কথা বলা শেষ করে লোকটা নিচে লুটিয়ে পড়ে।ভয়ে সোনালীর শরীর দিয়ে ঘাম ঝরতে থাকে।তারা সবাই সামনের দিকে দৌড় দেয়।
দৌড়াতে দৌড়াতে তারা হাফিঁয়ে যায়।
অনেক দূর এসে প্রত্যেকে থামে ।তারা রাস্তায় বসে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে।
-আচ্ছা ওই লোকটা কে!আর কেন ওর সাথে এমন করলো?( শান্ত)
-আর লোকটা ওসব কী বললো?( নীলা)
-জানি না,তবে লোকটা আমার বাড়ির পাশেই থাকে।( সোনালী)
-ওই ভাবে ওনাকে ছেড়েঁ এলাম। এতে কিছু হবে না তো!( সজল)
-ভ্যানওয়ালা গ্রামবাসীকে ডেকে আনবে আর মনে হয় লোকটা বেচেঁ আছে।যে পরিমাণ রক্ত শরীর থেকে বের হয়ছে।( মুনি)
-কিন্তুু আমাদের যাওয়া উচিত।( সজল)
-আমি যাবো না আর না কেউ যাবে না। পরে কিছু হলে সবাই আমাদের দোষী ভাববে।( শান্ত )
-কথাটা কিন্তুু ও ঠিক বলেছে।এসবে না জড়িয়ে চল আমরা বাড়ি যাই।( নীলা)
-কিন্তুু আমরা তো জানি না জমিদার বাড়ি কই!না জেনে যাবো কীভাবে?( শান্ত)
-আমরা দুইজন তো চিনি।চলুন আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসি। ( মুনি)
-হ্যাঁ,চলুন। ( সোনালী)
সোনালী আর মুনি মিলে তাদের নিয়ে হাটঁতে থাকে।সূর্য ডুবে যাওয়ার উপক্রম।সবাই হেঁটে চলেছে নিঃশব্দে,হঠাৎ এক অচেনা শব্দ।
সবাই থেমে গেল।এ শব্দ কারো পায়ে হাঁটার নয়। অন্য কিছুর শব্দ।সজল শব্দ অনুসরণ করে সেদিকে তাঁকায়।সে ভয় পেয়ে যায়।
শব্দটি একটা বটগাছ থেকে আসছে।সেই গাছে কে যেন বসে আছে।সজল ভয়ে কাঁপতে শুরু করে।
-কীরে এভাবে কাঁপছিস কেন!কী হয়েছে তোর?( নীলা)
-হু...ম,ওই গা...ছে কে যে...ন বসে আ.. ছে ( আমতা আমতা করে সজল)
সবাই বটগাছের দিকে দেখলো।কিন্তুু সেখানে কেউ নেই।সজলও এখন কাউকে দেখতে পেল না।একটু আগে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে,তাই তার এমন হচ্ছে।সবাই তা-ই বলছে সজলকে,যদিও সজলের মনে খটকা আছে।
প্রায় ২৫ মিনিট পর তারা জমিদার বাড়ির সামনে চলে আসে। তাদের পৌঁছে দিয়ে সোনালী আর মুনি চলে যায়।আসার সময় তারা দেখে অনেক লোক এসে জোড়ো হয়েছে।সঙ্গে ভ্যানওয়ালাও আছে।পুলিশও এসেছে।ভ্যানওয়ালা তাদের দিকে হাত দেখিয়ে ইশারা করে।সোনালী আর মুনি একটু ভয় পায়। সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, যখন পুলিশ তাদের ডাক দেয়।
তাদেরকে লোকটার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে।তখন সোনালী সবটা বলে।শুধু লোকটার বলা কথাগুলো বলে না।কারণ তার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।তাছাড়া সে বিশ্বাস করে লোকটা মরার সময় ভূলভাল বলছিল।যদিও সে সেটা বিশ্বাস করতে চায় না।কিন্তুু নিজের মনকে শক্ত রাখার জন্য সেটাই বিশ্বাস করেছে।পুলিশ তাদের বয়ান নিয়ে ছেড়েঁ দেয়।এরপর লোকের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে উঠায়।সোনালীর কী যেন মনে হয় সে লোকটার হাত ধরে।তখনই তার সঙ্গে মেলার মতো শুরু হয়।
সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, এবার সে খিচুঁনিও দিতে থাকে।পুলিশের সঙ্গে একজন ডাক্তার ছিল।ডাক্তার সোনালীকে দেখতে থাকে।
সে তার শরীরে হাত দিয়ে অবাক হয়ে যায়।কেননা,সে সোনালীর মধ্যে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পায় না।মুনি ডাক্তারের হাত সরিয়ে দেয়।সে সোনালীর হাত শক্ত করে ধরে।কিছুক্ষণের মধ্যে সে ঠিক হয়ে উঠে।তার এমন হওয়ার বিষয়ে পুলিশ জিজ্ঞেস করলে,মুনি অসুস্থতা বলে তাকে নিয়ে যায়।
সে যদি বলতো,যে জানি না।তাহলে গ্রামবাসী সেটা শুনে নিতো আর এ নিয়ে গ্রামে কথা উঠতো।পরে সোনালীর বিয়ে দিতে সমস্যা হতো।এজন্যই মুনি কথাগুলো লুকিয়েছে।
সে সোনালীকে বাড়ি নিয়ে আসে।দুজন দেখে বাড়ির আঙিনায় অনেক লোক বসে।সোনালীর বাবা-মাসহ আরও অনেকে বসে আছে।অনেকটা কাছে গেলে দেখে রাসেল।রাসেল তার বাবা-মাকে নিয়ে এসেছে।রাসেল আর সোনালী একে অপরকে ভালোবাসে।এজন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে।বিয়ের কথা শুনে লজ্জায় সোনালী দৌড় দিয়ে ঘরে যায়।তার পিছনে মুনি যায়।
-কী রে,তোর তো বিয়ে হবে।তাহলে তুই বড় হয়ে গেলি!( মুনি হেসেঁ)
-যা,তুই না।( সোনালী মুচকিঁ হেসেঁ)
তাদের কথাবার্তার মধ্যেই রাসেল ঘরে প্রবেশ করে।তাকে দেখে মুনি বাইরে বের হয়ে যায়।রাসেল সোনালীর পাশে বসে।তার হাতে হাত রেখে চোখের দিকে তাকাঁয় আর কপালে চুমু দেয়।আড়াল থেকে মুনি সবই দেখে নেয়।সে হেসেঁ বলে," ইস কত ভালোবাসা।এসব তো বিয়ের পর করলেই হয়।"সোনালী রাগী চোখে তাকাঁলে সে দৌড় দেয়।দুজনে একে অপরের দিকে তাকিঁয়ে মুচকিঁ হাসিঁ দেয়।
-এইজন্য আজকে মেলায় আসোনি।( সোনালী)
-হ্যাঁ আবার না। ( রাসেল)
-মানে!!
-আসলে চাকরির জন্য গিয়েছিলাম। ভাবিনি আজকে চাকরি হয়ে যাবে।যখন দেখলাম চাকরি হয়ে গেছে।তখনিই আর দেরি না করে চলে এলাম বউকে নিতে।
-যদি বউ যেতে না চায়।
-না গেলে জোর করে তুলে নিয়ে যাবো।
-এত সহজ বুঝি।আমিও দেখি কেরা আমারে তুইলা নিয়ে যায়।
-ঠিক আছে দেখো তাহলে।
রাসেল সোনালীকে কোলে তুলে নেয়।সোনালী ছাড়োঁ বলে চিৎকার করে উঠে।তখন বাইরে বসে থাকা তার বাবা বলে," কী হয়েছে মা?।"জবাবে," কিছু হয়নি"- বলে সোনালী।এরপর দুজন মিটমিট করে হাসঁতে থাকে।মুনি বাইরে দাঁড়িয়ে মুচকিঁ হাসঁতে থাকে।দুই পরিবার আর ছেলে মেয়ের রাজি থাকায়, বিয়ে ঠিক হয়।আগামী এক মাস পর তাদের বিয়ের দিন ঠিক করা হয়।বিয়ে ঠিক করেই রাসেল আর তার পরিবারের সকলে চলে যায়।
রাত ৮ টা,
সোনালীর মা কুলসুম বেগম রান্না করছেন।সোনালী তাকে হাতে হাতে সাহায্য করছে।তখনিই মুনি এসে হাজির।তাকে দেখে সোনালী খুশি হয়।মুনি তাকে হাতের ইশারা দিয়ে ডাক দেয়।মায়ের সব জোগাড় করে দিয়ে সে উঠে যায়।মুনি তাকে টেনে নিয়ে একটু দূরে যায়।
-কীরে এভাবে ডাকলি!কারণ কী?
-ওই যে রাস্তায় একটা লোক মরলো না।
-হুম, তো কী হয়েছে?
-ওই লোকটার শরীরে নাকি কোনো রক্ত নেই আর রাস্তায়ও নাকি কোনো রক্ত পাওয়া যায়নি।
-কী বলিস!কিন্তুু আমরা তো রক্ত দেখেছি!
-হুম,তাই তো।
-তাহলে রক্ত গেল কোথায়?
-সেটাই কথা।
কুলসুম বেগম তাদের দেখে ফেলে।তিনি তাদের ডাক দেন।দুজনে কথা বন্ধ করে রান্না ঘরে যায়।কুলসুম বেগম তাদের খাবার নিয়ে ভেতরে যেতে বলে।খাবারগুলো নিয়ে তারা ভেতরে যায়।দুজনে বসার জন্য কাপড় পেতে নিল।এরপর প্লেটে খাবার নিয়ে খেতে শুরু করলো।দুজনের মুখেই চিন্তার ঝাপঁ।কুলসুম বেগম ঘরে আসে।এসে দেখে তারা একই খাবার বার বার মুখে দিচ্ছে কিন্তুু খাচ্ছে না।
-কীরে তোদের কী হয়েছে!খাচ্ছিস না কেন?
-হ্যাঁ,কই কিছু না তো।এই তো খাচ্ছি মা।
-হ্যাঁ,খাচ্ছি তো আমরা।আচ্ছা চাচী, চাচা কোথায়?
-উনি তো বাজারে গেছে।কীসব যেন হয়েছে।
-ওও
একটু পরেই জাফর আলী চলে আসেন।তিনি এসে পাশের বাড়ির লোকটার মরার কথা বলেন।সেই সাথে মুনির বলা সেই অদ্ভুত কথাগুলোও বলে।তার বাবার কথা শুনে তারা দুইজন ঢোগ গেলে।তারা একে অপরের দিকে তাকাঁয়।খাবার খাওয়া শেষে সোনালী মুনিকে বাড়ি পৌঁছে দিতে যায়।যাওয়ার পথে তারা মরা নিয়ে কথা বলছিল।তখনিই রাসেল সেখানে এসে হাজির হয়।তাকে দেখে মুনি হেসেঁ বলে," থাক!আর তোকে এগিয়ে দিয়ে আসতে হবে না।আমি একাই বাড়ি চলে যেতে পারবো।তুই বরং অন্য কাউকে তোর মনের ঘরে এগিয়ে দিয়ায়।"মুনি সেখান থেকে হেঁসে চলে যায়।রাসেল সোনালীকে নিয়ে বাড়ি আসতে থাকে।রাত কম হলেও আশেপাশে সেরকম আলো নেই।শহরের মতো এত আলো গ্রামে থাকে না।
তারা দুজন ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে হাটঁছিল।সোনালী সামনে সামনে আর রাসেল পিছনে।
-আমার না বিশ্বাস হচ্ছে না।যে তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে।
-বিশ্বাস করিসও না।কারণ তোর বিয়ে তো হবে লয় রে।( মোটা স্বরে)
ভয়ে সে পিছনে ঘুরে তাকাঁয়।কিন্তুু পিছনে কেউ তো নেই।রাসেল গেল কোথায়!তাহলে কী সে রাসেল ছিল না!।তাহলে কে ছিল?সে ভয়ে দৌড় দেয়।এক দৌড়ে বাড়ি চলে আসে।
-কীরে এভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন!( কুলসুম)
-রাস্তায় কুকুর ছিল মা।
-কুকুর দেখে দৌড়ালে ও তোকে কামড় দেবে আর কখনোও কুকুর দেখে দৌড়াবি না।
-আচ্ছা মা।
অন্যদিকে,
সবুজ খাওয়া দাওয়া শেষ করে। খাবার খাওয়ার পর তার ভালো লাগছিল না।তাই সে ছাদে যায়।দুইশো বছর পুরোনো বাড়ি। তবে এখনোও এটা মজবুত আছে।সেই সাথে সৌন্দর্য তো ভরা।ছাদের চারপাশে ছোট করে দেওয়াল দেওয়া।সবুজ দেওয়ালের পাশে বসে পড়ে।আকাশে তাকিঁয়ে চাদঁ দেখতে থাকে।ঢাকা শহরে এসব দেখার তেমন সুযোগ হয় না।দেখা গেলেও গ্রামের মতো নয়।গ্রামের তার পছন্দ না হলেও কিছু জিনিস তার ভালো লাগে।
যেমন আকাশে তাকিঁয়ে চাদঁ আর তারা দেখা।পকেট থেকে ফোন বের করে আকাশের ছবি তোলে।নিজের তোলা ছবি দেখছিল।হঠাৎ একটা শব্দ হয়, সে উঠে দাড়াঁয়।শব্দটা পিছন থেকে এসেছে।সে পিছনে ঘুরে তাকাঁয়।দেখে কেউ একজন বাগানের বকুল গাছের ডালে বসে রয়েছে।সে ভাবে হয়তো কোনো চোর।তাই ঘুরে দারওয়ানকে ডাক দেয়।দারওয়ানকে বকুল গাছের ডালে বসা লোকের কথা বলে।দারওয়ান যখন সেখানে যায়।তখন সে কাউকেই দেখতে পায় না।সবুজ অবাক হয়ে যায়।এত তাড়াতাড়ি সে গাছ থেকে নেমেও গেল আবার নেমে পালিয়েও গেল!বেশ অদ্ভুত বিষয় তো"
যে বড় গাছ।তাতে এত তাড়াতাড়ি নামতে পাড়া মানে অভিজ্ঞ চোর।সবুজ দারওয়ানকে চারপাশ চ্যাক করতে বললো।
সবুজ নিচে নামার জন্য হাটাঁ শুরু করে।হঠাৎ পিছন থেকে আওয়াজ আসে," তুই যে শুধুই আমার রে। শুধুই আমার।" এই বলে অট্টহাসি দেয়।তার হাসিঁ শুনে সবুজ পিছনে ঘোরে।