প্রেমভুবনের অতসী

পর্ব - ২০

🟢

কাজ থাকার দরুণ প্রিসিলার স্বামী চলে গেলেও সে থেকে যায়। দুদিন থাকল বাপের বাড়ি। ফারজাদ নেই যদিও, তবে বাকি ভাই বোনেদের সাথে হাসি ঠাঠ্ঠা মিলিয়ে ভালোই কাটল দুটোদিন। তিনদিনের দিন ফিরে যাওয়ার সময়েই ঘটল বিপত্তি। বিকেলের আগেই তার স্বামী চলে আসে নিতে। কোনো বিজনেস মিটিং -এ যেতে হবে তাই তাড়াতাড়ি বউকে নিয়ে ফিরতে চায়। বোন প্রাচী বাড়ি না থাকায় প্রিসিলা তার আসা পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করতে চেয়েছিল।

প্রাচী কলেজে। বান্ধবীদের সাথে ফুচকা, আইসক্রিম বা অন্যকিছু খেতে খেতে মাঝেমাঝে ফিরতে দেরি করে সে। তাই প্রিসিলা বোনকে আজ তাড়াতাড়ি ফিরতে বলার উদ্দেশ্যে ফোন করে। কিন্তু প্রাচীর ফোন বন্ধ এলো।

যেহেতু স্বাভাবিকভাবেই এমন একটু আধটু দেরি করে সে, তাই প্রথমে তেমন দুশ্চিন্তা করল না কেউ ফোনে চার্জ নেই ভেবে। প্রিসিলা উপায় না পেয়ে স্বামীর সঙ্গে ফিরে গেল।

সময় গড়ায়, কিন্তু প্রাচী আর বাড়ি ফিরল না। বান্ধবীদের ফোন থেকেও যখন সে কোনো খবর দিচ্ছেনা দেখল, তখন থেকেই তার মা কাজ করতে করতে আপনমনে বাকাবকি শুরু করেছে মেয়ের উদাসীনতায়। বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে, তাও ফিরছেনা দেখে একটু নড়েচড়ে উঠল সবাই।

বাড়িতে কোনো পুরুষ নেই। ফারজাদের বাবা, চাচারা নিজেদের কাজে। আরমান প্রিসিলারা বেরিয়ে যাওয়ার পর পরই কোথাও বেরিয়েছে নিজেও। ফারজাদ তো বাড়ি থাকছেনা অতসীদের আসার সময় থেকে।

বাড়িতে উপস্থিত প্রত্যেকে চিন্তিত। বসার ঘরে সোফায় তাদের অবস্থান। চিন্তায় কারো মাথায় যেন কিছু আসছেনা। অতসীর মা বলল,

“ভাবি, প্রাচীর বান্ধবীদের কারো কি ফোন নাম্বার নেই? ওদের কাউকে কল দিয়ে দেখলে কিছু জানা যেত। যদি কোনো সমস্যায় পড়ে থাকে। ফোনেও চার্জ নেই হয়তো মেয়েটার।”

আরোহী সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলে,

“আমি কয়েকজনকে ফোন করে দেখেছি চাচীমণি। সবাই তো বলছে আজ প্রাচী ওদের সাথে বেরোইনি ক্লাস থেকে। উল্টো ওদের বলেছে বাড়িতে আপু আছে তাই তাড়াতাড়ি ফিরতে চায়— এজন্য ওদের সাথে আসেওনি।”

“কি বলছিস? আগে বেরিয়ে গেলে বাড়ি ফিরল না কেন এখনো? মেয়েটা কোনো বড়সড় বিপদে পড়ল না তো?” ফারজাদের মা চিন্তায় স্থির থাকতে পারছেনা। দুই জা সামলাচ্ছে তাকে।

আরোহী ফোন কানে লাগাতে লাগাতে বলে,

“আরও দুয়েকজনের নাম্বার আছে বড়-মা। আমি একটু ফোন দিয়ে দেখি ওরা কি বলে।”

সকলে সেই বাকি বান্ধবীদের থেকে কোনো খোঁজ পাওয়ার আশায় বসেছিল। অথচ সেখান থেকেও কোনো খবর পেল না প্রাচীর। আরমানকে ফোন দিয়েছে। সে একটু দূরে চলে গিয়েছিল। তবে প্রাচীর খবর শুনে ফিরছে সে। ফারজাদকেও ফোন দিয়ে জানাল। জানায়নি শুধু বাড়ি কর্তাদের। স্বামীকে জানাতে ভয় পাচ্ছে ফারজাদের মা। বাকি ভাইদের কানে গেলে ফিরোজ সাহেবের কানে যেতেও সময় লাগবেনা, তাই ফারজাদের দাদীর বারবার বলার পরও জানাতে চাইছেনা।

ফারজাদ বোনের এত সময় পরও বাড়ি না ফেরার খবর শুনে সবার আগে তার কলেজের ওখানে ছুটে গেছে। সিকিউরিটি গার্ড, আশেপাশের মানুষজনেদের জিজ্ঞাসাবাদ, দোকানগুলোর সিসিটিভি ফুঁটেজ— কিছু বাদ রাখেনি চেক করতে। সিসিটিভি ফুঁটেজে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সুস্থভাবেই হেঁটে কলেজের সামনের রাস্তার দিকে যেতে দেখা গেছে। বাড়ি ফেরার রাস্তা ওটা। বাড়ি ফিরতেই নিচ্ছিল তা বুঝল ফারজাদ। কিন্তু এরপর ওদিকটায় গিয়ে কয়েকটা দোকানের সিসিটিভি ফুঁটেজ চেক করেও আর প্রাচীর দেখা পেল না। বাড়ি ফেরার রাস্তাতেই গিয়েছিল, তাহলে এই ফুঁটেজে দেখা যাচ্ছেনা কেন? গেল কোথায় মেয়েটা?

“কারো সাথে প্রেম ট্রেমের চক্কর ছিল নাকি? কিছু জানিস?”

বন্ধুর প্রশ্নে চিন্তিত ফারজাদ মাথা তুলে তাকায়। কপালে ঘাম তার। দুশ্চিন্তায় চোখ, মুখ কেমন হয়ে এসেছে! চুলগুলো সামনে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে।

সে হেলমেট মাথায় দিয়ে বাইকে উঠতে উঠতে চিন্তিত গলায় জবাব দিল,

“উহু, প্রেমের সম্পর্ক নেই।”

“তুই শ্যর?”

“হান্ড্রেড পারসেন্ট। প্রেমের সম্পর্ক নেই ওর। প্রিসি, প্রাচী— ওদের সবকিছু নখদর্পণে আমার।”

সাকিব ফারজাদের পেছনে উঠে, প্রাচীর খোঁজ পেতে দরকারি নানান তথ্য জানার চেষ্টা করছে সে। আরও দুজন বন্ধু আছে সাথে। তারাও বাইকে উঠতে লাগল।

ফারজাদ বলে,

“তোরা বাঁ দিকের রাস্তায় যা। গলিগুলো ভালোভাবে দেখিস। আমি এদিকটায় যাচ্ছি।”

সন্ধ্যার সময় তখন। ধুলো উড়িয়ে ভ্রাঁাঁম শব্দ তুলে বাইক টান দেয় তারা। একেকজন একেক রাস্তায় গিয়ে খুঁজতে লাগল প্রাচীকে।

__

নিবিড়দের বাড়িটা ফারিশ মহলের মতো বড়সড় না হলেও মুটামুটি চোখে লাগার মতো। পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচ তাদের। সে, তার বাবা-মা, আর দুইবোনের পরিবার। আধুনিক ধাঁচের একটি নিজেদের জন্য মানানসই বাড়ি।

নিবিড় তাদের বাড়ির ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে আছে। ফোনে কারো সাথে কথা বলছে কফিতে চুমুক দিতে দিতে। নিবিড়ের বোন নম্রতা ; সে সিঁড়ি বেয়ে থমথম করে নামতে নামতে মায়ের উদ্দেশ্যে হাক ছাড়ে,

“মাআআ? মা? ভাইয়া কোথায়?”

তার মায়ের জবাব দিতে হলো না। নিবিড় পেছন ফিরে কপালে ভাঁজ ফেলে বোনের দিকে তাকায়,

“এখানেই আছি। কি সমস্যা চিৎকার করছিস কেন?”

নম্রতা ভাইয়ের সামনে এসে নিজের ফোনটা ধরল।

“এই ছেলে দুটো। রোজ রোজ বিরক্ত করে। আজ সীমা পার করে গেছে ভাইয়া। আমার রাগে কিছু করে ফেলতে ইচ্ছে করছে।” বলতে বলতে চোখ টলমল করে উঠল নম্রতার। সে পড়ে ইউনিভার্সিটিতে।

নিবিড়ের কপালের ভাঁজ মিলিয়ে যায়। চেহারাটা অকস্মাৎ কেমন যেন হয়ে উঠে বোনের টলমল চোখ দুটো দেখে। রাগ হয় ছবিটার দিকে তাকিয়ে, তবে ভেতরটা কেমন জানি হাশফাশ করে উঠে ভিন্ন কিছু মাথায় আসতেই।

“আমাদের ইউনিভার্সিটির না এরা। কোথাকার ছেলে আমি জানিনা। রোজ রোজ নানান অশালীন কথা বলে পিছু নিয়ে নিয়ে। আজ” গলা কেঁপে উঠল দুঃখে, “আজ আমার ওড়না ধরে টান দিয়েছে বখাটে দুটো। আমি থা প্প র দিতে চেয়েছি। কিন্তু আশেপাশে কেউ না থাকায় ভয়ে দিতে পারিনি। আমার রাগে নিজের চুল ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে ভাইয়া।”

নারীর অপারগতার দুঃখ, অন্য কোনো কষ্ট নেই। ব্যাস চেয়েও যোগ্য শাস্তি তো দূর, একটা থা প্প র অব্দি দিতে পারল না বলে ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে নম্রতার। বান্ধবীকে নিয়ে কোনোভাবে চলে এসেছে ওখান থেকে।

নিবিড়ের চোয়াল শক্ত হতে দেখা যায়। তবে তার মধ্যেও কিছুটা অন্যমনস্ক ভাব, আর দ্বিধাদন্ধ। সে আরেকবার বোনের টলমল চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে অকস্মাৎ দাড়িয়ে যায়। সামনে সোফার টেবিল থেকে নিজের ফোন, ওয়ালেট, আর গাড়ির চাবিটা নিয়ে তাড়াহুড়ো করে চলতে শুরু করে। দুকদম এগিয়ে আবার পেছনে আসে, বোনের অশ্রু মুছে দিয়ে বলে,

“কাল ভার্সিটি যাস না। ছেলে দুটোর ব্যবস্থা আমি করব। এখন কান্না বন্ধ কর, আর নিশ্চিন্তে থাক। এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা।”

আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না কথাগুলো বলে। বেরিয়ে যায় হতদন্ধের মতো।

___

সন্ধ্যার অন্ধকার চারদিকে। জায়গাটার নাম কি ঠিক জানা নেই। তবে কোনো এলাকার মোড়ের দোকানপাটের আশপাশ মনে হচ্ছে। মানুষজন জোট বেঁধে দাড়িয়ে আছে একটি গাড়িকে ঘিরে। কেউ কেউ ফোন তুলে ধরেছে, হয়তো ভিডিও করতে চাইছে। হাইস গাড়িটার ভেতরে একটি মেয়ে অর্ধ-অচেতন হয়ে পড়ে আছে, আর ছেলেটি মানুষজনের নানান সন্ধেহপ্রবণ প্রশ্নের অসংলগ্ন উত্তর দিচ্ছে। দেখতে ভদ্র বাড়ির ছেলে বলেই মনে হলো। বয়স হবে তেইশ-চব্বিশের ঘরে।

“তুমি ছেলে এই মেয়েটাকে নিয়ে কি করছ সঠিক সঠিক জবাব দাও। এমন আগামাথা ছাড়া কথা বললে কিন্তু আমরা প্রশাসনের হাতে তুলে দেব।”

“দেখুন, ও আমার গার্লফ্রেন্ড। আমরা বিয়ে করতে চাই। বাড়িতে মেনে নিচ্ছেনা। তাই পালিয়ে এসেছি। কাজী অফিস যেতে চাই। কিন্তু ও একটু অসুস্থ হয়ে পড়ায় গাড়ি এখানে থামিয়েছি। এর বেশি কিছু না।”

“একটু আগে যে বললে মেয়েটাকে চেনো না। লিফট চেয়েছে তোমার গাড়িতে। বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার আগে ঘুমিয়ে গেছে গাড়িতে। তাহলে এখন অন্য কথা বলছ কেন?” ভিড়ের মধ্যে একজন কথাটা বলতেই হইচই লেগে যায়।

“একে ধর। মেয়ে কিডন্যাপ করেছে হয়ত। দেখ দেখ কথার আগাগোঁড়া ঠিক নেই।”

“কিন্তু মেয়েটাকে দেখে নেশা করেছে মনে হচ্ছে। দুইজনের মধ্যেই ঘাবলা। শুধু ছেলেকে ধরলে হবেনা। আজকাল মেয়েরাও কম যায়না। দুটোকেই ধর।”

“আমার তো মনে হয় ছেলে মেয়ে দুটো নেশা করে অসৎ কাজ করতে যাচ্ছিল।”

“যাচ্ছিল কি কাকা? নাকি এমন কিছু ঘটিয়েই নেশা করেছে দেখো। দুটোকেই ধরে বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হোক। এসব ব্যাভিচার আমরা মানব না।”

নানানজনের নানান কথা। এসবের মধ্যে মেয়েটাকে একটু শান্তভাবে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করল না কেউ। না তো জানতে চাইল আদৌ সে স্বেচ্ছায় এখানে এসেছে, নাকি অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছে।

কাজী ডেকে আনিয়েছে তারা। ছেলেটার সাথে ঐ মেয়ের বিয়ে পড়ানোই তাদের উদ্দেশ্য এখন।

মেয়েটি; অর্থাৎ প্রাচী। সে চেয়েও মুখে একটা শব্দ করতে পারছেনা। এত দুর্বল লাগছে শরীরটা। অসাড় হয়ে আছে পুরোপুরি। ওপরওয়ালার নাম নিলো সে এই মসিবত থেকে উদ্ধার হতে।

ছেলেটি বোধ হয় বিয়ে পড়ানোর কথা শুনে সন্তুষ্ট। বিশেষ আপত্তি জানাল না। উপরন্তু যে উল্টাপাল্টা জবাব দিচ্ছিল, তাও ইচ্ছাকৃত মনে হলো বিয়ের কথা শুনা মাত্র তার চেহারার সেই দ্যুতি দেখে। কাজী ঐ অবস্থাতেই বিয়ে পড়ানো শুরু করতে যায়।

এর মধ্যে প্রচণ্ড বেগে ‘কিঁইইচ্’ শব্দ করে কোনো লাক্সারি কার এসে থামে তাদের বরাবর। কানে সেই তীক্ষ্ণ শব্দ আসতেই চোখ মুখ কুঁচকে সকলে পেছন ফিরে তাকায়। গাড়ির হেডলাইটে দেখা গেল— হতদন্ধের মতো নেমে আসছে কোনো পুরুষ।

নিবিড় তাড়াহুড়ো করে নেমে সেই ভিড়ের মধ্যে চলে আসে।

“সাইড দিন প্লিজ।”

“কে ভাই? আপনি কে?”

হতদন্ধ নিবিড় একটু থমকায়। তবে বেশি সময় না নিয়ে জবাব দেয়,

“আমি মেয়েটার গার্ডিয়ান। শি ওয়াজ কিডন্যাপড। আমায় ওর কাছে যেতে দিন প্লিজ।”

এ কথা শুনে সকলে সাইড দিল। অসাড় শরীর নিয়ে পড়ে থাকা অর্ধ অচেতন প্রাচী ভিড়ের মধ্যে নিবিড় স্যারকে দেখে স্বস্তি পায়। এতক্ষণ বহুকষ্টে খুলে রাখা চোখ দুটো আপনা আপনি বুজে যায় স্বস্তিতে।

__

ফারিশ মহলে কান্নার শব্দরা বারি খাচ্ছে শুধু। প্রাচীর মা কাঁঁদছে কিছুক্ষণ পরপর হু হু করে। দুই জা সামলাচ্ছে যদিও, তবে আদতে তাদের মনের অবস্থাও ঠিক নেই। বাড়ির তিন কর্তা পুরুষও জেনেছে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে। ফারজাদের মা মেয়ে ফিরবে আশায় স্বামীকে জানায়নি তখন, বকা শোনার ভয়ে। কিন্তু মেয়ে ফিরল না। স্বামীকে নিজেই আবার জানায় সবটা।

ফারজাদ এখনো লাগাতার খুঁজে যাচ্ছে বোনকে। আরমানও আছে এখন তার সাথে। ফিরোজ সাহেব লোক লাগিয়ে দিয়েছেন ইতোমধ্যে। কিন্তু মন কু ডাকছে। হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায়না। ভাইয়েদের সাথে পরামর্শ করে না চাইতেও পুলিশে খবর দেওয়ার সিদ্ধান্তে আসলেন। ফোন লাগিয়েছিল আরমানের বাবা। এর মধ্যে বাড়ির কলিং বেল বেজে উঠলে সকলে চমকিত, উদ্বিগ্ন চেহারায় আশার আলো নিয়ে নড়েচড়ে উঠে। আরমানের মা তাড়াতাড়ি যায় দরজা খুলতে।

দরজায় নিবিড়; কোলে অচেতন প্রাচী।

সকলে উঠে দাঁড়াল এই দৃশ্য দেখে। প্রাচীর দেখা পেয়ে এগিয়ে আসে হতদন্ধের মতো।

“প্রাচী? আমার মেয়ে। কি হলো ওর?”

“প্রাচী ঠিক আছিস? অজ্ঞান হয়ে আছে কেন ও?”

“তুমি ওকে কোথায় পেলে? ওর কি হয়েছে? অজ্ঞান কেন মেয়েটা?”

“তুই ওকে কোথায় পেলি নিবিড়?”

নানান প্রশ্ন সকলের।

“একটু ভেতরে যেতে দিন প্লিজ। ও অচেতন হয়ে আছে। জ্ঞান ফেরানো দরকার।” নিবিড়ের কথায় সকলে উদ্বিগ্ন, চিন্তিত চেহারায় সম্মতি জানায়, সরে দাঁড়ায়। তাকে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দেয়।

চিন্তিত এখনো সকলের চোখ মুখ। প্রাচীর সাথে কি হয়েছে, কোথায় ছিল— কিছু জানেনা। চিন্তা কাঁটছেনা কারো। তবে মেয়েটা ফিরেছে এতেই বুকের ওপর থেকে বড় একটা পাথর সরে গেল সবার। নিবিড়ের পেছন পেছন আসে।

“এখানে সোফায় রাখব? ওর রুমে নিয়ে যাওয়া বেটার হবে আই থিংক।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। চলো।”

রুম নিয়ে রাখা হলো প্রাচীকে। পারিবারিক চিকিৎসক ডেকে প্রাচীর চেক-আপ করানো হয়। তেমন কিছু হয়নি। ড্রাগ দিয়ে অচেতন করা হয়েছিল, যে কারণে শরীর অসাড় হয়ে আছে। মানসিক চাপ, আর ভয়-আতঙ্কে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।

প্রাচী ওপরে নিজের রুমে। তাকে একা বিশ্রাম নিতে দেওয়া হয়েছে। জ্ঞান ফিরবে আপনা আপনি। নিবিড়সহ বাড়ির সকলে নিচে সোফায় বসেছে।

“ওকে কোথায় পেলে, আর কিভাবে?”

“নিবিড়? কলেজ থেকে ফিরতে সময় কি ওকে কেউ কিডন্যাপ করেছিল? তুই তো ওদের কলেজেরই প্রফেসর। তুই দেখেছিলি কিছু?”

“আমাদের একবার জানাতে পারতে নিবিড়। চিন্তায় সকলের অবস্থা খারাপ হতে যাচ্ছিল।”

আরমানের মা হঠাৎ কিছু মনে পড়তে বলে,

“ওহ, আরোহী? ফারজাদ আর আরমানকে ফোন দিয়ে জানা— প্রাচী বাড়ি ফিরেছে। কোথায় কোথায় খুজঁছে ছেলেদুটো কি জানি! ফিরে আসতে বল।”

আরোহী সম্মতি জানিয়ে ফোন লাগায়। এর মধ্যে আবার কলিং বেল বেজে উঠলে আরোহীই গিয়ে খুলে দিল। দরজা খুলতে দেরি, কিন্তু ফারজাদের আগুনের বেগে ভেতরে আসতে দেরি নেই। আরোহী চমকে একটু সরে দাঁড়ায়, পরপর সামলে বলে,

“এসে গেছ তোমরা? প্রাচীকে পাওয়া গেছে। ওর কলেজের স্যার, মানে অতসীর ঐ খালাতো ভাই নিয়ে…” আর কিছু বলতে পারল না সে। গটগট পায়ে ভেতরে চলে গেছে ফারজাদ। সকলে চোখ তুলে দেখার সুযোগ পেল না। ফারজাদ গিয়ে সোফায় বসে থাকা নিবিড়ের কলার ধরে দাড় করিয়ে নেয়। মুখে বিচ্ছিরি একটা গা লি উচ্চারণ করে সজোরে ঘু ষি লাগাল গালে।

নিবিড় পাল্টা আক্রমণ না করলেও কি হচ্ছে বুঝে আত্মরক্ষা করল।

“আরেহ আরেহ। কি করছিস ফারজাদ? ছেলেটাকে মারছিস কেন?” মা

আরমানও তার পেছন পেছন এসেছিল। সে আঁটকাতে চায় ফারজাদকে। কিন্তু ফারজাদ থামছেনা।

“ফারজাদ? পাগল হয়েছিস নাকি? এসব কোন ধরণের উদ্ধত্যপনা।” বাবা

“জিজ্ঞেস করো এই শা লা কাওয়ার্ডটাকে। আমায় কাপুরুষ বলে। কু ত্তা তোর পুরুষত্বের প্রমাণ পেলাম আজ। মাদারচো*!”

শার্টের বোতাম ছিড়ে গেল নিবিড়ের। দুই গালেই ঘু ষি খেয়েছে। তবে আর আ ঘা ত পাওয়ার আগে ফারজাদকে তার বাবা ধা ক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল,

“যথেষ্ট করেছ। কি হয়েছে মুখে বলো। সবসময় তোমার এসব উগ্রপণা দেখার জন্য বসে নেই আমরা।”

অতসীর মা গিয়ে নিবিড়ের পাশে দাঁড়ায়। ঠোঁট ফেটে গেছে তার। বিস্মিত অতসীর মা।

“ফারজাদ? নিবিড়কে মারলে কেন হঠাৎ এভাবে? এসব কোন ধরণের অসভ্যতা? যখন যা মন চায় তাই করে বেড়াও। বাকিরা কি মানুষ না?”

“দুনিয়ার যতো ভুল সবকিছুর দোষ শালা এই ফারজাদের। বাকি সবাই দুধে ধোঁয়া তুলশি পাতা।” আগ্রাসী গলায় নিজে নিজে বলে সে।

“সোজাসুজি বলবে যা বলার। আর কাকে এসে আ ঘা ত করছ তুমি হ্যাঁ? তোমার বোনকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে এই ছেলেটা। তোমার ধন্যবাদ দেওয়া উচিত তাকে। আর তুমি অকারণে তাকে এভাবে আ ঘা ত করছ!”

তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল সে। আরমানেরও চোয়াল শক্ত। তবে ফারজাদকে ধরে রেখেছে।

“এই কু ত্তার বাচ্চাকে ধন্যবাদ দেব। থু!!” আদতেই ছ্যাপ ফেলল সে।

ফারজাদের বাবা এসে হাত তুলে থা প্প র দিতে। কিন্তু আরমান মাঝে এসে ভদ্রভাবে আঁটকে নিলো বড়বাবাকে।

“বড়বাবা। প্রাচীকে এই নিবিড়ই কিডন্যাপ করিয়েছে। আমরা খবর নিয়ে জেনেছি।”

ছেলের ওপর নিক্ষেপ করা কঠোর দৃষ্টি ঘুরে এসে আরমানের পড়ল। কপালে ভাঁজ এবার।

“কি বললে?”

আরমান শান্ত গলায় ফের আওড়ায় কথাটা,

“প্রাচীকে নিবিড় ছেলেটাই কিডন্যাপ করিয়েছে।”

“মাথা খারাপ? কিছুক্ষণ আগে ও ই ফিরিয়ে আনল প্রাচীকে।”

“তুমি যা জানার ঐ ছেলের কাছেই জেনে নাও বিশ্বাস না হলে।”

“ঠিক বলছে ওরা। আমিই প্রাচীকে অপহরণ করিয়েছিলাম।”

বিস্ময়ে নিবিড়ের দিকে ফিরল সকলে।

“এসব কি বলছিস তুই?” অতসীর মায়ের কথায় নিবিড় দম নিয়ে বলে,

“ঠিক শুনেছ। প্রাচীকে যে ছেলেটা কিডন্যাপ করেছিল তাকে আমিই গোপন পরিচয়ে হায়ার করেছিলাম এসবের জন্য। যদিও ছেলেটা প্রফেশনাল কিডন্যাপার নয়। ভালো পরিবারেরই ছেলে। প্রাচীকে পছন্দ করে। বারবার রিজেকশন পেয়ে ওর ওপর কিছুটা রাগ ছিল। ওটাই কাজে লাগিয়ে আমি ওকে অজ্ঞাত পরিচয়ে এসব করতে বলি। লোকজন থাকবে এমন জায়গায় নিয়ে সন্ধেহজনক কথাবার্তা বলে ওকে বিয়ে করে নিতে বলেছিলাম। সেও প্রাচীকে পেতে আর কিছুটা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে এসব করতে রাজী হয়ে যায়।”

ছেলেটার নিজ কর্মকাণ্ডের নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তি সকলে শুনে গেল ব্যাস। বিশ্বাস হচ্ছেনা কারো। চমক যেন সকলের মধ্যেই। একটু আগেই তো তাদের মেয়েকে বাঁচিয়ে আনলো। আবার বলছে নিজেই এসব করিয়েছে। কিন্তু কেন? প্রাচীর সাথে নিবিড়ের কি সমস্যা থাকতে পারে? মেয়েটার শিক্ষক হয়, ছাত্রীর সাথে কি এমন সমস্যা যে এমন জগন্য কাজ করলো?

“কেন করলে এমনটা?”

শিকারি দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা ফারজাদ হেসে উঠল তাচ্ছিল্য নিয়ে,

“তার বোন,” আবার আওড়ায় বোন কথাটা, “তার বোন অতসীর সাথে আমি যা করেছি সেসবের বদলা নিয়েছে এই সুপুরুষ। বোনের প্রতিশোধ নিয়েছে। আমার বোনকে বদনাম করে, ঐ ছেলেটার সাথে বিয়ে পড়িয়ে দিয়ে আমার কাছে বদলা নিতে চেয়েছে। হচ্ছিলও তাই। পরে আবার মিস্টার নিবিড়ের মনে পড়ল যে, সে সুপুরুষ। তাই গিয়ে নিজেই বাঁচিয়ে আনে। অ্যাম আই রাইট? মিস্টার সুপুরুষ!”

নিবিড় দম নিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। সেদিনের ঐ মা রা মারির পর অতসীর সাথে ফারজাদের বিয়ের প্রমাণ দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। রাগ, ক্রোধ আর জেদে কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। এই এত এত কিছুর পর আবার অতসীকে নিজের নামে দলিলও করে নিলো ফারজাদ— মানতে পারেনি সে। সবকিছু এই ছেলের অনুকূলে যায় কি করে! অন্যায় করার পরও এই ছেলে জিতে যাচ্ছে কি করে! অতসীর সন্তানের বাবা, আবার তার স্বামীও এখন। অথচ এতবছরের ভালোবাসার পরও তার হলো না মেয়েটা। তার নাকি অধিকারই নেই অতসীর ওপর! সব এই ছেলের। অতসীর সবটা জুড়ে যেন এই ছেলেরই অস্তিত্ব।

ঈর্ষায় ক্রোধের বশবর্তী হয়ে যা মাথায় এসেছে তাই করেছে। কিভাবে তার উপায়েই তাকে শাস্তি দেবে ভাবতে ভাবতে বোন প্রাচীকেই বদনাম করে বিয়ে দেওয়ার কথা মাথায় আনে। নিজের তৃপ্তির স্বার্থে কিছুটা ম্যানিপুলেট করে ঐ ছেলেকে লোকজনের সামনে তামাশা করতে রাজী করায়। নয়তো ছেলেটা ভালো পরিবারের —এই খোঁজ নিয়েই তাকে বাছাই করে ঘটনাটি ঘটানোর জন্য।

তবে নম্রতার সেই অভিযোগ, বোনের টলমল চোখ দুটো— এসব দেখে সে নিজের আসল ব্যক্তিত্বে না ফিরে পারেনি। সে তো এমন না। অন্য কারো অপরাধে একটা মেয়ের এমন ক্ষতি কিভাবে করে সে? এতটা প্রতিশোধপরায়ণ কবে হয়ে উঠল সে, যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে একটা মেয়ের বদনাম করে দিতেও দুবার ভাবেনি।

এত এত ভাবনার মাঝে ফের বোনের চেহারাটা দেখে। প্রাচীর জায়গায় নিজের বোনকে চিন্তা করেই সব চিন্তা বদলে গেল নিমিষে। নম্রতার সেই অভিযোগ শুনে ঐ ছেলেটাকে জ্যান্ত কবর দিতে ইচ্ছে করছিল। অথচ নিজেও কোনো মেয়ের সম্মানহানী করতে সুপারিশ দিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে নিবিড় যা করছে তা ভুল— এই উপলব্দির পর আর এক মুহূর্ত দেরি করার ইচ্ছে জাগেনি। তৎক্ষণাৎ গিয়ে প্রাচীকে উদ্ধার করে আনে।

নিবিড় এসব বিস্তারিত কাউকে জানায়নি। তবে যা বুঝার বুঝে নিল সকলে। ফারজাদ অতসীর সাথে যা করেছে সেসবের বদলা নিতে, ফারজাদকে এমন কিছু নিজের ওপর আসলে কেমন লাগে বুঝাতে কিনা এমন একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল ছেলেটা! সবার অবস্থা এতটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল কয়েক ঘণ্টায়, মনে হচ্ছিল এখানেই মেয়েটার সব শেষ।

কোন না কোন নরপশুর খবলে পড়েছে ভেবে কি দুশ্চিন্তায় ছিল তারা। অথচ নিবিড়ই কিনা!

ফারজাদের বাবার ভীষণ ক্লান্ত লাগল এই পর্যায়ে। নিজের মেয়ের সম্মানহানী করতে চাওয়া ছেলেটার উদ্দেশ্যে যে কিছু কথা বলবে— সে শক্তিটুকু নেই যেন।

বিস্ময়, আর দুর্বোধ্য সব অনুভূতিতে নীরব সকলে। এসবের বিপরীতে কি বলা উচিত —তাই খুঁজে পাচ্ছেনা কেউ।

ফারজাদ একা পেলে যেন নিবিড়কে ছি ড়ে ফেলবে— এমন শিকারি দৃষ্টি তার। ফিরোজ সাহেব সোফায় বসে পড়েছেন। নরম, ক্লান্তিভরা চোখ দুটো তুলে ছেলের উদ্দেশ্যে বলেন,

“রুমে যাও ফারজাদ।”

ফারজাদ জেদী নয়নে বাবার দিকে তাকায়। কিন্তু বাবার সেই অনড়, ক্লান্ত চোখদুটো দেখে দমে যায়, আর কিছু বলল না।

হনহন করে ওপরে চলে গেল শুধু।

__

“ফারজাদ ভাইয়া!”

কোনোদিক না তাকিয়ে হাঁটছিল ফারজাদ। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছে। নিজের রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরতেই সুন্দর একটি মেয়েলী গলায় নিজের নাম শুনল। চোখ তুলে তাকায় সে। শক্ত চোয়াল, আর কপালের ভাঁজগুলো আড়ষ্ট হয়ে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখতে দেখতে আপনা আপনি মিলিয়ে যায়। কণ্ঠটা ভীষণ সুন্দর এই মেয়ের। গান শেখে, গাঁয়। হবেনা? তবে ফারজাদ কখনো তার গলায় গান শুনেনি। উপলব্দি করলো ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস করে গেছে জীবনে।

“ফারজাদ ভাইয়া আছেন?”

আবার ডাকলে ধ্যান ভাঙে তার। এতক্ষণের কঠিন, ক্রোধান্বিত চোখদুটো নরম আবেশে চেয়ে গেছে মুহূর্তেই। সে জবাব দিল শান্ত গলায়,

“কিছু বলবে অতসী?”

অতসী জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিচে কি হয়েছে না হয়েছে সব শুনেছে সে। নিবিড় ভাইয়া এমন কিছু করবে কখনো কল্পনাও করেনি অতসী। তার জন্য কতকিছু হয়ে গেল আজ! প্রাচী আপুর সাথে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল তার কারণে। তার জীবনটা অচেনা, অজানা সেই বখাটে ছেলেটার সাথে জুড়ে যেতে পার‍ত আরেকটু হলেই। বদনামও হয়ে যেত প্রাচী আপুর। ফারজাদও নিচে বিনা দোষে নানান কথা শুনল। তার ওপর বুকে ছু রি খেয়েছে তার হাতে। অসুস্থ শরীরে কত ধকল গেল আজ। এর আগে সে নিজেও কতো ধা ক্কা দিয়েছে ওখানটাই!

সে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ফারজাদের প্রশ্নের বিপরীতে বলে,

“স…সরি”

“সরি কেন?” কপালে নরম ভাঁজ তার।

অতসী বলে,

“আমার কারণে অনেক কিছু হয়ে গেল আজ। নিবিড় ভাইয়া এমন কিছু করবে আমি জানতাম না। ভাবতেও পারিনি প্রাচী আপুর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে নিবিড় ভাইয়ার হাত থাকবে। আম…আমি নিবিড় ভাইয়ার হয়ে ক্ষমা চাইছি। ভাইয়া কখনো এমন ছিল না। কেন এমন করল বুঝতে পারছিনা। প্রাচী আপুর সাথে বিনা দোষে এসব করা উচিত হয়নি একেবারেই।”

“তুমি ক্ষমা চাইছ কেন? তুমি করেছ এসব?”

“ন…না মানে।”

“নিবিড়ের হয়ে তোমাকে ক্ষমা চাইতে আমি বলেছি?”

অতসী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

“নিবিড় যা করেছে তার দ্বায় ওর নিজের। তুমি ওর কেউ না যে তোমায় তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। বুঝেছ?” কিছুটা কঠোর শুনাচ্ছে ফারজাদের গলা। যেন নিবিড়ের হয়ে অতসীর ক্ষমা চাওয়াটা তার পছন্দ হয়নি একেবারেই।

অতসীর কপালে ভাঁজ পড়ে। তবে জবাব দিল না সে।

ক্ষমা চাওয়া দরকার মনে হয়েছে, চেয়ে নিয়েছে। যদিও শুধু নিবিড়ের জন্য না, নিজের করা কিছু কাজের জন্যও ছিল। তবে অতকিছু বুঝানোর ইচ্ছে হলো না তার। যা বলেছে তাই যথেষ্ট, বেশিকিছু বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই— এই ভাবনায় সে ওখান থেকে সরে হাঁটতে শুরু করে।

ফারজাদ দেখল কোথায় যেতে চাইছে মেয়েটা। কিন্তু দেয়ালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সে কপালে ভাঁজ ফেলে শুধায়,

“কোথায় যাচ্ছ?”

“প্রাচী আপুর রুমে।”

“ওদিকে না। আমার সাথে এসো।”

বলে অতসীর ডান হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলটা ছুঁলো সে। হালকা স্পর্শের মাধ্যমে সন্তর্পণে ধরল তাকে। অতসী চমকে উঠে, কাঁপলও কিছুটা। ফারজাদ তা বুঝে ওর হাবভাব কোণা চোখে দেখে।

অতসী নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেয়েও কি ভেবে তা করল না। দ্বিধা-সংকোচ থাকলেও শান্ত একটা ঢোক গিলে পা বাড়ায়। ফারজাদের সাথে এই পথটুকু চলা মেনে নেয়। তা দেখে ফারজাদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটে আপনা আপনি।

___

অতসী প্রাচীর রুমে ছিল বেশ কিছুক্ষণ। প্রাচীর জ্ঞান ফিরেনি তখনও। সে অনেক অপেক্ষা করেও জ্ঞান ফিরছেনা দেখে চলে আসতে নেয়। ফারজাদের সাথে যেদিক থেকে এসে বসেছিল, সেই বরাবর পেছন ঘুরে উঠে দাঁড়ায় সন্তর্পণে। তারপর ধীরে ধীরে কদম গুণে বেরিয়ে যায়।

হেঁটে পাশের রুম অব্দি আসতেই সেই রুমের ভেতর ফারজাদ, আর নিবিড়ের গলা শুনল। অতসীর কপালে ভাঁজ পড়ে। এরা দুজন আবার একসাথে কেন? বড়বাবা তো ফারজাদ ভাইয়াকে একা পাঠিয়েছিল ওপরে। নানান ভাবনা আসলেও ভেতর থেকে আবার আগ্রাসী গলার আওয়াজ শুনে সে ঐ রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেয়।

“শালা আমি তো হুশজ্ঞান খুইয়ে যা করার করেছিলাম। ওকে ভালোবাসি টের পেয়েছিলাম সেদিনই। ওমন পরিস্থিতিতে নেশার ঘোরে যার ওপর ফল করেছি তাকে পেলে কেমন ফিল হওয়ার কথা এজ আ ম্যান তুইও জানিস সেটা। তোর মতো সুস্থ মস্তিষ্কে এত ডার্টিভাবে কারো সম্মানহানী করার পরিকল্পনা আমি করিনি। আবার এসেছিস ক্ষমা চাইতে।”

ফারজাদের তাচ্ছিল্যে নিবিড় শান্ত গলায় বলে,

“আমি আবার বলছি। তোর কাছে এসেছি সুস্থভাবে ক্ষমা চাইতে। বাকিদের কাছেও চেয়ে নিয়েছি। তোর কাছেও আগের সব ইস্যু’স মিটিয়ে ক্ষমা চাইব বলে ওপরে এসেছি। এখন ক্ষমা করবি কিনা তোর ব্যাপার। আমার এটুকুই বলার ছিল।”

“আমার শেষ হয়নি। মাত্রই বললি তোর সবরকম ইস্যু আমার সাথে। তাহলে ওয়ান অন ওয়ান হ্যান্ডেল না করে, এসবে মেয়ে মানুষকে টানলি কেন শা লা? বড় কোনো ক্ষতি হয়ে গেলে তখন কি করতি? আমি যেভাবে উঠতে বসতে সব অপমান মেনে নিয়েছি ওভাবে তুই বা ঐ ছেলে মেনে নিতো? নিজেদের কাজের অনুশোচনা হতো তোদের? ঐ ছেলে দাঁত কেলিয়ে যা করেছি বেশ করেছি বলত না তার কি গ্যারান্টি হ্যাঁ? খারাপ কিছু হয়ে গেলে এরপর প্রাচীর জীবনটা কেমন হতো? ওর কি দোষ সব কিছুতে? আমি যা করেছি সেসবের জন্য থানা পুলিশ যেতেও রাজী ছিলাম। ম রতেও রাজী ছিলাম। তাহলে আমার নিরপরাধ বোনকে টানলি কেন?

আমার সাথে সমস্যা যখন আমাকে যা করার করতি! আমার বোনকে টানলি কেন শালা? বল আমার বোনের কি দোষ? মেয়ে মানুষকে টানিস নিজের দুশমনিতে, আবার সুপুরুষ হওয়ার ভান করিস। ছ্যাহহহ!”

বলে কলারে থাকা হাতে ধা ক্কা দিয়ে নিবিড়কে দূরে সরিয়ে দিল সে। নিবিড় কিছুটা পিছিয়ে যায়। সে ফারজাদের সব কথা মন দিয়ে শুনেছে। ধা ক্কা খেয়ে গা ঝাড়তে ঝাড়তে অকস্মাৎ বলে,

“বোন জামাই লাগি তোর। এসব ব্যবহার এখন থেকে আর করবিনা। শ্বশুর বাড়ি এসে এসব পেতে হলে বউ নিয়ে আর এমুখো হবো না। তখন বোনের জন্য আরও বেশি বেশি কাঁদিস।”

সেও কম কটু কথা শুনেনি এই অব্দি। তার খালা-খালু; অর্থাৎ অতসীর বাবা মা তাকে ওপরে এনে রুমে ডেকে ধরেছিল। এতদিন ফারজাদের উদ্দেশ্যে বাকিদের যা যা মনোভাব ছিল, তাদের যা যা ভাষা প্রয়োগ করতে শুনত ফারজাদের উদ্দেশ্যে— আজ নিজেও সেসবের মুখোমুখি হয়েছে।

তার বাড়িতে এসব জানাজানি হওয়া বাকি এখনো। ওটাও পূর্ণ হলে এর চেয়ে বাজে পরিস্থিতির শিকার হতে হবে নিবিড় জানে।

অতসীর বাবা-মা তো লজ্জ্বায় মুখ দেখাতে পারছেনা কাউকে। নিবিড়ের কাছে এমন কিছু তারা আশা করেনি। এভাবে অপমানিত হতে হলো বাড়িভর্তি সকলের সামনে। এক মেয়ের সব তো শেষ হলো! বদলা নিতে কিনা তাদেরই বাড়ির আরেক মেয়ের বদনাম করতে যাচ্ছিল এই ছেলে। অপারগতায়, লজ্জ্বায় মাথা কাঁটা যাচ্ছিল তাদের। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়েকে নিয়ে এই পরিবেশ থেকে বিদায় হতে চায় তারা এখন। এখানে থাকা মানে দিনের পর দিন ঐ এক ঘটনাতেই অতসীর জীবনটা আঁটকে থাকা।

পাসপোর্টগুলোও গতকালই চলে এসেছিল। আর দেরি করার মানে হয়না।

কিন্তু ফারজাদ।

সে নিবিড়ের বলা কথায় থেমে গেল। বোন জামাই লাগে মানে?

“বাংলা ম ’দ খেয়ে পাগলের প্রলাপ বকছিস?”

“ওসব খাওয়া আমার স্বভাবে নেই। তোর খাবার নিয়ে তুই ভালো থাক। আর কথায় কথায় আমাকে শা লা ডাকবিনা। শা লা হবি তুই। তাও আমার চেয়ে ভালোভাবে তুই আমার শা লা হবি।”

প্রেমভুবনের অতসী পর্ব ২০ গল্পের ছবি