সেদিনের পর একুশটা দিন কেটে যায়। অতসীর বাবা কোনোরকম প্রাণটা নিয়ে বেঁচে আছে। সেদিন তাৎক্ষনিকভাবে অপারেশনের মাধ্যমে রড বের করতে পেরেছিল ডাক্তাররা। কিন্তু ভদ্রলোকের লিভার ও অন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকায় জটিল পুণর্গঠন সার্জারির তাগিদ দেয় ডাক্তার। যা দেশে করানোর ব্যবস্থা থাকলেও তা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। ফারিশরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইনি বলে তিনদিনের মধ্যেই সিঙ্গাপুর নিয়ে যায় শফিক সাহেবকে। সাথে ছিল ফারজাদ, তার বাবা, মেজ চাচ্চু, আর নিবিড়।
অতসীর মাকে সাথে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এ ক্সি ডে ন্টে তিনি নিজেও বেশ আ ঘা তপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। সাথে কেমন বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন মানসিকভাবে। ট্রমার কারণে বোবার মতো হয়েছিলেন। উনার ঐ অবস্থা দেখে সাথে নেওয়া হয়নি আর। অতসী হাতে, পায়ে, আর মাথায় ব্যথা পেয়েছিল। এখন শারীরিকভাবে সেও ঠিকঠাক। শুধু মা মেয়ের ভেতরটা কোনোভাবেই সুস্থ হতে পারছেনা। সেই দূর্ঘটনার রেশ কাঁটাতে পারছেনা কেউ। তার ওপর অতসীর বাবা কাছে নেই। দূরদেশে চিকিৎসারত। কেমন অবস্থায় আছে-নেই এই নিয়ে মনটা বড্ড আনচান আনচান করে তাদের।
নিবিড় আবার নিজের কর্মস্থলের প্রয়োজনে ফিরে এসেছিল চৌদ্দ দিনের মাথাতেই। এদিকে পুরুষদের অনুপস্থিতিতে অফিস, পরিবারের মেয়েরা— সবটা আরমান একা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল। আবার ফারজাদের বড় ফুফির স্বামী আর ছেলে ব্যবসার প্রয়োজনে আগে থেকেই সিঙ্গাপুর ছিল। তাই ফারজাদ আর তার বাবাও নিবিড়ের সাথে সেদিন ফিরে আসে।
বর্তমানে ফারজাদের মেজ চাচ্চু, তার বড় ফুফির স্বামী আর ছেলেই শফিক সাহেবের সাথে সিঙ্গাপুর অবস্থান করছে।
_
“বা’দিকে… হ্যাঁ বা’দিকে আরেকটু ঘন করে লাগা।”
“ওদিকে এনাফ লাগিয়েছি। বেশি বুঝিস না। আমি দিচ্ছি ঠিক করে।”
“কি ঠিক করে দিচ্ছিস? সব গলায় আর কপালে লেগে যাচ্ছে। আরও কেয়ারফুলি কর।”
প্রাচী ড্রয়িং রুমে একটা টুলের ওপর বসে আছে মাথা নিচু করে। আর পেছনে দাঁড়িয়ে আরোহী হেয়ারপ্যাক লাগিয়ে দিচ্ছে চুলে। এভাবে মিনিট দু’য়েক দেওয়ার পর আরোহী বাটিটা রেখে হঠাৎ বলে,
“বাকিটা মা-বড়মা কাউকে দিয়ে লাগিয়ে নে প্রাচী। আমার জোর’সে এমারজেন্সি পেয়েছে।”
আরোহী হাতের গ্লাভ’সটা খুলে রেখে দৌড় দিল। প্রাচী কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে ফিরে তাকায়। হাতে বাটিটার দিকে একনজর তাকাল। এখন এটুকুর জন্য বসে থাকতে হবে!
“মাআআ?”
সাড়া পেলো না। ফের ডাকে,
“মাআআা? একটু এদিকে এসো তো।”
সেকেন্ড দু’য়েকের মধ্যে রান্নাঘর থেকে প্রাচীর মা বেরিয়ে এলো।
“কীরে? ডাকছিস যে? তোর মেজ চাচ্চু ফোন দিয়েছে নাকি? তোর ছোট চাচ্চুর কোনো উন্নতি হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করতো।”
“আরেহ কেউ ফোন দেয়নি। আমায় একটু বাকি হেয়ায়প্যাকটুকু লাগিয়ে দাও প্লিজ। আরোহীর বাচ্চা আরেকটু চেপে ধরতে পারেনি। ওয়াশরুমে দৌড় দিয়েছে সামান্য এটুকু রেখে।”
তার মা ফের রান্নাঘরে গিয়ে হাতের কাজটুকু সেরে আসে। প্রাচী টুলে মাকে বসতে দিয়ে নিজে ফ্লোরে বসে গেল। মন দিয়ে প্যাকটুকু লাগাচ্ছিলেন ভদ্রমহিলা। কিন্তু প্রাচীর ঘাড়ে, গলায় কোনো দাগ দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে তাকালেন। ভাবলেন ব্যথা পেয়েছে কোথাও। ভালো করে দেখতে দেখতে জানতে চাইবে তার আগে দাগগুলো অযাচিত কিছুর চিহ্ন মনে হতেই চমকে তাকান। আরও মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। চুল সরিয়ে-ওড়না সরিয়ে— আরও কিছু জায়গায় চোখ বুলালেন। প্রাচী যেহেতু নিচে বসেছে, আর গায়ের জামার গলাটাও বড় হওয়ায় সহসায় বুকের ওদিকটা গভীরভাবে দৃশ্যমান হলো। সেখানেও একই চিহ্নের দেখা পেলেন।
“কি হলো মা? লাগাও না। এটুকুই বাকি, সেটাও লাগাতে ঘণ্টা ফেলছ। দূউর!!”
চুলে প্যাক লাগানো থেমেছে অনেক আগেই। তার মা এসব দেখে স্থম্ভিত হয়ে থাকে কিছুপল। আশেপাশে চেয়ে দেখলেন— আপাদত ড্রয়িং রুমে কেউ নেই। মেয়েকে কাঁধ চেপে নিজের দিকে ফেরান। প্রাচী শব্দ করে উঠল ব্যাথায়। কাঁধে হাত মেজে বলে,
“আহ মা। কি করছ? ব্যাথা পাচ্ছি তো।”
তাকাতেই তীক্ষ্ণ নজরে সুপ্ত আতঙ্ক নিয়ে মা তার দিকে চেয়ে আছে বুঝল। প্রাচী বিরক্তি নিয়ে জানতে চাইল,
“কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?”
তার মা গলার ওড়না সরিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় সন্ধেহ নিয়ে শুধায়,
“এসব কি প্রাচী?”
নিজেও তাকাল ওখানটাই। দেখতেই সহসা কপালের বিরক্তির ভাঁজ মিলিয়ে গেল। বরং কিছুটা দ্বিধা আর ভয়ের রেখা ফুঁটে উঠল সেথায়। ওড়না টেনে ঢাকতে চাইল,
“কি…কিছুনা মা। একটু ব্যাথা পেয়েছিলাম?” হাতের বাটিটার দিকে চেয়ে বলে,
“প্যাক তো প্রায় শেষ। আজ বরং থাক। আর ইচ্ছে করছেনা।” বলে বাটিটা হাতে নিয়ে উঠতে চাইছিল সে। কিন্তু মা শক্ত হাতে প্রাচীর বাহু ধরে ফের বসিয়ে দিল।
“পালাবিনা একদম। এসব কি প্রাচী? এখানে ওখানে— এসব জায়গায় কামড়ের দাগ কেন?”
প্রাচী চোখ খিচে বন্ধ করে নেওয়ার উপক্রম। কিন্তু করলো না। মাকে সামাল দিতে হবে। কোনোরকম বলে,
“হ…হ্যাঁ। কামড়ের দাগই তো। দেখতে পাচ্ছ না? মশা কামড়েছে। চিন্তা করো না। ঠিক হয়ে যাবে।”
“তুই আমাকে মশার কামড় আর মানুষের কামড় চেনাচ্ছিস? প্রাচী কি লুকাচ্ছিস বল আমায়।” পরপর জামার গলাটা টেনে নামায়। বুকের কিছুটা নরম জায়গার মধ্যে দাগটা উন্মুক্ত করলো,
“এখানে এমন চিহ্নের মানে কি?”
তীব্র সন্ধেহ আর সুপ্ত আতঙ্কের ছাপ তার মায়ের কণ্ঠে। প্রাচীর কান্না পেল লজ্জ্বায়, ভয়ে।
“চুপ করে থাকিস না প্রাচী।
“ভ…ভুল ভাবছ তুমি।”
“থা প্পর খাবি তুই। কার সাথে কি অকাজ করেছিস এখন বল।”
“মা!!”
থা প্প র পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। প্রাচী গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে রইল।
“আরেকবার বলতে হলে পিঠের চামড়া একটাও রাখব না বেয়াদব মেয়ে। কার সাথে কি করেছিস? কতটুকু করেছিস?”
না চাইতেও ফুঁফিয়ে উঠল প্রাচী। কপালে চেহারায় চুল এসে পড়েছে। চোখ তুলে তাকাতে পারছেনা লজ্জ্বায়। ঢোক গিলে কোনোরকম উচ্চারণ করলো,
“নি…নিবিড় স্যার।”
তার মায়ের কপালে ভাঁজ পড়ে,
“অতসীর খালাতো ভাই! ঐ প্রফেসর?”
সে মাথা নাড়াল অল্প। প্রাচীর মা বিস্মিত না হয়ে পারলো না। অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েটাই অমত থাকায় তার বাবা ডিভোর্সের ব্যবস্থা অব্দি করতে দিয়েছে। আর মেয়ে ঐ ছেলেটার সাথে জড়িয়ে গেছে! প্রাচীর মায়ের রাগ হলো মেয়ের প্রতি।
“কবে থেকে সম্পর্কে জড়িয়েছিস?”
প্রাচী মিনমিন করে বলে,
“সম্পর্কে জড়াইনি।”
আরেকটা থা প্প র পড়ল সাথে সাথে। প্রাচী গালে হাত রেখে নাক টানে, মাথা তখনও নামানো,
“বি…বিয়ের ঘটনার পর থেকে পেছনে লেগে আছে।”
“আর তুই বেকুব মেয়ে গলে গেছিস! তাই স্বামী স্ত্রী বলে তেমনভাবে মেলামেশা শুরু করেছিস আড়ালে। তাইতো?”
দাঁতে দাঁত চেপে জানতে চাইল মা। প্রাচী জবাব দিল না। তার মা ফের শুধায়,
“ঐ ছেলেই তোর কিডন্যাপ করিয়েছিল এটা জানিস? জাদের ওপর বদলা নিতে তোর বদনাম করতে চেয়েছে এটা জানিস তুই?”
প্রাচী অল্প করে মাথা নাড়ায়,
“জা…জানি। ভাইয়া বলেছে।”
মা তার মাথাটা ঝাঁকিয়ে ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“তাহলে কোন আক্কেলে ঐ ছেলের সাথে থেকে এসেছিস তুই? সংসার করার শখ জেগেছে ওর সাথে? বদলা নিতে গিয়ে তোর বদনাম করে দিতে চেয়েছিল। সংসারজীবনে তোর ভাইয়ের বদলা তোর ওপর নেবে না এটার গ্যারান্টি কি বলদ মেয়ে?”
_
প্রাচী নিজের রুমে বিছানায় শুয়ে আছে। মায়ের সামনে যা হলো, ভীষণ লজ্জ্বা, আর অপমান লাগছে তার। বালিশে মুখ গুঁজে চুপচাপ শুয়ে আছে সে।
সেদিন জোর করে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা ফারজাদকে জানিয়েছিল নিবিড়। কিন্তু সেটা কোনো কনসার্ন থেকে নয়, বরং ইচ্ছে করেই জানিয়েছিল, যেন ফারজাদকে বুঝিয়ে দিতে পারে, তার নাকের ডগায় দিয়েই সে তার বোনকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাচ্ছে।
বাড়ি ফেরার পর ফারজাদ প্রাচীকে ধরে বসে। কীভাবে গেল, কেন গেল— সবটা জানতে চায়। জোর করে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে কড়া গলায় বলে, সামনে থেকে যেন নিবিড়ের ধারে কাছেও না যায় সে। শুধু তাই নয়, প্রাচী যেন কোনোভাবে নিবিড়ের ওপর ভরসা না করে— সেই জন্য নিবিড় যে তার অপহরণের সাথে জড়িত সেটাও জানিয়ে দেয়।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় প্রাচী। কথাগুলো মেনে নিতে তার কষ্ট হচ্ছিল। নিবিড় এমনটা করতে পারে? তার সঙ্গে? কী জঘন্য চিন্তা!
বদলা নিতে তাকে বদনাম করে দেওয়ার চেষ্টা— কোথাকার কোন ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা! ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে ওঠে তার। নিবিড়ের প্রতি একরাশ ঘৃণা জমে যায় মনে। এত নিচু মানসিকতাও মানুষের হতে পারে— এই ভাবনাতেই নিবিড়কে আরও বেশি অসহ্য লাগছিল তার।
এরপর দেখা হয় চাচ্চুর এক্সিডেন্টের সময়। হাসপাতালে এসে সবার আগে অতসী আর তার মাকে সামলাচ্ছিল নিবিড়। কখনো নিজের খালাকে, কখনো অতসীকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল— মেয়েটাকে আগলে রাখছিল খুব। সবটাই দেখেছিল প্রাচী।
যদিও ভাইয়ের কাছে নিবিড়ের সত্যটা জানার পর থেকেই তার মনে ঘৃণা জমে ছিল। তবু নিবিড় তার স্বামী, আর বিগত দিনগুলোতে যেভাবে তাকে চেয়ে এসেছে— তারপর অতসীর প্রতি নিবিড়ের সামান্য যত্নটুকুও অজান্তেই তাকে পীড়া দিচ্ছিল। ভেতরে ভেতরে কেমন এক অভিমান জন্ম নিচ্ছিল।
তবে এসব কিছুই নিবিড়কে বুঝতে দেয়নি সে। স্বাভাবিক আচরণই করেছে, যেন এসব নিয়ে তার কিছুই যায় আসে না। অথচ সেদিন এতকিছুর মাঝেও নিবিড় লুকিয়ে তার কাছে আসে, তাকে সান্ত্বনা দেয়। একবার কপালে আলতো করে চুমুও এঁকে দিয়েছিল। বলেছে, হাসপাতালে থাকলে সে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়বে, তাই বাড়ি চলে যেতে।
উপরন্তু নিবিড়ের পরিবারের তার প্রতি আলাদা যত্ন দেখা যায় ছেলের বউ হিসেবে। এসব ছোট ছোট বিষয়গুলোতেই তার কিছু হচ্ছিল।
তবু সহজে ধরা দেয়নি সে। নিবিড় চলে যায় সিঙ্গাপুর। সেই চৌদ্দ দিনের মধ্যে একবারও নিবিড়ের কোনো ফোনকল বা মেসেজের জবাব দেয়নি প্রাচী। নিজেকে শক্ত করে রেখেছিল।
শেষমেশ না পেরে নিবিড় একটা দীর্ঘ মেসেজ পাঠায়। সেখানে প্রাচীর কাছে জানা-অজানায় যা কিছু করেছে, যে কারণে মেয়েটা রাগ করেছে— সবকিছুর জন্য ক্ষমা চায়। নিজের ভেতরে সদ্য ফুঁটে ওঠা অনুভূতিগুলোও গুছিয়ে লিখে জানায়। আর সেদিনের অপহরণের ঘটনায় সে জড়িত ছিল এও জানিয়ে দেয়। আবারও ক্ষমা চায়।
তবু প্রাচীর মনের বরফ গলেনি। উল্টো নিবিড়কে ব্লক করে দেয়।
এরপর যখন ছেলেটা দেশে ফেরে, তখনই যা হওয়ার হয়ে যায়। প্রাচী সব দিক থেকে যোগাযোগের পথ বন্ধ করে রেখেছে, কলেজেও যাচ্ছে না। তাই এক রাতে নিবিড় কীভাবে কীভাবে লুকিয়ে হাজির হয় প্রাচীর রুমে।
প্রাচীর অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি আর রাগ— সবকিছু মেটানোর চেষ্টা করে যায় সে। কিন্তু প্রাচী তাতেও গলেনি। বরং আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কড়া, প্রায় অপমানজনক আচরণই করে যায় নিবিড়ের সঙ্গে।
নিবিড় কিছু মনে করেনি ওতে। পরদিন সে জানল দুদিন পর মেয়েটার জন্মদিন। সাথে ফারজাদের বাবা তাদের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করছে— এমন একটা উড়ু খবরও পায় সে।
জন্মদিনে আরোহীর মাধ্যমে প্রাচীকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে এলো। প্রাচী সেখানে নিবিড়কে দেখে অবাক হয়। আরোহীর প্রতি রাগ হয়। তবে তখন আর কিছু করার ছিল না। কেক কাটিয়ে তার অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও কোনো সারপ্রাইজের জন্য প্রাইভেট সেকশনে নিয়ে যায়। রোমান্টিক একটা পরিবেশ ছিল সেখানে। প্রাচীর দেখেই সংকোচ আর সুপ্ত লাজে গালটা লাল হয়ে আসছিল বারবার।
ওখানে আরও গুছিয়ে, সুন্দরভাবে নিজেকে প্রকাশ করে নিবিড়। অতসীর প্রতি যা ছিল সেসব জানায়, অতসীর থেকে কাটিয়ে উঠতে চায় ভীষণভাবে, প্রাচীর সাহারা দরকার— এমন নানান কিছু।
সেদিন অতসী আর ফারজাদের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বাড়ি ফিরতে সময় এ ক্সি ডেন্ট করতে করতে বেঁচে ফিরেছে। একমাত্র ছেলে পরিবারের। তাই চাইলেও মেয়েজড়িত ঘটনায় হতাশ হয়ে নিজের ক্ষতি হোক এমন কিছু করতে পারেনা সে। নিজেকে হতাশায় ডুবে থাকতে দিতে পারেনা। বোন আছে দুটো। সব তো তাকেই সামলাতে হবে!
প্রাচী সেদিন বুঝেছে নিবিড় মনের দিক দিয়ে ভীষণ শক্তপোক্ত আর দায়িত্ববান এক পুরুষ! নাহয় যা যা স্বীকারোক্তি দিল আগের অনুভূতি আর বর্তমান অনুভূতি নিয়ে— ওসব শুনে তারই চোখে পানি চলে আসছিল বারবার, অথচ নিবিড় কত অবলীলায় বলে গেল! কতো শক্তভাবে নিজেকে ধরে রেখেছে আপনজনেদের জন্য।
প্রাচীর চোখে নিবিড়ের জন্য সহানুভূতি। সে দেখতে পায় নিবিড়ের চোখে তার ভালোবাসা পাওয়ার আকুতি। সবমিলিয়ে চোখে চোখে অজানা কোনো সংযোগ হয় দুজনের। নিবিড়ের দৃষ্টিতে এছাড়াও কিছু ছিল। প্রাচী মোহাবিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল প্রতিবার। সেই ঘোরের মধ্যেই নিবিড়ের পদক্ষেপে দুজনের জীবনের প্রথম সর্বনাশ রচিত হয়।
“প্রাচী? তোর ব্যক্তিগত প্রফেসরের ফোন রিসিভ করছিস না কেন?”
দরজায় আরোহী। হাতে তার ফোন। নিশ্চয় নিবিড় তাকে ফোন দিয়ে প্রাচীকে ফোন রিসিভ করছেনা কেন জানতে চেয়েছে। সে নাক টেনে বলে,
“ঐ প্রফেসরের গুষ্টি তুষ্টি। তুই এখান থেকে বিদায় হ। ভালো লাগছেনা আমার।”
আরোহীর ফোনের ওপাশ থেকে কিছু বললো কেউ। সে গিয়ে বিছানায় প্রাচীর ফোনটা নিয়ে কাউকে ভিডিও কল লাগায়। তারপর বালিশের সাথে ঠিকঠাক বসিয়ে দেয়, যাতে প্রাচীকে দেখা যায়। পরপর চলে গেল।
প্রাচী তখনও বালিশে মুখ গুঁজে নিজেকে দোষছে।
“কাঁঁদছ নাকি? আবার কি হলো? কে কি বলেছে?”
নিবিড়ের গলা শুনে মাথা তুলে ফিরে তাকায়। ফোনে সে ভিডিও কলে আছে। দেখেই বুঝে নেয় এটা আরোহীর কাজ। গা তুলে ফোন কেটে দিতেই যাচ্ছিল,
“উহু, ফোন কাটবে না প্রাচী। রাতে চলে আসব, নয়তো। তখন কিন্তু সবকিছুর শোধ উঠবে।”
কথাটা শুনে প্রাচীর রাগ চড়ে গেল।
“আমার ভাইয়াকে সবসময় নানান কথা শুনান। অথচ আপনিও তো একই নৌকার মাঝি! অতসীর সাথে ভাইয়ার বিয়ে কেউ মানছে না। সেখানে আপনার সাথে আমায় মানবে? কেউই মানবে না। বাবা নাকি আমাদের ডিভোর্সের ব্যবস্থাও করছে। আমারই ভুল হয়েছে… আপনার পাগলামিতে সায় দেওয়া উচিত হয়নি একেবারেই। আমি বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে কিছুতেই দাঁড়াতে পারব না। কিন্তু আপনি… আমি…”
কথা শেষ করতে না পেরে প্রাচী কেঁদে উঠল।
মেয়েরা একবার তীব্র অনুভূতি নিয়ে কারো সাথে শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে জড়িয়ে গেলে, সেখান থেকে নিজেকে বের করে আনা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। ওখানটাই আঁটকে যায়, জড়িয়ে যায় ভীষণ বাজেভাবে।
নিবিড় শান্তভাবেই ফোনের ওপাশ থেকে প্রাচীর কান্নাভেজা মুখটা দেখছে। সে নিজের ঘরেই আছে। গায়ে পোশাক নেই, হাতে কফির মগ।
মেয়েটার মনোভাব সে ভালোই বুঝতে পারছে। তাকে ছেড়ে দেওয়া প্রাচীর পক্ষে আর সম্ভব নয়। আবার পরিবারের বিরুদ্ধেও যেতে চায় না। মোটকথা, নিবিড় আর নিজের পরিবারের মাঝখানে কোথাও আটকে গেছে প্রাচী।
সবকিছু বুঝেও নিবিড়কে একটুও বিচলিত মনে হলো না। কফিতে চুমুক দিয়ে সে শান্তভাবে বলে,
“তোমার ভাইয়ার সাথে বিষয়টা কীভাবে মেলাচ্ছ? ওদের ক্ষেত্রে তো অতসী নিজেই ফারজাদকে চায় না। আর আমাদের এখানে? তুমি তো আমায় চাও। আমায় ভালোবাসো… কি বাসো না প্রাচী?”
গভীর মনোযোগী দৃষ্টি প্রাচীর মায়াবী মুখের দিকে। সে জানে, প্রাচী ‘হ্যাঁ’ বলবেই। তবুও মেয়েটার মুখে শুনে সে অদ্ভুত এক তৃপ্তি পাবে, শান্তি পাবে। ঠিক শান্তিদায়ক শান্তি নয়— একটা পৈশাচিক শান্তি। যেন প্রাচীকে সে নিজের ভেতর এত গভীরভাবে ডুবিয়ে ফেলতে পেরেছে ভাবতে ভালো লাগে। তবে এমনও নয় যে প্রাচীকে কষ্ট দিয়ে সে সংসার করতে চায়। মোটেও না। বরং নিজের কষ্ট লাঘব করতেই প্রাচীকে তার দরকার। তবু কোথাও না কোথাও নিবিড়ের স্বার্থপর মনের আত্মতৃপ্তির একটা বিষয় রয়ে গেছে। প্রাচী তাকে চায়, এই কথাটা শুনলেই সেই তৃপ্তি আসে।
ক্রন্দনরত প্রাচী মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“হ-হ্যাঁ… বাসি। কিন্তু—”
নিবিড় তাকে থামিয়ে দিল।
“এরপর আর কোনো কিন্তু নেই। তুমি রাজি, আমি রাজি। আর কার কী এখানে?”
প্রাচী একটু থেমে বলে,
“আপনি আঙ্কেল-আন্টিকে এসে বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে বলেন না কেন, নিবিড়? বড়রা বুঝালে হয়তো একটু ভালো হতো… তাই না?”
নিবিড়ের মুখের ভঙ্গি বদলে গেল। গাম্ভীর্য ফুটে উঠল চোখে। সে ধীরস্বরে বলে,
“দরকার নেই। দুদিন পর যখন আমাদের কোনো সন্তান হবে। তখন ঐ খবর শুনলে দেখবে, নিজেরাই তোমাকে আমার হাতে তুলে দিচ্ছে।”
মেয়েকে চাইতে বলার জন্য পরিবারকে পাঠাতে সে রাজি নয় যেন। বরং তারা নিজেরাই প্রাচীকে তার হাতে তুলে দিক এটা চায় সে।
প্রাচী যদি একটু খেয়াল করত, হয়তো বিষয়টা ধরতে পারত। কিন্তু নিবিড়ের বলা কথাটা শুনেই লজ্জা আর এক অদ্ভুত অনুভূতিতে মিইয়ে গেল সে। বিয়ে হওয়ার পরও বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি উঠার আগে এমন ঘটনা সাধারণত চক্ষুলজ্জ্বার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রাচীর মনেও এই বিষয়টা আসতে চাইল। কিন্তু নিবিড়ের বলা কথাটা শুনে যে মেয়েলী লাজের অনুভূতি এলো, সেই অনুভূতির আড়ালে নিবিড়ের মনোভাবটা চাপা পড়ে যায়।
নিবিড় তার চেহারায় সেই লাজ দেখে নীরবে হাসে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে আরও কিছু আলাপ করে ফোন কাটে।
_
নিবিড় নিজের আর প্রাচীর মধ্যে সবটা ঠিকঠাক করে তারপর পরিবারকে মানানোর বিষয়টা পারিবারিকভাবে আলোচনার মাধ্যমেই করাবে ভেবেছিল। কিন্তু প্রাচীর পরিবার তাদের ডিভোর্স করাতে চাইছে শুনে সেই ভাবনা বদলে যায়। অহমিকা বা আত্মসম্মান— কোথাও একটা আ ঘাত লাগে তার। নিবিড় বা তার পরিবারের সাথে কোনোরুপ আলাপ আলোচনা ছাড়া কি করে নিজেরা এমন সিদ্ধান্তে আসতে পারে! তার বোধ হয়েছে যেন তাকে বা তার পরিবারকে ফারিশরা গোণায় ধরেনি। নয়তো সমজোতায় নাহয় আসলো না। কিন্তু একবার দুই পরিবার আলোচনায় বসে তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারতো না কি? নিজেরাই ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় কি করে!
জেদ চেপেছিল তার। প্রাচীকে নিজের বানানোর জেদ চাপে। আর সেটাও এত গভীরভাবে যে— সে চায় প্রাচী নিজেই তাকে চাইবে। পরিবার ছাড়তে বললেও ছাড়তে চাইবেনা, ছাড়তে পারবেনা।
তাছাড়া প্রাচীর পরিবারও স্বেচ্ছায় মেয়ে তার হাতে তুলে দেবে। তাদের কোনোরুপ আগ্রহ প্রকাশ ছাড়া ফারিশরা নিজেরাই তাদের ডেকে মেয়ে তুলে দিতে চাইবে— এমন একটা জেদ চাপে তার।
এসবের জেরে জন্মদিনে প্রাচীকে ভুলালো। গতানুগতিক ধারায় ছেলেরা প্রাক্তনের গল্প শুনিয়ে যেভাবে মেয়েদের সহানুভূতি নেয়, ঠিক সেই উপায়ে প্রাচীকে ম্যানিপুলেট করলো। উপরন্তু তার কিছু অনুভূতি, স্বীকারোক্তি ছিল সত্য। আর প্রাচী কোনো অচেনা মেয়ে নয়, বরং তার স্ত্রী। সুতরাং এত দ্বিধাদন্ধ রাখার মানে হয়না। নিজের মতো করে ভুলিয়ে প্রাচীর সম্মতিসমেত তাকে আপন করে নিয়েছে।
কিন্তু এরপর আগের জেদ থাকলেও কোথাও একটা প্রাচীর প্রতি নিজেরই সহানুভূতি এসে যায়। মেয়েটার সাথে অন্যায় হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই। যা করেছে জরুরী ছিল। যদি সেদিন মেয়েটাকে ওভাবে আপন করে না নিতো, তাহলে আজ অবলীলায় পরিবারকে বেঁছে নিতো সে।
কিন্তু এখন প্রাচীকে চেয়ে নিতে নিজের পরিবারকে ফারিশ মহল পাঠাবেনা বললেও, আদতে তা করলো না নিবিড়। প্রাচী শুধু শুধু তাদের নীরব অহংবোধ আর বদলা নেওয়া-নেওয়ি যুদ্ধে এমনিতেও অনেকটা বলি হয়ে গেছে। আরও জেদ ধরে থাকলে একটু বেশিই অন্যায় হয়ে যাবে মেয়েটার প্রতি। তাই হঠাৎ -ই পরদিন নিজের বাবা মাকে ফারিশ মহল পাঠাল।
সবাই ভাবে বোন আর বোনজিকে দেখতে এসেছে সবসময়ের মতো। কিন্তু আপ্যায়ন শেষে, বোনের সাথে আলাপ সালাপ সেরে— হঠাৎ সবার উদ্দেশ্যে প্রাচীর কথা তুলে নিবিড়ের বাবা। প্রাচীকে চেয়ে নেওয়াই তাদের আসার মূল উদ্দেশ্য— তা জানায়। এ কথা শুনে সকলে একটু নড়েচড়ে বসে। অতসীর বাবার এ ক্সি ডে ন্টের পর থেকে বহুবার তাদের এবাড়িতে আসা হয়েছে। তবে ওই পরিস্থিতিতে কখনো এসব নিয়ে কথা তুলেনি। তাই তারা ভেবে নিয়েছিল নিবিড়ের পরিবারও প্রাচীকে চায় না। তাই এই নিয়ে কথা তুলেনি একবারো।
ফিরোজ সাহেব নিজের স্ত্রীর দিকে তাকান একবার। কাল রাতেই তিনি স্বামীকে বলেছিলেন যেন ডিভোর্সের বিষয় স্থগিত রাখে।
কোনো কারণ জানান নি। ব্যাস বলেন যেন, ডিভোর্সের কথা না ভেবে সম্পর্ক যখন জুড়েই গেছে সেটাতে অমত না দেখাতে। আর আজই নিবিড়ের পরিবার থেকে এমন প্রস্তাব। কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে মনে হলো ফিরোজ সাহেবের।
তবে বলেন,
“দেখুন বিয়েটা কীভাবে হয়েছে তা জানেন। নিবিড় যা করেছে তার পরে ওর কাছে আমার মেয়ে সুখে থাকবে এই নিশ্চয়তা পাচ্ছিনা।”
থেমে যোগ করেন,
“আর আমরা প্রাচীর বিয়ে নিয়ে কিছুই ভাবিনি। একসময় নিবিড়ের সাথে অতসীর বিয়েতে মত দিয়েছিলাম তাকে পছন্দ হয়েছিল বলেই। কিন্তু এক বোনের সাথে এমন কিছু একটা নিয়ে কখনো কথা এগিয়েছে, এমন অবস্থায় সেইজনের কাছেই আরেক বোনকে দিয়ে সম্পর্কে জটিলতা আনতে চাইনা। ভবিষ্যতে বোনে বোনে কোনোরুপ দ্বিধা সংকোচ তৈরি হোক চাইনা আমরা।”
নিবিড়ের বাবা বলে,
“নিবিড় যা করেছে তার জন্য আমরা আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। সে নিজেও আপনাদের কাছে সেদিনই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে যতটুকু জানি। ক্ষমা চাইলেই সব ঠিক হয়ে যায় না জানি। কিন্তু ভাইজান প্রাচীকে সেদিন নিবিড়ই বাঁচিয়েছিল। ও যদি নিজের ভুল বুঝতে না পারতো তাহলে তো নিজেই গিয়ে আবার ওকে উদ্ধার করে আনতো না তাইনা? তাই একবার সুযোগ দিয়ে দেখা উচিত। আর অতসীর বিষয়টা।
সেক্ষেত্রে আপনার সাথে আমরা একমত। কিন্তু এসব ভাবনা তখন গুরুত্ব সহকারে দেখাটা যৌক্তিক মনে হতো, যদি বিয়েটা না হতো, বা বিয়ে হওয়ার আগেই এসব চিন্তা ভাবনা করার সময় থাকতো। কিন্তু সেসব ভাবার অবকাশ কই ছিল! যেভাবেই হোক বিয়ে যখন হয়ে গেছে, পবিত্র একটা সম্পর্ক যখন জুড়ে গেছে— তখন ওসব ভাবনাকে ইতোমধ্যে জুড়ে যাওয়া বিয়ের সম্পর্কটার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া তো আমাদের উচিত না ভাইজান। বিয়ে তো পবিত্র একটা সম্পর্ক। যেকোনো অবস্থাতে একবার সুযোগ দেওয়া উচিত প্রতিটি বিয়েকে। সেখানে এভাবে কোনোকিছু এগোনোর আগেই সবটা নিজেদের ইচ্ছে মতো দমিয়ে দেওয়া তো উচিত না।”
“জি ভাইজান। হতে পারে ছেলে মেয়ে দুটো নিজেরাই এখন একে অপরকে চায়। সেক্ষেত্রে আমাদের হস্তক্ষেপে ছাড়াছাড়ি করিয়ে দেওয়া অপরাধের সামিল।”
ফিরোজ সাহেবের কপালে ভাঁজ দেখা গেল এ পর্যায়ে। ছেলেমেয়ে দুটো নিজেরাই একে অপরকে চায়— এমন কথা আসলো কেন? স্ত্রীর দিকে তাকালেন একনজর।
প্রাচীর মায়ের নীরব দৃষ্টি দেখে ফের কাল ডিভোর্সের বিষয় স্থগিত করে রাখতে বলার কথাটি মনে পড়ল ফিরোজ সাহেবের। কপালের ভাঁজ গাঁঢ় হয়। প্রাচী এই বিয়ে টিকিয়ে রাখতে চায় এমন না তো কোনোভাবে? সবটা ভেবে তো তাই মনে হচ্ছে। কিছুটা গম্ভীর হয়ে উঠল চেহারা।
ফিরোজ সাহেবকে লক্ষ্য করে নিবিড়ের মা বলে,
“আশা করি আমাদের কথাগুলো মাথায় রেখে যথাযথ সিদ্ধান্তই নেবেন।”
অতসীর মাও আছে এখানটাই। ফারজাদের মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে। ফারজাদ মাত্রই দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে। বাইরে থেকে এসে ড্রয়িং রুমে এমন গভীর মনোযোগী পরিস্থিতি দেখে গাঁঢ় নয়নে তাকায়।
আর তাকে দেখেই অতসীর মায়ের চোখ দুটো বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল।
ফারজাদকে এখন কোনোভাবেই সহ্য হয়না ভদ্রমহিলার। এই যে আজ এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে তাদের জীবনটা— এই সবকিছুর মূলে এই ছেলেটা। অতসী বিছানায় পড়ে থাকে দিনের পর দিন। কেমন নিজের ভেতর গুমরে থাকে সারাটাক্ষণ। সেদিন ওমন একটা পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসার পর একবারো নিজের আপন মানুষদুটোকে একসাথে পেল না। বাবা তার কাছে নেই। চিকিৎসারত অবস্থায় কোনো এক ভীনদেশে। সে এখনো মেনে নিতে পারেনা। মা-বাবাকে একবারো ঐ পরিস্থিতির পর একসাথে কাছে পায়নি। সবকিছুর রেশ কাঁঁটাতে পারছেনা কোনোভাবেই। তার ওপর শরীরে নানান অশান্তি আছেই গর্ভকালীন সময় হওয়ায়। শারীরিক মানসিক— কোনোদিক দিয়ে যেন শান্তি পাচ্ছেনা। অতসীর মায়ের ভয় হয়— সবকিছু এমন চলতে থাকলে কোথাও প্রসবের সময় গিয়ে জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে যায় মেয়েটার। তার ওপর সঠিক বয়সও হয়নি অতসীর। সেই দূর্ঘটনায় স্বামীর অবস্থা দেখার পর, স্বামীর জীবনের এমন সংকট দেখার পর— মেয়েটাকে নিয়ে ভয় যেন আরও বেড়ে যায় এসব ভাবতে গেলে। কোনোভাবেই শান্তি পান না।
সবটা শুরু থেকে ভাবলে ফারজাদকেই সবকিছুর জন্য দায়ী মনে হয়। এখন আর মেয়েকেও তার কাছে তুলে দিতে চান না। বরং ঘৃণা লাগে চেহারাটা দেখলে। না এই ছেলেটা অতসীর জীবনের কালো অধ্যায় হিসেবে রচিত হতো। না আজ এমন প্রাণঘাতী দূর্ঘটনা নিয়ে অতসীর বাবাকে দূরদেশে পড়ে থাকতে হতো। ইশ! কি জগন্য সেই অনুভুূতি— যখন মানুষটার পেটে আস্ত একটা ধাতব বস্তু ঢুঁকে যেতে দেখে। অতসীর মায়ের নিজেরই প্যানিকড লাগে ঐ মুহূর্তটা ভাবলে।
প্রাচীকে কবে নামিয়ে দেবে এই নিয়ে আলাপ তুলছে নিবিড়ের পরিবার। অতসীর মা সেসব দেখল।
তার মেয়ের জীবন চরম সর্বনাশে পরিণত হয়েছে, স্বামীকে জীবন হাতে নিয়ে বিদেশে পড়ে থাকতে হচ্ছে— আর এখানে প্রাচীর বিয়ে নিয়ে আলাপ চলছে। বিষয়টা কেন জানি ভালো লাগল না তার।
এই যে প্রাচীকে নিজ থেকে চেয়ে নিতে আসলো তার বোনের পরিবার। অথচ কিছুদিন আগেই অতসীকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল। আজ কি সুন্দরভাবেই না বুঝিয়ে সুজিয়ে চাইছে প্রাচীকে। অতসীকে যে জায়গাটাই মেনে নিতে পারেনি। সে জায়গাটাই তাদেরই বাড়ির আরেক মেয়েকে রেখে সুখী একটা জীবন কাঁটাবে তার বোনের পরিবার। মাতৃমনটাই অদ্ভুদ এক খারাপ লাগা কাজ করে।
এই ফারজাদের কারণেই সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত আর ভয়ংকর পরিস্থিতিগুলোতে পড়তে হচ্ছে তাদের তিনজনকে। প্রাচীর মতো করে এভাবে কখনো ভালো কোনো ছেলের পরিবার অতসীকে চাইতে আসবে কিনা তাও জানা নেই।
অতসীকে তো ফারজাদের সাথে দিতে মন চায় না আর। কিন্তু তারা অতসীকে না দিলেও দেখা যাবে, ঠিকই একসময় অন্য এক মেয়ে বিয়ে করে সংসার করছে ফারজাদ। আর তার মেয়ে এই একই বাড়িতে বাচ্চাটাকে নিয়ে দিনের পরদিন বেরঙা জীবন কাঁটাতে থাকবে। বাচ্চাটাও তাদের কাছাকাছি থাকবে তখন। ফারজাদ নিজেও সুন্দর জীবন শুরু করবে বাচ্চার দায়িত্ব অতসীর কাছে গছিয়ে দিয়ে। তার নিজের নতুন সংসারে এই নিয়ে কোনো ঝামেলাই থাকল না। কারণ বাচ্চার জন্য তার নিজের মা তো আছেই। আবার সেই বাচ্চাটা তাদেরও কাছাকাছি থাকল।
অতসী মায়ের খুব ঈর্ষা লাগল সবটা ভেবে। ড্রয়িং রুমে সবার হাসি হাসি মুখটা দেখে হঠাৎ এক মুহূর্তের ভেতর ভীষণ ভয়ংকর কিছু চিন্তা করে ফেলে। কোনো কথাবার্তা ছাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যায়।
_
নিবিড়ের বাবা-মা চলে গেছে তখনই। তারা চলে যাওয়ার পর ফিরোজ সাহেব প্রাচীর মতামত নিয়েছেন। সে মিনমিন করে সম্মতি জানায়। তিনি মেয়ের দু’চোখের দিকে চেয়ে ছিলেন কিছুপল। তারপর আর কোনো প্রশ্ন করেন নি।
নিবিড়ের বাবাকে ফোন দিয়ে জানান— নিজের দু’ভাই দেশে ফিরলে তখনই প্রাচীকে নামিয়ে দেবে। তারাও মেনে নেয়। আর এই কথায় থাকল।
সময়টা রাত বারোটার দিকে,
ফারজাদ অফিসের কাজ করতে করতে কফির দরকার হলে নিজেই রান্নাঘরে যায়। সে সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার পর থেকে ফ্ল্যাটে আর উঠেনি, এখানেই থাকছে। কফি বানিয়ে ফিরতে সময় অতসীর রুমের দরজা খুলে, উদ্দেশ্য একনজর তাকে দেখে যাবে। কিন্তু ভেতর থেকে গোঙানির শব্দ এলে তার ভ্রু কুঁচকে আসে, কপালে ভাঁজ পড়ে। ডিম লাইটের ঝাঁপসা আলোয় ঠিক দেখতে পাচ্ছেনা, ভেতরে ঢুঁকে লাইট জ্বালালো সে।
ওমনি বিছানায় কাতরাতে থাকা অতসীকে চোখে পড়ে। মেয়েটা অস্বাভাবিকভাবে কাপঁছে। পেটে হাত দিয়ে এদিক ওদিক কাতরাচ্ছে শুধু। আর মুখে গোঙানির শব্দ। চমকিত ফারজাদ ছুটে যায় অতসীর কাছে। বাহু ধরে নিজের দিকে ফেরায়,
“হেই, অতসী। কি হয়েছে তোমার? খারাপ লাগছে?”
গালে হাত দিয়ে জানতে চাইল সে। পরপর কপালে-গলায় ছুঁয়ে জ্বর কিনা বুঝতে চাইল।
না, তেমন গায়ে জ্বর নেই। তাহলে হলো কি! অতসী পেটে হাত রেখে আর্তনাদ করছে দেখে সে বললো,
“কি হয়েছে অতসী? পেট ব্যাথা করছে তোমার? ওয়াশরুম যাবে? এই মেয়ে!”
উদ্বিগ্ন সে।
“আম আমার পেট ব্যাথা করছে। অনেক বেশি ফারজাদ ভাইয়া। অনেক বেশি। যন্ত্রণা করছে। আমি ম রে যাব। আহহহ!” বলতে বলতে আর্তনাদ করে উঠল সে। ফের বলে,
“আমি ম রে যাব। ভীষণ যন্ত্রণা করছে। আমায় বাঁচান। মাআআআআ মাআআ… আমায় বাঁচাও প্লিজ। আমি ম রে যাব।”
কাঁঁদছে সে। মাকে ডাকতে লাগল। উদ্বিগ্ন ফারজাদ কিছু বুঝতে পারছেনা। অস্বাভাবিকরকম মুচড়ামুচড়ি করছে দেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিলো। পিঠের নিচে হাত গলিয়ে নিজের কাছে কোলে তুলে নেয় মাথাটা। কিন্তু পিঠ তুলে কাছে আনতেই দৈবাৎ শুভ্র বিছানা লাল রঙে রঞ্জিত দেখে থমকে গেল ফারজাদ। কাতরাতে থাকা অতসীকে মাথায় এক হাত বুলাতে বুলাতে বুকে রেখে ওখানটাই হাত দিয়ে ছুঁলো।
র ক্ত!
র ক্ত কেন? ফারজাদ অতসীর দিকে তাকায়। সে আর্তনাদ করছে তখনও। বিস্মিত সে কিছু একটা অনুধাবন করতেই আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। অতসীকে কোলে নিয়ে বের হয়ে যায়। অতসীর চিৎকার তখন আরও গাঁঢ় হচ্ছে। অন্ধকার রাতের নিস্তব্দতায় সেই চিৎকার মহলের দেয়ালগুলোতে বারি খায়। যে কেউ আতঙ্কিত হয়ে উঠবে এই আর্তনাদ শুনে।
_
“পেশেন্টের হাসব্যান্ড কে?”
নার্সের প্রশ্নে নত মস্তকগুলো তুলে তাকাল। চোখে মুখে উদ্বিগ্নতা, আর একরাশ ভয়। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে উঠে আসায় চোখ লাল থাকারই কথা, তার ওপর অতি দুশ্চিন্তা, আর উদ্বিগ্নতায় দেখার মতো হাল নেই কারো।
নার্সের কথায় তৎক্ষণাৎ কেউ জবাব দিতে পারল না। ফিরোজ সাহেব ফারজাদের দিকে তাকান। আরমান তাদের দিকে একনজর তাকিয়ে পরপর নার্সকে ফারজাদের দিকে ইশারা করে দিল। তবে মুখে কিছু বলেনি। ফারজাদ গাঁঢ় শ্বাস টেনে বসা থেকে উঠে বলে,
“আমি, আমি সন্তানের বাবা। কি হয়েছে আমায় বলুন।”
নার্স জবাব দেয়,
“আপনার ওয়াইফের মিসক্যারেজ হয়েছে। ভ্রূণটা আর নেই।”
ফারজাদের র ক্তলাল চোখদুটোর পাতা কেঁপে উঠে। শাঁর্টের ওপরের বোতাম সব খোলা, এলোমেলো চুল কপালের ওপরে। মাথা নেড়ে অন্যদিকে তাকায় সে। হাতে মুখের ওপরটা ঘষে, চোখ থেকে গালটা ঘষে। পরপর মাথা ঝাড়ে অল্প। নাক টেনে নার্সের উদ্দেশ্যে শুধায়,
“ও কেমন আছে এখন? পেইন কমেছে? আর মি…মিসক্যারেজ কেন হলো?”
কথা আঁটকে আসছে তার। নার্স জবাব দেয়,
“উনার ভ্রূণ জমজ। একটা সুস্থ আছে। কিন্তু ওয়াশ করাতে গেলে ওটাও চলে যাবে। আবার না করালে মায়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। আপনারা কি করবেন জানাবেন দ্রুত। আর মিসক্যারেজ কেন হলো এটা ডাক্তারের কাছে জেনে নেবেন প্লিজ। আমি কিছু বলতে পারছিনা।”
“ওর সাথে একটু দেখা করতে পারি?”
“হ্যাঁ, আপনি তো হাসব্যান্ড। চাইলে যেতে পারেন। তবে আরেকটু পর। আমি এসে জানাবো।”
বলে চলে গেল নার্স। অতসীর মা একপাশে পাথর বনে বসে আছে। ফারজাদের বাবা চেয়ারে বসে পড়েছেন, আর আরমান পাশে দাঁড়িয়ে। ফারজাদ মাথা নাড়ল।
সে চলে যায় শাঁর্টে লেগে থাকা র ক্ত পরিষ্কার করতে। ওয়াশরুম থেকে ফেরার সময় একদিকের করিডোরে চাচীমণিকে দেখল একা। উনার চোখ মুখ অন্ধকার। বুকের ভেতর বড় বোঝা চেপে রেখেছেন যেন। ফারজাদ তাকে দেখে জানতে চাইল,
“অতসীর ওখান থেকে এসেছ চাচীমণি? ওর সবকিছু কমপ্লিট? আজ বাড়ি নেওয়া যাবে?”
অতসীর মা হঠাৎ কেঁদে উঠল। নজর ফারজাদের দিকে, কিন্তু চোখে অশ্রুধারা। ঠোঁট চেপে বহুকষ্টে নিজেকে সামলাতে চাইছে। ফারজাদ এগিয়ে আসে, চেয়ারে বসিয়ে বলে,
“চাচীমণি। কাঁদছ কেন? ডোন্ট ক্রাই প্লিজ। অতসী তো ঠিক আছে। ডোন্ট ক্রাই। আর…” কণ্ঠ কেঁপে উঠে তার,
“তোমার মেয়ে অনেক বড় বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে গেল। এত মন খারাপ করছ কেন? অতসী বেঁচে গেল অনেক বড় যন্ত্রণা থেকে। কাউকে কোনো পাপ করতে হলো না স্বেচ্ছায়, সৃষ্টিকর্তা নিজেই ওকে নিয়ে গেল।”
অতসীর মায়ের একথা শুনে আরও অবস্থা খারাপ হয়। মুখে আঁঁচল চেপে কান্নায় নীরব ভেঙে পড়ল। চোখে মুখে অনুশোচনা, অপরাধবোধ।
“আরেহ, এভাবে কেঁদো না প্লিজ। একটু পর অতসীর জ্ঞান ফিরলে ওকেও তো সামলাতে হবে। কেঁদো না চাচীমণি।”
অতসীর মা চাঁপা কান্নায় ভেঙে পড়ে, থেমে থেমে বলে,
“আমার মেয়ের তো কোনোকিছুর ঠিক নেই সেই থেকে। সুন্দর জীবনের আশায় বেরিয়েছিলাম। সবটা যেখানে শুরু হয়, এক ধা ক্কায় ঠিক সেখানে গিয়েই পৌঁছে যায় আবার। কিছু ঠিক নেই আমাদের, আমার স্বামী, সন্তান— সবার জীবনের যা অবস্থা। সিনেমাকে হার মানাবে।”
তাচ্ছ্যিল্য গলায় বলে।
“এর মধ্যে আমার বোন এলো প্রাচীকে চেয়ে নিতে। প্রাচী মেনে যেতেই বিয়ের আমেজ। ওদিকে আমার স্বামী…সে দূরদেশে হাসপাতালে। আমার মেয়ের খাবার দাবার, স্বাস্থ্য— কিছুর ঠিক নেই। আমার রাগ হচ্ছিল ভীষণ। সবাই বিয়েতে মজেছে দেখেই রাগ হচ্ছিল। তোমার ওপর রাগ হচ্ছিল।”
কিছুটা কড়া হয় গলা,
“আমাদের জীবন তামাশায় পরিণত করে তোমার বোনের বিয়ের কথাবার্তা। যে জায়গায় আমার অতসীকে নিতে অসম্মতি জানাল, সেই জায়গায় প্রাচীকে চাইতে এসেছে। আবার কি সুন্দর মেনেও নিচ্ছে। তোমাদের একেকজনের একেক নিশ্চিন্ত জীবন। আমার সব শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছিল ফারজাদ। তোমায় দেখে আরও রাগ লাগে, ঘৃণা লাগে। ইচ্ছে করছিল তোমার জীবন থেকে কিছু কেঁড়ে নিয়ে একটু বুঝাতে— যে এমন আপনজনেদের কষ্টে দেখলে, নিজের মানুষদের ওপর বিপদ এলে কেমন লাগে।”
অস্থির হয়ে উঠে গলা,
“আমার ভেতর কিছু একটা হয়। অতসীর রুমে গিয়ে ওর পানিতে…”
আর বলতে পারল না। ফারজাদ থমকে বসে আছে। নীরবে শুনে গেছে চাচীমণির প্রতিটি কথা। অতসীর মা থামতেই নজর ফেলে তাকায়। সেই দৃৃষ্টিতে চেয়ে অতসীর মায়ের রুহটা কেঁপে উঠল। তাকে যেন খুনীর চোখে চাইল ফারজাদ— এমনটা মনে হয় তার।
কাঁঁদতে থাকে অবিরত।
অথচ ফারজাদ অভিযোগ ছাড়া, ব্যাস অজানা কোনো অনুভূতি নিয়ে চেয়েছিল। চাচীমণি এমনটা করেছে বোধ হয় বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার। কীভাবে হয় এমনটা? ফারজাদের সন্তান ছিল সে শুধু? অতসীর কেউ না? গেলে অতসীর কিছু যেত না? গেছে তো! অতসীর নাড়ি ছেড়া ধন চলে গেছে। তাহলে সবাই তাকে শাস্তি দিতে অতসীর অংশকেও কেন কষ্ট দিতে চায় বারবার। অতসী নিজেও তো এটাই চেয়েছিল একবার। ফারজাদ যদি অন্যায় করেও থাকে। তাহলে কেন তার ওপর শোধ না নিয়ে তার আপনজনেদের লক্ষ্য করতে হবে? প্রতিবার এমন কেন? ক্লান্তভাবে চোখের পলক ফেলে চাইল সে। ঢোক গেলে।
অতসীর মা হঠাৎ মাথা নেড়ে বলে,
“না , না ফারজাদ। আমি পরে আর ওটা দিইনি অতসীকে। আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছিল। আমি কি করছি বুঝতে পারছিলাম না। না জানি কোন শয়তানের প্ররোচনায় পড়েছিলাম ঐ মুহূর্তে। ঘোর ভাঙলে পানির বোতলটা অতসীকে আর দিইনি। কিন্তু…”
বলতে বলতে গলা কেঁপে উঠল, “কিন্তু আমার আপা…মানে নিবিড়ের বাবা মা চলে যাচ্ছিল বলে আরোহীকে দিয়ে আমায় ডাকতে পাঠায় সবাই। আমি ওর কাছে বোতলটা দিয়ে বলেছিলাম পানিগুলো ফেলে দিতে। তারপর তাড়াহুড়ো করে চলে যাই।”
কপালে হাত দিয়ে আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন,
“ওখানেই ভুলটা করে ফেলি। হয়তো অতসীর ওখানে রেখে এসেছে বোতলটা। আর আমার মেয়েটা খেয়ে নিয়েছে! না জানি কতটুকু খেয়েছে পানি।”
এরপর আপনমনে আহাজারি করতে থাকে,
“আমার ভুলে আজ এত বড় সর্বনাশটা হয়ে গেল। আমি আমার মেয়েটার বাচ্চাকে শেষ করে দিলাম। আমি মানতে পারছিনা। আমি এত বড় পাপ কি করে করতে গেলাম। ভুল বুঝে নিজেই সব ঠিক না করে কেন গাফিলতি করলাম! কেন!! হায় রব!!”
অতসীর মা কপাল চাপড়ায় নিজের করা ভুলে। বিলাপ করছে রীতিমতো।
“আমার মেয়েটা… আমার মেয়েটার নাড়ি ছেড়া ধন। আমি কি করে এমন ভাবনা মাথায় আনলাম। কি করে এত বড় গাফিলতি করলাম। হায় খোদা! আমার বিচার করো। আমি কি করে বাঁচবো। কি করে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। খোদা!! এটা কি করলাম আমি!!”
শরীর অসাড় হয়ে আসছে অতসীর মায়ের। নিজে নিজে বিলাপ করছে। আরমানকে এদিকে আসতে দেখা গেল। সে এসে চাচীকে কাঁদতে দেখে ভাবল অতসীর গর্ভপাত হয়েছে বলে কাদঁছে। সে সামলায় চাচীমণিকে। ক্রমশ বাড়ছে মহিলার আহাজারি।
নার্সকে বলে একটা খালি কেবিনে গিয়ে ঢুকাল আরমান। ফারজাদ তখনও যেমন ছিল ওভাবে বসে আছে চেয়ারে। কোনো নড়চড় নেই।
_
মিনিট বিশেক পর,
অতসী নিজের কেবিনে। বাচ্চাটা আর নেই শোনার পর থেকে কাঁঁদছে। বিছানায় শুয়ে কেমন গগনবিদারী চিৎকার তুলে কাঁদছে, সাথে পেট ব্যাথার যন্ত্রণা তো আছেই। ডি এন্ড সি করাবে বলেছিল। কিন্তু দেরি করছে কেন জানেনা ফারজাদ। তবে সময় পেয়ে মেয়েটার কাছেই রইল সে।
“সবাই আমাকে ছেড়ে দূরে সরে যাচ্ছে। আমার বাচ্চাটা নেই। ও চলে গেল। আমার বাবা নেই, বাবাও চলে যেতে চাইছিল। আমাকে ফেলে কোন দেশে পড়ে আছে, আমার বাচ্চাটাও চলে গেল। আমার সবাই কেন চলে যাচ্ছে। আমার কাছে কেউ নেই। আমার বাচ্চাটা কেন চলে গেল? আমি তো ঠিকমতো ওষুধ খাচ্ছিলাম, খাবার খাচ্ছিলাম সবার কথামতো। আমি ঠিকভাবে চললে ও সুস্থ থাকবে বলেছিল সবাই। তাহলে চলে গেল কেন? কেন চলে গেল ও?”
আর্তনাদ করে কাঁদছে সে।
“রিল্যাক্স অতসী। এত হাইপার হইয়োনা প্লিজ। তোমার শরীর খারাপ করবে। প্লিজ শান্ত হও একটু।”
ফারজাদের বাবা কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে। এসব নিবিড়কে ফোন করে জানিয়েছিল প্রাচী। সে নিজের মেজ খালার ভাসুরের ছেলের বিয়েতে এসেছিল। বেশি দূরে নয়, তাই তাড়াহুড়ো করে ফারিশ মহল চলে যায়। সেখান থেকে প্রাচীর মায়ের কথায় প্রাচীকে আর তার মাকে নিয়ে হাসপাতালে আসে। এখন ফিরোজ সাহেবের পাশেই দাঁড়িয়ে।
ভেতরে আসতে পারছেন না অনুমতি না থাকায়।
ফারজাদ অতসীকে শান্ত করতে চাইছে। কিন্তু পারছেনা কোনোভাবেই।
“মা কোথায়? আমার মা কোথায়? মাকে আমার কাছে আসতে বলো কেউ। আমার পাশে থাকবে মা। নাহয় মাও চলে যেতে চাইবে আমি জানি। আপনি এখানে আছেন ফারজাদ ভাইয়া, তাহলে মা কোথায়? মাকে আসতে বলুন না কেউ। আমার কাছে আসতে বলুন! আমার বাচ্চাটাও চলে গেল, বাবাও চলে যেতে চায়। মা টাও চলে যাবে। আমি কীভাবে বাঁচব? ডাকুন না।”
মাকে ডাকতে বলে প্রতিবার। কিন্তু তার মা কোনোভাবেই মেয়ের কাছে আসছেনা। এত এত কান্না, আহাজারি শুনেও পাষাণ মা -টা আসছেনা। অথচ তার আসার অনুমতি আছে। নিজেই পাশের সেই খালি কেবিনে বসে মুখ গুঁজে কাঁঁদছে। আকাশসমান অপরাধবোধ নিয়ে নিজের চোখে চোখ মেলাতে পারছেনা। কিন্তু সেসব খবর কারো নেই। ভেবেছে মেয়েকে এভাবে দেখতে পারছেনা বলে লুকিয়ে আছে, লুকিয়ে কাঁঁদছে মেয়ের কষ্টে।
অতসী বারেবারে ডেকে যায়। সন্তানের জন্য বিলাপ করতে থাকে। কেউ বললেও থামেনা।
ফারজাদ আবার ডাকে,
“অতসী?”
সে ঐ ডাক কানে নিলো না। নিজের মতো অস্থির গলায় বিলাপ করতে থাকে।
“হুশ হুশ! অতসীরাণী। রিল্যাক্স। চুপ করো। শান্ত থাকো, কাম ডাউন।”
তার মাথায় রাখা হাত সরিয়ে দেয় অতসী। চলে যেতে বলে তাকে। ধীরে ধীরে পেট ব্যাথার যন্ত্রণা নিয়ে চিৎকার তা কমে আসছে। ফারজাদ বলে,
“তোমার বাবার হার্টবিট গুণবে? লিসেন, এটা শুনো।”
অতসী একটু থামে, ঘনঘন শ্বাস টেনে ফুঁফিয়ে নাক টানল সে।
“হসপিটালে যখন ছিলাম, তখন চাচ্চুর পেশেন্ট মনিটর থেকে অডিও রেকর্ড করে নিয়েছিলাম তোমার জন্য। এই নাও শুনো।” ফোনটা তার কানে ধরে,
“চাচ্চুর হার্টবিট। তোমার বাবা কোথাও যায়নি। তোমার মাও আছে। তোমায় কাঁঁদতে দেখতে পারবেনা বলে লুকিয়ে আছে।”
ফোনটা অতসীর কানের কাছে ধরে তাকিয়ে রইল সে। মেয়েটার চোখ মুখ লাল হয়ে আছে কান্নার ফলে। ফারজাদেরও মন চাইছে চাচীর মতো লুকিয়ে থাকতে কোথাও। তারপর না কাঁদলেও ইচ্ছেমতো চিৎকার করতে পারতো। জিনিস ভাঙচুর করে হোক, নিজের চুল ছি ড়ে হোক। কোনো একভাবে ভেতরে অপারগতার যে আগুণ তা নেভাতে পারতো। কিন্তু পারছে কই!
অতসীর দিকে অনেকটা ঝুঁকে থাকল সে। চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে আনমনে বিলি কাটতে লাগল। অতসী সত্যি সত্যি বাবার হৃৎস্পন্দন গুণছে। পেটে অল্প যন্ত্রণা নিয়েও ধরতে গেলে নীরব সে।
ফারজাদ বলে,
“দেখেছ? হি ইজ উইথ ইউ। চাচীমণিও আছে। সবাই আছে। যে নেই সে তো অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। কিছুদিন পর দেখবে আর খারাপ লাগবেনা। ইউ উইল গেট ইউজড টু ইট। এত কেঁদে নিজেকে অসুস্থ…”
সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটে কোমল হাতের আ ঘা ত এলো। অতসী হালকা হাতে থা প্প র দিয়েছে। গালে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু আন্দাজে সঠিকভাবে পারেনি।
“খারাপ লোক। খারাপ বাবা আপনি। আমি ওকে ভুলে যাব কি করে বলেন? আপনি যাবেন ভুলে। আপনার তো কিছু যায় আসেনা। নয়তো আপনার কষ্ট হচ্ছেনা কেন? আবার আমায় বলেন আমি আমার সন্তানকে ভুলে যাব? সবাই আছে কেন বলেছেন? আমার বাবুটা নেই। ও কে আপনি গোণায় ধরেন নি। কেন ধরেন নি? ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
ফারজাদ আ ঘা ত দেওয়া সেই হাত স্বীয় হাতের ভাঁজে নেয় কোমলভাবে। অতসীর কথার বিপরীতে বলে,
“আচ্ছা, ও সবচে গুরুত্বপূর্ণ। আমি ওভাবে বলতে চাইনি। আমি সরি হ্যাঁ?”
অতসী কেঁদে উঠল ঠোঁট চেপে,
“ও ম রে গেল ফারজাদ ভাইয়া। আপনি কেন বাঁচালেন না? তখন তো আপনিই এসেছিলেন। দেখেছেন তো! ওকে বাঁচাতে পারলেন না! একটু তাড়াতাড়ি আনতে পারলেন না আমায়? ও ম রে গেল।” মাথাটা নির্জীবভাবে বালিশে ফেলে ক্লান্ত গলায় বলে উঠল সে। চাঁপা কান্না তখনও তার কণ্ঠে।
বিড়বিড় করে সে,
“কেন বাঁঁচাতে পারলেন না! চলে গেল এভাবে! আমায় একা ফেলে সবাই খালি চলে যেতে চায়। ও চলে গেল।”
ফারজাদের বুকের ভেতরটা বারেবারে কেঁপে উঠছে অতসীর একেক আহাজারি শুনে। পুরুষ বলে অনুভূতি দেখাতে পারেনা সে। কিন্তু পাষাণ দেখতে বুকের ভেতরটাই যাদের স্থান দিয়েছে, তাদের জন্য খুবই সংবেদনশীল জায়গাটা। অনাগত সন্তানটা পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার দোষে জীবন মরণ পর্যায়ের যুদ্ধ করে গেল দু-দু’বার। এত যুদ্ধ শেষেও পারল না জীবন সংগ্রামে জিততে। এই দ্বায় তো ফারজাদের। তার ওপর এত এত যে ঝড় ঝাঁপটা গেল, সবকিছুর দ্বায় ফারজাদের। এত এত অপরাধের ভার মাথা পেতে নেওয়া ছেলেটা বাবা হিসেবেও ব্যর্থ বের হলো! মন চায় অতসীর মতো চিৎকার করতে। না কাঁদুক! ভেতরের সবটা উগড়ে দেওয়া একটা তৃপ্তিদায়ক চিৎকার দিতে পারলে অনেকটা হালকা লাগত।
সে অতসীর বিলাপ শুনে, বিড়বিড় করা কথাগুলো শুনে অকস্মাৎ কাছে বলে,
“অতসী! তোমার কাছে আজ আবার কিছু চাইব। সেই একই জিনিস না। ক্ষমা চাইব না আর। একটু ভিন্ন। তুমি আজ উত্তর দাও। দিয়ে দাও আজ উত্তর। আমি এরপর আর কোনোদিন তোমার কাছে এই চাওয়া নিয়ে দাঁড়াব না। এই প্রথম আর শেষ। আজ জবাব দিয়ে দাও।” থেমে তার খুব কাছে ঝুঁকে বলে,
“আমায় বিয়ে করবে? আমার হয়ে যাবে তুমি? তুমি চাইলে আবার বাবু দেব। না চাইলে মরণের আগ অব্দি তোমায় ছুঁবো না। কিন্তু আমার হয়ে থেকে যাও। এভাবে আর পারছিনা। আর সইতে পারছিনা। সম্ভব হচ্ছেনা।”
অতসী একটুও রাগল না। না তো উত্তেজিত হলো। তার যন্ত্রণাও কমে এসেছে, সে ওপরের দেয়ালে নজর ফেলে আছে। বলে,
“বাবার এই ঘটনার পর ঠিক করেছিলাম আপনি আরেকবার আমায় চাইতে আসলেই রাজী হয়ে যাবো। আমার সুন্দর জীবনের চেয়ে আমার সন্তানের সুন্দর জীবন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ও-ই তো নেই আর। আমাদের এক হওয়ার ফায়দা কি?”
পাগলের মতো করলো ফারজাদ হঠাৎ। অতসীর হাত ধরে আকুতি করছে সে রাজী হওয়ার সিদ্ধান্তে এসেছিল শুনে,
“এই মেয়ে, এই! আমায় লোভ দেখাচ্ছ! ও থাকলে মেনে নিতে? মিথ্যা বলছ তুমি? এখন মেনে নেবেনা? প্লিজ! অতসীরাণী। ভালোবাসি তোমায়। আমার ওপরও দয়া করো একটু!”
অতসী শান্তভাবে হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়।
“সেদিন বলেছিলেন না! ঐ তীব্র মুহূর্তে আপনাকে নিয়ে কি কি ভাবনা আমার মধ্যে আছে বলে উপলব্দি করেছি— সেসব নিজেই খুঁজে বের করতে?
আমি খুঁজে বের করেছি।
আমি বিশ্বাস করি আপনি বদলে গেছেন, আমার এখন আপনার ওপর ভরসা হয়, যে আগের মতো কিছু করবেন না। মেনে নিয়েছি আমায় ভালোবাসেন।
কিন্তু নিজেকে আপনার সাথে মেনে নিতে কষ্ট হয় আমার। আমার সন্তানও নেই। এতকিছুর পর সেই সবকিছুর মূল আপনিটার কাছে ফিরে যাব ভাবলে আমার খুব হীন লাগে নিজেকে। মেনে নিতে পারিনা আমি।
শুনেছি মানুষের মন বুঝা খুব কঠিন কাজ। কখন কি চায় বলা মুশকিল। আমার মন কখনো বদলে যাবে কি না জানিনা। কিন্তু আপাদত এগুলোই আমার ধারনা, এগুলোই আমার জবাব। এখানেই আপনার উত্তর।”
ফারজাদ তবু প্রচণ্ডরকম তৃপ্তি অনুভব করলো। অতসীর মাথার পাশে একই বালিশে মুখ গুঁজল হঠাৎ। গভীর নিঃশ্বাস ফেলছে। তার প্রতি বিশ্বাস আছে অতসীর, সে যে ভালোবাসে এটাও মানে। তার চাওয়া দুটোর একটা এটাই তো ছিল। এমন একদিনে এই স্বীকারোক্তি পাবে ভাবেনি। অতসীর মধ্যে তাদের অংশটা এখন আর নেই। বাচ্চাটা জানতেও পারল না তার মা তার বাবাকে এখন বিশ্বাস করে, মা তার বাবার ভালোবাসায় ভরসা করেছে, ভালোবাসে এটা মেনে নিয়েছে। ফারজাদের সেই চাওয়াদুটোর একটা পূরণ হয়েছে।
সে এতেই তৃপ্তি পেয়ে গেল। আর কোনো প্রশ্ন করল না। জবাব চাইল না।
সে উজাড় করে দেবে নিজের ভালোবাসা। কিন্তু এবার অতসীর কখনো তার প্রতি ভালোবাসা জাগলে হয় ফারজাদ নিজেই তা বুঝে নেবে। নাহয় খোদ অতসী জানাবে। তবে কথামতো তার হওয়ার দাবি নিয়ে আর কখনো অতসীর সামনে দাঁড়াবে না। তার হবে কিনা জানতে চাইবে না। যেদিন ক্ষমা করবে, সেদিন হয়তো আপনা আপনি ভালোওবেসে ফেলবে। কিন্তু আর কিছু চাইতে যাবেনা। যদি বেশি চাইতে গেলে যা পেয়েছে তাতেও নিজেরই নজর লেগে যায়?
সে অতসীর চুলের ওপর নাক ডুবিয়ে বালিশে মাথা রেখে আছে। হাতটা অতসীরই চুলের ভাঁজে। দু’জনের শ্বাস প্রশ্বাস একই গতিতে চলছে যেন। ফারাজাদ অনুভব করতে পারছে। ওভাবেই থাকে সে।
এর মধ্যে এক নার্স তাড়াহুড়ো করে এসে বলে,
“স্যার, ম্যাডাম। আমি খুব দুঃখিত। একটা মিস্টেক হয়ে গেছে। আসলে জমজ বাচ্চা মিসক্যারেজের কেসটা আপনাদের না। অন্য এক পেশেন্টের। আপনাদের সন্তান ওপরওয়ালার অশেষ রহমতে বেঁচে আছে। সময়মতো নিয়ে এসেছেন, আর ব্লিডিং বেশি হয়ে যাওয়ার আগে থামাতে পারায় ভ্রূণটা বেঁচে গেছে। আসলে আপনাদের আগে আগে আরেকটা পেশেন্ট এসেছিল সেইম কেইসের। আমি ওটার সাথে আপনাদের গুলিয়ে ফেলেছি। এখনো D&C করাতে বলছেনা বলে ডাক্তারকে মনে করাতে গিয়ে ভুলটা ধরতে পারলাম। আমি ভীষণ দুঃখিত আপনাদের ক্ষণিকের বিড়ম্বনায় ফেলার জন্য। আমায় ক্ষমা করে দেবেন প্লিজ।”
লেখিকার কথাঃ সমাপ্তিটা খোলামেলা। ওপেন এন্ডিং যাকে বলে। আমি বরাবরই বলে এসেছি গল্প মানেই হ্যাপি এন্ডিং স্যাড এন্ডিং না। গল্পে আরও নানান বিষয়বস্তু থাকে। এই গল্পের অন্যতম জনরা মনস্তাত্ত্বিক। সেই অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ সকল চরিত্রের দিকগুলো আমার অনুযায়ী ফুঁটিয়ে তুলেছি। সব তো পড়েছেন। গল্পটা সম্পূর্ণ পড়েছেন। শুরু থেকেই পড়েছেন। এবার সেই সমস্তকিছু বিবেচনায় আপনাদের নিজস্ব বিচার অনুযায়ী কি মনে হয়! এই পর্যায়ে ওরা এঁকে অপরকে মেনে নিয়েছে? মানে অতসী কি মেনে নিয়েছে এরপর? নাকি মানেনি? সেটা আপনাদের নিজস্ব ধারণার ওপর ছেড়ে দিলাম। যে সবটা মিলিয়ে মনে করেন যে, মানেনি। সে ভেবে নিন ওদের মিল হয়নি। আর যে সবটা মিলিয়ে মনে করেন যে, মেনে নিয়েছে। সে ভেবে নিন ওদের মিল হয়ে গেছে।
আমি মেনে নিয়েছে ভাবার মতো কারণও গল্পজুড়ে দিয়ে এসেছি। আবার মেনে নেয়নি ভাবার কারণও দিয়ে এসেছি।
ফারজাদের অপরাধটাকে অপরাধ হিসেবে গভীরভাবে মার্ক করে দেখিয়েছি যেমন, তেমন ওর ভালোবাসাটাও উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে ধরে এসেছি।
এবার ভেবে নিন যা ভাবার।
আর এই গল্পের শেষটা এভাবেই দেওয়া ছিল। সেই ৭/৮ পর্বে যখন শেষ হচ্ছিল, তখনও এমন ওপেন এন্ডিং ছিল। অতসী ভরা আসরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। ফারজাদকে অতসীর বাবা ফিরিয়ে দেয়। এদিকে সে মনে মনে ঘটনার দিন যে বিয়ে করে নিয়েছিল এটা ভাবে। ব্যাস এখানেই শেষ ছিল গল্প। ওটাও ওপেন এন্ডিং ই ছিল। আজও তেমনটাই আছে। তাই সেইফ প্লে করেছি ভাবার কারণ নেই। টেনেটুনে ১০০-২০০ পাঠকের রিয়েক্ট, আর মন্তব্যঘর খালি নিয়ে এগোলেও এভাবেই শেষ হতো এটা।
আর মনস্তাত্ত্বিক ধারার গল্প পড়েছেন, মনস্তাত্ত্বিকভাবেই শেষটা চিন্তা করে নিন। যেহেতু সবার মন মানসিকতা সেইম হয়না, বিষয়বস্তু বিবেচনার দৃষ্টিভঙ্গি সেইম হয়না। তাই অর্ধাংশ পাঠকের হয়তো পছন্দ হবেনা সব মিলিয়ে যেভাবে সমাপ্তি টেনেছি সেটা। পাঠক হিসেবে অধিকার আছে অপছন্দের বিষয়টা জানানোর। ভুলত্রুটি থাকলে তাও ধরিয়ে দেবেন সচেতন পাঠক হিসেবে।