প্রাণেশা আর দিথী, বাড়ি বাইরে বাগানের এক পাশে দোলনায় বসে আছে। ওদের বাগানে নানা রকম ফুল আছে। একটা বড়ো কালো গোলাপ গাছও আছে।
প্রাণেশার ওখান থেকে একটা ফুল হাতে নেয়ার খুব ইচ্ছে। কিন্তু দিথী আপু বলেছে, ওটা প্রানেশার স্বামী নামের লোকটার গাছ।
তাকে তার প্রিয় দাদান ষষ্ঠতম জন্মদিনের দিনে উপহার দিয়েছিলো কালো গোলাপ গাছটা। কিন্তু এর পর দিনই তিনি মারা যান, সে থেকে প্রিয় দাদান এর দেওয়া এই উপহারটা সে খুব যত্নে রেখেছে, ওখান থেকে কেউ ফুল ছিঁড়ুক তা সে পছন্দ করেনা।
কিন্তু প্রাণেশা এসব কিছু জানেনা। দিথী তাকে এত কিছু বলে নি, শুধু বলেছে ওটা তার বড় ভাইয়ার গাছ। আর সে কাউকে ওখান থেকে ফুল নিতে দেয় না।
কিন্তু প্রাণেশা ঠিক করে রেখেছে, ওখান থেকে সে সবার আড়ালে একটা ফুল নেবেই, সাথে কয়েকটা পাতা। আর সেগুলতে রং লাগিয়ে সে, বিশেষ একটা আর্ট করবে তার ক্যানভাসে। প্রাণেশা আর দিথী বাগানের পাশে একটা দোলনায় বসে আছে। এটা সেটা নিয়ে গল্প করছে ওরা। দিথী প্রাণেশার চেয়ে বড়। শুধু প্রাণেশা না, সে ইশির চেয়েও এক বছরের বড়।
দিথী ওদের এসব গল্পগুজবের মধ্যেই কল আসাতে ফোন কানে দিয়ে কথা বলতে বলতে খানিকটা দূরে চলে যায়। প্রাণেশা একাই দোলনায় বসে বসে হালকা দোল খেতে থাকে। ওর পরনে একটা কালোর উপর সাদা সুতার কাজ করা থ্রী পিস আর নিচে একটা সাদা স্কার্ট। খুব স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে ওকে। দোলনায় বসে হালকা দোল খেতে খেতেই সে দেখতে পায় গেট দিয়ে একটা গাড়ি প্রবেশ করছে ভেতরে। গাড়িটা থেকে ওর স্বামী-ই নামছে ফোনে কথা বলতে বলতে। সে তাকে অতটা পাত্তা না দিয়ে চোখ সরিয়ে নেই।
বাজে লোকটাকে এমনিতেও তার পছন্দ না। সুদর্শন হলে কি হবে, মেয়েদের একটুও সম্মান করতে জানেনা।
তার খুব মনে আছে, এটাই আরশি আপুদের ভার্সিটির সেই লোকটা। তখন কিভাবে গায়ে পড়ছিলো। আর এখন এমন ভাব করে যেন তাকে সহ্য-ই করতে পারেনা।
দ্বিমুখী একটা। পরিবারের সামনে সাধু সাজে। অথচ ভেতরে ভেতর ঠিক-ই অসভ্যতামী ভরপুর।
এসব ভেবে ভেবে সে ঠোঁটের কোণ বাকিয়ে অন্তিককে একটা ভেঙচি কেটে দিয়ে মাথা ঘুরিয়ে নিলো। কিন্তু বেচারি ভাবনার ঘোরে থেকে বুঝতেও পারলোনা পুরো ব্যাপারটা অন্তিকের নজরে এসেছে।
অন্তিক হতবম্ব। ব্যাপারটা কি হলো? সে তো ফোনে জরুরী কথা বলতে বলতে গাড়ি থেকে নামছিল। সাথে নীলয় ও আছে। সেও দেখেছে কিভাবে ঐ মেয়েটা তাকে ভেঙচি কেটেছে।
নীলয় মনে মনে বিষম খেলো প্রাণেশাকে এমন করতে দেখে। সে কোণা চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে দেখলো, স্যার এখনো হতবম্ব চোখে ফোনটা কানে লাগিয়ে প্রাণেশাকে দেখছে। স্যারের অবস্থা দেখে তার খুব হাসি পেলো।
অন্তিক ভাবছে, মেয়েটা তাকে ভেংচি কাটলো কেন? সেতো বাইরে থেকে এসেছে। না কোন ঝগড়া হলো মেয়েটার সাথে, না অন্য কিছু। শুধু শুধু নীলয়ের সামনে এভাবে ভেঙচি কেটে দিলো?
এমনিতে কাজের চাপে মেজাজ ঠিক নেই, ব্যাক্তিগত জীবন নিয়েও হতাশ, তার উপর এই মেয়ে!!
তার মাথা গরম হয়ে গেল। গটগট পায়ে হেঁটে সোজা দোলনায় বসা প্রাণেশার সামনে গিয়ে দাড়ালো সে। শক্ত করে ওর বাহু ধরে দাড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"কি সমস্যা তোমার?"
প্রাণেশা অবাক। ওর চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। এই লোক এখানে এলো কোত্থেকে? মাত্রই তো বাড়ির সদর দরজার দিকে যাচ্ছিলো। আবার জিজ্ঞেস করছে তার সমস্যার কথা। কিন্তু তার আবার কি সমস্যা!!
সে বড় বড় চোখেই জিজ্ঞাসু ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে মানে জিজ্ঞেস করলো।
অন্তিক ওর কথা বুঝতে পেরে দাঁতে দাতঁ চেপে বললো-
"ভেঙচি কাটছিলে কেন? বেয়াদব মেয়ে।"
এইরে!! দেখে নিয়েছে তাহলে। এবার কি হবে? বেয়াদব তো বলেই দিয়েছে। এখন কিছু একটা বলে কেটে না পড়লে স্টুপিড, ম্যানার্সলেস এসবও শুনিয়ে দিতে পারে।
না না। কিছু একটা করতে হবে। সে হঠাৎ অন্তিকের ফোনটা নিলো ওর অন্য হাত থেকে। ওটা অন করাই ছিলো। তাই সমস্যা হলোনা। ফটাফট কিছু এতটা টাইপ করলো।
সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই প্রাণেশা তার সামনে ফোনটা ধরলো। সেখানে লেখা –
"আমি আপনাকে ভেঙচি কাটছিলাম না। আমারতো আসলে দাঁত ব্যাথা। তাই ওমন করেছি। আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেননা।"
ওটা পড়ে অন্তিক একটু কাছে গিয়ে –
"স্টুপিড। কোনটা দাঁত ব্যাথা আর কোনটা ভেঙচি বুঝিনা? তোমার মতো ঘাস খেয়ে চলি?"
যা ভেবেছিলো তাই, স্টুপিড বলে দিয়েছে।
ওয়েট হোয়াট? সে ঘাস খেয়ে চলে?
প্রাণেশা এবার আর টাইপ করে নয়। বরং ইশারায় বলে –
"আমি মোটেও স্টুপিড না। আর ঘাস খেয়ে চলেন আপনি, আপনারা সবাই ঘাস খেয়ে চলেন। আপনার ঐ পিএ, আপনি যাদের সাথে কাজ করেন। আপনারা সবাই ঘাস খেয়ে চলেন।" পিএ বলার সময় নীলয়ের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো।
সে এখনো গাড়ির ওখানেই দাড়িয়ে, ওদের-ই ঝগড়া দেখছে। তার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে কিছু বোঝাতে দেখে থতমত খেয়ে গেলো।
অন্তিক কিভাবে জানি ওর ইশারা ইঙ্গিতে বলা কথাগুলো বেশ বুঝলো। সে চোখ মুখ কুচকে জিজ্ঞেস করলো –
"হোয়াট? মাথা ঠিক আছে তোমার?"
প্রাণেশা আবার ইশারায় –
"একদম ঠিক আছে আমার মাথা। বরং আপনার মাথায় গণ্ডগোল। স্টুপিডও আপনি।" প্রাণেশা যেন সুযোগ পেয়ে অন্তিকের উপর থাকা সব রাগ একেবারেই উগ্লে দিচ্ছে।
এবারো প্রাণেশার ইশারা ইঙ্গিতে বলা কথা অন্তিক বুঝতে পারলো। কিন্তু বেশ চটে গেলো –
"এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি করছো তুমি। আরেকটা কথা বললে তুলে আছাড় মারবো একদম।"
"আচ্ছা? এতো সহজ? দেখি মারেন আছাড়।" – ইঙ্গিতে(প্রাণেশা)
অন্তিক এক মুহুর্তও দেরি করলোনা। ওর কাছে গিয়ে কোলে তুলে নিলো। তারপর গটগট পায়ে পুলের দিকে এগিয়ে গেলো।
এই মেয়েটাকে একটা শিক্ষা দিতেই হবে। বেশি বাড়াবাড়ি করছে।
প্রাণেশা অবাক। এই লোকটা তাকে কোলে নিলো কেন? সত্যি সত্যি আছাড় দেবে না তো?
হায় আল্লাহ! এবার কি হবে?
নীলয় এবার অবাক হলেও চোখ সরিয়ে নিলো। আগ্রহে লাগাম টানা দরকার এবার। সে আর ওদিকে না গিয়ে চলে গেলো বাড়ির ভেতরে।
প্রাণেশা হাত পা ছুঁড়োছুঁড়ি করছে আর মুখে "উ... উ..." শব্দ করে তাকে নামিয়ে দিতে বলছে। কিন্তু অন্তিক সেসবের তোয়াক্কা করল না। তাকে নিয়ে চলে গেল পুলের কিনারায়।
— "এবার আছাড় মারি? এই পুলের মধ্যে? হুঁ?" — অন্তিক।
প্রাণেশা বারবার মাথা নেড়ে 'না না' বোঝাল।
— "কেন, কেন? তখন তো খুব বলেছিলে কেমন আছাড় মারি দেখতে চাও। এখন মারি? মারি?" — অন্তিক।
প্রাণেশা শক্ত করে এক হাত অন্তিকের গলায় রেখে মিনতি করছে আছাড় না মারতে।
অন্তিকের তা দেখে পৈশাচিক আনন্দ হলো।
— "আমি স্টুপিড, মাথায় গণ্ডগোল, ঘাস খেয়ে চলি। তারপর? হুঁ?"
ভ্রু উঁচিয়ে বলল ওর দিকে তাকিয়ে অন্তিক।
প্রাণেশা এবার কেঁদে ফেলবে প্রায়।
— "সরি বলো।" — অন্তিক।
সে মাথা নাড়ল। বলবে না।
অন্তিক এবার তাকে পুলে ফেলে দেবে এমন ভঙ্গিতে হাত বাড়ালো।
প্রাণেশা হঠাৎ দু’হাত দিয়ে অন্তিকের গলা জড়িয়ে ধরল, মুখও গুঁজে দিল তার গলায়। নিজেই অন্তিকের দিকে চেপে গেল। মুখ দিয়ে “উ... উ...” শব্দ করে বোঝাচ্ছে সে “সরি” বলবে।
কিন্তু অন্তিক একদম স্তব্ধ হয়ে গেছে।
প্রাণেশার মুখ দিয়ে “উ... উ...” শব্দ করার ফলে তার ঠোঁটদুটি ছুঁয়ে যাচ্ছে অন্তিকের গলায়।
ওর শরীরের সাথে একদম চেপে আছে সে গলা জড়িয়ে ধরা অবস্থায়। ভয়ে কাঁপছে, হার্টবিট অসম্ভব দ্রুত। অন্তিক সেটা ভালোই বুঝতে পারছে।
কোলে উঠে ছুটোছুটি করার ফলে জামাকাপড়ের অবস্থা প্রায় বেহাল।
উড়না বুকের উপর মেলে দেওয়া ছিল, এখন সেটা গলায় জড়ো হয়ে পিছন দিকে ঝুলছে।
অন্তিকের এক হাত ওর থ্রি-পিসের ভেতর দিয়ে উষ্ণ শরীর স্পর্শ করে ফেলেছে।
আর অন্যহাত পিঠ ঘুরে পেছন দিকে বিপদসীমার কাছাকাছি।
এসব-ই প্রাণেশার তখন কোলে উঠে করা ছুটোছুটি আর অন্তিকের যেকোনো ভাবে আটকে রাখার ফল।
অন্তিক ঢোক গিললো। এই অনুভূতিটা তার চেনা মনে হচ্ছে। কেমন চেনা, সেটাও সে আন্দাজ করতে পারছে।
সে আবার বোধহয় ঘোরে চলে গেল সেদিনের মতো।
আর প্রাণেশার ভাষ্যমতে — অসভ্য অন্তিক আবার!
হ্যাঁ, আবার অসভ্যতামি করলো...
ওই অবস্থাতেই হাত দুটো দিয়ে চাপ দিয়ে আর একটু নিজের দিকে এনে, সে মুখটা এগিয়ে দিতে চাইলো প্রানেশার দিকে...
প্রাণেশা অন্তিকের হাবভাব বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি পিছিয়ে এল। আর অন্তিকের অমনোযোগিতার সুযোগ নিয়ে কোলে থেকে নেমে এক ছুটে সেখান থেকে পালিয়ে গেল।
অন্তিকের ঘোর কেটে গেলো। নিজেকে একটা থাপ্পড় দিতে মন চাইলো। সে ঐ বেয়াদব মেয়েটার মধ্যে তার অস্থিরতাকে খুজছিল।
অন্তিকের মনে হচ্ছে সে এবার তার অস্থিরতার সামনে কোন মুখে দাড়াবে। অন্য একটা মেয়ের মধ্যে কিনা সে নিজের অস্থিরতা কে খুজছিল।
— "শিট!!" — সে পুলে নামার সিঁড়ির হাতলে পা দিয়ে একটা লাতি মেরে দুহাত দিয়ে মুখ ঘসে, চুল গুলোও দুহাতে ব্যাকব্রাশ করে পেছনের দিকে কয়েক সেকেন্ড চেপে রাখলো। তারপর মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে কি যেন দেখে চলে গেলো।