প্রেমভুবনের অতসী

পর্ব - ১৮

🟢

“কাল হসপিটালে গিয়েছিলি ফারজাদের সঙ্গে?”

“হ হ্যাঁ ভাইয়া, গিয়েছিলাম।”

নিবিড় মাথা নাড়ালো, যেন সে বুঝেছে।

“কী দরকারে? তুই অসুস্থ ছিলি?”

অতসীর গলা শুকিয়ে এলো।

“না… মানে, হ্যাঁ—একটু খারাপ লাগছিল। তাই আরকি।”

কথাগুলো বলতে বলতেই নিজের কানে কেমন ফাঁপা শোনাল। কারণ কি জবাব দেবে বুঝতে না পেরে কিছু একটা বলে দিয়েছে। আসল কারণটা কারও কানে যাক তা অতসী চায় না।

ফারজাদ ভাইয়া তো বাড়ির সবাইকে নিজেই অসুস্থ বোধ করছিল বলে জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সে তো জানে, যে এটা মিথ্যে।

অতসী নিবিড় ভাইয়াকে কিভাবে সরাসরি মিথ্যা বলবে! এর চেয়ে নিজেই যখন কিছুটা অসুস্থ বোধ করছিল। তা নিয়ে কিছু একটা বলে দেওয়া ভালো হবে ভাবলো।

কিন্তু জবাবটুকু দিয়ে একটু স্বস্তি নেবার আগেই নিবিড়ের পরের প্রশ্ন শুনে চমকে উঠল অতসী,

“অ্যাবরশন করাতে গিয়েছিলি?”

চমকিত অতসী কথা বলতে ভুলে গেলো। বুক ধড়ফড় করে উঠলো তার। নিবিড় ভাইয়া এ কথা জানলো কি করে?

“কথা বলছিস না যে?”

“তু তুমি… কী করে জানলে?”

“তার মানে, অ্যাবরশন করাতেই গিয়েছিলি।”

অতসী আবার আঁটকে গেল। কোনো জবাব দিতে পারল না। তার চমকে ওঠা আর ভয়ার্ত মুখ দেখেই নিবিড় নিশ্চিত হয়ে যায়।

“বাচ্চাটা এখন আছে, নাকি নেই?” তীক্ষ্ণ চোখে একরাশ সুপ্ত আশা।

“নিবিড় ভাইয়া…”

“বল, বাচ্চাটা আছে নাকি নেই, অতসী?”

“আছে। আমার সন্তান আছে। ওর কিছু হয়নি। এখন প্লিজ, মাকে ডেকে দাও। আমি একটু একা থাকতে চাই।”

দুদিন ধরে মনে লালন করা আশার বীজ এক মুহূর্তে উপড়ে গেল নিবিড়ের। সে মাথা কাত করে চোখ বন্ধ করল, গভীর শ্বাস নিল। রাগ উঠেছিল, তবে নিজেকে সামলে নেয়।

“অ্যাবরশন করানোর সিদ্ধান্ত তুই নিয়েছিলি, তাই না? তাহলে না করিয়ে ফিরে এলি কেন? ফারজাদ বাধা দিয়েছে?”

“তুমি না জেনে কথা বলছ, ভাইয়া। এমন কিছুই করেনি ফারজাদ ভাই। অ্যাবরশন করাতে উনিই নিয়ে গিয়েছিলেন।”

“তাহলে না করিয়ে ফিরে এলি কেন?” কণ্ঠ আরও আগ্রাসী হয়ে উঠল। অতসী চমকে যায়।

“গিয়ে আবার ফিরে আসার মানে কী? তোর কি ওই ফারজাদের সন্তানকে চাই?”

হঠাৎ করে নিবিড়কে অচেনা লাগল অতসীর। এই মানুষটা তো তার একটা ভরসার জায়গা। তার কোনো চাওয়া কখনোই অপূর্ণ রাখেনি আজ অব্দি নিবিড়। কোনোদিন তার কর্কশ গলার সামনে দাঁড়াতে হয়নি অতসীকে।

আজ হঠাৎ কেমন রেগে গেছে তার ওপর।

নিবিড়ের ভেতরের নারাজগি আর রুষ্টতা স্পষ্ট টের পাচ্ছে সে।

“ফারজাদ ভাইয়ার সন্তান বলছ কেন? ও তো আমারও সন্তান। আমি অবশ্যই ওকে চাই।”

“তাহলে অ্যাবরশন করাতে চাইলি কেন? আর করাতে গিয়ে আবার ফিরেও এলি কেন?”

নিবিড়ের এমন আচরণে কষ্ট পেল অতসী। ধীরে বলল,

“আমি… আমি ওকে রাখতে চাই, ভাইয়া। তাই ফিরে এসেছি।”

“মিথ্যে কথা। এখনই তো বললি, অ্যাবরশন তুই নিজেই করতে চেয়েছিলি। আবার রাখতে চাস বলছিস কেন?”

একের পর এক কৈফিয়ত চাইছে অতসীর কাছে। সে বলে,

“আমি কোনো মিথ্যে বলছি না। আমি আমার সন্তানকে চাই। ফারজাদ ভাইয়াও চায়। তাহলে তুমি এমনভাবে বলছ কেন ভাইয়া?” কণ্ঠ আর চোখে তার কষ্ট স্পষ্ট।

নিবিড় মানতে নারাজ, জেদ নিয়ে বলে,

“তুই চাস না। মাত্রই বলেছিস চাস না। ওই ফারজাদ তোকে উল্টোপাল্টা বুঝিয়েছে, তাই না? ব্রেইনওয়াশ করে ফেরত এনেছে তোকে।”

“তুমি ভুল বুঝছ, নিবিড় ভাইয়া। উনি এমন কিছুই চাননি। আমি অ্যাবরশন করাতে চাই শুনে বরং নিজেই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। পরে আমার…” সে থেমে গেল। কণ্ঠ কেঁপে উঠছে।

“পরে আমার অনুশোচনা হয়। বুঝতে পারি আমি ভুল করছি। তাই নিজেই ফিরে আসতে চেয়েছি। কিন্তু তোমাকে এসব কে বলেছে, ভাইয়া?”

নিবিড়কে জানিয়েছিল তার এক বন্ধু—সেই হাসপাতালেরই ডাক্তার। অতসীকে সে নিবিড়ের সূত্রে চিনত। অচেনা এক ছেলের সঙ্গে অতসীকে একা হাসপাতালে দেখে নিবিড়কে জানায়।

তখন নিবিড় মাত্রই অতসীদের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়েছিল। ছবি পাঠালে চিনতে পারে দুজনকে। প্রথমে ভেবেছিল ফারজাদের অসুস্থতার কারণেই যাওয়া। কিন্তু ছবিতে অতসীকেই বেশি অসুস্থ দেখাচ্ছিল— ফারজাদ তাকে আগলে রেখেছে। পরে সোনোগ্রাফি ওয়ার্ডের বাইরে তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্দেহ করে অতসীর গর্ভাবসস্থা সংক্রান্ত কারণে হয়তো তারা ওখানে গিয়েছে। বন্ধুকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেনি নিবিড়। এতে অতসীর সন্তানসম্ভবা হওয়ার বিষয়ে জেনে গেলে সমস্যা। তাই নিজেই খোঁজ নিয়েছিল পরে। অ্যাবরশন হয়েছে কি না, তা জানতে না পারলেও কেন গিয়েছিল—তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি।

বিষয়টা অপ্রত্যাশিত ছিল তার কাছে। তবু ভেতরে ভেতরে সন্তুষ্টই হয়। ভেবেছিল, বড় একটা সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। দুদিন সেই বিশ্বাস নিয়েই ছিল।

কিন্তু নিশ্চিত হতে এসে এভাবে সব আশা ভেঙে যাবে তা কল্পনাও করেনি। ফারজাদ, এমনকি অতসীর প্রতিও তীব্র অসন্তোষ আর ক্ষোভে মনটা বিষিয়ে উঠেছে তার।

এসব কিভাবে জেনেছে এই জবাব অতসীকে দিলো না সে। অতসী যখন একবার গর্ভপাতের বিষয়টা মাথায় এনেছিল। তখন এই নিয়ে সে আরেকটু বুঝাতেই পারে,

“অতসী। শোন, তুই প্রথমে কি ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলি জানিনা। কিন্তু সিদ্ধান্তটা একেবারেই খারাপ ছিলনা। বাচ্চাটার এসবে কোনো দোষ নেই তা আমি জানি। কিন্তু সে জারজ সন্তান। এটা কিছুতেই বদলাবেনা। ওকে নিয়ে তুই কিভাবে জীবনে সামনে এগোবি? সিঙ্গেল মাদার হওয়া এমনিতেই কতো কঠিন তা তো জানিস। সেখানে তোর আরও বড় বড় সমস্যায় পড়তে হবে বাচ্চাটাকে নিয়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ধ র্ষ ণে সন্তানসম্ভবা হলে অ্যাবরশন করানো জায়েজ। কোনো অপরাধ নেই এ…।”

“থেমে যাও প্লিজ। নিবিড় ভাইয়া। এসব কথা আর শুনতে চাইনা। তুমি থেমে যাও। তুমি,” কেঁপে উঠলো অতসীর গলা।

“তুমি কিভাবে আমার সন্তানকে মে রে ফেলতে বলছ? আমি ওকে মারবো না। তুমি এসব বলতে পারো না। ও থাকবে। জায়েজ হোক, নাজায়েজ হোক, ও আমার সন্তান, আমি ওর মা। আমি রাখবো ওকে। তুমি এসব বলার কেউ না। এসব বলবেনা।”

অতসীকে উত্তেজিত হয়ে উঠতে দেখে নিবিড় একটু থামে, পরপর নরম গলায় বললো,

“আচ্ছা, এত হাইপার হচ্ছিস কেন? আমি জাস্ট…”

“না। আর কিছু শুনতে চাইনা আমি। মাকে ডাকো, আমায় নিয়ে যেতে বলো। আমার তোমার সাথে আর কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা। এখান থেকে উঠতে চাই আমি।”

নিবিড় আরও একবার বোঝাতে চাইলো। কিন্তু অতসী শুনলো না। নিবিড় হতাশ হয়। রাগও হয়। তবে বাগানের অপরদিকে বাড়ির বুয়াকে গাছে পানি দিতে দেখলে, তাকে ডেকে অতসীকে ভেতরে নিয়ে যেতে বললো।

সে চলে গেলে সেকেন্ড কয়েক দাড়িয়ে নিবিড় সবটা ফের ভাবলো। গর্ভপাতের কথা সে মাথায় আনেনি শুরুতে, তবে অতসী বা ফারজাদ কেউ একজন চাইছে শুনে সন্তুষ্ট হয়েছিল আনমনে। ওটা হয়ে গেলে মাও আর অতসীকে বউ করতে আপত্তি করতে পারত না হয়তো। কিন্তু হলো না। মুখে হাত ঘষে দীর্ঘশ্বাস টানে। এখান থেকে ভালো কোনো খবর নিয়ে ফিরবে আশায় ছিল, কিন্তু এখন উল্টো মেজাজটাই খারাপ লাগছে। অতসীর ওপর রাগ লাগছে। ভাবনা রেখে চলে যেতে পা বাড়ায়। পেছন ফিরতেই অকস্মাৎ গালে কারো ঘু ষি লাগলো প্রচণ্ড জোরে।

“আহ”

ক্ষীণ আর্তনাদ করে সে। মাথা তুলে ঘটনা কি বুঝার সুযোগটাও পেলো না। ফের শক্তপোক্ত এক হাতের ঘুষি এসে আঘাত হানে তার চোয়ালে।

“মাদার*দ! আমার বাচ্চাকে রাখবো নাকি রাখবো না সে চিন্তা তোকে করার জন্য চাকরিতে রেখেছি আমি? ব্লাডি বিচ, শালা”

ক্রমাগত আঘাত হানছে নিবিড়ের গায়ে। কিন্তু নিবিড় ততক্ষণে তার সাথে কি হচ্ছে তা কিছুটা বুঝতে পেরেছে। আরেকটা আঘাত পেয়ে ফের হাত উঠলে তা সে প্রতিরোধ করে ফেলে শক্ত হাতে। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে তার। ফারজাদের বাহুতে ধা ক্কা দেয়।

ফারজাদ দুকদম পিছিয়ে যায়। তবে চেহারায় সেই আগ্রাসী ভাব তখনো। চোখদুটো রাগের তোপে অনলপিণ্ডে পরিণত হয়েছে।

“দূরে সর, নেশাখোর কোথাকার। তোর মতো ক্যারেক্টার ঢিলা কাপুরুষের কাছে আমি চাকরি নেবো? এত খারাপ দিন আমার?”

বলতে বলতে তেড়ে আসে সে, নিজেও আঘাত হানে। তবে ফারজাদ কৌশলে আঁটকে নিলো। নিবিড় থামেনা,

“কুত্তা, শু*র, গায়ে হাত তুলেছিস কেন তুই?”

“আমার বাচ্চাকে মে রে ফেলতে বলেছিস কেন? সাহস হয় কি করে তোর?”

এঁকে অপরের ওপর পাল্টা আঘাত হানছে পরপর। কেউ কম না। ফারজাদ বুকের ক্ষতে কিছুটা দুর্বল, তবে নিবিড়কে আগে আঘাত হাঁনায় সেও যথেষ্ট ব্যথা পেয়েছে। এদিকে ফারজাদের রাগের তোপে নিজের আঘাতের কথা মাথাতে নেই।

“ভাইয়া, স্যার। কি করছেন আপনারা?” প্রাচীর আতঙ্কিত কণ্ঠ। তাতে দুজনে ভ্রূক্ষেপ করেছে বলে মনে হলো না।

লাগাতার ঘু ষি, হাতাহাতি করেই যাচ্ছে। প্রাচী এসেছিল অতসীকে নিতে। কিন্তু এসে এসব দেখতে পাবে ভাবেনি। দৌড়ে আসলো তাদের কাছে। ছাড়াতে চায় দুজনকে,

“ভাইয়া, দূরে সরে যাও প্লিজ। তুমি ব্যাথা পাবে তো।”

ফারজাদ ঘু ষি খেয়ে নিবিড়কে জোরে ধা ক্কা দেয়, সে পিছিয়ে যায়।

“সর প্রাচী। এই কু ত্তাটাকে আমি মে রে ফেলবো। আমার সন্তানকে মে রে ফেলতে বলার সাহস করে কি করিস তুই মাদারচোঁ*।”

তেড়ে এসেছে বলতে বলতে। নিবিড়ও আগ্রাসীভাবে এগিয়ে এসে আবার ফারজাদের কলার ধরে,

“বলবো, আরও হাজারবার বলবো। কাপুরুষের মতো জবরদস্তি করেছিস ওর সাথে তুই। তোর ঐ নাজায়েজ বাচ্চা রেখে অতসী সারাজীবন ভুগবে কেন? মে রে ফেলাই উচিত। কিচ্ছু ভুল বলিনি।”

ফারজাদ কলার থেকে হাত তুলে গালে ফের ঘু ষি লাগায় জোরে,

“আমার সন্তান ও। ওর বাবা আছি, মা আছে। তুই এসব বলার কে? আমাদের নিজের সন্তানকে নিয়ে সমস্যা না হলে তুই কোথাকার কে শালা? বালের জ্ঞান চো*তে এসেছিস এখানে? শু*র”

“ভাইয়া, প্লিইজ ছেড়ে দাও। দূরে সরো তোমরা। স্যার, ছেড়ে দিন না। আমার ভাইয়া অসুস্থ। ছেড়ে দিন প্লিজ”

প্রাচী দুজনের কাছে দাড়িয়ে। দুহাতে ভাইকে ছাড়াতে চাইছে সে প্রাণপণে। নিবিড় ফের আঘাত হানতে চায়। প্রাচী নিজের হাত দিয়ে আঁটকে নিলো। কিছুটা ব্যথাও পায়, তবে ভাইকে বাঁঁচাতে চায় সে,

“না, প্লিজ। স্যার, আমার ভাইয়া অসুস্থ। প্লিজ আ ঘাত করবেন না।”

“প্রাচী সরে যা তুই এখান থেকে।” সে সরেনা। নিবিড় প্রাচীকে টপকে আবার ঘু ষি দেয়,

“জ্ঞান আমিই দেবো। ওকে আমি বিয়ে করতে চাই। আমাদের এনঙ্গেজমেন্ট ঠিক ছিল। তুই এসেছিস মাঝখান থেকে। জ্ঞান দেওয়ার অধিকার আমি রাখি। তোর মতো রাতের অন্ধকারে একা মেয়ে পেয়ে…”

গালে বিপরীত ঘু ষি পড়ে। থেমে যেতে হলো।

“ব্রিটিশ আমলের কথা ছাড়, এনঙ্গেজমেন্ট ঠিক হয়েছিল। হয়ে যায়নি, আর হবেওনা। তুই শালা আমার বাচ্চাকে মে রে ফেলার উস্কানি দিচ্ছিস অতসীকে। ম রতে ম রতে বেঁচে ফিরেছে আমার বাচ্চাটা। আবার এসব বলিস কোন সাহসে তুই?”

তখনো লাগাতার হাতাহাতি চলছে। প্রাচী মাঝখান থেকে ভাইকে আড়াল করতে চাইছে। ফারজাদ আবার বলতে লাগলো,

“আর কীসের অধিকারের কথা বলছিস তুই? ওটা তো বাদই দে। কাগজে কলমে খোঁজ নিয়ে দেখ। ওর সবেতে আমার অধিকার। বউ হয় আমার। তুই ভাই, ভাইয়ের মতো থাক। আমাদের ইন্টারনাল বিষয়ে নাক গলাতে হবে কেন তোর?”

‘ভাই, ভাইয়ের মতো থাক’ নিবিড় হেসে উঠলো কথাটা শুনে। প্রাচীর হস্তক্ষেপে দুজনে তখন কিছুটা থেমেছে, দূরে সরে দাড়িয়েছে। এ কথা শুনে সে হেসে হাতের উল্টোপিঠে ঠোঁটের র ক্ত মুছে বলে,

“Look who is talking!”

ফারজাদ উত্তপ্ত নয়নে চেয়ে আছে। নিবিড় ফের বলে,

“আমি ভাই হলে তুই কি?

অবশ্য সেদিক থেকে দেখতে গেলে ভাই হিসেবে কলঙ্ক তুই।”

“ফালতু কথা বলবিনা। আমি ওকে বোন মেনেছি কবে যে আমায় ভাই বলছিস?”

“বোন তো আমিও মানিনি। তবে তোর মতো উচ্ছিষ্টের মতো ব্যবহার করিনি। ভালোবেসে এসেছি সেই থেকে। তাই অধিকার কার বেশি হতে পারে তা মাথায় ব্রেইন থাকলে বুঝে নেওয়ার কথা।”

ফারজাদের চোখে মুখে রাগ, ঘনঘন শ্বাস টানছে। তবে আর আক্রমণ করার চেষ্টা করলো না। প্যান্টের পকেট হতে ফোন বের করে কিছু একটা বের করলো। নিবিড়ের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।

“না না, ভাইয়া প্লিইজ। আর না। অনেক মেরেছ। প্লিজ থামো। ভাগ্যিস বাবারা বাড়ি নেই। এসব বাবা দেখলে আবার তুলকালাম বেঁধে যাবে।”

“ছাড় তুই। আমি মারতে যাচ্ছিনা।”

প্রাচী মানেনা, “এখান থেকে করো কি করবে।”

“ছাড়তে বলেছি তোকে।” ধমক শুনে কেঁপে উঠে সে।

বোনের কাছে ছাড়া পেয়ে ফারজাদ নিবিড়ের সামনে গিয়ে দাড়ায়। নিবিড় তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে।

ফারজাদ ফোন থেকে ছবিটা বের করে নিবিড়কে দেখায়।

নিবিড় কপালে ভাঁজ ফেলে দেখে। দেখতে দেখতে কিছুটা মনোযোগী হয়ে উঠলো। পরপর বিস্ময় ফুঁটে উঠে চেহারায়। সেই কাগজটা। যেখানে অতসী আর ফারজাদের নামে বিয়ের রেজিস্ট্রি করা আছে। তবে সাইনের জায়গায় অতসীর আঙ্গুলের ছাপ।

বিস্মিত নিবিড় বুঝেছে যে এসব অতসী জানেনা। সজ্ঞানে এটা করেনি তা বুঝতে বেগ পোহানোর দরকার পড়েনি। কিন্তু, এই ছেলেটা কখন, কিভাবে এত বড় প্রতারণাটা করলো? সে কোনো প্রশ্ন করবে তার আগে ফারজাদ বলে,

“এখন বোঝা যায় কার কেমন অধিকার অতসীরাণীর ওপর?”

নিবিড় নিশ্চুপ। জবাব দিলো না। সে অবস্থায় নেই সে।

“শুধু বাচ্চার মা না, বউও হয় আমার। তাই ওকে নিয়ে এসব হিরোগিরি আমার সামনে দেখাবিনা সামনে থেকে।”

“এসব কখন করেছিস?”

“কখন, কিভাবে এসব জেনে কি কাজ? করেছি মানে করেছি। এটা দেখিয়ে ওর ওপর কোনোরকম অধিকার দেখানোর ইচ্ছে আমার ছিল না। কিন্তু তুই হস্তক্ষেপ করার কারণে শেষে এটাই করতে হলো। তাই সামনে থেকে সামলে।”

ফারজাদ চলে যায়। যথেষ্ট ব্যাথা পেয়েছে সে। নিবিড়ের অতটাও না হলেও কম না। তবে স্তব্দ নিবিড় মাত্র যে ধা ক্কাটা পেলো তার সামনে অন্য আঘাতের ব্যাথা অনুভব করতে পারল না।

প্রাচী কাতর চোখে নিজের স্যারকে দেখলো। মানুষটার জন্য কেন জানি তার কষ্ট হচ্ছে। কোনো দোষ নেই, শুধু ভালোবেসে ভেতরে ভেতরে পিষে ম রছে হয়তো মানুষটা। সে ভাইয়ের পেছনে যেতে যেতে নিবিড়ের কাছে আসতেই নিম্নকণ্ঠে বলে,

“স স্যার, আপনি ব্যাথা পেয়েছেন খুব। প্লিজ চলে যান, হস্পিটাল গিয়ে আঘাতগুলোতে ব্যান্ডেজ করিয়ে আসুন। ব্লিডিং হচ্ছে।”

নিবিড় তখনো নিজের ভেতর থমকে আছে বিস্ময়ে। কাছ থেকে অতি নিম্নকণ্ঠে প্রাচীর গলা শুনে একনজর তাকায়। আনমনেই আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়।

__

ফারজাদ যে আসবে তা প্রাচী জানতো শুধু। ফারজাদ আর কাউকে জানাতে নিষেধ করে দেয় প্রাচীকে। নিচে কেউ না থাকায় সবার চোখ এড়িয়ে নির্বিঘ্নে ওপরে চলে আসতে পেরেছে সে। প্রাচী ফাস্টএইড বক্স এনে ছোট ছোট আঘাতগুলোতে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিলো। নিবিড় ফারজাদের বুকের দিকে কোনোরকম আঘাত করেনি, ওপাশটা এড়িয়ে গিয়েছে— হয়তো জেনেবুঝেই। প্রাচীর বিষয়টা বুঝে আসতে একরাশ ভালোলাগার অনুভূতিতে ছেয়ে গেলো মনটাই। নিবিড়ের সাথে অতসীর বিয়ে ঠিক হওয়া, পরপর মেয়েটাকে নিয়ে তার ভাইয়ের সাথে নিয়ে ঘটা সব ঘটনা— এসবের মধ্যে অতসীর সাথে সাথে নিবিড় ছেলেটার প্রতিও প্রাচীর মায়া হয় ভীষণ। ভাইয়ের চেহারাটা তো মাঝে মাঝে অদেখা করতে মন চায়। কিন্তু একমাত্র ভাই তার! পারেনা কোনোভাবেই।

“অতসী কোথায়?”

“আছে, রুমে দেখে আসলাম মাত্র।”

“বাকিরা?”

প্রাচী পিঠের দিকে শেষ একটা ক্ষ তে মলম লাগাতে লাগাতে বলে,

“বাবা তুমি এসে মারামারি শুরু করার একটু আগে বেরিয়ে গেছে। চাচ্চুরাও নেই। ছোট চাচীমণি, আর মেজ চাচীমণি রান্নাঘরে হয়তো। মা রুমে। দাদীও রুমে, রিনি খালাকে (বুয়া) দিয়ে পা টেপাচ্ছে।”

“আরমান, আর আরোহী?”

“আরোহী বান্ধবীর সাথে ঘুরতে বেরিয়েছে। আরমান ভাই বাড়ি নেই।”

“আমি এসেছি শুনেনি না এখনো কেউ?”

“না।”

“ঠিক আছে। জানাস না এখন কাউকে।”

কথাটা বলে উঠে গেলো সে। গায়ে শার্ট জড়াতে জড়াতে বেরিয়ে যেতে লাগলো।

প্রাচী তাড়াতাড়ি উঠে দাড়ায়,

“কোথায় যাচ্ছ ভাইয়া?”

একটু থেমে বোনের দিকে ফেরে সে। প্রাচীর চোখে প্রশ্ন।

“অতসীর কাছে। একটু দরকার আছে। কেউ যেন বুঝতে না পারে খেয়াল রাখিস।”

প্রাচী জেদ নিয়ে বলে,

“না, তুমি ওর কাছে যাবেনা। আমি বলে দেবো সবাইকে।”

ফারজাদ কপাল কুঁচকে তাকায়।

“থা প্প র খাবি। যা বলেছি তা কর চুপচাপ।”

“ভাইয়ায়া!” সে ডাক দিলো অবাধ্য গলায়। তবে ফারজাদ ভ্রুুক্ষেপ করেনি। চলে গেলো অতসীর উদ্দেশ্যে।

__

অতসী ব্যাল্কনিতে ছিল। রুমে এলো সে। একটু বিছানায় গা এলিয়ে দেবে ভাবলো। কিছু ভালো লাগছেনা নিবিড়ের সাথে দেখা করার পর থেকে। দরজা একটু ঠেলে দিতে সেদিকটার উদ্দেশ্যে গেলো। সে দরজার সামনে যেতেই ফারজাদও ঢুকে সামনে থেকে। বুকে নাক ঘষা খায় অতসীর। সে কি না কি ভেবে আঁতকে উঠে,

“আহ, কি এটা? কে?” বলতে বলতে যেখানটায় ঘষা খেলো সেখানে হাত দিয়ে দেখে। ফারজাদের বুক। কিন্তু শার্টের বোতাম সব খোলা হওয়ায় তার কাছে মানুষের অঙ্গ বলে মনে হচ্ছেনা। এসব তো ব্যান্ডেজ।

ফারজাদের বুকের দিকের ব্যান্ডেজে হাত দিয়েছে।

“কে বলছেন?”

“আমি। আমি ফারজাদ।”

অতসী ফারজাদ তার সামনে উপস্থিত শুনে বিস্মিত হয়। ফারজাদ ভাইয়া তো বাড়ি নেই। বড়বাবা সে এখানে আছে বলে ফারজাদ ভাইয়াকে বাড়ি ছেড়ে ফ্ল্যাটে উঠতে বলেছিল—এমনটাই তো শুনেছে।

“আপনি? আপনি এখানে কেন? বাড়িতে না ছিলেন না?”

“এসেছি মাত্র।”

শীতল কণ্ঠের কথাটা শুনে সে কিছুটা রেগে যায়।

“এসেছেন তো এখানে কেন? আমার রুমে কি? যান এখান থেকে। আপনাকে আমার আশপাশে আসতে না মানা করে দিয়েছে সবাই? তাহলে তাও বারবার আমার কাছে কি?”

“তুমি কেঁদেছ?”

নিজের কথার পিঠে এহেন প্রশ্ন শুনে চমকে যায় অতসী। হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলো তাড়াতাড়ি।

“কে বলেছে আপনাকে? আর আপনার এখানে কি কাজ আমি তো এটাই বুঝতে পারছিনা। দরজা খোলা আছে, চলে যান প্লিজ। আমার রুমে আসার সাহস করেন এখনো। বড়বাবার কাছে বলে দিলে ফ্ল্যাট থেকেও বিতাড়িত করবে দেখে নিয়েন।”

ফারজাদ কপালে ভাঁজ ফেলে নাক ফুলিয়ে কথা বলা মেয়েটিকে দেখল। রাগ নাকের ডগায়। অথচ চোখের কোণে এখনো অশ্রুরা চিকচিক করছে। নিশ্চয় নিবিড়ের কাছ থেকে ফিরে নানান ভাবনায় কেঁদেছে।

“এই সামান্য বিষয়ে কাঁঁদতে হয়? ওকে কি আমি ছেড়ে দিয়েছি নাকি? আর ঐ ছেলে নিবিড়ের সাথে একা দেখা করেছ কেন তুমি? প্রাচীকে সাথে নিতে পারো নি?”

আচমকা প্রসঙ্গবিহীন কথায় ভড়কে যায় মেয়েটা। তবে সময় লাগলেও ধরতে পারল। এতে আরও রাগ হয় তার,

“আমি কার সাথে দেখা করবো না করবো আপনি ঠিক করে দেবেন? এখনো তো আপনার সাথে আছি একা। আপনার সাথে থাকতে পারলে নিবিড় ভাইয়ার সাথে পারব না? আমি কার কাছে বেশি সেইফ সেটা আমিও জানি। নিজেও জানেন।” তিরস্কারসূচক কণ্ঠ তার। পরপর আবার বলে,

“আর এখনো এখানে কি আপনার? কতবার বলবো চলে যেতে আশ্চর্য! নাকি চিৎকার করলে খুশি হবেন?”

কিছুটা উচু গলায় কথাগুলো বললো অতসী। ফারজাদ তার খোঁচা দেওয়া কথাগুলো শুনেছে। তবে শেষে উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে শুনে দরজা লাগিয়ে দেয়, পরপর বলে,

“হুশ! আস্তে কথা বলো। এত জোরে কে কথা বলে?”

“আমি বলি, আর কীসের আওয়াজ হলো? আপনি দরজা বন্ধ করেছেন তাইনা? দরজা কেন বন্ধ করলেন? খুলুন বলছি।” বলে বুকে ধা ক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দিলো ফারজাদকে।

ফারজাদ চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। মেয়েটা খালি এই বুকেই আঘাত করে প্রতিবার, আর সে সয়ে নেয়। এবারেও সয়ে নিলো। তবে অতসী ধা ক্কা দিতে গিয়ে আবার হাতে ব্যান্ডেজের স্পর্শ পেয়ে ওখানটাই হাতরে দেখে আনমনে,

“এটা কি? এখানে কি হলো?””

“কিছুনা। তুমি ঐ নিবিড়কে অ্যাবরশন করাতে চাওয়ার বিষয়টা জানিয়েছ কেন অতসী? ওকে বলার কি দরকার ছিল?” মূলত এই নিয়ে কথা বলতেই ফারজাদ এখানে এসেছে। আনমনে অবশ্য অতসীকে দেখার তৃষ্ণাও কম না।

“কি? কি বললেন? আপনি নিজে নিবিড় ভাইয়াকে এসব জানিয়ে এখন আমার ঘাড়ে দোষ চাপাতে এসেছেন? পারেন খালি এটাই। সবেতে আমার দোষ দেওয়া। আমি কিছু করলেও আমি দোষী, না করলেও আমি দোষী। ভালো সাঁজার অভিনয় করে গেলেও, আসল স্বভাবটা বদলাতে পারলেন না।”

অতসী আদতেই ভেবেছে ফারজাদ নিবিড়কে এসব জানিয়েছে। কারণ তারা দুজন না জানালে তো নিবিড়ের এসব জানার সুযোগ নেই। ওসব নিয়ে কাঁঁদতে কাঁঁদতে এটা ভেবে ফারজাদের ওপর আরও রাগ, ক্ষোভ আসছিল তার মনে।

ফারজাদ অতসীও জানায়নি বুঝল কথা শুনে। তবে কিছু বলবে তার আগে অতসী রেগে, উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো,

“আমার দোষ দিয়ে লাভ নেই আর। মুখ বুজে মেনে নেবো না কিছু। নিজে সাঁজিয়ে গুছিয়ে এসব কাহিনী করেছেন, আবার আমায় ব্লেইম করছেন। আপনি আমার বাচ্চাকে রাখতে চান না মানলাম। আমি তো চাই! আমি ওকে নিজের পরিচয়ে বড় করবো। আপনার দরকার নেই এটা জানিয়েওছি। তাও ওকে মে রে ফেলার উস্কানি দিতে নিবিড় ভাইয়ার কানে নিয়ে গেছেন ওসব। নিবিড় ভাইয়া নিজেও এসব জানলে অ্যাবরশন করাতে সাপোর্ট করবে, আর আমি ভাইয়ার কথা সবসময় শুনি— এটা জেনে কৌশলে এমনটা করেছেন তাইনা?”

“শাঁট আপ অতসী? মাথা খারাপ তোমার? কি বুঝে কি বলছ তুমি?” কপালে ভাঁজ তার।

“তা নয়তো কি? কোথাও আমার সন্তানের ভরণপোষণ না নিতে হয় ভবিষ্যতে—এই নিয়েই আপনার ভয় তাইনা?”

“মেয়েমানুষ অগ্রিম বুঝে জানতাম। তাই বলে এতটা জানতাম না।” বিড়বিড় করে কথাগুলো বললো সে। পরপর শান্ত, সংযত কণ্ঠে অতসীকে বোঝানোর নিমিত্তে বলে,

“অতসী। এখন নিবিড়ের কথা শুনে কষ্ট পেয়ে আছ তুমি। উল্টা পাল্টা ভেবে ফেলছ। এসব অতিরিক্ত ভাবনা তোমার জন্য ক্ষতিকর এখন। রিল্যাক্স থাকো প্লিজ।”

অতসী মানলো না,

“কথা ঘুরাবেন না একদম। কাপুরুষ একটা। নিজের সন্তানের ভরণ পোষণ করতে হবে এই ভয়ে মে রে ফেলতে চাইছেন, আবার আরেকজনকে এসব শুনিয়ে কৌশলে আমায় উস্কে দিতে চাইছেন। আপনার মতো কুৎসিত মনের মানুষ আর দুটো দেখিনি। ছিঃ!”

ফারজাদ অতসীর বাহু চেপে ধরল অকস্মাৎ। আগ্রাসী গলায় কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। চোখ বন্ধ করে দম নেয়। অতসীর সাথে একেবারেই শক্ত গলায় কথা বলতে চায় না সে। বহুকষ্টে সামলে যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বলে,

“নিবিড়কে ওসব আমি জানায়নি। তুমিও জানাওনি এটা বুঝতে পারছি। কিন্তু না বুঝে আমায় দোষ দিচ্ছ তুমি। আমার সন্তানকে আমি মা রতে চাইব কেন তুমি বলো? বাবা না আমি ওর? আমি ওকে মারতে চাইব?”

“নাটক করবেন না একদম। অ্যাবরশনের কথা একমাত্র আপনি আর আমি ছাড়া কেউ জানত না। আপনাকে এক বিন্দু বিশ্বাস করিনা। আমি যে আমার বাচ্চাকে মারতে চেয়েছিলাম, এটা কোনোভাবে সবার কানে পৌঁছাতে চেয়েছেন আপনি। তারপর এটা নিয়ে সবাই আমায় ভুল বুঝবে, দোষারোপ করবে। এতেই তো আপনি খুশি। তাহলে সব কারসাজি যে আপনার এটা বুঝতে রকেট সায়েন্স লাগবে? সবসময় তো চান আমায় ভুল বানাতে সবার চোখে। এখন নাটক করছেন দেখে আমি ভুলে যাবো আপনি কেমন মানুষ? অতীতে আমার সাথে কি কি করেছেন! কিভাবে সবার সামনে কারণে অকারণে দোষ দিয়েছেন সব ভুলে যাবো?”

ফারজাদ না চাইতেও দম নিয়ে চুপ থাকল। অতসী তার কোনো কথা শুনতে প্রস্তুত নয়, শুনতেই চায়না তাকে। বুঝিয়ে লাভ হবেনা, উল্টো ওতেও এমন কোনো না কোনো অসংলগ্ন কারণ বের করে তাকে ভুল বুঝবে। অবশ্য এসব তার কারণেই। অতীতে কারণে অকারণে অপছন্দের মেয়েটিকে দোষারোপ করেছে। এখন তার প্রতি হঠাৎ ভালোবেসে ভালো, এমনকি ভালোর চেয়েও ভালো আচরণ করলে সেসবেতেও কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে ভেবে নেবে স্বাভাবিক। আজকে অতসীর তার প্রতি অতি অবিশ্বাস, আর সন্ধেহের জায়গাটা নিজেই তৈরি করে দিয়েছে।

তাই বোঝানোর কণ্ঠে ফারজাদ বলে,

“তুমি ঘুমাতে চেয়েছিলে বোধ হয় রাইট? ঘুমিয়ে পড়ো অতসী। আমি আসছি এখন।”

“এখন পালাচ্ছেন কেন? সত্য শোনার সাহস নেই? সব বুঝে গেছি দেখে পালাচ্ছেন তাইনা? দাড়ান পালাবেন না। সুসংবাদ দিই আপনাকে। আমার সন্তানকে নিয়ে কোনোদিন আমি আপনার কাছে কোনো দাবি রাখব না বুঝতে পেরেছেন? তাই এসব অহেতুক ভয় মনে পুষতে হবেনা। না তো ওকে মারার জন্য অন্য কাউকে এসবে টানতে হবে। আমি আমার সন্তানকে নিয়ে আপনার কাছে এসে কোনোদিন দাড়াব না। নিশ্চিন্তে থাকুন, আর নিজের মতো মদপানি খেয়ে খেয়ে, মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করুন গিয়ে। কেউ কোনো বাঁধা দেবেনা। এত ভয় পেয়ে ভালো সাঁজার অভিনয় করতে হবেনা।”

ফারজাদের চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে। তাও ধৈর্য ধরে সংযত করছে নিজেকে। এত ধৈর্য ফারজাদের ভেতরে আছে তা প্রথম বুঝল সে।

“শেষবারের মতো জানাচ্ছি অতসীরাণী। আমার বাচ্চাকে নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। নেই মানে নেই। একেবারেই নেই। ওর, আর তোমার ভরণপোষণ নিতে গিয়ে রাস্তার ফকির হয়ে যেতে হলেও মঞ্জুর। বিন্দুমাত্র সমস্যা নেই। আর মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করতে কবে দেখেছ আমায় তুমি?”

অতসী হালকা হাসে। তাচ্ছিল্যের হাসি। সামনে দাঁড়ানো ছেলেটার কাছে সম্মানহানী হয়েছে যে মেয়ের, সেই মেয়েকেই জিজ্ঞেস করছে মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করতে কবে দেখেছে। অতসীকে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে দেখে ফারজাদের অপমান বোধ হলো। তবে কিছু করার নেই। নিজেও ধরতে পারছে বিষয়টা।

আর ধরতে পেরেই ফের হতাশ লাগলো তার। কিভাবে যে এই ঘটনার প্রায়শ্চিত্ত করলে জিনিসটা থেকে মুক্তি মিলবে তার! ফারজাদ আপনমনে কথাটা ভেবে নিজেই আবার সংশোধন করলো।

না’

মুক্তি মেলা উচিত নয়। সে মুক্তি পেতে শত প্রায়শ্চিত্ত করলেও অতসীর জীবন থেকে এই সত্য মিটবেনা। তাকে এই কালো অধ্যায়টা গছিয়ে দিয়ে নিজে মুক্তি নেয় কিভাবে? তারচেয়ে বরং শেষ নিঃশ্বাস অব্দি এই অপমান, অপবাধ নিয়েই বাচুক সে— ঠিক যেভাবে অতসী বাঁচবে।

কিন্তু মেয়েটা সেই এক বিষয় নিয়েই লেগে আছে। সেও যে নিজের সন্তানকে ভালোবাসে, সন্তানকে চায়— তা মানতেই নারাজ।

ক্লান্ত গলায় নরম কণ্ঠে বলে,

“অতসীরাণী! এত জেদী হয়ে গেলে কেন মেয়ে? তোমার পেটে যে আছে, সে আমার অংশ। তাকে আমি ভালোবাসবো না? আমি মারতে চাইব? এটা কেন মনে হচ্ছে তোমার?”

“কারণ আপনি পাষাণ। আপনার মতো নির্দয় পাষাণ লোক আমি জীবনে দুটো দেখিনি। কিভাবে বলেছিলাম সেদিন আমায় ছেড়ে দিতে, রেহায় দি…”

“হুশ! চুপ চুপ। ওসব বলো না। দমবন্ধ লাগে এখন ভাবলে। বলো না।” দম খিচানো কণ্ঠ ফারজাদের।

“হু, লাগবে তো। অতসীর মতো মেয়ের গর্ভে কিনা আপনার সন্তান এসেছে। দমবন্ধ লাগবেনা ভাবতে? আপনি এত ভয় পান কেন? চলুন না নিজের মতো। নিজের প্রেমিকা, আর শয়নসঙ্গীদের নিয়ে থাকুন। আমার আর আমার বাচ্চার যদি দ্বিতীয় কোনো পুরুষকে দরকারও হয় জীবনে, তবু আপনার দারস্ত হবো না। বাবা-মা যদি আমায় বিয়ে দেয়, যার সাথে দেবে তাকেই বাবা ডাকতে শেখাব। আপনি এত চিন্তা…”

“এই, এই মেয়ে। কে টে রেখে দেবো একদম। অনেক বলে ফেলেছ। আগেই ভালো ছিলে দেখছি। মুখে লাগাম নেই, কিছু নেই। যা আসছে বলে যাচ্ছো।”

হাতে প্রচণ্ড জোরে চেপে ধরেছে অতসীর। ব্যাথায় মুখ নীল হয়ে এসেছে।

“ছা ছাড়ুন।”

“কাকে বিয়ে করবে তুমি? হ্যাঁ? কাকে বাবা ডাকতে শেখাবে? কি বলেছ? মুখ সেলাই করে দেবো একদম। চুপ আছি দেখে যা মন চায় বলে যাচ্ছ। মানুষ মনে হচ্ছেনা আমায়? এসেছি থেকে কি কি বলে গেছ মনে করে দেখো। এত বাঁচাল হয়ে গেলে শেষে এসে? আর তুমি দেখি বিয়ে করারও স্বপ্ন দেখো। এই তুমি নিবিড়কে ভাবো মনে মনে? ঐ নিবিড়কে নিয়ে স্বপ্ন দেখো তাইনা হ্যাঁ? ঐ শালার মে রে মুখ ভেঙে দিয়েছি আজ। পঙ্গু বানিয়ে বসিয়ে রাখবো এসব অলীক স্বপ্নে লাগাম না টানলে।”

“হাত ছাড়ুন। ব্যাথা পাচ্ছি।” থেমে বলে,

“আপনার অপরাধে আমি বিয়ে করবনা নাকি? অবশ্যই করবো। যখন বাবা-মা আমায় বিয়ে দিতে চাইবে তখন আমি একদম রাজি হয়ে যাবো।”

“ঠ্যাং ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেবো। এখন তো শুধু চোখে দেখো না। তখন ল্যাংড়া হয়ে গেলে এই আমার কাছেই এসে উঠতে হবে।”

“ল্যাংড়া হয়ে দরকারে বাপের ঘাড়ে পড়ে থাকবো সারাজীবন। তাও আপনার মতো দুশ্চরিত্রের কাছে গিয়ে উঠব না।”

“সেটাই হোক। যা চাইবে তাই হোক। স্বেচ্ছায় আমায় না চাইলে জোর নেই। তবে অন্য কাউকে নিয়ে ঘর বাঁঁধবে তা হবেনা। বাপের ঘাড়েই পড়ে থেকো সারাজীবন।”

“হ্যাঁ তাই করবো। এ বাড়িতেও থাকব না। দেশেই থাকব না। বাবা বলেছে ইউকে মুভ করবে আমাদের নিয়ে। মায়ের কথায় মানা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আর করবনা। বাবা যা বলছে তাই হবে। বাবা-মা, আর আমার সন্তানের সাথে ওখানেই কাটাবো বাকি জীবন। তখন আলগা দরদ দেখিয়ে যদি আমার বাচ্চাকে নিয়ে নিতে চান, তাহলে আমিই কে টে রেখে দেবো আপনাকে। আমার বাবুর প্রমিস। ওকে নিয়ে টানাটানি করলে আপনাকে আমি মে রে ফেলব। বুকে আঘাত পেয়েছেন দেখছি! ওখানেই গু লি নাহয় ছু রি চালিয়ে দেবো একদম।”

“তুমিই তো বারবার জখম করছ আমার বুকটা। এ আর নতুন কি!”

পরপর অতসীর বলা পুরো কথাটা খেয়াল হতেই কপালে ভাঁজ ফেলে তাকাল সে।

“ইউকে মুভ করবে মানে? এসব কে বলেছে তোমায়?”

প্রেমভুবনের অতসী পর্ব ১৮ গল্পের ছবি