প্রেমভুবনের অতসী

পর্ব - ১৩

🟢

ফারজাদ তিন দিন আইসিইউতে ছিল। আজ পাঁচদিন হলো কেবিনে আছে। রিলিজ দেওয়া হয়নি।

অতসীরা পরদিনই নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরে গিয়েছিল। ফারিশ মহলে তার মায়ের সবকিছু বোধে আসার পর যতক্ষণ ছিল, পুরোটা সময়ই অস্থিরতায় কেটেছে। তাই এটা-ওটা কারণ দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদের গন্তব্যেই ফিরে গেছে তারা।

এই কদিনে যারা ফারজাদকে দেখতে এসেছিল, প্রত্যেকেরই মুখে ছিল একই প্রশ্ন —ছুরিটা কীভাবে ঢুকল? কেন ঢুকল?

আর সে প্রতিবারই সংক্ষেপে “ইট ওয়াজ অ্যান অ্যা ক্সি ডে ন্ট,” বলে বিষয়টা এড়িয়ে গেছে। এমনকি তার বন্ধুরাও, যারা অতসীকে ঘিরে ঘটা গোপন ঘটনার বিষয়টা আগেই জানত, তাদের কাছেও বিস্তারিত কিছু খোলাসা করেনি সে। ‘অ্যা ক্সি ডে ন্টলি’ বলতে ঠিক কীভাবে —এ নিয়েও নানান প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। হওয়াই স্বাভাবিক; বুকে ছুরি গেঁথে যাওয়া তো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।

তবু ফারজাদ কাউকে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। কারণ, এ নিয়ে বেশি কথা হলে আবার কেউ কেউ অতসীকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে; যা একেবারেই চায়না সে। তার কারণে অতসীর জীবনে আর এক বিন্দু মুসিবত আসুক, তা ফারজাদ চায়না। একারণেই তখন যেকোনোভাবে সে অতসীর রুমের সামনে থেকে দূরে সরে যেতে চেয়েছিল। সব প্রশ্ন, সব ঝঞ্ঝাটের হাত থেকে তাকে আড়াল করতে।

এখন তার মাথায় ঘুরছে একটাই প্রশ্ন— অতসী কি তার ছুড়ে দেওয়া ছু রিতে ফারজাদ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল এ কথা জানে?

এই প্রশ্ন হুশ আসার পর থেকেই তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অতসী যদি জেনে থাকে, তাহলে সে হয়তো তার ছোড়া চাকুতে ফারজাদ আঘাত পেয়েছে বলে সবাই এ কথা জানলে তাকে দোষারোপ করবে— এই ভেবে আতঙ্ক বা মানসিক চাপে থাকতে পারে। এঁকে তো তার জন্য আর কোনো মুসিবতে অতসী পড়ুক তা সে চায়না। তার ওপর নাজুক মেয়েটার মধ্যে আরেকটা নাজুক প্রাণ আছে, তার সন্তান আছে। এই অবস্থায় তো আরও যত্নে, সামলে রাখা উচিত অতসীকে। ফারজাদের অতসী, আর তাদের অনাগত সন্তানের নানান চিন্তায় কিছুই ভালো লাগছেনা। মনটা কেমন অস্থির হয়ে আছে।

কেবিনে শুয়ে আছে সে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া বিকেলের আলো এসে পড়েছে মুখের ওপর। তাতেও তার ভ্রূক্ষেপ নেই।

সে আধশোয়া অবস্থায় চোখ দুটো বন্ধ করে এসব ভাবনায় গভীরভাবে মজেছে। গায়ে হালকা নীল রঙের হাসপাতালের পোশাক। সামনে বাঁ পাশে মোটা ব্যান্ডেজ। শ্বাস নিলে সামান্য ওঠানামা করে বুকের অংশটা। বাম পাশে চেস্ট টিউব ছিল, এখন খুলে ফেলা হয়েছে। তবে জায়গাটায় ছোট গজ আর টেপ লেগে আছে।

মুখে রক্তশূন্যতার ফ্যাকাশে ছাপ, তবু চোয়ালের রেখা আগের মতোই দৃঢ়। কয়েক দিনের না-কাটা দাড়িতে তাকে আরও গভীর লাগছে।

ডান হাতে স্যালাইনের ক্যানুলা। আঙুলগুলো ফ্যাকাশে হলেও শিরাগুলো স্পষ্ট দেখাচ্ছে। তবে গায়ের রঙ আগের মতো উজ্জ্বল নেই তার। রক্তক্ষরণের কারণে কিছুটা বিবর্ণ হয়ে আছে।

দরজায় খোলার আওয়াজ পেলো ফারজাদ। তবে চোখ খুলে তাকায়না। বাড়ির কেউ এসেছে তা জানে।

“জাদ”

মায়ের ডাক পেয়ে বন্ধ চোখেই সাড়া দিলো,

“বলো।”

“স্যুপটা খেয়ে নে বাবা”

“রেখে যাও, খেয়ে নেবো।”

“উহু, এখনই খেতে হবে। ওষুধ আছে যে!”

“এখন ভালো লাগছেনা মা। ডিস্টার্ব করো না প্লিজ” নির্লিপ্ত কণ্ঠ তার

“আমি খাইয়ে দিই ভালো না লাগলে?”

ফারজাদ এবার চোখ খুলে তাকাল। জননী তার কেমন জীর্ণ শীর্ণ হয়ে আছে। চেহারাটা ফ্যাকাশে, চোখের নিচে কালি। সেদিনের ঘটনাগুলোর পর থেকে দিনরাত চিন্তা চিন্তায় থাকার ফল। এর মধ্যে আবার তার ওপর বয়ে যাওয়া প্রাণঘাতি দূর্ঘটনা। ভবিষ্যতে সবকিছু ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে দাড়াবে এই নিয়েও চিন্তা। সব মিলিয়ে বলতে গেলে শুধু ফারজাদ আর তার মা নয়, ফারিশ মহলের প্রতিটি সদস্যই নিজেদের মতো চিন্তায় আছে। সুন্দর সমাধান না হলে, আর সবটা বাইরে জানাজানি হলে— ফারিশদের সম্মানেও খুব বড় একটা কালি দাগ লেগে যাবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছুদিন সবটা নিয়ে কথাবার্তা স্থগিত রাখলেও, দুশ্চিন্তা কারো এক ফোঁটা কমেনি।

“এদিকে দাও”

সাইড টেবিলের এলোমেলো সবটা গুছিয়ে রাখছিল তার মা। ছেলের চাওয়ায় স্যুপের বাটিটা এগিয়ে দিল।

“নে, খেয়ে নে। সময়মতো ওষুধ না খেলে তো তাড়াতাড়ি সুস্থ হবিনা।”

“হুম”

ফারজাদ চামচ দিয়ে অল্প করে মুখে নিতে নিতে জবাব দেয়, পরপর বলে,

“আরমান কী চলে গেছে মা? থাকলে একটু এখানে পাঠিয়ে তো।”

“হ্যাঁ আছে, যায়নি এখনো। ক্যান্টিনেই হয়তো, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুই খেয়ে নে”

ফারজাদের মা চলে গেলো। পাশেই আরেকটা কেবিন বুক করে নেওয়া হয়েছে। সেখানে যাবতীয় দরকারি জিনিসপত্র রাখা, কিংবা তাদের বিশ্রামের প্রয়োজন হলে তাও নিচ্ছে।

মিনিট দশেক পর আরমান আসে কেবিনে। নক করে ঢুকল। চেয়ার টেনে বসে বলে,

“হ্যাঁ বলো ভাই। কোনো দরকার? কিছু লাগবে?”

ফারজাদ টিস্যু দিয়ে ধীরে সুস্থে হাত মুছে পানি খেলো। তার দিকে ফিরে চোখ তুলে তাকায়, কিছুপল চেয়ে জানতে চাইলো,

“বাড়িতে কী অবস্থা আরমান?”

“ভালোই তো। সবাই সুস্থ, ঠিকঠাক।”

আরমান স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিল। ফারজাদ ঠোঁট চেপে একটু সময় নিয়ে জানতে চায়,

“ওরা, আই মিন চাচীমণি-অতসী ওরা কী বাড়িতে আছে?”

জ্ঞান ফেরার পর প্রথমবারের মতো দ্বিধা সংকোচ উপেক্ষা করে অতসীদের কথা জানতে চাইল ফারজাদ। আরমান নজর স্থির করে সেকেন্ড কয়েক দেখল ভাইকে। প্রকাশ না করলেও চোখে চাঁপা আগ্রহ, আর উদ্বিগ্ন। আরমান তা বুঝে নিলো সহজেই। সে বলে,

“ওরা সেদিনের পর বিকেলেই চলে গিয়েছিল।”

“ও, মানে অতসী। ইজ শি ফাইন?”

আরমানের কেন জানি হাসি পেলো ফারজাদের ভেতরে থাকা চাঁপা উৎকণ্ঠা, আর চিন্তা টের পেয়ে। এই মেয়েটার নাম শুনলেই নাক ছিটকাতো একসময়, আর আজ এই অসুস্থ শরীরেও মন অস্থির হয়ে আছে সেই মেয়েটার একটু খবর পেতে। আরমান জানে জ্ঞান ফেরার পর থেকে অতসীর কথা ভেবে ভেবেই যত দুশ্চিন্তায় মগ্ন ছিল ফারজাদ। কিন্তু সে এই অবস্থায় ওসব কথা আর তুলতে চায়নি, তাই ভাইয়ের মনের খবর বুঝেও চুপচাপ ছিল। আরমান জবাব দিলো,

“ওর কী হবে? ঠিকই আছে। টোটালি ফাইন।”

“ঐদিনের পর আর কোনোপ্রকার সিকনেস দেখা গেছে?”

“না তো, একেবারেই ঠিক আছে।”

“মানে একদম সুস্থ? সবকিছু?”

“হ্যাঁ, সব সুস্থ”

অনাগত সন্তানসহ সন্তানের মা - দুজনেই সুস্থ আছে বুঝে কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো ফারজাদ। তার চোখে মুখের সেই স্বস্তি আরমান কোণা চোখে দেখল। ফারজাদের জন্য কেটে রাখা ফলগুলো সে একটা একটা মুখে নিচ্ছে।

সে বলে,

“শুনেছি আমরা যখন সেরাতে তোমায় নিয়ে এখানে হস্পিটালে আসি, তখন অতসী রুমে আবার অচেতন হয়ে পড়েছিল। তখনও দূর্বল লাগছিল হয়তো। তবে এরপর আর কোনো অসুস্থতা দেখা গিয়েছে এমন শুনিনি।”

আরমান এই নিয়ে সহজভাবে কথা বলছে দেখে ফারজাদ আরেকটু আগ্রহ পেলো,

“ও জানে আমি আঘাতপ্রাপ্ত, মানে আমি এখানে তা? কী ভাবছে?”

অতসীর তার অসুস্থতা নিয়ে কী ভাবনা, নিজের ওপর দোষ নিয়ে কোনো অনুশোচনায় ভুগছে কীনা, কিংবা বাড়ির কেউ জেনে যাবে এই নিয়ে ভয়ে আছে কী না— তার কিছুই বুঝতে পারছেনা। আর আরমানকেও সবটা খোলাখুলিভাবে জিজ্ঞেস করতে পারছেনা। কিন্তু সে জানতে চায় সবটা। তাই উল্টাপাল্টা কী বলছে নিজেও জানেনা হয়তো।

আরমান বলে,

“ও তো তুমি যে অসুস্থ, হস্পিটালে আছো, এসবের কিছুই জানেনা আই গেইস। চাচ্চু, আর চাচীমণির সাথে চলে গেলো সেদিন। বাড়িতে যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ কেউ জানাইনি। এরপর ওবাড়িতে তোমাকে নিয়ে কথা হয়েছে কী না আমি তো বলতে পারছিনা। আর হলেও আমার মনে হয়না চাচীমণি মেয়েকে তুমি যে বুকে ছু রি খেয়ে হস্পিটালের বেডে পড়ে আছো তা জানাবে বলে।”

ফারজাদের সব চিন্তা ভাবনারা ইতি টানল। তবে স্বস্তি পেলেও কোথাও একটু হতাশ লাগলো। সে চেয়েছিল তার এই বুকে ছু রি খেয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকা নিয়ে অতসীর কোনোপ্রকার অনুভূতি, বা সহানুভূতিও জেগেছিল কীনা জানতে। অতিরিক্ত চাওয়া এটা, তার সাজেনা এমন চাওয়া মনে পোষণ করা। কিন্তু তাও একটু জানতে ইচ্ছে করছিল যে, সে ম রে গেলে অতসীর কেমন লাগবে! তবে অতসী যখন এসবের কিছু জানেইনা। সেখানে এসব চাওয়া পাওয়ার চিন্তা মাথায় আনা অবান্তর।

_

সর্বক্ষণ অতসীর সাথে সাথে থাকা বুয়াকে ছুটি দেওয়া হয়েছে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। ফ্ল্যাটে সেই সময়ের পর থেকে অতসী, আর তারা বাবা-মা ছাড়া কেউ নেই। কারণ এমন সময়ে বুয়ার উপস্থিতিতে পারিবারিক গোপন খবর বাইরে যাওয়ার, আর লোক জানাজানি হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই ভীষণ সতর্ক রয়েছে তারা।

অতসীদের ছিমছাম আধুনিক ধাঁচের ফ্ল্যাট। দেয়ালজুড়ে হালকা রঙ, মিনিমাল সাজ, পরিপাটি আসবাব— সবকিছুই গুছানো। অতিরঞ্জিত বা একেবারে ফ্যাকাশে কোনোকিছু নেই।

নিজেদের রুমে বসে অতসীর বাবা ফোনে কারও সাথে কথা বলছে। অতসীর মা এসে কিছু পোশাক গুছিয়ে স্বামীর পাশে বসলেন। ভ্রু কুঁচকে শুনছেন। ওপাশে কারো সাথে পাসপোর্টের বিষয়ে কথা বলছে অতসীর বাবা। কথা শেষ করে ফোন রাখতেই তিনি জানতে চাইলেন,

“কার পাসপোর্টে আবার কী হলো? কোনো সমস্যা?”

“উহু, কোনো সমস্যা নেই।” কল কেটেও ফোনে কিছু দেখতে দেখতে জবাব দিলেন শফিক সাহেব

অতসীর মা কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,

“তাহলে পাসপোর্টের কথা বলছেন যে? আপনার পাসপোর্টে কিছু হয়েছে নাকি?”

“না। এত চিন্তা করো না অতসীর আম্মু। কোনো সমস্যা হয়নি। বরং সব ঠিক হবে।”

“কী বলছেন সোজাসুজি বলুন তো। কী ঠিক হবে?”

শফিক সাহেব ফোন বন্ধ করে পাশে রেখে স্ত্রীর দিকে পূর্ণ নজর দিলেন,

“তোমার, আর অতসীর পাসপোর্ট রিনিউ করতে দিয়েছি।”

“ও আচ্ছা।”

থেমে কপালে ভাঁজ রেখে বিছানার কুঁচকে যাওয়া চাঁদর ঠিক করতে করতে বলেন,

“তো কিছু ভেবেছেন? কী করবেন? কয়েকদিন তো কাঁটল। এভাবে তো সময় চলে যাবে কিন্তু সমাধান আর হবেনা।”

“ভেবেছি। ওসব চিন্তা ছাড়ো। আমি আছি সব ঠিক করার জন্য। তুমি শুধু অতসীকে দেখে রেখো।”

অতসীর মা কপালে ভাঁজ ফেলে তাকায় স্বামীর দিকে,

“ভেবে ফেলেছেন? কী ঠিক করলেন তাহলে? কী করবেন?”

শফিক সাহেব পাশ থেকে পানির গ্লাস নিয়ে পানি পান করেন। সাবধানে রেখে বলেন,

“আমরা ইউকে তে সেটেল হবো। তুমি, আমি, আমার মেয়ে - আমরা এখানে আর থাকছিনা অস্মিতা। আমার সব কাগজপত্র তো ঠিকঠাক আছে। তোমার, আর অতসীর সবকিছু ঠিকঠাক করে সময় হলেই ইউকে চলে যাবো। ওখানেই বাকি জীবন।”

অতসীর মা বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে থাকে। কোনো কথা বলল না বিপরীতে। কিছু সময় চেয়ে ঢোক গিলে মুখ খুলে,

“কী বলছেন আপনি বুঝতে পারছেন? আমরা অতসীকে নিয়ে অচেনা অজানা দেশে চলে যাবো সারাজীবনের জন্য? আপনার পরিবার মানবে?”

“ওরা মানুক না মানুক তাতে বিশেষ বদলাবেনা আমার সিদ্ধান্ত। এখানে অতসীর জীবন কঠিন হয়ে যাবে ফারজাদকে ছাড়া। আর ফারজাদের কাছে আমি মেয়ে দিচ্ছিনা। অতসী বাচ্চা নিয়ে এখানে থাকলে মুহূর্তে মুহূর্তে নরক যন্ত্রণা পাবে আশপাশের মানুষের কাছে। এখানে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব না।”

“আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। অচেনা অজানা দেশে গিয়ে উঠবেন। খোদা না করুক আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি ঐ ভিনদেশে আমার মেয়েকে নিয়ে কী করব? আপনার আর আমার কিছু হয়ে গেলে আমার অতসীর কী অবস্থা হবে? এসব কিছু মাথায় আছে আপনার? এমনি মন বললো, আর সিদ্ধান্ত একটা নিয়ে নিলেন।”

“আজাইরা চিন্তা করছ। সব ঠিক থাকবে। অতসীকে আমি সময় হলে ওর যোগ্য কারো হাতে তুলে দেবো। মেয়েকে যখন পাঠিয়েছে খোদা আমাদের কাছে, তখন ওর জন্য কাউকে বানিয়েওছে। যেভাবে হোক খোদার ঠিক করা ঝুটির মিলন হবে। আমার অতসীর যোগ্য কাউকে পেলে আমি অবশ্যই ওকে দেবো। ওরও একটা আলাদা পরিবার হবে। আর যদি তেমন কিছু হওয়ার আগেই আমাদের কিছু হয়ে যায় এমন চিন্তা করে থাকো। তাহলেও বলছি শুনো, একবারেই সবার সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করে যাবো এমন তো না। বড় ভাই, মেজ ভাই - ওরা আছে। অতসীকে নিজেদের কাছে নিশ্চয় ফিরিয়ে আনবে। আর তারপর যদি সেই ফারজাদের সাথেই তখন সবটা ঠিক করে দেয়। তাহলে করুক। অতসীর জীবন সাজিয়ে দেওয়ার আগে আমি মরলে নাহয় তাই করুক। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে ফারজাদের কাছে অতসীকে দেবো না।”

“ভিনদেশে গিয়ে, ভিনদেশি ছেলের কাছে মেয়ে দেবেন? বললেই হলো? আমি কিছুতেই এসব মানছি না। কেমন না কেমন মানুষ বিদেশীরা, বিয়ের নাম করে আমাদের মেয়েকে নিয়ে বেঁচে দিলে তখন কী করবেন? আমি অতসীকে কোনো বিদেশী ছেলেপেলের কাছে বিয়ে দিতে দেবো না। সে যতই আপনার পছন্দের বা চেনাজানা হোক। এখানেই থাকব সবাই। পারলে আপনার ভাতিজার সাথেই সমাধান করুন সব। এছাড়া যাই করবেন, সবদিকে নানান আশঙ্কা থাকবে। আপনার বাড়িতেই সেইফ থাকবে বাচ্চাসহ আমার অতসী। যা হয়েছে এরপর অন্য কোথাও ওকে দিয়ে শান্তি পাবেন না। মিলিয়ে নিয়েন আপনি। আর কোথাও শান্তি পাবেনা অতসী। এত সহজ নাকি সবটা?”

“তুমি কঠিন করে দেখছ তাই কঠিন লাগছে। এমনভাবে বলছ যেন ওখানে কাউকে চিনিনা আমি, আর আমরাই প্রথম বিদেশ যাচ্ছি সেটেল হতে। আশ্চর্য!” থেমে বলেন, “সিদ্ধান্ত নিয়েছি যখন সব জেনেশুনে, আর বুঝেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এত চিন্তা করো না।”

“কিন্তু আমি ওখানে যাবো না। অতসীও যাবেনা।”

“বেশি কথা না বলে ঘুমিয়ে পড়ো। অতসীর সব ওষুধ খাইয়েছো?” গা ঝেড়ে বসতে বসতে বললেন তিনি।

অতসীর মা রেগে বলে,

“আমি বুঝতে পারছিনা আপনাদের এত জেদ আসে কোত্থেকে! আপনার ভাতিজা জেদী হলে আপনিও কোনোদিকে কম না। আপনার মেয়েকে ওষুধ খাইয়ে এলাম হাজারটা কাহিনী করে। গায়ে তার বাচ্চা, এসবের হুশ তার থাকেনা। খাবার দাবারের ঠিক নেই। এত ঝামেলা না হলে নিবিড়ের সাথে বিয়ে দিয়ে আমি সারাটাজীবন নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম। সেটা হলো না। এখন অন্তত যেখানে দেওয়ার সেখানে দিয়েই নিশ্চিন্তে থাকা যেতো। এটাও জেদের জন্য আপনার সহ্য হচ্ছেনা। আপনি বুঝতে পারছেন না অতসীর বাবা। অতসীকে ভালো, যোগ্য কারো হাতে যদি তুলেও দেন, তাহলে ও সুন্দর জীবন পেলেও ওর বাচ্চাটা সুন্দর জীবন পাবে তার গ্যারান্টি নেই। তখন মা হিসেবে আমার অতসী ব্যর্থ হয়ে উঠবে। কিছু করার থাকবেনা ওর। অথচ সবাই ওকেই দোষ দেবে। আবার ওর বাচ্চাটা যদি নিয়েও নেয় আপনার পরিবার, তাহলেও অতসী সকলের কাছে ব্যর্থ মা-ই থেকে যাবে। না জানি সবার সাথে সাথে বড় হয়ে ওর সন্তানও ওকে ভুল না বুঝে। এত এত অনিশ্চয়তায় ফেলে দেবেন না দয়া করে মেয়েটাকে। ও এতকিছু নিতে পারবেনা।”

প্রেমভুবনের অতসী পর্ব ১৩ গল্পের ছবি