কবিরাজকে দেখে মুনিও অবাক হয়।আকাশ আর আমেনা, কবিরাজকে ভেতরে নিয়ে আসে।তারা কবিরাজকে বসতে বলে।এরপর নীলাকে ইশারা দিয়ে, কিছু খাবার নিয়ে আসতে বলে।নীলা কথামতো শরবত,বিস্কুট, চানাচুর,মিষ্টি নিয়ে আসে।কবিরাজ সেগুলো খায় না।তিনি সবকিছু নিয়ে যেতে বলেন।
-আমি কাজ করার সময় কিছু খাই না।কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিকও নেই না।এটা আমার নীতিরীতি।( কবিরাজ হেঁসে সোনালীর দিকে তাঁকায়)
-তাহলে,আপনার জন্য কী করবো?( আমেনা)
-আমার থাকার ব্যবস্থা করো।( কবিরাজ)
আমেনা তার কথামাতো, রফিক ভাইকে ডাক দেয়।তাকে কবিরাজের জন্য ঘর তৈরি করতে বলে।রফিক ভাই গাড়ি থেকে ব্যাগপত্র নামায়।তারপর তিনি সেগুলো ঘরে নিয়ে যায়।পুরো ঘর নতুন করে পরিষ্কার করে,গোছানো হয়।যাতে কবিরাজের কোনো অসুবিধা হয়।
কবিরাজকে রফিক ভাই নিয়ে যান।তিনি গেলে,সজল তার মায়ের ( আমেনা) হাত ধরে।সজলের চোখের দৃষ্টিতের ভাষায়,আমেনা সব বুঝে যায়।
-কবিরাজ সাহেব,কেন এসেছে?সেটাই তো জানতে চাস।তাই না?( আমেনা গম্ভীর হাঁসি দিয়ে বললো)
-হুম,কবিরাজ কেন এসেছে?( সজল)
-বেশি কিছু বলবো না।শুধু এইটুকু বলবো যে,তোমার জন্য এসেছে।( গম্ভীর গলায় আমেনা বলে চলে গেল)
-আমার জন্য! আমার জন্য মানে!মা আসলে কী বলতে চাইলো?( সজল মনে মনে)
দুজনের কথোপকথন, কেউ শুনতে পেল না।
তারা খুবই আস্তে কথা বলেছিল।তার উপর সকলে কাজে ব্যস্ত ছিল।সজলকে এক জায়গায় স্থীর ভাবে, দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, মুনি তাকে টেনে নিয়ে আসে।এরপর নীলাকে সাউন্ড বাক্সে গান চালাতে বলে।
নীলা " ইয়ে রাতে ইয়ে মছাম, নাদিকা কিনারা" গান চালায়।মুনি সজলের এক হাত ধরেই,তার সঙ্গে নাচতে শুরু করে।সজল তো শুধু মুনিকে দেখতে থাকে।যতবার সে তার সঙ্গে ঘুরছে।তখনই মুনির চুলগুলোও ঘুরছে।তা দেখতে বেশ ভালোই লাগছে।
তাদের নাচ দেখে প্রত্যেকে হাত তালি দেয়।নাচ শেষে,শান্ত নীলাকে টেনে নিয়ে যায়।তারপর সেও তার সঙ্গে নাচতে থাকে।এদের নাচের মধ্যে,শান্তা আর কিছু গ্রামের লোকও যোগদান করে।সোনালী তো বসে বসে আনন্দে হাঁসতে থাকে।সবুজ নাচ নয়,সোনালীকে দেখছিল।তার সোনালীকে দেখলেই, কেমন যেন লাগে।
নাচ শেষ হয়ে যায়।এবার নাটক অনুশীলন করার সময়।যখন সোনালীর সময় আসে।তখন কবিরাজ, উপর থেকে তাকে দেখে।সে কুৎসিত হাঁসি দিয়ে, হাতের ইশারা দেয়।তখনই পুরো বাড়ি নড়তে শুরু করে।ভূমিকম্প শুরু হয়।প্রত্যেকে এদিক ওদিক পড়ে যায়।সজলের বগল থেকে লাঠিটা পড়ে যায়।তখন মুনি তাকে শক্ত করে ধরে নেয়।সোনালী পড়ে যেতে বসলে,সবুজ তাকে ধরে নেয়।
---------
কবিরাজের মেয়ে রত্মা চোখ খুলেছে।তার হাত পা মুখ বাঁধা।সে নড়াচড়া শুরু করে।সকল বাঁধন খোলার চেষ্টা করে।কিন্তুু বাঁধন খোলা যায় না।তখন কবিরাজের বাড়ির সামনে একজন লোক আসে।
-কবিরাজ মশায়,বাড়ি আছেন নাকি?( লোকটা)
রত্মা লোকটার কথা শুনতে পায়।কিন্তুু কিছু বলতে পারে না।সে নড়াচড়া করে ডানে যায়।ডানে রাখা চেয়ারে কাঁচের গ্লাস ছিল।সেই গ্লাস নিচে ভেঙে পড়ে যায়।কাঁচ ভাঙার শব্দ লোকটা শুনতে পায়।লোকটা ঘরের দরজাটায় ধাক্কা দেয়।ধাক্কায় দরজাটা খুলে দেয়।
লোকটা দেখে রত্মা বাঁধা অবস্থায় আছে।দ্রুত লোকটা তার সবগুলো বাঁধন খুলে দেয়।
-তোমার সঙ্গে এসব কে করলো!আর তোমার বাবাই বা কোথায়?( লোকটা)
রত্মা কোনো উওর দেয় না।তার চোখে মুখে ভয়।সে লোকটার পিছনে তাঁকিয়ে আছে।পিছনে দাঁড়িয়ে আছে,এক কালো ছায়া।দেখেই বোঝা যাচ্ছে,কোনো নারী।
-কী হলো!কিছু বলো,আর তুমি আমার দিকে না তাঁকিয়ে,আমার পিছনে কেন তাকাচ্ছো?( লোকটা)
লোকটা পিছনে ঘুরে তাঁকায়।
--------
রত্না দৌড় দিচ্ছি।আশেপাশের সব লোক তাঁকিয়ে আছে।তাদের মধ্যে কিছু লোক,তাকে বাঁধা দেয়।
-কী হয়েছে!এভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন?( ১ম লোক)
-ও আসছে,আমায় পালাতে হবে।তোমরাও পালাও।নয়তো একে একে, তোমরাও লাশ হয়ে যাবে।( রত্মা হাঁপিয়ে)
-এসব কী বলছিস তুই!কে আসছে?আর কীসের লাশ?( ২য় লোক)
-শত বছরের বদলা।এবার সে নিতে,ফিরে এসেছে।( রত্মা লোকদের হাত থেকে, নিজেকে ছাঁড়িয়ে দৌড় দেয়)
লোকগুলো রত্মার পিছনের দিকে তাঁকিয়ে থাকে।
-ও এসব কী আবল তাবল বলছে?পাগলীর বাবা-ই বা গেল কোথায়?( ১ম লোক)
হঠাৎ লোকগুলো দুই দিকে ছিটকে যায়।যেন কেউ তাদের, ছিটকে ফেলে দিল।আশেপাশের সবাই হতভম্ব।তাও কিছু লোক রত্নার পিছনে গেল।রত্মা দৌড়ে নদীর কিনারায় চলে এসেছে।কালো ছায়াটিও সেখানে চলে এসেছে।রত্নার ভয় দেখে,কালো ছায়াটি দাঁত বের করে।এরপর নিজের মুখের, চুলগুলো সরায়।তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রত্মার উপরে।
কিছুক্ষণ আগে,
লোকটা পিছনে ঘুরলে, কাউকেই দেখতে পায় না।সে রত্মাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়।রত্মা সবার আগে বের হয়।এরপর লোকটা বের হওয়ার চেষ্টা করে।কিন্তুু তখনিই এক অদৃশ্য জিনিস, তাকে টেনে ভেতরে নিয়ে যায়।দরজা একাই বন্ধ হয়ে যায়।রত্না ভয়ে স্থীর হয়ে গেছে।একটুও নড়াচড়া করছে না। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে।
গলা শুকিয়ে গেছে। একটু পর পর সে ঢগ গিলছে।রত্না মনে সাহস জোগায়।সে দরজায় ধাক্কা দেয়।দরজাটা খুলে যায়।
------
সোনালী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সে খিঁচুনি দিতে শুরু করে।মুনি বিপদ বুঝতে পারে।সে সকলের নজর থেকে, সোনালীকে নিয়ে যায়।এই কাজে, সবুজ আর শান্ত তাকে সাহায্য করে।সোনালীকে সবচেয়ে কাছের ঘরে রাখা হয়।মুনি ঘরে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দেয়।কাউকেই ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় না।
-মুনি! দরজা লাগিয়ে দিলি কেন?দরজাটা খোল।( নীলা)
-এখন দরজা খোলা যাবে না।একটু অপেক্ষা কর।তারপর দরজা খুলে দেব।তার আগে দরজা খোলা যাবে না( মুনি)
-কিন্তুু কেন!( সজল)
-এত কিছু এখন বলা সম্ভব নয়।পরে সময় হলে সব খুলে বলবো।( মুনি)
সোনালীর খিঁচুনি বন্ধ হয়ে যায়।সে চোখ খোলে।তার চোখ দুটো কালো।সে শূন্যে ভেঁসে উঠে।এরপর দেখে,নদীর কিনারায় অনেকগুলো মরদেহ।কারো মাথা নেই,কারো পা তো কারো অন্যান্য অঙ্গ নেই।
সে স্বাভাবিক হয়ে যায়।মরদেহের দৃশ্য দেখে, সোনালী ভয় পেয়ে যায়।সে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে।মুনি তার দুই হাত, সোনালীর কাঁধে দেয়।
-কী হয়েছে সোনালী,তুই এমন করছিস কেন!তুই কী কিছু দেখলি নাকি?( মুনি ভয়ে)
-অনেকগুলো মরদেহ।( হাঁপিয়ে সোনালী)
-মরদেহ!(মুনি)
সোনালী আর কিছু বললো না।সে দরজা খুলে দৌড় দিল।তাকে দৌড়াতে দেখে, সকলে হতভম্ব হয়ে যায়।একটু আগেই কেমন করছিল,আর এখন দৌড়াচ্ছে!
-ও এভাবে কোথায় গেল?( সবুজ)
-মরদেহ।( মুনি এইটুকু বলে দৌড় দিল)
-মরদেহ!মানে কী?( শান্তা)
-সেটা জানতে হলে,ও'কে আগে ধরতে হবে।( শান্ত কথাটা বলেই দৌড় দেয়)
একে একে সকলেই দৌড় দেয়।কিন্তুু সজল তো দৌড় দিতে পারবে না।
-আরে আমায় কেউ নিয়ে যা।আমি তো এই অবস্থায় দৌড়াতে পারবো না।( সজল এক পা এগিয়ে)
শান্ত আর নীলা এসে সজলকে ধরে নিয়ে যায়।সোনালীকে মুনি থামতে বললেও,সে থামে না আর না কারো কোনো কথা শোনো।এত জনকে একসঙ্গে দৌড়াতে দেখে গ্রামবাসী অবাক হয়।
আকাশে অনেকক্ষণ আগেই কালো মেঘ জমেছে।এতে চারপাশ, রাতের মতো হয়ে গেছে।অন্ধকারে ভরা চারপাশ।গ্রামবাসী কী হয়েছে!জিজ্ঞেস করলে, কেউই কোনো উত্তর দেয় না।সবশেষে, এক মেয়ে সকলকে, মরদেহ বলে দৌড় দেয়।তখন গ্রামবাসীরাও দৌড়াতে শুরু করে।
সকলে নদীর কিনারায় এসে হাজির হয়।সোনালীর সামনে রত্মা ছিল।রত্না হঠাৎ বাম দিকে লাফ দেয়।যেন কিছু একটা তার উপর পড়তে বসেছিল আর সে বাঁচার জন্য লাফ দিল।রত্নার চেহারায় ভয় স্পষ্ট।
সোনালীসহ উপস্থিত সকলেই সেটা বুঝতে পারে।সোনালী, রত্নার তাঁকানোর দিকে তাঁকায়।সে চমকে উঠে।সেও সে-ই, কালো ছায়াকে দেখতে পারছে।
কালো ছায়ার চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে।তার সঙ্গে তার দাঁতগুলোও বের হওয়া।সোনালী ভয়ে ঘামতে শুরু করে।
-ও এভাবে ঘামছে কেন!( সবুজ)
-কীরে সোনালী,কী হলো তোর!তুই এভাবে ভয় পাচ্ছিস কেন?( মুনি সোনালীর কাঁধে হাত দিয়ে)
----
কিছুক্ষণ আগে,
রত্মা দরজা খুলতেই, তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়।লোকটার শরীর থেকে প্রত্যেকটা, মাংস আর হাড় আলাদা হয়ে গেছে।যেগুলো আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।হঠাৎ দূরে এক কালো ছায়া নজরে পড়ে তার।যে ছায়া একটা হাড় চাবাচ্ছে।এমন দৃশ্য দেখে রত্মা ভয়ে দৌড় দেয়।তখন কালো ছায়াটি খাওয়া বন্ধ করে,তার পিছনে দৌড় দেয়
------
কালো ছায়াটি রত্নার উপরে লাফ দেয়।রত্না ছিটকে গিয়ে নদীতে পড়ে যায়।সোনালী দৌড় দেয়।কিন্তুু তাকে বাঁচাতে পারে না।সে নিচে তাঁকিয়ে, ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। নিচে লতাপাতার আড়ালে রয়েছে,অনেকগুলো মানুষের মরদেহ।