মৌনপ্রেম

পর্ব - ৯

🟢

বাড়ির ভেতরে সোফায় গিয়ে বসেছে নীলয় তখন বাইরে থেকে এসে। দিগন্ত আর মাহদের সাথে কথা বলছে। অন্তিকের ফুফু এসে নীলয়কে দেখে ফর্মাল কথা বলে অন্তিকের কথা জানতে চাইলো।

নীলয় বললো বাইরে বাগানের ওখানে ভাবির সাথে আছে। একথা শুনে ফুফু আর কিছু বললোনা। তবে মাহাদ বিস্তারিত জানতে চাইলো ওদের কাছে বিয়ের ব্যাপারে।

দিগন্তই বলতে শুরু করলো পুরো ব্যাপারটা।

||অন্তিকের দাদি ছাড়া বাকি সবাই এসেছে আজ তাহেরা আমিনের ননদের ছেলের বিয়েতে। তবে তাদের দুই পরিবারের মধ্যকার এই সম্পর্কটা তেমন একটা গুরুত্ব পাইনা। তারা একে অপরকে পারিবারিক বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বিয়েতে এসেছেও সেই পরিচয়েই। বিয়েটা হচ্ছে শহরের নামি দামি একটা রিসোর্টে।

অন্তিক ছাড়া সরোয়ার বাড়ির সবাই এখানে উপস্থিত আছে। অন্তিক বলেছে তার কাজ সেরে আসতে একটু দেরি হবে। অন্তিকের মা চাচী তাদের বয়সী মহিলাদের সাথে একপাশে গল্পগুজবে মেতেছেন। তাদের অন্যপাশে পুরুষদেরও একই দৃশ্য।

আর ছেলেমেয়েরা আছে অন্যপাশে। ইশি, অয়ন্তি আর দিথী কখনো একে অপরের ছবি তুলে দিচ্ছে তো কখনো সেলফি তুলছে নানান ভঙিগ্তে। আবার কখনো ফটোগ্রাফার দিয়েও নিজেদের গ্রুপ ফটো নিচ্ছে। দিগন্ত কিছুক্ষণ আগে এসে ওদের একে অপরের থেকে আলাদা না হতে হুশিয়ারি দিয়ে গিয়েছে।

তারপর হঠাৎ কিছু একটা দেখে চিন্তিত ভঙ্গিতে কাউকে ফোন দিতে দিতে রিসোর্টের বাইরে পুল সাইডের দিকে চলে গিয়েছে। তিন বোন অবশ্য তা খেয়াল করেছে। কিন্তু সেদিকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আবার নিজেদের মধ্যে মেতে উঠল। দিথীকে অয়ন্তি ছবি তুলে দিচ্ছে, অয়ন্তির পাশে ইশিও আছে।

"শুনো আপু, আমি এই লাইটের পাশে দাড়াবো, তুমি এমনভাবে ছবি তুলবে যাতে লাইট আর আমার চেহারাটা ছাড়া বাকিসব অন্ধকার আসে। বুঝেছ?" — দিথী

"এই পোজে কম হলেও ১৫ টা এসেছে অলরেডি।" — অয়ন্তি

"ওগুলো আমার পছন্দ হয়নি। হাসিটা ন্যাচারাল মনে হচ্ছিলো না।" — দিথী

"আচ্ছা আচ্ছা। পোজ দে তাড়াতাড়ি।" — অয়ন্তি

দিথী পোজ দেই। অয়ন্তি বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে ডান বুঝালে সে কাছে এসে ছবিটা দেখে। তারপর পেছনে না ঘুরেই উল্টো হেঁটে যেতে যেতে বলে —

"আপু সেইমভাবে আরেকটা তুলো। কিন্তু আমি থাকবো পেছনে ফিরে। হেয়ার স্টাইলটা হাইলাইট হবে। কেম.. হেই, সরি সরি। এক্সট্রিমলি সরি। তুমি কি ব্যাথা পেয়েছ? আমি আসলে দেখতে পাইনি। আম ভেরি সরি।" — দিথী।

দিথী ওভাবে হাঁটতে হাঁটতে কারো সাথে ধাক্কা খায়। পেছন ফিরে দেখে একটা মেয়ে আর একটা ছেলে। সে মেয়েটার সাথেই ধাক্কা খেয়েছে। দিথী সরি বললে মেয়েটা কিছু বলেনা।

মাথা নাড়িয়ে ইটস ওকে বোঝায় আর চলে যায় ছেলেটার হাত ধরে।

অয়ন্তি আর ইশিও এসেছিলো ব্যাপারটা দেখতে। কিন্তু এসে কিছু বলবে তার আগেই ওরা চলে যায়।

"মেয়েটা সুন্দর, তবে অদ্ভুদ।" — অয়ন্তি

ইশি, দিথী দুজনেই মাথা নাড়ায়। পরক্ষণেই আবার নিজেদের মধ্যে মেতে উঠে।

এদিকে দিগন্ত অন্তিক কে ফোন দিচ্ছে লাগাতার। কিন্তু সে ফোন তুলছেনা।

দিগন্ত এখানে কিছুক্ষণ আগে মেঘলার স্বামী আয়াজ খানকে দেখেছে। সে জানতো আয়াজ খানের পরিবার আত্মীয় হয়। কিন্তু তাদেরতো বিয়েতে আসার কথা ছিলোনা।

কারণ তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। আয়াজকে জেলেও যেতে হয়েছিলো কিছুদিন আগে। এর মধ্যে নিশ্চয় এমন একটা ফাংশনে উপস্থিত হবেনা। মান সম্মানের তো একটা ব্যাপার আছে।

কেউ যদি ধুম করে মুখের উপর কেইসের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করে বসে তাহলে মুখ কোথায় লুকাবে।

এসব ভেবেই অন্তিক আর সে বিয়েতে উপস্থিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো পরিবারের সবাইকে নিয়ে। কারণ তাদের দুভাইয়ের জন্যই জেল কাটতে হয়েছে বলে প্রতিশোধ নিতে পরিবারের কারো কোনো ক্ষতি করলে সমস্যা।

কিন্তু এখন তো দেখছে নিজে না আসলেও নিজের লোকেদের ঠিক ই পাঠিয়ে দিয়েছে। এরা যদি এখন কোনো ঝামেলা করে। এজন্যই দিগন্ত বারবার অন্তিককে কল দিচ্ছে, কিন্তু সে রিসিভই করছেনা। দিগন্ত ভাবলো এবার সেই কিছু করবে।

দিগন্ত তার মা বড়মার কাছে গিয়ে তাদের সহ তিন বোনকে এক জায়গায় বসিয়ে আদেশ দিলো একসাথেই যেন থাকে ৫ জন। আর বড়বাবা আর বাবাকেও আশেপাশে থাকতে বললো।

সে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে তেমন অস্বাভাবিক কিছু পেলোনা। আবার মা বোনদের কাছে গেলো। ওখানে গিয়ে ইশির পেছনে দাড়ায়।

চারদিকে আরেক পলক চোখ বুলিয়ে কাউকে কল দিয়ে হ্যালো বলে উঠলে ইশি ভয় পেয়ে কেপে উঠে। হাতের জুসের গ্লাস থেকে কিছু জুস এসে ড্রেসে পড়ে। পেছন ফিরে দেখে ওটা দিগন্ত ভাই।

দিগন্তও দেখতে পেয়েছে ওর ভয় পেয়ে জুস ফেলে দেওয়ার ব্যাপারটা। সে ভ্রু কুচকে উপর থেকে নিচে একবার পর্যবেক্ষণ করে। তারপর ফোনে কিছু একটা বলে কেটে দেই।

"কি মেয়েরে বাবা। হ্যালো বললেও ভয় পেতে হয়? এখন উড়নাটা নষ্ট করে ফেললি।" — আয়েশা আমিন

"আমার কি দোষ? কানের কাছে এসে দৈত্যের মতো হ্যালো বললে ভয় পাবোনা?" — ইশি

"আচ্ছা আচ্ছা। চল ওয়াশরুমে গিয়ে পরিষ্কার করে নিবি। এভাবে রেখে দিলে দাগ বসে যাবে।" — অয়ন্তি

"তুই বস। আমার সাথে আয় ইশি।" — দিগন্ত

"আপনার সাথে মানে? আপনি কি লেডিস ওয়াশরুমে যাবেন?" — ইশি

দিগন্ত ওর দিকে কড়া চোখে তাকায়।

"আচ্ছা যাচ্ছি।" — ইশি

ইশি দিগন্তের পেছন পেছন যায়। ওদের টেবিল টার দু টেবিল পর কয়েকটা ছেলে বসে ছিল।

ওদের ক্রস করে যাওয়ার সময় ইশির হাত ধরে কাছে নিয়ে আসে দিগন্ত। আর গা ঘেঁষে দাড় করিয়ে নিজের এক হাত দিয়ে ইশির বাহু জড়িয়ে আগলে নেই নিজের সাথে।

ইশির দিগন্তের সাথে গা ঘেঁষে দাড়ানোতে সংকোচ হলেও ছাড়িয়ে নেয়না। ওয়াশরুমের সামনে গিয়েই ইশিকে ছাড়ে দিগন্ত।

"যা ভেতরে, আমি এখানে আছি।" — দিগন্ত

ইশি মাথা নাড়িয়ে ভেতরে যায়। ৫ মিনিট পর ফিরে আসলে দিগন্ত তাকায়।

উড়নাটা প্রথমে কোমরের এক দিকে লেহেঙ্গার সাথে গুজে দিয়ে শাড়ির আচঁলের মতো অন্য কাঁধে তোলা ছিল। বুকের দিকের অংশে জুস পড়ায় সেটা এখন খুলে অন্যভাবে পড়েছে। অন্যভাবে বলতে বুকে উড়নাটা মেলে দিয়ে পেছনের দিকে ঝুলানো।

কিন্তু ইশি বের হয়েছে টিস্যু দিয়ে কপালে কিছু একটা মুছতে মুছতে। যার কারণে হাতদুটো উপরে হওয়ায় উড়নাও কিছুটা উঠে যায়। ফলে ওর কোমরের দিকের অযাচিত কিছু অংশ দিগন্তের সামনে উন্মুক্ত হয়। সে কয়েক সেকেন্ড দেখে চোখ সরিয়ে নেই। ইশির মুখের দিকে তাকায়। তারপর আবার ওখানেই তাকায়।

চেয়েই থাকে যেন জীবনে প্রথমবার এমন দৃশ্য দেখছে। ওহ হ্যাঁ। প্রথমবার ই দেখছে। দিগন্ত তার জীবনের বেশ কিছু বছর বিদেশের মাটিতে কাঁটালেও এমন দৃ্শ্য দেখেনি। কিংবা অবচেতন মন জীবনে চলতে ফিরতে কখনও দেখলেও তা অবচেতন মনেই থেকে গিয়েছে। হৃদয়ের কোণে আর জায়গা পায়নি।

দিগন্ত জীবনের বেশ কয়েক বছর বিদেশে কাটালেও নারীঝোঁক কখন ই ছিলোনা তার। ডাক্তারি পড়তে পড়তেই জীবন কেটেছে। খুব অ্যাম্বিশিয়াস ছিল কিনা। তারপর ডাক্তার হয়ে যখন দেশে আসে, তখনও তিন বোন তার কাছে সমান ছিল।

কিন্তু কখন, কিভাবে, কোথায় যে মানুষের মনে হঠাৎ প্রেম চলে আসে তা হয়তো তারা বুঝতেও পারেনা। এভাবেই, দিগন্তও দেশে এসে সারাজীবন বোনের চোখে দেখা ইশির প্রেমে পড়ে যায় হয়তো। হ্যাঁ হয়তোই। কারণ দিগন্ত এখনও জানেইনা সে এক্সাক্টলি কবে ইশির প্রেমে পড়েছিল।

কিন্তু কখনও যে পড়েছিলো তা তো নিশ্চিত। নাহলে হঠাৎ করে সে ওমন আপত্তিকর স্বপ্ন দেখবেই বা কেন দিথীর চেয়ে আলাদা না ভাবা ইশিকে নিয়ে। যদি সে কখনও আলাদা চোখে নাই দেখে থাকে তাহলে তো ওমন স্বপ্ন দেখার কথাও না।

ঘুমের মধ্যে যা দেখেছে তা নিশ্চয় জেগে জেগে অবচেতন মনে হলেও কখনও মাথায় এনেছে। নাহলে এমন স্বপ্ন আগেতো কখনও দেখেনি। সেরাতের পর দিগন্তের দুদিন লেগেছে নিজেকে বোঝাতে। নিজের দ্বিধাদন্ধ কাঁটাতে।

মাথা থেকে সব ঝেড়েই ফেলেছিল। কিন্তু তারপর দিন-ই সে দেখতে পায় ইশি কলেজের বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাচ্ছে, সাথে নাকি ছেলে বন্ধুও আছে। একথা শুনে হঠাৎ তার মাথা গরম হয়ে যায়।

ওদের সবার সাথে বন্ধুত্ব ভাঙ্গিয়ে দেই। চোখে চোখে রাখতে শুরু করে। এভাবে কখন যে অলিখিতভাবে ইশিকে নিজের ভেবে নিয়েছে বুঝতেই পারেনি।

"আরেহ! দিগন্ত ভাই? কোথায় হারিয়ে গেলেন? চলুন?" - ইশি

দিগন্তের ঘোর ভাঙ্গে। আবার ওখানেই চোখ দেই। না এখন কিছু দেখা যাচ্ছেনা আর। উড়না ঢেকে আছে ওখানে।

"চলুন?" - ইশি

"ভেতরে যা আবার, উড়না ঠিক করে পড়ে আয়।" - দিগন্ত

"কি বলছেন? ঠিক করেই তো পড়েছি।" - ইশি

"না ঠিক হয়নি। সব ঢেকে ঢুকে পড়ে আয়।" - দিগন্ত

ইশি ভড়কায়। মানে টা কি! কি দেখা যাচ্ছে যে সব ঢেকে ঢুকে আসবে? সে নিজেকে পরখ করে। না.. সব তো ঠিক-ই আছে। পেছনে লম্বা চুল পিঠে ছাড়া, কিছু দেখা যাওয়ার কথা না। আর ব্লাউজটাও এমন না যে শরীর দেখা যাবে। সামনেও উড়না, তাহলে? ইশি ইতস্তত হয়ে বলে,

"ক কি বলছেন দিগন্ত ভাই। সব তো ঢাকা-ই আছে। আবার কি ঢাকবো?"

দিগন্ত বলে দিতে চাইলো। কিন্তু মেয়েটা সব ঢাকতে বলাতেই ইতস্তত করছে। এখন যদি সে হাত তুললেই পেটের দিকের অংশ দেখা যাচ্ছে এটা জানায়, তাহলে নির্ঘাত আগামী এক সপ্তাহ আর তার সামনে আসবেনা লজ্জ্বায়।

তাই সে অন্যভাবে বোঝাল।

"চুলে কি যেন পড়েছে, নিয়ে নে।"

"হুম? কোথায়?"

"মাথার উপর।"

"কই? পাচ্ছিনা তো।"

"দুই হাত দিয়ে দেখ।"

"আচ্ছা।"

সে দুহাত চুলে দিতেই আবার ঐ দৃশ্য দেখা যায়। দিগন্তও দেখে আবার। ইশি ওর দৃষ্টি দেখে নিজের দিকে তাকায়। তারপর ঘটনা বুঝতে পেরে দুহাত নামিয়ে উড়না খিচে ধরে দিগন্তের দিকে পিঠ দিয়ে দাড়ায়।

লজ্জ্বায় তার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। তবে দিগন্তকে তা বুঝতে না দিয়ে -"আমি একটু আসছি"- বলে আবার ওয়াশরুমের ভেতর দৌড় দেই।

ইশি লজ্জ্বা পেয়েছে দিগন্ত তা বেশ বুঝতে পারছে। হালকা হেসে ফোনটা দেখে সে।

অয়ন্তি, দিথী সহ বাবা-বড় বাবারও কল দেখা যাচ্ছে সেখানে। টেনশনে পড়ে গেলো দিগন্ত, এতগুলো কল? কোনো সমস্যা হলোনা তো ওদিকে! ফোন সাইলেন্ট ছিল বিধায় বুঝতে পারেনি সে। এখন চিন্তায় পড়ে গেলো সে।

ইশি নিজেকে সামলে লেহেঙ্গা ঠিক করে পড়ে এসেছে ততক্ষণে। দিগন্তের দিকে আর চোখ তুলেও তাকায়নি সে। দিগন্ত খেয়াল করেছে। সে জানতো লজ্জ্বাবতী আর তার চোখে চোখ রাখবেনা এ কয়দিন।

দিগন্ত অয়ন্তিকে ফোন দিলে অয়ন্তি তাকে দোতলায় আসতে বলে তাড়াতাড়ি। সে ইশিকে নিয়ে দ্রুত পৌঁছায় সেখানে। দেখতে পায় অন্তিক আর একটা মেয়ে একটা রুমের ভেতর আর তাদের ঘিরে কয়েকজন দাড়িয়ে আছে।

একজন ভদ্রমহিলা আর ভদ্রলোককে বেশ রাগান্বিত দেখাচ্ছে। সে চোখ ঘুরিয়ে নিজের বাবা-মা আর বড় বাবা-বড় মার দিকে তাকায়। তারা তেমন একটা রেগে নেই, কিন্তু চিন্তিত। ভদ্রলোক অন্তিকের পাশের মেয়েটার উপর নারাজ আর ভদ্রমহিলা তাকে বকছে।

সে অয়ন্তি আর দিথীর কাছে যায় আর ঘটনা জিজ্ঞেস করে।

—অন্তিকের বিয়েতে আসার কথা থাকলেও সে তার বন্ধু ইরফানের কারণে আবার না আসার সিদ্ধান্ত নেই। অন্তিকের বেস্ট ফ্রেন্ড ইরফান। সে এতদিন ছিল সংশোধনাগারে। ইরফান আগে থেকে ড্রা/গ এডি/ক্টেড ছিলই। তারা বন্ধুরা ইরফানকে ড্রা/গ নিতে বারণ করলেও সে শুনতোনা। নিয়েই যেতো।

কিন্তু তার এই বদ অভ্যাসকে এতদিন পাত্তা না দিলেও সে কয়েক মাস আগে তাদেরই এক বান্ধবীর সাথে খুব জগন্য একটা কাজ করে। এরপর কেউ তার ব্যাপারটা আর হেলেদুলে দেখেনি। দিগন্ত না থাকলে জেলের ভাতও খেতে হতো নিশ্চিত তাকে। সে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড এর প্রতি কঠোর হতে পারেনি। সংশোধনাগারে পাঠিয়ে দিয়েছিলো ইরফানের নানান কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দিয়ে।

ভেবেছিলো সংশোধনাগার থেকে একেবারে মানুষ হয়ে বের হবে। এই ছেলেকে নিয়ে ঝামেলা পোহাতে পোহাতে অন্তিক ওর সংশোধনাগারে থাকা এই কয়েকমাস নিশ্চিন্তেই ছিল। কিন্তু এখন আবার ঝামেলা পাকিয়েছে সে।

অন্তিক তাকে ধরে এনে তার ব্যক্তিগত ফ্ল্যাটে নিয়ে রেখেছিল। বিয়েতে আসার চিন্তাভাবনাও বাদ-ই দিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু বিয়ে বাড়ি থেকে বার বার ফোন আসতে থাকে। নানান ভাবে অনুরোধ করছিল তারা বিয়েতে উপস্থিত হতে।

তাই শেষে ইরফানকে ঐ ফ্ল্যাটে বেধে রেখেই এসেছিল সে বিয়েতে। কিন্তু এখানে এসে সবার সাথে কথাবার্তা বলে সে একটু রেস্ট নিবে বললে বরের বাবা-ই তাকে রিসিপশন থেকে একটা রুমের চাবি এনে দেই। সে চাবি নিয়ে রুমে যায় সে।

গিয়ে সিসিটিভি তে ইরফানকে দেখতে দেখতে শার্ট খুলছিল। উদ্দেশ্য কিছুক্ষণ রেস্ট নেবে।

কিন্তু শার্ট খুলে রাখতেই সে দেখতে পায় ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এসেছে একটা মেয়ে। অন্তিক মেয়েটাকে দেখতে দেখতেই সে অন্তিকের কাছাকাছি চলে আসে নিজের উড়না ঠিক করতে করতে। ভ্রমে থাকা অন্তিক রুমের ভেতর মেয়েটা কোত্থেকে এলো তা নিয়ে ভাববে, তার আগেই অঘটনটা ঘটে গেলো।

মেয়েটা অন্তিকের সাথে ধাক্কা খেয়ে তার উপর পড়ে সেসময়-ই একজন ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা সহ বরের বাবা আর কনের বাবা উপস্থিত হয় সেখানে।

তারা নিজেরা এক্সট্রা চাবি নিয়ে এসেছে। তাদের পর আরও দুই চারজনকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিন্তু ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা সম্ভবত মেয়েটার অভিভাবক, তারা এই দৃশ্য দেখে অন্তিককে তাদের মেয়ের সাথে অসভ্যতামির অপবাদ দিয়ে নানা কথা শুনাতে থাকে। স্বাভাবিক। ওদের দেখা ই গিয়েছে ঐ অবস্থায়। অন্তিক বার বার বুঝালেও নিজেদের চোখে দেখা ঘটনা বলে তাকে অবিশ্বাস করে।

সাথে আসা বাকি লোকেরাও অন্তিককে মেয়ে/বাজ, চ/রি/ত্র/হীন, রে/পি/স্ট/সহ নানা রকম অপবাদ দিতে থাকে। মূলত ঐ লোকগুলোই পরিস্থিতি বিগড়ে দেই। মেয়েটা একটা টু শব্দও করেনি। না নিজের হয়ে কোনো সাফাই গেয়েছে। শুধু দাড়িয়ে চোখের জল ফেলতে দেখেছে অন্তিক তাকে। এ কারণে মেয়েটার উপর তার মেজাজ খারাপ।

সে কি পারতোনা ঘটনাটা সবাইকে বোঝাতে যখন তাকে কেউ বিশ্বাস করতে চাইছেনা। মেয়েটা বললেই তো ব্যাপারটা ওখানে সল্ভ হয়ে যেতো। মুখ নেই কথা বলার? তারপর দেখা গেলো সাথে আসা ওদের মধ্যে এক মহিলা মেয়েটারই হয়তো কোনো দোষ আছে এটা বোঝাতে চাচ্ছে নানান কথাবার্তার মাধ্যমে।

নাহলে কেন কোনো চিৎকার করলোনা। আর দেখেও মনে হয়নি তাকে জোর করা হচ্ছিলো। এমন আরো কতো কি। শেষে মেয়েটার বাবা মাকেও দেখা গেলো মেয়েটাকে অবিশ্বাস করছে। মহিলা বোঝাতে চাচ্ছিল তারা দুইজন সম্মতিতে এসব করেছে।

যদিও শুরুতে শুধু অন্তিককেই অপবাদ দিচ্ছিল কিন্তু পরে কি কারণে মেয়েটাকেও অপবাদ দিচ্ছিল তা অস্পষ্ট।—

অয়ন্তির মুখ থেকে দিগন্ত শুনে পুরো ব্যাপারটা। এখন বড় বাবা কি সিদ্ধান্ত নেই, কিভাবে ব্যাপারটা সমাধান করে তাই দেখার বিষয়।

অন্তিকের বাবা জনাব মাহমুদ সাহেব ব্যাপারটা যাতে বেশি দূর না এগায় তাই ওদের দুজনের বিয়ে পড়িয়ে দিতে চায়। বাকিরাও সম্মতি জানায়। কিন্তু অন্তিক বেকে বসে। সে কিছুতেই এই বিয়ে করবেনা।

ওর অসম্মতি দেখে বাকি লোকজন ঘটনা লোক জানাজানি করার হুমকি দেই। সাথে মিডিয়াতেও এডভোকেট অন্তিকের এই কুকীর্তি প্রচার করার হুমকি দেই। অন্তিক শেষে বাধ্য হয়ে বিয়েটা করে নেই।

কাজিও ডেকে আনিয়েছে ঐ লোকগুলো। অন্তিক বেশ বুঝতে পেরেছে এখানে পুরো ঘটনা মোটেও কাকতালীয় নয়। পূর্ব পরিকল্পিত। সে ভেবেছিলো মেয়েটা আর তার বাবা মাও হয়তো এর সাথে জড়িত। কিন্তু কবুল পড়ানোর সময় জানতে পারে মেয়েটা বোবা।

আর ভদ্রমহিলা আর ভদ্রলোক মেয়েটার মামা মামী হয়। বাবা মা নেই। আর মেয়েটার বিদায় এর সময় তার মামা মামী মেয়েটাকে ভুল বুঝে নানান কথা শুনায় আর তাদের সাথে যোগাযোগ না করতে বলে।

সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেই। সাথে অন্তিক আর তার পরিবার এও জানতে পারে যে তাদের এক মেয়ে কিছুদিন আগেই কোনো এক ছেলের সাথে পালিয়েছে, তাই অন্য মেয়ের থেকেও এসব আশা করেন নি।

এজন্য মেয়েটাকে এভাবে দূরে সরিয়ে দিলো। মেয়েটার সে কি বোবা কান্না। কিন্তু তাও সবকিছু অন্তিকের বিরক্ত লাগছিল।

সে সেদিনের এক ধাক্কার ঐ মেয়েটার মধ্যেই আটকে গিয়েছে। তাই তার চারপাশ অস্থির লাগছিলো। এরপর কোনোভাবে মেয়েটাকে সহ বাড়ির সবাইকে নিয়ে চলে আসে। ||

মৌনপ্রেম পর্ব ৯ গল্পের ছবি