ঘটনাস্থলে নিবিড় গিয়ে নিজেকে প্রাচীর অভিভাবক পরিচয় দিলেও একজন জোয়ান ছেলে কেমন অভিভাবক হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় সেখানে উপস্থিত লোকজনের। নিবিড় তখন একটু আঁটকে গিয়েছিল। তবে প্রাচীর শিক্ষক হয়, সাথে আত্মীয়— একথা জানায়। কিন্তু সেসব ওখানের মানুষজন সহজভাবে নেয়নি।
কলেজের স্যার, আবার কোথাকার কি ভাই, সে আবার নিজেকে অভিভাবক পরিচয় দেয়— এসব তাদের গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। নিবিড়কেও সন্ধেহের তালিকায় ফেলে দেয়। ভিডিও করছিল তারা। নিবিড় তা দেখে তাদের শান্ত হতে অনুরোধ করে। দরকারে প্রাচীর পরিবারকে ডাকবে তাও জানায়। কিন্তু লোকগুলো ঐ ছেলেটার সাথে অনৈতিক সম্পর্ক আছে ধারণা করে তাদের বিয়ে দিতে চাইছিল। নিবিড় তাতে অমত জানালে তার দিকেই ঘুরে আসে তীর। নিবিড়ের সাথেও এই মেয়ের কোনো রকম সম্পর্ক থাকতে পারে, নয়তো ভালো পরিবারের মেয়ে হলে এ অবস্থায় কেন? কলেজের স্যার এসে অভিভাবক পরিচয় দেবে কেন? মেয়ের চরিত্র ভালো না— এমন নানান কথা বলে মেয়েটাকে দুজনের মধ্যে কোনো একজনের সাথে পবিত্র সম্পর্কে বেঁধে দিয়ে তবেই এখান থেকে ছাড়বে জানালে, নিবিড় কেন জানি আর দ্বিরুক্তি করেনি— সহজভাবে মেনে নেয় তা। নিজেই প্রাচীকে বিয়ে করতে চায় জানায়। ওখানেই দুজনের বিয়ে সম্পন্ন হয়। তারপর ফিরতে পেরেছে।
আর এসব এখন শুধু ফারজাদ নয়, বাড়ির সকলেই জানে।
_
সেদিনের পর আরও দুটো দিন কাটল। প্রাচীর প্রথম দিনটা একটু ঐ ঘটনার রেশ কাঁটাতে না পারায় আনমনা কাটে। সে জানেওনা তার সাথে এমনটা কেন হলো!
এমনকি বাড়ির সকলেরই মনের অবস্থা একই ছিল। নিবিড়ের ঘটানো এই ঘটনাটিতে প্রত্যেকে আশ্চার্যান্বিত। তার কাছে এমন কিছু কেউ আশা করেনি। না তো একজনের সম্মানহানীর প্রতিশোধ নিতে নিবিড়ের মতো শান্তশিষ্ট আর বুঝদার মানুষ আরেকটা মেয়ের সম্মানহানী করতে চাইতে পারে— এই বিষয়টা মাথায় খেলাতে পারছে। অতসীর সাথে তার বিয়েতে যখন সকলে মত দিয়েছিল, তখন তো ছেলেটার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতো বলেই দিয়েছিল। আর যখন ফারজাদ-অতসীর সবটা জানাজানি হয়, তখনও ছেলেটা অতসীকে বিয়ে করতে রাজী ছিল। এতে নিবিড়ের প্রতি সকলের দৃষ্টিভঙ্গিই আলাদা রুপ পায়। কোথায় তাদের ল ম্প ট ছেলে, আর কোথায় এই ভদ্র, সভ্য ছেলেটা! নিবিড়কে টপকে নিজেদের ছেলের জন্য অতসীকে চাইবে, বা অতসীকে ফারজাদের কাছে দেবে এই ভাবনা মাথায় আনতেও লজ্জ্বা করতো তাদের। কারণ অবশ্যই অতসীর জন্য ফারজাদের চেয়ে নিবিড় শতগুণে ভালো, আর যোগ্য সেই প্রমাণ চাক্ষুষভাবে পেয়েছে। আর এমন সুন্দর ব্যক্তিত্বের ছেলেটাই কিনা প্রাচীর এত বড় সর্বনাশ করে দিতে চেয়েছিল প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে!
আজকালকার যুগে ছেলেগুলোর মন মানসিকতা কতটা অপ্রত্যাশিত হয়! ভাবতেই যেন আফসোস আর ক্লান্তিতে নেতিয়ে যাচ্ছে তাদের মন।
অতসী, প্রাচী দুজনেই ভিন্ন পরিস্থিতিতে খারাপ একটা সময় পার করে এসেছে। বাড়িতেও সকলে মনমরা। তাই বোনেদের নিয়ে সুন্দর কোনো পরিবেশ থেকে ঘুরে আসার তাগিদ দেওয়া হয়েছে আরমানকে।
প্রাচী না যেতে চাইলেও বাবার আদেশের সামনে তার ইচ্ছে ফলেনি। আবার অতসীকেও পাঠাতে মানা ছিল তার বাবার। তাকে দেখে রাখতে স্বাভাবিকভাবেই আরেকজনের দরকার পড়ে। আরোহী ওসব করার মানুষ না। সে থাকবে নিজের মতো। প্রাচীরও মনের অবস্থা অতোটা ঠিক নেই যে অতসীর দায়িত্ব তাকে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকবে। তাই তাকে আরেকবার কখনো ঘুরতে গেলে তখন পাঠাবে বলে কাটিয়ে দিতে চাইল। অথচ সকলে জানে সেই সুযোগ আদতে সামনে আসবে কিনা তারই নিশ্চয়তা নেই। তাই ঐ কথায় কেউ গলেনি। প্রাচীই অতসীকে ছাড়া যাবেনা জানিয়ে দিল, সাথে আরোহীও নিজ থেকে জানালো সে দেখে রাখবে অতসীকে। অবশেষে সকলের জোরাজুরিতে রাজী হয়। অতসী, আরোহী, আর প্রাচীকে নিয়ে ঘুরতে বেরোয় আরমান।
তারা একটা রেস্টুরেন্টে যায় প্রথমে। প্রিসিলাও এসেছে স্বামীর সাথে। আরমান ডেকেছে বোনকে। সেখান থেকে ভালোমন্দ খাবার খেয়ে নিরিবিলি কোনো পার্কের উদ্দেশ্যে যাবে ঠিক করলো, যেখানে ছবি তোলার উপযোগী স্থান থাকবে। আরমান, আর প্রিসিলার স্বামী দেখেশুনে তেমনই একটা পার্কে নিয়ে যায় মেয়েদের।
ঘুরতে ঘুরতে প্রিসিলা আর আরোহীর নানান কথাবার্তার সাথে তাল মিলিয়ে প্রাচীর মন খারাপি গায়েব হয়ে যায় ধীরে ধীরে। অতসীও আছে বোনেদের আলাপ-সালাপে। পার্কের একপাশে বসার উপযোগীভাবে কিছু জায়গা সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে লতাপাতা দিয়ে ঘেরোয়া করে। ওখানটাই দেখিয়ে আরোহী বলে,
“ওয়েট ওয়েট। এই জায়গাটাই কিছু পিকচার’স নিই। প্রথমে আমাদের চারবোনকে তুলে দেবে। তারপর ভাইয়ার সাথে আমরা চারজন। দেন দুলাভাইয়ের সাথে আমরা। লাইক শ্যালিকা দুলাভাই ডুয়ো, এন্ড শ্যালক শ্যালিকা-দুলাভাই ডুয়ো। মন চাইলে আপুর সাথে কাপল পিকও তুলতে পারেন দুলাভাই। উই ডোন্ট মাইন্ড।”
আরোহীর কথায় হেসে সম্মতি জানায় তারা। একসাথে চারবোন ছবি তুলে। আরমানসহ কিছু তুললো বোনেদের সাথে। দুলাভাইয়ের সাথে শ্যালিকারা, আবার শ্যালক-শ্যালিকাদের মাঝে দুলাভাই, তো কখনো দম্পতিকে একলা— এমন নানান ছবি তুলে।
ঘুরতে ঘুরতে পার্কের শেষ মাথায় লেইকের ধারে ছায়ায় গিয়ে বসলো তারা। ওখানে একটা বাদাম বিক্রেতা দেখা যাচ্ছে।
অতসী প্রাচীর পাশে বসে আছে। পাশ থেকে একটা বাচ্চা মাকে বাদাম কিনে দেওয়ার বায়না করলে অতসীর কানে আসে তা।
“আপু। এখানে বাদামওয়ালা আছে?”
প্রাচী ফোনের ক্যামেরায় নিজেকে দেখছিল। চুল ঠিক করতে করতে জবাব দেয়,
“হ্যাঁ, আছে তো। তুই খাবি?”
“হ্যাঁ খাবো আপু! এনে দাও প্লিজ।”
আরমান উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“বোস তোরা, আমি নিয়ে আসছি। বাকিরা খাবি?”
সকলে সম্মতি জানায়। সে গেল বাদাম কিনতে।
প্রিসিলা স্বামীর পাশে বসেছে। সে ফোন চেক করছে একটু পরপর। মনে হচ্ছে কারো অপেক্ষায় আছে।
তার স্বামী বলে,
“অতসী? একটা গান গাও তো ছোট আপু। শুনলাম তুমি গান শেখো, খুব ভালো গান গাও। আমাদেরও শুনাও। নিরিবিলি জায়গায় বেশ এঞ্জয়েবল হবে।”
“এখনো শিখছি ভাইয়া। অতো ভালো গাইতে পারিনা। আরেকদিন প্লিজ।”
প্রিসিলা ফোন হতে নজর সরিয়ে তাকায়,
“ডাহা মিথ্যে কথা। এই মেয়ে সেরা রকম গান গায়। শান্ত আপনি ধরুন আপনার শ্যালিকাকে। দেখি আজ কিভাবে পার পায়। এত ভালো গান গেয়েও আমাদের একটা গান শুনাতে বললে খালি গাইগুই করে প্রতিবার।”
“অতসী, আজ বাহানা দেখাবিনা একদম। এখানে তো আমরা ছাড়া কেউ নেই। গান ধর দেখি একটা।”
আরমান ততক্ষণে বাদাম নিয়ে এসে বসেছে। অতসীকে গান গাইতে বলছে শুনে সে বলে,
“এই একটা কাজের কাজ করেছিস সবাই মিলে ওকে গান গাইতে বলে। অতসী গান ধরত একটা। সবাই একটু মাইন্ড রিফ্রেশ করি তোর কোকিল কণ্ঠ শুনে।”
এর মধ্যে কোথা থেকে ফারজাদ চলে এলো। প্রিসিলা তাকে দেখে এদিকটাই হাত দেখিয়ে ডাকে। সে আসবে তা বাকিরা জানতো না। তবে সন্তুষ্ট হয়, প্রকাশ না করলেও ভাই বোনেদের এই মুহূর্তে ফারজাদকে মিস করছিল তারা। আনন্দিত হয়ে কিছু বলতে নিচ্ছিল আরোহী। কিন্তু অতসীর কথা মাথায় আসতেই একনজর তার দিকে তাকাল। শুধু সেই না, সবাই তাকায়। অতসী বুঝতে পারেনি ফারজাদের উপস্থিতি। বলছে,
“আপু, এমন করো না। আরেকদিন গাইনা প্লিজ। এখানে আশেপাশে কেমন মানুষ, কতো মানুষ— কিছুই তো জানিনা। বাড়ি গিয়ে শুনাব তোমাদের।”
“এখানে তেমন কেউ নেই অতসী। দুয়েকটা কাপল বাচ্চাকে নিয়ে ছিল, তাও অন্য দিকে চলে গেছে। আমরা নিরিবিলি জায়গা দেখেই এখানটাই এসেছি। তুই গা তো!”
আরমানের কথায় অতসী একটু নড়েচড়ে বসলো। কেউ নেই যখন গান একটা ধরাই যায়। এমনিতেও গান গাওয়া তার অতিপ্রিয় শখ। এটাতে তার বিরক্তি আসেনা। সে গান ধরছে বুঝে সকলে মনোযোগী হয়ে বসে।
ফারজাদ আছে তাদের মধ্যে। তার ইশারাতেই সবাই নিশ্চুপ থেকেছে তাকে নিয়ে। সে সবুজ ঘাসের ওপর বসে পেছনে হেলে মাটিতে দুহাত রাখে, ওতে শরীরের ভার ছেড়ে দিয়েছে। মাত্র এসে বসায় কিছুটা হাপাঁচ্ছে। কপাল কুঁচকানো, আর নজর অতসীপানে।
অতসী চোখ বন্ধ করে গান ধরল,
মধুমালতী ডাকে আয়
ফুঁল ও ফাগুনের এ খেলায়
মধুমালতী ডাকে আয়
ফুল ও ফাগুনের এ খেলায়।
গানের বাক্যগুলো বেরোতেই তার কণ্ঠ হাওয়ার মতো মোলায়েম হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঠোঁটের নড়াচড়া খুব ধীর, আর মাপা। প্রতিটি শব্দ যেন অতসী যত্ন করে গড়ে তুলছে।
যুথি কামিনী কত কথা
যুথী কামিনী কত কথা
গোপনে বলে মলয় আয়
মধুমালতী ডাকে আয়।
গান গাইতে গাইতে তার চোখদুটো অল্প অল্প বন্ধ হয়ে আসে, আবার সুর বদলালে ধীরে ধীরে খুলে যায়। চোখের পাতা কেঁপে ওঠে হালকা।
চাঁপা বনে অলি সনে
আজ লুকোচুরি গো লুকোচুরি
আলো ভরা কালো চোখে
কি মাধুরী গো কি মাধুরী
মন চাহে যে ধরা দিতে
লাইনটা টানতে গিয়ে সে সামান্য মাথা কাত করল। তার গলার শিরা হালকা টানটান হয়ে উঠেছে, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত শান্তি। কি চোখ ধাঁধানো দেখাল কারো চোখে সেই দৃশ্যটা।
ফের একই সুর তুলে,
মন চাহে যে ধরা দিতে
তবু সে লাজে সরে যায়
মধুমালতী ডাকে আয়।
গানের ভেতরে ঢুকে গেলে যেমন হয়— অতসী যেন ঠিক সেভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে।
এভাবে গাইতে থাকল সে। ওদিকে সবাই নিঃশব্দ।
আরমান বাদামের কাগজের ঠোঙা হাতে নিয়েই বসে গেছে। বাকিদের যে ঠোঙাটা দেবে তা মাথায় নেই। প্রিসিলা ফোনটা কখন যে পাশে রেখে দিয়েছে সে নিজেও জানেনা। শান্ত চুপচাপ তাকিয়ে আছে অতসীর দিকে। আরোহী ভিডিও করছে সবটা। কখনো ফোন ঘুরিয়ে বাকিদেরও দেখায়। প্রাচী অতসীরই পাশে।
আর ফারজাদ…
সে আগের মতোই পেছনে হেলে বসে আছে, দুহাত মাটিতে রাখা। কিন্তু তার চোখ এখন স্থির। কপালের কুঁচকানো ভাঁজ ধীরে ধীরে মসৃণ হয়ে এসেছে। এত মন দিয়ে মেয়েটার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি লক্ষ্য করছিল যে এর মধ্যে কবে গানটি সম্পূর্ণ গেয়ে শেষ করেছে বুঝতেও পারছেনা। ফারজাদের চারপাশটা স্বাভাবিক। কিন্তু সে আর অতসী; তারা দুজন ধরণীর বিশেষ কোনো নিয়মে আপনগতিতে ধীরভাবে চলছে যেন। অতসীর ঠোঁটের নড়চড়, চোখের পাতার কম্পন, হাতে গানের সাথে তাল মেলানোর চেষ্টা, গানের বিশেষ বিশেষ বাক্যে এসে মুখে নেমে আসা লাজুকতা— সবটা গভীর নয়নে দেখল সে। অবশেষে তার জীবনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ সম্পন্ন হয়েছে এই মেয়ের কণ্ঠে গান শুনে।
কিন্তু কই?
এখানে তো গর্বর হয়ে গেল কিছু একটা। ফারজাদের আরও শুনতে ইচ্ছে করছে গান। তৃষ্ণা তো বেড়ে গেল! বিষয়টা উপলব্দি হতেই কপালে ভাঁজ পড়ে। অতসীর গান শেষ। অকস্মাৎ সকলের তালির আওয়াজ কানে আসতেই তাদের জন্য গড়া সেই বিশেষ নিয়ম ভেঙে গেছে মনে হলো তার। ধরণী একাকার হয়ে গিয়েছে। সবাই এখন একসাথে। তার ঘোর ভেঙেছে। অতসীও বাকিদের সাথে তাল মিলিয়ে হাসছে, কথা বলছে।
ফারজাদ সোজা হয়ে গা ঝাড়া দেয়।
_
“গান খুব ভালো গাও তুমি। একটু আগে বুঝলাম, এখন আমার আরেকটা জিনিসেও নেশা ধরে। গেস হোয়াট?— ইট’স ইউর ভয়েস।”
“হুহ? কে?”
অতি সন্নিকটে শোনা কণ্ঠটি খুব চেনা। তবু সাথে সাথে টাহর করতে পারল না অতসী। চমকে দু’পা সরে গেল সে। শরীরে মৃদু কম্পনও সৃষ্টি হয়েছে এই সামান্যে। মেয়েটার নাজুকতা দেখে ফারজাদের অদ্ভুদরকম ভালোলাগার আবেশ অনুভব হয় প্রতিবার।
যথাসম্ভব নরম গলায় কথা বলে সে অতসীর সাথে। তাও এই কণ্ঠ নাজুক মেয়েটার কানে গমগমে শোনায় হয়তো। লাগবেই তো! মেয়েটা যে অতসী! তার সেই কঠোর-গমগমে গলা এই ভীতু অতসী ফুলের জন্য না। মানায়না অতসীর বিপরীতে কোনো কর্কশ কণ্ঠ।
ইশ!
একসময় কোনো সংযম ছাড়া এই নাজুক মেয়েটার সাথে কতো রুক্ষ আচরণই না করেছে! আফসোস লাগে তা ভাবতে। বড্ড আফসোস লাগে ফারজাদের।
সে ভয়ার্ত অতসীপানে নজর রেখে নরম স্বরে বলে,
“আমায় চিনতে পারছ না?”
“ফারজাদ ভাইয়া?”
শব্দটা শুনেই ফারজাদের কপাল একটু কুঁচকে আসে। মুখে হালকা বিরক্তির রেখা ফুটে উঠল। ‘ভাইয়া’—ডাকটা তার কানে খচখচ করে লাগে। অতসীর মুখে তার জন্য এই শব্দ বেমানান। খুবই বেমানান। কিন্তু শুধরে দিল না আর। বরং যেতে দিয়ে শান্ত স্বরেই বলে,
“বলছি গান খুব ভালো গাও। তোমার গানের গলা নেশা ধরে যাওয়ার মতো।”
অতসীর প্রশংসা পেয়েও অস্বস্তিকর লাগল। সে সামলে বলে,
“আপনি এখানে কিভাবে? কখন এসেছেন?”
ফারজাদ হালকা হেসে বলল,
“অনেক আগেই এসেছি। তুমি বুঝতে পারোনি।”
অতসীর কপালে ভাঁজ পড়ে,
“না, আপনি এখন এসেছেন।”
ফারজাদও সামান্য কপাল কুঁচকে মৃদু স্বরে বলল,
“উহু। আমি তো তোমার গান শুরু করার আগে থেকেই এখানে আছি। তুমিই বুঝতে পারো নি।”
সে ফারজাদের কথার বিপরীতে বললো,
“শুরু থেকে থাকলে আমি বুঝতে পারতাম। এখন এসে মিথ্যা বলছেন।”
হাতে থাকা একটি ফুল অতি সাবধানে অতসীর কানে চুলের ভাঁজে গুঁজে দিল ফারজাদ, যাতে অতসী টের না পায়। পরপর তার কথার বিপরীতে বলে,
“তাই? আমার উপস্থিতি তুমি অনুভব করতে পারো?”
অনুদ্দেশ্যে স্থির থাকা দৃষ্টি একটু নড়েচড়ে উঠল ফারজাদের কথায়। চেহারাতেও সেই অস্থিতিশীলতার হালকা ছাপ দেখা যায়। সেটা দেখে ফারজাদ নিঃশব্দে হেসে ফেলল। অতসী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
“আপনি এসেছেন ভালো কথা। কিন্তু এখানে আমার কাছে কেন? আর বাকিরা—”
কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল।
“আহ - আআ - ওয়াক”
অকস্মাৎ বমি করে ফেলল সে।
সবটা গিয়ে পড়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফারজাদের গায়েই।
তবু এক মুহূর্তের জন্যও ফারজাদকে বিরক্ত হতে দেখা গেল না। বরং অতসীর হঠাৎ এমন অবস্থায় তাকে ভীষণ বিচলিত দেখায়।
দ্রুত তার বাহু ধরে সামলে নেয় সে।
“কি হলো? সিক লাগছে তোমার? আগে জানালেনা কেন?”
কিন্তু অতসীর বমি থামছে না, জবাব দেওয়ার অবস্থায় নেই। গলগল করে বমি করে যাচ্ছে সে। একহাতে নিজেই সাহারা নিতে ফারজাদের হাত শক্ত করে ধরে ফেলেছে। তার পোশাকও নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
ফারজাদ তড়িঘড়ি করে অতসীর ওড়নাটা ঠিক করে গুছিয়ে দেয়। কপালের উপর পড়া চুলগুলো সরিয়ে পেছনে নিয়ে ধরল। যতটা পারে জামাকাপড়ও সামলে দিল। তারপর অতসীর হাত ছাড়িয়ে নিজেই দু’হাতে আগলে রাখে তাকে।
অতসী সামনে ঝুঁকে ‘ওয়াক ওয়াক’ শব্দ তুলে একের পর এক বমি করেই যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টে খাওয়া খাবার আর একটু আগের খাওয়া বাদাম— সবকিছুই উগরে দিচ্ছে সে। ফারজাদ নিচু গলায় বলল,
“কাম ডাউন, অতসী… কাম ডাউন।”
এর মধ্যে তাদের লক্ষ্য করে বাকিরাও তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে আসে। অতসীর শরীর ভালো লাগছে না শুনে তাকে একপাশে দাঁড় করিয়ে তারা ছবি তুলছিল।
দৌড়ে এসে প্রিসিলা উৎকণ্ঠিত গলায় বলে,
“কি রে? তোর এত শরীর খারাপ লাগছে তো বললি না। দেখি? কি অবস্থা হয়ে গেল ইশ!”
“যা খেয়েছে সব তো উগলে দিচ্ছে। পেটে সয়নি হয়তো।” চিন্তিত গলা প্রাচীর।
আরোহীও যথেষ্ট বিচলিত। কিন্তু প্রাচীর কথা শুনে সে বলে,
“পেটে সয়নি নয়। প্রেগ্ন্যান্সিতে এমন হয় পাগল। নতুন শুনছিস?”
কথাটা ধীরে বললেও প্রায় সকলের কানে যায়। দুশ্চিন্তার মধ্যেও ফিরে তাকায়। ভুল কিছু বলেনি।
“পানি নিয়ে আয় তো আরমান, কুইক।”
আরমান গেল গাড়ি থেকে পানি নিয়ে আসতে।
“কাম ডাউন অতসী। কাম ডাউন।”
অতসী গাঢ় শ্বাস প্রশ্বাস টেনে একটু জিরিয়েছিল মাত্র। ফারজাদ তার মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ আবার;
“ওয়াক…”
শব্দ তুলে আবার বমি করতে শুরু করল সে। ফারজাদের শার্ট ইতোমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। সে প্রিসিলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“একটু ধর ওকে।”
উদ্বিগ্ন প্রিসিলা মাথা নেড়ে এগিয়ে আসে। বাকিরা দাঁড়িয়ে চিন্তিত বদনে অতসীর অবস্থা দেখছে।
তার গায়ের অরগাঞ্জা ধরণের ওড়নাটা ঠিকভাবে থাকছেইনা। নষ্ট হয়ে যাবে বলে ফারজাদ সামনে গিয়ে হাত পেতে ধরল অতসীর সম্মুখে। হাতের আজলায় নিয়ে বমি অতসীর গায়ে যাওয়া থেকে আঁটকে নেয়। চেহারায় কোনো অযাচিত প্রতিক্রিয়া নেই। বরং চিন্তার রেখা।
প্রাচী আর প্রিসিলা দুই পাশ থেকে ধরে আছে অতসীকে। এই দৃশ্য দেখে সবাই মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। চোখাচোখি করল একবার। এসময় আরমান পানি নিয়ে ফিরে আসে।
প্রিসিলা বলে,
“শান্ত হো অতসী… কাম ডাউন।”
মিনিট দুয়েক পর ঘনঘন শ্বাস টেনে সে স্থির হয় কিছুটা। বোনেদের গায়ে ভার ছেড়ে দেয়। প্রিসিলা বলে,
“মুখে পানি নিয়ে কুল্কুচি করে নেওয়া দরকার একটু।”
আরমান পানিটা এনে এগিয়ে দেয়। প্রিসিলা চিপি খুলে তার মুখে ধরল। কুলকুচি করে, পরপর অল্প করে খাইয়ে দেয়। দুই লিটারের দুবোতল নিয়ে এসেছে পানি।
একটি হাতে নিয়ে ফারজাদ বসার জায়গার ব্যবস্থা আছে ওখানটাই ইশারা করে বলে,
“ওকে ওখানে নিয়ে বসা। একটু স্থির হোক।”
প্রিসিলা সম্মতি জানায়। ফারজাদ একপাশে গেল বোতলটা নিয়ে। যতটুকু পারে পরিষ্কার করে নেয় গায়ের শাঁর্টটা। চোখে মুখে পানি দিয়ে একটু স্থির হয় অতসীও। প্রিসিলা মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে বারবার। অতসী প্রিসিলার কাঁধে মাথা রাখা, চোখ বন্ধ রেখেই ক্লান্ত গলায় বলে,
“পায়ে ব্যাথা লাগছে আপু। ওখানটাই কিছু লেগেছে। একটু দেখো না প্লিজ।”
তার কথায় সবাই তাকায়। মেয়েদের হিজাব পিন ফুঁটেছে পায়ের একপাশে।
“পিন ফুঁটে গেল দেখি পায়ে। এত কাণ্ড কবে হয়ে গেল। ইশ! র ক্ত আসছে কিভাবে। দেখি?”
বলে পাজামা সরিয়ে আরেকটু ভালো করে দেখে। তার স্বামী টিস্যু বের করে বলে,
“পিনটা নিয়ে টিস্যু দিয়ে ব্লা ড মুছে দাও প্রাচী। পরিষ্কার করে দাও একটু। ইনফেকশন হবে।”
প্রাচী সায় জানিয়ে করল তা। ফারজাদ শাঁর্ট পরিষ্কার করে আসে, তবে ভিজে গেছে পুরো।
বুকের দিকে সব বোতাম খোলা, একপাশ ঝাড়তে ঝাড়তে কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,
“রেস্টুরেন্টে কি আবোল তাবোল খাইয়েছিস ওকে? কিছুই ডাইজেস্ট হয়নি। ওসব জাংকফুড খাইয়ে আবার বাদামও দিয়েছিস। এসব অতিরিক্ত খাবার এখন শরীরের জন্য কতটা হার্মফুল জানিস না? সবার বোধ বুদ্ধি লোপ পেয়েছে নাকি! স্ট্রেঞ্জ!”
প্রিসিলার স্বামী বলে,
“আরেহ শালাবাবু, সবাই যেখানে এক খাবার খাচ্ছিলাম ওখানে একজনকে অন্যকিছু দিয়ে একঘরে করে দেওয়া যায় নাকি?”
“সেটাই? আর এমন বমি একবার না, বহুবার করেছে এই অব্দি। তুমিই জানো না শুধু। এসময়ে এসব হয় একটু আধটু। এত চিন্তা করো না।”
কথাগুলো শুনে ফারজাদ হঠাৎ গভীর নয়নে ক্লান্ত অতসীপানে তাকায়। আগাগোড়া পরখ করল। কিন্তু কপালে ভাঁজ পড়ে। পায়ের র ক্ত তার চোখে পড়েছে। ওখানটাই বসে পড়ে। হাতে পা -টা অল্প করে তুলে বলে,
“এটা কীভাবে হলো?”
“পিন ফুঁটেছে।” আরোহী
এর মধ্যে অতসী ভাঙা ভাঙা গলায় বলে,
“আ… আপনি পা ছাড়ুন। আর, আমি বাড়ি যাবো আপু। তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে চলো প্লিজ। পেটের ভেতর এখনো কেমন কেমন লাগছে। অবশ লাগছে সবটা।”
ফারজাদ আর অপেক্ষা না করে বোনের কাছ থেকে স্বযত্নে সরিয়ে নেয় তাকে, পরপর তুলে নিল অসাড়-নাজুক দেহটা।
_
দুদিন কেটে গেল আরও,
প্রাচী এখন অনেকটা স্বাভাবিক। কলেজে গিয়েছে সে। একটা ক্লাস বাদ দিয়ে পরেরটা করে তবেই বেরুলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। বান্ধবীদের আগেই বেরিয়ে এসেছে। হাঁটছে একা কলেজ গেইট হতে মূল রাস্তা অব্দি পথটুকু। হঠাৎ কোনো প্রাইভেট কার এসে পাশ বরাবর ব্রেক কষলে সে ঈষৎ ঘাবড়ে একটু পিছিয়ে দাঁড়ায়। কপালে ভাঁজ পড়ে। কিন্তু গাড়ি থেকে নিবিড়কে নেমে আসতে দেখেই তা মিলিয়ে গেল। উল্টো কিঞ্চিৎ অস্বস্তি এসে ভর করল সেথায়।
নিবিড় গাড়ি থেকে বের হয়, চোখের সানগ্লাসটা ভেতরে রেখে প্রাচীর সামনে এসে দাঁড়াল। তারও কপালে ভাঁজ,
“কলেজে এসেছ, কিন্তু ক্লাসে এবসেন্ট ছিলে? হুয়াই?”
প্রাচী এদিক ওদিক তাকায়, ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল কেন তা নিয়ে এভাবে সরাসরি প্রশ্ন করবে— তা সে ভাবেনি। সে তো এমনিই স্যারের সামনে পড়ার ইচ্ছে নেই বলে তার ক্লাস বাদ দিয়েছে।
“কি হলো? চুপ করে আছ কেন? আমি তো ভেবেছিলাম কলেজ আসোনি। কিন্তু এসেও আমার ক্লাসে এটেন্ড ছিলেনা। তাহলে কোথায় ছিলে তুমি?”
“অসুস্থ লাগছিল স্যার। তাই কমন রুমে চলে গিয়েছিলাম।”
নিবিড়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে,
“অসুস্থ লাগছিল? এখন ঠিক আছ?” বলে তার কপালে হাত ছুঁয়ে দিতে চাইল। কিন্তু প্রাচী আনমনে কিছুটা সরে দাঁড়ায়। নিবিড় তা বুঝতেই হাত থামিয়ে গুটিয়ে নিলো। কিছু মুহূর্ত প্রাচীর অস্বস্তি দেখে থেমে রয়। পরপর শ্বাস টেনে পূর্ণদৃৃষ্টিতে তাকায় প্রাচীর দিকে,
“ফোন করেছি কয়বার? রিসিভ করো নি কেন?”
প্রাচী কি জবাব দেবে ভেবে পেল না। নিবিড় স্যারের সাথে ফোন ধরাধরি নিয়ে, কিংবা এমন যেকোনো ব্যাপারে এভাবে সামনা সামনি কথা হবে তা কখনো ভাবেনি সে। স্যার হিসেবে সম্মান আর শ্রদ্ধা ছিল ব্যাস। আর কোনো অনুভূতি তার ছিল না যে সবটা এত সহজভাবে নেবে। সে নিম্ন গলায় বললো,
“ফোন হাতের কাছে ছিল না তাই।”
নিবিড় চোখ বন্ধ করে দম নেয়। লেইম বাহানা দেখাচ্ছে মেয়েটা। শুধু ছাত্রী হলে এতক্ষণে ধমক দিয়ে দিতো। কিন্তু সম্পর্ক বদলেছে। মেয়েটার সাথে অন্যকিছু হবে তার। আগের মতো করা যায়না। সে শ্বাস টেনে সময় নেয়, গভীর নজর ফেলে জানতে চাইল,
“এড়িয়ে যাচ্ছ কেন প্রাচী?”
“ক কই? তেমন কিছু না।”
নিবিড়ের এবার বিরক্ত লাগল,
“প্রাচী। এভাবে এড়িয়ে গিয়ে তো কিছুই হবেনা। আমাদের মধ্যে এখন একটা পবিত্র সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমি শুধু তোমার কলেজের স্যার, বা চাচাতো বোনের খালাতো ভাই নই যে অচেনার মতো আচরণ করবে। উই হ্যাভ আ প্রপার এন্ড পিউর রিলেশন বিটুইন আস। সেটাতে দুজনকেই তো এফোর্ড দিতে হবে তাইনা? নয়তো কিভাবে কি হবে?”
প্রাচীর চোখ নামানো। সে জবাব দেয়,
“স্যার, এড়িয়ে যাচ্ছিনা আমি। একটু সময় চাইছিলাম ব্যাস।”
“কীসের সময় চাও তুমি? তোমার সময় নেওয়া মানে আমার ফোনকল বা আমাকে ইগনোর করা তাই তো? ইট’স রেডিকিউলাস প্রাচী।”
সে ভুল ভাঙানোর নিমিত্তে বলে,
“আপনি ভুল ভাবছেন স্যার। এমন কিছুইনা। কিন্তু”
“কিন্তু”
নিবিড়ের তীক্ষ্ণ কণ্ঠের বিপরীতে প্রাচী ঢোক গিলে বলে,
“স্যার, সেদিন আমার সম্মান বাঁঁচাতে আপনি যে পদক্ষেপটা নিয়েছেন, এরপর আমারই আপনার প্রতি সম্মান বেড়েছে। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ সেদিনের জন্য। কিন্তু জোরজবরদস্তির একটা সম্পর্ক তো এভাবে আমরা নিজেদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারিনা। সেদিন যা হয়েছে সেসব তো ঐ লোকগুলোর জোরাজুরিতে।
“কি বলতে চাইছ স্পষ্ট বলো।”
প্রাচী এবারে একনজর তাকায় চোখ তুলে, কিন্তু নিবিড়ের নজর সরাসরি তার ওপর বুঝে সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে নিলো।
“আমি চাইছিনা আমাদের সম্পর্কটা এগিয়ে যাক। এখনো তো এই বিয়ের ব্যাপারে কেউ জানেনা। এর আগে কি ডিভোর্সের ব্যবস্থা করা যায়না? অগোচরে বিয়ে হয়েছে, আড়ালে সবটা মিটে গেলে আপনার আমার কারো বদনাম হবেনা। লুকায়িত থাকবে বিষয়টা। এমন করা যায়না?”
শেষ কথাগুলো কিছুটা ভয় নিয়েই বলে। তার কথার বিপরীতে নিবিড় জবাব দিল,
“তোমায় কে বলেছে যে আমাদের বিয়ের সম্পর্কে কেউ জানেনা? আর বিয়েটা না এগোতে চাওয়ার কারণ শুধু কি জোরাজুরির বিয়ে মনে করছ এটা? এছাড়া আর কোনো কারণ?”
“স্যার…”
“সোজাসাপ্টা জবাব দাও প্রাচী।”
প্রাচী সেই কঠোর দৃষ্টিতে স্বীয় নয়ন মেলায়, পরপর নামিয়েও নেয়,
“স্যার আপনি অন্য কাউকে চান। বিয়েটাও অনাকাঙ্ক্ষিত। আমি অন্য কাউকে নিয়ে অনুভূতি আছে এমন কারো সাথে কোনোরকম জবরদস্তির সম্পর্কে যেতে চাইনা।”
“তোমাকে বলেছি আমি জবরদস্তি এই সম্পর্কে জুড়েছি নিজেকে? আমি না চাইলে আমাকে কারো সাথে বিয়ের সম্পর্কে বেঁধে দেওয়া কারো পক্ষে সম্ভব?”
“কিন্তু…”
“চুপ! একদম চুপ। দুদিন হয়নি বিয়ের, আর ডিভোর্সের চিন্তাও করো তুমি! ইচ্ছে তো করছে…” নিবিড়ের অযাচিত ধমকে কেঁপে উঠল প্রাচী।
“ভাইয়ের মতো হয়েছ তাইনা? যেটা মনে আসবে চিন্তা ভাবনা ছাড়া ঠাস করে বলে দেবে। কথার ভার বুঝোনা?”
“আপনি ভুল ভাবছেন স্যার…”
“কি ভুল ভাবছি আমি? ডিভোর্স দিতে চাইছ স্বামীকে বিয়ের দুদিন পেরুতে না পেরুতেই। অতি পাকনা মেয়ে!”
থেমে জেদী গলায় বলে,
“শুনো। বিয়েটা কোনো ছেলেখেলা না। তোমার আমার বিয়ে হয়েছে, এখন সংসারও করতে হবে আমার সাথে। তোমার ভাই বিয়ে করেছে অতসীকে। প্রতারণা করেছে এটা স্পষ্ট। তাও কোনোভাবে অতসী অন্যকারো বউ এটা জানার পর বিবাহিত একটা মেয়েকে নিয়ে ভাবার চিন্তা মাথায় আনতেও দুইবার ভেবেছি আমি। সেখানে নিজের কবুল বলে পূর্ণসম্মতিতে বিয়ে করা বউকে এত সহজে ছেড়ে দেবো? হাতের মোয়া নাকি সবকিছু তোমাদের ভাই বোনেদের কাছে?”
নিবিড়ের মেজাজ গরম হয়ে আছে। তার সাথে প্রাচীর বিয়ে টিকুক তা প্রাচীর পরিবারও চাইছেনা। কারণ এঁকে তো নিবিড় আর অতসীর সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল, সাথে অতসীর প্রতি নিবিড়ের অনুভূতি কতটা তীব্র তাও দেখেছে। তার ওপর ফারজাদের কারণে প্রতিশোধ নিতে প্রাচীর সম্মানহানী করতে চেয়েছে সে। সেখানে বিবাহিত জীবনে ফারজাদের সেই বোনকে কতটুকু সুখ দেবে? ওখানেও শোধ-প্রতিশোধের বিষয় আনবেনা তার কি গ্যারান্টি? এই নিয়ে সকলের বিয়ে মানাতে আপত্তি। এছাড়া ফারজাদও তার বোনকে নিয়ে ঘর করার স্বপ্ন দেখতে মানা করেছে নিবিড়কে। প্রাচীকে তার কাছে দেবেনা সে।
পরিবারের লোকজনের নাহয় বিশ্বাস জিতে নিজের প্রতি আস্থা তৈরি করে নেবে। তারপর পারিবারিকভাবে সবটা ঠিক করে নেবে। এটা সে মেনে নিয়েছে।
কিন্তু ফারজাদ? এই ছেলে কি করে জেদ দেখায় এখানেও? নিবিড় নিজের বউয়ের সাথে সংসার করবে কি করবেনা সেই অনুমতি এখন ফারজাদের কাছে নিতে হবে? তার নিজের বউকে ফারজাদের কাছে চেয়ে নিতে হবে? অতসীর প্রতি এখন সবচেয়ে বেশি অধিকার ফারজাদের হলে প্রাচীর প্রতিও তো তার। সেখানে তার বিষয়েও জেদ দেখায় কি করে? সেদিন তার ওসব কথা শোনার পর থেকেই নিবিড়ের মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। প্রাচীর সাথে কথা বলে নিজেদের মধ্যে সবটা মিটমাট করে রাখবে ভেবেছিল, যেন ভাইয়ের কথায় এসে বিয়ে না মানা মানি কাহিনিতে চলে না যায় মেয়েটা। কিন্তু যা চায় নি তাই হলো! আর এসব ভেবে মেজাজ তুঙ্গে আছে তার।
“প্রাচী। আমাদের বিয়ের ব্যাপারে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ জানেনা— এটা ভুল ধারণা তোমার। আমার পরিবার, তোমার পরিবার— প্রত্যেকেই জানে আমাদের বিয়ের ব্যাপারে। তাই আড়ালে মিটমাট করে নেওয়ার এসব ফালতু চিন্তা বাদ দাও। পারিবারিকভাবে সবার সম্মতি নিয়ে তোমায় ঘরে তুলতে চাই বলে এখনো ওবাড়ি আছ। নয়তো তখনই নিজের সাথে নিয়ে যেতাম। কিন্তু তা করিনি বলে তুমি এই সম্পর্ক থেকে মুক্ত— এমনটা ভাবার ভুল করবেনা।”
প্রাচীর চেহারা তমসায় ছেয়ে গেছে। বাড়ির সবাই তাদের বিয়ের ব্যাপারে অবগত— একথা সে জানতো না। এখন তো তাহলে সবটা কঠিন হয়ে গেল। তাছাড়া সে নিবিড় যেমনটা বলছে তা চায়না। চেহারাতেই তা স্পষ্ট।
নিবিড়ের তা বুঝে আরও রাগ হলো। বিয়ে করা বউ তার। তাকে বর মানবেনা কেন? অতসীকে ভুলতে কি না করছে সে! প্রাচীর সাথে বিয়ে হওয়ার মুহূর্ত থেকেই ধ্যান জ্ঞান সব এই মেয়েতে দিয়ে নিজেকে আগের মানসিক বিধ্বস্তটা থেকে মুক্ত করবে ভেবে রেখেছিল; করছেও তা। প্রাচীকে পূর্ণরুপে বউয়ের স্থান দিয়ে ফেলেছে সে। এই মেয়েটাকেই ভাবছে উঠতে বসতে। সবরকম অযাচিত চিন্তা মাথায় আসার আগে বারবার প্রাচীর চেহারাটা মনে করে নিজেকে বাঁধে সে। মেয়েটাকে নিয়ে সংসার পাতার চিন্তা করে ফেলেছে, ঘর বাঁধার চিন্তা করে ফেলেছে। পুরুষ মানুষের কোনো মেয়েকে নিয়ে এসব চিন্তা করার আগে তাকে কাছ থেকে, ভীষণ ঘনিষ্ঠভাবে কল্পনা করাটা আপনা আপনি হয়ে যায়। সেখানে প্রাচী তো ইতোমধ্যেই বিবাহিত বউ তার। কোনো বাঁধ মানেনি তাকে নিয়ে ভাবতে। আর এখন এই মেয়ে ভাইয়ের সুরে তাল মেলাচ্ছে। রাগ হলেও যথাসম্ভব সামলে সে জানতে চাইল,
“তোমার মনে হয় যে আমাদের বিয়েটা জবরদস্তি বিয়ে— এটাই তো সমস্যা? লিসেন প্রাচী— আমি সজ্ঞানে পূর্ণসম্মতিতে তোমায় কবুল করেছি। এখানে কোনো জোর জবরদস্তি নেই। বুঝেছ? কোনো জোরজবরদস্তি নেই।” থেমে বলে, “এখন এটা তো ক্লিয়ার হলো। এছাড়া আর কোনো কারণ বিয়ে না মানার?”
প্রাচী ইতস্তত করলো। নিবিড়ের ধৈর্যচ্যুত হচ্ছে। সে খানিকটা এগিয়ে এসে প্রাচীর হাত ধরল। যথাসম্ভব নরম গলায় শুধায়,
“চুপ থেকো না প্রাচী। তোমায় মানিয়ে তোমার পরিবারকেও মানাতে হবে। আমি একা কতদিক সামলাবো? ভেবেছিলাম তুমি অন্তত বুঝবে। কিন্তু…”
প্রাচী আর চুপ থাকতে পারছেনা। সে বলে,
“স্যার, আপনি অতসীকে ভালোবাসেন।”
মনে হলো যেন সে মনে করিয়ে দিয়েছে।
নিবিড় থেমে যায় ওখানটাই। প্রাচীর চোখে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার চোখ দুটোতে স্পষ্ট এটাই মুখ্য কারণ তার বিয়ে মানতে নারাজগির। নিবিড়ের কথাটা শুনে একটু থমকানো লাগছিল, তবে প্রাচীর চোখে রাখা চোখ দুটো বন্ধ করে দম নিলো সে। পরপর চোখ খুলে বলে,
“ওসব অতীত এখন। তুমি অন্তত ওসব টেনে আমায় আরও ঠেলে দিওনা ওদিকে। আমি আর ওটা নিয়ে ভাবতে চাইনা। তোমায় নিয়ে নতুনভাবে সবকিছু শুরু করতে চাই আমি। তাহলে এমন কেন করছ? অতসীর বিষয়টা কেন টানছ?” কিছুটা কাতর শোনায় তার কণ্ঠ।
“অতসীকে আমি টানছিনা। অতসী আপনার মনে শুরু থেকেই আছে। আমিই বরং অবাঞ্চিত। আর বিয়ের মতো একটা সম্পর্কে আমি অবাঞ্চিত অতিথি হয়ে থাকতে চাইনা। আমার বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন, বর নিয়ে অনেক স্বপ্ন। আমি তা ভাঙতে চাইনা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জেরে। আমার স্বপ্ন এখনো আমার কাছে দামি। দয়া করে আমায় ছেড়ে দিন। আপনাদের অনুভূতি অনুভূতি খেলায় আমার জায়গা নেই। সেখানে জেনেশুনে পড়ে থেকে আমি নিজের জীবনটা নষ্ট করতে চাইনা।”
প্রাচীর অনুরোধ স্বরে বলা কথাগুলো শেষ হতে না হতেই তার কাছে এসে কিছুটা ঘনিষ্ঠ হলো নিবিড়। দেহ দুটো ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রাচী একটু পিছিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু নিবিড় আঁটকে নেয়। নিজের সাথে আঁটকে গভীর চোখে তার দিকে চেয়ে বলে,
“অতীতকে বর্তমান আর ভবিষ্যতে স্থান দিতে চাইনা আমি। অতীতটা কাটিয়ে উঠতে চাই। তোমাকেই ভাবছি এখন। একটু সময় দাও শুধু। তোমায় এত এত ভালোবাসা দেব নিজেই অতিষ্ঠ হয়ে যাবে। বর, আর বিয়ে নিয়ে যা যা স্বপ্ন তোমার, সব পূরণ করবো। আমায় ছাড়া আর কিছু মাথায় আসবেনা তোমার। এতটা ভালোবাসবো ট্রাস্ট মি!”
প্রাচীর অযাচিত ঘনিষ্ঠতায় মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছেনা। নিবিড় স্যারের সাথে এমন পরিস্থিতি তার কল্পনার অতীত ছিল। আর যা যা বললো, তা শুনে রীতিমতো অচেনা লাগছে তাকে। দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল সে। পুরুষালি দেহটা এত কাছে! মাথা নাড়িয়ে অস্বস্তিভরে কোনো রকমভাবে অসম্মতি জানাল সে। নিবিড়ের চোয়াল শক্ত হয়। গালে হাত দিয়ে নিজের দিকে ফেরায়,
“এই মেয়ে, আমার সাথেই সংসার করবে তুমি। এসব জেদ আমার ঘরে উঠার পর দেখাবে। তোমায় আমি ছাড়ছিনা। যাকে চেয়েছি তাকে পাইনি। যাকে পেয়েছি সেও থাকতে চাইবেনা। এত সহজ? আমি প্রতিবার ছেড়ে দেব এভাবেই? তোমার পরিবারকে মানিয়ে সামনের সপ্তাহেই উঠিয়ে নেব তোমায়। প্রস্তুত থাকবে বুঝেছ?”