প্রিসিলার ভাইয়েরা বসার ঘরে তার দেবরদের সাথে গল্প গুজব করছে। আর সে বাড়ির বাইরে বোনেদের নিয়ে ঘুরছে। বাড়ির ভেতরটা যেমন চমৎকার, বাইরের চারদিকটাও তেমন চোখ ধাধানো। বাগানের দিকের সিটিং লন, শিকলের বড় দোলনা, পুলসহ আরও অনেক কিছু চোখে পড়ার মতো। তারা ঘুরেঘুরে ওসব দেখছিল, আর নানান ভঙ্গিমায় ছবি তুলছিল।
এর মধ্যে হঠাৎ গেট দিয়ে ফারজাদকে দেখা যায় বাইক নিয়ে ভেতরে ঢুকতে। পুরুষটির মোহনীয় রুপ, আর সুঠাম দেহ সর্বদা আকর্ষণীয়। শক্ত পেশিযুক্ত হাতে বাইকের হ্যান্ডেল চেপে ধরায় তা প্রলুব্ধিময় দেখাচ্ছে বেশ, কালো শার্টের বুকের দিকে কিছু বোতাম খোলা। কিন্তু মুগ্ধ নয়নে তা বেশিক্ষণ দেখার ফুরসত পেলো না কেউ।
কারণ তার পেছনে বাইকে জুবুতুবু হয়ে বসে আছে অতসী। ফারজাদের পেছন থেকে শাঁর্টের এককোণা শক্ত করে খামচে ধরা, অন্য হাত পেট জড়িয়ে তার পিঠেই মুখটা একপাশ করে লাগিয়ে দিয়ে চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে আছে। অতসী প্রথমবার বাইকে চড়েছে, তাই প্যানিক করছে তা স্পষ্ট। কিন্তু ফারজাদের সাথে অতসী… অবাক কাণ্ড!
প্রত্যেকে ভুত দেখার মতো চমকে তাকিয়ে রইলো। বাইক থামালে লুকিং গ্লাস ঠিক করে তাতে নজর ফেলে ফারজাদ, চোখে কালো সানগ্লাস। ওটা খুলে চুলের ভাঁজে হাত বোলায়, নিজের পেছনে জড়োসড়ো হয়ে তাকে ধরে বসে থাকা অতসীকে মনোযোগী নয়নে চেয়ে বলে,
“এসে পড়েছি অতসীরাণী। চোখ খুলো।”
অতসী সেই আওয়াজে ধাতস্ত হয়। কিন্তু নামতে পারেনা একা। কোনদিক থেকে, কীভাবে নামবে - কিছুই টাহর করতে পারেনা। দ্বিধা, সংকোচে তখনও আঁকড়ে ধরে আছে ফারজাদকে।
ফারজাদ অবশ্য তাকে নামতে বলেওনি; বলেছে চোখ খুলতে। সে নিজেই হেলমেট রেখে কায়দা করে নেমে গিয়ে অতসীকে কোমর আগলে নামায়, একরাশ সাবধানতা আর যত্ন সেই স্পর্শে। যা কারো চোখ এড়িয়ে যায় না।
অতসী নেমে ধাতস্ত হয়। তবে কোথায়, আর কেমন পরিবেশে আছে টাহর করতে না পারায় ফারজাদকে ছাড়েনা। আগ বাড়িয়ে চলতে গিয়ে কোনো অঘটন না ঘটিয়ে ফেলে।
কিন্তু ভয়ও কাজ করছে মনের ভেতর। সে এভাবে ধরেছে বলে কখন না আবার ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দেয় ফারজাদ। নতুন তো না এমনটা। সে নিজের মতো চলতে ফিরতে গিয়ে কখনো ফারজাদের সামনে পরলে, সে প্রতিবার ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিতো। নাক ছিটকে তার সামনে বা আশেপাশে আসতে মানা করে দিতো।
আজও কোথাও তেমনটাই না করে এই অচেনা পরিবেশে!
তবে ফারজাদ তার মনের সেই সুপ্ত আতঙ্ক ভুল প্রমাণিত করলো। বাইকে উঠার আগে অতসীর গাঁঁয়ে গুছিয়ে পেঁচিয়ে দেওয়া ওড়নাটা খুলে সুন্দরমতো গাঁঁয়ে জড়িয়ে দিল। অতসী ওড়নাই হাত দিয়েছে বুঝে একটু দূরে সরে যেতে চেয়েছে অবশ্য, কিন্তু সে হাত ধরে কাছেই দাড় করিয়ে কাজটা সেরে নিলো। বাতাসে এলোমেলো হওয়া চুল কপাল থেকে সরিয়ে দিল। তারপর অতসীকে নিয়ে হাত ধরে এগোয় সে।
প্রিসিলাসহ বাকিরা হতবাক নেত্রে সবটা দেখছিল। ফারজাদ এতটা সাবধানে, নিখুঁতভাবে কেন সঙ্গে করে নিয়ে আসছে অতসীকে? চোখদুটোতে, আর প্রতিটি পদক্ষেপে একরাশ যত্ন স্পষ্ট।
আরোহী প্রাচীর দিকে ফিরে তাকাল। প্রাচী সবটা দেখলেও অতকিছু মনে আনল না। অতসী এসেছে এতেই খুশি।
প্রিসিলা আনন্দে ছুটে গেলো। সে যেতেই আরোহীর পাশে এসে ফারজাদের মামাতো বোন কায়রা জিজ্ঞেস করলো,
“আরোহী! ফারজাদ ভাইয়া না শুনেছিলাম অতসী মেয়েটাকে… আই মিন, তোমার বোনকে দেখতে পারেনা তেমন একটা? একবার নাকি ধাক্কা দিয়ে কপাল ফাটিয়ে দিয়েছিল। এখন ওদের মধ্যে ভাব হয়ে গেছে?”
“হ্যাঁ, তেমনটাই তো শুনেছিলাম। তোমাদের বাড়িতে কতো কাহিনী নাকি হলো সেবার ফারজাদ ভাইয়া ওমন করায়। এখন ওদের মধ্যে সব ঠিক হয়ে গেছে? জানতাম না তো!”
আগ্রহ, আর কৌতূহল নিয়ে জানতে চায় ফারজাদের দুই মামাতো বোন।
আরোহী কোনো জবাব দিল না। সে তখনও বিস্মিত নয়নে তাদের একসাথে আসার দৃশ্যখানা দেখে যায়।
“ভাইয়া? তোমরা একসাথে? অতসীকে কোথায় পেলে?” অতসীর পাশে এসে সে তাকে জড়িয়ে ধরে প্রিসিলা, পরপর ভাইকে উদ্দেশ্য করে বলে, “বাকিদের সাথে এলো না যে? আমি তো তুমিও আর আসবেনা ভেবেছিলাম। যাক, অবশেষে দুজনেই এলে। ভেতরে এসো…” উচ্ছাসিত হয়ে কথাগুলো বলে প্রিসিলা ভাই আর বোনকে নিয়ে ভেতরে যায়। বাকিরাও ঢুকে গেলো তাদের পরপর।
প্রত্যেকেই বিস্মিত; চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তা। ভেতরে আরমানরাও ওদের একসাথে আসতে দেখে একইভাবে চমকিত হলো। তবে প্রিসিলার শ্বশুর বাড়ি হওয়ায়, সবার সামনে তেমন কিছু জিজ্ঞেস করেনা কেউ।
এরপর সময়টা খুব ভালো কাটল। সবাই মিলে মজা, ঠাট্টা, হইহল্লর - সব শেষে বাড়ি ফেরার সময় হয়। প্রিসিলা আর তার শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকের কাছে বিদায় নিয়ে তারা সবাই ফিরে যায়। অতসীকেও নিজেদের সাথে ফারিশ মহল নিয়ে গেল। ফারজাদ আবার তাকে নিজের সাথে বাইকে না টানে! এজন্য তার থেকে দূরে দূরে থাকছিল অতসী। প্রাচীকে বলে সব মেয়েদের মাঝে এক কোণে গিয়ে আসন নিয়েছিল। ফারজাদ অতো মেয়েদের মধ্যে নিশ্চয় আসবেনা!
আর ফেরার সময়ে আরমানকে বারবার অনুরোধ করছিল যেন তাকে বাড়ি ফিরতে সময় নিজেদের সাথে গাড়িতে নেয়। শেষমেশ অতসীর ইচ্ছেই ফলেছে। তবে ফারজাদকে রুষ্ট দেখাল তার এই কাজে। যদিও অতসী সেসব দেখতে পায়নি, আর না দেখার ক্ষমতা আছে তার। তবে ফারজাদের দৃঢ় চোয়াল, আর শক্ত পেশী দেখে অন্যদের বুঝে যাওয়ার কথা। কিন্তু নিজেদের খেয়ালে থাকায় দেখল না কেউ।
অতসী সবার সাথে গাড়িতে উঠতেই সে চাবি নিয়ে বাইক টান দেয়।
____
অতসীর খালার বাড়িতে তখন ওকে নিয়ে ভেতরে গিয়েছিল ফারজাদ। অতসীর খালা আর তার দুই মেয়ে নয়নিকা, নম্রতা ছাড়া কেউ ছিল না বাড়িতে তখন। অতসীর খালাকে বলে ওকে নিয়ে এসেছে নিজের সাথে। হঠাৎ ফারজাদের আগমনে অতসীর খালা অবাক হয়েছিল খুব। কিন্তু ফারজাদ যেহেতু অতসীর ভাই হয়, তাই আর মানা করেনি। যদিও আগের সব কেচ্ছা জানা অতসীর খালার। কিন্তু শত হোক, তারা ভাই বোন। বোনের শ্বশুর বাড়ি যেতে মানা করতে পারেনা সরাসরি। এখন অতসীর খালাতো ভাই নিবিড় বাড়ি এসে এসব শুনে মাথা গরম করে বসে আছে,
“তোমার কী একবারের জন্য আমাকে জানানো দরকার মনে হয়নি মা? ঐ ফারজাদ বললো আর পাঠিয়ে দিলে সাথে। তুমি কি জানো না অতসী ফারজাদকে কতটা ভয় পায়? ফারিশদের কেউ কেউ অতসীকে পছন্দ করেনা, যার মধ্যে সর্বপ্রথম এই ফারজাদ। তাও তুমি এভাবে ওকে একা ছেড়ে দিলে, তাও বাইকে। আমি জাস্ট অবাক হচ্ছি মা, এতটা বোকামি কীভাবে করতে পারো তুমি?” প্রচণ্ড বিরক্তি আর রাগ নিবিড়ের কণ্ঠে।
“আচ্ছা, তুই একটু শান্ত হ। যতই অপছন্দ হোক, অতসী তো ওর বোন তাইনা? নিশ্চয় দেখে রাখবে। এবার একটু শান্ত হ নিবিড়।” তার বাবা কথাটা বললো ছেলেকে শান্ত করতে।
“তুমি বুঝতে পারছো না বাবা, ফারজাদ ছেলেটা আস্ত একটা মেশিন। ঐ অনুভূতিহীন ছেলেটা অতসীর খেয়াল রাখবে? ওর সাথে আমাদের অতসীকে একা পাঠিয়ে দিলে। বাইকে অতো পথ কীভাবে যাবে ও? আর নামবে কীভাবে বলতে পারো?” নিবিড় চোখ মুখ কুচকে ফেলে বলতে বলতে।
তার বাবা মা আরও কিছু বুঝাতে লাগল। কিন্তু সে নিজের রুমে চলে যায় রাগ, ক্ষোভ নিয়ে। অতসীকে নিবিড় পছন্দ করে এ কথা তাদের জানা। তাই এমন ব্যবহারে কেউ অবাক হলো না।
____
সবার সাথে ফারিশমহল ফিরলে, অতসীকে দেখে তার দাদী-ফারজাদের মা-চাচী সবাই খুব খুশি হয়। অতসীর মা তাকে দেখে দ্রুত কাছে এগিয়ে আসে।
গালে হাত রেখে কপাল হতে চুল সরিয়ে দিতে দিতে বলে,
“অতসী, তুই প্রিসিলার শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিলি ওদের সাথে? কই আমাকে বা তোর বাবাকে জানালি না তো মা? কার সাথে গেছিস ওখানে? নিবিড় নিয়ে গেছিল?”
মায়ের প্রশ্নে অতসী নরম কণ্ঠে জবাব দেয়,
“না মা, নিবিড় ভাইয়ার সাথে যাই নি।”
“তাহলে কার সাথে গেলি মা?” ভ্রু কুঞ্চিত করে জানতে চায় তার মা।
প্রাচী পেছন থেকে বলে,
“আমার ভাইয়াকে নিয়ে আসতে দেখলাম চাচী।”
“মানে? ফারজাদের সাথে!” কপালে ভাঁজ পড়লো অতসীর মায়ের। সাথে বাড়ির বাকিদেরও মনোযোগ এদিকে চলে আসে।
আরমান বলে,
“কিছুই বুঝতে পারিনি চাচী, ফারজাদ ভাই বলেছিল বাইক নিয়ে যাবে। তাই আমরা গাড়ি নিয়ে নিশ্চিন্তে চলে গেলাম। ওখানে পৌঁছে অনেকক্ষণ হয়ে গেলেও দেখি ফারজাদ ভাই আসে না। আর অতসী তো আসবে না ধরেই নিয়েছিলাম। কিন্তু নাস্তা পানি খেয়ে যখন সবাই বসি গল্প গুজবে। তখন হঠাৎ দেখি দরজা দিয়ে অতসী প্রবেশ করছে প্রিসিলার সাথে। পেছন পেছন ফারজাদ ভাই।”
এরপর আরোহী বলে উঠে,
“শুধু তাই না, অতসী ফারজাদ ভাইয়ের সাথে বাইকে চড়ে গেছিল। এমনিতে ঠিকঠাক হাঁটতেও পারেনা চোখ দুটো নিয়ে। আবার বাইকেও চড়ারও শখ তার। বুঝো না নাটক!!” শেষ কথাটা নিম্নস্বরেই বললো। তবে কেউ শুনলনা। কিন্তু তাও তার কথায় খোঁচা স্পষ্ট। অতসীর খারাপ লাগলো। সে মাথা নত করে দাড়িয়ে থাকে।
“অতসী… ফারজাদ তোকে কোথায় পেলো? তুই তো তোর খালার বাড়ি ছিলি। ওখান থেকে নিয়ে এসেছে তোকে।” কণ্ঠে সন্ধেহ আর অনুসন্ধান স্পষ্ট বড় ফুফির।
অতসী নত মাথাটা স্বল্প নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
কেউ একজন বললো, “হঠাৎ ফারজাদ কেন অতসীকে এত জরুরী মনে করে আনতে গেলো? যেখানে ওকে দুচোখেই সহ্য করতে পারেনা… বুঝলাম না ঠিক।” এমন নানান সন্ধেহপ্রবণ কথা বললো ফারজাদের ফুঁফি, মামী, খালারা কেউ কেউ। অতসী মাকে খামচে ধরে দাড়িয়ে আছে। ভালো লাগছেনা তার এসব জবাবদিহিতা।
নাতনির কোমল ভয়ার্ত চেহারা দেখে দাদী সবাইকে চুপ করিয়ে দেন আওয়াজ তুলে,
_“সবাই থামো। হঠাৎ ফারজাদ অতসীকে কেন নিতে গেলো সে প্রশ্ন ফারজাদকেই করো যাদের যাদের মনে এত সন্ধেহ আছে। অতসীকে যেন এই নিয়ে আর একটাও প্রশ্ন করা না হয়। ছোট বউমা…” শাশুড়ির ডাকে অতসীর মা ফিরে তাকান।
_“দিদিভাইকে নিয়ে উপরে যাও। তাকে নরম সরম পোশাক পরিয়ে দাও। এসব ভারি কাপড়ে অস্বস্তি হবে অতসীর। যাও… ওর বাবা, চাচারা চলে আসবে এখন। এসে ওকে সবাই মিলে এত জেরা করছ দেখলে রেগে যাবে। তখন আরেক ঝমেলা, যাও তাড়াতাড়ি দিদিভাইকে নিয়ে।”
তারপর বাকিদের উদ্দেশ্যে বলেন,
_“বাকিরাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও, আর এই নিয়ে অতসীকে যেন কোনো প্রশ্ন করা না হয়।”
কিন্তু কথাটা বলে জিরোতে না জিরোতেই বাইরে থেকে ফারজাদকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা গেল। হাতে বাইকের চাবি। নিজের মতো প্রবেশ করছে ফারজাদ, আশেপাশে চোখ নেই তার। তার নিঃশব্দে ভারী পায়ের চলন অদ্ভুদ এক নীরবতা তৈরি করলো সবার মাঝে।
হঠাৎ আগমনে সবাই তাকে দেখে চলে যেতে গিয়েও থেমে গেল। কারো মুগ্ধ কিংবা কৌতূহলী দৃষ্টি তার উপর নিবদ্ধ হয়। ফারজাদ সবার মাঝে নিরুত্তাপভাবে চলতে গিয়ে পরিচিত সেই সুভাষ নাকে ঠেকতেই হঠাৎ থেমে যায়। দু সেকেন্ড চলা থামিয়ে দাড়ায়। ঘাড় ফিরিয়ে বা পাশে নজর ফেলে।
অতসী অনুদ্দেশ্যে দৃষ্টি ফেলে মাকে ধরে দাড়িয়ে আছে। যে জানেনা সবাই হঠাৎ চুপ মেরে গেল কেন। কৌতূহল ছিল, কিন্তু ফারজাদের মতো, নিজেও সেই পরিচিত ঘ্রাণ পেলো নাকে। মাকে ধরা হাতটার স্পর্শ গাঁঢ় হলো। ঢোক গিলে সে।
অতসী বুঝতে পারছে ফারজাদ ভাই তখনো উপস্থিত তার আশেপাশে। কেন জানি, তার দিকেই চেয়ে আছে মনে হচ্ছে। ভেবে অস্বস্তি হলো তার। চোখের মণি এদিক ওদিক ঘুরিয়ে সংযতভাবে শ্বাস নেয় সামলানোর প্রয়াসে।
ফারজাদ মদ্যপ নয়নে সবটা দেখল। সেদিনও তো পিচ্চি ছিল দেখতে। উঠতি বয়সের হওয়ায় অল্প স্বল্প শরীর এসেছিল। আজ সবটা পরিপূর্ণ লাগছে তার ছোঁয়ায়। টানটান মেয়েলী নরম কায়াটায় আনমনে চোখ বুলিয়ে ঐ অবস্থাতেই ঘেমে উঠল ফারজাদ। ঢোক গিলে নজর সরিয়ে পা বাড়ায় সামনে। একধাপ একধাপ সিঁড়ি পার করে মুহূর্তেই চলে গেল উপরে।
ফারজাদের সব কাণ্ড উপস্থিত প্রত্যেকের চোখে পড়লো। কিন্তু আগে যেমন পছন্দ করতনা। ধরে নিলো আজও অতসীর উপস্থিতিতে বিরক্ত বলেই এমন তির্যক নয়ন ফেলে দেখেছে তাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যায় যে যার যার মতো। যদিও কারো কারো চোখে অন্যকিছু বলে মনে হয়েছে। তবু অতসীর প্রতি ফারজাদের আগের ব্যবহার মনে করে নিজেদের ধারণা ভুল ভেবে উড়িয়ে দিলো।
____
অতসীরা এ বাড়িতে না থাকলেও, তাদের জন্য আগের রুমগুলো বরাদ্দ আছে। অতসী তখন পোশাক পরিবর্তন করে হাত মুখ ধুয়ে রুমের ব্যাল্কনিতে বসেছে। রাত হলেও আভিজাত্যে মুড়ানো ফারিশ মহলের চারপাশটা নিয়ন আলোয় ঝলঝল করছে। যদিও এসব আলো দেখার সৌভাগ্য অতসীর নেই। সে নিরবে ব্যাল্কনিতে বসে বসে গুণগুণ করে গান গাঁইতে থাকে। কিছুসময় পর ফোনটা বেজে উঠলো। কে ফোন দিয়েছে দেখতে পারেনা সে। অভ্যাস অনুযায়ী আন্দাজে রিসিভ করে কানে ধরল সে। ওমনি এক পুরুষ কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো ওপাশ থেকে,
_“অতসী?”
নিবিড় ভাইয়ার কণ্ঠ তা অতসী বুঝল। সে জবাব দেয়,
“হ্যাঁ ভাইয়া… আমি বলছি। কেমন আছ তুমি?”
নিবিড় গাঢ় শ্বাস টেনে বলে,
“আমি ভালো আছি। তুই এখন কোথায়? ফারজাদের সাথে চলে গেলি একবারও আমাকে বলার প্রয়োজন মনে করলি না?”
অতসী মুখ অন্ধকার করে বলে,
“আমি আর কীভাবে মানা করতাম? খালামনিই তো উনাকে অনুমতি দিয়ে দিলো আমাকে নিয়ে আসার।”
উনি বলতে ফারজাদকে বুঝিয়েছে তা বুঝল নিবিড়। অজান্তে চোয়াল শক্ত হয় তার। তবে অতসীকে কিছু বলল না এই নিয়ে,
“ঠিকঠাক যেতে পেরেছিলি? ফারজাদ কিছু করেনি তো?”
“না ভাইয়া, ভালোভাবেই পৌঁছেছি।”
“প্রথমবার বাইকে চড়েছিস ফারজাদের সাথে। অথচ আমি এতবার অনুরোধ করার পরও আমার সাথে কোনোদিন উঠলিনা।”
“তুমি তো জানো আমি বাইকে ভয় পাই। কিছু দেখতে পাইনা। কীভাবে বসব, আর নামবই বা কীভাবে -তার ঠিক নেই। তাই ভয় করে আরকি। রাগ করছ কেন ভাইয়া!”
“আমি কী তোকে সেইফলি বসতে বা নামতে হেল্প করবো বলিনি কখনো?”
“ভাইয়াআআ…” একটু টেনে বলে সে, “তুমি প্লিজ রাগ করো না। আমার সত্যি ভয় করে এটা তো তুমিই সবচেয়ে ভালো জানো।”
“আর ফারজাদের সাথে উঠলে ভয় করেনা?”
অতসী হতাশ কণ্ঠে বলে, “আমি আর কী করতাম? উনি নিজেই আমাকে ধরে ঠিকভাবে বসিয়ে দিলেন, তারপর আমার হাত দুটো সামনে এনে ঝাপটে ধরতে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর আবার নামিয়েও দিলেন আমাকে ধরে, সুন্দর ভাবে। আমার তাই ভয় করেনি তেমন একটা। উনি আস্তে আস্তে চালিয়েছেন বাইক। তবে মাঝরাস্তায় একটু ভয় লেগেছিল প্রথমবার হওয়ায়। ফারজাদ ভাইয়া আরও আস্তে চালিয়ে একহাতে আমাকে ধরে রেখেছিলেন। তাই ভালোই…” সাথে সাথে ওপাশ থেকে ফোন কেটে গেল। অতসী টুট টুট শব্দ শুনে তা বুঝল। কিন্তু অবাক হয় অকস্মাৎ ফোন কেটে দেওয়ায়।
“আশ্চর্য!! কেটে দিলো কেন?”
“জেলাস…” আনমনে কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে পুরুষালি কোনো কণ্ঠের গমগমে আওয়াজটি পেলো অতসী। আতকে উঠে সে।
“কে? কে বলছেন?” সাথে সাথে উত্তর এলো না ফারজাদের। ব্যাল্কনিতে একটা বেঞ্চি আছে, যেখানে অতসী বসে আছে। আর ফারজাদ ব্যাল্কনির দরজায় হেলান দিয়ে আকর্ষণীয় কায়দায় দাড়িয়ে আছে পকেটে হাঁত গুঁজে। ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট। মাত্রই আগুন ধরিয়েছে সেটাতে। তাই সিগারেটের গন্ধের দরুন ফারজাদের ঘ্রাণ চিনতে পারে নি অতসী।
ফারজাদ কয়েক টান দিয়ে ব্যাল্কনির রেলিং এর কাছে এগিয়ে কোথাও ছুড়ে ফেলল সিগারেটটা। পরপর মাউথ ফ্রেশ্নার মুখে পুরে।
এরমধ্যে আতঙ্কিত অতসী বেশ কয়েকবার ‘কে কে’ শব্দ করে কে এসেছে জানতে চেয়েছে। মুখ ফ্রেশ করে সিগারেটের গন্ধ দূর করে তবেই অতসীর কাছে এগিয়ে গেলো ফারজাদ। বসে থাকা অতসীর পেছনে গিয়ে মাথা নামিয়ে তার কাঁধ বরাবর আনে। হাত দুটো নিজের পেছনে। অতসীর পেছনে দাড়িয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে-