“বয়স কত?”
“স সতেরো।”
“এজন্য অ্যাবরশন করাতে চাইছ? বাচ্চা নিলে তোমার ক্ষতি হবে বলে।”
অতসী জবাব দিলো না। সোনোগ্রাফার মহিলাটি অতসীর পেটে জেল লাগাতে লাগাতে বলেন,
“যতই হোক, তোমাদেরই তো সন্তান। আল্লাহ্র দেওয়া রহমত এসেছে যখন ফেলে দেওয়া উচিত না। গ্রামগঞ্জে এর চেয়ে কম বয়সী মেয়েরা মা হয়ে সুস্থ থাকে, যদি প্রপার চিকিৎসা পায়। তোমাকে তো ভদ্র, আর যথেষ্ট টাকা-পয়সাওয়ালা পরিবারের মেয়ে মনে হচ্ছে। এত কীসের ভয়!”
পরপর নিম্ন কণ্ঠে আপনমনে বলে,
“ওপরওয়ালা কেন যে জানের কদর না বুঝা এই মানুষ নামের অমানুষগুলোর কাছেই সব রহমত ঢেলে দেয়!”
অতসীর চোখের পাতা কাঁপলো। কোনো জবাব দিল না সে। বুকের কোথাও খুব ধড়ফড় করছে তার। দৃষ্টিহীন নজর এদিক ওদিক ঘুরিয়ে শুয়ে থাকে।
আল্ট্রাসাউন্ড প্রক্রিয়া শেষ হলো। রিপোর্ট দেখে অতসীকে গর্ভের বয়স, জরায়ুর ভেতরে আছে কী না সব জানানো হলো।
“তোমার অ্যাবরশন ওষুধ দিয়েই করা যাবে।” পরপর সাথে থাকা নার্সকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“এক গ্লাস পানি দিন।”
নার্স পানি এনে অতসীর হাতে ধরিয়ে দিলো।
ওষুধের বক্স থেকে ওষুধ নিয়ে অতসীর দিকে এগিয়ে দিলেন মহিলাটি,
“নাও, এই পিলটা খেয়ে নাও। আরেকটা পিল দেবো। ওটা বাড়ি গিয়ে ২৪–৪৮ ঘণ্টা পর নেবে। এর ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে কাজ হয়ে যাবে।”
একটু থেমে, কম্পিত হাতে পানির গ্লাস আর ওষুধ নিয়ে বসে থাকা অতসীর দিকে পূর্ণনজরে চেয়ে বলেন,
“তার আগে আরেকবার চাইলে ভেবে দেখতে পারো। বাইরে ওটা তো তোমার হাজবেন্ড তাইনা? তোমার অভিভাবক, তার সাথে নাহয় আরেকবার আলোচনা করো। তোমাদেরই সন্তান, নাড়ির টান। মে রে ফেলা এত সহজ?”
অপ্রাপ্তবয়স্ক অতসীর গর্ভপাত ঝামেলা ছাড়া নির্বিঘ্নে করাতে টাকা খাইয়েছে ফারজাদ। তা সচরাচর ন্যায় গ্রহণ করলেও মহিলাটি মানবিকতার খাতিরে যতটুকু বলা যায় বলছিল। তবে তার কথাগুলো শুনে অনিশ্চয়তা, ভয়ার্ত, আর দ্বিধান্বিত মনে বসে থাকা অতসী জোর কণ্ঠে হঠাৎ বলে উঠে,
“ওটা আল্লাহ্র দেওয়া রহমত হলেও পবিত্র নয়। ঐ লোকটা আমার সাথে জোর জবরদস্তি করেছে। আমার বিয়েও হয়নি। তাহলে আমি মে রে ফেলছি এটা কেন বলছেন বারবার? ফারজাদ ভাইয়া যে অপরাধ করেছে, আমার সবকিছু শেষ করে দিয়েছে সেটাও বলুন না…”
—
ফারজাদ হাসপাতালের করিডোরে চেয়ারে বসে আছে। হাঁটুতে কনুই রেখে দুই হাতে মুখ গুঁজে রেখেছে। অপারগতায় আর নিজের প্রতি রাগে চুলগুলো টেনে টেনে এলোমেলো করে ফেলেছে। কপালের ওপর ঝুলে আছে সামনের ঘন চুল। ঘনঘন শ্বাস টেনে মুখে হাত বুলিয়ে নিচ্ছে সে।
হঠাৎ চেনা কণ্ঠের ক্ষীণ আওয়াজ কানে আসতেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। র ক্তা ভ চোখ দুটোতে ধরা দিল অতসী। সে এগিয়ে আসছে। সঙ্গে কেউ নেই; একাই।
ফারজাদ নার্সটিকে টাকা দিয়ে বলেছিল, সব কাজ সম্পন্ন করে যেন অতসীকে তার কাছে পৌঁছে দেয়। যেকোনো সমস্যায় যেন সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে।
কিন্তু এখন অতসী একা। দৃষ্টিহীন চোখ দুটো নিয়ে কোথায় কীভাবে হাঁটছে, সে নিজেও বুঝছে না যেন। কান্নাভেজা মুখটা উদ্ভ্রান্ত। ফারজাদ ঢোক গিলল। মনের কোণে একটা কথাই উঁকি দিচ্ছে,
‘তার সন্তান নিশ্চিহ্ন হয়েই গেল তবে!’
বুকের ক্ষ ত বি ক্ষ ত ব্যথার সঙ্গে ভেতরের যন্ত্রটিতেও অদৃশ্য চাপ অনুভব করল সে। হাঁটু কেঁপে উঠছে, তবু উঠে দাঁড়িয়ে এলোমেলোভাবে হাঁটতে থাকা অতসীর দিকে এগিয়ে যায়। তার বাহু ধরে কাছে টেনে নেয়। অল্পের জন্য দেয়ালে ধাক্কা খাওয়া থেকে বেঁচে গেলো মেয়েটা।
অতসীকে এমন টলমল পায়ে হাঁটতে দেখে বাকি লোকজন তাকিয়ে আছে। চোখে-মুখে অশ্রু, মুখে ভাঙা ভাঙা শ্বাস, তার ওপর ফারজাদের পোশাকটাও কিছুটা র ক্তা ক্ত দেখাচ্ছে— স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল কম নয় তাদের চোখে।
মনের কোণে সন্তান হারানোর সূক্ষ যন্ত্রণা থাকলেও তা লুকিয়ে ফারজাদ অতসীকে সন্তর্পণে ধরে, কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে জানতে চাইল,
“একা এলে কেন? ওই নার্সটা কোথায়?”
অতসী সে কথায় কান না দিয়ে ফারজাদ পাশে আছে বুঝে তাকে ধরল শক্ত করে। ফারজাদ তার চোখের পানি মুছে দেয়।
“কী হলো কাঁদছ যে? ব্যথা লাগছে?” ফারজাদ বিভ্রান্ত। সে অ্যাবরশন কীভাবে, কেমন সময়ে কোন পদ্ধতিতে করায় এসব জানেনা। তবে ভেবেছিল হাসপাতালে আরও কিছুক্ষণ থাকতে হবে।
অতসীকে নিশ্চুপ দেখে ফারজাদ আবার প্রশ্ন করলো,
“অতসী, তুমি চলে এলে যে? অ্যা অ্যাবরশন হয়ে গেছে? আরও কিছুক্ষণ থাকতে হবেনা? আর হেঁটে এলে যে?”
অতসী হু হু করে কেঁদে উঠে। ফারজাদকে আরও দৃঢ়ভাবে ধরে সাহারা নিলো। সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখতে না দেওয়ায় অতসীও মনের কোথাও কষ্ট অনুভব করছে— ভেবে ফারজাদের বুকের ভেতর আরও বেশি র ক্তক্ষরণ হলো যেন। তবে অতসীর হাঁটতে-দাড়াতে কষ্ট হচ্ছে ভেবে সে ঢোক গিলে তার মাথায় হাত রেখে নরম গলায় জানতে চায়,
“কাঁদছ কেন? খারাপ লাগছে?”
পরপর পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি এখানে বসো। আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে আসি।”
অতসী তার হাত চেপে ধরল,
“যা যাবেন না… বা বা বু… আছে…”
কান্নায় কণ্ঠ কেঁপে যাচ্ছে।
ফারজাদ বুঝতে পারল না। স্নেহ মেশানো বিভ্রান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“মানে? কী বলছ? কিছু লাগবে?”
অতসী অশ্রুভেজা চোখ তুলে তাকায়। টলটলে চোখদুটোর পাতা কাঁপছে,
“আমার বাবু আছে। ওকে মারিনি আমি।”
ফারজাদের মুখের ভাব যেন থমকে গেল। স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া নেই, শুধু স্থির দৃষ্টি। সে ধীরে অতসীর পাশে বসে বলল,
“বুঝিনি অতসী… কে আছে?”
তার কানে শুধু ‘বাবু আছে… মারিনি…’ এ কথাটাই বাজছে। তাই প্রশ্নাত্মক কণ্ঠের আড়ালে অদৃশ্য এক ক্ষীণ আশা।
অতসী জানে না তারা ঠিক কোথায় বসে আছে। চারপাশের কিছুই যেন তার বোধে নেই। ক্ষণে ক্ষণে কান্নায় কেঁপে উঠছে। দুর্বল শরীর সামলাতে পারছে না। ফারজাদ তাকে ধরে রাখল নিজের বাহুতে।
অতসী কাঁপা গলায় বলল,
“আমার… আমার সন্তান… ওকে আমি মারিনি।”
চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। হাসপাতালের গুমোট করিডোরে শব্দহীন ভার। ফারজাদও নিশ্চুপ। চোখের পলক ফেলছেনা। ক্রন্দনরত অতসীকে দেখে যাচ্ছে। এর মধ্যে সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স এসে কিছু বলতে চাইলে, ফারজাদ হাত তুলে ইশারায় তাকে চলে যেতে বলল। কিছুপল নীরব থেকে অতসীর উদ্দেশ্যে মুখ খুললো,
“রেখে দিলে?”
অতসী মাথা নাড়ায়।
“আমার পাপের চিহ্ন বলেছিলে তো। তাহলে?”
মেয়েটার কণ্ঠ এবার কাঁপলেও দৃঢ়,
”আমার সন্তান নিষ্পাপ, কোনো ভুল করেনি সে। কোনো ভুল করেনি। যা করেছেন আপনি। আপনার জন্য আমি আমার বাচ্চাকে মা র ব না। কিছুতেই না।”
“তোমারও সন্তান সে?”
“হ্যাঁ। আমি, আমি ওর মা। আমি নিজের দুঃখে, নিজের যন্ত্রণায় সব ভুলে বসেছিলাম। কিন্তু… কিন্তু ও আমারও। আমার বাচ্চা। ওকে মা র তে এসেছি আমি— এটা ভেবে আমার ক কষ্ট হচ্ছিল ভীষণ। আপনার সন্তানকে মে রে ফেললে সব ঠিক হয়ে যাবে ভেবেছিলাম। কিন্তু ও তো আমারও।”
মহিলাটির বারবার বলা ‘আপনাদেরই সন্তান, নাড়ির টান- মেরে ফেলা এতোই সহজ’ এই কথাগুলো অতসীর ভেতরটা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। তার এত অনিশ্চয়তা, আর দ্বিধা জড়ানো অনুভূতি যে নাড়ির টানের কারণেই, তা বুঝতে কিশোরী অতসীর একটু সময় লাগলো। এখন পূর্ণ উপলব্দি শেষে অজানা যন্ত্রণায় কাঁদতে বসেছে হয়তো। মেয়েটা ফের বলতে শুরু করলো,
“ওখানে মেশিনে আমার সন্তানকে ঐ মহিলাটা দেখতে চেয়েছে। কিন্তু দেখা যায়নি। এখনো দেখার মতো কিছুই হয়নি ওর মধ্যে। এইটুকুন বাচ্চাটা! ওকেই তো আমি শেষ করে দিতে এসেছিলাম। কী নিষ্ঠুর আমি! আবার… আবার ওর অস্তিত্ব ঐ মহিলাটি দেখতে চাইছে বুঝে আমারও ওকে দেখার তৃষ্ণা জাগছিল। এমন কেন? এত দ্বিধা, মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আমি… আমি কী করে মারতাম ওকে? আমি পারিনি।” থেকে থেকে কেঁপে উঠছে অতসী,
“আম আমারও সন্তান সে। আমার কেমন কেমন লাগছে। সব মা তো সন্তানকে ভালোবাসে। তাহলে আমার সন্তানের ভাগ্য কেন এত খারাপ হবে? মা, বাবা সবাই কেন ওকে মে রে ফেলতে চাইবে? কেন ওকে সবাই ভালোবাসবেনা? আমি, আমি নিজের দুর্ভাগ্যের প্রতিচ্ছবি দেখছিলাম ওর মাঝে। পৃথিবীতে আসার আগেই কতকিছুর মুখোমুখি হয়ে গেলো আমার বাচ্চাটা। আমার বুকটা পুড়ে যাচ্ছে ফারজাদ ভাইয়া। আমার সন্তানকে কেন তার মা ভালোবাসবেনা? ও কোনো দোষ করেনি। আপনার জন্য ওকে আমি ভালোবাসবো না এটা কী করে হয়? ও আমার, আমি ওকে কোনো কষ্ট পেতে দিতে পারিনা।”
ফারজাদ সব শুনছে। কাঁপা কাঁপা চোখের পাতাদুটো ছলছল করছে, আর ঠোঁটদুটো অতি কান্নার ফলে লাল হয়ে আছে। তাও কতো মায়াবী দেখায়! এই রুপেও এত মোহনীয় লাগছে। তার সন্তানের মা হবে বলেই কী সবকিছু এত ভালো লাগছে আসলে, নাকি অতসীকে দেখার দৃষ্টি বদলেছে বলে এই মুগ্ধতা? দৃষ্টিতে প্রেম আছে বলেই কী অগোছালো দেখতে মেয়েটাকেও অপরুপা লাগছে? হয়তো!
মেয়েটার বয়স কম। আবেগে হুটহাঁট সিদ্ধান্ত নেওয়া অস্বাভাবিক না। কিন্তু এই পর্যায়ে সন্তানকে অনুভব করে আবার ফিরে আসবে ফারজাদ ভাবেনি।
ফারজাদের তাকে দেখা ফুরালো না, কণ্ঠে অস্থিরতা নিয়ে অতসীই আবার বলতে লাগলো,
“আমার অংশ… আমার গর্ভে বেড়ে উঠছে। আমি জন্ম দেব। তাহলে সে শুধু আপনার সন্তান হয় কী করে? বরং সে সম্পূর্ণই আমার। আপনার কোনো ভাগ নেই। আপনি চাইলেও আমি তাকে দেব না। আপনি তো আমি না বুঝে ওকে মেরে ফেলতে চেয়েছি যখন, তখনও সম্মতি দিয়েছেন। আমার বাচ্চার প্রাণ নিতে চেয়েছেন। আপনার অধিকার নেই। আমার বাচ্চা শুধু আমার! আর কারো না। কারো না।”
শরীর দূর্বল, অথচ কণ্ঠে অস্থিরতা। ভাঙা শ্বাসে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন নিজের ভেতর থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে।
নিজের অনাগত সন্তানকে সন্তানের মা এভাবে অনুভব করছে— এই উপলব্ধি হয়তো ফারজাদের বুকে জলোচ্ছ্বাসের মতো সুখের ঢেউ তুলেছে। তবু তার মুখে সেই উচ্ছ্বাসের ছাপ নেই। মুখ শান্ত, স্থির। সে নীরবে অতসীকে আগলে রাখে। অতসীর সব অভিযোগের বিপরীতে ধীর কণ্ঠে বলে,
“বাচ্চার সাথে ন্যায় করলে, তার মায়ের সাথে অবিচার। আবার মাকে ন্যায় দিলে বাচ্চার সাথে অবিচার। আমি কী করতাম?”
অতসীর চোখ ভিজে ওঠে। কাঁপা স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“তাই বলে আমার সন্তানকে মেরে ফেলতে চাইবেন?”
ফারজাদের ধৈর্য যেন এক মুহূর্তের জন্য টলে ওঠে। অতসীর বাহুতে রাখা হাতটা অজান্তেই দৃঢ় হয়ে আসলো। গলা কঠিন হলেও ভেতরে জমে থাকা ব্যথা স্পষ্ট,
“আমি ওকে মারতে চাইনি। কখনোই চাইব না।”
“তো কী আমি চেয়েছি?” অতসীর কণ্ঠ রাগে কাঁপে।
তবে কথাটা বলেই সে থেমে যায়। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসলো, কণ্ঠ নরম হয়ে ভেঙে পড়ে,
“হ্যাঁ… আমিই তো চেয়েছিলাম।”
একটু থামে সে। এবারে অস্থির দেখালো মেয়েটাকে,
“আপনি বারবার এটা মনে করিয়ে দিয়ে কী প্রমাণ করতে চাইছেন? আমি খারাপ মা? নির্দয় মা? একটু আগেও তাই ছিলাম— এটাই বোঝাতে চান? এখন যে আমি ভালোবাসছি, সেটা দেখতে পান না? সবাই শুধু আমার দোষই দেখে কেন?
ওই মহিলাটাও বলছিল আমি অমানুষ, তাই নাকি নিজের সন্তানকে মেরে ফেলছি! আপনি যে কী করেছেন তা তো সে জানেই না। না জেনেই আমায় দোষ দিল। আপনিও কি তাই করছেন? বাড়িতেও সবাই প্রতিটা ব্যাপারে আমাকেই দোষী বানায়। কেন সবাই এমন করেন? প্রতিবার…”
কথাগুলো জড়াতে থাকে। আর ফারজাদ কপালে ভাঁজ ফেলে অতসীকে বুঝতে চাইছে। কোথা থেকে কী বলছে, সে নিজেও যেন ঠিক জানে না হয়তো। মুড সুইং জনিত সমস্যা হতে পারে।
অতসী বারবার তার কাছ থেকে সরে বসতে চায়। কিন্তু দুর্বল শরীর তাকে সঙ্গ দিচ্ছে না। পড়ে যাওয়ার ভয়ে ফারজাদ শক্ত করে আগলে রেখেছে,
“আমায় এখনও এভাবে ধরে রেখেছেন কেন?” অতসী বিরক্ত গলায় বলে ওঠে। “বলেছিলাম না আপনি ছুঁলে আমার ঘৃণা লাগে? আমি ম রে পড়ে থাকলেও ধরবেন না। ছেড়ে দিন। দূরে বসুন।”
“রিল্যাক্স, এত হাইপার হইওনা। আমাদে,.....” “তোমার। তোমার বাচ্চার জন্য ক্ষতি হবে অতসী।” বোঝানোর কণ্ঠে বলে ফারজাদ।
অতসী সম্মতি জানায়,
“হ্যাঁ, আমায় একটু বসিয়ে দিন সুন্দর করে। পানি দিন। পানি খাবো। ওকেও সুস্থ থাকতে হবে তো। দূরে যান, আর পানি… পানি দিন আমায়।”
আড়চোখে তাদের দেখতে দেখতে হেঁটে যাওয়া একটি নার্সকে থামিয়ে পানি আনালো ফারজাদ। অতসীকে পান করায় স্বযত্নে। পানিটুকু খেয়ে হাতের উল্টোপিঠে মুখ মুছতে মুছতে অতসী বলে,
“আমার আর ওর কথা আসলে, ওকে হালকাভাবে নেবেন না কোনোদিন। ওকে প্রায়োরিটি দেবেন। ওকে সুন্দর জীবন দেবেন, সঠিক বিচারও ওকেই দেবেন। ওকে নিয়ে অবহেলা করবেন না। আমার সাথে ভালো হোক, খারাপ হোক। আমার সাথে আমার কিছুই না থাকুক। ওর যেন কিছু না হয়। বুঝতে পেরেছেন ফারজাদ ভাইয়া? আমার সন্তানকে একটুও অবহেলা করবেন না, অবিচার করবেন না ওর প্রতি। আমি যা কিছুর অভাব পেয়ে এসেছি ছোট থেকে, ওসব অভাব যেন আমার সন্তান না পায়। বাবা-মা, পরিবার সবার কাছে যেন ওর সমান গুরুত্ব থাকে। বুঝতে পেরেছেন? ও সবার আগে থাকবে। সবার আগে। আমারও আগে।”
অতসীর কথার মধ্যে কপাল থেকে চুল সরিয়ে দিচ্ছিল ফারজাদ। কিন্তু মেয়েটা আনমনা থেকেই তার হাত সরিয়ে দূরে ঠেলে দিলো। নিজেও সরে বসার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। ফারজাদ শ্বাস টেনে অতসীর দিকে তাকায়। কথাগুলোর প্রতিউত্তরে বলে,
“আগে পরে কম্পিটিশন করছ কেন? সে তার জায়গায়, তুমি তোমার জায়গায়।
তোমাকে নজরআন্দাজ করে এখন আর কিছু করতে মন সায় দেয়না তো অতসীরাণী। অনুশোচনা থেকে বলো, ভয় থেকে বলো, বা ভালোবাসার অনুভূতি থেকে— কবে থেকে যেন তুমি সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে এসেছ।”
অতসী ফারজাদের আপনমনে বলা সেসব কথা শুনেনি। সে নিজের ভেতরেই ডুবে আছে।
কাতর কণ্ঠে বলল,
“আমার শরীর খারাপ লাগছে। অবশ অবশ লাগছে। আমায় বাড়ি দিয়ে আসুন প্লিজ। মা বাবার কাছে দিয়ে আসুন।”
____
নিবিড়ের কথাগুলোর সত্যতা অতসীর বাবা নিজেও কোথাও না কোথাও উপলব্দি করতে পারে। তবে পালাতে চাইছে এটা কখনো সত্য না। মানুষটা মোটেও পালাচ্ছেনা। মেয়ের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে চান শুধু। পরিবারের নাম খারাপ হওয়ার ভয়ে কিছু অপারগতা, আবার ফারজাদের প্রতি সিদ্ধান্তে রাগ, ক্ষোভের আড়ালে জেদ, আর অহমিকা আছে ঠিক। তবে সেটা মেয়ের ঊর্ধ্বে না কখনো। কিন্তু এটা প্রমাণ করতে দেশেও থেকে যেতে চান না তিনি।
কাউকে কিছু প্রমাণ দেওয়ার দরকার নেই। মেয়ে উনার কাছে কী, এটা নিজেই বেশ জানেন। কাউকে প্রমাণ দিতে হবেনা। সবসময় তো ভালো সম্পর্কে থাকার চেষ্টা করে গিয়েছেন সবার সাথে। শেষে সেসবের ফল কী এসেছে তা বর্তমান পরিস্থিতিই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে যথেষ্ট। এখন কারো কাছেই নিজের স্বচ্ছতা প্রমাণের দরকার নেই। মেয়ে উনার, ভালোটাও উনিই বুঝবেন।
____
অতসীর বাবা মা মাত্র ফারিশ মহল এসে পৌঁছেছে।
ফারজাদকে দীর্ঘসময় ধরে ফোনে না পেয়ে, সে অতসীকে নিয়ে এখানে চলে এসেছে ভেবে তারাও সেই উদ্দেশ্যে বের হয় কোনো কথাবার্তা ছাড়া। বাড়ির লোকেদের প্রতি অবিশ্বাসের দরুন কাউকে একবার ফোনে জিজ্ঞেসও করেনি যে আদতে ফারজাদ অতসীকে নিয়ে মহলেই গিয়েছে কী না। কিন্তু মহলে এসে মেয়ের দেখা না পেয়ে অতসীর বাবা-মা দুজনেরই মেজাজ বিগড়ে আছে।
কাউকে কিছু না বললেও মুখাভঙ্গিতে সেই বিগড়ানো মেজাজ স্পষ্ট। ফারজাদের মা-দাদিও এই পর্যায়ে ছেলেটার হয়ে সাফাই দিতে পারছেনা। উপরন্তু তারাও ভেবেছিল ফারজাদ নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। অতসীকে সবকিছু ঠিক না হওয়া অব্দি কোনোরকম বিরক্ত করবে, বা তার কাছাকাছি গিয়ে কথাও বলতে চাইবে এমন কিছু মাথায় আনেনি। সেখানে এখন কীনা টানা এত সময় মেয়েটাকে নিজের কাছে আঁটকে রেখেছে— ভাবতে লজ্জ্বা, ঘেন্নায় তার হয়ে বলার মুখটুকু খুজে পাচ্ছেনা।
মেয়েটা হারিয়ে গেছে, সে পেয়েছে— ভালোই ভালোই দিয়ে আসবে। এটুকুই তো হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখানেও এমন নিজের কুচিন্তার দরুন ফায়দা তুলবে বুঝতে পারেনি কেউ। কত সময় কেটে গেলো মেয়েটা একা ফারজাদের কাছে!
বসার ঘরে আভিজাত্যে মোড়ানো সোফায় বসে আছে প্রত্যেকে। হঠাৎ অতসীর বাবার ফোন বেজে উঠলো। হাতে নিয়ে ফারজাদের কল দেখে কিছুটা চমকিত হলেও শক্ত চোয়ালে তা রিসিভ করে,
“চাচীমণিকে একটু নিচে এসে মেয়েকে নিয়ে যেতে বলো চাচ্চু।”
“এখন কোথায়?”
“তোমাদের বিল্ডিং এর নিচে।”
“একা?”
“উহু, আমি আছি ওর সাথে।”
রাগে কথা বের হচ্ছেনা অতসীর বাবার। শক্ত চোয়ালে শুধু বললেন,
“ফারিশ মহল নিয়ে আসো ওকে।”
ফারজাদ কপালে ভাঁজ ফেলে ফোন হাতে নিয়ে একবার তাকায়। পরপর বিল্ডিং এর ওপরে তাকিয়ে ফোন কানে জানতে চায়,
“তোমরা ওখানে? ফ্ল্যাটে নেই?”
ওপাশ থেকে অতসীর বাবার কণ্ঠের পরিবর্তে তার নিজেরই বাবার কণ্ঠ শোনা গেলো এবার,
“অতসী কোথায়?”
ফারজাদের কপালের ভাঁজ সরব হয়। চাচ্চু, চাচীমণি মহলে!! এর মধ্যে ওখানে চলে গেলো ভেবে অবাক হয় সে। অবশ্য তারা বেশ সময় নিয়েছে হাসপাতালে। সেই বিকেলে মেলায় ছিল। এখন রাত দশটার ঘরে ঘড়ির কাঁটা। অতসীর শরীর খারাপ লাগছিল, তারও বুকের ক্ষ তে র ক্তক্ষরণ হচ্ছিল। চিকিৎসা নিয়ে ফিরেছে। তাই সব মিলিয়ে বেশ সময় কাটে হাসপাতালে।
“অতসী কোথায় ফারজাদ?” বাবার দৃঢ় কণ্ঠে আবার প্রশ্নটা শুনে সে একনজর গাড়ির ভেতরে অতসীর দিকে তাকায়। পরপর উত্তর দেয়,
“আছে, গাড়িতে বসে আছে।”
“ফোন দাও তাকে।”
ফারজাদ দ্বিরুক্তি না করে গাড়ির ভেতরে সিটে মাথা ফেলে বসে থাকা অতসীর দিকে ফোন বাড়িয়ে দেয়। খেয়াল হলো সে বাড়িয়ে দিলেও অতসী দেখবেনা কিছু, নেবেওনা। তাই নিম্ন কণ্ঠে কোমল গলায় ডাকে, তারপর ফোনটা হাতে তুলে কানে ধরিয়ে দিলো,
“হ্যাঁলো!” জড়ানো কণ্ঠ তার।
“অতসী মা?”
বড়বাবার নরম গলা পেয়ে সে জবাব দেয়,
“হ্যাঁ বড়বাবা, আমি বলছি। তুমি কেমন আছ?”
“আমি খুব ভালো আছি মা। তুমি এখন কোথায় বলতে পারো?”
“ফারজাদ ভাইয়া তো বললো আমাদের বিল্ডিং এর সামনে আছি। মা এসে নিয়ে যাবে।”
“তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে আম্মু? ফারজাদ তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে? বা, আর কিছু করেছে?” সতর্ক কণ্ঠ ফারজাদের বাবার।
লাউডে না হলেও পাশে থাকা ফারজাদের কানে আসছিল কথাগুলো। সে হালকা হাসে। ওপাশে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো।
অতসী নিম্নকণ্ঠে জবাব দেয়,
“না বড়বাবা, কিছু করেনি।”
“ভয় পাচ্ছ ওকে? বড়বাবাকে জানাও, তোমায় বাজেভাবে ছুঁয়েছে? এবারে জ্যান্ত কবর দেবো প্রমিস।”
অতসী একটু দ্বিধা জড়ানো গলায় বলে,
“ভ ভয় পাচ্ছিনা বড়বাবা, কিছু করেনি আমায়, খারাপ ব্যবহারও করেনি।”
ফারজাদের বাবা আঁটকে রাখা শ্বাস ছাড়েন। বাকিরাও উনার মুখাভঙ্গি দেখে যা আশঙ্কা করেছিল তা হয়নি বুঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ফারজাদ এগিয়ে এসে অতসীর সিটবেল্ট লাগিয়ে দেয়। লুকিং গ্লাসে মায়াবী মুখখানা একনজর দেখে গাড়ি স্টার্ট দিলো।
অতসীর মা চিন্তায় মেয়ে কোথায়, কেমন অবস্থায় আছে জানতে চাইছে বারবার। তাই ফারজাদের বাবা এবারে ফোন লাউডে দিয়ে জানতে চাইলেন,
“তোমরা এতক্ষণ কোথায় ছিলে? বাড়ি ফিরতে এত দেরি করেছ কেন?”
“হস্পিটালে ছিলাম তো। এজন্য দেরি হলো।”
“হস্পিটালে? ওখানে কেন? কার কী হয়েছে?”
অতসী, ফারজাদ— দুজনের মা-ই উত্তেজিত হয়ে উঠলো; সাথে বাকিরাও। অতসী দ্বিধায় পড়ে যায়। গর্ভপাত করানোর উদ্দেশ্যে তারা হাসপাতালে গিয়েছিল— এ কথা জানলে সবাই তাকে ভুল বুঝবেনা? তার বাবা, মা রাগ করবেনা? কিন্তু মা কিছু না লুকাতে বলেছিল।