প্রেমভুবনের অতসী

পর্ব - ৯

🟢

সকলে বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে। প্রাচী-আরমান-আরোহীরা এঁকে অপরের দিকে চেয়ে যা শুনছে তার বাস্তবতা যাচাই করল। ফারজাদের বাবা-মা, চাচা-চাচী, আর ফুফিরাও হতবাক। একে তো অপছন্দের অতসীকে ভালোবেসে এভাবে হাত পেতে চাইছে তার বাবা-মায়ের কাছে। আবার নিজের বিজনেসও শুরু করছে নাকি শুধুমাত্র অতসীকে বিয়ে করতে। তার বাবা-মাও এই নিয়ে কিছুই জানত না। তাদের নিজস্ব ব্যবসায় বলে কয়েও ঢুকানো যাইনি এতদিন, আর না চাকরির কথা কখনো ভেবেছে। বাবার টাকায় বেপরোয়া জীবন, আর রেইস জিতে জিতে লটারি হাতিয়ে বিলাসিতা— এসবই তো করতো। আর এখন নাকি অতসীকে বিয়ে করবে বলে নিজে ব্যবসা শুরু করছে।

তবে বিস্মিত হলেও অতসীকে এভাবে চেয়ে নেওয়ায় সন্তুষ্ট হলো তার বাবা-মা। ছেলেকে জাতে আসতে দেখে একটু যেন ভরসা পেলো। নিজেরাও চেয়ে থাকে জবাবের আশায়।

অতসীর মা অনেকক্ষণ চুপ করে একদৃষ্টে ফারজাদের দিকে চেয়ে থাকেন— কেমন হাত ধরে মিনতি করছে অতসীকে পেতে।

আর মেয়ে উনার বাহু জড়িয়ে শক্ত করে ধরে আছে, যেন ছাড়লেই কেউ নিয়ে যাবে মায়ের কাছ থেকে। তিনি বুঝতে পারছেন মেয়ে বিস্ময়, আর আতঙ্কে জমে আছে। আর ফারজাদের প্রতিটি কথার সাথে সাথে অতসীর বুকের যে কম্পন, তা অনুভব করে বেশ আন্দাজ করতে পারছেন —যে ফারজাদ যে আবদার রাখছে, মেয়ে তা চাইনা।

তিনি ঢোক গিলে স্বামীর দিকে একনজর তাকান। অতসীর বাবা নিজেও কপালে ভাঁজ ফেলে ফারজাদের কথা শুনছিল। অতসীর মা নিজের পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসা ফারজাদের দিকে চেয়ে বলতে শুরু করেন,

“এ বাড়ির সবাইকে আমি খুব ভালোবাসি ফারজাদ। তোমাদের সব ভাই বোনেদের মন থেকে স্নেহ করি বিশ্বাস করো! কখনো অতসীকে প্রিসিলা, আরোহী, প্রাচীসহ তোমার ফুফির মেয়েদের থেকে আলাদা করে দেখিনি। কিন্তু তাও আলাদা যত্ন নিতে হতো অতসীর। বুঝই তো…অসুস্থ মেয়ে আমার। আর তোমরা ছেলেরা তো আমারই ছেলে। পেটের ছেলে না হলেও একটা পুত্রসন্তান না থাকার আক্ষেপ তোমাদের দেখলেই গুছে যেত আমার।” শ্বাস টেনে বলেন, “কিন্তু শ্বশুরবাড়ির সুখ আমার কপালে ছিল না। এমন না যে জ্বালিয়েছে সবাই। কিন্তু তাও, তোমার মা-মেজ মার মতো সুখটা কোনোদিন পাইনি ফারজাদ। তোমার মা, মেজ-মার কাছে এটাই তাদের আসল বাড়ি এখন। অথচ আমার শ্বশুর বাড়িই রয়ে গেলো এত বছরেও। তাও কোনো আক্ষেপ নেই বিশ্বাস করো! সবার কপালে সব সুখ থাকেনা, এটা তো আমি জানি!” কাঁতর চোখে মেয়ে আর তার বাবার দিকে ইশারা করে বলেন, “দেখো না… আমার মেয়ে, আর আমার স্বামীর ভাগ্য! ওদের কপালে যেমন সব সুখ নেই; তেমন আমারটাও।” থেমে ঢোক গিলেন, “সেসব যাক, আমি এসব মেনে নিয়েছি অতসী, আর ওর বাবার মতো। তাই আর খারাপ লাগেনা।” পরপর ফের কাঁতর কণ্ঠে বলেন, “তবে তোমার কাছে এতটাও নিষ্ঠুরতা আশা করিনি। তুমি ওটা অতসী ছিল জেনেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো নি ফারজাদ; অতসী ছিল জেনেই। আরোহী, সামিরা, সায়রা - ওরা কেউ ছিল বুঝতে পারলে তুমি সামলে নিতে পরিস্থিতি। নিজেকে প্রশ্ন করে দেখো আমি যা বলছি ঠিক কী না! সামলে নিতে তুমি। আমার অতসী জেনেই তোমার অবচেতন মন যা ইচ্ছে তাই করতে সায় দিয়েছে, উস্কে দিয়েছে। ওটা অতসীই… ওর সাথে কিছু হলেই বা কী! এমনটাই ভেবে নিয়েছ তুমি। এমনটাই ভেবেছ ফারজাদ। আমার মেয়েকে তোমার কাছে মানুষ মনে হয়নি তখন। হাতের খেলনা যেন ও! ওর মান-সম্মান-সুস্থতা-অসুস্থতা কোনোকিছুরই মূল্য নেই তোমাদের কাছে।” কেঁদে উঠেছেন তিনি বলতে বলতে। ফারজাদ দৃষ্টি নত করে নিয়েছে শুনতে শুনতে। চাচীমণিকে থামতে দেখে নত দৃষ্টিতেই এক পলক অতসীর দিকে তাকাল সে। অতসীর চেহারায় কিছুক্ষণ আগেও যে আতঙ্কটা ছিল, এখন আর তা নেই। কিছুটা স্বস্তি দেখা যাচ্ছে তাতে। তার মানে কী চাচীমণি যা বলছে, আর যা চাইছে - সেসবই অতসীর মনের কথা?

তবে নিঃসন্ধেহে ভরা আসরে হওয়ায় ভীতু অতসীর দ্বিধা, সংকোচ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। পিনপিন নীরবতার মধ্যে চাচীমণিকে আবার মুখ খুলতে শুনে, ফারজাদ অতসী হতে নজর সরিয়ে চাচীর দিকে তাকায়। এবার তার দৃষ্টিতে স্বল্প আশঙ্কা ফুঁটে উঠল।

অতসীর মা তার দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যান হওয়ার সেই আশঙ্কা দেখে আনমনে হেসে উঠেন, নাক টেনে ফের বলতে শুরু করেন,

_”ভয় পেয়োনা ফারজাদ? তুমি আজ এই প্রস্তাব না রাখলেও আমি ঠিকই আমার অতসীর জন্য প্রস্তাব তোমার কাছে নিয়ে আসতাম। প্রত্যাখ্যান হওয়ার আশঙ্কায় ভয় পেয়োনা। তুমি তো পুরুষ মানুষ। তোমরা ধর্ষ ক হলেও মাথা উচু করে বাঁচতে পারবে, ভয় নেই।”

সকলে অতসীর মায়ের কথায় সরব হয়ে তাকাতে গিয়েও কোথাও একটু আঁটকে গেলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা দেখিয়ে দেওয়ায়। তাও ক্ষীণ আশা আছে কোথাও। ফারজাদের শঙ্কিত দুচোখে বিস্ময় আসতে আসতেই ফের নুইয়ে গেলো চাচীমণির শেষোক্ত কথার ভারে। মনে মনে সে বিভ্রান্ত, ঢোক গিলে তাকায়। চাচীমণি কী চাইছে, কী বলছে, কী করবে—তার কিছুই সে ধরতে পারছেনা। তাও মনোযোগী চিত্তে শুনতে চাইল সে,

অতসীর মা বলে,

“কারণ আমি তো মেয়ের মা। তার উপর মেয়েটা যদি প্রতিবন্ধি হয়, তাহলে আর কীই বা করবো? তুমি বলো? মেয়ের ইজ্জত হরণকারীর কাছেও মাথা নত করতে বাধ্য আমি প্রতিবন্ধি মেয়ের মা হওয়ায়। এই সমাজ আমার মেয়ের জন্য সেই শুরু থেকেই খুব নিষ্ঠুর। আর আজ যা হলো, তারপর এই সমাজ অভিশপ্ত ওর জন্য। আমি এই অভিশপ্ত সমাজে আমার মেয়েকে আগলে রাখতে পারব না আমি জানি। যেখানে পরিবারের মানুষদের কটাক্ষ, আর ঘৃণ্য সব বুলি থেকেই আগলাতে পারলাম না আজ। সেখানে কাল দশজনের মুখ কীভাবে বন্ধ করবো জানা নেই। তুমি কি চাইবে আমার কাছে! আমিই তোমার কাছে হাত জোর করছি। আমার মেয়েকে গ্রহণ করে একটু মর্যাদা দিও তুমি ফারজাদ। আমার মেয়ের বাকি সম্মানটা রক্ষা করো দয়া করে। আমার কোনো ছেলে নেই। দুদিন পর ওর বাবা, আর আমার কিছু হয়ে গেলে ওকে দেখার কেউ নেই ফারজাদ। কেউ নেই আমাদের। একটু দয়া করো আমার অতসীর ওপর।” কথাটা বলে নিজেই হাত জোর করে ফেলেন ফারজাদের সামনে। পিনপিন নীরবতায় উনার কাজে সকলের মাঝে অনুতাপ, আর অপারগতার ঢেউ বয়ে গেলো। অতসীর বাবা স্ত্রীর কথায় দ্বিমত প্রকাশ করেন।

“থামো অতসীর মা। অনেক কথা বলে ফেলেছ তুমি। এবার চুপ করো। যা হওয়ার হোক আমাদের। অতসীর ব্যবস্থা আমি করব। তোমাকে এত দুশ্চিন্তা করতে হবেনা। এখন উঠো এখান থেকে অতসীকে নিয়ে। উঠো তুমি।”

কথাগুলো বলে স্ত্রীকে নিয়ে মেয়েসহিত উঠে যেতে চান।

অতসীর মা হঠাৎ রেগে গেলো,

”আপনি কী কিছু বুঝতে পারছেন না অতসীর বাবা? আমার মেয়েটা চোখে দেখেনা। তার ওপর এসব। বাড়ির মানুষরাই দেখুন কতভাবে অপমান করছে। ওর খালাকেই দেখুন কার না কার বাচ্চা পেটে ধরেছে বলে অতসীকে আর চায় না। সেখানে বাইরের অচেনা কেউ ওকে নেবে? আর কী ব্যবস্থা করবেন আপনি ওর? স্বাধীনভাবে নিজের জীবন চালানো, কর্মজীবী মেয়ে হওয়া — এসব ঐ মেয়ের জন্য আসেনি। এঁকে তো এই অন্ধ চোখ, তার ওপর কেউ কিছু জানতে চাইলেও কোথায় সমস্যা সেটা মুখ ফুঁটে বলতে পারেনা। আজ এতকিছু হয়ে গেলো, আপনার মেয়ে একবারো কাউকে একটা জবাব দিয়েছে? ওর সাথে কী হয়েছে না হয়েছে সেসব আমরা জানতাম না তাই মুখবুজে সয়ে গেছি। কিন্তু ও এত এত অপমানজনক কথা শুনেও নিজের হয়ে কিছু বলেছে? বলেছে? যে না আমি কারো সাথে কোনো নষ্টামি করিনি। এ বাড়ির ছেলে আমার সাথে জবরদস্তি করেছে— এ কথা একবারো মুখ ফুঁটে বলতে পেরেছে আপনার এই অকর্মণ্য মেয়ে? পারে তো শুধু বাপের ছায়ায়, আর মায়ের আঁঁচলের তলে গুঁজে থাকতে বেড়ালের বাচ্চার মতো। আমরা যে সেদিনের পর থেকে হাজারবার জানতে চেয়েছি— কী সমস্যা ওর, কোথাও অসুস্থ লাগছে, কেন অসুস্থ লাগছে— হাজারবার জানতে চেয়েছি এসব। কই আপনার বাপ সোহাগি মেয়ে বাপকেও তো কিছু বলল না? আমাদেরই নিজের সাথে হওয়া অন্যায়ের কথা বলতে ভয় পায় সে। নিজের বিচার কী চাইবে?” রাগের তোপে কাপঁছে অতসীর মা। ফের বলেন,”পেলেছেন তো সেই ছোট থেকে ডিঙ্গি মেয়ে হওয়া অব্দিই সোহাগে আহ্লাদে। কেউ একটা ফুলের ঠোকা দিলেও সে নেতিয়ে যায়। বিপরীতে পারেনা টু শব্দ করতে। যেন কে পাথর মেরেছে তাকে। এঁকে দিয়ে আপনি কী ব্যবস্থা করবেন আমাকে বোঝান, আমিও দেখতে চাই। আর সাথে এর পেটে আপনাদের জাতের আরেকটা যে আসছে রক্ত? ওটারও কী ব্যবস্থা করবেন আমাকে বলুন দেখি, আমি শুনি।”

অতসীর মা উঠে দাড়িয়ে গিয়েছিল। আর অতসী তখনও একা সোফায় বসে মায়ের আঁঁচল পেছন থেকে একহাতে খামচে ধরে ছিল, যেন দূরে চলে না যায়, আর সে একা না হয়ে পড়ে। কিন্তু মায়ের কথাগুলো শুনে অভিমানে ছেড়ে দিল। নত মাথায় হাতে সোফার বেড খামচে বসে থাকল একা, ঢোক গিলতেই চোখের কোণ বেয়ে অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ে।

ফারজাদ তখন চাচীমণির শুরু থেকে সব কথা শুনে পাথর বনে বসে আছে। চাচ্চু আর চাচীমণি পরিবারের সকলের প্রতি একরাশ নীরব অভিমান পুষে রেখেছে এতকাল ধরে, তা কেউ কখনো বুঝতে পারেনি। আজ ফারজাদের সুবাধে প্রত্যেকে জানতে পারল। কিন্তু চাচীমণির কথাগুলো শুনে ফারজাদের এই মুহূর্তে নিজের প্রতি ভীষণ ঘৃণা লাগছে। সেই শুরুর দিকে যেমনটা হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে কমে আসছিল। আজ ফের নিজেকে সমাজের নিম্নস্তরের এক কীট অনুভব করল। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস টেনে খুলতেই অতসীর বিষয়টা চোখে পড়ে; নরম দৃষ্টিতে লক্ষ্য করল অতসীর নীরব অভিমান।

অতসীর মা সরাসরি আঙ্গুল না তুললেও; তার প্রতিটি কথায় যেন একেকটা অভিযোগ প্রকাশ পেলো শ্বশুর বাড়ির লোকেদের প্রতি, আর মেয়ের প্রতি। নিজের মেয়ের এই অতিমাত্রায় নীরবতার স্বভাবে নিজের ওপরই ভীষণ রাগ লাগছে তার।

মেয়ে আর মেয়ের বাবার ওপর শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকের প্রতি জন্ম নেওয়া ক্ষোভটা ঝেড়ে দিলেন তিনি। আর সকলে তা ধরতেও পারল।

“এসব কথা বাড়িতে গিয়ে বলতে পারবে অস্মিতা। এখন মেয়েকে ধরো। এখান থেকে চলো আমার সাথে।” অতসীর বাবা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফারিশ মহল থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছেন। স্ত্রীর মনের সব চিন্তা তিনি বুঝতে পারছেন। তবে সেসব তিনি একা শুনতে চান। এখানে সবার মাঝে নয়, আর সেটা ধমকবিহীন শক্তভাবে বোঝাতে নাম ধরে ডাকলেন।

“আমি এখান থেকে সমাধান না নিয়ে এক পাও নড়ব না। আমাকে জবাব দিন আগে।”

“অস্মিতা, শুনো। এখন এসব কথা রাখো। অতসী দূর্বল এখনো। কিছুক্ষণ আগেই তো হাসপাতাল থেকে ফিরলে। ওকে একটু সবটা মাথায় প্রসেস করতে দাও। একটু সময় দাও ওকে। আর তোমরাও সময় নাও। তারপর শান্ত মাথায় সবাই সমাধানে বসতে পারবে।” নিবিড়ের বাবার কথায় নিবিড় চোখ তুলে তাকায়। চোয়াল তার শক্ত, আর চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে।

“এখানে সমাধান বলতে তোমরা কী বুঝাচ্ছ? অতসীকে এই ছেলেটার কাছে তুলে দেওয়া? এটাই বোঝাতে চাইছ সমাধানের মানে? আর খালামণি! মায়ের কথা খুব ধরে বসে আছ, আমি যে এখনো আজ রাতেই আমাদের এনগেজমেন্ট হোক চাইছি— এটা কী শুনতে পাওনি?”

নিবিড়ের মা বোন তার কথায় কষ্ট পেয়েছে বুঝে কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে ছিলেন। কিন্তু নিবিড়ের কথায় সরব, আর শঙ্কিত চোখে তাকায়।

অতসীর মা বলে,“তো বলছিস আমি তোকে নিজের ধ র্ষিতা মেয়ের সাথে বিয়ে দিই? বাচ্চাসহ নিজের মেয়েকে আমার বোনের গলায় ঝুলিয়ে দিই। কেন? ওদের রক্ত সব। যা আসছে, যাতে কলঙ্ক লাগিয়েছে—সব তো ওদের রক্ত। ওদের গলায় ঝুলুক না। তোর সাথে বিয়ে দেবো। বাচ্চা নিয়ে কাড়াকাড়ি হবে। এত কাহিনী কে করবে? তোদের সাথে তখন এদের ঝামেলা শুরু হবে, সম্পর্কে স্বাভাবিকতা বদলাবে। এত কাহিনীতে আমি কোথায় গিয়ে একটু শান্তি পাবো বল?”

পরপর তার মায়েরও অসম্মতি পেলো সে। অতসীর খালা বোনের ভেতর একটা সুপ্ত অভিমানের বীজ পুতে দিয়ে ফেলেছে তা বুঝতে পারছে, আর অবশ্যই তা কাঁঁটাতে চান। কারণ বোন আর বোনজিকে ভালোবাসেন। কিন্তু নিবিড়ের সাথে আর অতসীর বিয়ে কোনোভাবে চান না। নিবিড়ের বাবা তার মাকে শান্ত হতে বলে। ভরা আসরে মা-ছেলের এসব নিয়ে আলোচনা শোভা পায়না। মায়ের সাথে কিছু তর্ক করে বিক্ষিপ্ত মেজাজে নিবিড় বেরিয়ে গেলো ফারিশ মহল থেকে।

ফারজাদ নজর ঘুরিয়ে সবার দিকে তাকায়। তার মা আঁঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদছে সেই শুরু থেকে, মেজ মা তাকে ধরে রেখেছে। বাবা আর মেজ চাচার দৃষ্টি নুইয়ে আছে ছেলের, আর নিজেদের অপরাধের ভারে।

আপাদত ফারজাদ আর কিছু বলতে চায় না সবার মাঝে। চাচীমণি আর চাচ্চুর একেকটা দুশ্চিন্তা তাদের ভাবনাসীমার বাইরে। তাই শান্ত নেই তাদের ভেতরটা। একটু সময় গড়ালে কিছুটা হলেও সহজ হতে পারে। এই মুহূর্তে সবার বিক্ষিপ্ত মনের অবস্থায় আর কথা বাড়ানো উচিত হবেনা।

সে নিবিড়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকায় কিছুটা সরব চোখে।

অতসীর বাবা স্ত্রীকে বুঝিয়ে সুজিয়ে মেয়েকে নিয়ে উঠতে চাইছেন।

আর উনার ভাই বোনেরা অসহায়, আর অনুতাপের দৃষ্টিতে শুধু দেখছেন। কিছু বলতেও যেন কোথাও বাঁধছে।

শেষে ফারজাদের দাদী দূর্বল গলায় মুখ খুলল, “ছোট খোকা, একটু সময় নে তোরা। দয়া করে একটু সময় নে। আমি এখনো কী হচ্ছে না হচ্ছে এ বাড়িতে— তার কিছুই মাথায় ঢুকাতে পারছিনা। কী থেকে কী হয়ে গেলো! বড় খোকা, মেজ খোকা, একটু বোঝা না তোদের ভাইকে… রাগ করছে আমার ছেলেটা।” আহাজারি, আর অসহায়ত্ব তার কণ্ঠে, ফারজাদের মেজ-মা, আর প্রাচী-আরোহী এসে তাদের দাদীকে সামলাচ্ছে। বৃদ্ধা থামছেন না, সোফার বেডে মাথা এলিয়ে ফের বলে, “একটু সময় নে তোরা সবাই। দয়া কর আমার ওপর। অতসী দিদিভাইয়ের শরীর ভালো নেই, দেখ কেমন ঝিমিয়ে গেছে। সমস্যা, সমাধান— সব পরে বের করিস। ওকে একটু কেউ পানি দে।” অতসীর চোখ বুঝে আসছিল তখন। বলতে দেরি নেই, সোফার মধ্যেই গড়িয়ে পাশে পরে যেতে নিলো সে।

সবাই বিচলিত হয়ে পড়ে। ফারজাদই পাশ থেকে তাকে পরে যেতে দেখে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এলো, নেতিয়ে যাওয়া শরীরটার বাহু ধরে উঠিয়ে, গালে হাত দিয়ে নিজের সাথে আগলে নিতে চায়। ওমনি অতসীর আধো আধো গলায় ক্ষীণ কণ্ঠ কানে আসে,

“ছু ছুবেন না আমায়।”

প্রেমভুবনের অতসী পর্ব ৯ গল্পের ছবি