প্রেমভুবনের অতসী

পর্ব - ১০

🟢

অতসীর বাবা মা ছুঁটে আসে। ফারজাদের কাছ থেকে নিয়ে নিলো তাকে তার মা। বিচলিত কণ্ঠে দুজনে গালে হাত দিয়ে ডাকতে থাকে,

“অতসী… অতসী মা চোখ খোল।”

“এই অতসী! কী হয়েছে, চোখ খোল মা।”

কিন্তু অতসী জবাব দেয়না। প্রত্যেকে ওকে অজ্ঞান হতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নিবিড় বের হয়ে যাওয়ার পরও তার বাবা মা থেকে গিয়েছিল। এমন মুহূর্তে একা ছেড়ে গিয়ে বোনের অভিমানের পাল্লা ভারী করতে চায় না অতসীর খালা। সকলে অতসীকে অচেতন হতে দেখে কুণ্ঠিত। ফারজাদ কিছুটা দূরে একপাশে দাড়িয়ে আছে। অচেতন অতসীকে একদৃষ্টে দেখছে সে। আজ যা হয়েছে, সেসবের পর কেন জানি তার মনে হচ্ছে অতসী মানসিক দিক দিয়ে কিছুটা বদলে গেলো।

উহু! বদলও না, ভাবনাতে আগে যা ছিল তাই আছে; শুধু যা চায় তা সম্মুখের ব্যক্তির সামনে অল্প হলেও জাহির করার সাহস পেয়েছে। অবশ্যই বিষয়টা ভালো।

তবে তার জন্য পরিস্থিতি অনুকূলে আনাটা কঠিন হয়ে দাড়াবে। মায়ের কথায় অভিমানে সে যা চায় তা হয়তো দ্বিধা সংকোচ উপেক্ষা করে জানাবে এবার থেকে। ফারজাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তো তাই বলছে।

ফারজাদ দৃষ্টিহীন ঐ চোখ দুটোর ভাষা, আর নাজুক ঐ শরীরটার কিংবা স্বচ্ছ নীলাভ ফুলের ন্যায় চেহারাটার অঙ্গভঙ্গিতে মেয়েটার মনের অবস্থা, চাওয়া— এসব বুঝতে শিখছে হয়তো কোথাও একটা।

ডক্টর ডেকে অতসীর চেকাপ করানো হলো। অতিরিক্ত ধকলে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে সে। সকাল থেকে শপিং এর ঝাক্কি আর এখন যা যা হলো, তাতে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত সে।

অতসীর বাবাকে অনেক বুঝিয়ে সুজিয়েও অতসী, আর ফারজাদের বিয়ের জন্য রাজী করাতে পারলো না কেউ। অবশ্য চেষ্টা করেছেই শুধু ফারজাদের মা। বাকিরা নিজেদের ভুল–ত্রুটির জন্য ক্ষমা চায়, জানা–অজানায় করা অন্যায়ের দায় নেয়। কিন্তু তাতেও কিছু হলো না। অতসীর বাবা নিজেও কোনো সমঝোতায় এলেন না মেয়ের বিষয়টা নিয়ে, আর স্ত্রীকেও আসতে দিলেন না। বাদবাকি বিষয় নিয়ে তাঁর কোনো অভিমান নেই— এমনটাই জানালেন। কিন্তু কথাগুলোর আড়ালে যে নিজের মানুষদের প্রতি জমে থাকা অভিমানই কথা বলছে, সেটা কারও বুঝতে বাকি রইল না।

ফারজাদ অদ্ভুদভাবে চাচীর কথাগুলো শুনার পর থেকে, অতসীর ছুঁতে মানা করে দেওয়ার পর থেকে— নিশ্চুপ হয়ে আছে; কোনো কথা সে বলেনি। শুধু নীরবে অতল সমুদ্রের মতো গভীর চোখজোড়া দিয়ে অচেতন অতসীকে দেখে গেছে।

সবাই অতসীকে রাখা রুমটাতেই ছিল শুরুতে, ডাক্তার ভিড় কমাতে বলার পর ফারজাদের দাদীর রুমে গেলো সবাই।

ফারজাদ কোথাও যায়নি। সে বসার ঘরেই রয়ে গেছে। যেখানটায় দাড়িয়ে ছিল সে বরাবর সোফায় বসে পড়ে অন্যমনস্কতায়। দু’হাঁটুতে কনুই ঠেকিয়ে হাত দুটো মুখের কাছে এনে একত্রিত করে। সামনে তাকিয়ে থাকে —দৃষ্টি অন্যমনস্ক, অথচ মনে হচ্ছে গভীর মনোযোগে কিছু একটা ভাবছে সে।

ওপর থেকে আরমান নেমে এসে ধীরে একপাশের সিঙ্গেল সোফায় বসে পড়ে। অন্যমনস্ক ফারজাদ চোখের কোণ ঘুরিয়ে এক পলক তাকায় তার দিকে। আরমানের চোখে নিজের প্রতি জমে থাকা অনেকগুলো প্রশ্ন দেখতে পায় সে। তার সাথে ঠিক ঘৃণা নয়— তবে তার খুব কাছাকাছি কোনো এক অনুভূতির ছায়াও ধরা পড়ে। ফারজাদের ঠোঁটের কোণে অন্যমনস্ক একটুকরো হাসি খেলে যায়। সে আর কিছু না বলে আবার সামনে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়।

আরমান বেশিক্ষণ নীরব থাকল না। প্রথম প্রশ্নটা করে ফেলল,

“এতটাও কঠিন ছিল সেদিন পরিস্থিতি সামলানো ফারজাদ ভাই? নাকি আসলেও অতসী ছিল বলেই?”

“তোর কী মনে হয়?”

“মনে তো অনেক কিছুই আসছে। কিন্তু একটার সাথে আরেকটা লিংকাপ হয়না। কীভাবে বুঝব কোনটা সঠিক?”

“এত ভাবাভাবির কিছু নেই আরমান। আমি র‍্যা*পি স্টই।” ঠাণ্ডা এক চাঁপা কণ্ঠ।

আরমানের চোয়াল শক্ত দেখাল সাথে সাথে। ঠোঁট দিয়ে জিহ্বা ভিজিয়ে হালকা করে ঘাড় বাকাল সে। হয়তো সামলানোর প্রয়াস।

ফারজাদ দৃষ্টি সামনেই। নিজের প্রতি তিরস্কার, না কি আরমানের উদ্দেশে —তা স্পষ্ট নয়। তবে ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত একচিলতে হাসি টেনে বলে,

“মারতে ইচ্ছে করছে আমায়?”

“আজ যা যা বললে চাচীমণিকে। কতটুকু ধরা যায়?”

ফারজাদ উল্টো প্রশ্নে একনজর ফিরে তাকায়, তবে জবাব দিল না।

“নাকি একবার পেয়েছ বলে মোহতে আঁটকে সেটাকে ভালোবাসার নাম, দিচ্ছ?” তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার। তাও ফারজাদ শান্তভাবেই জবাব দিল,

“ঐ ঘটনার আগেই রিয়েলাইজ করেছি আরমান।”

“মোহ নয় বলছ?”

সে নিশ্চুপ থাকে, জবাব দিল না।

“এখন বিয়ের জন্য চাচীমণি রাজী থাকলেও চাচ্চুর সাফ মানা। আর যতদূর মনে হয় অতসীরও মত থাকবেনা। সেক্ষেত্রে কী করবে?”

ফারজাদ এবারেও জবাব দিল না। তবে অনিয়শ্চয়তার চোখ দুটো তুলে এক নজর তাকাল ভাইয়ের দিকে। কোন দিশায় হাঁটবে সেটা স্থির করতে পারছেনা সে এখনো।

“ওর খালাতো ভাই নিবিড়ও কিন্তু লাইনে আছে। অনাগত সদস্য নিয়েও তার কোনো সমস্যা নেই যতটুকু বুঝলাম। এটা হালকাভাবে নেওয়ার মতো না। ওদিকে কিছু হলেও হয়ে যেতে পারে চাচ্চু চাইলে। এসব সম্ভাবনার ক্ষেত্রে তোমার পদক্ষেপ কী হতে পারে জানতে চাইছি।”

ফারজাদ নির্বিকারচিত্তে নীরবতাই অবলম্বন করল আবার।

“চুপ করে থেকো না ফারজাদ ভাই। যে পরিস্থিতিতে এসে থেমেছে সবটা; সুস্থ, স্বাভাবিকভাবে অতসীকে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছেনা কেউ — এতটুকু নিশ্চিত। এখন তুমি কী আবার জবরদস্তির পদ্ধতি অবলম্বন করবে সবটা ঠিক করতে?”

ফারজাদ ঠিক করার মানসিকতায় জবরদস্তি করলে ঠিক তো হবেনা, উল্টো সবটা আরও জগন্য পর্যায়ে গিয়ে দাড়াবে। তাই শঙ্কিত, আর সন্ধেহের দৃষ্টিতে চেয়ে কথাটা জানতে চাইল আরমান।

“সেদিন সাকিব আসবে বলেছিলাম বাড়িতে, আমার বন্ধু। মনে আছে?”

“কোন দিন?”

ফারজাদ এক নজর তাকিয়ে জবাব দেয়,

“ঘটনার দিন”

আরমানের মনে পড়েছে। তবে হঠাৎ সেই কথা কেন উঠছে বুঝতে পারছেনা। ভ্রু কুঁচকে সে জবাব দেয়,

“হ্যাঁ মনে পড়ছে, কেন?”

“সাকিবের সাথে অন্য যে ছেলেটা ছিল মোটাসোটা করে অল্পবয়সী! ওটা একজন কাজী।” আরমান প্রথমে না বুঝে ভ্রু কুঁচকে তার কথা শুনলেও, পরক্ষণে বিস্ময় খেলে গেল কিছু আঁচ করে।

কিছুপল নীরবে চমকিত আর গম্ভীরচিত্তে সবটা মাথায় ঢুকাল সেদিনের। ফারজাদ তাকে সকাল সকাল ফোন দিয়ে বলেছিল তার বন্ধু সাকিব আসবে, সাথে অন্য এক বন্ধুও থাকবে। তাদের যেন নির্বিঘ্নে তার রুমে পৌঁছে দেয়। কারণ সে আগের দিন রেইস হেরে এসে ড্রাংক হয়ে রুমে পড়েছিল। সকালেও অবস্থা খুব একটা ঠিক ছিল না। তাই আরমানকে ফোন দিয়ে বলেছিল, নিচে তার দুই বন্ধু আসবে - তাদের কোনোদিক না দেখিয়ে সোজা যেন তার রুমে নিয়ে যায়। আরমানও তাই করেছে কোনো প্রশ্ন ছাড়া। কারণ অতসীর ঘটনার পর থেকে বাড়িতে বন্ধুদের তেমন একটা আনেনা তারা দুই ভাই। আর আনলেও এমন সাবধানতা অবলম্বন করা হয়। তাই তেমন কোনো ভাবনা মাথায় আনেনি তখন আরমান। কিন্তু এখন ফারজাদের কথা শুনে রীতিমত মাথা ঘুরছে তার। শিরাগুলো ফুলে উঠতে দেখা যায়।

“তো এখন বলতে চাইছ তোমার হাতেই সবকিছু!”

ফারজাদ হাসে ক্ষীণ। ভাইয়ের যে তার কথাবার্তা, কাজকর্ম— সবকিছুতেই অসহ্য এক ক্রোধ জাগছে তা সে বুঝতে পারছে,

“আমি এসব কিছু কাজে লাগাতে চাইনা। এত প্যারা খাস না। অর্ধ অচেতন অবস্থায় কবুল বলেছে; মনেও নেই ওর। সাইনও করেছে থ্রাম্বপ্রিন্ট দিয়ে। ঐ কাজী তখনই বলেছিল এই বিয়ে বৈধ হবেনা।”

“তাহলে করেছ কেন এটা? হোক বৈধ, অবৈধ। তাও কোথাও একটা আঁটকে থাকতে হবে এটা নিয়ে। এ কথা জেনেও কী ইচ্ছে করে করেছ এমনটা? যাতে সেই সবকিছু বাই হুক অর ক্রুক তোমার ফেভারেই থাকে?” চাঁপা ক্রোধ তার কণ্ঠে।

“এত কিছু ভাবিনি। আমার পাগল পাগল লাগছিল। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না ঐ মুহূর্তে। শুধু এটা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে মনে হয়েছিল।” শান্ত কণ্ঠ তার, ফের বলে, “বাট এখন এটা আর ম্যাটার করছেনা। সো লিভ ইট! শয়তান মাথায় ঘুরছিল তখন। কীভাবে সবটা ঠিক করার নামে ধামাচাপা দেবো ওটাই খেয়ালে আসছিল।” দীর্ঘশ্বাস টেনে বলে, “এই নিয়ে কোনোরকম ক্লেইম তুলে চাচ্চু আর চাচীমণিকে প্রেশারাইজ করতে চাইছিনা। ওয়ান অন কথা বলে, বুঝিয়ে সুজিয়ে যতটুকু ঠিক করা যায় করব। নয়তো কতদূর কী হয় দেখা যাক।”

“ঠিক হবে এমনটা ভাবছও কেন? বাবা, আর বড়বাবার হাতে বিচার তুলে দিয়েছে চাচ্চু। তোমার কোনো আইনি সাঁজাও তো দিতে পারে। কী করবে তখন?”

চোখ তুলে তাকাল ফারজাদ। দুসেকেন্ড নজর মিলিয়ে তাকিয়ে রয়।

_______

অতসী বিছানায় শুয়ে আছে তখন। কেউ নেই তার মা ছাড়া। জ্ঞান ফিরতেই তাকে স্যুপ খাইয়ে দিতে চাইছে তার মা। সে মুখে নিচ্ছেনা এক চামচও। বারকয়েক নরম কণ্ঠে বলেও মেয়ের মুখে তোলা যাচ্ছেনা দেখে অতসীর মা দিলেন এক ধমক,

“কী সমস্যা তোর? আবার কী তামাশা করছিস? খেয়ে নে চুপচাপ। সারাদিন লেগে থাকতে পারব না তোর পিছে। খেলে খা নাহয় সব একসাথে ঢুকিয়ে দেবো মুখের ভেতর।”

অভিমানে বুক ভার হয় তার। সেই থেকে একটা কথা তার সাথে সুন্দর করে বলছেনা মা। নরপশুর খবলে পড়েছিল তাদের অতসী, আর এত যে কষ্ট পেয়েছে — এসব জানার পরও একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিল না তার পাষাণ মা। এজন্যই সে কাউকে বলতে চাইনি। সবাই যেকোনোভাবে তার দোষই খুঁজে বের করবে বেশ জানত। তারপর আড়ালে যে সম্মানহানী হয়েছে সেটা লোকমুখে চলে আসতো। কিন্তু ঐ লোকটার আর শাস্তি হতইনা।

সে নাক টেনে হাঁ করে। খাইয়ে দিতে লাগলো তার মা। বেশ কয়েকচুমুক খেলো আস্তে আস্তে। একসময় অতসী নিজেই ধীরে মুখ খুলল,

“তোমরা খেয়েছ?”

“না।”

“কেন? বাবা কোথায়? বাবা খেয়েছে?”

“খায়নি কেউ।”

“এখনো কী রাত হয়নি? তোমরা খেলে না যে! আমরা কী এখন আমাদের ফ্ল্যাটে মা?”

“উহু”

“তাহলে?”

“ফারিশ মহল।”

অতসীকে কেমন থমকাতে দেখা গেলো। সেকেন্ড কয়েকের মতো জমে থাকে। হয়তো এখনো ফারিশ মহলেই রয়ে গেছে তারা— এটা আশা করেনি। থমকে থেকে ধীরে শ্বাস প্রশ্বাস ঘন হতে দেখা গেলো।

“আমরা এখনো এখানে কেন মা? বাসায় ফিরিনি কেন?” কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠ তার।

তার মা স্যুপের বাটিতে চামচ ঘুরাতে ঘুরাতে মেয়ের হাবভাব পরখ করছিল। কী নিষ্পাপ এই চেহারাটা। কেউ কী করে ঘৃণা করে তার এই আদুরে মেয়েটাকে? দেখলেই তো মায়া মায়া লাগে, বুকের ভেতর ঢুকিয়ে নিতে মন চায়। অথচ এ বাড়িরই কেউ কেউ নাকি এই মেয়েটাকে অপছন্দ করে।

“কেন? অসুস্থ হয়ে পড়ে আছিস, আর কোথায় যাবো? এটাই তো তোর আসল বাপের বাড়ি। আর দুদিন বাদে হয়তো শ্বশুর বাড়িও হয়ে যাবে। তখন?”

“মাআআ?” কুণ্ঠিত স্বর অতসীর

“কী মা?”

“এসব কী বলছ? আমাকে তোমরা দিয়ে দেবে? রাখবেনা তোমাদের সাথে?” চোখ ভিজে এলো তার।

“তুই ফারজাদসহ সবার সাথে এখানে থাকতে চাস না?”

“অবশ্যই না, উনাকে আমার ঘৃণা লাগে। প্লিইজ উনার ওসব কথায় আমাকে দূরে সরিয়ে দিওনা। আমার খুব কষ্ট হবে মা। আমি উনার সাথে এখানে থাকব না”

তার মা অদৃশ্য ক্ষোভে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “মাথামোটা মেয়ে। এখন আমার সামনে উনার সাথে থাকব না, তোমাদের সাথে থাকব— এসব বলতে পারছিস। ঐ ছেলেটাই যে তোর সর্বনাশ করেছে এটা সবার সামনে বলতে পারিস নি তখন? যখন আমরা জানতে চাইছিলাম বারবার, তখন আমাদের জানাতে পারলি না একবারো যে ঐ ছেলেটা তোর সম্মানে হাত দিয়েছে? একদিন না একদিন এই ঝামেলা তো হওয়ারই ছিল, কিন্তু পেটে যেই ঝামেলা নিয়েছিস? ওটা থেকে অন্তত বেঁচে যেতে পারতি আগে আগে জানালে। এখন এটা নিয়ে কার ঘাড়ে উঠবি? তোর বাবা গো ধরেছে ঐ ছেলেকে মেয়ে দেবেনা। আমার একটা কথা শুনছেনা। এটা না আসলে তোকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যেতাম। এখন কী করবি, কীভাবে বাঁচবি আমায় একটু বল? কীভাবে নিজে সুস্থ জীবন কাঁটাবি, আর আমাদেরও বা শান্তি আসবে কীভাবে?” ভঙ্গুর কণ্ঠ তার মায়ের, “কেন বললি না অতসী? তখন জানিয়ে দিলে আজ এত দূর গড়াত না জল। এখন এটা না রাখতে চাইলেও নতুন সমস্যা শুরু হবে। তোর বাবা মানবে কী না তার ঠিক নেই। আবার নাকি তোদের গোষ্ঠী ঝামেলা করে তারও ঠিক নেই। এটা না থাকলে কিছু অন্তত ভাবা যেতো। ফারজাদের দিকে ফিরেও তাকাতাম না আর। বরং শাস্তির জন্য লড়তে পারতাম। এখন কী করবি সব ভালোই ভালোই মেনে না নিয়ে তোরা বাবা মেয়ে —আমায় একটু বোঝা।”

অতসী বুঝল তার অনাগত বাচ্চা নিয়ে বলছে তার মা। তবে বিশেষ কোনো অনুভূতি কাজ করল না এই বাচ্চা নিয়ে তার। শুধু ফারজাদ থেকে দূরে থাকতে চায় সে। বাবা মায়ের সাথে থাকতে চায় অতসী; আর কিছুনা। কোনোভাবেই ঐ পশুর মতো নির্দয় লোকটার কাছে গিয়ে উঠতে চায়না।

“সব বলব মা। এবার থেকে তোমাদের সব বলবো আমি। এবারের মতো মাফ করে দাও প্লিজ। আর কিছু লুকাব না। আমাকে দিয়ে দিওনা তোমরা।”

হাত আঁকড়ে, শরীর টেনে মায়ের গা ঘেঁষে বসে যায় সে। তার মা চাঁপা রাগে না চাইলেও, শেষ অব্দি আগলে নিলো। চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে ঝুঁকে কপালে চুমু এঁকে দেয়।

“শুধু আমাদের না। সবাইকে বলবি। নিজের মনের সব কথা বলে দিবি যেখানে বলা দরকার। চুপচাপ থাকিস বলেই তো সবাই বলার সুযোগ পায়। চুপ থাকবি না মা।”

“প্রমিস চুপ থাকব না। কিন্তু আমার সাথে ওভাবে ধমকে কথা বলো না আর। তোমরা সবার মতো করলে আমার কষ্ট হয়।”

তার মা আরও আগলে নিলো মেয়েকে।

“ফারজাদ কোনো জোর জবরদস্তি করেছিল এরপর আর? একাডেমীর ওখানে যেতো বলল যে!”

“হ্যাঁ, ড্রাইভার আঙ্কেল, আর রুমা আন্টিকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে, আমাকে কোথায় কোথায় জানি নিয়ে যেতো। আমাকে ছুঁয়ে দিতো। আমি কোনোকিছুতে মানা করলে যেখানে থাকি, ওখানে ঐ অবস্থায় একা ফেলে চলে যাওয়ার ভয় দেখাত।” অশ্রু ছেড়ে কোলে মুখ গুজল সে মায়ের।

“ছুঁয়ে দিতো মানে? সেদিনের মতো কিছু আর…”

“ন না, হাত ধরা, চ চুমু খাওয়া, জড়িয়ে ধরা —এসব” কাঁপা কাঁপা সংকোচে জড়ানো গলা তার।

“থুথু ছুড়ে দিতে পারলি না তখন?” পোক্ত কণ্ঠে বলে তার মা। বিপরীতে অতসী কিছুটা উৎসাহী কণ্ঠে বলে,

“দিয়েছি তো মা। মাঝরাস্তায় একবার থুথু ছুড়ে দিয়েছিলাম। মুখেই লেগেছিল হয়তো।”

শুনে ভালো লাগলেও কিছুটা শঙ্কা ফুঁটে উঠল তার মায়ের চেহারায়।

“তোকে আঘাত করেছে? লোকজন দেখেছে?”

“না, কিছুই বলেনি, আর আঘাতও করেনি। কয়েকজন এসে কী হয়েছে জানতে চেয়েছিল। কিন্তু…”

“কিন্তু?” কৌতূহলী কণ্ঠ অতসীর মায়ের। সে ইতস্ততায় না বলতে চাইলেও মাকে প্রমিস করেছিল বলে লুকাল না,

“বলেছে, আমি উনার ব বউ, রাগ… মানে ঝগড়া হয়েছে তাই রাগে করে ফেলেছি— এমনটা বলেছিল। তার, তারপর সবাই চলে যায়।”

_

ফারজাদ আর আরমান তখনও বসার ঘরে সোফায়। প্রাচী সিঁড়ি বেয়ে নেমে বলে,

“ডাকছে ওপরে।”

কাকে বলেছে সঠিক বোঝা গেল না। দুজনে চোখ তুলে তাকায়। আরমান কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,

“হু?”

“ডাকছে”

“কাকে ডাকছে? কে?” কুঞ্চিত ললাট

প্রাচী এক নজর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ফের আরমানের দিকে দৃষ্টি ফেলে,

“ওপরে রুমে ডাকছে বাবা। তোমাকে না।”

ফারজাদ তাকেই ডাকছে এ কথা বুঝল। বোন তার সাথে সরাসরি কথা বলছেনা। নরম, অন্যমনস্ক চোখে দেখল সে তা। আরমানও বুঝল বিষয়টা। কথা না বাড়িয়ে ফারজাদ উঠে চলে যায় ওপরে।

_

ফারজাদের বাবা, ফারজাদ, অতসীর মা, আর অতসী ছাড়া প্রত্যেকে দাদীর রুমে ছিল তখন। অতসীর খালা আর খালু চলে গিয়েছে একটু আগে। অতসী আর তার মা দুতলার একদম কোণার দিকের রুমে। আর বাকিরা সবাই ঠিক তার বিপরীতে অন্যপাশের রুমগুলোতে। অতসীর দাদীর রুমে থাকা প্রত্যেকে নির্বিকারে মায়ের কথায় না চাইতেও বসে থাকা অতসীর বাবাকে নানান কিছু বুঝাচ্ছে, আর বারে বারে মাফ চাইছে তখনও।

নিজেদের কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ ফারজাদের বাবা মায়ের রুম থেকে ফারজাদের বাবার ক্রমাগত রাগী কণ্ঠ ভেসে আসতে শুনল সবাই। একের পর এক বিচ্ছিরি গা ‘লি, আর ঘৃণ্য সব বুলি ভদ্রলোকের কণ্ঠে। সবাই কুণ্ঠিত নেত্রে এঁকে অপরের দিকে তাকায়। কী হলো বুঝতে পারছেনা। প্রাচী জানালো, তার বাবা একটু আগে ভাইয়াকে রুমে ডেকেছিল।

সকলে বুঝল ফারজাদের উদ্দেশ্যেই ছোড়া এই কান ঝাঁ ঝাঁ করা জগন্য শুনতে গা’ লিগুলো। তবে চোখে মুখে যে আতঙ্ক আর একরাশ শঙ্কার ঢেউ খেলে গেলো সকলের— তা এই গালির জন্য না। বরং এঁকের পর এক চাবুকাঘাতের মতো যে তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে আসছে কানে, তার জন্য।

প্রেমভুবনের অতসী পর্ব ১০ গল্পের ছবি