ভবিষ্যতী

পর্ব - ১৩

🟢

সোনালী পড়ে গেলে,সকলে তার কাছে যায়।তখন তাদের নজর পড়ে,সেই সব মরদেহের উপর।গ্রামবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।কিছুদিন ধরে কোনো মরদেহ না পাওয়ায়,তারা ভেবেছিল,হয়তো কবিরাজ সব ঠিক করে ফেলেছেন।কিন্তুু আসল ঘটনা তো অন্যকিছু।যে কয়দিন গ্রামের পরিবেশ শান্ত ছিল।সে কয়দিন মানুষের লাশ, এই নদীর কিনারায় পড়ে ছিল।

শান্ত পানিতে ঝাঁপ দেয়।রত্না সাঁতার জানে না।তাই সে শুধু পানিতে লাফাচ্ছে।একে তো সাঁতার জানে না। তার উপর নদীর স্রোত।অনেক কষ্টে শান্ত, রত্নাকে নিয়ে কিনারায় আসে।নীলা রত্নাকে উঠাতে সাহায্য করে।রত্মা পানি বেশি খাওয়ায়,সে অজ্ঞান হয়ে গেছে।

শান্ত তার পেটে কয়েকবার চাপ দেয়।কিন্তুু তাও রত্না চোখ খোলে না।তখন তার মুখ দিয়ে,রত্মার মুখে শ্বাস দেয়।এরপর আবার পেটে চাপ দেয়।তখন রত্মার ভেতরের পানি বের হয়ে যায়।সে চোখ মিলে তাঁকায়।

গাছের পাতার মধ্যে শান্তা, নদী থেকে পানি আনে।তারপর সোনালী মুখে ছিঁটে দেয়।সোনালীর জ্ঞান ফিরে।কিন্তুু তার মাথা ব্যাথা শুরু হয়।তখন সবুজ তার কাছে আসে।সবুজ তাকে উঠানোয় সাহায্য করে।

সবুজের স্পর্শ পেতেই, সোনালী পূর্ণরায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।সবুজের শুরু হয়, মাথাব্যাথা।এত তীব্র ব্যাথা হতে থাকে,যে সে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।শান্ত রত্মাকে এক ছেলের কাছে দিয়ে,তার ভাইয়ের কাছে ছুটে আসে।

-কী হয়েছে ভাই!তোর আবার মাথা ব্যাথা শুরু হলো নাকি?( শান্ত সবুজকে ধরে)

সোনালীর বাছাইকৃত ছেলের মধ্যে, একটি ছেলে। নাম তার হাবিব। সে রত্মাকে ধরে আছে।মুখে তার ভয়ংকর ছাপ।সে রত্নার কানে কানে বলে,

"সাহস করে পালালি,আবার বেঁচেও গেলি।সত্যিই বলতে হবে,তোর ভাগ্যও আছে।কিন্তুু এরপরের বার তো, তোকে বাঁচাতে আর কেউ আসবে না। তখন তুই কী করবি?"

এই কথা বলে, ছেলেটা দ্রুত জনগমের মধ্যে মিশে যায়।হাবিবের বলা কথাগুলো, সবুজ দূর থেকেই শুনতে পায়। সবুজ আবার স্বাভাবিক হয়।কিন্তুু সে কী শুনলো!কে-ই বা এসব বললো?তবে এতটুকু তার কাছে স্পষ্ট যে, কথাগুলো রত্নাকেই বলা হয়েছে।

সে রত্নার দিকে তাঁকায়।সোনালীর জ্ঞান ফেরেনি।তাকে নিয়ে তার বাসায় যাওয়া হয়।এরপর সোনালী রেখে গ্রামবাসীরা চলে যায়।শুধু নীলা,শান্ত,সবুজ,সজল,মুনি, শান্তা আর রত্মা থাকে।তারা কেউই বাড়ি যাবে না।যতক্ষণ না, সোনালীর কোনো খবর তারা পাবে।ডাক্তার আসে,সোনালীর জ্ঞানও ফিরে আসে।

রাসেল ও তারা মা-বাবা তাকে দেখতে আসে।রাসেলের মা এখানে আসতে চাননি।ছেলের জোরজবরদস্তিতে আসতে বাধ্য হয়েছেন।বাকি রইলো বাবার কথা,উনি এসেছেন বিয়ে ভেঙে দিতে।এ বিষয়ে রাসেল কিছুই জানে না।সে তো শুধু, সোনালীর অসুস্থর কথা শুনে ছুটে এসেছে।

-ডাক্তার সোনালী এখন কেমন আছে?( রাসেল উত্তেজিত হয়ে)

-উত্তেজিত হওয়ার দরকার নেই।উনি এখন ঠিক আসে।ঠিকমতো খাবার না খাওয়ার জন্য,মাথা ঘুরে গেছিল।তবে চিন্তার কিছু নেই,আমি ঔষধ আর খাবারে তালিকা তৈরি করে দিয়েছি।সেগুলো অনুসরণ করলেই উনি,আবার ঠিক হয়ে যাবেন।( ডাক্তার হেঁসে)

-এখন তাহলে আমরা আসি।( নীলা)

-আচ্ছা।কালকে ভোজনের সময় দেখা হবে।( মুনি)

-আচ্ছা।( সজল)

-দাঁড়া,রত্মাকেও আমাদের সঙ্গে রাজবাড়ি নিয়ে চল।(সবুজ)

-কেন!( শান্তা)

-যত দূর আমি জানি। ওর মা কয়েকদিনের জন্য বাইরে গেছে, আর কবিরাজমশায় তো, আমাদের বাড়িতে কিছুক্ষণ থাকবেন।তাই ও'কে একা বাড়িতে রাখা ঠিক হবে না।( সবুজ কথা শেষ করে ইশারা পাগল বোঝালো)

-আচ্ছা ঠিক আছে।( সবুজসহ সবাই চলে যায়)

শুধু মুনি আর রাসেল সোনালীর কাছে বসে।রাসেলের মা-বাবা, সোনালীর মা-বাবার সঙ্গে, কিছু গুরত্বপূর্ণ কথা বলছে।রাসেল সোনালীর হাত নিজের মুখে লাগায়।

-এভাবে না খাওয়ার মানে কী?( রাসেল)

-খেতে ইচ্ছে করে না,তাই খায়নি।তবে আজ থেকে আবার খাবো।ডাক্তার বাবু তো,ঔষধ দিয়ে গেল।( সোনালী রাসেলের গালে আদর দিয়ে)

-ওসব ঔষধে কিছুই হবে না।( রাসেল গম্ভীর গলায়)

-মানে!কিছু হবে না,মানে কী?( সোনালী হাত সরিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে বললো)

----------

রত্মাকে ধরে শান্ত নিয়ে যাচ্ছে।রত্মা তার দিকে তাঁকিয়ে আছে।তার কেমন যেন অনুভূতি হচ্ছে।শান্তর ছোঁয়া তার বেশ ভালো লাগছে।কিন্তুু এর কারণ,সে বুঝতে পারলো না।রত্মা নদী থেকে উঠার পর থেকে,স্বাভাবিক আচরণ করছে।এখন আর, পাগলের মতো ব্যবহার করছে না।

সেটা কেউই লক্ষ্য করেনি।বাঁশবাগান দিয়ে সকলে এগিয়ে চলেছে।বাঁশের আড়ালে, আলো হারিয়ে গেছে।ক্ষীণ হয়ে গেছে আলো।

হঠাৎ সবুজের মনে হয়,কেউ একজন তাদের অনুসরণ করছে।কখনোও পিছনে, তো বামে,তো ডানে কেউ আছে,এমনই মনে হয়।সে সব দিকেই তাঁকায়।কিন্তুু কাউকেই দেখতে পায় না।যখন বাঁশবাগান থেকে বের হবে।

তার আগেই সে লক্ষ্য করে,একজন বাম দিক দিয়ে,তাদের সঙ্গে হেঁটে চলেছে।সে বাম দিকে তাঁকায়।স্পষ্ট দেখা না গেলেও,কেউ যে আছে, এটা স্পষ্ট।অন্ধকারের জন্য লোকটাকে ছায়ার মতো লাগছে।মাঝে মাঝে যখন, বাঁশবাগানের ভেতরে সূর্যের আলো পৌঁছায়।সেই ক্ষীণ আলোয়, লোকটাকে একটু দেখা যায়।তবে ভালোভাবে কিছুই বোঝা যায় না।

-কে ওই খানে?( সবুজ জোরে)

-কাকে কী বলছি ভাইয়া?( শান্ত )

-ওই যে.... ( সবুজ হাত দিয়ে দেখায় কিন্তুু লোকটা নেই)

-ওই যে কী?( নীলা)

-ওই যে নাটকের সংলাপ বলছিলাম।( সবুজ কথা ঘুরিয়ে হেঁসে)

-হ্যাঁ!তুই নাটক করতে রাজি হলি,সংলাপ বগবগ করতে লাগলি,তার উপর আবার মুখে হাঁসি!আমি তো পাগল হয়ে যাবো।( শান্ত মুখটা হাস্যকর করে বললো)

-বেশি কথা না বলে,চুপচাপ হাঁট।( সবুজ গম্ভীর কণ্ঠে বললো)

-আবার আগের মতো হয়ে গেছে,খারাপ মানুষের মতো।( নীলা আস্তে বললো)

সকলে রাজবাড়ি চলে আসে।রত্মাকে দেখে কবিরাজ মশায় অবাক হয়।তিনি তাকে টেনে ঘরে নিয়ে যেতে চায়।কিন্তুু রত্না যেতে চায় না।রত্মা স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে।এটা দেখে উপস্থিত সকলেই চমকে যায়।

-হ্যাঁ!( কবিরাজ অবাক দৃষ্টিতে)

-আমি আর আগের মতো পাগল নেই।এখন আমি সুস্থ হয়ে গেছি।( রত্মা হেঁসে)

-কবিরাজমশায়,এতো সুখের খবর।আপনার মেয়ে ঠিক হয়ে গেছে।(আমেনা খুশি হয়ে)

-অনেক খুশির খবর।আমি বরং ওর মা'কে ফোন দিয়ে বলি।( কবিরাজ রত্মার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাঁকালো।এরপর তার স্ত্রীকে ফোন দিল।তারপর কানে ফোন ধরে বাইরে চলে গেল)

-চাচী,তুমি বরং রফিক ভাইকে বলে।রত্মার জন্য ঘর তৈরি করতে বলো।যেহেতু কবিরাজ এখানে থাকবে,তাহলে রত্মা বাসায়, একা থেকে কী করবে?( শান্ত হেঁসে)

-হুম,এখুনি সব কিছুর ব্যবস্থা করছি।( আমেনা হেঁসে বললো।এরপর চলে গেল।)

কবিরাজ তার স্ত্রী (মুনিয়াকে) ফোন করে।তিনি শুরুতেই কীসব অদ্ভুত মন্ত্র বলেন।সঙ্গে সঙ্গে তার বলে," আমি কালই চলে আসছি।"

-----------

গ্রামবাসীরা পুলিশকে ফোন করেছিল।পুলিশ এসে, সকল মরদেহ উদ্ধার করেছে।রীতিমতো গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।সকলকে ঠিক করেছে,সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া যাবে না,আর একা তো যাওয়াই যাবে না।আতঙ্ক বিরাজের পাশাপাশি, নানা প্রশ্ন।কিন্তুু উত্তর, একটারও নেই।এতগুলো মরদেহ,অদ্ভুতভাবে খুন!নাকি অশরীরীর কান্ড।

অধিকাংশ মানুষ ভূতূড়ে কান্ড ভেবে নিয়েছে।শুধু অল্প শিক্ষিত সমাজ,খুন ভেবেছে।যে যা-ই ভাবুক না কেন,পুলিশ এখনও কিছু বুঝতে পারেনি।তারা শুধু সিরিয়াল কিলার ভাবছে।তাও স্পষ্ট নয়।পুলিশ পুরো গ্রামে লকডাউন দিয়ে দিয়েছে।গ্রাম থেকে বের হতে হলে, কিংবা ভেতরে প্রবেশ করতে হলে,অনুমতি পত্র নিতে হবে।

পুলিশ অফিসার ( শ্যামল) সবকিছুর তদন্তে আছেন। তিনি গ্রামবাসীসহ,মেম্বারের সঙ্গে কথা বলেছেন।এখন শুধু রাজবাড়ির সদস্য, আর সোনালী ও মুনির সঙ্গে, কথা বলা বাদ আছে।তাই তিনি জিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।হাবিব ঝোপঝাড় দিয়ে বাড়ি ফিরেছে।তাদের টিনের বাড়ি।একটা ছনের গোয়াল ঘরও আছে।বাড়ির চারপাশে পাতার বেড়া।পাটি পেরে উঠানে বসে আছেন, হাবিবের মা(মুনিয়া)। মুনিয়ার বাম পাশে, হারিকেন জ্বলছে।এ বাড়িতে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই।মা ( মুনি) হাত পাখা দিয়ে, বাতাস নিচ্ছেন।ছেলেকে আসতে দেখে, তিনি এক পা উঠায়।দেখে মনে হচ্ছে, কোনো জমিদার বসে আছে।

মুনি ভ্রু কু্ঁচকালে,হাবিব একটু ভয় পায়।সে ঢোগ গিলতে শুরু করে।মুনি সেটা লক্ষ্য করে,মুঁচকি হাঁসি দেয়।

-ভয় পাওয়ার দরকার নেই।আমি তো কিছু বলেইনি।( মুনি হেঁসে)

-না,আসলে...মা...আমি..( হাবিব একটু ঘাবড়ে গিয়ে)

-কোথায় গেছিলি!এত দেরি হলো কেন?কতবার না বলেছি,এত রাতে বাড়ির বাইরে না থাকতে।কথা কী, কানে যায় না,নাকি!( মুনি একটু রেগে উঠে দাঁড়ালো)।

এরপর তিনি এক হাত উঁচু করলেন।সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে এক আলোর বল তৈরি হলো।

Story Cover