ভবিষ্যতী

পর্ব - ১১

🟢

সজল পানিতে ডুব দেয়।মুনিকে দেখা যাচ্ছে না।এত অন্ধকারে, তাকে দেখা মুশকিল।হঠাৎ সজল কিছু একটা, জ্বলজ্বল করতে দেখা পায়।মুনির ঘড়ি,মুনির হাতে পড়া ঘড়িটি অন্ধকারে জ্বলে।সে বৃষ্টির মধ্যেও খেয়াল করেছিল।যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছিল।

কিছুক্ষণ আগে,

-তোর ঘড়ি জ্বলজ্বল করছে!( সজল)

-হ্যাঁ,এই ঘড়িটা অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে।এছাড়া এটা ওয়াটারপ্রুফও,পানিতে পড়লে এর কিছু হবে না।( মুনি হেঁসে)

বর্তমানে,

সজল সেই আলোর দিকে এগোতে থাকে।পানির নিচে প্রবল ঢেউ।তবু সে এগিয়ে চলেছে।কারণ একটাই,মনের মানুষকে বাঁচানো। সোনালীর খিঁচুনি শুরু হয়।সে পানিতে ডুবে যায়।বিলের মধ্যে প্রবল ঢেউ হচ্ছে।কিছুক্ষণ পর সেই ঢেউ চিড়ে, সোনালী ভেসেঁ উঠলো।

সে শূন্যে শুয়ে রয়েছে।খিঁচুনি বন্ধ হয়ে গেছে।কিন্তুু চোখ তার কালো। সোনালী দেখছে,সজল মুনিকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হবে।সেই অদ্ভুত প্রাণীকে সজলকে লেজ দিয়ে আক্রমণ করবে। এইটুকু দেখার পর, তার চোখ স্বাভাবিক হয়ে যায়।সে শূন্য থেকে পানিতে পড়ে যায়।

-আমার সঙ্গে এসব কী হচ্ছে! আমি এসব কী দেখলাম?( সোনালী চিন্তিত হয়ে মনে বললো)

সজল অনেক কষ্টে মুনিকে ধরতে পারে।সে তাকে টেনে নিয়ে আসে।এখনোও মুনি নিঃশ্বাস ছাঁড়েনি।মুনি সজলকে শক্ত করে ধরলো।সজল তাকে নিয়ে ভেঁসে উঠলো।দুজনকে সুস্থ দেখে সোনালী খুশি হলো।সে তাদের, দ্রুত কিনারায় যেতে বললো।

সোনালী কিনারায় উঠে পড়লো।এরপর সজল মুনিকে উঠালো।যখন সজল উঠবে।তখন-ই প্রাণীটি সজলকে লেজ দিয়ে আঘাত করে।সজল পানি থেকে ছিঁটকে বাইরে পড়ে।তারা দুইজন প্রচন্ড ভয় পায়।চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।সোনালী আর মুনি ভয়ে, একে অপরের দিকে তাঁকায়।

বৃষ্টি থেমে গেছে।কালো মেঘ সরিয়ে, সূর্যের আলো বের হচ্ছে।চারপাশ আবারও সবুজে ভরে গেছে।এতক্ষণ কী হয়েছে,তা এই সবুজ সূর্যে জানা অসম্ভব।যেন কোনো ঝড় বয়ে গেল।

সূর্যের আলো, সজলের চোখে পড়তেই,সে ধীরে ধীরে চোখ মিলে তাঁকায়।তাকে সুস্থ দেখে মুনি জড়িয়ে ধরে।সজল কোনো কিছু বুঝতে না পেরেও,তাকে জড়িয়ে ধরে।মুখে সজলের হাঁসি।সোনালীও মিটমিট করে হাঁসছে।মুনিরও যে সজলের প্রতি, একটা অনুভূতি এসেছে,সেটা সোনালী বুঝতে পারছে।

সজল পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা পেয়েছে।তা-ই সোনালী আর মুনি মিলে,তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।সজলের পায়ে প্রচন্ড আঘাত লেগেছে।সে কিছু ভালোভাবে হাঁটতে পারবে না।ক্ষত স্থানক ডাক্তার, তাকে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে তাকে Crutch (ক্রাচ) দিয়েছে।তাকে বগলে ভর দিয়ে চলতে হবে।

বাড়ির সবাই উত্তেজিত হয়ে পড়ে।

আয়না বেগম দৌড়ে, সজলের কাছে যায়।পরিবারের সবাই বেশ চিন্তিত।কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে,সজল পানিতে পড়ে গিয়ে, ব্যাথা পেয়েছি,কথা বলে দেয়।

-পানিতে!তুই তো বাজারে গেছিলি!( নীলা)

-হুম, তাই তো।তুই তো বাজারে গেছিলি,তাহলে পানিতে পড়লি কী করে?( শান্ত ভ্রু কুঁচকে)

-আহ্,আগে ও'কে বসতে তো দে।( আয়না বেগম রেগে বললেন)

মুনি আর সোনালী, সজলকে ধরাধরি করে সোফায় বসায়।মুনি তাকে বসানোর সময় নিঁচু হয়ে যায়।তখন তার গলার চেইন,সজলের শার্টের বোতামের সঙ্গে, আটকে যায়।মুনি অনেক চেষ্টা করে, কিন্তুু চেইনকে বোতাম থেকে খুলতে পারে না।সোনালীসহ বাড়ির বাকি ছেলে মেয়েরা হাঁসছে।আয়না আর সোহানা বেগম, শুধু তাদের হাঁসি দেখছে।

-সবার মুখেই হাঁসি।কিন্তুু হাঁসির কারণ কী?( আয়না বেগম গম্ভীর ভাবে)

মুনি নিজের গলা থেকেই, চেইন খুলে ফেলে।এরপর সোঁজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

-তোমরা দুজন কে?( সোহানা বেগম)

-ওরা সোনালী আর মুনি।( শান্ত )

-ও,তাহলে তোমরাই সোনালী আর মুনি।তোমাদের বিষয়ে বলেছিল আমাকে।( আয়না বেগম)

-শুধু তোমাকে না বউমা,আমাকেও বলেছিল।( সোহানা বেগন একটু অন্যভাবে বললো)

সকলে মুঁচকি হেঁসে দিল।আয়না বেগম সোনালী আর মুনিকে, থাকতে বলে কালকের ভোজন নিয়ে, আলোচনা করার জন্য।নীলা তাদের টেনে সোফায় বসায়।এরপর কালকের ভোজন নিয়ে আলোচনা শুরু করে।প্রথমে সোনালী আর মুনির, একটু অস্বস্তি বোধ হয়।কারণ,এর আগে তারা এ বাড়িতে, কখনোও আসেনি।তার উপর তারা বাইরের লোক।

তবে কিছুক্ষণ যেতেই,তারাও ওদের সঙ্গে মিশে যায়।এরপর নানা আলোচনা করে।কালকে ভোজনের সঙ্গে নাচ,গান,কবিতা,আবৃত্তি আর নাটকের পরিকল্পনা করা হয়।এর জন্য রাজবাড়ির ছেলেমেয়েরা আর গ্রামের কিছু ছেলেমেয়ের, সঙ্গে অনুশীলন করতে হবে।

-আমি গিয়ে ছেলেমেয়ে জোগার করি।তারপর তাদের নিয়ে রাজবাড়িতে চলে আসবো।ততক্ষণ তোরা আর মুনি মিলে নাটক,গান ইত্যাদির পরিকল্পনা কর।( সোনালী সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে)

-আচ্ছা,তুই যা।আমি এখানে আছি।( মুনি)

সোনালী দ্রুত চলে যায়।আয়না বেগম( মা) সজলকে, ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে।কিন্তুু মুনি থাকায়,সে যেতে চায় না।তাই আয়না বেগম আর জোর করেন না।আয়না বেগম আর সোহানা বেগম সেখান থেকে চলে যায়।

তারা গিয়ে বাকিদের সঙ্গে আলোচনা করে।মামা( আফজাল), মামী(আমেনা) অন্য রুমে আছে।সোহানা বেগম আর আয়না বেগম,তাদের সঙ্গে গল্প করতে থাকে।আয়নার দেবর ও তার বউ, আজ সকালে বাইরে গেছে।কীসের একটা ফোন আসায়।তারা ছুটে চলে যায়।

এদিকে,

মুনি আর বাকিরা মিলে একটা " এই তো আশেপাশে " নাটকের পরিকল্পনা করে।এই নাটক বিভিন্ন ভাগে হবে।কখনোও দুটো নাচের পর,তো কখনোও একটা গানের পর।এভাবে নাটকটি শেষ অবধি চলবে।নাটকে তারা প্রত্যেকে অভিনয় করবে।এমনকি সজলও করবে।

তাদের আলোচনার মধ্যে, সবুজ ঘর থেকে বের হয়।সবুজ নিচে নেমে আসে।এরপর সে ফ্রিজ থেকে পানি বের করে।তাকে দেখে মুনি মুখে হাঁসি চলে আসে।যেটা দেখে সজলের মোটেও সহ্য হয় না।তার অজান্তেই, তার মুখে রাগ চলে আসে।

-উনি, নাটক করবে না?( মুনি সবুজের দিকে তাঁকিয়ে হেঁসে)

-হ্যাঁ!ও করবে,নাটক!এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।( নীলাসহ বাকিরা হেঁসে)

-কেন!( মুনি)

-ও সবসময় গোমড়া হয়ে থাকে।ওর দ্বারা এসব সম্ভব নয়।( সজল)

তাদের এসব কথা সবুজ শুনে নেয়।সে রেগেমেগে, তাদের দিকে আসে।এরপর মুনির দিকে, রাগী চেহারায় তাঁকায়।তারপর ভ্রু কুঁচকে বলে,

" নাটকে অভিনয় আমি করতেই পারবো।কিন্তুু আমি শুধু শুধু সময় নষ্ট করে, নাটক করতে যাবো কেন!এতে আমার লাভ কী?শুধু সময় অপচয় হবে।"( সবুজ একটু ভাব নিয়ে বললো)

তার কথা শুনে, সেখানকার সকলে হাঁসতে লাগলো।শুধু মুনি হাঁসলো না।সে সবুজের দিকে তাঁকিয়ে রইল।

অন্যদিকে,

আকাশ ( সবুজের চাচা), আমেনা ( চাচী) কবিরাজের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।কবিরাজ তাদের ফোন করেছিল। তিনি ফোন করে বলেছিল,

" সজল যে আপনাদের সন্তান নয়, তা আমি জানি।সামনে ওর বড় বিপদ।যদি ও'কে বিপদ থেকে বাঁচাতে চান।তবে আমার সঙ্গে দেখা করুন।আমি এই গ্রামের একমাত্র কবিরাজ।"

এই কথা বলে, তিনি ফোন রেখে দেন।আকাশ আর আমেনা,এইজন্য তার কাছে এসেছে।আমেনা গর্ভবতী হলেও,হাসপাতালে তার সন্তান মারা যায়। তখন সে কান্না করতে থাকে। সে সময় এক অদ্ভুত নারী,তাকে এক সন্তান দেয়।ছেলে সন্তান, যে বর্তমানে সজল।

কিন্তুু কবিরাজ, এ বিষয়ে জানলো কী করে!এ তো বহু বছর আগের কথা।তার পক্ষে তো এসব জানা সম্ভব নয়।তবে,জানলে কী করে?

-কবিরাজ,এখন আপনি বলুন।আমার ছেলের সামনে কী বিপদ আর ও'কে কীভাবে, সেই বিপদ থেকে বাঁচাবো?( আমেনা হাত জোর করে বলে)

------

সোনালী গ্রামে যায়।সে অনেকগুলো ছেলেমেয়েকে জোগাড় করে।এরপর তাদের নিয়ে রাজবাড়িতে আসে।এসে দেখে সবুজ আর মুনি কথা বলছে।মুনি সবুজে রাগায়।যাতে সে স্বইচ্ছায়,অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে।

-আপনি করতে পারবেন না।এটা বললেই হয়।শুধু শুধু বাহানা দেওয়ার দরকারটা কী!( মুনি মুখ ভেঙচি দিয়ে বলে)

-এসব করে লাভ হবে না।আমি তোমার ফাঁদে পা দেব না।( সবুজ চলে যেতে থাকে)

-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলে, কী হয়!সবাই কত আনন্দ করবে।আপনিও একটু সবার আনন্দের কারণ, হয়ে দেখুন।দেখবেন,অনেক ভালো লাগবে।( সোনালী হেঁসে)

- ঠিক আছে,দেখি কত আনন্দ পাওয়া যায়।এই সুযোগে,আমি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবো,আর সবাইকে দেখিয়ে দেব।যে আমি কী কী করতে পারি।( সবুজ আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলে)

সবুজের এই হঠাৎ রাজি হওয়া,সকলের কাছেই স্বপ।তাদের কারো বিশ্বাসই হচ্ছে না।সবুজ এই অনেক বছর পর,কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছে।সবুজ সোনালীর কাছে যায়।তার উড়না টেনে নিয়ে,তাকে খাবার টেবিলে বসায়।এরপর শান্তাকে ঘর থেকে খাতা কলম আনতে বলে।শান্তা খাতা কলম নিয়ে আসে।সবুজ আর সোনালী মিলে নাটক লিখতে থাকে।

বাকিরা নাচ,গান আর অন্যান্য বিষয়ে নিয়ে পরিকল্পনা করে।সজলের খুব আনন্দ হয়।যে সবুজ মুনির থেকে দূরে আছে আর সে মুনির কাছে আছে।সবার পরিকল্পনার মধ্যে,দরজায় কেউ ঠকঠক করে।নীলা গিয়ে দরজা খোলে।দরজার সামনে আকাশ,আমেনা আর কবিরাজ।কবিরাজকে দেখে সোনালী গম্ভীর হয়ে যায়।

-কবিরাজ!কবিরাজ, এই বাড়িতে কী করছে?( সোনালী মনে মনে বলে)

Story Cover