ফারজাদ অতসীরা ভীনদেশে পাড়ি জমাবে শুনে আরেকবার জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। অতসী ফের একই জবাব দিলে কিছুপল সেখানে দাড়িয়ে, নাকের ডগায় রাগ নিয়ে থাকা মেয়েটিকে একদৃষ্টে দেখে। পরপর বেরিয়ে যায় রুম থেকে। বেরুতেই বোন প্রাচীর দেখা পায়।
সে অবশ্য তার ভাই যেন অতসীর সাথে নতুন করে কোনো ঝামেলা পাকাতে না পারে সেই পাহারা দিচ্ছিল আড়ালে। ভাই অকস্মাৎ বেরিয়ে আসবে বুঝতে পারেনি।
কিন্তু ফারজাদ তাকে বাইরে দেখে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাল না। বরং বোনের কাছেই নিশ্চিত হয়ে জানতে চায় অতসীর কথার সত্যতা।
প্রাচী জবাব দিল,
“হ্যাঁ ভাইয়া। চাচ্চু আর চাচিমণি সেদিন তুমি অতসীকে নিয়ে ফেরার আগেই সবাইকে এটা জানিয়েছিল। সবাই আপত্তি করলেও বাবা মেনে নেয়। আর বাকিদেরও ঝামেলা করতে নিষেধ করে। বাবার কথায় কেউ আর আপত্তি থাকলেও কিছু জানায়নি।’”
কপালে চিন্তার দুর্বোধ্য রেখা নিয়েও ফারজাদ মনোযোগ দিয়ে শুনেছে বোনের কথা। প্রাচীর বলা শেষ হতেই শুধায়,
“কবে যাবে এসব কিছু ঠিক করেছে?”
“আমি এই নিয়ে কিছু জানিনা ভাইয়া। তুমি অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করো।”
এরপর আর সেখানেও দাড়ায়নি ফারজাদ। নিজেদের অফিসে বাবার কাছে চলে যায়।
ফিরোজ সাহেবের সাথে দেখা করে জানতে চেয়েছে— “চাচ্চুর অতসীকে নিয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তে কেন সম্মতি জানালো?”
ফারজাদ অতসী এভাবে দূরে চলে যাক তা একেবারেই চায়না। তার ওপর মেয়েটার গর্ভে তার সন্তান। অতসীর দূরে চলে যাওয়া মানে বাচ্চাটাও দূরে চলে যাওয়া। এমন অবস্থায় কি করে ওদের ভিনদেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত তার বাবা মেনে নেয়!
তখন নিজের বাবার সামনে বসে আছে অফিসের কেবিনে। ফারজাদের মনোভাব বুঝে ফিরোজ সাহেব কপালে ভাঁজ ফেলে চেয়ে আছেন।
“তো তুমি এখন শফিকের নিজের মেয়েকে নতুন জীবন দিতে চাওয়ার সিদ্ধান্তে আপত্তি জানাতে চাও? সেই মুখও রাখো?”
ফারজাদ চেয়ারে হেলান দিয়ে গাম্ভীর্যচিত্তে মাথা নামিয়ে বসে ছিল। বাবার কথায় বিরক্তি নিয়ে ‘চ’ শব্দ করে। বারবার সবকিছুতে একই জিনিসের খোটা বিরক্তি দিচ্ছে তাকে।
বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি তো তোমাদের বলেছিলাম যেন পুলিশে ধরিয়ে দাও আমায়। সেটা দাওনি নিজেদের স্বার্থে। এখন বারবার একই জিনিস নিয়ে খোটা দেওয়ার মুখ তোমরাও রাখো না।”
ফিরোজ সাহেবের চেহারায় স্বল্প রাগের আভা দেখা গেল কথার পিঠে ছেলের কাটকাট জবাবে, তবে সামলে বলেন,
“এখন কি চাইছ? কীসের জন্য আমার সাথে জরুরী তলব সেটা স্পষ্ট করো।”
“আর কি বলবো আলাদা করে? অতসী ইউকে যাক আমি চাইনা। ও এখানেই থাকবে।”
“তো আমি কি করতে পারি এতে?”
ফারজাদ কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,
“কি করতে পারো মানে? চাচ্চুকে যেতে দিচ্ছ কেন? অতসীকে আমি ভালোবা…” বলতে বলতে থেমে যায় ফারজাদ। তাকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে থাকা বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“ওসব যাক। তুমি দাদু হবে এটা ভুলে গেছ? এখন অতসীকে দূরে পাঠিয়ে দাও কি করে? তাও সোজা ইউকে? লাইফটাইমের জন্য।”
“তো যাক! দাদু হবো ভুলিনি আমি। তাই বলে অতসীর সুন্দর জীবন পাওয়ার যে সুযোগ সেটাতে বাঁধা দিতে পারিনা। যখন দাদু হবো তখন নিশ্চয় আমাদের সে পাশে পাবে। বরং সবটা যাতে সুস্থভাবে হয় সেই ব্যবস্থা করে রাখব। দরকারে লম্বা সময়ের জন্য তোমার মাকেও ওখানে পাঠিয়ে দেব। কিন্তু ওদের যা চাইছে তাতে নিষেধ করা আর সম্ভব না।”
“আশ্চর্য! নিজেরা কি করবে না করবে সব ভেবে ফেলেছ। আর আমি? আমার কি হবে?”
“তোমার কি হবে মানে? তুমি কি বাচ্চা যে ওরা চলে গেলে তুমি এতিম, ছন্নছাড়া হয়ে যাবে?”
ফারজাদ বিরক্তি নিয়ে বলে,
“আমার অনাগত সন্তান। সে পৃৃথিবীতে আসবে আর আমি থাকব না ওদের কাছে? আমার সাথে থাকবেনা ওরা? তোমরা কি করবে সেসব ভেবে ফেলেছ। ওদের সব ওখানে সেটেল হবে। এসবের মাঝে আমি কই? স্ট্রেঞ্জ!”
ছেলের ভেতরে বিস্ময়, প্রশ্ন আর কি হচ্ছে বুঝতে না পারার যে বিষয়টা— তা ফিরোজ সাহেব ধরতে পারছেন। তবে কিছু করার নেই। বাবা হওয়ার অনুভূতি নিজেও জানেন, কিন্তু ফারজাদের পরিস্থিতি ভিন্ন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
“শুনো ফারজাদ। অতসী আর তোমার একসাথে হওয়া, বা থাকা এখন সম্ভব না। মেয়েটা এখনো ছোট। এমন কোনো বয়স হয়নি যে কারো সাথে বিয়ে দিতেই হবে। এমনকি তোমার সাথেও না। ও নিজের সন্তান নিয়ে একটু স্পেস পাক। নিজেকে বুঝুক, চিনুক। আরও ম্যাচ্যুর হোক। তোমার ততোদিন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। অবশ্য ম্যাচ্যুর হওয়ার পর তোমায় চোখে দেখতে চাইবে কিনা তাতেই সন্ধেহ।
যায় হোক, অতসীকে এমন সময়ে তোমার কাছে রাখা বিপজ্জনক। কারণ ওর তোমার প্রতি রাগ-ক্ষোভ এখনও তাজা। মেয়েদের অন্তঃসত্ত্বাকালীন সময়ে, কিংবা গর্ভাবস্থার পরের সময়— এসব একটু সেন্সিটিভ হয় আজকাল। সেখানে অতসীর একটা ট্রমা আছে তোমায় নিয়ে। বরং সবচেয়ে বড়, আর একমাত্র ট্রমাটাই তোমাকে নিয়ে। তাই তুমি আশেপাশে থাকা মানে সেই নিত্য পরিবেশ ওর চারপাশে থাকা। এখনো ওর মন থেকে যা করেছ সেসবের রেশ বিন্দুমাত্র কাটেনি। তুমি ওর আশেপাশে থাকা একেবারেই এলাও করতে পারছিনা আমি। এটা ওর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনিরাপদ হতে পারে। সাথে এমন দুর্ঘটনার পর ওর পরিবার হিসেবে সেইফ সারাউন্ডিং কতটুকু দিতে পারছি সেটাতেও বিরাট প্রশ্ন তৈরি করবে।”
জিরিয়ে বলেন,
“আর তোমার প্রতি ঘৃণা-রাগ শুধু অতসীর মনে নয়। তোমার চাচ্চু, আর চাচীমণির দিকটাও ভাবো। তাদের মনেও কম বিতৃষ্ণা থাকার কথা নয় তোমায় নিয়ে। সার্বিক চিন্তায় তোমার অতসীর কাছে থাকার প্রশ্নটাই আসা অন্যায় মনে হয়েছে আমার। আর এসব বিবেচনার আগে তুমি যে ঐ সন্তানের পিতা সেটা মাথায় রাখা উচিত এমনটাও মনে হয়নি আমার। এমন কোনো পবিত্র বিয়ে আর সুখী দাম্পত্য থেকে সুসংবাদ দাওনি সবাইকে, যে তোমায় বিবেচনা করবো।”
শেষ কথাগুলো বলার সময় গলায় হালকা কঠোর ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠল,
“বাকি এখানেও জেদ দেখাবে কি না ভেবে দেখো। আমি তোমার জেদও ভাঙব দরকার হলে। নরমভাবে যতটুকু দরকার বুঝিয়েছি। তোমার পরবর্তী সিদ্ধান্ত সামনেও কতটুকু নরম থাকব সেটা নিশ্চিত করবে।”
ফারজাদ পুরো সময়টা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল। এক হাত টেবিলে রাখা কলমটা অন্যমনস্কভাবে নড়াচড়া করছে তার আঙুলে। মাথা সামান্য ঝুঁকে আছে।
বাবার প্রতিটি কথা সে মন দিয়ে শুনল। কপালে চিন্তার হালকা রেখা পড়েছে, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা। কিছুক্ষণ পরে সে কলমের নড়াচড়া থামায়। আরও কয়েক সেকেন্ড একই ভঙ্গিতে বসে থাকে নীরবে। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। কোনো কথাবার্তা ছাড়া ধীরপায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
পুরো সময়টা ফিরোজ সাহেব চশমার ফাঁক দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলেকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ফারজাদ কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও কয়েক মুহূর্ত দরজার দিকেই তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসে সামনে রাখা কাগজপত্রে মন দিলেন।
__
ফারজাদ সোজা ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিল। ফারিশ মহল ফিরেনি আর। তার সাথে ফ্ল্যাটে যে বন্ধু থাকছে— সাকিব। তার কাছে আবার আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে।
সাকিব সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফারজাদের। তার এক মামাতো বোনকে কিছুদিন আগে নিজের কোনো বান্ধবীর সাথে ফোনে ফারজাদ, আর অতসীকে নিয়ে কিছু বলতে শুনেছে, হাসাহাসি করে। চমকিত সাকিব তৎক্ষণাৎ বোনকে ধরে। তার মামাতো বোন মিম।
সে সাকিব ভাই আশেপাশে আছে খেয়াল করেনি। তাকে দেখে চমকে গিয়েছিল। কিন্তু সাকিব সেসবের ধার ধারেনি। তার বন্ধুকে নিয়ে মিম কি নিয়ে কথা বলছিল তা বিস্তারিত জানতে চায়। মিম কাটিয়ে যেতে চাইলেও ছাড়েনি সাকিব। হুমকি, ধমকি দিয়ে শাসন করে; সবটা জানতে চায়। না পারতে মিম জানায় যে,
সাকিবকেই এসব ফোনে বলতে শুনেছিল সে। সাকিবের এক বন্ধু ফারিশদের ছেলে এ কথা সে জানতো। আর তার বান্ধবী নয়নিকার খালাও ফারিশ বাড়ির বউ এ কথাও জানা।
এদিকে মিম নিজের বান্ধবী নয়নিকার ভাই নিবিড়কে পছন্দ করে। যার সাথে কিনা কিছুদিন আগে নিজের খালাতো বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। এ কথা শুনার পর থেকে ভীষণ কষ্টে ছিল মিম। ভালোবাসার মানুষটার অন্য এক মেয়ের সাথে বিয়ে হতে যাচ্ছে। এ যন্ত্রণা কাউকে বলতেও পারছিল না, আবার সইতেও পারছিল না।
নিজের মধ্যে দ্বিধা-কষ্ট লালন করে যায়। আর যার সাথে বিয়ে ঠিক হচ্ছে সেই মেয়ের প্রতি অজানা ক্রোধ পুষে রাখে মনে। যে মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে, সে নয়নিকার যেই খালা ফারিশদের বাড়ির বউ। তারই মেয়ে— এটাও সে শুনেছে।
কিন্তু দুদিন যেতেই আবার শুনল এঙ্গেজমেন্ট স্থগিত। এদিকে সাকিবকে ফোনে যা বলতে শুনেছিল, সেসব চিন্তা করে সব হিসাব মিলাতে পেরে সে তৃপ্তি পায়। তবে নিবিড় তখনও মনের দিক দিয়ে অতসীতে মজে আছে জেনে ঈর্ষান্বিত ছিল মিম।
সেদিন ওর সাথে রাস্তায় দেখা হলে, মেয়েটা অন্ধ— এ কথা বুঝতে পেরে কোনো মায়া কাজ করেনি মিমের মধ্যে। বরং তার ভালোবাসার মানুষটা এই প্রতিবন্ধি, কলঙ্কিত মেয়ের জন্য এখনো আশায় বসে আছে জেনে ঈর্ষা অনুভব করে। আর সময়মতো তা উগড়ে দেয়।
যদিও পরে আদতে ফারজাদ যা ঘটিয়েছে সেসব অতসীর সাথেই কিনা, নাকি আরেক চাচার মেয়ের সাথে তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়। আর সাকিব ভাইকে ফোনে যা বলতে শুনেছিল, সেসব ঘটনাও আদতে ফারজাদকে ঘিরেই, নাকি এখানেও কিছু এদিক ওদিক শুনেছে তা নিয়েও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। যে কারণে পাঁচকান করেনি।
তবে অতসীকে ওই কথাগুলো শুনাতে পেরে সে যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিল মনে মনে। সেদিন কথায় কথায় নিজের এক বান্ধবীর সাথে নিবিড়কে নিয়ে আলোচনা করছিল। অতসী, আর ফারজাদও কিছুটা স্থান পেয়েছে তাতে। আর সাকিব তা শুনে নেয়।
আজ সময় পেয়ে বন্ধুকে জানালো।
ফারজাদ সাকিবের কাছে সব শুনে মেলার দিনের ঘটনা বুঝতে পেরেছে। এই মেয়ের কথার আ ঘা তেই অতসী সেদিন কষ্ট পেয়ে গর্ভপাতের বিষয়টা মাথায় এনেছিল— তাও বুঝতে সময় লাগলো না। তবে ফারজাদ নিজের বন্ধুর সব কথা শুনেই গেল শুধু। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
নির্লিপ্ত, নির্বিকারে কাটে বিকেলটা। রাত হলে অতসীর সাথে ঘটানো সেই ঘটনার দিনের পর প্রথমবারের মতো ড্রিঙ্ক করলো। সাকিবও সঙ্গ দেয় অনেকটা সময়। ড্রিঙ্ক করতে করতে আবোল তাবোল বকে সাকিব মেঝেতেই গা এলিয়ে দিয়েছে। ফারজাদ চোখ পিটপিট করে মাথা ঝেড়ে উঠে দাড়ায়, ভারসাম্য রেখে দাড়াতে পারছেনা। নেশায় বুদ হয়ে থাকা সাকিবের উদ্দেশ্যে বলে,
“তোর ঐ বোনকে আমার হয়ে দু চারটা থা প্প র দিয়ে গাল লাল করে দিবি। নয়তো ঐ মেয়ের ব্যবস্থা আমিই করবো দেখে নিস। বেয়াদব মেয়ে একটা।”
আরও নানান কিছু বলতে বলতে নিজের ফোন খুঁজল। পেয়ে বন্ধুর উদ্দেশ্যে এলোমেলো গলায় বলে,
“তুই থাক এখানে। আমি একটু জিদ্দি মেয়েটার সাথে কথা বলে আসি।”
ব্যল্কনিতে চলে গেলো ফোন লাগাতে লাগাতে। চারবারে গিয়ে রিসিভ হয় তা,
“হুউউম, হ্যালো?” জড়ানো কণ্ঠ অতসীর
ফারজাদ ফোন কানে চেপে মাতাল গলায় বলে,
“আরেকবার বলো? তোমার কণ্ঠ সুন্দর।”
“হুউউ? কে?” ফের জড়ানো কণ্ঠে জানতে চাইলো অতসী। হয়তো নিজেও ঠিকঠাক ঘুমের ঘোর থেকে বেরোতে পারেনি।
“আমি, ফারজাদ।”
অতসীর ঘুম এবার একটু হালকা হয়। দৃষ্টিহীন ঘুমঘুম চোখ দুটো মেলে এদিক ওদিক ঘুরায়। ফোনটা কানে আরেকটু চেপে স্পষ্ট করে জানতে চাইল,
“হু? কে বলছেন?” তাও ঘুমঘুম শুনাল সেই কণ্ঠ
ফারজাদ ব্যাল্কনির ফ্লোরে বসে পড়েছে দেয়ালে হেলান দিয়ে, পাশে হুইস্কির বোতলটা। এক চুমুক দিয়ে ঢোক গিলে জবাব দিল,
“ফারজাদ বলছি আমি, ফারজাদ মীর ফারিশ পুরো নাম।”
অতসীর ঘুম পুরোপুরি ছুটে যায়, চোখ পিটপিট করে। তবে উঠে বসলো না। শুয়ে থেকেই ফোন কানে চেপে জানতে চায়,
“এত রাতে কি দরকার?”
“তোমায় দরকার।”
ধীরে চোখ কচলে বলে,
“ফাজলামো করবেন না।”
ওপাশটা চুপ থাকল কিছুপল। অতসীও চুপচাপ থাকে। ভারি নিঃশ্বাস ভেদ করে সেকেন্ড কয়েক পর প্রশ্ন এলো,
“তুমি চলে যাবে?”
অতসী সাথে সাথে জবাব দিল না। কোথায় যাওয়ার কথা বলছে বুঝতে চায়। সেকেন্ড কয়েক পর বুঝে আসতেই সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দেয়,
“হ্যাঁ।”
“যেওনা।”
“কেন?”
“আমার দরকার তোমায়, তোমাদের।”
“আমাদের দরকার নেই আপনাকে।”
“আছে। দুজনেরই আমাকে দরকার।”
“না, নেই।”
তার জেদী কথার পিঠে ফারজাদ হার মানে, বোতল তুলে আরেক ঢোক গিলে আধো আধো বলে,
“আ…আচ্ছা, নেই।”
কিছুসময় উভয়পাশ নীরব থাকল। ফারজাদই সেই নীরবতা ভেদ করে আকাশপানে চেয়ে বলে,
“ভালোবাসি তোমায় অতসীরাণী।”
“আমি বাসিনা।”
“জানি।”
“তাহলে বলছেন কেন?”
“বলছি কারণ তুমি না বাসলেও, আমি যে বাসি এটা যদি মেনে নাও!”
“মানবো না।”
“তাও জানি।”
“সব যখন জানেন আমায় ফোন করেছেন কেন?”
“যেওনা প্লিজ। অনেক তো শাস্তি দিলে, দরকারে আরও দিও। কিন্তু যেওনা। তুমি আমাদের বাবুকে নিয়ে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকবে এটা সহ্য হবেনা। নিতে পারব না।”
“নিতে না পারুন। আমার কিছু যায় আসেনা।”
“বুকে ছু রি চালিয়ে কম তো শাস্তি দাওনি। সেদিন ঐ মুহূর্তে মনে হচ্ছিল তোমাদের একা রেখে আমি চলে যাবো সারাজীবনের জন্য। এঁকে তো বড় অপরাধ করেছি। তোমার ভাষায় কাপুরুষ। সেখানে দুনিয়ার মাটিতে তোমাদের জীবন কঠিন করে দিয়ে নিজেই বিদায় নেবো। তোমাদের একা রেখে, সংগ্রামের জীবন চাপিয়ে দিয়ে। মানতে পারছিলাম না ট্রাস্ট মি! সেই মুহূর্তে নিজেকে আসলেই কাপুরুষ মনে হয়েছিল। বিশ্বাস করো তখনকার অনুভূতিটার চেয়ে বড় শাস্তি আমার জন্য আর নেই।”
অপর হাতের বোতলটা তুলে, ঢকঢক করে আরও দু-চার ঢোক গিলে,
“ম রে গিয়ে তো এতকিছু থেকে বিদায় নিয়ে নিতাম। কিন্তু ঐ মুহূর্তটা!
নিজেকে এত অসহায় লাগছিল, এত নিরুপায় লাগছিল— বলে বুঝাতে পারব না। আর এখন আবার সেই সাত সমুদ্র তেরো নদী পরিমাণ দূরত্বে চলে যাবে তোমরা। এক ধরণীতে থেকেও এত দূূরত্ব আমি কিভাবে সইবো অতসীরাণী? এর চেয়ে ভালো আমার বুকে আবার ছু রি চালিয়ে দাও। আমি ম রে গিয়ে মুক্তি পাই সব অপরাধ-অপবাদ থেকে। আর তুমিও ভালো থাকতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে চলে যাও আমার সন্তানকে নিয়ে। কিন্তু যেখানেই যাবে, যাওয়ার আগে আমায় মুক্তি দিয়ে যাও।”
থেমে নেশার ঘোরে একই কথা আওড়াতে থাকে,
“হয় সারাজীবনের জন্য মুক্তি দাও, নয়তো ক্ষমা দাও অতসীরাণী। প্লি…প্লিজ”
দেখতে গেলে উপায় বহু। তবে মাতাল ফারজাদ কি বলছে নিজেও জানেনা। এতটাও বেহুশ না সে, কিন্তু আটকাতে পারছেনা নিজেকে। নেশা তাকে ভেতরের ভাবনাগুলো আপনা আপনি বলিয়ে ফেলছে।
অতসী কিসের ছু রি চালানোর কথা বলছে জানেনা। কপালে ভাঁজ তার। সাথে সে যে কথাগুলো বললো, আর যেভাবে বললো— তাতে কোনো ভিক্ষুক তার কাছে ভিক্ষা চাইছে মনে হচ্ছে। ভেতরটা অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু অনুভব করছে। ভীষণ অনাকাঙ্ক্ষিত।
মায়া!
এই মানুষটার প্রতি মায়া আসা তার মানায়না। একেবারেই না। তাহলে কেন হচ্ছে?
অতসী সেই দিকটা কাটিয়ে জানতে চাইল,
“বুকে ছু রি মানে? কিসের কথা বলছেন আপনি?”
“আমায় ফেলে তোমরা যেওনা অতসীরাণী।”
“বলছেন না কেন? আপনার বুকে ছু রি লেগেছিল?”
“হ্যাঁ,” জড়ানো গলায় আবার বলে, “হ্যাঁ, ঠিক বুকে।” শার্টের বোতাম খোলা তার। ব্যান্ডেজ স্পষ্ট। সেখানটাই হাত ছুঁঁইয়ে বলে,
“এই যে এখানটাই। এখানে ছু রি চালিয়ে দিয়েছিলে তুমি। আমি ভেবেছিলাম ওখানেই সব শেষ। তোমরাও মুক্ত, আমিও মুক্ত সবকিছু থেকে। পরে মাথায় এলো, তোমার রুমে আমায় দেখলে সবাই তোমাকেই না আবার ভুল বুঝে। ঠিক আমার মতো।
আমি যেভাবে ভুল বুঝেছিলাম; দাদুভাই মা রা যাওয়ার সময় তোমায় বাঁচাতে চেয়েছিল বলে— তোমার কারণে দাদুভাই নেই ভেবেছিলাম। তেমন বাকিরাও না একইভাবে তোমায় দোষারোপ করে আবার। আইনি ঘটনাও তো ঘটতে পারতো। তখন আমার কারণে, আমার অনুপস্থিতিতে আবার আরেক ঝড় চলে আসতো তোমার জীবনে। কতো চিন্তায় ছিলাম জানো পুরো সময়টা? কিভাবে যেন বেঁচে ফিরেছি। ঐ ঘটনার,” নেশার তালে আঁটকে যায় বলতে বলতে,
“ঐ ঘটনার আগেও তোমায় তোমার মতো জীবন কাঁঁটাতে দেবো ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু দেখলাম তুমি,”
একসাথে এত কথা বলায় ফের গলা জড়িয়ে আসছে তার,
“তুমি ছাড়া আমি আর সম্ভব না। তুমি, আমাদের বাবু— তোমাদের ছাড়া ফারজাদ আর কিছুইনা অতসীরাণী। কিছুইনা।”
দুপাশেই শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুধু। ওপাশ থেকে দীর্ঘ নীরবতার পর প্রশ্ন এলো,
“মদ খেয়েছেন?”
“ঐ একটু, মানে পাঁচ।
না, সাত…সাত বোতল চলছে এখন। বেশি না! অনেকদিন পর তো? আর মু…” আবার জড়িয়ে গেল তার গলা, “মুডও ছি…ল”
“ফোন কাটুন। ঘুমিয়ে যান।”
“উহু, ঘুমাব। কিন্তু তুমি ফোন কাটবেনা। তোমার সাথে কথা বলতে বলতে ঘুমাব আমি।”
অবুঝ কণ্ঠ তার। অতসীকে চুপচাপ তার এত কথা শুনতে দেখে অবচেতন মন আরেকটু চাইছে তার সান্নিধ্য। কিন্তু নিষ্ঠুর অতসী ফোন কেটে দিলো। ফারজাদ নিজেই বকে গেলো সবরকম আবোল তাবোল প্রলাপ। যার মধ্যে আছে তার অতসীকে নিয়ে অনুভূতি, তাদের সন্তানকে নিয়ে অনুভূতি, তার অপরাধের অনুতাপ, ক্ষমা চাওয়া, দূরে যেতে নিষেধ করা— এমন নানান আবদার। সময়ের সাথে ওপাশে আর কেউ নেই বুঝলে ফারজাদ বিড়বিড় করে,
“ওহ, ফোন কেটে দিয়েছ?” বোতল থেকে আরেক ঢোক গিলে,
“সমস্যা নেই। ঘুমাও তুমি। র…রাত জাগলে আবার শরীর খারাপ করবে। ঘুমাও! আমিও দেখি, ঘুম আসে কি না।”
ব্যাল্কনির মেঝেতেই গা এলিয়ে দেয় সে।
কল কেটে অতসী ফোনটা বালিশের নিচে রাখে, তারপর সোজা হয়ে থম মেরে শুয়ে রইলো।
___
দুদিন পর,
প্রিসিলা এসেছে শ্বশুর বাড়ি থেকে। সে বাড়িতে ঘটে যাওয়া এত ঘটনা শুরুতে জানত না। ফারজাদের ছু রি লাগার ব্যাপারে জানানো হয়েছিল শুধু। তাও তার স্বামী, আর শ্বশুরবাড়ির বাকি লোকেদের। প্রিসিলাকে তখন জানায়নি এসব। কারণ সে ছিল স্বামীর সাথে হানিমুনে। ওখানে ভাইয়ের এমন দূর্ঘটনা সম্পর্কে অবগত করতে চায়নি তার স্বামী। এমন আনন্দের মুহূর্তে হঠাৎ ধা ক্কায় প্রিসিলাকে সামলানো কঠিন হয়ে যেতো। বাড়ি ফিরে ধীরে সুস্থে জানাবে ভেবেছিল। এদিক থেকে প্রিসিলার পরিবারের লোকও তাকে এসব জানাতে নিষেধ করে, যেন মেয়ের নতুন জীবনের আনন্দময় মুহূর্ত নষ্ট না হয়।
তারা বাড়ি ফিরলে ভাইয়ের এমন দূর্ঘটনার খবর শুনে ছুটে এসেছিল। ফারজাদ তখনও হাসপাতালে ভর্তি। ঐ সময়ে ঘনঘন হাসপাতালে আসা যাওয়া করতো ভাইকে দেখতে। পরে ফারজাদ কিছুটা সুস্থ হয়। এরপর আর আসা হয়নি বাপের বাড়ি— নতুন বিয়ে হওয়ায় নানান আত্মীয়-স্বজনের আসা যাওয়াসহ দাওয়াতের ব্যাস্ততায়। আজ এসেছে অতসীরা মহলে থাকছে শুনে।
প্রিসিলা তার বোন প্রাচীর কাছে ফারজাদ হাসপাতালে থাকার সময়েই অতসীর সাথে ঘটা ঘটনাগুলো একে একে জেনে গিয়েছিল। ছু রি কিভাবে লেগেছে তা সে জানে। ভাইয়ের কাছেই জেনে নিয়েছে। অবশ্য কথামতো গোপনে রেখেছে তা।
আজ স্বামীসহ তার আগমনে মহলে তাড়াহুড়ো লেগে গিয়েছে। বাড়ির জামাইকে নিয়ে কথাবার্তা ছাড়া চলে আসায় একটু বকাও শুনল সে। আপ্যায়নেরও তো একটা ব্যাপার আছে! কিন্তু প্রিসিলা সেসব কানে নেয়নি। বাড়িতে তিন তিনটে মা থাকতে তার কীসের চিন্তা? সে সবার সাথে সবরকম আলাপ শেষে স্বামীকে শ্যালক-শ্যালিকাদের মাঝে বসিয়ে দেয়। পরপর ওপরে চলে যায়।
উদ্দেশ্য অতসী।
অতসী তখন আয়নার সামনে টুলে বসে চুলে চিরুনি চালাচ্ছে। প্রিসিলা রুমে নক করার প্রয়োজনবোধ করল না। দরজা খুলে দাড়ায় সোজা,
“অতসী?”
অতসী হঠাৎ প্রিসিলা আপুর গলা শুনে চমকিত হলেও খুশি হয়,
“প্রিসি আপু?”
“হ্যাঁ, আমি।” ততক্ষণে অতসী উঠে বসেছে। প্রিসিলাও তার কাছে চলে আসে। সবার আগে জড়িয়ে ধরলো বোনকে। অতসী স্বানন্দে তার বুকে যায়। প্রিসিলা বেশকিছুক্ষণ বুকে রাখলো অতসীকে।
“তোমায় খুব মিস করেছি আপু।”
“আমিও। খুব মিস করেছি।” বলে তার মাথায় স্নেহের চুমু খায়। অতসীর দৃষ্টি থাকলে প্রিসিলার চোখের অশ্রু দেখতে পেত। কিন্তু তা হলো না। প্রিসিলা অতসীকে এনে খাটে বসায়, নিজেও বসে পাশে।
“তো? কেমন যাচ্ছে? কি অবস্থা তোর? শরীর, মন— সব ঠিক আছে এখন?”
“আমার কি হবে? সব তো ঠিকই আছে।”
প্রিসিলা তার মায়া জড়ানো মুখটাই নজর বুলায়,
“তাই? খুব গ্লো করছিস দেখি। কিন্তু মুখটা দেখে গভীর ভাবনায় ডুবে ছিলি মনে হচ্ছে কেন? কি ভাবছিস হু?”
“তেমন কিছু না আপু। তুমি কবে এসেছ? তোমার শ্বশুরবাড়ির সবাই এসেছে? নাকি দুলাভাইয়ের সাথে এসেছ?”
“তোর দুলাভাইকে নিয়ে এসেছি। আমাদের আজ আসার কোনো প্ল্যান ছিল না। মা বললো তোরা এখন মহলে আছিস। তাই চলে এলাম হঠাৎ।”
আরও নানান কথা হলো দুবোনের মধ্যে। একে একে সব কথা শেষে প্রিসিলা হঠাৎ একদৃষ্টে অতসীর হাসি হাসি মুখটার দিকে চেয়ে বলে,
“অতসী? তোর খুব কষ্ট হচ্ছে তাইনা?”
অতসী একটু থমকায় আকস্মিক এহেন কথায়। পরপর চোখ পিটপিট করে সম্মুখে তাকিয়ে থেকে জানতে চাইল,
“এভাবে বলছ যে? আমার কষ্ট হতে যাবে কেন?”
“আমি ভাইয়ার বোন বলে, আমাদের ওপর রাগ হয় তোর?”
অতসী কথার পৃষ্ঠে কারণ ধরতে পারল কিছুটা।
“তেমন কিছুনা আপু। একজনের দোষে আরেকজনের ওপর কেন রেগে থাকব? আর তুমি, তোমরা কি শুধু ফারজাদ ভাইয়ার বোন? আমার বোন না?”
প্রিসিলা হাসে। অতসীর কাছে গিয়ে কপালে স্নেহের স্পর্শ দেয়, হাতে হাত নিয়ে বলে,
“আচ্ছা তোর রাগ হয়না ভাইয়াকে কেউ পুলিশে দেয়নি তাই?”
অতসী ফারজাদকে কেউ আইনের হাতে তুলে দেয়নি— এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা ভালো লাগা খারাপ লাগা— এমন কিছু ভাবেনি। তার মাথায় আসেনি ফারজাদকে যে তার অপরাধের জন্য আইনের হাতে দেওয়া যাবে এই বিষয়টা। প্রিসিলার কাছে এই প্রশ্ন শুনে থমকাল বটে। সময় নিয়ে বলে,
“উনাকে পুলিশে দেওয়া যেতো?”
“হ্যাঁ, যেতো তো। তুই চাইলে যেতো।”
“ওহ, আমায় তো কেউ কিছু বলেনি। জিজ্ঞেসও করেনি”
“তুই চাস? এখনো দেওয়া যাবে।” জিজ্ঞাসু নয়নে চেয়ে আছে প্রিসিলা। অতসী কি চায় জানতে আগ্রহী সে।
“ন… না থাক। পুলিশে দিলে তো সবাই। মানে বাইরের সবাই ফারজাদ ভাইয়াকে পুলিশে নিলো কেন জানতে চাইবে। তখন এসব জেনে গেলে?” স্পষ্ট ভয় অতসীর দুচোখে। সে নিজের সাথে হওয়া দূর্ঘটনা সবাইকে জানাতে চায় না।
“তো জানলে জানবে। অপরাধ তো তুই করিস নি। যা করার ভাইয়া করেছে।”
“ন…না প্লিজ। দরকার নেই ওসবের। আমাকে কথা শুনাবে সবাই। সাথে আমার সন্তানকেও নানান বুলি করবে। তার চেয়ে বাবা-মায়ের সাথে দূরে কোথাও চলে যাওয়াই ভালো।” নিবিড়ের বলা জারজ সন্তান কথাটা তার স্পষ্ট কানে বাজে এখনো। এই সুযোগ সে আর কাউকে দিতে চায় না।
প্রিসিলা বলে,
“তোর সন্তান? খুব ভালোবাসিস তাইনা?”
“হু। বাসবো না? আমার সন্তানকে আমি ভালো না বাসলে কে বাসবে?”
প্রিসিলা ছোট বোনের কথায় হাসে। নাক টেনে বলে,
“মা হয়ে যাচ্ছিস। খুব বড় হয়ে গেলি দেখি। ভাইয়াকে সেদিন নাকি সে তোর সন্তানকে মে রে ফেলতে চাইছে কেন জিজ্ঞেস করেছিস? ভাইয়া তোদের সন্তানকে মা রতে চায়?”
“তো…তোমাকে কে বলেছে এসব?”
“এত ভয় পেতে হবেনা। ভাইয়া বলেনি। প্রাচী সেদিন তোদের পাহারা দিচ্ছিল। ও সব শুনেছে, আর আমি জেনে নিয়েছি।”
“ওহ।”
“হু, তো বল? কি হয়েছিল পরশু?”
অতসী বলতে না চাইলেও প্রিসিলার জোরাজুরিতে নিজের নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে পরশুর সব ঘটনা একে একে বললো। সব শুনে প্রিসিলা কিছুপল চুপ থাকে। পরে বলে,
“ভাইয়াকে এভাবে ভুল বুঝে নিজের সন্তানকে মে রে ফেলতে চায় বলে অভিযোগ করে দিলি? তুই ভাইয়াকে অবিশ্বাস করিস ঠিক আছে। কিন্তু একটু ভাবলেই ওসবে তার হাত নেই বুঝে যাওয়ার কথা। এখন অবিশ্বাসের দরুন স্পষ্ট বিষয়ও নজর আন্দাজ করে খারাপ ব্যবহার করলে তো ভাইয়া আর তোর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবেনা। সেও আগে তোর সাথে এমন করতো। এখন তুইও এটা করলে তো সমানে সমানে হয়ে যায় এই বিষয়টা। আরেকটু বয়স হলে, আরেকটু ম্যাচ্যুর হলে— তখন নিজেরই এসব ভেবে নিজেকে বোকা লাগবে। তাই এখন তুই এসব অতিরিক্ত চিন্তা থেকে দূরে থাক। ভাইয়ার জন্য না। নিজের, আর নিজের সন্তানের জন্য।
থেমে সময়ে নিয়ে বলে,
“আর ভাইয়াকে পারলে একেবারেই অদেখা করে যা। তার অস্তিত্বই উপেক্ষা করে যা। নয়তো ক্ষণে ক্ষণে মানসিক অশান্তিতে ভুগবি।”
অতসী নিম্নকণ্ঠে সম্মতি জানায় ধীরে,
“আচ্ছা”
প্রিসিলা বলে,
“ভাইয়াকে সবাই নানানভাবে শাস্তি দিচ্ছে। উঠতে বসতে কটু কথা শোনায় সবাই। আমি, প্রাচী, আরমান ভাইয়া, চাচ্চুরা, চাচীমণিরা, বাবা — কমবেশি কেউ স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিনা আগের মতো। তুইও অনেক কথা শুনাস। ভাইয়া এসবের বিপরীতে কোনো দ্বিরুক্তি করছেনা। এমনকি তুই প্যানিক করে ভুলে ভাইয়ার বুকে ছু রি চালিয়ে দেওয়ার পরও এই নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। তুই অ্যাবরশন করাতে চেয়েছিস, কিন্তু ভুল বুঝে ভাইয়াকেই কথা শুনিয়ে দিলি— তাও সয়ে নিয়েছে। আর আগে তোর উপস্থিতি বুঝলেই কতো খারাপ আচরণ করতো। বুঝতে পারছিস পরিবর্তনটা?
ভালোবাসা বাসির দিকে যাবো না। ওটা তোদের ব্যাপার। কিন্তু অনুতাপটা আছে ভাইয়ার মধ্যে। এখন তুই আইনের হাতে তুলে দিতে চাইলে দিয়ে দে। অনুতাপটা সব না। শাস্তি দেওয়া উচিত কখনো কখনো। আর না চাইলে না দে। ক্ষমা করবি কিনা তাও তোর ব্যাপার।
কিন্তু এখন যে রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা নিয়ে আছিস? ওসব বাদ দিতে হবে। কারণ এসব ভাইয়াকে পীড়া দেবে ঠিক, কিন্তু তোরও মানসিক শান্তি মিলবেনা। তাছাড়া ভাইয়াও অনুতপ্ত। এরপরও রাগ-ঘৃণা দিনের পর দিন প্রকাশ করতে থাকলে একসময় দেখবি তুই নিজেই সবার চোখে ভুল হয়ে যাবি। তোকেই মানুষ দোষ দেবে। পুরুষ মানুষের যেকোনো কিছু অতিরিক্ত করার স্বভাব আমাদের সমাজের মানুষজন মানিয়ে নেয়। নিজেদের অভ্যস্ত করে নেয় স্বাভাবিকভাবে দেখে।
কিন্তু মেয়েরা কিছু একটা বুঝে না বুঝে বেশি করলে একসময় মেয়েরাই সবার আগে তার প্রতি বিরক্ত হয়। টিটকিরি দেয়। তোর প্রতিও বিরক্তি প্রকাশ করবে সবাই, নানান বুলি করবে। তখন তোর সাথে কি ঘটেছিল সেটাও নজর আন্দাজ করতে তারা দুবার ভাববে না। এটাই নিয়ম।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতসীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সে,
“তাই ভাইয়ার হয়ে সাফাই গাইতে এসেছি ভাবার কারণ নেই অতসী। সব তো শুনলাম তোদের। ভাইয়ার সাথে বুঝে না বুঝে যা যা আচরণ-ব্যবহার করেছিস। সেসব সবার সামনে আসলে বাড়ির লোকেরাই তোকে কোনো না কোনোভাবে বাড়াবাড়ি করছিস বলে বকবে। তখন বর্তমানে যে ক্ষোভ ভাইয়ার প্রতি দেখাচ্ছে সবাই সেটাও কমে যাবে, উল্টো মায়া দেখাবে তার প্রতি। তখন ওসব দেখে তুইও মানসিক শান্তি পাবিনা। এটা তোর জন্য ক্ষতিকর এখন।”
একটু থামল প্রিসিলা। যেন কথাগুলো মেপে নিচ্ছে।
“ভাইয়ার কথা ভাবা ছেড়ে দে, অতসী। সে যে একজন আছে— এটাও ভুলে যাওয়ার চেষ্টা কর। তাহলে ওই ঘটনাটাও একসময় তোর মনে ততটা কষ্ট দেবে না। এমনকি ভাইয়ার জন্য এটাই সবচেয়ে বড় শাস্তি হবে।”
অতসী তখনও মাথা নিচু করে বসে আছে। কোনো কথা বলছে না।
প্রিসিলা আবার বলল,
“আর নিজেকে একদম অসহায় ভাববি না। তোর জীবন শেষ, সব শেষ এমনটা একেবারেই ভাববি না। আজকাল চারপাশে কতো রে ই পের ঘটনা ঘটে শুনছিস তো! কেমন বিকৃত বিকৃত উপায়ে নিজেদের পশুত্ব দেখাচ্ছে ছেলেমানুষরা সুস্থ, স্বাভাবিক অবস্থায়। মেয়েগুলোর কতো করুন করুন পরিণতি হয়! সেখানে তোর ভাগ্য ওদের তুলনায় অনেকটা ছাড় দিয়েছে। যে অবস্থাতেই আছিস এখন সেটার জন্য বরং ওপরওয়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় কর।”
কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠে হালকা ক্লান্তি এসে পড়ে তার।
“কারণ সেদিন তোর বিপরীতে মানুষটা ভিন্ন হতে পারতো। ভাইয়ার জায়গায় অন্য কেউ থাকতে পারতো, কিংবা জায়গা ভিন্ন, পরিস্থিতি ভিন্ন, তোর পরিণতি ভিন্ন। তখন?”
একটু থেমে সে ধীরে যোগ করল,
“আমি বলছিনা ভাইয়া তোকে ছাড় দিয়েছে তাই সে ভালো মানুষ। এমন সেন্সে বলছিনা অতসী। বলছি তোর দিক থেকে। আমি ফারজাদ ভাইয়ার বোন এটা সাইডে রেখে আমার কথাগুলো ভেবে দেখিস।”
মাথা নত করে নীরবে বসে থাকা অতসীর দিকে চেয়ে প্রিসিলা আবার বলে,
“আমার বলার পয়েন্ট অফ ভিউতে বুঝার বিষয় আছে অতসী। ভুল বুঝে আপুকে পর মনে করিস না কেমন?”