প্রাচী পরদিন আবার কলেজে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই চলছিল সবটা। কিন্তু ক্লাসরুমে গিয়ে বসে চারপাশটাই একটু মনোযোগ দিতেই খেয়াল করলো তাকে আড়চোখে ঘুরেফিরে দেখছে সবাই, সাথে আছে নিজেদের মধ্যে ফিসফিসানি। স্বাভাবিকভাবেই একটু নড়েচড়ে বসলো সে। ফোন বের করে ক্যামেরায় নিজেকে দেখে নিলো সব ঠিকঠাক কিনা!
না কিছু হয়নি।
তাহলে সবাই এমন বাকাচোখে দেখছে কেন? আর এত ফিসফিসানিই বা কীসের? কপালে ভাঁজ পড়ে তার। সাথে একটু সংকোচে পড়ে যায় নিজেকে নিয়ে।
ফোন হাতে বান্ধবীদের ফোন দেয়, বিড়বিড় করছে,
“ফোন ধর, ধর”
কিন্তু ফোন ধরল না কেউ। না মেসেজ সিন করলো। প্রাচী ভাবলো হয়তো গাড়িতে তারা। সে কোনোরুপ কথাবার্তা ছাড়া নিজের মতো বসে অপেক্ষা করতে থাকল। মিনিট কয়েকপরই তার বান্ধবী সামিহা, আর নিঝুমকে দেখা যায় ক্লাসে ঢুকতে।
প্রাচী তাদের দেখে হাত দেখাল। সামিহা আর নিঝুম তার ওখানটাই আসলে সে জায়গা দিতে দিতে বলে,
“এসেছিস তবে! আমি সেই কবে থেকে অপেক্ষা করছিলাম। ফোনও ধরলিনা কেউ।”
নিঝুম কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে, রোদ থেকে আসায় ক্লান্তি চেহারায়,
“রিকশা পাচ্ছিলাম না দোস্ত। তাই লেট হলো। আমার ফোনটাও সাইলেন্ট ছিল। রিকশা থেকে নেমে তোর কল দেখলাম। তাই আর ব্যাক করিনি।”
“সে ভালো। কিন্তু সবার আগে বল আমায় দেখতে কি উইয়ার্ড লাগছে কোথাও?”
সামিহা বোতল থেকে পানি খেয়ে গাল মুছল। প্রাচীর কথায় ভ্রু কুঁচকে তার দিকে চেয়ে বলে,
“না তো! উইয়ার্ড দেখাবে কেন? তোর কি শেয়ালের মতো লেজ আছে?”
“এক্স্যাক্টলি আমিও এটাই ভাবছি। কোথাও কোনো অস্বাভাবিক কিছু পাচ্ছিনা। কিন্তু ক্লাসে এসে বসার পর থেকে দেখছি সবাই আমাকে দেখছে আড়চোখে। নিজেদের মধ্যে গসিপও করছে। মানে বুঝলাম না কিছু।”
প্রাচীর চিন্তিত গলায় কথাটা বলতে না বলতে সামিহা আর নিঝুম কিছু মনে পড়তে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। সামিহা বলে,
“ওয়েট ওয়েট! তোকে কাল এত ফোন দিচ্ছিলাম রিসিভ করলি না কেন? ফোন কোথায় তোর? অনলাইনেই তো ছিলিনা। কল ঢুকেনি একটাও। এদিকে কতকিছু হয়ে গেল।”
এমন কথায় প্রাচী কিছুটা ঘাবড়ে যায়। নড়েচড়ে তাকায়।
“কতকিছু হয়ে গেল মানে? কি হয়েছে রে?”
নিঝুম আর সামিহা এঁকে এঁকে সব জানায়। গতদিন প্রাচীকে প্রফেসর নিবিড়ের সাথে অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখেছে কিছু ছাত্র-ছাত্রী। ছবি তুলে নেয় তারা। স্টুডেন্টদের হোয়াট’স গ্রুপে সেই ছবি দিয়ে দীর্ঘসময় ধরে নানান চর্চা করা হয়। প্রাচী আর প্রফেসর নিবিড়কে নিয়ে নানানরকম কথা ছড়িয়ে গেছে সকলের মধ্যে। তাদের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক আছে সকলে নিশ্চিত এখন। তবে কলেজের প্রফেসরের সাথে ছাত্রীর সম্পর্ক কেউ স্বাভাবিক চোখে দেখছেনা। প্রাচীর চরিত্র নিয়ে কথা তুলতেও ছাড়েনি কেউ কেউ। আর এই বিষয়গুলো কলেজের কমবেশি সব ছাত্র ছাত্রীই জেনে গেছে ইতোমধ্যে।
সামিহা আর নিঝুম প্রাচী আর তাদের প্রফেসর নিবিড়ের মধ্যে এমন কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে এই নিয়ে কিছু জানত না। প্রাচী তার সাথে কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা সম্পর্কে তাদের কিছুই জানায়নি। সে ঐদিন কাউকে না জানিয়ে ফুফির বাড়ি চলে গিয়েছিল বলে বাড়ির সবাই বিচলিত হয়ে তাদের ফোন করে - এমনটা জানায় শুধু।
তাই এসব সম্পর্কে ধারণা না থাকায় গ্রুপে ছবিগুলো দেখেই প্রাচীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল। কিন্তু পারেনি।
প্রাচী সব শুনে হতবম্ব। বিমূঢ় চোখে চারদিকে তাকায় সে। এখনো চলমান তাকে নিয়ে ফিসফিসানি।
“কীরে? কিছু বল? হট টপিক হয়ে আছিস পুরো ক্লাসে। এমনকি অন্যান্য ব্যাচের সিনিয়র জুনিয়ররাও অনেকে জানে, দেখেছে। সবার মুখে মুখে তোদের কথা। ছবিগুলোতে ওভাবে ছিলি কেন তোরা? কিছু তো বল!”
প্রাচী জবাব দিল না। টেবিলে রাখা নিজের ফোনটা নিয়ে গ্রুপে ঢুঁকে সেই সব মেসেজগুলো দেখে।
সেখানে হুলস্থুল লেগে গিয়েছিল রাতে। ছবিগুলো দেখে প্রথমে সবাই বিস্মিত হলেও আস্তে আস্তে নানান হাসি তামাশা শুরু করে। করারই কথা। নিবিড় যখন শেষদিকে রেগে তার অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছিল, তখনকার ছবিই তুলে নিয়েছে কেউ। প্রফেসরের সাথে এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ছবি— বিষয়টা দৃষ্টিকটু। প্রাচীর নিজেরই ছবিটা দেখে সংকোচ লাগল লজ্জ্বায়। এঁকে এঁকে স্ক্রল করে তাকে আর নিবিড় স্যারকে নিয়ে বলা নানান অপ্রীতিকর কথা ভেসে উঠল। প্রাচীর চরিত্র নিয়েও হাসি ঠাঠ্ঠা হয়েছে। তাদের প্রফেসরের সাথে প্রাচীর অবৈধ মেলামেশা আছে— এমনটা ধারণা অনেকের।
সে আর দেখতে পারলো না। লজ্জ্বায়, অপমানে গা শিউরে উঠে।
“এসব না দেখে এটা বল, ওভাবে ছিলি কেন তোরা?”
“এই প্রাচী! প্রফেসরের সাথে তোর প্রেম চলছে? কখন কীভাবে হলো এসব? আমরা জানলাম না কেন? আর করছিসই যখন আরেকটু সামলে থাকতি। এখন খুব বাজেভাবে চর্চা হচ্ছে রে!”
প্রাচীর মাথা খারাপ হয়ে আছে এসব দেখে। অপমান আর রাগে কি করবে বুঝে আসছেনা। সবাই প্রাচীকে নিয়েই করলো যত হাসি ঠাঠ্ঠা। প্রাচীর চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তুলল শুধু। সে নাকি নিবিড়কে ফাসিয়েছে!
লেখাটা পড়ে অপমানে গা শিরশির করছে তার। সামিহা আর নিঝুমের একের পর এক প্রশ্ন। এমনকি পাশের বেঞ্চগুলোতে বসা মেয়েগুলো কান পেতে আছে। প্রাচী কান্না আঁটকায়, তীব্র আক্রোশ নিয়ে বান্ধবীদের উদ্দেশ্যে জোরগলায় বলে,
“কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই। আমার খেয়ে ধেয়ে কাজ নেই কলেজে এসে প্রফেসরকে ফাঁঁসাবো? বরং তোদের ঐ প্রফেসরই আমায় বিয়ে করতে উঠেপড়ে লেগেছে বুঝেছিস? বিশ্বাস না হলে তাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস কর।”
কথাটা বলে এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। হনহন করে বেরিয়ে যায় সে। নিঝুম আর সামিহা ডাকলেও শুনল না। এমনকি তাদের দিকেই ছিল ক্লাসের সবার নজর। তারাও প্রাচীর কাছে পাওয়া নতুন তথ্য নিয়ে আলোচনা শুরু করে।
প্রাচী কলেজে বান্ধবীদের সাথেই যাতায়াত করতো আগে। কিন্তু সেদিনের ঘটনার জেরে আজ থেকে কলেজে যাতায়াতের জন্য বাড়ির একটা গাড়ি বরাদ্দ করে দেওয়া হয়েছে তাকে। প্রাচী নিষেধ করলেও শুনেনি তার বাবা।
কিন্তু কলেজে এসে ক্লাস না করে বেরিয়ে আসায় গেইটে আর গাড়ির দেখা পেল না। হয়তো কোনো কাজে গিয়েছে। রিকশাও দেখা যাচ্ছেনা। ক্রোধান্বিত প্রাচী মাথার ওপর রোদ নিয়ে হাঁটা ধরে বাড়ির রাস্তার উদ্দেশ্যে।
কিছুদূর এগিয়ে মূল রাস্তায় উঠে দাড়াতেই কোথা থেকে নিবিড় এলো।
“প্রাচী? তুমি এখানে কেন?”
সে কপালে ভাঁজ ফেলে পাশে তাকাল। নিবিড়ের কপালেও একই ভাঁজ।
“কি হলো? এতক্ষণে ক্লাস শুরু হবে তোমাদের। তুমি এখানে কেন এই টাইমে? কোনো সমস্যা?”
প্রাচী নিবিড়ের দিকে একনজর চেয়ে শক্ত চোয়ালে জবাব দেয়,
“সেই কৈফিয়ত আপনাকে দেব না।”
নিবিড়ের কপালের ভাঁজ সরেনা। তবে প্রাচী কোনো কারণে রেগে আছে বুঝে একটু নরম হয়,
“হোয়াট হ্যাপেন্ড প্রাচী? রেগে আছ কেন? এনিথিং রং?”
বলতে বলতে অল্প করে হাত ধরেছে তার। প্রাচী ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিল।
“ছুঁবেন না একদম। বিয়ে হয়েছে মানে কিনে নেন নি যে যেখানে সেখানে হাত ধরবেন, কাছে আসবেন। তারপর কেউ একটা দেখে নিলে বলবে মেয়ে খারাপ। প্রতিবার আপনিই যে কাছে এসে পড়েন সেসব কারো চোখে পড়বেনা। আমিই হবো খারাপ। তারপর ছবি তুলে পুরো কলেজে বদনাম হবে প্রাচী প্রফেসরকে ফাঁসায়। জগন্য একেবারে। ছাড়ুন আমায়।”
নিবিড় বুঝল ঘটনা। মনে পড়ল কাল তাদের ছবিগুলো নিয়ে যা যা হয়েছে সবটা। অন্য এক কাজে কলেজে ছুটি নিয়েছিল সে আজ। কিন্তু কালকের ঘটনাটি সবার মুখে মুখে হয়ে যাওয়ায় প্রিন্সিপ্যালের কানেও গেছে। সে এসেছিল একারণেই। কাবিননামার কাগজটাসহ নিয়ে প্রিন্সিপ্যালের সাথে দেখা করে এসেছে। যদিও তার ডাক পড়েনি তখনও। কিন্তু নিজের খামখেয়ালিপণা যেহেতু ছিল, কলেজের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে বিয়ের বিষয়টা জানানো উচিত। একারণে জানিয়ে এসেছে সবটা। আজ প্রিন্সিপ্যাল নিজেই হয়তো সবার কাছে তাদের বিয়ের বিষয়টা জানিয়ে দেবে যাতে আলোচনা সমালোচনা থেমে যায়। কিন্তু কাল ওসব দেখার পর, প্রাচীর মনের অবস্থা চিন্তা করে তার সাথে কথা বলতে চেয়েও আর যোগাযোগ করা যায়নি। তবু অনলাইনে নেই দেখে খুশি হয় ওসব তার চোখে পড়েনি ভেবে। যায় হোক, নিবিড় গাঁঢ় নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলে,
“ঐ ঘটনাটা আজকেই মিটমাট হয়ে যাবে। ডোন্ট ও্যরি প্রাচী। আর এত রেগে থেকো না! এখন চলো তো গাড়িতে উঠো। রোদে লাল হয়ে গেছ।”
প্রাচীর রাগ তখনও কমেনি। প্রথমে অসম্মতি জানায় নিবিড়ের গাড়িতে উঠতে। কিন্তু সে দুয়েকবার নরমভাবে বলার পরও না উঠলে ধমকে তুললো।
প্রাচীর অনিচ্ছাস্বত্তেও উঠে। নিবিড়ের সাথে রেস্টুরেন্টে যায়। কিছু খাইয়ে বাড়িতে মা বোনের জন্যও প্যাক করে নিলো নিবিড়। পরপর ফের উঠে গাড়িতে।
এবারে বাড়ির রাস্তায় না গিয়ে অন্যদিকে যাচ্ছে দেখে প্রাচী কপালে ভাঁজ ফেলে তাকায়,
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আবার? সব আপনার মনমতো নাকি? আমার বাড়ির রাস্তা এটা না। আপনার অন্য কোথাও কাজ থাকলে আমায় নামিয়ে দিন। আমি রিকশা নিয়ে চলে যাবো।”
নিবিড় একটা গান চালু করে দেয় গাড়িতে। আর প্রাচীকে বললো,
“আহমেদ ভিলা যাচ্ছি। তোমার শ্বশুর বাড়ি। ওটাই তোমার আসল ঠিকানা। তাই ভয় পেতে হবেনা।” পরপর থেমে বলে,
“আর বাড়ির চিন্তা করো না। কলেজে ছুটি হওয়ার সময় এখনো অনেক বাকি। ঠিক টাইমে ফারিশ মহল পৌঁছে যাবে। আর না পৌঁছালেও এত প্যারা নেওয়ার দরকার নেই। আসল গন্তব্যেই যাচ্ছ, অন্য কোথাও না। তাছাড়া তোমার ভাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে তার বোনকে নিজের শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।”
প্রাচী বিস্ময়ভরা নয়নে চেয়ে রইল। আর নিবিড় গানের লাইনের সাথে ঠোঁট মেলাচ্ছে আপনমনে। সে গান বন্ধ করে দেয় রেগে। নিবিড় কপালে ভাঁজ ফেলে তাকায়। ফের চালু করে। প্রাচী ফের বন্ধ করে কয়েকবার বললো গাড়ি থামাতে। কিন্তু থামাল না।
শেষে সিটবেল্ট খুলে নিবিড়ের কাছে এগিয়ে আসে। স্টিয়ারিং এ থাকা হাত জবরদস্তি থামাতে থামাতে নিবিড়ের গায়েও আ ঘা ত করতে লাগল।
“থামান বলছি। আমি কোথাও যাব না। আপনার বাড়িতেও না। থামান গাড়ি।”
নিবিড় তার এমন করায় রাস্তায় গাড়ি বেশি দেখে একপাশে থামাল নিজেরটা। প্রাচী সঙ্গে সঙ্গে নেমে যাওয়ার জন্য পা বাঁড়ায়।
কিন্তু পারল না। তার আগে তাকে আঁটকে কোলে তুলে বসিয়ে নিয়েছে নিবিড়।
“কি সমস্যা? এত জেদ করো কেন হ্যাঁ? এই মাঝরাস্তায় কোথায় যাবে?”
“অভদ্র প্রফেসর।”
রাগে নাক লাল হয়ে এসেছে প্রাচীর। সে নিবিড়ের এই কাজে রাগে কাপঁছে রীতিমতো। কথাটা শুনে নিবিড় অতি সন্নিকটে ক্রোধের লালিমা নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে থাকা প্রাচীর দিকে তাকায়।
এক মুহূর্তের জন্য অন্য ঘোরে চলে গেল হয়তো সে। প্রাচীর কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো গোলাপের সুভাস দিচ্ছে। সে ধীরে কিছুটা এগিয়ে তার নাকটা আনলো প্রাচীর ঠোঁটের খুব কাছাকাছি। আনমনে চোখ বন্ধ করে গোলাপের ঘ্রাণটা টেনে নিলো। প্রাচী নিঃশ্বাস আঁটকে নেয়। কোমরে থাকা হাত দুটো খামচে ধরে। নিবিড় আরেকটু চাপ প্রয়োগ করে কাছে আনে। তার ঠোঁটের দিকে ঘোরলাগা দৃষ্টি রেখে নাক সরিয়ে ধীরে স্বীয় ওষ্ঠ আনলো সেথায়। সে ছুঁয়ে দেয়। কিন্তু প্রাচী সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে নরম গালে ছুঁয়ে গেল ঠোঁটের পরশটুকু।
অকস্মাৎ রাস্তা বেয়ে যাওয়া কোনো গাড়ির হর্ণে নিবিড়ের ঘোর ভাঙে। তবে সরে এলো না একটুও। বরং ধ্যান ফিরতেই কিছুপল নিজেকে বুঝতে ব্যয় করলো। কিছু বিষয় মাথায় আসে, কিছু যায়। সেকেন্ড কয়েক কাটে। সে দু’চোখ বন্ধ করে দম নেয়। পরপর খুলে ক্রোধান্বিত প্রাচীর ফিরিয়ে রাখা মুখটায় হাত রেখে নিজের দিকে ফেরাল। মেয়েটার ঠোঁটে হঠাৎ কামড় বসিয়ে দিল। প্রাচী আর্তনাদ করে উঠে। তবে এর বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় পেল না। তার আগে কামড় খাওয়া জায়গায় নিবিড়ের ঠোঁটের মোলায়েম স্পর্শ অনুভব করে।
তার হাত নিবিড়ের কাঁধের শাঁর্টে। ওখানটাই প্রাচীর নখ দেবে যাচ্ছে যেন। ছাড়া পেতেই ঘনঘন শ্বাস টেনে বলে,
“অস ভ্য প্রফেসর।”
“তোমার কাছে অভদ্র হলাম, অস ভ্য হলাম।”
কাঁধে রাখা হাতটা তুলে নিবিড়ের বুকের দিকে হালকা হাতে কি ল দিয়ে আবার বলে,
“আমি আপনার বাড়ি যাবো না।”
রাগ তখনও তার চোখে-মুখে। নিবিড় জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। ওখানে লেগে থাকা স্বাদটুকু যেন খেয়ে নিল। পরপর বলে,
“একশো বার যাবে। আর ওটা শুধু আমার বাড়ি না। বলো আমাদের বাড়ি।”
“আমি যাবো না।”
“যাবে। মা অপেক্ষা করছে।”
“ওদের জানিয়েছেন?”
“হু, জানাবো না? আমার বোনেরা তাদের ভাবি আসবে বলে এক্সাইটেড।”
“নিবিড় স্যার!!”
“উহু, নিবিড় ডাকো শুধু। স্বামীকে স্যার কে ডাকে?”
_
আজ অতসীরা চলে যাচ্ছে। তাদের বিদায় জানাতে অতসীর ফুফিরা-খালারা সবাই এসেছিল মহলে। সকলকে বিদায় জানিয়ে সময়মতো বের হয় তারা। আরমান আর অতসীসমেত তার বাবা-মাই বের হয় শুধু। আরমান যাবে অন্য এক গাড়িতে সব জিনিসপত্র নিয়ে। আর অতসীর বাবা বাড়ির কাউকে বিদায় জানানোর জন্য এয়ারপোর্ট আসতে নিষেধ করে দিয়েছে।
উহু, মান অভিমানের জেরে না। ব্যাস এয়ারপোর্ট থেকে আপন মানুষদের ফেলে যাওয়ার দুঃখ যাতে এড়ানো যায় তাই বাড়িতেই সব পুরনো স্মৃতি, আর আপনজনেদের রেখে এসেছেন।
হ্যাঁ অতসী বাবা-মায়ের সাথে নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, আর নতুন জীবন পাওয়ার লক্ষ্যে ভীন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে আজ। বেরিয়ে পড়েছে সে বাবা-মায়ের সাথে। তার জীবনের সবচেয়ে বিশ্বাস আর ভরসার স্থান যে দুটো মানুষ— তাদের সাথে নতুন জীবন পাওয়ার লক্ষ্যে দেশ ত্যাগ করবে সে।
অতসী চলন্ত গাড়িতে বসে জানালা দিয়ে নিজ দেশের হাওয়া-বাতাস অনুভব করতে পারছে, যা সে আজ ছেড়েছুড়ে চলে যাবে। আফসোস আলোটুকু দেখার সামর্থ্য নেই। তবে মাটির ঘ্রাণটা বেশ অনুভব করতে পারে। কারণ অতসীদের সুস্থ ইন্দ্রিয়গুলো একটু বেশিই প্রকট হয়!
সে জানালা দিয়ে হাওয়া লাগাতে একটু হাত বের করতে চাইল। তবে সাথে সাথে আলতো ঝাড়া লাগে হাতে। তার মা ঝাড়া মে রে ঢুকিয়ে নিয়েছে,
“মা র খাবি অতসী। যাওয়ার মুহূর্তে বিপদ ডাকার শখ জেগেছে?”
অতসী পাত্তা দিল না মায়ের কথায়। সামনে ড্রাইভিং সিটের পাশে বসা বাবার উদ্দেশ্যে বলে,
“বাবা! ওখানে গিয়ে আমায় একটা মিউজিক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে ঠিক আছে? আমার সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগেনা। ওখানে তো আমি বেরুলে সমস্যা হবেনা তাইনা?”
“কোনো সমস্যা হবেনা মা। কিন্তু মিউজিক স্কুলে তো সম্ভব না! একাডেমিক স্কুলে যেতে হবেনা আগে? দুটোই একসাথে হলে বেশি চাপ হয়ে যাবে তো। তোমার এখন বেশি প্রেশার নেওয়া যাবেনা। রিল্যাক্স থাকতে হবে।”
“চাপ হবেনা তো বাবা। আমি কি নতুন গান শিখছি? নতুন নতুন হলে একটু সমস্যা হতো।”
“তাও। একাডেমিক স্কুলেই যাবে আগে। মিউজিক পরেও শেখা যাবে।”
অতসী জেদ ধরল।
“না। আমি শুধু একাডেমিক স্কুলে গিয়ে গিয়ে থাকব না। আমি নতুন কোনো ইন্সট্রুমেন্ট শিখতে চাই। ভায়োলিন শিখতে চাই আমি। মিউজিক না হোক। ইন্সট্রুমেন্ট শেখার জন্য কোথাও দেবেই দেবে।”
বাবা তাকে কিছুক্ষণ এটা ওটা বলে বুঝাল। কিন্তু মেয়ের জেদ অনড়। এভাবে চলতে লাগল দুজনের কথাবার্তা। শেষে বাবা -ই হার মানলো মেয়ের কথায়। কথাবার্তার মধ্যে বমি বমি লাগছে জানালে তার মা একটা আচারের প্যাকেট বের করে, খাইয়ে দেয় একটু একটু করে। মা তাকে হাতে ধরতে মানা করেছে যদিও, তাও নিজে অল্প অল্প করে নিয়ে খেলো।
খাওয়ার মাঝে পানি খেতে চাইল। মা পানি বের করতে করতে বকে তাকে,
“আঁচার খেয়ে পানি খায়না বললেও তাকে হয়না। দুনিয়ার যতো আজগুবি সব আমার ঘরেই হয়।”
বলে বোতলের চিপি খুলে খাইয়ে দেয় ঠিকমতো। অতসী পানিটুকু খেয়ে বাকি আঁচার খাবেনা বলে রেখে দিল। মা তাকে হাত পরিষ্কার করে দেয়। তারপর আরও কিছুক্ষণ বকবক করে, ক্লান্ত হয়ে মায়ের কাঁধে মাথা ফেলে দেয়, উদরে হাত ছুঁঁইয়ে কিছু অনুভব করতে চায়।
ওভাবে পেছনে ফেলে আসা কিছু ঘটনা, কিছু মুহূর্ত, কিছু কথা, আর কাউকে একবার মনে করলো। চোখ বেয়ে অজান্তে অশ্রু গড়াল। মায়ের পেট জড়িয়ে লেপ্টে থাকে। বাবার উদ্দেশ্যে বলে,
“বাবা? আমরা আর কখনো আসবো না তাইনা? আমরা এবার থেকে নিজেদের মতো থাকব। তুমি, আমি, মা,” তারপর বিড়বিড় করে বলে, “আর অনাগত সে”
কিন্তু বাবার কণ্ঠে মেয়ের উদ্দেশ্যে কোমল কণ্ঠে জবাব এলো না। বরং তার বদলে কারো উদ্দেশ্যে উদ্বিগ্ন হয়ে জোর গলায় কিছু বলতে শুনা যায়।
“এই এই এই, বামে বামে বা……”
এতটুকুই শুনল অতসী। এর মধ্যে ঠিক কি হলো টাহর করে উঠতে পারেনি। চারপাশটা তীব্র ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠে। যেভাবে ভূমিধ্বস হয়, ঠিক সেভাবে যেন তাদের গাড়িটা ধ্বসে গেল। চুরমার হয়ে গেল। অতসীর তো তাই মনে হয়েছে। নাহলে এমন শব্দ হবে কেন চারদিকে? এমন কেঁপে উঠবে কেন সবটা? দূর দূর থেকে মানুষের চিৎকার ভেসে আসতে চাইছিল নাকি কানে? কিন্তু হঠাৎ ‘কুউউউউ’ শব্দ করে কানটা ব্লক হয়ে গেল বোধ হয়। কিছু আর কানে এলো না। গাড়ির ধাতব ঘ্রাণে মিশে গেছে চারপাশটা।
মাথায় একটা বারি খেয়েছে কোথাও, হয়তো গাড়ির গ্লাসে। খুব ব্যাথা পেলো সে। কিন্তু এর মধ্যে কবে জানি কীসের নিচে চাঁপা পড়ে যায়। অতসীর মাথা আর কাজ করতে পারল না তৎক্ষণাৎ। সে নির্জীবভাবে পড়ে থাকে। মাথায় বাবা-মায়ের চিন্তা। কিন্তু হঠাৎ করে কি হয়েছে বুঝতে না পারায় ব্ল্যাংক আউট হয়ে আছে সে।
_
অতসীদের গাড়ির এ ক্সি ডে ন্ট হয়েছে। ভীষণ বাজেরকম এ ক্সি ডে ন্ট। মিনিট দু’য়েক পেরিয়েছে শুধু। এখনো ঘটনাস্থলেই পড়ে আছে তারা। চারদিক থেকে মানুষজন ছুটে আসছে হইহই করে। সকলের চিৎকার, চেঁচামেচির মধ্যে অতসীর মায়ের আর্তনাদ তৎক্ষণাৎ কারো কানে গেল না।
অতসীর বাবার পেটে রড ঢুঁকে গেছে। বাসের ধা ক্কায় তাদের গাড়ি ছিটকে যায়। আর বিপরীত দিক থেকে আসা রডবাহী গাড়ির সাথে বেকায়দায় গিয়ে লাগে। অতসীর দিকে এসে লাগছিল সেটা। কিন্তু গাড়ির জানালা দিয়ে গলে পড়ে গিয়েছিলেন শফিক সাহেব। দৃষ্টিহীন মেয়ে তার কিছু দেখেনি। কি বিপদ আসছিল জানেনা সে। বাবা চিৎকার দিয়ে জানাবে— সে সরবে, কিংবা নিজে এসে সরাবেন —তাতে বহু দেরি হয়ে যেত। তাই নিজেই এসে মেয়ের ঢাল হয়ে গেছেন। আর সব বিপদ নিয়ে নিলেন। অথচ পেছন থেকে অতসীকে তার মা এসে সরিয়েই দিচ্ছিল। এতে হয়তো আজ স্বামীর জায়গায় নিজে থাকতেন। তাই শফিক সাহেব ভাঙা কাচে ভরপুর পিচঢালা রাস্তায়— হামাগুড়ি দিয়ে এসে নিজেই স্ত্রী-কন্যাকে বাঁচিয়ে নিলেন।
ভদ্রলোককে দেখে আতঙ্কে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে কেউ কেউ। মেয়েকে নতুন জীবন দেওয়ার স্বপ্ন ছিল যে দু’চোখে। আপাদত তা অস্বাভাবিকরকম বড়, আর লাল হয়ে আছে।
ড্রাইভার মাথায় আ ঘা ত পেয়ে অচেতন হয়ে পড়েছে। অতসী ঠিক অচেতন না, তবে অসাড়।
তার মা অস্মিতা হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। মেয়েকে টপকে কোনোরকমভাবে স্বামীর কাছে এলেন। গালে হাত দিয়ে ডাকেন,
“অতসীর বাবা? এই অতসীর বাবা। এটা কি করলেন। কেন করলেন? অতসীর বাবা? কি হলো? কথা বলুন না।”
বারবার ডাকছেন। পেটে ঢুঁকে যাওয়া রডটা দেখে একটুও চোখ ফিরিয়ে নিলেন না। বরং ওটা একবার দেখে, আরেকবার স্বামীর দিকে তাকান।
“অতসীর বাবা? কথা বলুন না? এটা কি হয়ে গেল? আমরা না চলে যাবো একটু পর? আপনি জেদ ধরেছিলেন আমাদের নিয়ে চলে যাবেন। তাহলে এখন এসব কেন? এসব কি? আপনার পেটে এটা কেন? এটা কিভাবে বের করবো আমি? আমার বুক ফেটে যাচ্ছে তো! আমি কি করবো অতসীর বাবা? বলুন না আমি কি করবো?”
বলতে বলতে বিলাপ করে কেঁদে উঠলেন। ইতোমধ্যে পুলিশ এসেছে, ফায়ার সার্ভিস এসেছে। সবাইকে সরিয়ে নিচ্ছে। অতসীর মাকেও সরিয়ে নিতে আসলো। শফিক সাহেবের পেট থেকে রড বের করতে হবে। রড কাটার মেশিন নিয়ে আসা হচ্ছে। কিন্তু অতসীর মায়ের বিলাপ থামছেনা। গগনবিধারী কান্না ভদ্রমহিলার।
অতসী ততক্ষণে কিছুটা হুশে ফিরেছে। মায়ের আহাজারি শুনে এঁকের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো জবাব আসছেনা। না তো তার কথা হাউমাউ করে কাঁদতে থাকা মায়ের কানে যাচ্ছে।
“এই মা? এভাবে কাঁদছ কেন? বলো না কি হয়েছে? আমার বাবা কোথায়? বাবার জন্য কাঁদছ তুমি? আমার বাবার কি হয়েছে?”
ভিড়ের মধ্যে লোকজন আর সাংবাদিকদের গলায় যদিও শুনতে পাচ্ছে সে— তার বাবার পেটে রড ঢুকেছে। কিন্তু মন মানছেনা তার। এটা হতে পারেনা। মানুষের পেটে আবার রড ঢুঁকে যায়?
সে আরও বারকয়েক প্রশ্ন করল, ডাকল। কিন্তু কেউ কিছু শুনতে পাচ্ছেনা। মায়ের চিৎকার অনুযায়ী পিচঢালা রাস্তাটাই গা টানতে শুরু করে। কপাল ফেটে, হাত থেকে পা থেকে র ক্ত বেরুচ্ছে। ধীরে ধীরে মাকে বাবাকে ডাকতে ডাকতে কাছে এলো সে।
তার মা রাস্তায় বসে আছে। পেছন থেকে দাঁড়িয়ে দু’হাত ধরে দু’জন মহিলা পুলিশ আঁটকে রেখেছে কোনোভাবে। স্বামীর কাছে এগিয়ে যেতে চাইছেন। বিলাপ করছেন।
কিন্তু শফিক সাহেবের পেটের রডটা কাটতে ব্যস্ত এক মিস্ত্রী। আশেপাশে পুলিশ-সাংবাদিক ঘিরে রেখেছে। লোকজন শফিক সাহেবের দিকে তাকাতে পারছেনা আতঙ্কে। কৌতূহলে তাকিয়ে বারবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অথচ আপন মানুষদের ওতে কিছু যায় আসছেনা। একটু কাছে যাওয়ার আকুতি। বুকটা ফেটে যাচ্ছে তাদের। অতসীকেও এক মহিলা পুলিশ ধরে সান্ত্বনা দিতে চাইল। কিন্তু সে হালকা হাতে ঝাড়া মারে। তাকে ধরতে নিষেধ করে। ক্রন্দনরত মায়ের শরীর হাতড়ে তার বুকে মুখ গুঁজে ধীরে ধীরে।
“মা? এভাবে কাঁদছ কেন? আমার বাবাকে বাঁচাওনা। বাবার পেটে কি জানি ঢুঁকে গেছে। ওরা বলছে শুনতে পাচ্ছ না? তুমি দেখতে পাচ্ছ না? আমার বাবার কষ্ট হচ্ছে। ও মা? বাবাকে বাঁচাওনা।”
অতসীর মা মেয়ের কোনো কথা কানে নিচ্ছেনা। সেই অবস্থায় নেই।
“আমাকে ছাড়ুন। ছেড়ে দিন। মানুষটার কষ্ট হচ্ছে। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। একটু কাছে যেতে দিন। আমায় একটু উনার কাছে যেতে দিন। অতসীর বাবা? আপনি শুনতে পাচ্ছেন? আমাদের একা ফেলে কোথাও যাবেন না আপনি। কোথাও যাবেন না।”
“আমি তো যাচ্ছিলাম মেয়েকে বাঁঁচাতে। আপনি কেন আসতে গেলেন? আমি ম রে গেলে কিছু হতো না। কিন্তু আপনি না থাকলে আমার মেয়ের কি হবে? আমাদের কি হবে? আমি কোথায় যাবো? কি করবো? অতসীর বাবা? আপনি চোখ খুলে এদিকে তাকান। দেখুন না আমরা দু’জনেই এখানে আছি। এই অতসীর বাবা!
অতসী মায়ের বুক ছাড়ে। বাবা কোন দিকে আছে হাতড়ায়। কিন্তু লাভ হয়না। সে কি করবে বুঝতে পারছেনা। কেন এমনটা হচ্ছে জানেনা। মা তো এভাবে কাঁদেনা। সেদিন অতসীর চরম সর্বনাশের কথাটা যখন জানতে পারল। তখন সে ঘুমিয়ে গেছে ভেবে রাতে বুকে নিয়ে কেঁদেছিল। সারারাত কেঁদেছিল বুকে আগলে রেখে। কিন্তু এভাবে তো বিলাপ করেনি সবার সামনে। এতটা বেপরোয়া আচরণ করেনি। তার মানে বাবা নিশ্চয় খুব কষ্টে আছে। বাবার সাথে খারাপ কিছু হচ্ছে। সে অনুভব করতে পারছে। কিন্তু কিছু করার নেই। দেখার নেই।
অতসী রাস্তায় হঠাৎ পিঠ ফেলে দেয়। খোলা আকাশের নিচে পিচঢালা রাস্তায় অসহায়, করুণ এক নিঃশ্বাস ফেলে শরীর ছেড়ে দেয়।
সাংবাদিকদের জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া বিস্তারিত বর্ণনা কানে আসছে। সেই অনুযায়ী চারদিকের দৃশ্যটা কেমন, বাবার অবস্থাটা কেমন— কল্পনা করে নিলো। বিড়বিড় করলো,
“ভাগ্যিস এই দৃশ্য দেখার সামর্থ্য তোর নেই অতসী। নয়তো কয়েক দফা মরতি তুই আজ।”
প্রায় পনেরো/বিশ মিনিট পর রডটা কাঁটা গেল। ততক্ষণে আরমান, আর ফারজাদ চলে এসেছে ঘটনাস্থলে। হন্যে হয়ে লোকজন ঠেলে তাদের কাছে এলো। চাচ্চুকে দেখে সেকেন্ড কয়েক থমকে থাকে। উদ্ভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছে তাদের।
আরমান গাড়ি নিয়ে আসার সময় ফারজাদকে বাইক নিয়ে আসতে দেখে। সেও এয়ারপোর্ট আসছিল বুঝে তখন। গাড়িতে গ্যাস নিতে দাঁড়ালে ফারজাদও বাইক থামিয়ে নামে। অতসীর চলে যাওয়া নিয়ে ফারজাদের মনের অবস্থা বুঝতে পারছিল আরমান। দু’ভাই বেশ কিছুক্ষণ আলাপ-সালাপ করে। এর মধ্যেই পাশের একটি দোকানে টিভিতে এই খবর দেখল।
প্রথমেই চাচ্চুর অবস্থা দেখা যায় টিভিতে। পেটের জায়গা আর রডটা ঝাঁপসা করে দেখাচ্ছে ক্যামেরায়। কিন্তু শিরোনামে বড় বড় করে লেখা পুরো ঘটনা। সবটা মাথায় খেলাতে সেকেন্ড কয়েক সময় নেয়। তারপর উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে এসেছে দু’ভাই।
আরমান চাচ্চুর সাথে গেল অ্যাম্বুলেন্সে। অতসীর মাকেও নেওয়া হয়। অতসীকে মহিলা পুলিশ দুটো ডাকছে, তুলতে চাইছে। কিন্তু সে অসাড় তখনো। কোনো সাড়া দিচ্ছেনা। ফারজাদ তার কাছে আসে। পুলিশ বাড়ির লোক জেনে বাঁধা দেয়নি।
“অতসী? এই? অতসীরাণী? উঠো। কিছু হবেনা কারো। ট্রাস্ট মি কিছু হবেনা।”
সে অতসীর শরীর হাতড়ে কোথায় কোথায় আ ঘা ত পেয়েছে তা দেখল। গালে হাত দিয়ে ডাকে। কিন্তু মেয়েটার সাড়া নেই। কোলে তুলে নেয় দেরি না করে। আম্বুলেন্সে জায়গা নেই তাই বাইকটা পুলিশের জিম্মায় দিয়ে আরমানের গাড়িতে নিলো অতসীকে। নির্জীব মেয়েটাকে সিটবেল্ট বেঁধে কোনোরকম বসিয়ে একহাতে তাকে ধরে। অন্যহাতে ড্রাইভ করে। ফোনটা গাড়ির ডেস্কে রাখা। বাড়ি থেকে একের পর এক ফোন আসছে। আপডেট দেওয়া জরুরী। তাই লাউড স্পিকারে দিল। পরপর অ্যাম্বুলেন্সের সাথে সাথে গাড়ি টান দেয়।