প্রিসিলার বিয়ের অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে সে শ্বশুরবাড়ি অবস্থান করছে। ফারিশ মহলে সে আর নেই এখন। বিয়ে বাড়ির সব অতিথিরাসহ বাড়ির গুরুজনেরা খুব তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে। যদিও বেশির ভাগ অতিথি চলে গেছে কালই। কিন্তু কাছের মানুষগুলো আছে। যেমন ফারজাদের দুই ফুফির পরিবার, তিন মামা আর এক খালার পরিবার - তারা সবাই আছে নিজেদের ছেলেমেয়েসমেত। বড়রা তাড়াতাড়িই উঠে পড়েছে। ছেলে মেয়েরা বেলা অব্দি ঘুমাল। তাও বেশি বেলা গড়াতে দেওয়া হয়নি। দশটার দিকেই প্রত্যেককে ডেকে ডেকে তোলা হলো। প্রিসিলার শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে।
মেয়েগুলোর একেকটার তৈরি হতে হতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যায়। তাই বিশেষ করে তাদের খুব তাড়াহুড়ো লাগিয়ে জাগিয়ে দেওয়া হলো।
ঘুম থেকে উঠে তখন সবাই ডাইনিং এ নাস্তা করছে। ফারজাদ, তার বোন প্রাচী, বড় ফুফির ছেলেমেয়ে - সাদমান, সায়রা, আদনান। ছোট ফুফির এক মেয়ে সামিরা। আর ফারজাদের মেজ চাচ্চুর ছেলেমেয়ে আরমান, আরোহী-সহ ফারজাদের মামা, খালাদের ছেলেমেয়েরাও আছে। খেতে খেতে আরমান ফোনে কিছু একটা করছিল। নাখোশভাব তার চেহারায়। গলা উচিয়ে ছোট চাচীকে, অর্থাৎ অতসীর মাকে ডাক দেয় সে,
“চাচিমণি, চাচিমণি…” অতসীর মা রান্নাঘর থেকে এলো হাতে চামচ নিয়ে। রান্না করছিলেন কিছু। এসে আরমানকে শুধান,
“কি হয়েছে আরমান? কিছু লাগবে তোর? পরোটা আরও দুটো দেবো?”
“আরে রাখো তো পরোটা। তোমার মেয়ের ঘটে এত কুবুদ্ধি এলো কবে থেকে সেটা জানাও আগে।”
কথার মানে বুঝতে না পেরে আঁচল দিয়ে কপাল মুছে অতসীর মা বলেন,
“কি বলছিস? আমার অতসী আবার কি করলো?”
“কি করেছে জিজ্ঞেস করছ? কাল বলেছিলাম আজ সকালে আমি নিতে যাবো। মেনে নিলো। কিছুক্ষণ পর আবার নিজে ফোন দিয়ে জানালো তার নিবিড় ভাইয়ার সাথে চলে আসবে সে। আমি যেন কষ্ট করে আর না যাই। আমিও ভাবলাম সত্যি সত্যি আসবে। তাই আর যেতে হবেনা ভাবলাম। এখন দেখছি তোমার মেয়ের ফোন বন্ধ। এই মেয়ে তো আচ্ছা দরিবাজ বের হলো। ফোন বন্ধ করে রেখেছে যেন আজও আসতে না হয়। এত একঘুয়ে মেয়ে কিভাবে উৎপাদন করলে বলো তো চাচীমণি?”
ডাইনিং এ প্রত্যেকে আছে। অল্প হাসির রোল পড়লো শেষ কথায়।
ফারজাদ ও আছে, কফিতে অল্প স্বল্প চুমুক দিতে দিতে বসে আছে সে। সবার মতো হাসল না। না চোখ তুলে তাকাল। নির্লিপ্তে চুমুক দিতে লাগলো শুরুর ন্যায়।
“কই, এত কিছু তো আমায় জানায়নি অতসী। না বলেছে যে আজ ওর আসার কথা ছিল।” কপালে ভাজ ফেলে বলেন অতসীর মা।
“চুরনি মিথ্যা বলেছে তাই তোমায় জানায়নি। একবার পাই। কালও বিয়েতে থাকল না। আজও আমরা সবাই যাবো আর ও থাকবেনা। এটা কোনো কথা হলো? প্রিসিলা আমায় বিশেষভাবে বলে দিয়েছিল যেন আজ বাকিরা কেউ বাদ গেলেও, অতসীকে অবশ্যই নিয়ে যায়। এখন আমি কি জবাব দেব বলো তো ওকে?” আরমান।
ফারজাদের মামী বলে, “অতসী কাল এলো না কেন ভাবি? বোনের বিয়েতে উপস্থিত থাকল না, এটা কেমন কথা? আপনারাও এখানে হলে, ও কি একা রয়ে গেলো বাড়ি? সামলাতে পারবে তো একা?”
অতসীর মা বলেন, “হ্যাঁ আপা। ওকে আমার বোনের বাড়ি রেখে এসেছি। আমাদের বাসার কাছেই ওদের বাড়িটা। সমস্যা হবেনা।”
পরপর আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলে।
“অতসীর আসলেই শরীর খারাপ আরমান। প্রিসিলাকে দেখতে আসার দিন, এখান থেকে যাওয়ার সময় থেকেই কেমন অসুস্থ হয়ে পরেছিল মেয়েটা। এখনো শরীরটা দুর্বল। ওর না আসাই ভালো হবে। তোমরাই বরং চলে যাও। ওকে আমরা বড়রা মিলে গেলে তখন নিয়ে যাবো আমাদের সাথে। এখন ও গেলে তোমাদেরও ঝামেলা বাড়বে।”
অতসীর মায়ের কথা মানল সবাই। যে যার যার মতো তৈরি হয়ে দুপুরের আগ সময়ে রওনা দেয়।
____
ছেলেমেয়েরা সবাই এখন প্রিসিলার শ্বশুর বাড়ি অবস্থান করছে। তার শ্বশুর বাড়িটা ফারিশ মহলের মতো বেশ বড়সড়, আর আভিজাত্য স্পষ্ট। প্রিসিলা ফারজাদের ছোট। আর তারপর প্রাচী। প্রাচী পড়ছে কলেজে। প্রিসিলারও কলেজ শেষ করেই বিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার নিয়ত ছিল না ফারিশ মহলের কর্তাদের। কিন্তু ভালো সম্বন্ধ পেয়ে, আর পাত্রপক্ষের নমনীয় অনুরোধে গলে গেলেন।
প্রিসিলার আজ প্রথম দিন তার শ্বশুর বাড়িতে। নতুন বউ লাল-গোলাপি রঙা শাড়ি পড়েছে। খুব মানিয়েছে তার গাঁঁয়ে ওটা। মাথায় ঘোমটা টানা। সাথে স্বর্ণের চুড়ি, ব্রেসলেট, কানের দুলসহ গলার হার, আংটি - সব আছে পড়নে। হাতখানা মেহেন্দি রাঙা। গালে গত রাতের লাজুক আভা। নতুন বউ বুঝি একেই বলে।
সে ভাই বোনেদের পেয়ে খুব খুশি হলো। একে একে সবার সাথে কথা বললো। বসার ঘরে বসতে দেওয়া হয়েছে তাদের। সবার জায়গা হবেনা বলে বাড়তি চেয়ার এনে রাখা হয়েছিল আগে থেকেই। কিন্তু প্রিসিলার সবাইকে চোখে পড়লেও- দেখল না একমাত্র ভাই, আর চাচাতো বোন অতসীকে। আরেকবার নজর বুলিয়ে দেখল সে, ভাই না থাকলেও অতসীটা না কোথাও গুজে বসে আছে ভেবে। কিন্তু না, দেখা পেল না অতসীর। সে ভাই আরমানের দিকটায় এগিয়ে যায়, পাশে এসে জানতে চায়,
“আরমান ভাই? অতসীকে নিয়ে আসতে বলেছিলাম না তোমায়? ওকে আনলে না কেন?”
আরমান কি জবাব দেবে ভেবে পেল না। তাও কোনোরকম বলে,
“অতসীটা চালাকি করেছে আমার সাথে। আমি বলেছিলাম আজ সকালে ওকে নিতে যাবো। জানালো নিবিড় ভাইয়ের সাথে নিজেই চলে আসবে বাড়ি, তারপর একসাথে আসতে পারবো। কিন্তু সকালে ফোন দিতেই দেখলাম ফোন সুইচ অফ। মেয়েটা ইচ্ছে করেই এমন করেছে। আমি আর কিই বা করতে পারি যদি ও নিজে না আসতে চায়?” শেষদিকে হতাশ কণ্ঠে বলে আরমান।
তার কথায় প্রিসিলার চেহারা তমসায় চেয়ে গেলো। বিয়েতেও এলো না, আজও এলো না। মন খারাপ হয় তার। কিন্তু তার ভাইকেও যে এখনো দেখা যাচ্ছেনা। সে আবার এদিক ওদিক নজর ঘুরিয়ে বলে,
“কিন্তু ভাইয়াকেও তো দেখছিনা কোথাও। ভাইয়া কি আসেনি তোমাদের সবার সাথে?”
আরমান বলে,
“ফারজাদ ভাই বাইক নিয়ে আসবে বলেছিল, আমাদের পর পরই তো বেরিয়েছিল। এখনো আসেনি কেন বুঝতে পারছিনা। দাড়া, আমি ফোন দিয়ে দেখছি কোনো সমস্যা হলো কি না।”
বেশ কয়েকবার ফোন দিয়ে দেখল আরমান। কিন্তু রিসিভ হচ্ছেনা। সে হতাশ নয়নে তাকায় প্রিসিলার দিকে। প্রিসিলা বুঝল ভাইকেও পাওয়া যাচ্ছেনা লাইনে। অভিমান হয় তার। ভাই বোনেরা তাকে অবজ্ঞা করছে।
_______
অতসী তখন তার খালামণিদের বাড়ির বাগানে বসে আছে। সাদা রঙের বসার টুল আছে ওখানে লম্বা একটা। ওখানেই বসে আছে সে। পাশে হাটার সময় সাবধানতার সুবিধার্থে যে স্টিকটা ব্যবহার করে, ওটা রাখা। খালার বাড়িতে অতিরিক্ত কেউ নেই। তারা স্বামী স্ত্রী আর সন্তানেরা। যারা প্রত্যেকেই অতসীকে স্নেহ করে। তাই তার এখানে আসতে কোনো দুনোমনা থাকেনা। সে এখানটাই খালাতো বোনের সাথে বসেছিল। বসে বসে গল্পে মেতেছিল। কিন্তু মায়ের ডাক পরায় খালাতো বোন ভেতরে যায়। আবার ফিরে আসবে বলে অতসীকে রেখে গেছে। অতসী আপনমনে বসেই ছিল। অকস্মাৎ বেঞ্চিতে তার পাশে কেউ বসেছে মনে হতেই কপালে ভাঁজ পরলো তার,
“কে?”
কোনো উত্তর নেই। অতসী ফের আওয়াজ তুলে,
“পাশে কে বসেছেন এই মাত্র?”
নিরুত্তর।
“নম্রতা আপু?”
“……………”
“নিবিড় ভাইয়া?”
“......”
“নয়নিকা?”
“…...”
“কে বলছেন না কেন? নয়নিকা তুই? চুপ করে আছিস কেন? আমাকে ভয় দেখাতে চাইলে খালাকে বলে দেব দেখিস।”
একাধারে বেশ কয়েকবার পাশে বসা ব্যক্তির পরিচয় জানতে চেয়ে কথাগুলো বললো সে। কিন্তু কেউ উত্তর দিলনা। প্রথমে খালাতো ভাই বোনেরা কেউ তার সাথে মজা করছে ভাবলেও এবার ভয় করছে। কপাল ঘাম দেখা যাচ্ছে অল্প। সে কাঁপা কাঁপা শরীরটা টেনে একটু কাছে এগিয়ে বসে। উদ্দেশ্য ঘ্রাণ শুকে কে বুঝবে। সাথে অল্প করে হাতও বাড়াল। কিন্তু কে চিনে নেবে, তার আগে হাতটা কেউ ধরে নিলো আলতো করে। অতসী আতঙ্কে শিউরে উঠল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
“ক কে? কে বলছেন? আমার হাত ধরেছেন কেন আপনি? গেটের ভেতর কিভাবে আসলেন? আপনি কে?” ভীষণ আতঙ্ক তার মিহি কণ্ঠে।
উত্তর না দিয়ে হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দিল সে জন। মোলায়েম হাতের ভেতর খসখসে হাতের স্পর্শে পাশের জন যে কোনো পুরুষ তা বুঝতে অসুবিধা হলোনা অতসীর। এতে তার আতঙ্ক বাড়ল বৈ কি!
“আপনি কে? কেন এমন করছেন? আমার হাত ছাড়ুন প্লিজ? আমি চিৎকার করবো নয়তো।” হাত ছাড়াতে চেয়ে কথাটা বলে সে।
পাশের জন অল্প দূরত্ব টুকু মিটিয়ে অতসীর কাছে এসে বসলো। হাতটা তখনো তার হাতের ভাঁজে। কাছে এসে বসতেই অতসী থমকে গেল। এ ঘ্রাণ খুব ভালো করে চেনে সে। বিগত এক সপ্তাহ ধরে তার শরীর হতে এই ঘ্রাণ বিলীন করতে চাইছে, কিন্তু পারছেনা। শরীর থেকে বিলীন হলেও, মন মস্তিষ্ক হতে সরছেনা কোনোভাবে। কিভাবে সরবে? তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে এই শরীরের স্পর্শ, ঘ্রাণ - সবটা।
ফারজাদ ভাই… তার সমগ্র শরীরে নিজের ছাপ বসিয়েছে। তাকে কলঙ্কিত করেছে এই মানুষটা। তার জীবনের লুকায়িত এক সত্য হয়ে দাড়িয়েছে এই মানুষটা। যা তাকে প্রতি ক্ষণে নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণা অনুভব করায়। নিজেকে শেষ করে দিতে প্ররোচিত করে।
অতসী ঢোক গেলে। কণ্ঠনালী হতে বুক বেয়ে তা উদরে নামলো। ফারজাদ নিজের গভীর সমুদ্রের মতো চোখের দৃষ্টিতে দেখল তা। খুব মনোযোগী সেই দৃষ্টি।
এই মেয়েটাকে আগে কখনো এত সুন্দর, মোহনীয়, আর প্রলুব্ধিময় লাগেনি তার চোখে। বিরক্ত হতো মেয়েটাকে দেখলে সে। খুব বিরক্ত হতো। চেহারাটাও সহ্য হতোনা। এর কারণ— মাত্র এগারো বছর বয়সে এই মেয়েটাকে বাঁঁচাতে গিয়ে তার দাদুভাই মারা গিয়েছিল। তারপর নিজেও অন্ধ হয়ে বসে থাকে। দাদুভাইয়ের মৃত্যুর পেছনে এই মেয়েটাকে দায়ী করে গেছে বেশ লম্বা একটা সময় জুড়ে। যদিও সে যে দাদুভাইয়ের মৃত্যুর কারণ হিসেবে অতসীকে দায়ী করতো এ কথা সে ছাড়া আর কেউ জানত না। সময়ের সাথে সাথে তার সেই ধারণা যে ভুল ছিল, তা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তাও কেন জানি সহ্য হতো না মেয়েটাক। এরপর আরেকদিন তার কিছু বন্ধু এসেছিল বাড়িতে, যাদের একজন অতসীকে একা পেয়ে তার অজান্তে তার পাশে এসে খারাপভাবে ছুঁয়ে দিতে চেয়েছিল। ফারজাদের চোখে পরে যায় তা। বাড়িতে তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলেছিল। নিজের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসা বন্ধুকে মারতে মারতে আধমরা করে ফেলে। তারপর ফারজাদ পুলিশে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার পরিবার এসে ক্ষমা চেয়ে, আকুতি-মিনতি করে ছেলেকে বাঁচিয়ে নেয় কোনোভাবে। তাদের অপমান করে বিতাড়িত করা হয় ফারিশ মহল থেকে।
ফারজাদ এরপর থেকে আর কারো সাথে কখনো বন্ধুত্ব করেনি। ঐ ছেলে ছাড়া বাকি যে বন্ধুরা ছিল তাদের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করতে চেয়েছিল সে। কিন্তু বন্ধুদের কারণে আর পারেনি। তারাই জোর করে ফারজাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে। ঐ ছেলের সাথে যোগাযোগ শেষ করে দেয় তারাও। সব ঠিকঠাক হয়ে যায়। সে অধ্যায় ওখানেই শেষ হয়।
কিন্তু অতসীর অন্ধ হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো ফারজাদের চোখে বিষের ন্যায় ঠেকতে লাগল এরপর থেকে। সহ্য হতো না মেয়েটাকে। যাই করে অন্যের চোখে পড়ার জন্য, সহানুভুতি আদায়ের জন্য করে —এমনটা মনে হতে লাগে। যেখানে যাবে বিপত্তি বাঁধাবে— এমন একটা অযাচিত ধারণা তৈরি হয় মনের ভেতর। অথচ বাড়িতে সেদিনের ঘটে যাওয়া কিছুই অতসী আজ অব্দি জানেনা।
সেই থেকে ফারজাদের চোখে বিরক্তিকর এই মেয়েটা। আর আজ তার কাঁপা কাঁপা গলায় বলা কথাগুলো শুনতেও মধুর লাগছে। কানের কাছে যেন বায়োলিনের সুর তুলছে কেউ। যা তার ভীষণ পছন্দের।
“আ, আপনি এখানে কেন? ছেড়ে দিন প্লিজ।” বড্ড অসহায়, আর কাতরতা তার কণ্ঠে। কথাটা বলে সে হাত সরাতে চেয়েছে। কিন্তু ফারজাদ আরও গভীরভাবে নিজ হাতের ভাঁজে নিলো মেয়েলি নরম হাতটার চিকন চিকন আঙ্গুলগুলো।
“উহু…… হাত ছাড়াবে না। এভাবে থাকুক।” অতি নিকটে পুরুষটির এমন ধীমি কণ্ঠে অতসীর ভেতরটা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেলো বুঝি। কেমন একটা লাগছে তার। পাশাপাশি বসা দুজনে, আর ফারজাদ ভাই তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে -তা খুব বুঝতে পারছে অতসী।
কথা বলার সময় নিঃশ্বাস যেভাবে তার মুখে এসে পরছে, অন্যদিকে দৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই। অস্বস্তি হচ্ছে তার।
“আ আপনি এখানে কেন?” আতঙ্কিত অতসী কোনোভাবে রাখে প্রশ্নটা।
“তোমাকে দেখতে এসেছি।” তখনো স্থির দৃষ্টি অতসীর দিকেই।
অতসীর চোখের মণির ঘুরানো দেখেই, সে এ কথার মানে কী জানতে চাইছে -তা বুঝে নিল ফারজাদ। নিজেই দিলো উত্তরটা,
“তোমাকে মিস করেছি। দেখতে ইচ্ছে করছিল খুব। তাই চলে এলাম।”
কথাটা বলে হাতে নেওয়া ঐ মেয়েলী হাতে অল্প করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। অতসী আবার শিউরে উঠল। ফারজাদ ভাই এসব কি করছে? কেন করছে? তুমি সম্বোধন করতে শুনা যাচ্ছে, যেখানে তার সাথে তুই সম্বোধন ছাড়া কথা বলেনি কখনো। এত নরম কণ্ঠ, এত আদুরে ভাবে উত্তর দিচ্ছে তাকে… তার ভয় হয়। মেয়েলী মনটাতে সে রাতের কথা ভেবে অন্য একটা আতঙ্ক জাগছে। এর মধ্যে ফারজাদ তার কপালে আসা চুল সরিয়ে, হাতে আরেক দফা ঠোঁট ছোঁয়ালো। অতসী চোখ দুটো খিচে বন্ধ করে নেয়। যা ভেবেছে তা মুখে আনল সে বহু কষ্টে,
“আ আপনি কি আবার ওসব চাইছেন?”
ফারজাদ তার চেহারাটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিল, নতুন কি এসেছে মুখটাতে। তা খুঁজে বের করতে চাইছিল। এত কেন ভালো লাগছে সেদিনের পর থেকে, জানেনা সে। মায়া মায়া লাগে যতবার সে রাতের কান্নাভেজা চোখ দুটো, আর কাপঁতে থাকা ঠোঁট দুটো চোখে ভাসে। অতসীকে দেখতে দেখতে কথাটা শুনে কিছুপল তাকাল। তারপর বলে,
“ওসব চাইছি মানে?” স্বাভাবিক জিজ্ঞাসু স্বর ফারজাদের।
অতসী কাঁপাকাঁপা গলায় ফের বলে,
“সেদিন যা করেছিলেন। ওসব চাইছেন?”
সাথে সাথে উত্তর এলো না ফারজাদের। সে কিছুপল তার ভয়ার্ত চেহারায় চোখ বুলিয়ে বলে,
“এমনটা কেন মনে হলো?”
“আপনি আমার সাথে এভাবে কথা বলছেন যে?”
অতসী কি বুঝাতে চাইছে ফারজাদের মাথায় ঢুকছেনা। গভীর সমুদ্রের মতো চোখদুটোতে স্বল্প বিভ্রান্তি। যা মনোযোগ দিয়ে ঐ চোখ দুটোর দিকে তাকানো ছাড়া বোঝার সুযোগ নেই।
“কি হলো? চুপ করে আছেন যে? আবার ওসব করতে চান? তাই এত নরম হয়ে কথা বলছেন?” জিরিয়ে ফের বলে, “আপনি নরম গলায় কথা বললেও আমি মানবো না। আমি সবাইকে জানিয়ে দেব এবার। একবার বেহুশ হয়ে কলঙ্কিত করেছেন আমায় জোর জবরদস্তি করে, আমি কাউকে কিছু বলিনি। এখন হুশে থেকে মিষ্টি কণ্ঠে কথা বললে ভেবেছেন আমি গলে গিয়ে স্বেচ্ছায় নিজেকে বিলিয়ে দেব আপনার কাছে? আরেকবার আমার সাথে জোর জবরদস্তি করার চেষ্টা করলে আমি হয় নিজেকে শেষ করে দেবো, নাহয় আপনাকে কিছু একটা করে দেবো। তাই আমায় আরেকবার কলঙ্কিত করার কথা মাথাতেও আনবেন না বলে দিচ্ছি।” ভয়ে ভয়ে যথাসম্ভব দৃঢ় গলায় বলার চেষ্টা করলো সে। ফারজাদ তা খুব মন দিয়ে দেখল, শুনল।
“তুমি এত কথা বলতে পারো আগে জানতাম না।” আসলেই জানতো না ফারজাদ। অতসী কখনো ফারজাদের সামনে সতঃস্ফূর্তভাবে মনের কথা এত নির্দ্বিধায় বলেনি। ফারজাদের তার প্রতি আচরণের দরুন সে ভয় পেত ফারজাদ কে। বারবার গুটিয়ে নিতো নিজেকে আশেপাশে ফারজাদের উপস্থিতি টের পেলে। এমনভাবে এতগুলো কথা সে বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে ফারজাদ ভাই তাকে সহ্য করতে পারেনা জেনে আর কখনো বলেনি।
অতসী সেসব মনে করে চোখের মণি এদিক ওদিক ঘোরায়। দমে গেছে কিছুটা।
ফারজাদ অতসী মূূলত কি ভাবছে তা বুঝেও আর ওসব নিয়ে কথা বাড়াল না।
“আসো, ভেতরে যায়। রেডি হয়ে নেবে, আমরা প্রিসিলার শ্বশুর বাড়ি যাবো।” ফারজাদের স্বাভাবিক কণ্ঠের এই কথায় অতসী আশ্চর্যান্বিত হয়ে ফেরে ফারজাদের দিকে। অনুদ্দেশ্যে দৃষ্টি ফেলে বলে,
“আমায় প্রিসিলা আপুর শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছেন আপনি?”
“হু, আমরা এখান থেকে সোজা প্রিসিলার শ্বশুর বাড়ি যাবো। বাকি কথা পরে। আমার সাথে ভেতরে এসো।” অতসীকে হাতে ধরে উঠাতে চায় ফারজাদ। কিন্তু অতসী আঁটকে নেয়,
“আমি আপনার সাথে কোথাও যাব না। আপনি চলে যান ভাইয়া।”
ফারজাদ বিরক্তি নিয়ে তাকায়। সেই রাতের পর প্রথম অতসীর প্রতি বিরক্তি নিয়ে তাকাতে দেখা গেলো ফারজাদকে। আগে যাকে দেখলেই বিরক্তি চাপতো মাথায়, তাকে এ যাবৎ শুধু মুগ্ধ নজরে দেখছিল সে। অকস্মাৎ ফের চলে এলো বিরক্তি,
“ভাইয়া ডাকছ কেন? আমি তোমার ভাই?”
অতসী দ্বিধায় পড়ে। চোখের মণি ঘুরিয়ে বলে,
“তো?”
“সেরাতের কথা ভুলে গেছ? তোমার আমার সম্পর্ক অন্যরকম এখন। তুমিই তো বললে, আমার নামের কলঙ্ক লেগেছে তোমার শরীরে। যা যা হয়েছে দুজনের মধ্যে, এরপর ভাই ডাক আসে কি করে? গা গুলাচ্ছেনা?" থেমে মাথা নিচু করে তার দিকে ঝুঁকে সে, "আই হ্যাড ইউ অতসী, ইউ ফরগট দ্যাট নাইট?”
নিজের বলা কথায় গা না গুলালেও ফারজাদের নিম্ন পুরুষালি কণ্ঠে বলা কথাটায় ঘিনঘিন করে উঠল শরীরটা।
সে চোখ খিচে বন্ধ করে, ফারজাদের বাহুতে থাকা হাতে ওখানটা খামচে ধরে।
“ছিঃ!! এসব কি বলছেন ফারজাদ ভাই…?”
শ্বাস আঁটকে এসেছে তার। যে মানুষটা সারাজীবন তাকে অবহেলা-অবজ্ঞা করে গেছে, উচ্ছিষ্ট বাদে অন্য নজরে দেখেইনি। তারই কণ্ঠে এমন কথা ঐ রাতটার আগেও আকল্পনিত ছিল। কিন্তু সবটা কেমন চোখের পলকে বদলে গেছে। তাকে দেখলে সেই নাক ছিটকানো স্বভাব আর দেখা যায় না এখন। বরং অতসীকে যেন এখন মনে মনে ভাসনা করে এই মানুষটা। অতসী কেমন মিইয়ে গেছে। দৃষ্টি নত তার।
অথচ ফারজাদের মেজাজ আরও গরম হয়েছে তার ঐ কথায়। চোখ মুখ কুচকে চারদিকটাই তাকিয়ে অতসীর কাছে ঝুঁকে আসে আবার। ফিসফিস করে বলে,
“আরেকবার ভাই ডাকলে ইংরেজিতে যেটা বলেছি ওটা খাটি বাংলায় বলবো। তুমি সইতে পারবে তো অতসীরাণী?”
অতসীর দৃষ্টিহীন চোখ দিয়ে অশ্রুকণা গড়াতে দেখা যায়। লজ্জ্বায়, অপমানে মুখটা একটুখানি হয়ে এসেছে,
“আমার সাথে এমন করছেন কেন?”
থেমে নাক টেনে আবার বলে, “আমি ঠিক করে রেখেছিলাম প্রাণ থাকতে আর আপনার সামনে পরবো না। আপনার ঘ্রাণও কখনো অনুভব করব না। কখনোই আপনার সামনে আসব না।” কণ্ঠ কেঁপে ওঠে তার,
“কিন্তু আপনি নিজেই আমার সাথে এসব নিয়ে এত নোংরা ব্যবহার করছেন! আপনার কী নিজের কাজের জন্য একটুও অনুশোচনা হয়না ফারজাদ ভাই? বাড়িতে প্রাচী আপু, প্রিসিলা আপু, আরোহী - সবাই আছে। আমিও তো ওদেরই মতো। চোখে দেখতে পাই না বলে ওদের মতো করে স্নেহ করলেন না কোনোদিন, একটু ভালো করে কথা বললেন না বোন হিসেবে। রাস্তার মেয়েদের মতো ব্যবহার করেছেন সবসময়। আরোহী প্রাচী আপুদের মতো পরিপূর্ণ নই বলে বোন হিসেবে মানতে চাইতেন না মানলাম। কিন্তু আপনার বাকি বোনেদের মতো বোন পরিচয় দেওয়ার যোগ্য না হলেও আমিও তো মানুষ তাইনা? আমার কী ভালো লাগা খারাপ লাগা থাকতে পারেনা? আমি কি ইচ্ছে করে অন্ধত্ব বেছে নিয়েছিলাম?”
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে,
“আপনার ভালো লাগেনা বলে আমাকে কলঙ্কিত করে দিলেন। বোনের মতো স্নেহ না করলেও, আমার
চরম সর্বনাশ চান - এটা কখনো কল্পনাও করিনি ফারজাদ ভাই। কখনো না।”