প্রেমভুবনের অতসী

পর্ব - ২২

🟢

অতসীদের ফ্লাইটের টিকিট কেটে ফেলেছে তার বাবা। আগামী পরশুই পাড়ি জমাবে। তার বাবা-মা গিয়েছে নিজেদের ফ্ল্যাটে। আরমানও ওখানে আছে তাদের সাথে। নিজেদের সবকিছু গোছগাছ করে নেওয়াই মূল উদ্দেশ্য। অতসীকে নেওয়া হয়নি। সে ফারিশ মহলেই রয়েছে এখন। অতসীর সন্তানসম্ভবা হওয়ায় যত্নের কমতি হচ্ছেনা কারো তরফ থেকে। ফারজাদও উপস্থিত নেই মহলে। তাই তাকে রেখে যেতে বিশেষ ভাবতে হলো না তার বাবা-মাকে।

কিন্তু ফারজাদ কথাবার্তা ছাড়া আবার চলে এসেছে মহলে। এবারে বোনকেও জানায়নি। এসে মায়ের সাথে দেখা করল। কথায় কথায় জানতে পারে চাচ্চু, আর চাচীমণি ফ্ল্যাটে গেছে গোছগাছ করতে। এ কথা শুনে ফারজাদ একটু থামে। পরপর সময় নিয়ে বলে,

“ওরা নেই? তাহলে আমি একটু অতসীর সাথে দেখা করে আসি।” হাঁটা ধরল সে কথাটা বলে।

“দাড়া দাড়া। কোথায় যাচ্ছিস। তোর সাথে আমার কথা আছে।” মায়ের ডাকে ফিরে তাকায়। কপালে ভাঁজ।

“দুদিন পর ফ্লাইট। মানে বুঝতে পারছিস? ওরা চলে যাবে জাদ? কিছু করবিনা? এভাবে যেতে দিবি?”

সহসা ফারজাদের কপালের ভাঁজ মিলিয়ে মসৃণ হলো। সে বলে,

“গেলে যাক। তবে একেবারেই ছেড়ে দিচ্ছিনা। চিন্তা করো না। ওদের ওপর আমার নজর থাকবে সবসময়।”

“তুই এখানে থেকে ওখানে ওদের ওপর নজর রাখবি— এটা কিভাবে বলছিস? জাদ? প্রাচীর কাছে শুনেছি কিভাবে কিভাবে বিয়ে নাকি করে নিয়েছিস? এটা কি সত্যি? তাহলে সবাইকে জানিয়ে দে না? তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে দেখে নিস!”

ফারজাদ অতসীকে যেতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। কষ্ট হবে; ভীষণ কষ্ট হবে তার। কিন্তু এটাই হওয়া উচিত। বাচ্চাটার বাবা হিসেবে নিজের জন্য ওদের কাছে রাখতে চাইলেও আদতে অতসীর জন্য এই দূরত্বটুকু দরকার। অতসী তার কাছে থাকতে চায় না। সেখানে নিজের চাওয়ার পূরণ করতে ওর মানসিক দিকের খেয়াল না রেখে আঁটকে রাখলে আর কি অনুতাপ-অনুশোচনা হলো?

তাই বুকে পাথর রেখে হলেও অতসীর জন্য এটুকু দূরত্ব মেনেই নিতেই হবে।

সে নিঃশ্বাস ফেলে মাকে বলে,

“মা। এত চিন্তা করো না। ওদের যেতে দিচ্ছি মানেই ছেড়ে দিচ্ছি এমন না। তুমি চাইছ অন্তত এই সময়টাই যেন ওকে কাছ ছাড়া না করি তাইতো? আই আন্ডারস্ট্যান্ড! বাট আমি ওদের নিজের কাছে রাখতে চাই বলে, অতসীর না চাওয়া সত্ত্বেও নিজের চাওয়া পূরণ করতে ওদের আঁটকে রাখলে এটা তো আর হলো না রাইট? অতসীর চাওয়াটা আমার চাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা মাথায় রাখো। তাহলেই সব ঠিকঠাক।”

অথচ তার মন একেবারেই চায় না এত দূরত্বে সায় দিতে। এখন যেভাবে থাকছিল— সে এক বাড়ি, আর ওরা আরেক বাড়ি— এভাবেই কি কম শাস্তি হচ্ছিল তার জন্য? সেদিন সে শুনেছে অতসীর মাঝেমাঝেই এমন অসুস্থতা দেখা যায়! গর্ভকালীন সময়ে নাকি এটা স্বাভাবিক! অথচ এসব কিছু জানতোই না ফারজাদ। অতসীর এই সময়টাই সে পাশেই নেই। সেদিন ওসব শোনার পরই তো সবটা ফিকে লাগছিল তার।

যা হচ্ছে তা হতে তো দিচ্ছে! কিন্তু ওরা চলে যাওয়ার পর কিভাবে মনকে মানাবে তা জানেনা।

ফারজাদ তাও মাকে বিষয়টুকু কোনোরকমভাবে বুঝিয়ে অতসীর রুমে চলে যায়। সে মূলত এসেছিল অতসীর এরপর আর কোনো অসুস্থতা দেখা গিয়েছিল কিনা এই চিন্তায়। তবে এসে সরাসরি দেখা করে যেতে পারবে তা ভাবেনি। চাচ্চুরা যখন নেই, তখন সুযোগ কাজে লাগানোই যায়।

_

দরজা খুলে অতসীর রুমে ঢুকতেই মেয়েলী একটা সুবাস সুরসুর করে নাকে ঢুকল তার। সাথে একটা মেয়েলী কণ্ঠও কানে আসে। চারদিকে তাকিয়ে অতসীকে খুঁজতে খুঁজতে ব্যাল্কনির দিক থেকেই গানের কণ্ঠটা ভেসে আসলো। মন দিয়ে গান গাইছে মেয়েটা। সন্তর্পণে দরজাটা লাগিয়ে ব্যাল্কনির উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল ফারজাদ।

পাহাড় চূড়ায়,
বেয়ে আকাশ তো ছুঁতে দেখিনি।
স্রোতস্বিনীর হাওয়ায়
পাড়ি দাও সমুদ্দুর!
আছড়ে পড়ে সে ঢেউ,
আমার বুকে দুরন্ত বেগে!
নাকি কাঁদিয়ে আমাকে সেই
চোখের জলে ভেজো?
তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে শুধু……

গান গাইছে সে। গিটার হাতে গান গাইছে আপনমনে। ফারজাদ পেছনে ব্যাল্কনির দরজায় হেলান দিয়ে মনোযোগসহিত শুনল যতটুকু গেয়েছে সেই পুরোটা। থামতেই মুখে ভঙ্গি বানিয়ে হাতে অল্প করে তালি দেয়,

“বাহ! তোমার গানের প্রশংসা করতেই হয়।”

অতসী এবারে আর চমকে উঠল না। তবে কপালে গাঁঢ় একটা ভাঁজ পড়ে। গিটারটা পাশে আন্দাজ করে স্বযত্নে রেখে বললো,

“আপনি এখানে কেন? আপনাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলার পরও, যখন তখন এসে আমার রুমে চলে আসেন কেন বুঝিনা আশ্চর্য! মানুষের তো নানান কাজ থাকে খেয়েধেয়ে। আপনার শুধু দরকারে অদরকারে আমার পেছনে এসে উদয় হওয়াটাই একমাত্র কাজ তাইনা?”

সূক্ষ খোঁচাটুকু শুনে ফারজাদ হেসে উঠল নীরবে। রুম থেকে ব্যাল্কনির দেয়ালটা কাঁচের। স্বাভাবিক দেয়াল, আর দরজা না দিয়ে কাঁচ দেওয়া হয়েছে। সে খোলা গ্লাসটা টেনে দিয়ে ঢুঁকে আসে,

“দরকারে অদরকারে আমার কাজ প্রতিবার তোমার কাছেই— এটা ঠিক বলেছ।”

অতসী বিরক্ত হয়।

“গতবার যে এসেছিলেন তা আমি মাকে বলে দিয়েছি। এবার বড়বাবাকে বলে দেব সোজা। একটা মেয়ের রুমে যখন তখন নির্লজ্বের মতো যে এসে পড়েন কোনোরকম নক করা ছাড়া? আপনার একটু লজ্জ্বা লাগেনা?”

ফারজাদ তার কথায় বিশেষ হেলদোল না দেখিয়ে, ব্যালকনির ফ্লোরে বসে পড়লো দেয়ালে হেলান দিয়ে।

“আর অসুস্থ বোধ করেছিলে সেদিনের পর?”

শান্ত গলায় শুধায় সে। কিন্তু অতসীর রাগ লাগছে। নেহাত দরজার হুক লাগানোতে নিষেধাজ্ঞা আছে তার। নয়তো ফারজাদের জ্বালায় রুম লক করে বসে থাকতো প্রতিবার। নাক লাল হয়ে এসেছে রাগে। ফারজাদের তা দেখে আবার হালকা হাসল নীরবে।

সে কোনো কথা না বলে হঠাৎ তার গিটারটা টেনে নেয়। হাতের বা’পাশ থেকে ঠিকভাবে নিয়ে টুং টুং করে দু’য়েকবার সুর তুলে।

“এটা তো দেখিনি আগে? তুমি তার মানে গিটারও বাজাতে পারো!” গালে অতসীর এই গুণে বাহবা দেওয়ার মতো ভঙ্গি করে,

“ব্যাপারটা বেশ তো! অনেক গুণই দেখি লুকিয়ে রেখেছিলে। আগে দেখালে তখনই ফল করে যেতাম আই গেইস।” শেষোক্ত কথাগুলো নিম্নকণ্ঠে বলে সে।

“আমার গিটার ছাড়ুন।” জেদী গলা অতসীর।

“হুশ! ওয়েট।” আবার নির্দিষ্ট একটা সুর তুলতে তুলতে বলে,

“তোমাকে একটা গান শোনাই।”

“দরকার নেই”

তার জেদী গলার বিপরীতে ‘উহহুম’ বলে চুপ থাকতে বুঝাল। তারপর ধীরে ধীরে মনোযোগ দিয়ে সুর তুলতে তুলতে গানে এলো,

This night is cold in the kingdom
I can feel you fade away

From the kitchen to the bathroom sink and
Your steps keep me awake

Don't cut me down, throw me out, leave me here to waste
I once was a man with dignity and grace

Now I'm slipping through the cracks of your cold embrace
So please, please

মন দিয়ে গানের লাইনাটা গাইতে গাইতে সে চোখ তুলে অতসীর দিকে তাকাল। অতসী কপালে ভাঁজ ফেলে তার গান শুনছে। সে নিজেও বাক্যগুলো শুনে হালকা নড়েচড়ে বসে। ফারজাদ গাইতে থাকল,

Could you find a way to let me down slowly?
A little sympathy I hope you can show me

কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গেছে অতসীর। এই লাইনগুলোতে ফারজাদের তাকে ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য বুঝে খালি এদিক ওদিক চোখ ঘুরাচ্ছে মেয়েটা।

If you wanna go, then I'll be so lonely

If you're leaving, baby, let me down slowly

Let me down, down, let me down, down

Let me down, let me down, down

Let me down, down, let me down

এতক্ষণ অতসীপানে চেয়ে চেয়ে লাইনগুলো গাইতে গাইতে চোখ বন্ধ করে নিলো। হৃদয়ের গভীর থেকে গাইছে যেন,

If you wanna go, then I'll be so lonely

If you're leaving, baby, let me down slo……

অকস্মাৎ থেমে যেতে হলো ফারজাদকে। চোখ খুলে দেখে অতসী তার কাছে এসে গিটারটা ছিনিয়ে নিয়েছে।

“গাইতে হবেনা আপনাকে গান। আপনার গানের গলা খুব বাজে। একদম বিচ্ছিরি!”

অনুদ্দেশ্যে চোখ রেখে জেদ নিয়ে বললো সে। গিটার এখন তার কাছে। ফারজাদ বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাল না এ কথায়, না তো গিটার কেঁড়ে নেওয়ায়।

“তুমি নাহয় একটু বেশিই ভালো গান গাও। তাই বলে এভাবে বলবে?”

অতসী জানে তার কথায় ফারজাদের বিন্দুমাত্র খারাপ লাগেনি। সে এমনি এমনি এমনভাবে বলছে। কারণ সেও বুঝতে পেরেছে এবং ফারজাদ নিজেও জানে, যে তার গানের গলা সত্যিই সুন্দর। তবু এভাবে বলায় অতসীর মনে হলো যেন তাকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। মুহূর্তেই তার রাগের পারদ আরও বেড়ে গেল।

“আপনাকে ঠিক কিভাবে বললে, আর কতবার বললে এখান থেকে বিদায় হবেন?”

শান্ত ফারজাদ উলম্বভাবে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ল। বেশ আরাম করে বসেই বলে,

“বিদায় হব না। তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি। আজ একটু সময় নেব।”

“প্রাচী আপুউউউউ! বড়বাবাআআ…!”

হঠাৎ করেই চিৎকার শুরু করে অতসী। ফারজাদ কানের কাছে এমন আকস্মিক শব্দে একটু ঘাড় বাঁকিয়ে কপাল কুঁচকে ফেলে। চিৎকার করতে থাকা মেয়েটার দিকে ভাঁজপড়া কপাল নিয়েই তাকিয়ে রইল।

অতসীর চিৎকার থামতেই বলে,

“কেউ আসবে না। ব্যালকনির গ্লাস লাগিয়ে দিয়েছি। দরজাও বন্ধ। তোমার যা চিৎকার; এতদূর যাবে না। আর যাদের ডাকছ, তারা কেউ ঘরেও নেই।”

“চাচীমণিইই…”

“এই মেয়ে! বললাম তো— তোমার আওয়াজ এতদূর যাবে না। শুধু শুধু গলার পানি শুকাচ্ছ।”

অতসী বেশিক্ষণ ডাকতে পারল না। তার আগেই ফারজাদের মৃদু ধমকে দ্বিধাভরে তাকাল অনুদ্দেশ্যে। ফারজাদ একটু নরম গলায় বলে,

“চুপচাপ একটু বসো। তোমায় খেয়ে ফেলতে আসিনি। কথা বলতে এসেছি।”

এ কথায় অপমানবোধে ভরে উঠে অতসীর বুক। ফারজাদ সেটা লক্ষ্য করল। কপালে ভাঁজ থাকলেও চোখে কোমলতা নিয়ে বলে,

“রিল্যাক্স! একটু শান্ত হয়ে বসো। আমি কিছু কথা বলেই চলে যাব।”

অতসী নীরব। ফারজাদ গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর খুব সাবধানে অতসীর ব্যথা পাওয়া পাটা টেনে নেয় নিজের দিকে। অতসী ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু সে ছাড়তে দেয় না। হাঁটু মুড়ে বসে পা -টাকে যত্ন করে কোলে তুলে নিল। মনোযোগ দিয়ে ক্ষতটা দেখছিল সে। তারপর চোখ তুলে তাকায়,

“সেদিন ড্রাঙ্ক হয়ে উল্টাপাল্টা অনেক কিছু বলে ফেলেছিলাম আই গেস। ঠিকঠাক মনে নেই সব। ওসব ভুলে যেও, হু?”

একটু থেমে আরও নরমভাবে বলে,

“চাচীমণির কাছে তোমাকে নিয়ে একবার সবটা কনফেস করেছিলাম। যদিও সেখানে সবাই ছিল। কিন্তু সরাসরিভাবে তোমার কাছে সবটা ওভাবে বলা হয়নি। আজ কিছু বলতে চাই তোমায়।”

অতসী মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। ফারজাদ বলতে লাগল,

“অতসী… তোমাকে আমি ছোট থেকে…” হঠাৎ থেমে গেল সে।

“না, ছোট থেকে বললেও ভুল হবে। যখন তুমি বড় হওয়ার পর দৃষ্টি হারিয়েছিলে? তখন থেকে অপছন্দ করে এসেছি। কারণ আমার মনে হতো দাদুভাই তোমাকে বাঁঁচাতে গিয়ে নিজেকে মৃ ত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। সেদিন যদি তোমার কাছে গিয়ে তোমাকে আগলে না ধরত, তাহলে তোমার মাথায় ভয়ানক আ ঘা ত লাগত। কিন্তু তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে সবটা নিজের ওপর নেয় সে। আমি সবটা নিজের চোখে দেখেছি। চোখের সামনে দাদুভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল।”

তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।

“তাই মনে হতো— তোমাকে বাঁচাতে গিয়েই দাদুভাই মারা গেছে। তোমাকে দেখলেই রাগ হতো। এত বিরক্ত লাগত যে বলার সীমা রাখে না। মনে হতো, তুমি না থাকলে দাদুভাই আজ বেঁচে থাকত।”

আরেকটা দীর্ঘশ্বাস।

“আমি একটু মায়ের স্বভাব পেয়েছি তা তো জানোই। যাদের আপন মনে করি, তাদের নিয়ে ভীষণ পসেসিভ। আরোহী, তুমি— তোমাদের কখনো প্রাচী আর প্রিসির মতো বোনের চোখে দেখিনি। তোমাদের নিয়ে তেমন কেয়ারও করিনি। যাদের নিজের ভাবতাম, তাদের নিয়েই সব ছিল।”

“এখনো তাই। তোমার যে বিরাট ক্ষতি হতো দাদুভাই সেদিন সবটা নিজের ওপর না নিলে, সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যাথাই ছিল না। দাদুভাই কেন নেই এটাই ট্রিগার করতো আমায় বারবার। আর সেই কেন-র উত্তর আসতো— তোমার কারণে নেই। অথচ সেদিন তোমার জায়গায় আমরা ভাই বোনেদের যে কেউ থাকলেও এটাই করতো দাদুভাই। কিন্তু ওসব নিয়ে আমার কোনো পরোয়া ছিল না। তোমার কারণে সে নেই ভাবতে ভাবতে তুমি চোখের বি ষে পরিণত হয়েছিলে।“

ফারজাদ একটু থামল।

“অসহ্যকর তুমি বড় হতে হতে দিনদিন আমার বিরক্তি আরও বেড়ে যাচ্ছিল। হয়তো অবাঞ্চিত অনুভূতি তখন থেকেই জন্ম নিচ্ছিল বলে। কিন্তু সেসব আমি বুঝতে পারিনি।”

মৃদু হেসে বলে,

“যাকে অপছন্দ করি, তার চলনও বাঁকা লাগে— এমন একটা কথা আছে না? আমারও তেমনই হয়েছিল।”

“তুমি যা-ই করতে, অসহ্য লাগত। কিন্তু এই বিরক্তি, ঘৃণার মধ্যেই কখন যে প্রেম এসে ঢুকে গেল আমার জীবনে— টেরই পাইনি।”

ফারজাদের চোখে এখন এক অদ্ভুত দ্যুতি।

“বিরক্তির দেয়ালের ওপাশে চাপা পড়ে ছিল সেই প্রেম। দিনের পর দিন সেভাবেই গেল। এর মাঝে যখন দেখতাম কোনো ছেলে তোমার প্রতি সামান্য আগ্রহ দেখাচ্ছে— তখন যে রাগ, যে ঈর্ষা হতো! আমি সেটাকেও অসহ্যকর এক অনুভূতি হিসেবে নিতাম, আর এটাও তোমার প্রতি বিরক্তি ধরে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে যেতাম প্রতিবার।”

একটু আগ্রহ নিয়ে বলে,

“কিন্তু সেদিন… তুমি যখন শাড়ি পরে এলে?”

“জানো কি হয়েছিল?”

“আমি সেদিন ভীষণ বাজেভাবে ফল করেছিলাম। তুমি হয়তো ভাববে— রূপ দেখে গলে গেছি। কিন্তু বিষয়টা তা না। শাড়ির সাথে বাঙালি মেয়েদের একটা ‘বউ বউ’ কানেকশন থাকে। যেকোনো পুরুষ সাজগোজ করা কোনো মেয়েকে শাড়িতে দেখলে একটু ভিন্ন চোখে তাকায়। সেখানে তোমার জন্য তো বিরক্তির নিচে প্রেম চাঁপা পড়ে ছিল। আমি সেদিন তোমায় দেখে এভাবেই একটা ধা ক্কা খাই। অজান্তেই বউরূপে কল্পনা করে ফেলেছিলাম।”

তারপর ধীরে বলে,

“আর সেখানেই সর্বনাশ ঘটে যায়। চাঁপা পড়ে যাওয়া সব অনুভূতি এক মুহূর্তে কেমন জীবন্ত জীবন্ত হয়ে উঠে। আগের সবকিছু মনে করে সেই সর্বনাশটা স্বীকার করতেও ইগোতে লাগছিল। তোমার ওপর কি করে ফল করতে পারি আমি! এটা ভেবে এত এত অসহ্য একটা সময় পার করেছি— তোমায় বুঝাতে পারব না। এটা থেকে নিস্তার পেতেই চলে যাই বাড়িতে প্রিসির দেখতে আসা অনুষ্ঠান রেখে। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। মাথায় তখনও একটা বউ সাজা অতসী। রাইড করতে করতে চলন্ত রাস্তায় আমার সামনে সে এসে দাড়াচ্ছে দেখছিলাম বারবার। তাকে টপকে জিতের জন্য এগিয়ে যেতে পারিনি। ছোটখাটো একটা এ ক্সি ডে ন্ট করে হার নিয়ে ফিরে আসি। তোমাকে ভাবতে গিয়ে কিনা প্রথমবারের মতো হারের মুখ দেখলাম। আমার সেটাও মানতে কষ্ট হচ্ছিল। ”

তার কণ্ঠ নিচু হয়ে এল।

“সব মিলিয়ে আমার সাথে কি হচ্ছে টের পেয়েও নিজেকে মানাতে, স্বীকার করতে— একটু সময়ের দরকার ছিল। কিন্তু সেই সময় আর পেলাম না। বাজে কিছু ঘটে গেল এর মধ্যে। তুমি যখন আমার কাছে এলে তখন আমি কি পরিমাণ দ্বিধাদন্ধে ছিলাম তোমায় নিয়ে তা বলে বুঝাতে পারব না অতসী। কখনো বুঝাতে পারব না। ওখানেই তোমায় নিয়ে সুন্দর শুরু করার সম্ভাবনার ইতি ঘটে গেল। আমার কপাল আমায় ভালোবাসা রিয়েলাইজ করে স্থির হওয়ার সময়টুকু দিল না। এতটা বাজেভাবে সুযোগটা কেঁড়ে নিলো যে ভালোবাসাটাকে ভালোবাসা বলতেই লজ্জ্বা লাগবে।”

“অতসী!

শুরু থেকে সব অপরাধ নিজের মুখে কনফেস করে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি আজ। ক্ষমা করে দিও প্লিজ। আমায় ক্ষমা করে দিও।”

অতসীর পা তখনও ফারজাদের হাতে ধরা। ওটা ছোঁয়ার যে ধরণ, অতসী সহসা বুঝে নিলো ফারজাদ তার পা ধরে ক্ষমা চাইছে। সেবার বলেছিল এভাবে সে ক্ষমা চাইতে চায়। কিন্তু তাও সে তা করবেনা। অহমিকার বিষয়টা বুঝতে অতসীর বেগ পোহাতে হয়নি বেশি। আর বলেছিল— এই ঘটনার কারণে অতসী তার হয়ে গেছে বলে এতটাও খারাপ কিছু হয়েছে বলে মনে হয়নি তার।

অতসীর তখন ফারজাদের সামনে নিজেকে এত ঠুনকো, এত মূল্যহীন কেউ মনে হয়েছিল— যে নিজের অস্তিত্বে রাগ হচ্ছিল তার।

আর আজ সেই অতসীরই পা ধরে ক্ষমা চাইছে আকুল হয়ে। শুধু ক্ষমা চেয়েই নিশ্চিন্ত না, বরং ক্ষমাটা পাওয়া না পাওয়া নিয়েও তার যথেষ্ট মাথাব্যথা। অতসী চোখের পলক ফেলে।

ফারজাদের কথা তখনো জারি।

“অতসী আমি অপরাধটা জাস্টিফাই করতে এসব এক্সপ্লেনেশন দিইনি। ওটার জন্য তো সারাজীবন প্রায়শ্চিত্ত করে যাবো আমি।”

“এতকিছু বললাম— সবটা নিজে স্মরণ করে, তোমায় স্মরণ করিয়ে ক্ষমা চাইতে। কিন্তু বেহায়া-স্বার্থপর আমিটা এসব বলে এখন মনের কোথাও না চাইতেও আশা রেখে দিচ্ছি, যে তুমি আমার অনুভূতিটা বুঝবে।”

না চাইতেও এমন কিছু আশা করায় লজ্জ্বিত হওয়ার কথা তার। তাও নির্লজ্বের মতো ওটাই চাইছে যেন।

“সবটা তো কনফেস করলাম। ক্ষমা করে অনুভূতিটাও একটু কনসিডার করো প্লিজ। এই দুটো জিনিস চাইতে এলাম আজ।

কবে দেবে সেটা তোমার ব্যাপার। যখনই দেবে, আমি সেদিনের জন্য অপেক্ষা করবো। কিন্তু জীবদ্দশায় দিও প্লিজ। ক্ষমা করে, আমার মনে তোমার জন্য ভালোবাসা আছে— এ কথাটা যে মানো তা জানিও প্লিজ।

বিপরীতে ফিরতি ভালোবাসা দিতে হবেনা তোমায়। শুধু এটুকু মেনে নিও— আমি তোমাকে ভালোবাসি।

আমার ভালোবাসাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করো না।”

এতক্ষণ যা বলেছে— সবই আগে থেকে ভেবে রেখেছিল ফারজাদ। অতসীকে যাওয়ার আগে এই কথাগুলো বলার জন্য সে সুযোগ খুঁজছিল। আজ সবটা বলতে পেরে তার মনটা কিছুটা হালকা লাগছে।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে অতিশয় নির্জীব অতসীকে দেখে যেন নতুন কিছু ভাবল সে। আবার বলতে শুরু করে,

“অতসী… যদি কোনোদিন, কখনো, আমার জন্য তোমার মনে সামান্য কিছু অনুভূতিও জন্মায়— মায়া হোক, সহানুভূতি হোক; একবার আমাকে জানিও, কেমন? আমার জন্য সেটা অনেক বড় পাওয়া হবে।

আমার অপেক্ষার শেষ গন্তব্য শুধু দুটো জিনিস— তোমার ক্ষমা…

আর তুমি মেনে নেবে যে আমার ভালোবাসাটা সত্য।

আমি এই দুটোর জন্যই অপেক্ষা করে যাবো। কিন্তু যদি আমি যেভাবে সরাসরি ক্ষমা চাইছি সেভাবে ক্ষমা দিতে তোমার দ্বিধা লাগে… যদি মুখে বলতে সংকোচ হয়, বা রুচিতে বাঁধে— তাহলে একবার শুধু একটা ইশারা দিও। আমি সেই তাতেই সব বুঝে নেব।

বুঝে নেব— তোমার মনে আমার জন্য একটু হলেও মায়া জন্মেছে, একটু সহানুভূতি এসেছে। সেদিন দেখো— তোমার কাছে আমি এক পৃথিবী ভালোবাসা এনে সঁপে দেবো।

বিনিময়ে তোমাকে ভালোবাসা দিতে হবে না। ফিরতি কিছুই দিতে হবেনা। শুধু মায়াটুকু দেখিও। আমি তাতেই ক্ষমা খুঁজে নেব। তাতেই বুঝে নেব— তুমি অন্তত আমার অনুভূতিটাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছ।”

“আর…তোমার মনে আমার জন্য মায়া জন্মাতে যতো সময় লাগে নাও, যত দূরত্ব দরকার নাও। কিন্তু শেষে আমার কাছেই ফিরে এসো, অতসী। আমি অপেক্ষায় থাকব। তোমাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে, যেকোনো অবস্থায়— আমার অতসীরাণী করে নিতে আমি প্রস্তুত থাকব।

শুধু একবার ইশারা করবে— প্রেম না হোক, আমার জন্য তোমার মনে কিছু একটা অনুভূতি আছে। আমি এতেই আমার দুটো চাওয়া পূর্ণরুপে পেয়ে গেছি এমনটা ধরে নেব। আমি হাজির থাকব আমার সব ভালোবাসা নিয়ে। তোমার দেখানো সেই মায়ার বিনিময়ে এক আকাশ ভালোবাসা দিতে প্রস্তুত থাকব আমি।”

দীর্ঘ প্রলাপ শেষে ফারজাদ গভীরভাবে দম নেয়। অতসী নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। যেন কোনো অনুভূতিই নেই তার মধ্যে। শরীরের কোথাও কোনো নড়াচড়া নেই। কিছু সময় এভাবেই নীরবতায় কাটল— দু’জন মানুষ, মুখোমুখি বসে, অথচ যেন দু’জনই ভিন্ন দুটো জগতে আটকে আছে। ফারজাদের দৃষ্টি স্থির অতসীর দিকে। এতক্ষণ যে আবেগঘন কথা সে বলেছে, তার বিপরীতে অতসীর প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছে আগ্রহী-আশার চোখদুটো নিয়ে। কিন্তু মেয়েটা এত নির্জীব হয়ে আছে কেন? দ্বিধাভরে তাকিয়ে রইল সে।

অতসী বারকয়েক ধীরে চোখের পলক ফেলল। তারপর শান্ত, নিরাবেগ কণ্ঠে বলে,

“চলে যান, ফারজাদ ভাইয়া।”

ফারজাদের চেহারায় সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। নিজেও পলক ফেলে চেয়ে থাকে অতসীর দিকে। সেকেন্ড দু’য়েক পর ধীরে চোখ বন্ধ করে দম নেয়। বুঝল অতসী এই নিয়ে কথা এগোতে চাইছেনা তার সাথে। আর সে বসেছিল ক্ষমা পাওয়ার আশায়। নিজের অতিরিক্ত চাওয়ার কথা মনে হতেই নীরবে তাচ্ছিল্য হাসল। আগ্রহী নয়নে তার দিকে চেয়ে ছিল সে। শরীরের ভঙ্গিটাও তেমন। এ পর্যায়ে

পিঠটা দেয়ালে এলিয়ে হাঁটুতে একহাত রেখে বসে। তবু দৃষ্টি অতসীপানে।

অতসী নিজের তরফ থেকে কিছু বলছে। তার ভালো লাগছেনা এত কথা শুনতে বা বলতে। তাই ফারজাদ যেন বেরিয়ে যায় এখান থেকে। কিন্তু সেসব ফারজাদের কানে ঢুকেছে কিনা সন্ধেহ। সে নরম দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে অতসীর দিকে। ঠোঁটের নড়চড় চোখে পড়লেও আদতে কি বলছে তার কানে যাচ্ছেনা। মিনিট দুয়েক যায়।

অতসীকে দেখতে দেখতে ফারজাদের কি যে হলো!

দৈবাৎ ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে অতসীকে জড়িয়ে ধরল সে। কোনো কথাবার্তা ছাড়া, অনুমতি ছাড়া— গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নিলো তাকে।

অতসীর কথা থেমে গেছে, জমে গেছে পাথর ন্যায়। মুহূর্তের মধ্যে কি হলো টাহর করতে পারল না সে। সেকেন্ড কয়েক পর কারো বুকে পিষ্ট হচ্ছে বুঝে দম আঁটকে এলো তার। ছাড়িয়ে নিতে চাইল নিজেকে। ফারজাদকে ঠেলে যেকোনোভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল সে। কিন্তু কোনো হেলদোল হচ্ছেনা ফারজাদের। বরং আলিঙ্গন আরও গভীর হচ্ছে যেন।

অতসীর পুরো সত্তাটা কেঁপে উঠে। এত গভীর আলিঙ্গন! এই পুরুষটার সাথে! কীভাবে মিশে গেছে তার সাথে!

অতসীর দেহদুটোর লেপ্টে থাকার গভীরতার বুঝে আতঙ্কিত লাগছে। স্বীয় অঙ্গে ফারজাদের গভীরভাবে মিশে যাওয়া, দুটো দেহের এত গভীরভাবে ছুঁয়ে যাওয়া— অনুভব করতে পারছে সে। খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারছে। সেই রাতের মতো— পোশাক দুটোর আবরণের অনুপস্থিতি ছাড়া এভাবেই তো লেপ্টে ছিল তার সাথে।

কি জগন্য এক অনুভূতি! অতসীর গা গুলিয়ে উঠল। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াল। কণ্ঠে রাগ-ঘৃণা, পিঠে কি ল দিয়ে বলে,

“ছাড়ুন। ছাড়ুন বলছি। কোন সাহসে এভাবে…”

কম্পমান গলা দিয়ে ক্ষোভে ঘৃণায় কথা বেরুল না তার। ফারজাদ আরও দৃঢ় করে বন্ধন। অতসীর রাগে অপারগতায় নিজের চুল ছি ড়তে ইচ্ছে করছে। আগেও একবার এভাবে জড়িয়ে ধরেছিল সেই ঘটনার পর। কিন্তু তখন এসব ঘটনা কেউ জানতো না। তার ভয় করতো ফারজাদকে, সবাই জেনে যাওয়ার ভয় ছিল তখন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। তার এখন আর ওসব ভয় নেই। উল্টো ভয় পাওয়ার কথা ফারজাদের। তাহলে এখনো কেন তার সাথে এমনটা হচ্ছে? সে তো কাটিয়ে উঠছিল সেই ঘটনার রেশ, সবকিছু পেছনে ফেলে আসছিল। এর মধ্যে ফের; ফের এমন কিছু!

গলা দিয়ে কথা বেরুচ্ছেনা অতসীর। ক্রমাগত কি ল, ঘু ষি দিতে লাগল।

কিন্তু পুরুষটির কোনো হেলদোল নেই। সে একটু শান্তি পেতে মরিয়া। প্রেমভুবনের মেয়েটির দেশ ত্যাগের আগে শেষবারের মতো গভীরভাবে একটু আগলে নেওয়ার ইচ্ছে পূরণ করতে মরিয়া সে।

অতসী কণ্ঠে একরাশ ঘৃণা নিয়ে পিঠে কি ল দিতে দিতে বলে উঠে,

“অ সভ্য, ল ম্প ট, জানোয়ার— ছাড় আমায়। ছাড়, ছাড় বলছি।”

ফারজাদ নীরবে হেসে উঠল ওভাবে থেকেই। মাথা নাড়িয়ে তার চুলের ভাঁজে নাক ডুবিয়ে আরেকটু গভীর হলো। হালকা চুমুও খেলো সেথায়। অতসী কাঁঁদছে।

“শ য় তান, ল ম্প ট। ছাড় বলছি আমায়। ছেড়ে দে। তোকে মে রে ফেলব আমি। ছাড়!”

দৈবাৎ সে অনুভব করল ফারজাদ শুইয়ে দিয়েছে তাকে। অতসীর ব্যাল্কনিতে বসে গান গাওয়া কিংবা আনমনে বসে থাকা— এসব একটু বেশি করা হয়। তাই বড় ঝুলন্ত দোলনাসহ, ফ্লোরেও আরাম করে বসতে কিংবা শুতে পারার মতো ব্যবস্থা করা আছে।

ফারজাদ সেখানে শুইয়ে দিল তাকে।

অতসীর চারপাশটা মুহূর্তের জন্য তীব্র ভুমিকম্পের ন্যায় কেঁপে উঠল যেন। তাকে এভাবে শুইয়ে দিল কেন ফারজাদ! কি করতে চাইছে?

সেদিন পার্ক থেকে কোলে নিয়ে তাকে আনতে চাইছিল যখন, তখন সবার মাঝেই মানা করে দিয়েছিল বলে বদলা নিচ্ছে— এমনকি?

অতসী তো তখন নিষেধ করে দিলেও আনমনে একটু ভয়ে ছিল— ফারজাদ এটার জন্য অপমানবোধ করে আবার খারাপ কিছু না করে তার সাথে। কিন্তু আদতে কোথাও একটা বিশ্বাসও ছিল হয়তো ফারজাদের প্রতি, যে সে এমনটা করবেনা। এ কদিনে তাকে অনেকটাই তো ভিন্নভাবে চিনেছে। আর একারণেই হয়তো সবার মাঝে ওভাবে অবাধ্য হওয়ার-জেদ করার সাহস দেখাল সেদিন। তাহলে ফারজাদ এখন এমন করছে যে?

অতসী কি ভুল চিনল তাকে? ফারজাদ কি একটুও বদলায়নি? অপমানের প্রতিশোধ নিতে এভাবে বদলা নেবে আবার? একটু আগে তবে এত গভীরভাবে ক্ষমা চাইল কেন? কেন বললো যে তাকে ভালোবাসে!

কেন অতসীকে এতটা বিশেষ অনুভব করাল ফারজাদ? যদি এভাবেই শেষে ফের নিকৃষ্টভাবে নিজেকে জাহির করবে!

অতসীকে তো অতসীরাণী ডেকেছিল সে। তাহলে কেন আবার দাসীর স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে!

অতসীর ভাগ্যের প্রতি তীব্র অভিযোগ, আক্ষেপ, আর অপারগতায় কান্না পেল। ফারজাদের শক্তপোক্ত হাতটা যখন তার পোশাক সরাতে হাত রেখেছে, তখনই চোখ বন্ধ করে সব আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা ত্যাগ করল সে। ফারজাদের ওপর আ ঘা ত হানা বন্ধ করে দিল। যেন মেনে নিয়েছে নিজের পরিণতি।

বন্ধ চোখের কোণা বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে। নীরব, নির্জীব সে।

ফারজাদ তার ওপর ঝুঁকে উদর হতে পোশাক সরায়। এঁকে এঁকে চুমু দিতে দিতে, টানা দশবার চুমু খেলো। তারপর সেকেন্ড কয়েক ওখানটাই নাক ঠেকিয়ে রইল। ঠোঁটের স্পর্শও লেগে আছে মোলায়েমভাবে। ওভাবে কিছুপল থেকে নিচে অগ্রসর হয়। ক্ষ তযুক্ত পা -টা হতে পাজামা অল্প সরিয়ে সেই ক্ষ ততেও ঠোঁট ছোঁয়ায়। আবার উঠে এসে তার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললো,

“ভয় পেয়েছিলে? সরি!” থেমে বলে, “ঐ মুহূর্তটাতে কি অনুভব করলে অতসী? তুমি এ কদিনে আমার প্রতি কোনোরকম কি বিশ্বাস এনে ফেলেছিলে? আর আমায় নিয়ে কি কি ধারণা জন্মেছিল বলে উপলব্দি করলে এই অল্পসময়ের তীব্র মুহূর্তটাতে? আমায় জবাব দিতে হবেনা। তুমিই ভাবো, নিজেকে উত্তর দাও অতসীরাণী।”

কথাটা বলে চলে যায় সে।

আর অতসী ওভাবেই পড়ে রইল; নির্জীবভাবে।

_

দুটোদিন কেটে গেল চোখের পলকে। অতসী বাবা-মায়ের সাথে নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, আর নতুন জীবন পাওয়ার লক্ষ্যে ভীন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে আজ। বেরিয়ে পড়েছে সে বাবা-মায়ের সাথে। তার জীবনের সবচেয়ে বিশ্বাস আর ভরসার স্থান যে দুটো মানুষ— তাদের সাথে নতুন জীবন পাওয়ার লক্ষ্যে দেশ ত্যাগ করবে সে। অতসী চলন্ত গাড়িতে বসে জানালা দিয়ে নিজ দেশের হাওয়া-বাতাস অনুভব করতে পারছে, যা সে আজ ছেড়েছুড়ে চলে যাবে। আফসোস আলোটুকু দেখার সামর্থ্য নেই। তবে মাটির ঘ্রাণটা বেশ অনুভব করতে পারে। কারণ অতসীদের সুস্থ ইন্দ্রিয়গুলো একটু বেশিই প্রকট হয়!

অবশেষে সবকিছু পেছনে ফেলে আজ চলে যাচ্ছে সে। উদরে হাত রেখে নিজের অনাগত সন্তানকে অনুভব করতে চাইল। পরপর পাশে মায়ের কাঁধে মাথা ফেলে চোখ বুজে নেয়।

প্রেমভুবনের অতসী পর্ব ২২ গল্পের ছবি