়ানা দিল।মুনি আর রাসেল স্বপ্ন নিয়ে ভাবছে না।কারণ তারা দুজন সব ভূলে গেছে।
অন্যদিকে,
রাজবাড়িতে স্বপ্ন নিয়ে কেউই চিন্তিত নয়।তারা প্রত্যেকে এটা নিয়ে ভাবছেই না।সবাই তো স্বপ্ন ভূলে গেছে।শুধু সবুজের মনে আছে।নাস্তার জন্য সে টেবিলে আছে।বাকিরা খাবার আনার জন্য হইচই শুরু করে দিয়েছে।
-চেঁচামেচি ছাড়া কী খাবার খাওয়া যায় না?( রাকিব রেগে)
-আহ্ দাদু,ওদের একটু ওদের মতো করে আনন্দ করতে দাও।তুমি ওদের আনন্দে বাঁধা দিও না।(সোহানা দাদী)
-ঠিক আছে,তাহলে আমি উপরে যাচ্ছি।আমার খাবার ঘরের সামনে রেখে দিও।( রাকিব উঠে চলে যায়)
-ও সবসময় এমন কেন করে?আগে তো এমন ছিল না।সেই যেদিন থেকে রাতে ও ভয় পেয়েছিল।সে-ই দিন থেকে ও এমন করে।শুধু শুধু রেগে যায়।( নীলা মন খারাপ করে)
-কবে যে ও আবার আগের মতো হবে।( আয়না বেগম)
-আমার নাতীর বিয়ে দিয়ে দাও,ঘরে বউ আসলে, দেখবে ও ঠিক হয়ে যাবে।( সোহানা বেগম)
-ও করবে বিয়ে!!( আয়না বেগমসহ সকলে চমকে উঠে)
রাকিবের বিয়ে কথা শুনে, রীতিমতো সকলে উপহাস শুরু করে।ও তো বিয়ে করবেই না আর করলেও,ও কে কেউ বিয়ে করবে না।
আয়না বেগম রাকিবের জন্য খাবার নিয়ে যায়।ঘরের সামনে রেখে দরজায় ঠকঠক করে।এরপর তিনি সেখান থেকে চলে যান।তার কিছুক্ষণ পর রাকিব দরজা খোলে আর খাবারের প্লেট ভেতরে নেয়।
সে বিছানায় বসে খেতে থাকে।তখনই দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ি নিচে পড়ে যায়।ঘড়ির কাঁচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।কাঁচের টুকরোগুলো, চারিদিকে ছিটিয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ রাকিবের কানে তীব্র হয়ে লাগে।সে দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে।তীব্র শব্দের ব্যাথায় সে হাঁটু গেড়ে নিচে বসে পড়ে।এরপর চিৎকার করে উঠে।
হাসপাতালে,
ডাক্তার সোনালীকে দেখছেন।মুনি আর রাসেল বাইরে।কারণ,ডাক্তার তার সঙ্গে একা কথা বলতে চায়।ডাক্তার তার খিঁচুনির বিষয়ে জিজ্ঞেস করে।তার সাথে হওয়া সমস্ত কথা সোনালী জানায়।ডাক্তার সব শোনে,কিন্তুু এটা কোন রোগ তা বুঝতে পারে না।কারণ,এমন তো কোনো রোগ নেই,যেখানে অন্য মানুষকে স্পর্শ করলে খিঁচুনি হয়।
সমস্ত চ্যাকআপ করার পর সোনালীকে ডাক্তারের কাছে স্বাভাবিকই লাগে।কিন্তুু তার কথাবার্তা শুনে ভাবে,সোনালীর মানসিক সমস্যা হয়েছে।হয়তো সেভাবে তার সঙ্গে এমন হবে।তাই যখন সে অন্য কাউকে স্পর্শ করে, তখন সে খিঁচুনি খেতে শুরু করে।ডাক্তার সোনালীকে তার মনে হওয়া কথাগুলো বলে না
-আপনি বাইরে যান।আমি আপনার হবু স্বামীকে আপনার রির্পোটের কথাগুলো বলবো।( ডাক্তার)
-কেন ডাক্তার!খারাপ কিছু? ( সোনালী আতঙ্কে)
-না,না তেমন কিছু না।আসলে আপনার হবু স্বামী বলেছেন,যে রির্পোটই হোক না কেন,সেটা যেন আমি সবার আগে তাকেই বলি।( ডাক্তার)
- আচ্ছা, আমি ও'কে পাঠিয়ে দিচ্ছি।( সোনালী)
সোনালী বাইরে আসে।সে রাসেলকে ভেতরে যেতে বলে।রাসেলকে ডাক্তার সমস্ত কথা বলে।যা যা তার মনে হয়।মুনি বাথরুমে যেতে চায়।তখন সোনালী তাকে নিয়ে যায়।বাথরুম থেকে বের হয়ে মুনি সোনালীকে স্পর্শ করতেই,সোনালী আবারও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।খিঁচুনি দিতে শুরু করে।মুনি ভয়ে বলে,
"সোনালী!কে কোথায় আছো?এদিকে এসো।"
সোনালীর সঙ্গে বরাবরের মতো সবই হলো।তবে এবার একটু ব্যতীক্রম জিনিস ঘটলো।যা দেখে মুনি অবাক হয়ে গেল।সোনালী চোখ খুলেছে।কিন্তুু তার খিঁচুনি বন্ধ হয়নি।খিচুঁনি বন্ধ হয়নি,এটা দেখে সে অবাক হয়নি।অবাক হয়েছে,কারণ তার চোখ দুটো কালো হয়ে গেছে।