এদিকে,
রাজবাড়িতে নীলা আর সজল রয়েছে।তারা দাদীর যত্ন নিচ্ছি।দাদী ( সোহানা) অতি চিন্তায় ঘুমিয়ে পড়েন।তার গাঁয়ে কাঁথা দিয়ে তারা দুজন বের হয়ে যায়।দুজনে সোফায় বসে।এরপর শান্তকে ফোন করে।হঠাৎ পুরো বাড়ির আলো চলে যায়।
-কীরে আলো আবার চলে গেল কেন?(নীলা সজলের হাত ধরে)
-জানি না,হয়তো মেইন সুইচে কোনো সমস্যা হয়েছে।( সজল ফোনের টর্চ লাইট জ্বালিয়ে)
-এখন এই সময়ে মেইন সুইচ কে ঠিক করবে?( নীলা)
-চিন্তা করিস না, আমার কাছে ইলেকট্রিশিয়ানের নম্বর আছে।( সজল উঠে দাঁড়িয়ে)
-তাহলে ফোন দে,দাঁড়া শান্ত ফোন ধরলো না?( নীলা)
-না,নেটওয়ার্কের সমস্যা আগেই লেকট্রিশিয়ানকে ফোন দেই।তারপর আবার শান্তকে ফোন দেব।( শান্ত ইলেকট্রিশিয়ানকে ফোন দিয়ে)
ইলেকট্রিশিয়ানকে ফোন দিলে, তিনি তাকে মেইন সুইচের লিভার চ্যাক করতে বলেন।অনেক সময় লিভার আপনাআপনিই নিচে নেমে যায়।তখন বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়।সজল নীলাকে একা বসা অবস্থায় রাখে। নীলাকে অন্ধকারে রেখে সজল মেইন সুইচের কাছে যায়।নীলা একা একা বসে পা নাড়াতে থাকে।হঠাৎ তার মনে হয়,কে যেন তার পা স্পর্শ করলো।সে ভয়ে পা সোফায় উঠিয়ে নেয়।
আলো না থাকায় আশপাশের কোনো কিছুই, সে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিল না।এমনিতেই সে ভয় পাচ্ছিল।তার উপর কাঁধে কে যেন হাত রাখলো।নীলা ভয় পেয়ে যায়।ভয়ে তার সারা শরীর থেকে ঘাম ঝরতে থাকে।মাথার ঘাম গড়িয়ে পায়ের কাছে চলে আসে।সে পিছু ফিরে তাঁকায়।কিন্তুু কই,কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না।আলো না থাকলেও, এত অন্ধকার নয়।যে আশেপাশে কেউ থাকলে, তাকে দেখা যাবে না।
কেউ যদি না-ই থাকে, তাহলে তার পা স্পর্শ করলো কে!কে-ই বা তার কাঁধে হাত রাখলো?
নীলা ভয়ে সোফা থেকে উঠে পড়ে।সে অন্ধকারের মধ্যেই সামনে এগোতে থাকে।তার রুমে ফোন আছে।দো তলার প্রথম ঘরই তার।সে কোনোমতে সিঁড়ির কাছে চলে আসে।এরপর সাবধানে এক পা করে,উপরে উঠতে থাকে। যখন সে অর্ধেক সিঁড়ি অতিক্রম করেছে।ঠিক তখনই, কেউ একজন তাকে পিছন দিকে টান দেয়।সে সিঁড়ি থেকে পড়ে যায়।নীলা গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়।মাথা ফেঁটে তার রক্ত বের হয়।সে কষ্ট করে উঠে বসে।এরপর মাথায় হাত দেয়।স্পষ্ট রক্ত দেখতে না পেলেও,সে বুঝেছে যে এটা রক্ত।
হঠাৎ সে খেয়াল করে,কেউ একজন সিঁড়ির নিচে বসে আছে।যে তার-ই দিকে তাঁকিয়ে আছে।নীলা ভয় পায়।ভয়ে সে ঢগ গিলে,শরীর থেকে তার অনবরত ঘাম ঝরছে।কিছুক্ষণ স্থীর হয়েই বসে রইল।তারপর মনে সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
" কে!কে আপনি?"
উত্তরে ভেঁসে এলো,
"আমায় জিজ্ঞেস করছিস আমি কে!আমি তো তোর বাপ রে বাপ।"
সেই অজানা লোকটা উঠে দাঁড়ালো।নীলা ভয়ে চিৎকার করে উঠল।লোকটা সিঁড়ির দেওয়ালে দুই হাত দিল।এরপর দুই পা দিল।তারপর দুই হাত ছেঁড়ে, সে পা দিয়ে দেওয়ালে হাঁটতে লাগলো।নীলার দিকে এগোচ্ছে লোকটা বা কালো ছায়া।কালো ছায়াটি একেবারে তার মুখের কাছে আসলো।নীলা স্থীর হয়ে রয়েছে।
কালো ছায়া তার দুই পা নিচে নামায়।
ছায়াটি নীলার সামনে বসে পড়ে।তারপর হাতের বড় নখ বের করে।নীলার মুখে নখ দিয়ে গোল ঘোরায়।তবে হালকা ভাবে,কোনো রকম ব্যাথা দেয় না।নীলা ভয়ে কাঁপা শুরু করেছে।কালো ছায়াটি তার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে।তার কাঁপা বন্ধ করে দেয়।কালো ছায়াটি বড় করে তার মুখ খোলে।যেন সে নীলাকে গিলে খাবে।নীলা এত ভয় পেয়েছে যে,তার মুখ দিয়ে কোনো প্রকার শব্দও বের হচ্ছে না।
অন্যদিকে,
কবিরাজকে দেখে সোনালী ও মুনি বেশ অবাক হয়।এ সময় তার তো এখানে থাকার কথা না।কবিরাজ সোনালীর দিকে এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে।সোনালী এতে কিছুটা বিব্রত হয়।মুনি সেটা বুঝতে পারে।তাই সে কবিরাজকে বলে,
" কিছু বলবেন কবিরাজমশায়?"
-বলতে তো অনেক কিছুই চাই।কিন্তুু বলার সুযোগ আর পাই কোথায়?( কবিরাজ ব্যঙ্গ করে বলে)
-যদি আপনার বলার কিছু না থাকে,তাহলে আমরা আসি।( সোনালী মুনির হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়)
কবিরাজ সোনালীর দিকে তাঁকিয়ে রয়েছে।তার মুখের কোণে এক অদ্ভুত হাঁসি।সোনালী আর মুনি হাঁটার সময় একটা বিড়ালের আওয়াজ শুনতে পায়।সোনালী আওয়াজ শুনে অনেক খুশি হয়।সেও তো বিড়াল পালে।নাম তার মিনি।কিন্তুু অনেক দিন হলো সে আর সোনালীর বাড়িতে আসে না।আগে প্রতিদিনই আসত।সোনালীও তাকে প্রতিদিন খেতে দিত।বিড়ালের আওয়াজ শুনে সোনালী মিনি বলে ডাক দেয়।তখন ঝোঁপের মধ্যে কেউ নড়াচড়া করে।কিছুক্ষণ পর ঝোঁপের আড়াল হতে বিড়াল বের হয়।
একেবারে কালো কুচকুচে বিড়াল।এটা সোনালীর সেই মিনি না।মিনি দেখতে অন্যরকম।বিড়ালটি সোনালীর দিকে কীভাবে যেন তাঁকিয়ে আছে।যা দেখে তাদের দুজনেরই ভয় লাগে।মুনি তো ভয়ে সোনালীর পিছনে লুকিয়ে পড়ে।সোনালী ঢগ গিলে, এরপর বলে,
" তুমি যদি ভালো বিড়াল হও, তাহলে চলে যাও আর যদি না হও থাকলে অদ্ভুত কিছু করো।"
বিড়ালটি তার কথা শুনে অদ্ভুতভাবে মাথা ঘোরায়।এরপর অদ্ভুতভাবে হাঁসি দেয়।তারা দুজন এমন দৃশ্য দেখে ভয়ে চিৎকার দেয়।সোনালী মুনিকে দৌঁড়াতে বলে।কিন্তুু পিছনে তাঁকিয়ে দেখে মুনি নেই।সামনে তাঁকালে দেখে,মুনি আগে থেকেই দৌড় শুরু করেছে আর মুনি তাকে দৌঁড়াতে বলছে।সোনালীও দৌড় শুরু করে।দুজনে দৌড় দিয়ে বাগান ফেলে লোকালয়ে চলে আসে।
লোকালয়ে এসে তারা দুজন থেমে যায়।তারা স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে থাকে।সোনালী অবাক হয়ে যায়।যখন সে যাওয়ার পথে চায়ের দোকানে কবিরাজকে দেখতে পায়।এ কথা সে কাউকে বলে না।এমনকি নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু মুনিকেও না।
মুনি সোনালীর সঙ্গে তার বাসায় আসে।এসে দেখে রাসেল এসেছে।রাসেলকে দেখে তারা বুঝতে পারে,সে সোনালীর অদ্ভুত খিঁচুনির কথা বলতেই এসেছে।সোনালীকে দেখে তার মা-বাবা জড়িয়ে ধরে।এরপর কিছুক্ষণ বকাবকি করে।
-তোকে কেউ টাকা নিয়ে চিন্তা করতে বলেছে।দরকার পড়লে তোর পরে বিয়ে দিতাম।যদি ছেলে পক্ষ রাজি না হতো,তাহলে দিতাম না বিয়ে।( জাফর আলী)
-হুম,ঠিক।কিন্তুু এসব কথা ভেবে,তুই নিজের অসুস্থের কথা বলবি না।তোর কিছু হলে আমরা কী করতাম?( কুলসুম বেগম রেগে)
-আমার ভূল হয়ে গেছে মা।আমি আর এমনটা করবো না।( মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে সোনালী)
-শশুর বাবা এ কেমন কথা বলবেন!দরকার পড়লে বিয়ে দিতেন না!আমি কী খারাপ ছেলে নাকি!যে সোনালীর অসুস্থতার কথা শুনে বিয়ে করবো না।( রাসেল রেগে)
-আমি সেভাবে কথাগুলো বলেনি বাবা।( জাফর আলী নম্রস্বরে)
-আহ্ বাবা,ওকে এত মাথায় তুলতে হবে না।রাগ করলে রাগ করে থাকতে দাও।আমি দেখি কতক্ষণ ও রাগ করে থাকতে পারে।( সোনালী মুখ ভেঙচি দিয়ে)
-তোমার মা-বাবা যদি এখানে না থাকতো।তাহলে তোমার এই কথার জন্য,আমি তোমাকে এখুনি চুমু দিতাম। ( রাসেল সোনালীর দিকে তাঁকিয়ে)
-হ্যাঁ!এসব কী বলছো? মা-বাবা আছে।( সোনালী মুখ চেঁপে বলে)
-বলছি,আমি ঘরে গেলাম।একটা কাজের কথা মনে পড়লো।( জাফর আলী কুলসুমকে বললো)
-আমিও আসছি,তোমায় কাজে সাহায্য করব।( কুলসুম জাফী আলীকে নিয়ে ভেতরে গেল)
মুনি, সোনালী আর রাসেল একযোগে হাঁসতে লাগলো।রাসেল এরপর সোনালীর হাত ধরলো,তারপর তাকে তার সঙ্গে যেতে বললো।মুনিকেও যেতে বললো।কোথায় যাবে জিজ্ঞেস করলে,সে উওরে হাসপাতালে বলে।বাকিটা তারা দুজন ঠিকই বুঝে যায়।আজকে রাসেল সোনালীকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে।
রাসেল তার বাইকে উঠে পড়ে।তার পিছনে সোনালী আর সবার শেষে মুনি বসে।এরপর তারা হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা দেয়।কিছু পথ এসে রাসেল বাইক থামিয়ে দেয়।সোনালী কিছু বলতে গেলে,রাসেল হাতের ইশারা দিয়ে চুপ করতে বলে।এরপর সামনের দিকে তাঁকাতে বলে।
এক কালো ছায়া একটা অ্যাম্বুলেন্সের উপরে বসে আছে।সোনালী আর মুনি দেখেই বুঝে যায়,এর মধ্যে কারা আছে।শান্ত আর শান্তা ভয় পেয়ে যায়।তারা ড্রাইভারকে ডাক দেয়।ড্রাইভার গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল।তাদের ডাকে পিছনে ঘুরলে,কালো ছায়াটি তার উপরে লাফ দেয়।তার মাথা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে।জানালা দিয়ে শান্ত, শান্তা আর বাইকে বসে বাকিরা সবই দেখছিল।
প্রত্যেকের মনেই ভয় বিরাজমান।তবু সব দেখে চলেছে।মুনি সোনালীর কাধেঁ হাত দেয়।
কালো ছায়াটি ড্রাইভারের মাথা হাত দিয়েই দুই ভাগ করে ছিঁড়ে ফেলে।