সোনালী অনেক চলে আসে।তখনিই তার কাধেঁ কেউ হাত দেয়।সে হাত ধরে ভয়ে চিৎকার করে উঠে।
-ওরে থাম,চিৎকার করছিস কেন!আর এসময়ে বাইরে কী করিস?( কুলসুম)
-ওহ্ মা,তুমি!আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম।
-এত রাতে বাইরে কী?আর "কে,কে" বলে চিৎকার করছিলি কেন?
-তৃষ্ণা পেয়েছিল তাই পানি পান করতে এসেছিলাম।পানি পান করার সময় কলাগাছের পিছনে কাউকে দেখতে পাই।
কুলসুম হাতের টর্চ কলাগাছের দিকে দেয়।কিন্তুু সেখানে কাউকেই তিনি দেখতে পান না। কেউ না থাকলেও সোনালী দেখেছে কেউ ছিল।কুলসুম বেগম তাকে ঘরে গিয়ে ঘুমাতে বলে।সোনালী ঘরে চলে যায়।কুলসুম বেগম বাথরুমে যায়।তখন সোনালীর বাড়ির সামনে কবিরাজ আসেন।চোখ দুটো তার লাল, লাল হয়ে আছে।সে বাড়ির দিকে তাকিঁয়ে মুচকিঁ হাসি দেয়।
অন্যদিকে,
সজল আর শান্ত ভয়ে চিৎকার করে উঠে।তাদের চিৎকারে ছায়াটিও চিৎকার করে।কন্ঠস্বর তাদের চেনা মনে হয়।তারা ভালো করে তাকাঁলে দেখে দিশা।তাদের চিৎকারের আওয়াজে বাড়ির বাকি সবাই চলে আসে।আফজাল সাহেব এসে সব লাইট অন করে।
-কী হয়েছে এখানে!সব লাইট বন্ধ কেন!( আফজাল)
-আসলে মামা দিশা আমাদের ভয় দেখিয়েছে।( শান্ত)
-ভয়! আর আমি, পাগল নাকি! আমি তোদের সাহায্য করতে এসেছিলাম।( দিশা)
-আর তোকে খুজেঁ না পেয়ে ভয় পাচ্ছিলাম।( নীলা)
-সব বুঝলাম কিন্তুু লাইট বন্ধ কেন!( আয়না রেগে)
-আসলে মা, হয়েছে কী আমরা সকলে ভূতের সিনেমা দেখছিলাম।( শান্ত ভয় পেয়ে)
-যাও ঘুমাতে যাও।( রেগে আয়না বেগম)
প্রত্যেকে দৌড় দিয়ে ঘুমাতে যায়।ঘুমের মধ্যেও সবাই ভয় পাচ্ছিল আবার হাসঁছিল,কারণ ভূত ছিল না দিশা ছিল।হাসঁতে হাসঁতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন সকালে,
জমিদার বাড়িতে গতকাল রাতের সেই লোক যায়।যে কীনা লাইন ঠিক করেছিল।দারওয়ান তাকে ঢুকতে দেয় না।পরে সে আফজাল সাহেবকে বলে পারমিশন নেয়।এরপর সে ভেতরে প্রবেশ করে।আফজাল সাহেব তার জন্য অপেক্ষা করছিল।বাড়ির বড় সব সদস্যরাও ড্রইং রুমে বসে ছিল।লোকটা তাদের কাছে আসে আর ক্ষমা চায়।
-ক্ষমা!!কীসের জন্য?? (আয়না)
-গতকাল রাতে নিশ্চয়ই আমার ব্যবহার আপনাদের খারাপ লেগেছে।
-খারাপ লাগেনি বরং অদ্ভুত লেগেছে।( আফজাল)
-আসলে আমার চোখে সমস্যা।এজন্য রাতে লাইটের আলোয় সমস্যা হয়।যার দরুণ তখন আমি লাইট জ্বালাতে না করেছিলাম আর দ্রুত চলে যায়।
-সব ঠিক আছে কিন্তুু লাইট ফেটেঁ যাওয়া!(আয়না)
-মানে!
-মানে আপনি যাওয়ার পর লাইট জ্বালাতেই সেটা ফেটেঁ যায়।( আফজাল)
-ওটা তো আমি জানি না।হয়তো লাইটে সমস্যা ছিল।
-হ্যাঁ,এটাই হবে।আচ্ছা এসব বাদ দিন আর এসে বসুন।আমি আপনার জন্য চা আনছি।( আয়না)
-না, না।তার কোনো দরকার নেই।আমাকে আবার কাজে যেতে হবে।অন্য কোনোদিন এসে খেয়ে যাবো।আজ বরং আসি।
লোকটা চলে যায়।সবার মনে থাকা রাতের সে-ই ভয়, দূর হয়ে যায়।প্রত্যেকের মুখেই হাসিঁ চলে আসে।
অন্যদিকে,
সকালে ঘুম থেকে উঠেই সোনালী কাজ শুরু করে।বাড়ির সব কাজ সে একাই করতে থাকে।একটু পরে মুনি এসে হাজির হয়।সেও তার কাজে তাকে সাহায্য করে।তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ করে।এরপর দুজন বেরিয়ে পড়ে।
মেম্বার বাড়ির বাগানে তেঁতুল ধরেছে।একদম পাঁকা আর সে-ই স্বাদের তেঁতুল। দেখেই জিভে পানি চলে আসে।আজ তেতুঁল মাখা খাবে তারা।এজন্যই সকাল সকাল লুকিয়ে বাগানে চলে এসেছে।পাশে থাকা পাথর দিয়ে তারা তেতুঁল গাছে ঢিল মারে।অনেকগুলো তেতুল নিচে পড়ে যায়।মুনি সেগুলো কুড়িয়ে কাপড়ে বাধেঁ।এরপর আস্তে আস্তে বাগান থেকে বের হয়ে পড়ে।কিন্তুু তখনিই তাদের মেম্বার দেখে ফেলে।
-এই কে রে!!কে রে আমার বাগান থেকে তেঁতুল চুরি করে?দাঁড়া লাঠি নিয়ে আসছি।আজকে তোদের পিঠের হাঁড় আমি ভেঙে দেব।( মেম্বার)
দুজনে জোরে একটা দৌড় দেয়।মেম্বার তাদের ধরতে পারে না,বয়স্ক মানুষ।এই বয়সে দৌড়ানো তার শরীরে আর সয় না।তারা দুইজন জমিদার বাড়ির পাশের জঙ্গলে যায়।মেম্বার বাড়ি থেকে অনেক কাছে জায়গাটা।তাই তারা এখানেই এসেছে।এই জঙ্গলে লোকসমাগম নেই বললেই চলে। গ্রামের লোকেরা ভাবে এখানে নাকি ভূত থাকে।মুনি তার থলে থেকে ছুরি বের করে।এরপর তেঁতুলগুলো কেটেঁ নেয়।ভালো করে ধুয়ে, তেঁতুলগুলো মাখায়।দুজনের জিভেই পানি চলে আসে।
-কীরে কে খাবে আগে!আমি না তুই?( সোনালী)
-দেখা যাক কে খায়!( মুনি)
তারা কাড়াকাড়ি শুরু করে।প্রথম তেতুঁল মাখা মুনি মুখে দেয়।তেঁতুল মুখে নিয়ে মুচকিঁ হাসিঁ দেয়।সোনালীও তেঁতুল মুখে নিয়ে হাসিঁ দেয়।
অন্যদিকে,
শান্ত,নীলা আর সজল ঘুরছিল।তারা বাড়ির পাশের জঙ্গলে প্রবেশ করে।প্রকৃতি তাদের বরাবরই পছন্দ।সজলের হাতে ক্যামেরা।সে প্রকৃতির ছবি তুলছে।হঠাৎ তার নজর যায়, সোনালী আর মুনি উপর।
-ওই দেখ,সোনালী আর মুনি।(সজল)
-কোথায়!কোথায় ওরা দুজন?( শান্ত)
-ওই জঙ্গলে বসে ওরা দুজন কী করে?( সজল)
তারা তিনজন দৌড় দেয়।দৌড় দিয়ে তারা তাদের কাছে যায়।সোনালী আর মুনি দৌড়ানোর আওয়াজ পায়।তারা ভাবে মেম্বার সাহেব আসছে।তাই তারাও তেঁতুল মাখা হাতে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করে।
-আরে দৌড়াচ্ছো কেন!( শান্ত)
-দৌড়াঁবো না তো কী করবো?সামান্য তেঁতুলের জন্য কী আপনি আমাদের মারতে এসেছেন।এই বয়সে এত দৌড়ানোর কোনো মানে হয়?( মুনি)
-কীসের তেঁতুল! আর তোমরা কী বলছো?(নীলা)
-ওও আপনারা!আমরা ভেবেছিলাম অন্য কেউ ( সোনালী আর মুনি পিছনে ঘুরে)
-কাকে? (নীলা)
-কাউকে না।( মুনি)
-তোমাদের হাতে তেতুঁলমাখা।( নীলা ঢগ গিলে)
-খাবে নাকি!( মুনি)
-এতে আবার বলার কী আছে?দাও তো,তেঁতুল না খেয়ে যাবো কোথায়?( নীলা)
তেতুঁলমাখা হাত থেকে নিয়ে নীলা বসে পড়ে।তার সঙ্গে বাকিরাও বসে পড়ে।সবাই মিলে তেতুঁলমাখা খেতে থাকে।সোনালীর সঙ্গে সজলের শরীর স্পর্শ হতেই তার আবার শুরু হয়।
সে মাটিতে শুয়ে পড়ে।বরাবরের মতো খিচুনি দিতে শুরু করে।সবাই ভয় পেয়ে যায়।মুনি ওর হাত শক্ত করে ধরে।এবার একটা ভিন্ন জিনিস হলো।শরীর থেকে প্রাণ চলে যাওয়ার মতো করতে লাগলো সোনালী।বুকটা উচুঁ করে দিয়ে শান্ত হয়ে গেল।সোনালী এখনও চোখ খোলেনি।প্রায় ৫ মিনিট পর ওর জ্ঞান ফেরে।
-ওর কী হয়েছিল?( নীলা)
-জানি না।কয়েকদিন ধরে প্রায়ই ওর এমন হয়।( মনি)
-ডাক্তার দেখান। ( সজল)
-হ্যাঁ,সেটা বলেছিলাম। কিন্তুু ওর বিয়ের জন্য কথাটা বলে উঠা হয়নি।আজকে আমি নিজেই ওর বাবা মাকে বলবো।( মনি)
- যত তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখাবে।তত বেশি ভালো হবে।( শান্ত)
-আচ্ছা এখন আমরা আসি।আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।( সোনালী)
-ঠিক আছে,পরে আবার দেখা হবে।( নীলা)
মুনি সোনালীকে নিয়ে চলে যায়।সজলের মন খারাপ হয়ে রয়েছে।সে এখন আর প্রকৃতির ছবি তুলছে না।মাথা নিঁচু করে শুধু হাঁটছে।বিষয়টা নীলা আর শান্ত লক্ষ্য করেছে।দুজনে একে অপরের দিকে তাঁকায়।ঘাড় উঁচুকে কী জানি ইশারা করে।
-কীরে তোর কী হয়েছে?(শান্ত)
-এভাবে মুখ কালো করে রয়েছিস কেন?( নীলা)
-মুখ কালো করবো না!তো কী করবো?সোনালীর বিয়ে অথচ দাওয়াতই পেলাম না।( সজল মুখ ভেঙচি দিয়ে)
-এই নিয়ে সোনালীর সঙ্গে দুইবার পরিচয় হলো আর তুই ওর বিয়ের দাওয়াত আশা করিস!( নীলা আর সজল হেঁসে)
সোনালী আর মুনি হেঁটে বাজারে চলে আসে।ওই পথ দিয়ে গেলে মেম্বারের কাছে ধরা খাওয়া ভয়।তাই এ পথ দিয়ে এসেছে।আসার পথে তারা রাস্তায় অনেক ভিড় দেখে। তারা থেমে যায়।কবিরাজ সাহেব এসেছেন।তিনি ফিরে আসায় সব খুশি হয়েছেন।তাকে ঘিরে সবাই তার জয়জয়কার করছে।
- আপনি ফিরে আসায় আমরা অনেক খুশি হয়েছি বাবা।( গ্রামবাসী)
-না এসে থাকি কী করে!তোমাদের বিপদ মানে আমার বিপদ।তাই বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য উপায় আনতে গেছিলাম।( কবিরাজ)
-বাবা, কোনো উপায় খুজেঁ পেলেন ?( গ্রামবাসী)
-পেয়েছি।
-কী উপায় বাবা?
-বলবো, আমি শীঘ্রই তোমাদের বলবো।তবে সময় আসুক।সঠিক সময় হলেই বলবো।কিন্তুু তার আগে তাকে খুজেঁ তো পাই।
কথাটা বলে কবিরাজ সোনালীর দিকে তাকাঁয়।ওর কেমন যেন লাগলো।মনের ভেতর ভয় শুরু হলো।কবিরাজের চোখ দুটোর মধ্যে কিছু আছে।যা সোনালীর প্রাণে ভয় সৃষ্টি করছে।কবিরাজের কাউকে খোজাঁর বিষয়, বলাটা সবার অদ্ভুত লাগে।গ্রামবাসী কে বলতে যাবে।হঠাৎ আরেকজন গ্রামবাসী দৌড়ে সেখানে আসলো।সবার নজর তার উপর গেল।হাঁপাচ্ছেন সে।ভয়ে চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেছে।
- কী হয়েছে চাচা! এভাবে হাঁপাচ্ছেন কেন?( মনি)
-আবারও মরছে।আবারও আরেকজন মরছে।কিন্তুু ওর শরীর আর চোখ আছে।তবে মাথা নেই।( লোকটা)