অতসীর মা সেদিনের পর থেকে নানানভাবে স্বামীকে মানানোর চেষ্টায় আছে, যেন দেশের বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদলে নেয়। কিন্তু আরও দু-চারদিন কেটে গেছে, এখনও অব্দি তেমন কোনো লাভ হয়নি।
এত এত ঘটনার পর আবার এতদিন ঘরবন্দি থাকায় মানসিকভাবে অবসাদ, আর বিষণ্ণতা কাজ করতে পারে অতসীর মধ্যে। মন সুস্থ না থাকলে শরীরের শক্তিও কোথাও না কোথাও ম্লান হয়ে পড়ে। যা শুধু তার জন্য না, অনাগত সন্তানের জন্যও ক্ষতিকর। তাই ছুটির দিন হওয়ায় মেয়ে, আর স্ত্রীকে নিয়ে বের হয়েছেন শফিক সাহেব। অতসীকে নিয়ে স্বামী স্ত্রীর এমন ছুটির দিনগুলোতে ঘুরতে বের হওয়ার অভ্যাস আগে থেকেই আছে। যেহেতু পরিবার থেকে দূরে থাকে, তার ওপর মেয়ে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, নানান ঝঞ্ঝাট আর তুচ্ছ তাচ্ছ্যিল্য থেকে অনেক সময় চাইলেও বাঁঁচাতে পারেনা— তাই তাকে নিজেদের মতো যথাসম্ভব সুস্থ, সুন্দর জীবন দেওয়ার চেষ্টায় থাকে তার বাবা-মা। মেয়েকে খুব করে আগলে রাখে। একটা মাত্রই সন্তান। খাইয়ে দেওয়া, চুল আঁচড়ে দেওয়া থেকে, কী পোশাক পড়বে— এসবও মা ঠিক করে দেয়।
অতসীর মা সেদিন যেমনটা বলেছিল— বাবার ছায়া, আর মায়ের আঁঁচলই তার নিরাপদ স্থান; আসলেও তাই। এই দুটো মানুষ ছাড়া অতসী অচল; অস্তিত্বই নেই তার।
“মা। ঝাল আরেকটু বাড়িয়ে দিতে বলো।”
মেয়ের কথায় নাক কুচকালেন অতসীর মা। কাঁধের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে মেয়ের মুখে সাবধানে ধরেন। খাইয়ে দিতে দিতে বলেন,
“আরে কীসের জন্য ঝাল? হু হাঁ করে নাকের পানি চোখের পানি এক করে কাঁদতে বেশি ভালো লাগে তাইনা?”
অতসী পানিটুকু ঠিকমতো খেয়ে মায়ের আঁঁচল হাতড়ায়, ওটা টেনে গালের পাশটা মুছতে মুছতে বলে,
“ওভাবেই তো খেতে মজা লাগে। আরেকটু ঝাল দিতে বলো না মা! প্লিইইজ! শেষে ভেলপুরি খেয়ে নেবো। আর ঝাল লাগবেনা। ঝাল ফুঁচকা খেয়ে ভেলপুরি খেতে কী যে মজা!”
অতসীর মা আরেকটা ফুঁচকা নিয়ে মেয়ের মুখে পুরে দিলেন স্বযত্নে। কপালে ভাঁজ ফেলে বলেন,
“কোনো ভেলপুরি টেলপুরি হবেনা। ফুঁচকা খেয়ে আইসক্রিম। তারপর আরেকটু ঘুরেফিরে সোজা বাসায়। অনেক ঘুরেছ আজ।”
“না, ভেলপুরিও খাবো। আমি কিন্তু বাসায় থাকতেই বলেছিলাম ফুঁঁচকা, ভেলপুরি দুটোই খাবো। বাবা কথা দিয়েছিল দুটোই খেতে দেবে। এখন পল্টি নিলে আমি বাসায় ফিরব না বলে দিচ্ছি।” জেদী কণ্ঠ তার। অতসীর মা মৃদু ধমকে বলে,
“সামনের বার খাবে ভেলপুরি। একসাথে এতকিছু না। পেট খারাপ করবে অতসী। ফুঁচকা খেয়ে আইসক্রিম শুধু।”
“বাবাআআ? বাবা কোথায়? আমি দুটোই খাবো। নইলে কিন্তু ফিরব না।”
“তোর বাবা আইসক্রিম আনতে গেছে। জেদ করিস না। মাইর দেবো কিন্তু আমি।”
অতসী তাও বাবাকে ডাকার জেদ করে। বাবা এলে যেকোনোভাবে খেয়ে নিতে পারবে সে। আর হলোও তাই। অতসীর বাবা আইসক্রিম হাতে মেয়ে, আর স্ত্রীর কাছে আসতেই অতসী বাবার কাছে ভেলপুরি খাওয়ার বায়না ধরে। বাসায় থাকতে কথা দিয়েছিল —এও মনে করিয়ে দেয়।
শফিক সাহেব মানা করলেন না। ভেলপুরি খেতে দিলেন মেয়েকে। সাথে আইসক্রিমও খেলো অতসী। ফিরতে সময় মা, মেয়েকে গাড়িতে রেখে বাসার দরকারি কিছু জিনিস নিতে গিয়েছিল অতসীর বাবা।
অতসী, আর তার মা তখন গাড়ির ভেতর বসে নানান কথা বলছে। গাড়িটা রাস্তার ধারের একটা গাছের নিচে ছায়ায় দাড় করানো। কেউ এসে গাড়ির গ্লাসে হাত রেখে খোলার জন্য ইশারা করে বাইরে থেকে। অতসীর মা গাড়ির গ্লাস নামাতেই বোনের মেয়ে নয়নিকার দেখা পেলো।
“নয়নিকা যে! কোথা থেকে এলি?” কথাটা বলে দরজা খুলে দিলেন। নয়নিকার সাথে তার চার-পাঁচজন বান্ধবীও দেখা যাচ্ছে। সে জবাব দেয়,
“আমরা ঘুরতে বেরিয়েছিলাম খালামণি। ওপাশ থেকে তোমাদের গাড়ি দেখে এলাম। তোমরা এখানে? অতসীও তো আছে দেখি। কেমন আছিস অতসী?”
অতসী জবাব দিল। কথাবার্তা বললো দুজনে। তার মা বলে,
“আমরাও একটু বের হয়েছিলাম। অতসীকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাত্র গাড়িতে বসলাম। তোর আঙ্কেল কিছু দরকারি জিনিসপত্র আনতে গেছে। এখন কী বাড়ি ফিরবি নাকি? তাহলে চলে আয়, একসাথে ফিরি নাহয়।”
“না না, আমাদের আরও ঘোরাফেরা বাকি।” পরপর বলে, “বলছিলাম অতসীকে আমাদের সাথে দাও নাহয়। বাজারের শেষ মাথার বড় মাঠে মেলা বসেছে। ওখানেই যাচ্ছি সবাই। ওকেও দাও নাহয়। ঘুরে আসি।”
“না নয়নিকা। তোরাই বরং ঘুরে আয়। আজ ওকে নিয়ে অনেক তো ঘুরলাম। অন্য একদিন আবার বের হবো ওকে নিয়ে। তখন মেলাতেও ঘুরিয়ে আনব।”
অতসীর মা মানা করে দিলো। মেয়েকে একা কোথাও পাঠাতে চান না। নয়নিকা সামলে রাখবে জানে। তবু মেলায় গিয়ে ওকে পাহারা দেওয়া ঝামেলার কাজ হবে তাদের জন্য। তার ওপর নয়নিকা অতসীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছু জানেনা, তাই সে অতঃসত্তা এ কথাও অজানা তার। কারণবশত তার ভাই, আর অতসীর এনগেজমেন্ট স্থগিত হয়েছে— এটুকুই জানে ব্যাস।
অতসীর অবাধে চলাফেরা ঠিক হবেনা। তাই তিনি সুন্দরভাবে মানা করে দিলেন।
নয়নিকা বলে,
“আরে মেলা অতোদিন থাকবে নাকি? আঙ্কেল ছুটি পাবে সামনের সপ্তাহে। মেলা উঠে যাবে পরশুদিন। তুমি অতসীকে আমাদের সাথে দাও। দেখো ওরও যেতে ইচ্ছে করছে। আমি ওকে দেখে রাখব। অতো চিন্তা করো না। আর আমাদের ঝামেলা হবে এই চিন্তা বাদ দাও তো! অতসীকে নিয়ে আমার কোনো ঝামেলা হয়না। চিল!”
অতসীর মা মানা করতে চাইলেও ভাগিনির জোরাজুরি, আর মেয়ের চোখেমুখে চাঁপা আগ্রহ দেখে না করতে পারলেন না। এর মধ্যে অতসীর বাবাও চলে এলো। তাকেও একইভাবে বুঝিয়ে অতসীকে সাথে নিয়ে গেলো নয়নিকা।
ছুটির দিনগুলোতে তারা বান্ধবীরা মিলে প্রায়সময় এমন ঘুরতে বের হয়। আজও প্রতিবারের ন্যায় বের হয়েছে। তাদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে অতসীকে ফের যেতে হলো আরেকটা ফুঁচকার দোকানে। সবাই জোরাজুরি করলেও এবারে আর কিছু খেলো না সে। একা মা-বাবার সাথে থাকলে যতটা স্বতঃস্ফূর্ত দেখায় তাকে, তেমন অন্য কারো সাথে থাকলে হয়না। বাবা-মায়ের কাছেই তার সব জেদ, বায়না আর আবদার। তার ওপর অবচেতন মন আজেবাজে খাবার বেশি খেলে তার সাথে সাথে আরও একজনের ক্ষতি হতে পারে —এই সংকেত দিচ্ছে।
সেখান থেকে মেলার দিকে গেলো তারা। ঘুরেফিরে ঠিক করল নাগরদোলনায় চড়বে। কিন্তু বিপত্তি অতসীকে নিয়ে। অতসী দুই খালাতো বোন নম্রতা, নয়নিকা, আর খালাতো ভাই নিবিড়ের সাথে ঘুরতে বের হয়ে আগেও নাগর দোলনায় চড়েছে। আজও নয়নিকা তাদের সাথে নাগর দোলনায় চড়াতে চাইল। ভয়ার্ত অতসীকে কোনোরকম মানিয়ে, গন্ডোলাতে উঠে গেলো সাবধানে তাকে ধরে ধরে। নয়নিকার চার বান্ধবী একটাতে, আর অতসীসমেত সে আরেকটা বান্ধবীকে নিয়ে অন্য গন্ডোলাতে উঠেছে। কিছুক্ষণ কেটে গেলেও চালানো শুরু করছেনা দেখে অতসী জানতে চাইল,
“এতক্ষণ লাগছে কেন আপু?”
নয়নিকা এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে,
“আরও দুটো ছেলে উঠতে চাইছে হয়তো। কোথায় বসবে ঠিক করতে পারছেনা।”
সে বলতে না বলতে দোলনা পরিচালক লোকটা সেই দুই ছেলেকে নিয়ে তাদের গন্ডোলার দিকেই এগিয়ে এলো।
“আপা, আপনারা তিনজন তো একসাথে তাইনা?” নয়নিকাদের দিকে ইশারা করে বলে,
“আপনারা তিনজন একসাথে যখন এক সারিতে বসেন দয়া করে? তিনজনেই চিকন পাতলা আছেন, একসাথে বসলে সমস্যা হবেনা। তারপর এনারা এখানে বসতে পারবেন।” পাশের দুই ছেলের জন্য জায়গা করে নিচ্ছে। নয়নিকা তাদের চিকন পাতলা বলায় ভ্রু উচিয়ে তাকায়, তবে কথা বাড়াল না। বান্ধবীর দিকে ফিরে বলে,
“তুই এখানে চলে আয়। এদিকে বসি সবাই।”
নয়নিকার বান্ধবী চলে এলো। সেই দুজন ছেলে উঠে বসে। নয়নিকা, আর তার বান্ধবী চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে সুদর্শন দেখতে পুরুষ দুটোকে। যদিও মুখে মাস্ক থাকায় চেহারা দেখা যাচ্ছেনা। তবে পোশাক-আশাক, আর গায়ের গড়ন, চুলের কাট— এসব দেখে তো ভদ্র, আর ব্যক্তিত্ববান পুরুষ বলেই মনে হচ্ছে। নয়নিকা বিরবির করে ওপরনিচ চেয়ে বলে, “ছাপড়ি ছাপড়ি ভাব তো নেই! তাহলে মেয়েদের মতো নাগর দোলনায় কী কাজ? সাথে প্রেমিকা, বা বউ থাকলে নাহয় একটা কথা ছিল।”
আড়চোখে চেয়ে চেয়ে এসব ভাবে সে। বান্ধবীর সাথে চোখে চোখে সুদর্শন দেখতে পুরুষ দুটোকে ইশারা করে দেখাল স্বভাব বশত।
অতসীর বাহু আগলে শক্ত করে ধরল নয়নিকা, অতসীকেও গন্ডোলার কোথায় কোথায় ধরতে হবে হাত দিয়ে ধরে ধরে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিল।
দোলনা ‘ঘেরঘের’ শব্দ করে আস্তে আস্তে চলতে শুরু করেছে। একেকজনের মৃদু স্বরের চিৎকার কানে আসতে লাগলো। সময়ের সাথে সাথে যখন জোরে চলতে শুরু করে, আর প্রতিবার পাঁক খেয়ে ওপর থেকে নিচে নামে তখন— বাচ্চা, আর মহিলাদের চিৎকারে কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়। চারপাশটায় মেলার আমেজ ছড়িয়ে যায়।
অতসী বাকিদের মতো চিৎকার করছেনা। তবে দৃষ্টিহীন চোখ দুটো বাতাসের তাড়নায় একবার খোলে, আবার আবার বন্ধ করে। বাকিদের মতো স্বচক্ষে অনুভব করতে না পারলেও ওপর থেকে নিচে নামার সময় পেটের ভেতর যে শূন্যতার অনুভূতি পাচ্ছে, আর ঠিক ঐ সময়েই বাকিদের চিৎকার, চেঁচামেচির আওয়াজ কানে আসছে— তাতেই সে সবটা বুঝতে পারছে।
জড়সড় হয়ে বসে থাকে সে। মাঝে মাঝে বিরবির করে কিছু উচ্চারণ করে আনমনে। নয়নিকা, আর তার বান্ধবী অনবরত আওয়াজ করছে। চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে ওপরওয়ালাকে জপছে বাকিদের মতো, অথচ মুখে হাসি, আর চোখে ভয়-আনন্দ।
মাঝামাঝি সময়ে গতি খুব বেশি ছিল। ওপর থেকে নিচে নামতে সময় অতসী এবার আতঙ্কে অজান্তেই যেন কেঁদে দেবে।
“আপু, আর কতক্ষণ লাগবে। থামিয়ে দিতে বলো এবার।” সঙ্গে সঙ্গে আরেক চক্কর শেষে ওপর থেকে নিচে নামল দোলনা। অতসীর মনে হলো আকাশ থেকে তাকে ছুড়ে ধরণীতে পাঠিয়ে দিয়েছে কেউ।
সবাই চিৎকার করে উঠে। নয়নিকা অতসীর কথা শুনল না। নিজের খেয়ালে উপভোগ করছে সে। তবে অতসীকে ধরেই রেখেছে।
অতসীর মাথা ঘুরছে এবার। গন্ডোলার কাঁপুনি, মানুষজনের কোলাহল, আর হঠাৎ হঠাৎ পেটের ভেতর শূন্য শূন্য লাগা— সব মিলিয়ে আর পারছেনা সে। কম্পমান কণ্ঠে ফের কিছু বলতে চাওয়ার আগে নিজেরই পোশাক খামচে ধরা হাতে অন্য এক হাতের অস্তিত্ব পেলো। সেই হাতের ধীর স্পর্শ তাকে আশ্বস্ত করছে কিছু হবেনা। আতঙ্কিত অতসীর কানে চারপাশের কোলাহল যেন অনেক দূর থেকে আবছা আবছা শোনা যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে হাতটা তাকে স্বান্তনা দিচ্ছে। অতসী এমন সময়ে কারও কাছে আশ্বস্ত ইঙ্গিত পেয়ে, কম্পিত হাতে শক্ত করে ধরল নিজেও। এভাবে হয়তো আর দুপাক গেলো মাত্র। পরপর ধীর হয়ে আসে। মানুষের চিৎকারও কমতে লাগল, চারপাশটা শান্ত হলো। অতসীর মনে হলো সে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে।
নেমে গেলো তারা। একপাশে গিয়ে দাড়ায়।
“স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাক সবাই। নইলে মাথা ঘুরাবে।” মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় তারা।
“অতসী তুই ঠিক আছিস?” নয়নিকার কথায় অতসী মাথা নাড়াল। হাসছে সবাই নিজেদের অনুভূতি জানিয়ে জানিয়ে।
“আমার এখনো মাথা ঘুরছে।”
“ভাই তোরা ঠিকঠাক এঞ্জয় করতে পেরেছিস। আমাদের কোঠায় দুটো ছেলে ছিল। এদের সামনে চিৎকার করতেও লজ্জ্বা লাগে, আবার পোশাক-আশাক উড়ে যাচ্ছে ভয় লাগে।”
“সেইম দোস্ত। আমি তো সামনে ফিরে তাকায়নিও একবারের জন্য। অতসীকে শক্ত করে ধরে অন্যপাশে চেয়েছিলাম।”
“আর ছেলে দুটো নিজেদের মধ্যে দুয়েকবার কথা বলেছে শুধু। পুরো সময় নীরব ছিল। ভয় লাগেনি বোধ হয়। আমার তো ওপর থেকে নিচে নামার সময় জান বেরিয়ে আসতে চাইছিল কসম।”
নানান কথাবার্তা চলে তাদের। শরীরের কম্পন থেমেছে মনে হলে, তারা গেলো একপাশে বিভিন্ন ছুড়ি, কানের দুল, ঝুমকাসহ মেয়েদের বাহারি অলংকারের দোকানগুলোর দিকে। সবাই একেকটা দেখছে। অতসী সবার মধ্যে আছে। নয়নিকার বান্ধবী মীম জানতে চাইল,
“নয়নিকা? ও তোর বড় খালার মেয়ে নাকি ছোট খালার?”
নয়নিকা হাতে নেওয়া ঝুমকা জোড়া দেখতে দেখতে জবাব দেয়,
“অতসীর কথা বলছিস? ও আমার মেঝ খালার মেয়ে। আমার মা তো সবার বড়।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বড় বলতে ওটাই বোঝাতে চাইছি। ও কী ঐ যে ফারিশরা? ওদের মেয়ে? তোর মেঝ খালা না ফারিশ বাড়ির বউ? নাকি ছোট খালা?”
“হ্যাঁ, মেজ খালা-ই। অতসী হচ্ছে ফারিশদের সবচেয়ে ছোট মেয়ে। অতসী ফারিশ।”
মীম মাথা নাড়াল। একবার পেছন ফিরে অতসীর দিকে তাকায়। তাকে যেখানটাই দাড়িয়ে থাকতে বলা হয়েছে ওখানেই দাড়িয়ে আছে লক্ষী মেয়ের মতো। নয়নিকার বান্ধবী ধীরে তার কাছে এলো,
“অতসী? চুড়ি নেবে?” বলে সে নিজেই হাত ধরে ছুড়িগুলো পড়িয়ে দিল।
অতসী হাতে ছুড়ির অস্তিত্ব অনুভব করে কিছু বলতে যাবে তার আগে মীম বলে,
“হ্যাঁ জানি বাড়িতে তোমার অনেক চুড়ি আছে। ঐগুলো থাক নিজের মতো। তুমি আজ এগুলো পড়ো হাতে।”
অতসী হেসে সম্মতি জানালো। মীম তার দিকে চেয়ে থাকে কিছুপল। নয়নিকাদের দিকে পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে সাবধানের সহিত বলে,
“অতসী? তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব সত্যি সত্যি জবাব দেবে?”
অতসী কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে যায় এ কথায়। আজই তো পরিচয়, এর মধ্যে কী এমন গোপন কথা জানতে চাইবে যে এভাবে বলছে? কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও অসম্মতি জানাল না।
“হ্যাঁ, বলুন আপু। জানলে অবশ্যই বলন।”
“শুনেছি তোমার সাথে নাকি খারাপ কিছু হয়েছে। বলতে চাইছি তুমি নাকি প্রেগন্যান্ট? এটা কী সত্যি?”
দৃষ্টিহীন অতসীর অন্ধকার জগতটা ধা ক্কা খেয়ে নড়ে উঠেছে মনে হলো। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠে। এসব কী শুনছে? বাইরের মানুষরা জানে এসব কথা? অতসীর মাথাটা ঘুরে উঠে।
“কী হলো চুপ যে? বলো না এসব কী সত্যি? তোমার পরিবার কী কোনো স্টেপ নেয়নি রে পি স্টের এগেইন্সটে? এভাবে এভাবেই যেতে দিলো সবটা? আর শুনলাম” মীম সতর্ককণ্ঠে জানতে চায়,
“শুনলাম রে পি স্ট নাকি তোমার চাচাতো ভাই? এসব কী সত্যি অতসী? তোমার চাচাতো ভাই এসব করেছে বলেই কী এখনো তোমার বাড়ির সবাই সবটা চেপে রেখেছে? নাকি তুমি কিছু বলোনি কাউকে? এভাবেই সবটা যেতে দিলে? কোথাও তোমার সাথে তোমার চাচাতো ভাইয়ের আগে থেকে সম্পর্ক ছিল এমন নয়তো? মানে অবৈধ সম্পর্ক!”
কৌতূহলে না চাইতেও আগ বাড়িয়ে নানান প্রশ্ন করে ফেললো মীম। অতসীর কেমন লাগতে পারে। কেমন লাগছে —তার কিছুই মাথায় নেই মীমের। শুধু দুচোখে গোপন কথা জানার অধম্য কৌতূহল। অতসী কান্না চেপে বহুকষ্টে জানতে চাইল,
“আ আপনাকে এসব কথা কে বলেছে আপু?” কাপঁছে অতসীর গলা।
মীম সাথে সাথে জবাব দিলো,
“আরে কেউ বলেনি। তোমার সেই চাচাতো ভাই, ফারজাদ নাম না তার? সে আমার ফুফাতো ভাইয়ের বন্ধু। ওদের ফোনালাপ শুনেছি কিছুদিন আগে। বললে না তো? এসব সত্য?” পরপর আবার বলে,
“প্রেগন্যান্ট বলেও শুনেছিলাম। তোমার কী খারাপ লাগেনা নাজায়েজ সন্তান, নিজের রে পি স্টের সন্তান তোমার গায়ে। ছিঃ ছিঃ! কী বাজে একটা ঘটনা। বিচারও করল না তোমার বাড়ির কেউ। আচ্ছা বাচ্চাটা কী অ্যাবরশন করিয়ে ফেলেছ? নাকি বিয়ে করে নেবে তোমার চাচাতো ভাইকে? আগে থেকে সম্পর্ক থেকে থাকলে বিয়েই করে নিও। তবে সম্পর্ক না থাকলে অ্যাবরশন করিয়ে ফেলতে পারো। তোমার অনিচ্ছায় এসব হয়ে থাকলে তো যতবার বাচ্চাকে দেখবে ততবার ওসব স্মৃতি মাথায় ঘুরবে। শত হোক অবৈধ সন্তান। তোমার কলঙ্কের চিহ্ন হয়েই থেকে যাবে সারাজীবন। সবাই বলবে তোমার চরিত্র খারাপ”
অতসীর টলমল চোখ, আর ঠোঁট ভেঙে আসছে দেখে মীম এবার কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে যায়। পেছনে বান্ধবীদের দিকে একনজর সতর্ক দৃষ্টি ফেলে অতসীকে বলে,
“আরেহ কাঁঁদছ কেন? আমি এমনিতেই জানতে চাইছিলাম। তোমার সাথেই এসব হয়েছে কী না আমি শিউর না। তোমাদের বাড়িতে তুমিই সবার ছোট বললো নয়নিকা। আর ভাইয়ার বন্ধু, মানে তোমার কাজিন নিজের চাচাতো বোনের সাথে এমন কিছু করেছে বলেই শুনেছি মনে হয়েছিল। তাই জিজ্ঞেস করছিলাম। তুমি প্লিজ কিছু মনে করো না। আমি আরও ভাবলাম তোমার পে, মানে তুমি অতঃসত্তা। কিন্তু আমি হয়তো ভুল, তুমি কেঁদো না প্লিজ।” বলে সে নয়নিকার পাশে গিয়ে দাড়ালো। ওর সাথে কথা বলতে বলতে কেঁদে দিয়েছে দেখলে আবার কী হয়েছে জানতে চাইবে। অতসী তখন সে কী কী বলেছে জানিয়ে দিলে নয়নিকার তোপের মুখে পড়তে হবে।
অতসীর অজানা রাগ, ক্ষোভে সবটা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিতে মন চাইছে। কেমন অসহ্য লাগছে চারপাশটা। কারো ধা ক্কা খেয়ে একটু সরে গেলো। তবে পড়ল না, সামলে অন্যপাশে দাড়ায়।
ঐ অভিশপ্ত ঘটনাটা অতসীর পিছু ছাড়ছেনা যেন। একটু সেসব ভুলে আগের মতো থাকতে চাইলেও পারেনা। হয় কোনো না কোনো ঘটনা তাকে সেসব মনে করিয়ে দেবে, নাহয় কেউ না কেউ মনে করিয়ে দেবে। কেন সেই বীভৎস ঘটনাগুলো নিয়েই কৌতূহল থাকতে হবে সবার? কেন? তাকে একটু সবটা ভুলে শান্তিতে থাকতে দিলে মানুষের কোথায়, আর কী সমস্যা?
তার ওসব মনে পড়লে অসহ্য যন্ত্রণা হয়, ঘৃণা হয়। আর এখন,
এখন এই বাচ্চাটাকেও অসহ্য লাগছে তার। পেটে ঐ নরপিশাচটার নোংরামির চিহ্ন। আজ অতসীর গর্ভে সত্যি সত্যি কেউ আছে বুঝতে পারেনি বলে যা মীম ভাবছে তা হয়নি ভেবে চলে গেছে। কাল যখন বাচ্চাটা আরও বেড়ে উঠবে, তার পেট ফুলে যাবে, তখন? তখন অতসী সবাইকে কী করে বলবে —যে সে পবিত্র। অপবিত্র বরং ঐ নোংরা মনের মানুষটা; অতসী মোটেও অপবিত্র নয়। তার মা তাকে বুঝিয়েছে। রাতে কান্না পেলে মা তাকে বোঝায়, প্রতিবার বোঝায়— যে অতসীর কিছুনা এতে, তার কোনো দোষ নেই, না তো কোনো অপবিত্রতা আছে তার শরীরে। যা নোংরা সব ফারজাদ ভাইয়ের মন, মস্তিষ্ক, শরীর— সবকিছু নোংরা ঐ মানুষটার। অতসীর কিছু না। সে এখনো অতসী ফুলই আছে।
কিন্তু তার মা তো তাকে এটা বলেনি যে বাচ্চাটা নাকি তার কলঙ্কের চিহ্ন?
সত্যিই তো! মীম ঠিকই বলেছে। বাচ্চাটা তার কলঙ্কের চিহ্ন। সে যে অপবিত্র তা এই বাচ্চাটাই তো প্রমাণ করে দেয়। তাহলে কী তাকে এই বাচ্চাটা নিয়ে, অপবিত্রতার চিহ্ন নিয়েই থেকে যেতে হবে সারাজীবন?
অতসী নানান ভাবনায়, মানুষের ধা ক্কায় সরে দাড়াতে দাড়াতে— ভিড়ের মধ্যে যে হারিয়ে গেছে, তা এখনো বুঝতে পারেনি।
“আপু? নয়নিকা আপু?”
কয়েকবার ডাকল সে। কিন্তু সাড়া না পেয়ে এক পা-দুপা এগিয়ে এদিক ওদিক ফিরে ডাকে। কারো সাড়া পেলো না। রাগে দুঃখে এখানেই বসে যেতে ইচ্ছে করছে তার। তবু জেদ নিয়ে অনুদ্দেশ্যে দৃষ্টি ফেলতে ফেলতে যতটুকু পারে চলতে থাকে বোনকে ডাকতে ডাকতে।
দিশেহারার মতো সুপ্ত জেদ নিয়ে চলতে চলতে, দৈবাৎ পেছন দিকে কেউ এসে তার হাত ধরে আঁটকে নিলো।