প্রেমভুবনের অতসী

পর্ব - ১৫

🟢

ফারজাদের কাছে আটকা পড়েছে অতসী। সে এখানেই ছিল। একটু সুস্থবোধ করছে বুঝে চলে এসেছে অতসীকে সরাসরি দেখতে। মা-বাবার সাথে বাড়ি ফিরেনি দেখে তারও আর ফেরা হয়নি। চোখে চোখেই রেখেছিল, হঠাৎ ঐ মেয়েগুলোর মাঝে আর দেখা যাচ্ছেনা বুঝে খুজঁতে খুঁজতে এখানটাই পেলো।

অতসী তাকে আঁটকে নেওয়া মানুষটা ফারজাদ বুঝে ঝাড়া মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়,

“ছাড়ুন, দূরে থাকুন আপনি। কোথাও শান্তিতে থাকতে পারবনা না আপনারা জ্বালায়? এখানে কী জন্যে এসেছেন? চলে যান, দূর হন সামনে থেকে। আপনাকে আমার সহ্য হচ্ছেনা।”

ফারজাদ ধা ক্কা খাওয়ার সাথে সাথে চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে নিয়েছে। বুকের দিকে চিনচিন ব্যাথায় সমগ্র শরীরে ঝিম খেয়ে থাকল কিছুপল। সে সূক্ষ ব্যাথাটুকু গিলে নেয় বহুকষ্টে। অতসীর দিকে নজর ফেলে বলে,

“তোমার সামনে আসতে চাইনি তো। কিন্তু ওদের সাথে ছিলে, হঠাৎ দেখি আর নেই ওখানে। তাই এসেছি। একা কোথায় যাবে?”

“একা ভিড়ে তলিয়ে যাবো, তাও আপনার সাহারা নেবো না। চলে যান আপনি।” জেদী, একরোখা জবাব তার।

ফারজাদ আনমনে বলে তার রাগী চেহারাটায় নজর বুলিয়ে বলে,,

“এখনো তো তলিয়েই গিয়েছ। খুঁজে খুঁজে আমি এলাম। এভাবে তলিয়ে যেখানটাই যাবে, সেখানেও সাহারা দিতে আমিই থাকবো।”

একটু আগেও মীম নামের মেয়েটা বলেছিল বাচ্চাটা সারাজীবন তার কলঙ্কের চিহ্ন হয়ে সাথে থেকে যাবে, এখন এই মানুষটাও বলছে যেখানে যাবে সেখানে তার সাথে হাজির হবে।

সবখানে।

সবখানে কেন এদের থাকতে হবে। একটু শান্তি মিলবেনা এই লোকটার জন্য? তার জীবনের সব শান্তি, আর তার সম্মান কেঁড়ে নিয়ে এখন ভালোবাসা দেখায়, যত্ন দেখায়।

“আপনার এসব ফালতু কথা আমার সামনে বলবেন না। সবাই যাতে সহানুভূতি দেখিয়ে, শাস্তির কথা না ভাবে। এজন্য ভালোবাসার নাটক সাজিয়েছিলেন তাইনা?”

ফারজাদ ব্যথিত নয়নে বলে,

“তোমার আমার ভালোবাসা উদ্দেশ্যমূলক মনে হয়?”

“তা নয়তো কী? এতদিন এসব কোথায় ছিল? যেই দেখলেন আপনার কুকর্মের কথা সবাই জেনে গেছে, ওমনি ভালোবাসার কথা বলছেন। যেন সবাই আমায় আপনার সাথে বিয়ে দেয়, আমি বুঝিনা ভেবেছেন? নিজের অপরাধ ঢাকতে ভালোবাসার মতো পবিত্র শব্দের ব্যবহার করবেন না।”

“তুমি ভুলে যাচ্ছ, সবাই সবকিছু জানার আগেও তোমায় আমি ভালোবাসি বলেছি অতসী।”

অতসী সে কথা কানে নিলো না। কিছু একটা ভাবে মুহূর্তের মধ্যে, আতঙ্কিত বদনে বলে,

“আপনি আমার কাছে আপনার…… আপনার সন্তান আছে জেনে, এসব নাটক করছেন আমায় নিজের কাছে বেঁধে রাখতে। যেন আপনার ঐ পাপের ফলকে নিজের কাছে নিয়ে নিতে পারেন তাইনা? আমি বুঝতে পারছি। আমি ভেবেছিলাম আপনি সত্যি সত্যি ক্ষণিকের মোহে আঁটকে আছেন এখনো। কিন্তু… কিন্তু না। আপনি আসলে নিজের অপরাধ ঢাকতে, আমায়সহ নিজের খারাপ কাজের ঐ চিহ্নকে নিজের কাছে নিতে এসব লোক দেখানো অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। আমি বেশ বুঝতে পারছি।”

মীমের কথাগুলো তার ভেতরটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছিল, এর মধ্যে ফারজাদের উপস্থিতি।

অতসী উদ্ভ্রান্তের মতো কথাগুলো বলে। পারছেনা কিছু একটা করে ফেলতে।

ফারজাদ তার সব কথা মন দিয়ে শুনল। অতসী আর কী কী ভাবে তাকে নিয়ে, এসব জানার ইচ্ছে ছিল তার। জেনে গেলো সে। চোখ বন্ধ করে শ্বাস টানলো। কিছু বলতে মুখ খুলবে তার আগে দৈবাৎ বুকে তীব্র আঘাত অনুভব করে চোখেমুখে একরাশ ব্যাথা নিয়ে তাকায়।

“এখনো দাড়িয়ে আছেন কেন? আপনার মতো বহুরুপী আমি চাইনা আমার জীবনে। চলে যান এই মুহূর্তে।” বুকে কাঁপতে কাঁপতে দু-চারটা কিল লাগাল সে। ফারজাদ ব্যাথায় না পেরে হাত ধরে নিয়েছে।

“অতসী, স্টপ প্লিজ। আমি তোমার সাথে কোনো নাটক করছিনা। আর প্লিজ,” কিছুটা কাতর কণ্ঠে বলে, “প্লিজ আমাদের সন্তানকে এসবে টেনো না। তোমার সাথে যা করেছি তার প্রায়শ্চিত্ত তুমি চাইলে আমি শেষ নিঃশ্বাস অব্দি দিয়ে যাবো। কিন্তু ওকে এসবে টেনো না। আই রিকুয়েস্ট!”

অতসী একরোখা কণ্ঠে বলে, “টানব, ওটা আপনারই তো অংশ। ওকে টানবই। আমি, আমি ওকে রাখব না। ও আমার অপবিত্রতার প্রমাণ হয়ে থেকে যাবে সারাজীবন, সবাই বলছে। ও আমার সর্বনাশের প্রমাণ। ওকে আমি থাকতে দেবো না। কিছুতেই না।”

“অতসী শাট আ…” ধমকে বলতে গিয়েও ফারজাদ থেমে গেলো, নিজেকে সামলে কণ্ঠ নামিয়ে বলে,

“আমি তোমায় বাসায় পৌঁছে দিচ্ছি, বাসায় গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। এখন থামো, প্লিজ অতসী। তুমি কী বলছ নিজেও বুঝতে পারছ না। একটু শান্ত হয়ে থাকো। আর আমার সাথে এসো।”

অতসী হাত ছাড়িয়ে জেদী কণ্ঠে বলে,

“আমি কী বলছি বেশ বুঝতে পারছি। আপনার বাচ্চা আমি রাখব না। আপনি বলেছেন না? যা করেছেন তার প্রায়শ্চিত্ত দিতে চান। সেদিনও তো শাস্তি চেয়েছিলেন! নিন আমি বলছি বাচ্চাটা মেরে ফেলুন। আমায় হাসপাতালে নিয়ে যান এই মুহূর্তে। এরপর যা যা করেছেন সেসবের কোনো অভিযোগ আমি আর রাখব না আপনার প্রতি।”

ফারজাদ শান্ত, দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

“থেকে যাক তাহলে অভিযোগ। সারাজীবন তোমার অপরাধী হয়েই থাকবো। তাও ওকে নিয়ে এসব ভাবনা মাথায় আনবেনা অতসী।”

“কেন আনব না? কেন কেন? বলুন কেন? আপনি এখনো সেই জেদ দেখাচ্ছেন। আপনি ওপরে ওপরে অনুতাপ দেখান, অথচ একটুও অনুতপ্ত না নিজের কাজের জন্য। হলে আপনার বাচ্চাকে আমার জীবনে চাপিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতেন না। আমার মনে পড়ে, আপনি সেদিনও বলেছিলেন যা হয়েছে ভালো হয়েছে। আপনি এসব হয়েছে বলে আমার প্রতি অনুভূতিগুলো ঠিক কীসের বুঝতে পেরেছেন।”

ঠোঁট ভেঙে আসে তার, ফারজাদ ব্যথা নিয়েও শক্ত হয়ে দাড়িয়ে শুনছে তার কথাগুলো। রাগে দুঃখে ফের তার বুকে আঘাত করে অতসী বলে,

“কেন? আপনার অনুভূতি বুঝতে আমার সম্মান বলি দিতে হবে কেন? এতই সস্তা আমার ইজ্জত? আপনার ঐ ঠুনকো ভালোবাসা উপলব্দির মাধ্যম আমার সতীত্ব? এমন নোংরা ভালোবাসা চাইনা আমার। না তো এই জগন্য অভিজ্ঞতার প্রমাণ রেখে জীবন কাঁঁটাতে চাই। আমি বাঁচতে চাই। আমার নিজস্ব জীবন চাই। আপনি, আপনার অংশ, আপনার কাজের প্রমাণ —কিছুই চাইনা আমার জীবনে। কিছুইনা।”

ফারজাদের বুকের ব্যান্ডেজ লাল হয়ে এসেছে। শার্টের ওপর তার র ক্তা ভ আভা দেখা গেলো। সে অপারগ এক করুণ দৃষ্টি ফেলে অতসীর সব কথা শুনল। ঢোক গেলায় অ্যাডাম’স অ্যাপলের নড়চড় স্পষ্ট হলো।

তার কান্নামিশ্রিত নিষ্পাপ চেহারাটা দেখে। দৃষ্টিহীন চোখ দুটোতে তাকে, আর তার সবরকম চিহ্নকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার অধম্য ইচ্ছে। অথচ তা করতে পারবেনা বলে চাঁপা ক্রোধ, নিজের ভেতরে অপারগতার দুঃখে পি ষে ম র ছে যেন। ফারজাদ আসলেই সবাই জানার আগ অব্দি এত ভয়াবহ পরিণতির কথা মাথায় আনতে পারেনি।

উহু তার নিজের পরিণতি না।

অতসীর পরিণতির কথা ভাবছে। আসলেই তো তার অপরাধের চিহ্ন অতসী কেন সারাজীবন বয়ে যাবে? ফারজাদ ভেবেছিল তার প্রতি অসীম ঘৃণা থাকলেও তাদের সন্তানকে রাখা না রাখার কথা আসবেনা।

না!

ভেবেছিল বললেও ভুল হবে।

সে আদতে এমন ভাবনা মাথাতে আনেইনি, যে এত কিছুর মধ্যে তার সন্তানের অস্তিত্ব রাখা না রাখার কথাও উঠতে পারে।

অতসী কেন? যেকোনো মেয়ের জন্য কষ্টদায়ক তার মতো মানুষদের অপরাধের চিহ্ন বয়ে যাওয়া। সে প্রাপ্য শাস্তি নিয়ে কী করবে? যদি না অতসীকে স্বস্তি দিতে না পারে?

ফারজাদ কান্নামিশ্রিত চেহারাটা দেখতে দেখতে মস্তিষ্কে নানান ভাবনা চিন্তাদের বিশ্লেষণ করে, অবশেষে নিজেকে প্রস্তুত করে কিছু জানাতে চাইবে, তার আগে ফোনে কারো কল এলো।

কাঁচা ক্ষ ততে আ ঘা ত পাওয়ায় বুকে ব্যাথা অনুভব হচ্ছে খুব বেশি। ক্রন্দনরত অতসীপানে নজর রেখে সে কল রিসিভ করল,

“জাদ? কোথায় তুই?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠ মায়ের।

ফারজাদ নির্লিপ্তে জবাব দেয়,

“আমি আছি। একটু বেরিয়েছিলাম। চিন্তা করো না।”

“চিন্তা করব না মানে? তুই বের হওয়ার মতো সুস্থ হয়েছিস? ডাক্তার বাড়িতে রেস্ট নিতে বলেছিল কয়েকটা দিন। সাবধানে থাকতে বলেছিল যেন ওখানে কোনোপ্রকার আ ঘা ত না লাগে। আর তুই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলি? একটু নিশ্চিন্তে থাকতে দিসনা কেন বাবা? এখন কোথায় তুই?” একের পর চিন্তিত প্রশ্ন তার মায়ের।

ফারজাদ সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দেয়,

“আমি সুস্থ আছি, ঠিক আছি মা। সময় হলে বাড়ি ফিরব। এত চিন্তা করো না। ফোন রাখছি।”

ওপাশ থেকে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদেরও কণ্ঠ শুনতে পেলো সে। হয়তো বাড়ি নেই দেখে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। এখনো তাকে বকাবকি করছে না জানিয়ে বেরিয়ে এসেছে বলে। সে ওসবে কান না দিয়ে ফোন কেটে দিলো।

অতসীর কাছে প্রশ্ন রাখে,

“এখন কী চাইছ? কী করতে চাও?”

“অ্যাবরশন। অ্যাবরশন করাতে চাই। আপনার বাচ্চা আমার চায় না।” তৎক্ষণাৎ সোজাসুজি জবাব তার।

ফের কল এলো ফোনে। ফারজাদ ভীষণ সহজ এক দৃষ্টিতে অতসীকে দেখছিল। চেহারা দেখে ভেতরে কী চলছে বোঝার উপায় নেই। আবার ফোন পেয়ে দূর্বলভাবে চোখের পলক ফেলে না দেখেই রিসিভ করল।

“ফারজাদ? কোথায় তুমি?” এবারে বাবার ফোন। কণ্ঠ কিছুটা গুরুগম্ভীর শুনাচ্ছে। ওপাশ থেকে তার মায়ের ক্ষীণকণ্ঠের একের পর এক ফারজাদের হয়ে বলা কথা ভেসে এলো। মায়ের কথা অনুযায়ী ফারজাদ কাছে কোথাও বেরিয়েছে, সে ওসবে নেই। সাথে অন্যদেরও নানান আওয়াজ কানে আসছে। ফারজাদ জবাব দেয়,

“আছি। বাড়িতে কোনো সমস্যা?”

“তোর চাচ্চু ফোন করেছে, অতসীকে পাওয়া যাচ্ছেনা।”

“আচ্ছা।”

“তুই কোথায়?”

“আছি, এক জায়গায়।”

“অতসী কোথায়?”

“আমার কাছেই।”

হয়তো ফোন লাউডে ছিল। ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো তার মা-দাদীর,

“ফারজাদ। কী বলছিস এসব? ও তোর কাছে কেন? কীভাবে নিয়ে গেলি? এতকিছুর পর আবার” উৎকণ্ঠা, আর ভয় তার দাদীর কণ্ঠে,”অতসীর সাথে কী করছিস তুই? ওকে ফিরিয়ে দে। কী আশ্চর্য! এতকিছুর পর আবার!!”

“জাদ এবার তোকে সামনে পেলে আমি কী করব নিজেও জানিনা সত্যি বলছি! তুই বাড়ির কাউকে এক দণ্ড শান্তি দিবিনা তাইনা? অতসী কোথায় বেয়াদব ছেলে?”

“অতসীকে কোথায় পেয়েছ? ওর সাথে কী করছ তুমি? এই মুহূর্তে ওকে ফোন দাও ফারজাদ।” বাবার শক্ত কণ্ঠের বিপরীতে ফারজাদ জবাব দিলো,

“ওকে আমি ছুঁইনি ওভাবে। এত চিন্তা করো না।”

“তোকে আমি বলেছি অতসীর সাথে কথা বলিয়ে দিতে কুত্তার বাচ্চা। শফিক ফোনের ওপর ফোন দিচ্ছে। তার মেয়ে মেলায় ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে গেছে। মেয়ের খোঁজ না লাগিয়ে সবার আগে তুই কোথায় খবর নিলো, কারসাজি করেছিস সন্ধেহ করছে। তোর মা একের পর এক সাফাই গাইল তোর হয়ে। এখন কী জবাব দেবো বলতে পারিস বেহায়া লম্পট ছেলে?”

_

“অতসী ফারজাদের কাছে আছে?”

নিবিড়ের প্রশ্নে অতসীর বাবা নজর তুলে না তাকালেও তার মা তাকাল,

“তাই তো বললো। বড় ভাবি ফোন দিয়েছিল। নয়নিকাদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে যাওয়ার পর ফারজাদ পেয়েছে ওকে। ও নাকি ওখানেই ছিল।”

“তোমার মনে হয় হারিয়ে গেছে, আর ফারজাদ পেয়েছে? এত সোজা? ওর সাজানো সবকিছু। এটাও বুঝতে পারছনা?”

“ছেলেটা অতসীকে ফলো করছিল তার মানে। নয়তো অসুস্থ শরীরে এখানে আসার তো কারণ নেই।”

“মেয়েটাকে যেতে দিয়েই ভুল করেছি।” অতসীর মায়ের আফসোসে ভরা কণ্ঠ।

নিবিড়ের মা বলে,

“নয়নিকা তো বললো দেখেশুনে রেখেছিল। হাত ধরে ধরে ছিল নাকি। একটু ছাড়তেই হারিয়ে গেলো।” চিন্তিত কণ্ঠ উনার।

নয়নিকা তার বান্ধবীদের সাহায্যে অনেকক্ষণ খোঁজাখুজি করে না পেয়ে তৎক্ষণাৎ বাড়িতে ফোন দিয়েছিল। সবাই জেনে সর্বপ্রথম বাড়িতে ফোন দেয়। শফিক সাহেব এমনিতেও ফারজাদ কোনোভাবে অতসীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে কী না! কোনোভাবে অতসীকে কথায় ভুলানোর, বা ভয় দেখানোর চেষ্টা করে কী না —এসব নিয়ে সতর্ক থেকেছেন খুব। অতসী নিখোঁজ শুনে কেন জানি সবার আগে ফারজাদের খোঁজ নিয়েছে। আর শুনল সে বাড়ি নেই। কোথায় আছে কেউ জানেনা। কিছুক্ষণ পর ফারজাদের মা ফোন দিয়ে জানালো অতসী তার ছেলের সাথে আছে, সাথে ফারজাদের কাছে থাকার আগাগোঁড়া কারণ খুব বুঝিয়ে বুঝিয়ে বললো।

কিন্তু শফিক সাহেব সেই থেকে সোফায় নীরবে বসে আছেন। সবার কোনো কথায় যোগ দিলেন না। কাউকে ফোন করে সব কাজ তাড়াতাড়ি শেষ তাগিদ দিলেন শুধু। উনার কথায় উপস্থিত নিবিড়, আর তার বাবা মায়ের কপালে ভাঁজ পড়ে। এমন সময়ে কী এমন দরকারি কাজের তাগিদ দিচ্ছে?

“আঙ্কেল? এনি আদার প্রব্লেম?”

অতসীর মা স্বামী কীসের তাগিদ দিচ্ছে বুঝতে পেরেছে, জবাবটা তিনিই দিলেন,

“আমার আর অতসীর পাসপোর্ট রিনিউ করতে দিয়েছে।”

স্বাভাবিকভাবেই নিলো সকলে কথাটা।

“পাসপোর্ট রিনিউ করতে দিয়েছি। ইউকে মুভ করব অতসী, আর তোমার খালাকে নিয়ে।”

উনার কথায় চমকিত নেত্রে তাকায় সবাই।

“ইউকে মুভ করবে মানে? এসব কখন হলো? কীভাবে। আর কেন?” হতবম্ব হয়ে জানতে চাইল নিবিড়ের মা। নিবিড় আর তার বাবাও কপালে ভাঁজ ফেলে চেয়ে আছে। অতসীর বাবা জবাব দিল,

“এখানে থাকলে অতসীর পরবর্তী জীবন খুব ডিফিকাল্ট হয়ে পরবে। এভাবেই চলতে থাকবে সবকিছু। ফারজাদ অতসীর পিছু ছাড়বেনা। তার চেয়ে বড় কথা বাচ্চারও একটা বিষয় আছে। বাচ্চার দোহায় দিয়ে ফারজাদকে এক বিন্দু ছাড় দিতে চাইনা।”

নিবিড় হঠাৎ হেসে উঠল সবার মাঝে। খানিকটা তাচ্ছিল্যের হাসি বোধ হলো। গাম্ভীর্য ধরে বসে থাকা অতসীর বাবা নত মাথাটা তুলে তাকাল। বাকিরাও অপ্রকৃতস্থ হয়ে তাকায়।

“হাসালেন আঙ্কেল। সারাজীবন ছাড়ই দিয়ে এসেছেন ঐ ছেলেটাকে। এবারে আপনাকে এত দৃঢ় দেখে ভালো লাগছিল। কিন্তু এতকিছুর পরও সেই পালাতেই চাইছেন। না হেসে পারলাম না।”

“নিবিড়? এসব কী বলছিস?”

মায়ের প্রশ্নে আবার ক্ষীণ হাসলো সে।

“নিবিড়? বেয়াদবি করিস না।” বাবার ধমকে সে ক্ষমা চায়।

“সরি, কেন জানি হাসি পেলো। আ’ম ভেরি সরি।”

অতসীর মা বিভ্রান্ত চোখে বোনপোকে দেখছে। শফিক সাহেব নিবিড়ের কথাগুলো শুনে সবাইকে থামিয়ে দিলেন,

“তোমার কেন মনে হচ্ছে যে আমি পালাচ্ছি?”

“পালাচ্ছেনই তো। মনে হবেনা? কত দৃঢ় আছেন বলে দেখাচ্ছেন ওপরে ওপরে। অথচ মেয়ের অপরাধীর শাস্তি কনফার্ম না করে বিদেশ পালাচ্ছেন।”

“সোজাসুজি বলো কী বলতে চাও।”

“বলতে অনেক কিছু চাই। আপনি শুনতে পারবেন কী না সেটাই বড় কথা।”

তার মা ফের ধমক দিলেও অতসীর বাবার অভয়ে নিবিড় বলে,

“আপনার ওপর আমার ভীষণ রাগ লাগে আঙ্কেল। ট্রাস্ট মি ভীষণ রাগ লাগে। আপনার ভালোমানুষী দেখানোর যে স্বভাব? এটার জন্য। সেই দৃষ্টি হারানোর পর থেকে ওবাড়িতে ফারজাদ ছেলেটা অতসীকে অপমান করতো নানান ভাবে। আপনাদের ছেলে সন্তান না থাকায় সবাই ভালোবাসা দেখালেও কোথাও না কোথাও যে অবহেলাও ছিল— এটা তো এখন আপনিও বুঝতে পারেন। তখন সবেতে এত নীরবতা দিতেন মানা যায়। কিন্তু অতসীর সেই দূর্ঘটনার পর যখন এই ফারজাদ ছেলেটা ওকে এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো, যখন তখন যা তা নিয়ে অপবাধ দিতো। তখনও ভালো সেজে সব উপেক্ষা করে গেছেন। আমি কতবার চোখের সামনে অন্যায়ভাবে ফারজাদকে অতসীর প্রতি খারাপ আচরণ করতে দেখেছি। আমি বাইরের মানুষ তাই কিছু বলিনি কখনো। কিন্তু আপনি কেমন বাবা? কখনো আপনার মেয়ের প্রতি ওসব ব্যবহারের বিরুদ্ধে শক্ত আওয়াজে কথা বলেন নি। ওরাও এটা ওটা বলে, ফারজাদকে লোক দেখানো ধমক দিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে প্রতিবার, আর আপনিও মেনে নিয়েছেন। এভাবেই তো এখন যা ঘটছে সেসবের সাহস জুগিয়েছেন নীরবে। ফারজাদকে এই কাজ করার সুপ্ত সাহসটা আপনি এভাবেই দিয়েছেন সবকিছু মেনে নিয়ে নিয়ে। আমি দেখেছি খালামণির ওদের কোনো ব্যবহার, কোনো বিষয়— খারাপ লাগলেও কখনো মুখে সেটা বলেনি। আপনার ভয়ে। আপনি বকেন এমনটা নয় হয়তো। কিন্তু খালামণিকে কখনো সবকিছু আপনার কাছে নির্দ্বিধায় জানানোর মতো সাহসটাও দেননি। বিশেষ করে এই পারিবারিক ম্যাটারগুলোতে। আপনাকে কিছু জানালে আপনি বাড়ির লোকেদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চায়, কান ভারি করতে চায় ভাববেন বলেই হয়তো চুপ থাকতো। কী জানি! আপনাদের ব্যাপার।

কিন্তু এই যে আজও ফারজাদের শাস্তি নিশ্চিত না করে পালাচ্ছেন। এটা লিমিট ক্রস মনে হচ্ছে। আ’ম ভেরি সরি, বাট আপনার মতো বাবা কারো না হোক আঙ্কেল।”

“নিবিড়? চুপ কর। এসব কী কথা? বেশি বলে ফেলেছিস।”

“তোর আঙ্কেল ফারজাদের শাস্তি ওদের বাড়ির লোকেদের হাতে তুলে দিয়েছে নিবিড়।”

“হাহ? সিরিয়াসলি? এই কথাটা বলেই সব মাফ? মানে এখানেই ইস্তফা নিয়ে নিলো আঙ্কেল? সব দায়বদ্ধতা শেষ এখানেই। তবে এটা সুন্দর উপায় ঘাড় থেকে দায় নামানোর। মানুষের চোখে সহজে ধুলো দেওয়া যায়। আপনি সাকসেসফুল আঙ্কেল।”

“তো তোমার কী মনে হয়? আমি ঠিক কী চেয়েছি?” শান্ত কণ্ঠেই জানতে চাইল অতসীর বাবা।

“আপনিই ভাবুন না আঙ্কেল। নিজেই ভেবে দেখুন। আপনি আসলে অন্য কারো কাছে কিছু প্রমাণ করছেন না। নিজের কাছে প্রতিটি কাজের ভালো সংজ্ঞা দাড় করিয়ে সৎ থাকতে চাইছেন। অথচ আপনার পদক্ষেপে যে কোথাও না কোথাও ভুল আছে, এটা আপনিও জানেন।”

শফিক সাহেব একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেন নিবিড়ের দিকে। জবাব দিলেন না।

“কী? কিছু মাথায় আসছেনা এখনো? আপনি আসলে নিজেই চান না ফারজাদের বিশেষ শাস্তি হোক। কারণ ঐ যে, নিজের বংশের নাম খারাপ হবে— এই ভয় আপনার মনের কোণে খুব সুন্দরভাবে বাসা বেঁধে আছে। মানুন, আর না মানুন। এটাই সত্যি। সাথে হয়তো মেয়ের বিষয়টাও লোকমুখে চলে আসার ভয়ও আছে। সে যাক, আপনি আপনার বাড়ির লোকেদের হাতে শাস্তির দায়িত্ব তুলে দিলে বিশেষ কোনো শাস্তি পাওয়া হবেনা ফারজাদের, আর যায় হয়ে যাক কিন্তু বংশের সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকবে, ওরাই রাখবে— এটা জেনেই দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন। এতদিন মনে হতো শুধু। আজ সবকিছু থেকে পালিয়ে যেতে চাইছেন শুনে আর কোনো দ্বিধা রইল না। আসলে আইনি নিয়ম মেনে ফারজাদের শাস্তি হোক, এটা আপনিও চান না। এদিকে মেয়েকেও ভালোবাসেন। যা হয়েছে সেসবও মেনে নিতে পারছেন না। সব মিলিয়ে ফারজাদকে মেনে না নেওয়ার যা যা ভাবনা আপনার? এসবও জেদ, বিশ্বাস করুণ আঙ্কেল! এটাই সত্যি।”

প্রেমভুবনের অতসী পর্ব ১৫ গল্পের ছবি