নতুন মৃত্যুর সংবাদে সবাই ভয় পেয়ে যায়।প্রত্যেকে কবিরাজকে কিছু করতে বলে।তিনি হাতের উচুঁ করে থামতে বলে।সবাই চুপ হয়ে যায়।
-বললাম না,সময় লাগবে।এর আগে আমি কিছু করতে পারবো না।( কবিরাজ)
তিনি সেখান থেকে চলে যান।সোনালী আর মুনিও বাড়ি চলে আসে।মুনি তার অসুস্থের কথা বলতে চায়।কিন্তুু বলতে পারে না।সোনালী তাকে বাধা দেয়।কারণ তার বাবা বিয়ের টাকা নিয়ে চিন্তায় আছেন।তার উপর অসুস্থের কথা শুনলে আরও চিন্তা করবেন আর তাছাড়া খরচও তো আছে।এজন্য সোনালী তার বাবাকে কিছু বলতে না করে।
- তাহলে কী করবি!!এভাবে সবকিছু লুকিয়ে রাখবি?
-না,বলবো।
-কবে ?( মুনি)
-সবকিছু রাসেলকে বলবো।
-হ্যাঁ,এটা ভালো বুদ্ধি।ওকে সবটা বললে ও তোকে নিশ্চয়ই সাহায্য করবে।
-হুম,আচ্ছা শোন।আজ বিকেলে বিলের পাশে আসিস।যাওয়ার সময় রাসেলকেও আসতে বলিস।( সোনালী)
-আচ্ছা, ঠিক আছে।তাহলে এখন আমি আসি।কোনো সমস্যা হলে আমায় জানাস কিন্তুু।( মুনি চলে যাওয়ার পথে)
বিকেলবেলা,
সোনালী বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়ে।আসার পথে সে নতুন লোককে দেখে।প্রায় শান্তদের
বয়সের যুবক।জমিদার বাড়ির কেউ হতে পারে।কিন্তুু ওরা তো সবাইকে চেনে।শুধু বড়দের বাদ দিয়ে।হয়তো পরে এসেছে।সে আর ও দেখে নজর দিলো না।তাড়াতাড়ি করে বিলের কাছে চলে এলো।মুনি আর রাসেল আগেই এসে গেছে।দুজনে বিলের পাশে বসে গল্প করছে।তাকে দেখা মাত্র রাসেল উঠে দাড়াঁয়।দৌড় দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।সোনালীও তাকে জড়িয়ে ধরে।সে কান্না করতে থাকে।
-আমায় আগে বললে কী হতো!আমি কী তোমার আপনজন না?( রাসেল)
-আমি আসলে ভয় পেয়ে গেছিলাম।বুঝতেই পারছিলাম না যে,কী করবো! তাই সাহস করে কাউকে বলতে পারিনি।
-আমায় বলতে পারোনি কিন্তুু মুনিকে বলতে পেরেছো।( রাসেল)
-না,আসলে..
-ভালো, ওই তোমার সব।তাই তো ওকে সব বলেছো আর আমি তো তোমার কেউ না।তাই তো ওর কাছ থেকে আমায় সব শুনতে হলো।
(রাসেল)
রাসেল অভিমান করে মুখ ঘুরিয়ে থাকে।তখন সোনালী তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে।রাসেল মুচকিঁ হেঁসে দেয়।মুনি তাদের দুজনের কান্ড দেখে হাঁসতে থাকে।হঠাৎ সে লক্ষ্য করে সে-ই নতুন একটা লোক। হাতে তার ক্যামেরা।আশেপাশের ছবি তুলছে।তাকে দেখে মুনি এক দৌড় দেয়।এভাবে তাকে দৌড়ে আসতে দেখে সবুজ ভয় পেয়ে যায়।
-এভাবে দৌড়াচ্ছেন কেন!! কিছু কী হয়েছে??( সবুজ)
-আপনার নাম কী? আমার নাম মুনি।
-কী!!আমার নাম জিজ্ঞেস করার জন্য এভাবে দৌড়ে এসেছেন?
-না,আসলে..আপনায় গ্রামে নতুন দেখলাম।তাই একটু পরিচিত হতে আসলাম।আমাদের গ্রামে নতুন অতিথি আসলে আমরা পরিচিত হই।( মুনি হেঁসে)
-আমার নাম রাসেল। আমি জমিদার বাড়ির বড় ছেলে।পরিচয় হয়ে গেছে।এখন আমি আসি।
-বলছিলাম..
-আমায় একা থাকতে দেবেন।( রেগে সবুজ)
মুনি মন খারাপ করে মুখটা নামিয়ে রাখে।সবুজ চুপচাপ সেখান থেকে চলে যায়।মুনি তার দিকে বলে,
"প্রথম দেখায় আমার কিন্তুু আপনাকে ভালো লেগেছে। এখন শুধু ভালোবাসা বাকি"
মুচকিঁ হাঁসতে থাকে।তখন তার কাছে রাসেল আর সোনালী আসে।তারাও হাঁসতে থাকে।
-কীরে তোরা এভাবে হাঁসছিস কেন?( মুনি)
-তুই হাঁসছিস।তাই আমরাও হাঁসছি।( সোনালী)
-যা তো।একটু শান্তিতে হাঁসতেও দেয় না।
-কীরে ব্যাপারটা কী?( রাসেল)
-যদি তোদের কথা শেষ হয়।তাহলে চল বাড়ি যায়।সন্ধ্যা হতে চলেছে।
অন্যদিকে,
কবিরাজ সাহেব জমিদার বাড়ির পাশের জঙ্গলে যাচ্ছেন।সন্ধ্যা হওয়ায় চারপাশ অনেকটা অন্ধকার। ভালোভাবে কিছু দেখা যাচ্ছে না।তিনি হাঁটতে হাঁটতে বড় বটগাছের কাছে চলে আসেন।মনে বিড়বিড় করে কিছু পড়তে থাকে।হঠাৎ বটগাছের সামনে একটি কালো ছায়া আসে।যে কীনা শিকলের দ্বারা বন্দী।
গাছের সঙ্গে সেই শিকল বাঁধা।হাজার চেষ্টা করেও সে এটা ভাঙ্গতে পারে না।তখন কবিরাজ ঝোঁপের আড়াল থেকে দুটো চোখ আর একটা মাথা বের করে।যেগুলো কীনা গ্রামের মৃত লোকের।যারা অদ্ভুত মারা গেছে তাদেরই অঙ্গ।
জমিদার বাড়ি,
নীলা আর আয়না বেগম মিলে রান্না করছে।তাদের হাতে হাতে শান্তা সাহায্য করে দিচ্ছে। রান্নার ঘ্রানে পুরো বাড়ি মহো মোহ করছে।আয়না বেগম ( বাড়ির গিন্নি) প্লেটে খাবার সাঁজান।এরপর সেগুলো নিয়ে খাবার টেবিলে নিয়ে যান।সেখানে আগেই সকলে অপেক্ষা করছিল।খাবার আসতে দেখে প্রত্যেকেই হইচই করতে থাকে।তাদের এমন আচরণে সোহানা বেগম ( গিন্নির শাশুড়ী) খুশি হয়।
-এই চুপ,এত চেঁচামেচি করার কী আছে!চুপচাপ খাবার খাওয়া যায় না?( সবুজ রেগে)
-সবসময় শুধু এমনই করে।আনন্দের মধ্যে পানি ঢেলে দেয়।এইজন্যই তো আমার ওকে ভালো লাগে না।( নীলা আস্তে আস্তে মুখ গোমড়া করে বলে)
-আহ্,দাদু ভাই। ওদের আনন্দে তুমি এভাবে বাধা দিও না।এই ছোট ছোট দুষ্টামি ওদের যেমন আনন্দ দেয়।ঠিক তেমনি আমাদের বয়স্কদেরও আনন্দ দেয়।( সোহানা বেগম)
-ওকে বলে কোনো লাভ নেই।শুধু শুধু কথা খরচ হবে মা।( আয়না বেগম কষ্টে বলেন)
-আমাকে নিয়ে যখন এত কথা।তখন বরং আমিই চলে যাই।তোমরা সকলে বসে আনন্দ করো আর খাও।( সবুজ চেয়ার থেকে উঠে)
-এত রাগ শরীরের জন্য ভালো নয়।( সোহানা বেগম সবুজের হাত ধরে)
-আমার ভালোর বিষয়ে তোমাদের কাউকে ভাবতে হবে না।আমি নিজের ভালো নিজে বুঝি।
-বেশ,বললাম না।কিন্তুু এভাবে খাবার ছেঁড়ে উঠে যেও না।( সোহানা অনুরোধ করে)
দাদীর কথায় রাকিব আবার চেয়ারে বসে।বাকি সবাই চুপচাপ খেতে থাকে।রাকিবও খাওয়া শুরু করে।হঠাৎ করে বসার রুমের ঝাঁরবাতি খুলে নিচে পড়ে যায়।সকলে চমকে উঠে।খাওয়া বন্ধ দিয়ে উঠে পড়ে।এই ঝাঁরবাতির শব্দ রাকিবের কানে তীব্র হয়ে লাগে।সে ব্যাথায় কান চেপে ধরে।সবাই তার কাছে আসে।যন্ত্রণায় সে চিৎকার করতে থাকে।কান দিয়ে তার রক্ত বের হতে শুরু করে।
প্রত্যেকে চিন্তায় পড়ে যায়।শান্ত তাড়াতাড়ি করে অ্যাম্বুলেন্সকে ফোন করে। আয়না বেগন অস্থীর হয়ে পড়ে।সবুজের অবস্থা দেখে দাদী(সোহানা) চিন্তা করলে,নীলা জোর করে ঘরে নিয়ে যায়।বাকিরা সবুজকে কষ্ট করে সোফায় বসায়।তার কান দিয়ে এখনও অনবরত রক্ত পড়ছে। এভাবে রক্ত বের হতে থাকলে, ২ মিনিটের মধ্যেই সবুজ জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে।এছাড়া বেশি রক্ত বের হলে,সে মারাও যেতে পারে।
ছেলের এমন করুণ পরিস্থিতি দেখে আয়না বেগম অজ্ঞান হয়ে যায়।শান্তা তার মা'য়ের মুখে ছিটেঁ পানি দেয়।কিন্তুু জ্ঞান ফেরে না।বাড়ির সবাই খুব চিন্তায় পড়ে যায়।সেই সঙ্গে সকলের মনেই ভয় শুরু হয়।সবুজ চিৎকার থামিয়ে দেয়। কিন্তুু তার মাথা ঘুরতে শুরু করে।চোখে ঝাপসা দেখতে থাকে।কিছুক্ষণের মধ্যেই সবুজ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।অ্যাম্বুলেন্সও চলে আসে।সকলে সবুজ আর আয়না বেগমকে উঠিয়ে দেয়।
গ্রামের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স দেখে সবাই ভয় পেয়ে যায়।সকলের মনে এক আশংকা বিরাজমান।নতুন করে কেউ আবার খুন হলো না তো!সোনালীও দেখেছে,রাতে দোকানে আসার সময় সে অ্যাম্বুলেন্সকে দেখেছে।এছাড়া আসার সময় তার সামনে দিয়েই অ্যাম্বুলেন্স যায়।জানালা দিয়ে সে ভেতরে শান্তকে দেখেছে।
তখনই বুঝতে পেরেছে,ওদের পরিবারের কারো কিছু হয়েছে।বাড়ি এসে দেখে,মুনি এসেছে।মুনি তাকে শান্তদের কথাটাই বলতে এসেছে।ওদের বিষয়ে জানার পর,দুজনেরই বেশ খারাপ লাগে।হঠাৎ তখনই সেখানে কবিরাজ হাজির হয়।
অন্যদিকে,
গ্রাম থেকে বের হওয়ার পথে গাড়ি থেমে যায়।গাড়িওয়ালা গাড়ি থেমে নেমে চ্যাক করতে যায়।জঙ্গলের মধ্যে এসে গাড়ি থেমেছে।তাই আশপাশ আরও বেশি অন্ধকার।হাতে টর্চলাইন নিয়ে তিনি চ্যাক করেন।গাড়ির ইন্জিন নষ্ট হয়ে গেছে।আশেপাশে কোনো গ্যারেজও নেই।মেকানিককে ফোন করা হলেও আস্তে বেশ সময় লাগবে।তাই গাড়িওয়ালা নতুন অ্যাম্বুলেন্স আনার জন্য ফোন দেয়।
গাড়ির মধ্যে আয়না ও সবুজ অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে।তাদের পাশে রয়েছে শান্ত,শান্তা।হঠাৎ তারা দুজন ঝোঁপের মধ্যে কাউকে দেখতে পায়।কে যে দাঁড়িয়ে আছে।চোখ তার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।লাল দুটো বড় চোখ।দূর থেকে দেখেই ভয় লাগছে।কাছে গেলে তো ভয়ে কেউ বাঁচবেই না।
ঝোঁপের আড়াল থেকে লোকটা বের হয়।ধীরে ধীরে তাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।এরপর অর্ধেক পথ এসে থেমে যায়।তারপর ঘাড় গোল গোল ঘোরায়।যেটা স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।লোকটা কিছুক্ষণ এমন করার পর এক লাফ দেয় গাড়ির উপর।