প্রেমভুবনের অতসী

পর্ব - ১১

🟢

অতসীর বাবা —শফিকুল্লাহ মীর ফারিশ। শফিকুল্লাহ সাহেবের ভাই বোন আছে তিনি বাদে চারজন। তিন ভাই, আর দুই বোন তারা; দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট শফিকুল্লাহ সাহেব। আর দুই বোনের মধ্যে এক বোন তার ছোট হয়। তবে সবার বড় ফারজাদের বাবা— ফিরোজ মীর ফারিশ। ছোট থেকে বাড়ির বড় সন্তান হওয়ার আলাদা দায়িত্ব, আর ছোট ভাই বোনেদের প্রতি কর্তৃত্ব চোখে পড়ে। আর তারা ছোট ভাই বোনেরা বাবার সমতুল্য সেই বড় ভাইয়ের দায়িত্ব আর কর্তৃত্বপরায়নতা মেনেও চলে। কারণ, সম্মানের জায়গাটাই তেমন।

ফিরোজ সাহেবকে কখনো অপ্রয়োজনীয় ধমকা-ধমকি কিংবা অশ্রাব্য গা’ লি মুখে আনতে শুনেনি এ বাড়ির মানুষ।

শুধু এ বাড়ির মানুষই কেন?

বাড়ির বাইরেরও কেউ আদৌ মানুষটির মুখে এমন অশ্রাব্য সব গা ‘লি কখনো শুনেছে কী না প্রশ্ন রয়ে যায়।

সেই মানুষটির মুখে নিজেরই ছেলের উদ্দেশ্যে ছোড়া এমন জগন্য গালি শুনে সকলে হতবম্ব হয়েছিল প্রথমে। পরপর একরাশ আতঙ্ক ঝাঁপটে ধরে তাদের। মুখ দিয়ে নিঃসৃত সেসব শব্দ, আর কিছু দিয়ে সজোরে আঘাত করার মতো ‘শাৎ শাৎ’ করা ক্ষীণ যে আওয়াজ কানে আসছে, তা শোনার পর আতঙ্কিত হওয়ারই কথা।

ফারজাদের মা বিরামহীন কাঁদছে। একমাত্র ছেলে তার, একটু গোয়ার, আর বেপরোয়া ধরণের হওয়ায় নানান বকা শুনলেও, আজ অব্দি এমনভাবে কেউ তার গায়ে হাত তুলেনি।

সেই অতসীকে ধা ক্কা দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার পর একবার থা প্পর দিয়েছিল তার বাবা, আর ধমকা-ধমকি করে শাসিয়েছিল— তাও কী না আড়ালে, বন্ধ দরজার ওপাড়ে। এরপর বাড়ি থেকে চলে যায়। নানার বাড়ি, অর্থাৎ বিদেশিনী মায়ের দেশে গিয়ে উঠে। টানা অনেকদিন ছিল সেখানে। সেবারেই এই বাইক রেইসের নেশা লাগিয়ে এসেছিল, সাথে অনিয়ন্ত্রিত ড্রিঙ্ক করার অভ্যাসটাও।

ফারজাদের মা, আর দাদীর আকুতি মিনতিতে অনেক বলে কয়ে ফেরানো গিয়েছিল। এরপর থেকে আরও গোয়ার হয়ে যায় ছেলেটা। কিছু বললে সেটা যেন এককান দিয়ে ঢুঁকে, আরেক কান দিয়ে বের হয়। কারও কথায় পাত্তা দেয়না। এসবেতেও কখনো এমন অশ্রাব্য গা’ লি কিংবা গাঁয়ে হাত তোলা হয়নি ছেলের ওপর। আর আজ মুখের লাগাম নেই, না আছে গায়ে হাত তোলাতে বিন্দুমাত্র সংকোচ।

ফারজাদের মা দরজা ধা ক্কিয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পায়নি। এমনকি ছেলেকেও দরজা খুলে দিতে বলেছে, কিন্তু সেও নিরুত্তর ছিল। ফারজাদের দাদী বিছানায় বসে বিলাপ করছে। তার মা বারবার গিয়ে দরজা ধা ক্কায়, ছেলেকে ছেড়ে দিতে বলে। ফল না পেয়ে হতদন্ধ হয়ে শেষে ছুঁটে আসে ছোট দেবরের সামনে,

“শফিক ভাই, দয়া করুন আমার ওপর। আপনি একটু গিয়ে আপনার ভাইকে থামতে বলুন না প্লিজ। আমার ছেলেটা ম ‘রে যাবে। দয়া করুন শফিক ভাই”

অতসীর বাবা নিজেও কপালে ভাঁজ ফেলে থমথমে চেহারায় সবটা লক্ষ্য করছিলেন। বড় ভাবির হাত জোর করে এহেন মিনতিতে চোখ তুলে তাকান। আকুতি এক মায়ের চোখে। ছেলেকে তার বাবা আঘাত করছে।

ছেলেকে।

পুরুষ মানুষ ফারজাদ। সৃষ্টিকর্তা তাদের বাহ্যিক, কিংবা মানসিক; যেকোনো আঘাতের জন্য যথাযথ সহ্য ক্ষমতা দিয়ে তৈরি করেছেন। তাও সে আঘাত পাচ্ছে, এটা জেনে মায়ের বুক কেঁপে উঠছে। মা তো! সামান্য আঘাতেও বুক কাঁপবে। এটাই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু তার মেয়েটা যখন সেদিন এই ছেলেটার খবলে পড়েছিল! এভাবে একটু বাঁঁচাতে অনুরোধ করার কেউ ছিল না! যখন নিজের জন্য নিজেই আকুতি মিনতি করছিল! সেই সময়ে এখন যে ছেলেটাকে আঘাত করা হচ্ছে, সে ছিল নিরুত্তাপ। তার ফুলের মতো নিষ্পাপ, আর নাজুক মেয়েটার সকল বাঁধা-অনুরোধ উপেক্ষা করে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করেছে। কতই না কষ্ট পেয়েছিল তখন তার অতসী।

অতসী ফুলটার তখন শুধু আঘাত, ব্যাথা কিংবা শারীরিক কষ্ট পাওয়ার ভয় ছিল না, এসবের সাথে সাথে ছিল মান হারানোর ভয়। কিন্তু এই ছেলেটা তো তার ফুলটাকে একা পেয়ে পিষে ফেলেছিল তখন, কোনো বাঁধা মানেনি।

আজ যখন সেই নিষ্পাপ ফুলটাকে কেউ কলঙ্কিত করে দিয়েছে একথা জেনেছিল। তখন বোধ হচ্ছিল তার পিতৃমনের প্রতিটি কোণ অনামিশায় তলিয়ে গেছে। সেই নিকষ অন্ধকারে তার মন মস্তিষ্ক কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছিল না। কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। বুকের কম্পনে মনে হচ্ছিল হৃৎপিণ্ডটা বুঝি এবারেই থেমে যাবে চিরকালের জন্য।

মুহূর্তটার সকল দমবন্ধকর অনুভূতি অতসীর বাবার চোখে প্রতিচ্ছবির মতো ভেসে উঠল ফারজাদের মায়ের এই অনুরোধে। তাকে নিরুত্তাপ দেখে ফারজাদের মা আহাজারি করে ফের বলে,

“শফিক ভাই, একটু দয়া করুন না। ফারজাদ নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেনা। শক্ত হয়ে দাড়িয়ে থাকবে শুধু। আমার ছেলেকে আমি চিনি। যতক্ষণ আপনার ভাই থামবেনা ততক্ষণ মার খেয়ে যাবে শুধু। একটু বাঁচান না দয়া করে, আপনার ভাই আপনার কথা শুনবে। শফিক ভাই”

অতসীর বাবা বিশেষ বিকার দেখাল না। এক নজর সকলের দিকে তাকায়। ফারজাদের দাদী বিছানায় শুয়ে আহাজারি করছে। শেষ বয়সে এসে এসব ব্যভিচার, আর অবাঞ্চিত সব ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে নিজেরই বাড়িতে — এ কল্পনার বহির্ভূত ছিল বৃৃদ্ধার।

বাকিরা আতঙ্কে কী করবে ভেবে পাচ্ছেনা। আরমান পাশে চিন্তিত ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে। অতসীর বাবা নির্বিকারে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। বড় ভাইয়ের কক্ষের সামনে গিয়ে দাড়ায়।

ওপাশ থেকে প্রহারের শব্দের সাথে ভাইয়ের হাঁপানো, জোর দেওয়া কণ্ঠে অশ্রাব্য সব গা লি ভেসে আসছে।

“শুয় রের বাচ্চা।”

“যেখানে গিয়ে মদ পানি গেলা শিখেছিস, যেখানে গিয়ে দুনিয়ার ন ষ্টামি শিখেছিস। সেখানে তো তোদের স্বভাবের মেয়েরও অভাব নেই। ওসব ক্লাবে গিয়ে নোংরামি করে আসতে পারলি না?”

ছ্যাত ছ্যাত আঘাতের শব্দ আরও তীব্র হলো, সাথে ফিরোজ সাহেবের হাঁঁপানো, তবু জোর দেওয়া কণ্ঠ,

“আমার বাড়ির মেয়ের দিকে এই শকুনের নজর দেওয়ার আগে আমি এখনো বেঁচে আছি এটা মাথায় আসল না তোর? শুয়ো র”

“কুত্তা, শুয়োর কোথাকার। তোর মতো কুলাঙ্গারকে জন্ম দেওয়ার আগে আমাকেই তুলে নিতো ওপরওয়ালা! বেয়াদব কোথাকার। দুশ্চ রিত্র ল ম্পট! এই দিন দেখার আগে মরলিনা কেন? তোর মতো কুলাঙ্গার আমার ঘরেই কেন এলো। দুশ্চরিত্র কোথাকার”

আঘাতের শব্দের সাথে সাথে আসা এই অশ্রাব্য কথাগুলো আর বেশি কানে আসার আগে অতসীর বাবা দরজায় ঠোকা দেয়, “ভাইজান। দরজা খুলুন।”

ওপাশ থেকে জবাব এলো না। গা লি, প্রহারের শব্দ— কোনোটাই থামেনি। অতসীর বাবা আরও কয়েকবার ডাকে, তবে সময়ের সাথে সাথে আওয়াজ কমে এলেও দরজা খোলা হলো না।

ফারজাদের মা -ও ততক্ষণে অতসীর বাবার পেছনে এসে দাড়িয়েছে। শফিক সাহেব কাজ হচ্ছেনা দেখে ভাবিকে বলেন,

“বাড়ির চাবিগুলো নিয়ে আসুন ভাবি। লক খুলে ফেলি। ভাইজান, ফারজাদ কেউ তো সাড়া দিচ্ছেনা।”

ফারজাদের ক্রন্দনরত মা তাড়াতাড়ি যায় শাশুড়ির রুম থেকে চাবির গোছা আনতে।

নিয়েও এলো অল্প সময়ের মধ্যে। অতসীর বাবা দরজা খুলতেই ফারজাদের বাবাকে মাথায় হাত দিয়ে ফ্লোরে ক্লান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখল। খাটের সাথে হেলান দিয়ে মাথা নত অবস্থায় বসে আছে। পাশে একটা বেল্ট পড়ে আছে এলোমেলো হয়ে। চোখ তুলে অল্প দূরত্বে তাকাতেই ফারজাদকে দেখা গেলো শক্ত হয়ে নিরুত্তাপভাবে দাড়িয়ে থাকতে। গায়ে শার্ট নেই, ঢুলুঢুলু প্যান্টে বেল্ট নেই, চুলগুলো এলোমেলোভাবে ঘর্মাক্ত কপালের ওপর এসে পড়েছে, আর চোখ দুটো টকটকে লাল। ফ্লোরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নির্লিপ্তে ঘনঘন শ্বাস টানছে। নিয়মিত শরীরচর্চায় বানানো পুরুষালি বাইসেপসগুলো চোখে পড়ার মতো দৃশ্যমান, তার ওপর ঘামে চকচক করছে গা -টা। ফিরোজ সাহেব যে এতক্ষণ সর্বশক্তি দিয়ে প্রহার করেছে, তাতে এই শরীরে কতটুকুই বা প্রভাব ফেলবে? অতসীর বাবার ভাতিজার প্রতি মায়া লাগল না। নজর সরিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকান।

“বাড়িতেই বাড়ির ছেলেকে এভাবে আঘাত করা ঠিক নয় ভাইজান। এটা আপনাকে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে অবাক হচ্ছি। অন্যান্য সদস্যরা আছে এখানে, মায়ের বয়স হয়েছে— তাদের ওপর প্রভাব পড়বে। এসব অসুস্থ ঘটনার অসুস্থ শাস্তি বুঝে শুনে দিবেন সামনে থেকে”

ফিরোজ সাহেব হাঁপানো নজর তুলে ভাইয়ের দিকে তাকান। অনুতাপ, গ্লানি, আর সীমাহীন লজ্জ্বার ভারে ছেয়ে আছে ভদ্রলোকের রক্তিম চোখদুটো।

ফারজাদের মা আহাজারি করছে। ছেলের পেশিগুলোতে বেল্টের আঘাত লাল হয়ে বসে বসে আছে, কোথাও কোথাও ছিড়ে গেছে— এ দৃশ্য মায়ের চোখে বড্ড করুন লাগে। একটু বুকে যে নেবে ছেলেকে, তার জন্য ছুঁতেও ভয় লাগছে— কোথাও জ্বলে না উঠে ক্ষতগুলোতে। তিনি স্বামীর দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে একবার তাকিয়ে, পরপর তার পাশে ফ্লোরে পড়ে থাকা সাদা শার্টটা তুলে নেন। হেঁচকি তুলে কাঁঁদতে কাঁঁদতে ছেলের গায়ে জড়িয়ে দিলেন, গালে হাত দিয়ে নিম্নকণ্ঠে বলেন,

“জ জাদ, চল এখান থেকে। মলম লাগিয়ে দিলে আর ব্যাথা লাগবেনা। চল বাবা।”

ফারজাদ রক্তিম চোখদুটোর নজর তুলে নিজের বাবার দিকে তাকায়। ভদ্রলোককে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তবে মা-ছেলের দিকে তিনি তাকালেন না। ফারজাদ বাবা তৃপ্ত হয়েছে বুঝে তবেই মায়ের সাথে পা মেলালো। কোনো শব্দ করল না। না তো চোখে কোনোপ্রকার রাগ কিংবা ক্ষোভের আভা দেখা যাচ্ছে। বরং সে যেন এই আ ঘাতগুলো পেয়ে নিজেই তৃপ্ত।

_

ফারজাদের বাবার আদেশে বাড়িতে কারো মুখে সারাদিনের ঘটনার কোনোরকম কথা বা চর্চা আর রইল না। এমনকি ফারজাদকেও দেখার, আর তার প্রতি কোনোরকম সহানুভূতি প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আজকের দিনটা মহলের প্রতিটি মানুষের কাছে দীর্ঘ ছিল। যেন শেষই হচ্ছিল না। একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ফারজাদের দাদী দূর্বল হয়ে নিজের কক্ষে পড়ে আছে। দুইমেয়ে সহ নাতনিরাও সেখানে। তখন রাত হয়েছে কিছুটা। অতসী আর তার মা সর্বশেষ ঘটা ঘটনাটির কিছুই জানেনা। মা মেয়ে কক্ষ থেকে বেরোয়নি তাই।

শুধুমাত্র ফারজাদের মা লুকিয়ে ছেলের কক্ষে গিয়েছে তার ক্ষত সাড়াতে। তখন ফারজাদ উপুড় হয়ে বালিশে মাথা রেখে, খালি গাঁয়ে শুয়ে আছে। তার মা নাক টেনে টেনে ছেলের পিঠে মলম লাগাচ্ছে।

“নাক পরিষ্কার করে এসো মা। বাচ্চাদের মতো করছ।” জড়ানো পুরুষালি কণ্ঠ তার

তার মা নাক টেনে আরেকটু কান্না গেলার চেষ্টা করল। ফারজাদ ‘চ’ শব্দ করে বিরক্তিতে। তবে কিছু বলল না।

কিছুসময় পর ফারজাদের মা নিজেই মুখ খুলল,

“ভালো যখন বাসিস, ভালোই ভালোই সব আমাদের জানিয়ে দিলে কী হতো? কেন গেলি সেদিন নেশা করতে?” আফসোসে ভরা কাতর কণ্ঠ তার মায়ের।

ফারজাদ জবাব দিল না।

“ফুঁলের মতো মেয়েটা।” ক্ষীণ কণ্ঠে নিজে নিজে বলল তার মা।

“ফুঁলের সাথে আমার থ্রু ভুলটা হওয়ারই ছিল। তাও না হলেই ভালো হতো। আর হয়ে যখন গেছে, তখন সবকিছুর কনসিকুয়েন্সেস ফেইস করতেই হবে। ভুল করব, তার মাশুল দেব না, তা হয়? এত চিন্তা করছ কেন? যা হবার হবে।”

ফারজাদের আনমনা কণ্ঠ

“আর ফুলটা যে লাইফটাইম ট্রমা পেলো? সে যে অপবিত্র হয়ে গেলো?”

“কে বলেছে? ফুল অপবিত্র হয়না। সে আগেও ফুল ছিল, এখনো তাই আছে, শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত কাটা চলে এসেছে ফুলে। তাই সেই কাটাযুক্ত ফুলকে এখন কেউ সহজে নিতে চাইবেনা। আর কাটা-টা তোমার ছেলে জাদ।”

“ভালো তাহলে সত্যিই বাসিস বলছিস?”

“তোমারও সন্ধেহ হয়?”

“সব যে খুব কঠিন হয়ে গেলো জাদ! মেয়েটা এখন তোকে খুব ভয় পায়। তুই যখন আশেপাশে ছিলি, তখন পারছিল না মায়ের বুকের ভেতর ঢুঁকে যেতে। বুঝতে পারছিস কতো প্যানিক করছিল?”

“করবেই তো!”

তার মা ছেলের নির্লিপ্ততায় দুঃখে মলম দিতে দিতে জোরে চাপ দেয় পিঠে। ফারজাদ হেসে উঠল।

“এত হেলদোল ছাড়া কীভাবে আছিস? তোর চাচ্চু মেয়ে দেবেনা তোকে। কত বোঝালাম আমিসহ তোর ফুঁফিরা। কারো কথা শুনেনি। আর তুই হাসছিস।”

“তুমি চাচ্চুকে বোঝাতে গিয়েছিলে?” ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে সে।

“বোঝাব না একটু?”

‘চ’ শব্দ করতে শোনা যায় ফারজাদকে, পরপর বলে,

“আর কিছু বোঝাবেনা এই নিয়ে কাউকে। কিছু করার হলে আমিই করব, বোঝানোর হলেও আমিই বোঝাব। মেয়ে দেওয়ার আগে শাস্তি দিক, তাও সমস্যা নেই। তুমি এসব ঝামেলায় কারো কাছে কোনোকিছু বোঝাতে যাবেনা মা, এমনকি বাবাকেও না। অতসীকে চাইতে, কিংবা আমাকে কোনো শাস্তি দিতে চাইলে সেসব আটকাতে কাউকে কোনোকিছু বলবেনা বুঝতে পেরেছ? আর শুধু তুমি না, বাড়ির সবাইকেই মানা করে দেবে— যেন মেয়ে দেওয়ার জন্য চাচ্চুর কাছে অনুরোধ, জোর কিছুই না করে। যা করার আমিই করব।”

“তুই একা কী করবি? তুই চাইলে মেয়ে দেবে তোর চাচ্চু? মুখ ফিরিয়ে নেবে আরও।”

“নিক। যতো পারে মুখ ফিরিয়ে নিক। যখন আমায় ভালো লাগবে, তখনই নাহয় মেয়ে দেবে। তাও এটা সেটা বুঝিয়ে আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো প্রেশারাইজ করবেনা।”

“আর তোকে যদি কোনোদিনই পছন্দ না করে? আমার নাতি/নাতনিটার কী হবে?”

ফারজাদ সাথে সাথে মাথা তুলে এপাশ ফিরে। পরপর মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দেয়।

“মা, চুলগুলো টেনে দাও।”

“কী হলো? মাথা ব্যাথা করছে? বিচলিত কণ্ঠে তার মায়ের।

“উহু।” মাথা নাড়ে সে

“তাহলে চুল টানতে বলছিস যে?”

“এমনি।”

তার মা চুল টেনে দিতে দিতে আদুরে চাপড় দিল গাঁয়ে।

ফারজাদ কিছুসময় পর নিজে নিজে বলে উঠে,

“যে আসছে? ওর কথা মাথায় আসলে কোনো বাঁধা মানতে মন চায়না। যতদিন অতসীকে আমার না করতে পারছি, ততদিন ওর কথা বলো না।”

তার মা হেসে উঠল হাঁলকা।

“তাই? এখন তো এক বাড়িতেই আছিস? তাও এত অধৈর্য লাগছে? কিছুক্ষণ পর ওরা চলে যাবে। তখন কী করবি হু? নাকি একাডেমীতে গিয়ে গিয়ে বাচ্চা, বাচ্চার মা দুটোকেই বিরক্ত করা শুরু করবি?”

সাথে সাথে ফারজাদ মাথা তুলে তাকায়। কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চায়,

“ওরা চলে যাবে আজ?”

“তো থেকে যাবে? তোর চাচ্চুর অভিমান পড়েনি। আর না তো কোনোকিছু হাতে এসেছে এখনো অব্দি। সবাই আজকের রাতটা অন্তত থেকে যেতে বলেছিল। কিন্তু তারা থাকবেনা। যত রাত হোক চলেই যাবে।”

ফারজাদ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে অনুদ্দেশ্যে। কপালে ভাঁজ তার।

_

অতসীর মাকে শাশুড়ি ডেকেছে। হয়তো ছেলেকে বোঝাতে বলবেন যেন অতসী আর ফারজাদের বিয়ের জন্য মেনে যায়। কিন্তু ফারজাদের দাদী মূলত ছেলের মতো, ছেলে বউয়েরও অভিমান ভাঙাতে কিছু কথা বলতে ডেকেছিল। যদিও অতসীর বাবাকে বুঝানোর জন্যও অল্প করে বলছে। সাথে দুই ননদও তাদের তিক্ত কথার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করছে।

অতসী তখন রুমে একা। চোখ লেগে এসেছিল তার।

“অতসী”

আধো আধো ঘুমের মধ্যে কানের কাছে কারো ধিমি কণ্ঠের ডাকে বন্ধ চোখেই ভ্রু নড়ে উঠে অতসীর। স্নিগ্ধ কোমল চেহারা তার, আঁকা আঁকা ঠোঁটদুটো, আর সরু নাকটা দেখতে কী নিখুঁত! যেন সৃষ্টিকর্তা যত্ন সহকারে বানিয়ে অতসীফুলে এই কোমল সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। সেসবেতে নজর বুলিয়ে ফের আওয়াজ তুলল,

“অতসী, ক্যান ইউ হিয়ার মি?”

অতসী কাউকে তার নাম ধরে ডাকতে শুনে ধীরে চোখ খুলে তাকায়। চোখের মণি এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে, মুহূর্তপর অনুদ্দেশ্যে দৃষ্টি স্থির করল।

“হু… কে?” মিহি কণ্ঠটা ঘুম ভাঙায় জড়ানো শুনাচ্ছে। ফারজাদের কানে ফের যেন বায়োলিনের সুর বাজলো।

সে গাঁঢ় শ্বাস টেনে সামলে নিজের উপস্থিতির জানান দেয়,

“আমি, ফারজাদ”

কিছুপল অতসী থেমে থাকল। মাত্র ঘুম ভাঙায় ঘোর এখনো সেভাবে কাটেনি। সে আদৌ ঠিক শুনছে কী না বুঝতে ফের জানতে চাইল,

“কে?” দৃষ্টিহীন চোখে তাও সুপ্ত শঙ্কা।

ফারজাদ তা দেখে গভীর শ্বাস টানে। অথচ অতসী সেই নিঃশ্বাসেই ঘ্রাণ শুকে নিয়েছে। শ্বাস প্রশ্বাস ক্রমশ গাঁঢ় হতে লাগলো তার। ফারজাদ ফের বলে,

“আমি, ফারজাদ।”

“আপনি এখানে কেন এসেছেন? আমার মা কই? সবাই কই? আপনি আমার রুমে কেন?” অতসী চোখ বড় বড় করে সামনে কোথাও তাকিয়ে আছে। আর সুপ্ত ভীতি নিয়ে অস্থির কণ্ঠে কথাগুলো বলে। ফারজাদ তাকে শান্ত করার নিমিত্তে বলে,

“কাম ডাউন অতসী। প্লিইজ। আমি চলে যাবো একটু কথা বলে। জাস্ট দুই মিনিট লাগবে।”

“না। আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই। আপনি কেন এসেছেন এখানে? আবার আমায় একা দেখে চলে এসেছেন তাইনা? আমি চিৎকার করব। চলে যান আপনি।”

“প্লিজ কাম ডাউন অতসী। আ’ম নট হেয়ার ফোর হোয়াট ইউ’আর থিংকিং। প্লিজ কাম ডাউন, প্লিজ” তাকে শান্ত রাখার নিমিত্তে নিম্ন কণ্ঠেই কথাগুলো বলে সে। কিন্তু অতসী মানল না।

“আপনি এখান থেকে চলে যান বলছি তো! আমার আপনার সাথে কোনোরকম কথা নেই। যান বলছি। মাআআ…” নিজের কথা শেষ করেই উচ্চস্বরে মাকে ডাকতে শুরু করে সে।

“হেই, অতসী। দুই মিনিট লাগবে বলছি তো। প্লিইজ! জাস্ট গিম্মি টু মিনাট। আমি কিছু কথা বলেই চলে যাবো। ট্রাস্ট মি!”

“মাআ” দূর্বল কণ্ঠে যথাসম্ভব উচ্চশব্দে আওয়াজ তুলছে সে।

“অতসী” কাতর চোখে তাকায় ফারজাদ। একটুও শুনতে চাইছেনা মেয়েটা। শুধু কথা বলেই চলে যাবে ফারজাদ।

“মাআআ” আরও উচ্চস্বরে ডাকল সে এবার।

“প্লিইজ অতসী” ফারজাদের মন চাইছে অতসীর মুখে আঙ্গুল চেপে যা বলার আছে সবটা বলে চলে যেতে। কিন্তু সেই সামান্য ছোঁয়াটা দিতেও তার বাঁধছে।

অতসী দূর্বল কণ্ঠে আবার উচ্চশব্দে ডাকতে মুখ খুলে। ফারজাদ এক নজর বন্ধ দরজার দিকে তাকায়। মনে হচ্ছে কেউ চলে আসলো যেকোনো মুহূর্তে। সে অতসীকে বারবার চিৎকার করা থেকে রুখতে অকস্মাৎ বলে,

“আমাদের বেইবির প্রমিস অতসী। তুমি কাউকে ডাকবেনা আর, চিৎকার করবেনা একদম।”

অতসী থমকে গেলো। কোথাও একটা কিছু হলো তার। শরীরে কেমন একটা ঝাঁকি দিয়ে উঠেছে।

‘আমাদের বেইবি’ এটাই তো শুনল। গাঁ গুলানো অনুভূতি হচ্ছে তার। ভীষণ রকম গুলিয়ে উঠছে। অস্থির চেহারাটায় অসহায়ত্ব, আর কাতরতা ফুঁটে উঠে।

“কী বললেন এটা?”

ফারজাদ সে থেমেছে দেখে সন্তুষ্ট। তবে অতসীর চেহারার ভঙ্গিমা পরিবর্তন হতে দেখে ভ্রু কুঁচকে এলো।

“কী বলেছি?”

অতসী কাঁতর এক ঘৃণা মিশ্রিত কণ্ঠে বলে,

“আপনার মতো জগন্য মানুষ আমি আর দুটো দেখিনি।”

ফারজাদের চোখে কিছুটা বিভ্রান্তি দেখা যায়। আবার কোন কথায় কষ্ট পেলো বুঝতে পারছেনা সে। কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,

“কী হয়েছে? টেল মি! আ’ল বি সরি, এন্ড অলসো উইল নট রিপিট ইট।”

“আপনাকে আমি মেরে ফেলতে পারলে ভালো লাগতো।” ঘনঘন শ্বাস টেনে সে ঘৃণ্য কণ্ঠে বলে।

ফারজাদের কুচঁকানো কপালের ভাঁজ সরব হয়। গায়ে এখনও তার অনেকটা ব্যাথা। কিন্তু মাকে এখন ভালো লাগছে বলে রুমে পাঠিয়ে দিয়েছে। পরপর শার্ট জড়িয়ে আড়ালে এখানে চলে এসেছে। চুলগুলো এখনো এলোমেলো, কপালে এসে কিছু চুল অগোছালোভাবে পড়ে আছে। সে অতসীর পাশে বিছানায় বসেছিল। আরেকটু সরব হয়ে তার দিকে পূর্ণদৃষ্টি ফেলে বসলো। পরপর জানতে চায়,

“শাস্তি দিতে চাও আমায়?”

অতসী সাথে সাথেই ক্ষোভ নিয়ে বলে,

“দিতে চাই। আপনাকে কঠোর শাস্তি দিতে চাই আমি।”

“কী শাস্তি বলো? তুমি যেটা চাইবে সেটা হবে। বলো আমায়।”

অতসী একটু থামে। ফারজাদ হঠাৎ এ কথা বলছে কেন বুঝতে পারেনা সে। তার সাথে মজা নিচ্ছে বলে তো মনে হচ্ছেনা কণ্ঠ শুনে। সে শক্ত কণ্ঠে বলে,

“যে শাস্তিই দিতে চাই। সেটাই মেনে নেবেন?”

“হ্যাঁ নেবো। আমি তোমার ঠিক করা শাস্তিই গ্রহণ করতে চাই। তুমি বলো।”

“তাহলে আমায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছেন যেটা দিয়ে, ওটা কেটে ফেলুন।”

ফারজাদ কিছুপল চেয়ে রইলো। সরল, মনোযোগী চোখে চেয়ে রইলো। বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। অতসী আসলেও এটাই চাইছে। সে পরপর উচ্চারণ করে দুটো শব্দ,

“ঠিক আছে, তাই হোক।”

অতসী শ্বাস টেনে বসে থাকে। ফারজাদের চেহারার ভঙ্গিমা, সে কী করছে — সবটা দেখার জন্য দৃষ্টির অভাববোধ করলো। তবু বাকি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কী হচ্ছে বোঝার প্রচেষ্টায় থাকে।

ফারজাদ এদিক-ওদিক তাকিয়ে বিছানার সাইড টেবিলে গিয়েই চোখ থামাল। শরীর টেনে ওখানে থাকা ফলের ঝুড়ি থেকে ছুরিটা নিয়ে নেয়। পরপর অতসীর সামনে এসে নিজে ধরে হাতে তুলে দিতে গিয়েও থেমে যায়। একনজর সতর্ক ভঙ্গিতে বসে থাকা অতসীপানে চেয়ে বলে,

“হাত তুলো অতসী।”

“হু?”

“হাতটা তুলে মেলে ধরো।”

অতসী ফারজাদ কী করছে জানেনা। সে তাও কথা অনুযায়ী হাত তুলে মেলে ধরলো। সাথে সাথে ফারজাদ হাতে থাকা ছু ‘রিটা তার হাতে সাবধানে তুলে দেয়। যেন কোনোরুপ আঘাত, বা তার ছোঁয়া না লাগে।

অতসী হাতে সরু কিছুর অস্তিত্ব পেয়ে জানতে চায়,

“হাতে কী দিয়েছেন?”

“ছু ‘রি”

“ছু রি কেন?”

“কাঁটবেনা?”

বলতে বলতে প্যান্টের বেল্ট খুলতে শুরু করেছে সে। ফারজাদ মোটেও মজা করছেনা। সে অতসী এটা চাইলে এটাই করবে। বেল্টের খোলার আওয়াজ পেয়ে অতসী কেঁপে উঠে। সতর্ক দৃষ্টিতে শঙ্কা ফুঁটে উঠে। এই তো সেদিন এভাবে,

ঠিক এভাবে তাকে বিছানায় বিবস্ত্র করে ফেলে, তার সামনে দাড়িয়ে তাকে লুলোপ দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে বেল্ট খুলছিল, জিপার খুলছিল— সবটা সে বুঝতে পেরেছিল শব্দগুলো শুনে, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। আর প্রতিবার চিৎকার করে বাঁচার আকুতি করতে চাইছিল। অথচ মুখ দিয়ে শব্দ বের করার উপায় ছিলনা তার কাছে। কারণ মুখটাই ছিল বাঁধা। অতসীর সেরাতের বীভৎস অনুভূতিগুলো কল্পনায় ভেসে উঠল। আর এই মুহূর্তেও একইভাবে সেই বেল্ট খোলার ধাতব আওয়াজ, জিপার খোলার ঘেরঘের শব্দ। সে চিৎকার দিয়ে হঠাৎ কানে হাত চেপে ধরে। ছু ‘রিটা কোথায় ছুড়ে ফেলেছে তার ঠিক নেই। সে কানে হাত দিয়ে চেপে ধরে ঘনঘন শ্বাস টেনে। পরপর হতদন্ধের মতো পাশ হাতরে চাঁদর খুঁজে। পেয়ে গায়ে টেনে নিলো সে ওটা। গলা অব্দি আবৃত করে গুটিশুটি মেরে গোঙাতে থাকে।

ফারজাদ চোখ মুখ উল্টে তাকে দেখছে। সবার আগে সে জিপার ফের বন্ধ করলো। বেল্ট ঠিক করতে পারল না। শ্বাস আঁটকে আসছে তার। চোখ দুটো উল্টে এসেছে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। বুকের দিকে গেঁথে যাওয়া ছুরিটার দিকে তাকায় সে বহুকষ্টে।

প্রেমভুবনের অতসী পর্ব ১১ গল্পের ছবি