প্রেমভুবনের অতসী

পর্ব - ১৭

🟢

“তোমরা এতক্ষণ কোথায় ছিলে? বাড়ি ফিরতে এত দেরি করেছ কেন?”

“হস্পিটালে ছিলাম তো। এজন্য দেরি হলো।”

“হস্পিটালে? ওখানে কেন? কার কী হয়েছে?”

অতসী, ফারজাদ— দুজনের মা-ই উত্তেজিত হয়ে উঠলো; সাথে বাকিরাও। অতসী দ্বিধায় পড়ে যায়। গর্ভপাত করানোর উদ্দেশ্যে তারা হাসপাতালে গিয়েছিল— এ কথা জানলে সবাই তাকে ভুল বুঝবেনা? তার বাবা, মা রাগ করবেনা? কিন্তু মা কিছু না লুকাতে বলেছিল।

আবার সবার মাঝে বললে তাকে নিশ্চয় দোষ দেবে প্রত্যেকে।

অতসী কী করবে দ্বিধায় পড়ে যায়। এদিকে ফোনের ওপাশ থেকে তাদের বাবা, মায়েদের একের পর এক প্রশ্ন। ফারজাদও অসুস্থ। অতসীও খুব একটা সুস্থ না। কার কী হলো! অস্থির পরিবারের সকলের মন।

ফারজাদই ফোনটা নিয়ে অতসীর হয়ে জবাবটা দেয়,

“তেমন কিছুনা। বুকে একটু আঘাত লেগেছিল আমার। ব্যাথা উঠে, তাই হস্পিটাল গিয়েছিলাম। ওখানেই সময় লেগেছে।”

ফারজাদ পুরোপুরি সুস্থ না এ কথা সকলেরই জানা। রাগে, চিন্তায় অযাচিত যে ভাবনাগুলো মাথায় এনেছিল সেসবও ভুল তা বুঝতে পারছে। কিন্তু এবারে তাকে নিয়েই চিন্তিত হয়ে পড়ে সকলে। ফারজাদ তাদের সব প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে ফোন কেটে দেয়।

“মিথ্যা বললেন কেন?”

ফারজাদ ড্রাইভ করতে করতে অতসীর কথা শুনে একনজর তাকায়। পরপর সামনে দৃষ্টি রেখে কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চাইল,

“কী মিথ্যা বলেছি?”

“আমার কারণে হস্পিটালে এত সময় লেগেছে এটা না জানিয়ে আপনার বুকে ব্যথা এমনটা কেন বললেন? আমায় বাঁচিয়ে মিথ্যা বললে আপনাকে ভালো মানুষ ভাববো ভেবেছেন?”

ফারজাদ ভ্রু কুঁচকে ফের একনজর তাকায়। তবে জবাব দিলো না। মেয়েটা একটু বেশি বেশি বুঝছে সবকিছু। গর্ভাবস্থার কারণে হতে পারে। তবে ফারজাদের মন কিছুটা ভালো এখন।

অতসী আগে তার উপস্থিতি বুঝলে পালাতো, সেই ঘটনার পর ঘৃণা করলেও ভয় পেতো তাকে, কোনো কথা সামনাসামনি সম্পূর্ণ বলার সাহস করতে পার‍তো না। আতঙ্কে ছেয়ে যেত প্রতিবার দৃষ্টিহীন চোখ দুটো। এখন ভয়, ঘৃণা, রাগ, ক্ষোভসহ যা যা অনুভূতি আছে তার প্রতি, সব প্রকাশ করে। সামনা সামনি থেকেও যে অদৃশ্য দূরত্বটা থাকতো দুজনের মধ্যে, তা আর নেই। কথাবার্তাও হতো তাদের মেপে মেপে। সে যতটুকু বলতো, আর বলাতো সেটুকুই। এখন অবিরত কত কথাই না বলে মেয়েটা তার সম্মুখে। এঁকের পর এক অভিযোগ করে যায়, ঘৃণা আর ক্ষোভ নিয়ে কতকিছু বলে।

আরও বলুক, ফারজাদের প্রতি এভাবে রাগ ঘৃণা সব পেরিয়ে একদিন ভালো কোনো অনুভূতিও আসুক। তাকে ভালো না বাসুক। অন্তত ফারজাদ তাকে ভালোবাসে, এই কথাটা বুঝুক। সব ভুল ফুল হয়ে যাক। যদি অতসী চায়।

আর না চাইলে, সে যা চায় তাই বরং হোক!

___

দুজনেে মহলে ফেরার পূর্বেই অতসীর বাবা-মায়ের কাছে সকলে জানলো, যে শীঘ্রই তারা দেশ ত্যাগ করবে। তাও স্থায়ী বসবাসের জন্য। একথা শুনে সকলে বিস্মিত। অতসীর দাদীসহ কমবেশি সকলেই নানান আপত্তি জানালেও, ফারজাদের বাবা ভাইয়ের কথা শুনে, কিছুপল চুপ থেকে পরে মেনে নিয়েছেন। সাথে বাকিদেরও আপত্তি জানাতে নিষেধ করে দেন। বাবা হিসেবে এতেই মেয়ের ভালো হবে মনে হলে তাই করুক। তাদের আটকানো মানায়না, তাও অন্তত সন্তানের দোহায় দিয়ে তো নাই।

পরিবারের সম্মানের দোহায় পেয়ে অতসীর অপরাধী বেঁচে গেছে। তারা বাঁচিয়ে দিয়েছে। ফারজাদের জায়গায় অন্য কেউ হলে নিজেরাই তো সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতো। কিন্তু নিজেরই ছেলে! বুকে পাথর রেখে হলেও আইনের হাতে তুলে দিতো যদি অন্য কোনো অপরাধ হতো। তবে যা হয়েছে, এতে ফারিশদের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। বাড়ির বাকি ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ সংকটে পড়বে। সদ্য বিয়ে হওয়া প্রিসিলার বিবাহিত জীবনে প্রভাব পড়বে। সবদিক চিন্তা করে আবার অতসীকে বলি দিয়েছে।

এতকিছুর পর মেয়েটার জন্মদাতা যদি সুন্দর জীবন দেওয়ার লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেখানেও নিজেদের স্বার্থে বাঁধা দেবে কোন মুখে? এমনকি অনাগত সদস্যকে নিজেদের কাছে রেখে দেওয়ার জেদ করাও সাজেনা এখন তাদের। তাই সবাইকে এই নিয়ে আপত্তি জানাতে নিষেধ করে যার যার মতো রুমে চলে যেতে বলেন।

দুদিন পর,

“জাদের বাবা, আপনি শফিক ভাইজানকে অনুমতি দিয়েছেন কি বুঝে? মাথা ঠিক আছে আপনার? আমাদের নাতি/নাতনি আসছে। কোথায় জাদের সাথে বিয়েটা কোনোভাবে দিয়ে ওকে ঘরে তোলার ব্যবস্থা করবেন, তা না করে এখন অতসীকে ইউকে নিয়ে যেতে অনুমতি দিয়ে দিলেন। আপনার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”

“অনুমতি? আমি অনুমতি দেওয়ার কে? ওরা শুধু ওদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। আমরা শুনেছি, সম্মতি জানিয়েছি। আর এখনো মেয়েকে সুন্দর জীবন দিতে ওরা যা করতে চাইছে তাতে আপত্তি জানানোর কথা মাথায় আনো কী করে? তোমার কুলাঙ্গার ছেলে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এতেই তো শোকর করা উচিত তোমার।”

বেডসাইড টেবিল থেকে ওষুধের পাতা নিলেন। পানি দিয়ে ওষুধ খেয়ে নিলেন কথাগুলো বলে। দুদিন যাবৎ ব্যস্ততায় ঠিকঠাক বাড়ি আসা হচ্ছিল না। আজ সময় পেয়ে ফারজাদের মা ধরেছে স্বামীকে। স্বামীর কথার প্রতিউত্তরে বলে,

“মরতে মরতে জীবন হাতে নিয়ে ফিরেছে আমার ছেলেটা, এটা কী কম মনে হচ্ছে আপনার? সেদিন আপনিও মেরেছেন তো জানপ্রাণ দিয়ে। আর কতো শাস্তি দেবেন?”

“যা প্রাপ্য তাই পেয়েছে ঐ ছেলে। কোনোকিছু একটা মেয়ের সম্মানের ঊর্ধ্বে নয়। মা হয়েছ, ছেলের প্রতি আবেগ থাকবে স্বাভাবিক। কিন্তু আবেগে এতটাও অন্ধ হইয়োনা যে নিজেও একটা মেয়ে এ কথা ভুলে যাবে।”

ফারজাদের মা বোঝানোর কণ্ঠে বলে,

“আপনি ভুল ভাবছেন। আমি এসব সাপোর্ট করছি এমন না। জাদ ভুল করেছে এটা অবশ্যই মানি। কিন্তু ও তো এখন অতসীকে ভালোবাসে তাইনা? অতসীকে এমনিতেও বিয়ে দিতেই হবে? তাহলে বাড়ির মেয়ে বাড়িতে থাকলে খারাপ কি? তার ওপর জাদ অতসীর সন্তানের বাবা। ও যখন ভালোওবাসে, তাহলে ওর সাথেই বিয়ে দিলে সমস্যা কী?”

ফারজাদের বাবা বিছানায় বসতে বসতে চোখ মুখ কুঁচকে নিলেন স্ত্রীর কথায়,

“এসব কথা দ্বিতীয়বার আমার সামনে বলবেনা সুচি। অতসীর বিয়ে একদিন না একদিন দিতে হবে এ কথা আমারও জানা। কিন্তু সেসব নিয়ে ভাবার সময় পেরিয়ে যায়নি। অতসীর এখনো এমন কোনো বয়স হয়নি যে বিয়ে না দিলে জীবনে আর কোনো গতি নেই এমনটা ভাবতে হবে। বাড়িতে ওর বড় আরও দুটো মেয়ে আছে। ও যদি না চায় তাহলে জোর করার অধিকার নেই আমাদের। আর শফিক তো বাইরে নিয়েই যাচ্ছে মেয়েকে। চিন্তা কমেছে উল্টো। এখানে থাকলেও অতসী যদি ফারজাদকে না চায়, তাহলে সন্তানসহ ওর নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। সবার কথা ভাবতে গিয়ে এমনিতেও মেয়েটার সাথে অন্যায় করেছি। ও না চাইলে তোমার ছেলের সাথে বিয়ে হতে দেবো ভাবো কী করে? বাচ্চা নিয়ে মেয়েটা নিজের মতো থাকুক, লেখাপড়া শেষ করুক। ঐ অব্দি তোমার ছেলে নিজের বাচ্চা, আর বাচ্চার মায়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারলে করুক নাহয়। অপেক্ষাতেই থাকুক ঐ ছেলে। এরপরও অতসীর মনে ওর জন্য অনুভূতি না আসলে কিছু করার নেই। ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আর কিছু করবো না।”

গায়ের পোশাক ঝেড়ে চশমা চোখে লাগালেন, উঠে বেরিয়ে যেতে যেতে বলেন,

“অবশ্য চরিত্রের যা নমুনা তোমার ছেলের, মনে তো হয়না ঐ ভালোবাসা কোনো কাজের ভালোবাসা বলে। যে বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে।”

ফারজাদের মা কপালে ভাঁজ ফেলে স্বামীর প্রস্থান দেখলো।

অতসী কী চাইছে এটাতে গুরুত্ব দেওয়ার মন ফারজাদের মায়েরও ছিল। কিন্তু মেয়েটার মধ্যে উনার ছেলের অংশ আছে। অতসী নিজের মতো জীবন কাঁটাতে ফারজাদের থেকে দূরে থাকলে, এর মধ্যে যদি অন্য কোনো পুরুষ চলে আসলে মেয়েটার জীবনে? তখন কী হবে এই নিয়েই যতো চিন্তা। ছেলেটাও এখন ভালোবাসে অতসীকে। আবার অনাগত সদস্য আছে ওর মধ্যে। অতসীর জীবনে অন্য পুরুষ চলে এলে এই লন্ডভণ্ড বিষয়টা আরও জটিল হয়ে যাবেনা? নিবিড়ের দিকটায় তো বিপদ নেই তার মায়ের কারণে। কিন্তু এর বাইরে অন্য কেউ চলে আসলেও যে সমস্যা!

ভয় হলো ফারজাদের মায়ের। ‘সুচি লি’ ভদ্রমহিলার নাম। ফারজাদের বাবা ফিরোজ মীর ফারিশ -এর সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল, পরে বিয়ে হয়। ব্যবসায় সূত্রে বিদেশ গিয়ে এই আবেগী, আর আপনজনেদের প্রতি মাত্রারিক্ত যত্নশীল মেয়েটিকে প্রেমের সম্পর্কে বেঁধে নিয়েছিলেন। সুচির লি-র পরিবার বাঙালি যুবকের সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে নারাজ থাকলেও, মেয়ের জেদের কাছে হার মানতে হয়েছিল। সেই যে বিয়ে হলো, এখন এই সংসার আর স্বামী সন্তানই যেন সুচির সব। পুরোদস্তুর বাঙালি বধূতে পরিণত হয়েছে ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে। ভাষাও পুরোপুরি আয়ত্তে। মেয়ে দুটো বাবার দিকে গেলেও ফারজাদ দেখতে শুনতে এই বিদেশিনী মায়ের মতোই হয়েছে।

ফারজাদের দাদীর আবার বিদেশিনী পুত্রবধূ নিয়ে সমস্যা ছিল। শাশুড়ির কম জ্বালাতন সহ্য করেনি বিয়ের প্রথম কয়েক বছরে। পরে ধীরে ধীরে সেসব কাটে। কিন্তু সুচি আপনজনেদের নিয়ে স্বভাব বশত একটু বেশি ভালোবাসাপূর্ণ, স্নেহশীল আর যত্নশীল। সামনে তার আপন কেউ সহ পরিচিত অন্য কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে দেখা যাবে সুচি নিজের আপনজনকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে অপরজনের অস্তিত্বই ভুলে যাবে। যা কখনো কখনো বাড়ির বাকিদের চোখে দৃষ্টিকটু, বা স্বার্থপরের মতো দেখায়। এ কারণে নানান ছোট ছোট মনোমালিন্য হতে দেখা যায়। ফারজাদ জানতো তার এই ঘটনাতেও সে যখন অতসীকে ভালোবাসে জানিয়েছে, তখন মা অতসীকে স্বাভাবিকভাবেই ফারজাদের বউ হিসেবে চাইবে। কিন্তু এমন ঘটনাতেও উনি ছেলের জন্য অতসীকে চাইলে দেখা যাবে পারিবারিক কূটক্যাচাল শুরু হয়ে গেছে মহিলাদের মধ্যে। তাই সে মাকে নিষেধ করে দিয়েছিল তার হয়ে কারো কাছে কোনো সুপারিশ করতে।

কিন্তু সুচি আজ মানছেনা ছেলের নিষেধাজ্ঞা। স্বামীর প্রস্থানের পর পরই নিজের ছোট জা-এর কাছে চলে যায়। এভাবে তো হাত গুটিয়ে থাকতে পারে না। কিছু একটা করতে হবে অতসীকে এ বাড়িতে রাখতে।

অতসীর বাবা-মা মেয়ে নিয়ে শীঘ্রই বিদেশ চলে যাবে জানার পর, সম্মতি জানিয়ে ফারজাদের বাবা যতদিন দেশে আছে এবাড়িতে থাকার অনুরোধ করেছিল। অতসীর বাবা আপত্তি জানাতে চাইলে ফারজাদের কারণে অতসীকে কোনোরকম সমস্যায় পড়তে দেবেনা এই কথা দেন, অনুরোধ করেন শেষদিনগুলো পরিবারের সাথে কাঁটানোর। তাই না পেরে মেয়েকে নিয়ে অতসীর বাবা মা থেকে গেছে।

“অস্মিতা…”

বড় জা-য়ের ডাকে ফোন কানে পেছন ফিরল অতসীর মা।

বোনের সাথে ফোনে কথা বলছিলেন রুমে বসে। ফোন কেটে স্বাভাবিকভাবে বলেন,

“হ্যাঁ ভাবি, আসুন।”

ফারজাদের মা ভেতরে ঢুঁকে।

“বলছিলাম, তোমার সাথে একটু কথা ছিল।”

অতসীর মা জায়ের চোখ দেখেই বুঝে নিলো কী নিয়ে কথা বলতে এসেছে।

তাও বলতে ইশারা করলেন।

“অস্মিতা, জাদ যা করেছে ওসবের জন্য এই অব্দি কম তো শাস্তি পেলো না। সেদিন ওর বাবা ওকে কিভাবে মেরেছিল তাতো শুনেছ। গায়ের ক্ষতগুলো ঠিক হতে না হতেই জীবন-মরণ পরিস্থিতিতে চলে গেলো। বেঁচে ফিরবে এটাতো ভাবনার ঊর্ধ্বে ছিল আমার। এতকিছু হলো! যে যা শুনাচ্ছে তাই শুনে যাচ্ছে জাদ। কতো জেদী আমার ছেলেটা! আগে হলে জীবনে এসব শোনার ধৈর্য রাখতো? সামান্য বকা দিলেও কেমন রেগেমেগে বাড়ি থেকে চলে যায়, দেশ ছেড়ে ওর গ্র্যানির বাড়ি উঠে, ভাঙচুর করে —এসব তো জানই। এখন সব নীরবে মেনে নিচ্ছে, কারণ ও অনুতপ্ত।

জানি এটা অন্যায় আবদার, কিন্তু ক্ষমা করে দাও অস্মিতা। দয়া করো একটু। ও সত্যি অনুতপ্ত। অতসী খুব ভালো মেয়ে, যথেষ্ট সুন্দরী মেয়ে।

সত্যি বলতে মোহে, বা ঝোঁকে পড়ে অনেক ছেলেই চাইবে ওকে জীবনসঙ্গী বানাতে। কিন্তু বিশ্বাস করো এই ইন্সিডেন্টের আগে এমন কেউ ওর জীবনে এলে ভালোবেসে আগলে রাখার যে সুযোগটুকু ছিল তা এখন একেবারেই ক্ষীণ। দুদিন সংসার করেই দেখবে এসব নিয়ে খোটা দেবে, আর বাড়ির অন্যান্যরা তো ওর প্রতিবন্ধকতা নিয়েও আপন করতে নারাজগি দেখাবে। এটাই এই সমাজের নিয়ম। তুমি তো র ক্তে বাঙালি। এসব আমার চেয়ে ভালো জানো।

আর যদি বিদেশী কোনো ছেলেকে মেয়ে দাও। তাহলে দেখবে অতসীর সন্তানটা মাকে হারিয়েই ফেলেছে। সাথে অতসীর জীবনটাও আরেক অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেওয়ার সামিল হবে। আমাদের পশ্চিমা দেশে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, বউ রেখে বাইরে যাতায়াত, সম্পর্ক ফাটল, ডিভোর্স —কয়েকটা ব্যতিক্রম ছাড়া এসব নিত্য। অতসী যদি বাকিদের মতো পরিপূর্ণ হতো তাহলে ভেবে দেখা যেতো। কিন্তু সহজ, সরল, চোখে দেখতে অপারগ মেয়েটা। সহজ হবেনা ভাইজান যা চাইছে ওসব।”

“দেশ ছাড়ার ইচ্ছে তো আমারও নেই। কিন্তু আপাদত ওকে বিয়ে দিতে চাওয়ার চিন্তা আমি বাদ দিয়েছি। আর ওর বাবাকেও আমি কিছু বোঝাতে চাইনা। বিশেষ সমস্যা থাকলে আপনারাই বরং বোঝান। আমি এসব নিয়ে, মেয়েটাকে নিয়ে —চিন্তা করতে করতে ক্লান্ত। পাগল হয়ে যাবো দুদিন পর। আপনারাই যা বলার বলুন ভাবি।”

সোজা কথায় প্রত্যাখ্যান। অতসীর মা জা-কে ফিরিয়ে দিলো।

সুচি যা যা বলেছেন সত্য। তাই বলে অতসী অন্ধ, আর ধ র্ষি তা হওয়ায় জীবনকে যা সুযোগ দিতে চাইবে, তাই শতভাগ ঝুঁকিপূর্ণ এমনটা নয়। চাইলে সংগ্রাম করে সুন্দর জীবন পেতে পারে। কিংবা ওর বিবাহ ভাগ্য ভালোও হতে পারে। অস্বাভাবিক না! কতো মানুষের হয়। কিন্তু সবাই যার যার স্বার্থে ওর জীবনে ফারজাদকে ছাড়া এগোতে গেলে কী কী সমস্যায় পড়তে হবে তাই জানিয়ে যাচ্ছে বারবার। এতে যে সম্ভাবনায়ময় বিষয়গুলো আছে তাও চাঁপা পড়ে যাচ্ছে।

এই তো, এই মুহূর্তে অতসীর মা জা -কে প্রত্যাখ্যান করে দিলেও, মনে মনে বেশ প্রভাবিত হয়েছে কথাগুলোতে।

ফারজাদের মা আরেকটু বোঝাতে চাইছিল। কিন্তু দরজায় কারো শব্দ করায় ফিরে তাকায় দুজনে। প্রাচী এসেছে,

“চাচীমণি, তোমার বোনের ছেলে, ঐ যে নিবিড়! সে এসেছে।”

অতসীর মায়ের কপালে ভাঁজ পড়ে।

“নিবিড়? কই মাত্র তো আপার সাথে ফোনে কথা বললাম। নিবিড় আসবে তো জানালো না।”

আপন চিন্তায় কথাটা বলে প্রাচীর উদ্দেশ্যে বলে,

“আচ্ছা চল। নিচে তোর মেজ চাচী আছে? বসতে দিয়েছিস তো?”

“হ্যাঁ, দাদীর সাথে বসেছে। গিয়ে দেখো।”

ফারজাদের মায়ের কপালেও চিন্তার ভাঁজ। খালার বাড়ি আসতেই পারে। কিন্তু এই ছেলের তো তার অনাগত নাতি/নাতনির মায়ের প্রতি নজর ভিন্ন। তাই স্বাভাবিক আসা যাওয়াও পছন্দ হচ্ছে না।

___

নিবিড়কে বসতে দিয়েছে ফারজাদের মেজ চাচী। তার দাদীর সাথে বসে কথা বলছিল। অতসীর মা গেলে খালার সাথে সৌজন্য কথা বললো সে। দাদী তাদের একান্ত কথা থাকতে পারে বুঝে উঠে এলেন। অতসীর মা, আর নিবিড় বসলো সোফায়। প্রাচী চাচীর ডাকে রান্নাঘরে চলে গেলো।

“কোনো সমস্যা নিবিড়? একটু আগে আপার সাথে ফোনে কথা বললাম। আপা তো তুই আসবি জানালো না। বাড়িতে সব ঠিকঠাক?”

“হ্যাঁ খালামণি, সব ঠিক আছে। আর এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম। ছোট খালার ওখানে ঢুকেছিলাম। আসতে সময় ভাবলাম তোমাদেরও দেখে যাই।”

“খুব ভালো করেছিস। যে কাজে এসেছিলি তা হয়েছে?”

নিবিড় সম্মতি জানায়। পরপর বলে,

“অতসী কোথায়? ও সুস্থ আছে? সেদিন সুস্থ অবস্থায় ফিরেছিল তো বাড়ি?”

“হ্যাঁ, সুস্থই ছিল। হাসপাতালে ছিল দুজনে, তাই ফিরতে দেরি হয়েছে।”

“হাসপাতালে ছিল?” ভ্রুকুটি করে, জানার আগ্রহ। কিন্তু চোখ দুটো বলছে সে জানে। তাও আবার জানতে চাইছে। এর কারণ?

অতসীর মা অতকিছু খেয়াল করেনি। প্রাচী ট্রে -তে নাশতা নিয়ে এলে নিবিড় মানা করে দিলো। কিছু খাবেনা সে। অতসীর সাথে দেখা করে চলে যেতে চায়।

অতসীর মা প্রাচীকে বললো, যেন বাগানের দিকে সিটিং লনে নিয়ে যায় নিবিড়কে।

আর নিজে গেলো মেয়েকে আনতে।

প্রাচীর সাথে নিবিড় যাচ্ছে। প্রাচী দুকদম সামনে। নিবিড় কোথাও ফারজাদকে চোখে পড়ে কি না দেখছিল। দেখা না পেয়ে প্রাচীকে জিজ্ঞেস করে,

“তোমার ভাই, ফারজাদ… সে কোথায়?”

প্রাচী পেছনে ফিরে। নিবিড়ের দিকে নজর তুলে তাকায়। ভাইয়ের কথা কেন জানতে চাইছে নিবিড় স্যার? নিশ্চয় স্বাভাবিক কোনো কথোপকথনের জন্য নয়। বিগড়ানো ব্যাপারটা নিয়েই হয়তো কিছু বলবে। বাবা, চাচা - কেউ তো একটু সুন্দর করে কথা বলেনা ভাইয়ের সাথে এখন। বাইরের মানুষও এই নিয়ে খোটা দেবে! প্রাচীর ভালো লাগলো না।

“কি হলো? কানে কম শুনো? তোমার ভাই কোথায়?”

প্রাচীর এমন রুক্ষ ভাষার বিপরীতে কড়া করে কিছু বলার ইচ্ছে থাকলেও বললো না। এঁকে তো অতিথি। তার ওপর কলেজের স্যার। নয়তো চুপ থাকতো না। সে নিম্নকণ্ঠে বলে,

“ভাইয়া বাড়ি নেই দুদিন। বন্ধুদের নিয়ে আমাদের ফ্ল্যাটে উঠেছে।”

“কারণ? শরীরে ক্ষ ত এখনো সেভাবে সারেনি এজ ফার এজ আই নো। তাহলে বাড়ি ছেড়ে ফ্ল্যাটে উঠল যে আবার?”

প্রাচীর একটা বাইরের লোককে বাড়ির বিষয়াদি জানানোর ইচ্ছে মোটেও নেই। কিন্তু জবাব না দিলে আবার বেয়াদবি হয়ে যাবে। সে না চাইতেও বলে,

“বাবা এ কদিন বাড়ি থাকতে মানা করে দিয়েছে ভাইয়াকে। চাচ্চুরা… মানে অতসী আছে তাই।”

নিবিড়ের ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট হাসি খেলে যায়। প্রাচীর কোণা চোখে তাকানোতে সেই হাসি ধরা না খেলেও, চোখ দুটোর উজ্জ্বলতা তার মনের সন্তুষ্টি বুঝিয়ে দিলো। সে ওভাবে চেয়েই ফের বলে,

“তবে একটু পর আসবে। কিছু দরকারি জিনিস ফেলে গিয়েছিল। ওসব নিতে আসবে। হয়তো এতক্ষণে চলে আসছে।”

প্রেমভুবনের অতসী পর্ব ১৭ গল্পের ছবি