মৌনপ্রেম

পর্ব - ৭

🟢

প্রাণেশা এখন বসে আছে খুব সুন্দর পরিপাটি একটা রুমে, শুধু বসে আছে বললে ভুল হবে। বসে বসে রঙের ক্যানভাসে কিছু আঁকা-আঁকি করছে খুব মনোযোগ দিয়ে। রঙের ক্যানভাসটা একটা টেবিলের ওপরে রাখা, টেবিলের একপাশে কিছু রঙের কৌটা রাখা, ওখান থেকে রঙ নিয়েই সে আঁকা-আঁকি করছে। টেবিলটা দেয়াল গেষে যতটুকু জুড়ে আছে ঠিক ততটুকু অবধি সামনে একটা জানালা, সেখান থেকে আলো আসছে। দেয়ালে নানারকম ছবি ও আঁকা টাঙানো। মামাবাড়িতে থাকতে সে যে রুমে থাকত, সেখানেও এরকম নানা পেইন্টিং টাঙানো ছিল দেয়াল জুড়ে, সাথে অনেক লতা পাতা ঝুলানো। বরং এখানকার চেয়েও বেশি ছিল। কিন্তু এখানকার চিত্রটা একটু ভিন্ন। এই রুমটা বেশ মডার্ন, বড়লোক বাড়ির রুম বলে কথা। কিন্তু যতই মডার্ন হোক, সে তার ছোটবেলা থেকে একটু একটু আবেগ দিয়ে সাজানো মামা বাড়ির ওই রুমটা ভীষণ মিস করে।

তার আঁকা প্রায় শেষ, হঠাৎ বাইরে থেকে কেউ ডাকলো বলে মনে হলো। সে ক্যানভাসের বাকি চিত্রটুকু রেখেই চলে গেল ওই ডাকে। তার শাশুড়ি মা ডেকেছেন। তার ফুপি শাশুড়ি পরিবারসহ কানাডা থাকেন। সেখান থেকে কাল নিজেদের বাড়ি এসেছিল ছেলেমেয়েদের নিয়ে ছুটি কাটাতে। আর আজ তাদের বাড়ি, অর্থাৎ প্রাণেশার শ্বশুরবাড়ি আসার কথা ছিল। হয়তো এসে গিয়েছে, তাই ডাকছে তাকে। ইশ!! সে তো ভুলেই বসেছিল প্রায়। এখন সবাই যদি তাকে ভুল বোঝে!! অতিথি আসবে জেনেও রুমের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসেছিল — এই ভেবে।

সে ড্রয়িং রুমে পৌঁছতেই দেখল একজন মধ্যবয়সী মহিলা আর একটা ছেলে ও একটা মেয়ে বসে আছে সোফায়। সাথে উপস্থিত আছে বাড়ির প্রায় সব সদস্যই। সবাই একে অপরের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে আছে। তবে অয়ন্তি আপুর বয়সী মেয়েটাকে দেখে কেমন মনমরা মনে হচ্ছে। সে ইশির দিকে গিয়ে একপাশে দাড়াতেই সবার নজর পড়ল তার দিকে। এভাবে সবাইকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে তার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। এই অস্বস্তি থেকে তাকে তার শাশুড়িই বাঁচালেন। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিলেন অন্তিকের বউ হিসেবে। অতিথিরা সবাই আবার তাকালো তার দিকে। সে ইশারাই সালাম জানালে, অন্তিকের ফুপি সালাম নিলেন। তাদের পাশে এসে বসতে বললেন। জিজ্ঞেস করলেন—

"নাম কী তোমার?"

প্রাণেশা কীভাবে উত্তর দেবে ভেবে পেল না। আশেপাশে কোনো কলমও নেই যে লিখে দেখাবে। সে অসহায় বোধ করল খুব ওই মুহূর্তে…

তারপর হঠাৎ অয়ন্তি-ই বলে উঠল ওর নামটা—

"ফুপি, ওর নাম প্রাণেশা।"

"শুধু প্রাণেশা? আর কিছু নেই?"

সে হালকা মিইয়ে গিয়ে বলল—

"তা তো জানিনা।"

তিনিও আবার প্রাণেশাকে জিজ্ঞেস করলেন—

"তোমার পুরো নাম কী প্রাণেশা?"

প্রাণেশা এবারও অসহায় চোখে এদিক সেদিক তাকালো।

ফুপি এবার বিরক্ত গলায় বললেন—

"কি হলো? উত্তর দিচ্ছো না কেন তুমি? কথা বলতে পারো না?"

প্রাণেশা তাঁর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। কিন্তু ফুপি বুঝতে পারছেন না মেয়েটা আসলে কী বোঝাতে চাইল। তিনি বাকিদের দিকে তাকালেন। তাঁর তাকানোতেই প্রাণেশার চাচি শাশুড়ি বলে উঠলেন—

"আপা, এখন ওকে ছাড়ো। বাইরে থেকে এসেছো। হালকা কিছু খেয়ে নাও তোমরা। পরে না হয় আস্তে ধীরে সব জানা যাবে।"

"অদ্ভুত!! নামটা বলতেও এত সমস্যা।" — বিরক্ত গলায় বললেন তিনি।

"মেয়েটা কথা বলতে পারে না, মারজিয়া। তাই উত্তর দিতে পারছে না।" — প্রাণেশার শাশুড়ি।

"মানে?"

"মানে, মেয়েটা বাক-প্রতিবন্ধী। কথা বলতে পারে না সে।"

মিসেস মারজিয়া অবাক হয়ে একবার প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে আবার বাকিদের দিকে তাকালেন। বুঝতে চাইলেন তিনি কিছু ভুল শুনেছেন কিনা। কিন্তু না। একথা শুনেও বাড়ির সবাই নির্বিকার, যেন তারা আগেই জানে।

প্রাণেশার চোখ ফ্লোরে।

অবাক শুধুই তারা ৩ জনই।

তিনি কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে ধাতস্থ হয়ে চলে গেলেন ডাইনিংয়ে নাস্তা করতে। কোনো সিন ক্রিয়েট করলেন না। না কোনো প্রশ্ন। সাথে দুই ছেলে-মেয়েকেও ডেকে নিয়ে গেলেন।

কিন্তু তাঁর গম্ভীর মুখ বলছে, এই ব্যাপারে আবার কথা উঠবে।

মায়ের সাথে সাথে গেলো মেহরিন আর মাহাদও। কিন্তু তারা এখনো বিষয়টা থেকে বের হতে পারছে না।

মাহাদ দেখল— সুন্দর, সরল চেহারার একটি প্রতিবন্ধী মেয়েকে।

সে ভাবছে— অন্তিক ভাই একটা বোবা মেয়েকে বিয়ে করলো?

চেয়ারে বসতে বসতে বিরবির করে বললো—

"অদ্ভুত।"

অতিথিরা খেতে বসেছে, সাথে বাকিরাও।

অন্তিকের মা-চাচি দীর্ঘদিন পর তাদের ননদ আসবে বলে নানান রকম ডেজার্ট তৈরি করেছেন।

সবাই খাচ্ছে, প্রাণেশা শাশুড়ির পাশে পাশে ছিল। তিনি কিচেনে যাচ্ছিলেন।

প্রাণেশাকেও তাঁর পেছন পেছন আসতে দেখে বললেন—

"তুমি আমার পেছন পেছন কি করছো? যাও গিয়ে বাকিদের সাথে খেতে বসো।"

প্রাণেশা মাথা নেড়ে, হাত দিয়ে ইঙ্গিতে বোঝালো সে শাশুড়ির সাথেই খাবে।

মিসেস আয়েশা ওর দিকে সোজা দৃষ্টিতে গভীরভাবে তাকালেন। —

মেয়েটা সরল, মিষ্টি চেহারার। দেখলেই মায়া মায়া লাগে। তার নাকি মা নেই। এক্সিডেন্টে মারা গেছে। সাথে তার বাকশক্তিও নিয়ে গেছে সেই এক্সিডেন্ট। বাবার কথা কিছু জানেন না তিনি। মেয়েটা বলেনি। ছোট থেকেই নানাবাড়িতে থাকত। মায়ের সাথে সাথে নানা-নানিও মারা যাওয়ার পর থেকে মামার কাছেই বড় হয়েছে।

এইভাবেই জীবনের প্রায় ১৮টা বছর কাটিয়ে দিয়েছে।

তার মামা-মামি হয়তো - তাকে বুঝবে, তার প্রতিবন্ধকতা সহ তাকে মেনে নেবে— এমন কারো সঙ্গে দেখে-শুনে ওর বিয়ে দিত। কিন্তু একটা দুর্ঘটনা সবকিছু এলোমেলো করে দিল।

মামা-মামিও মেয়েটাকে ভুল বুঝলো। সাথে তাঁর ছেলেও মেয়েটাকে মানতে চাইছে না। বিয়ের পর একটা সুন্দর সংসার পেতে পারতো। কিন্তু এখন দুই কুলই হারালো।

তাঁর নিজেরও প্রথমে প্রাণেশাকে ছেলের পাশে মানতে কষ্ট হচ্ছিল।

তাঁর রাজপুত্রের মতো ছেলের পাশে একটা বাক-প্রতিবন্ধী মেয়ে!

ক্ষণিকের জন্য মনে দ্বিধা থাকলেও পরে ঠিকই মেনে নিলেন,

কারণ, স্বামী-স্ত্রীর জুটি সৃষ্টিকর্তা আগেই নির্ধারণ করে রাখেন।

সেখানে তিনি না মানার কে?

কিন্তু তাঁর ছেলে নিজেই তো মানতে চাইছে না মেয়েটাকে।

ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রাণেশাকে সাথে নিয়ে গেলেন ডাইনিংয়ে।

শাশুড়ির সাথে সাথে বসল প্রাণেশা, সবার মাঝে।

সবাই যার যার মতো খাচ্ছে।

মাহাদ অয়ন্তি, ইশি আর দীথির সাথে গল্প করছে খাওয়ার মাঝে মাঝে।

কিন্তু মেহরিনের গলা দিয়ে যেন খাবার নামছেই না।

এই তো সামনেই বসে আছে মেয়েটা।

এই মেয়েটা নাকি এখন অন্তিক ভাইয়ের বউ।

ভাবতেই বুকের রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা কেউ খামছে ধরেছে।

তার এত বছরের সাধনার মানুষটাকে এত সহজেই পেয়ে গেল এই মেয়ে?

মেয়েটা কথা বলতে না পারলেও বেশ সুন্দর।

কিন্তু সেও কি কম সুন্দর?

তার উপর কোনো অপূর্ণতা নেই নিজের মধ্যে।

তাহলে কেন অন্তিকের পাশে সে নেই আজ?

খুব কষ্ট হচ্ছে মেহরিনের।

সে বাকি খাবারটুকু রেখেই উঠে চলে গেল সবার মাঝ থেকে।

সবাই যার যার খাওয়া আর গল্পে মত্ত ছিল বলে কেউ আর খেয়াল করলো না তাকে।

ওদের সবার খাওয়া-দাওয়ার মাঝেই দিগন্ত এলো বাইরে থেকে। সে জানত তার ফুপি আসবে, তাই হাসপাতাল থেকে চলে এসেছে।

সবাইকে ডাইনিং এরিয়াতে দেখে সে ওদিকেই গেল।

সেখানে মাহাদকে দেখে সবার আগে দুই ভাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর ফুফিকে জিজ্ঞেস করলো —

"কেমন আছো ফুপি? কতক্ষণ হলো এসেছো?"

"এসেছি আরও এক ঘণ্টা আগে। কিন্তু ভাইপো গুলোর একটারো দেখা নেই।

তারা হয়তো ফুপিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না, তাই আসবে জেনেও সময় দেয় না।"

"আরে আরে! রাগ করছো কেন? আমি ছুটি নিয়েছিলাম আজ,

কিন্তু হঠাৎ ইমারজেন্সি কল আসলো। তাই যেতে হলো।

বুঝোই তো, ডাক্তারি পেশা মানেই তো ইমারজেন্সি।"

"হুঁম... কেমন আছিস? আর আরেকজন কই?"

"আমিতো বেশ আছি। কিন্তু আরেকজন-এর কথা তো বলতে পারছি না।" তারপর মাহাদকে বললো—

"মেহরিন কই? ও আসেনি? দেখতে পাচ্ছি না যে?"

"মাত্রই উঠলো, খাওয়া শেষ করে।"

"আচ্ছা।"

"তো বিয়ে-শাদির ব্যাপারে কী ভাবছো? তোমার ভাই তো আমাদের না জানিয়েই চুপিচুপি করে নিলো। তোমারও কি সেরকম কোনো প্ল্যান আছে নাকি?" - ফুফি

দিগন্ত বললো—

"কি যে বলো না! ওসব চুপিচাপি কাজ আমি করি না।"

তারপর আবার ইশির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো—

"সবাইকে জানিয়ে, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বউ রুমে তুলবো!"

ইশির এভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে এসব বলতে দেখে একটু অস্বস্তি হলো।

সে নড়ে-চড়ে বসল।

"সোজা রুমে? বাড়িতে তুলবে না আগে?" — মাহাদ ইয়ার্কি স্বরে বললো।

দুই ভাইয়ের এমন নির্লজ্জমার্কা কথা শুনে সবাই বিষম খেলো।

দিগন্ত ইশির দিকেই তাকিয়ে চোখে হেসে বললো—

"বউ তো বাড়িতেই আছে। শুধু রুমে তোলার অপেক্ষা।"

তবে সেটুকু বাকিদের কান অব্দি গেলোনা।

শুধু মাহাদই শুনলো।

সে মাথা দু’দিকে নেড়ে হালকা হাসলো। তবে ইশির - ওর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নেড়ে কিছু বলতে দেখে মনে হলো ওকে নিয়েই কিছু বলছে। বাজে লোকটা শুধু তার পেছনে লাগে। অসহ্য।

মৌনপ্রেম পর্ব ৭ গল্পের ছবি