সময়টা বিকেল ৪ টার আশেপাশে। অন্তিক নিজের রুমে বসে কেইসের বিভিন্ন ফাইল ঘাটাঘাটি করছিলো। এমন সময় কেউ তার রুমের দরজায় নক করে। সে না তাকিয়েই হালকা স্বরে ভেতরে আসতে বললে মিসেস অয়েশা আমিনকে দেখা যায় দরজা ঠেলে রুমে আসতে। কফি নিয়ে এসেছেন তিনি। এসে অন্তিকের সামনে টেবিলে কফির মগ রাখলে অন্তিক বলে।
"থ্যাংকস মা। খুব দরকার ছিলো।"
মিসেস আয়েশা আমিন মৃদু হেসে ছেলের পাশে বসেন। অন্তিক মায়ের দিকে তাকালে তার মনে হলো মা কিছু ভাবছে। সে হাতে থাকা ফাইলে চোখ রেখে বলে -
"মা কিছু বলবে? এভাবে বসে আছো যে?"
"তোর পাশে বসতে গেলে বুঝি কিছু বলতে হবে? ছেলের পাশে এমনি বসা যায়না?"
বিরক্ত চোখে মায়ের দিকে একপলক তাকিয়ে -
"আমি সেটা কখন বললাম?"
"তাহলে?"
"একটু বেশি বুঝো। আমি বলতে চাইলাম, তুমি এভাবে বসে বসে কি ভাবছো?"
"ভাবছি তো অনেক কিছুই। আমার ভাবাভাবির কি শেষ আছে? তাছাড়া আমি যখন বেশি বুঝি তখন কম বুঝবে এমন মানুষ আনলেই তো হয়।"
"পয়েন্টে আসো।"
এবার মিসেস অয়েশা আমিন নড়েচড়ে বসে বললেন -
"বলছিলাম....বয়স তো অনেক হলো তোর। এবার একটা বিয়ে করে নে। কম কম বুঝবে, সময় অসময়ে কফি এনে দেবে। তোর দাদি বৃদ্ধা মানুষ, উনার কি নাতবউ দেখতে ইচ্ছে করেনা? আজকেই আমাকে বলছিলেন। তাছাড়া তোর ছোট ভাই-বোনেরাও এখন বিবাহযোগ্য। তাদের নিয়েও তো ভাবতে হবে সামনে। আমাদেরও বয়স হচ্ছে। সময় থাকতে বিয়ে করে নে, নাতি-নাতনি পেলে দিতে পারবো।"
"আর।"
"আর মানে? তুই কি আমার কথা পাত্তা দিচ্ছিস না?"
"দিচ্ছিতো।"
"তাহলে বিয়ে কর।"
"আচ্ছা।"
"সত্যি বলছিস? মেয়ে দেখি?"
"না।"
"না মানে? এইতো রাজি হলে। আবার না বলছিস কেনো?" তারপর আবার ছেলেকে একপলক দেখে জিজ্ঞেস করলেন -
"তোর কি মেয়ে পছন্দ আছে?"
"আপাদত এসব কথা রাখো মা। সময় হলে আমি নিজে বলবো তোমাকে। আর মেয়ে টেয়ে দেখতে হবেনা।"
মিসেস আয়েশা কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু বাইরে থেকে স্বামীর ডাক শুনে আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। শুধু যেতে যেতে বলে গেলেন -
"ঠিক আছে, এখন আমি আসছি। কিন্তু পরে আবার আসবো,তখন সব বলতে হবে।"
মা চলে যাওয়ার পর অন্তিক ভাবছে কিছু। খুব গভীরভাবে ভাবছে সে। সেদিনের ঐ মেয়েটার কথা। যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার বুকে এসে, হৃদয়ে ধাক্কা দিয়ে পালিয়েছে। সে ঘটনার পার হয়ে গিয়েছে।
অথচ অন্তিক এক মুহূর্তের জন্যও মেয়েটাকে ভুলতে পারছেনা। মেয়েটা তার বুকে এসে লেগে তাকে ঘোরে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। অন্য একটা জগতে ছিলো সে ঐ মুহূর্তে। এতটাই মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল যে মেয়েটাকে বুক থেকে তুলে চেহারাটা দেখবে, পালানোর আগে হাত ধরে নামটা জিজ্ঞেস করবে, সে হুশ টুকুও ছিলোনা।
আর এখন ঐ মেয়েটার কথা ভাবতেই অস্থির লাগছে। কি অদ্ভুদ!! মুহূর্তের সাক্ষাতে মেয়েটা কতো রকম অনুভুতি যে দিচ্ছে তাকে। ঐ ইউনিভার্সিটিতে কতোজন স্টুডেন্ট? অতোগুলো মেয়ের মধ্যে সে তার অস্থিরতাকে কোথায় খুঁজবে? কাকে জিজ্ঞেস করবে তার কথা? এসব ভেবে ভেবে সে আরো অস্থির হচ্ছে।
অন্তিক হঠাৎ বিছানা থেকে মোবাইলটা নিয়ে নীলয়কে ফোন করলো।
"জী স্যার। বলুন।"
"নীলয়, ঐ মেয়েটাকে খুঁজে বের করো। যেকোনো ভাবে।"
"কোন মেয়ে স্যার?"
"সেদিনের ঐ মেয়েটা।"
"কোন দিনের কথা বলছেন স্যার? অনেক দিন-ই কাটলো জীবনে।"
"উফ... কিছুই মনে রাখোনা। সেদিন ইউনিভার্সিটিতে আমাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়েছিলো ঐ মেয়েটা। খুঁজে বের করো তাকে।
তুমি তো ওকে দেখেছিলে। জনে জনে জিজ্ঞেস করবে সব স্টুডেন্টকে। তাড়াতাড়ি করবে। দুদিনের মধ্যে খবর চাই আমার।"
"ও.. ওকে স্যার। দেখছি ব্যাপারটা।"
অন্তিক ফোনটা কেটে দিলো। নীলয়কে তো বলে দিয়েছে মেয়েটাকে খুঁজে বের করতে। নীলয় তার কোনো কাজ অসম্পূর্ণ রাখেনা। দুদিনের মধ্যেই হয়তো খুঁজে বের করে ফেলবে।
সে তার অস্থিরতাকে দেখতে পাবে। এসব ভেবে ভেবেই যেন অস্থিরতা আরো দ্বিগুণ হচ্ছে।
এদিকে নীলয় ফোনটা কেটে দিয়ে ভাবছে সে যা ভেবেছিলো তাই হলো। সে জানতো তার স্যার মেয়েটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলবে তাকে। সেদিন গাড়িতে তার হাবভাব দেখেই বুঝেছিলো।
কিন্তু এতো ডেস্পারেট হয়ে খোঁজ নিতে চাইবে ভাবেনি। তার খুব ইচ্ছে করছিলো কারণটা জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু সে সর্বদা-ই বিনা বাক্যে অন্তিকের সব আদেশ মেনে নেই। কোনো রকম প্রশ্ন না করেই অন্তিকের এমন হুটহাট করা বিভিন্ন আদেশ পালন করে সে।
তাই আজও স্বভাব বিরুদ্ধে গিয়ে তা করতে পারলোনা। সে যায় হোক, নীলয় তার অন্য এক সহকর্মীকে সাথে নিয়ে চললো সেই ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে।
---------
আরশি নাহিদের সাথে কথা বলছে বর্তমানে। কাঁদতে কাদঁতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। এখন বাবা-মায়ের অগোচরে নাহিদের সাথে ফোনে কথা বলছে। নাহিদকে সে শুরু থেকে সব ঘটনা জানিয়েছে।
এও বলেছে তার মা বাবাকে মানাবে বলে রুমে ঢুকে কথা বলে উল্টে নিজেই মেনে এসেছে। বাবা মানেনি তো মানেনি, উল্টে মাকেও যাতে না মানে হুশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। মায়ের সান্ত্বনায় আরশির যা একটু ভরসা ছিলো, এখন তাও গুড়িয়ে গিয়েছে।
সে কাঁদতে কাঁদতে নাহিদকে এসব-ই বোঝাচ্ছে। নাহিদ যদিও তাকে অভয় দিয়েছে, সব ঠিক করে দেবে। কিন্তু তাও তার মন মানতে চাচ্ছেনা। মনে হচ্ছে কিছু একটা অঘটন ঘটবেই।
শেষে নাহিদ বললো সে তার বাবা মাকে নিয়ে তাদের বাড়ি আসবে তার বাবার কাছে মেয়ের হাত চাইতে। একথা শুনে আরশি একটু শান্ত হলো। নাহিদ ওকে আরো এটা সেটা বুঝিয়ে অভয় দিয়ে ফোনটা কেটে দিলো।
আরশির পাশেই দেয়ালের সাথে লেগে মুখ কালো করে দাড়িয়ে আছে প্রাণেশা। সে আরশির জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলো। মামী পাঠিয়েছে। মেয়েটা খাবার খাচ্ছেনা তাই।
তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আরশি আপুর জন্য। কিন্তু তার এটা ভেবে আরো খারাপ লাগছে যে, আরশি আপু এসব কিছুর জন্য তাকেই দ্বায়ী মনে করছে। হ্যাঁ। প্রাণেশার মামী যখন নাহিদ ভাইয়াকে ভুলে গিয়ে বাবার কথা মেনে নিতে বলেছিল তখন সে খুব কেঁদেছে।
প্রাণেশা তাকে সান্ত্বনা দিতে গেলে ঝটকা মেরে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলেছে এসবের জন্য সে-ই দ্বায়ী।
সে না তাদের ইউনিভার্সিটি যেতো, না শুভ স্যারের নজরে পড়তো, আর না আজ জল এতদূর গড়াতো। আরশির মুখে এসব শুনে তখন প্রাণেশা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ বনে গিয়েছিলো। এরপর আর আরশি আপুকে কোনোরকম সান্ত্বনাবাণী বোঝাতে যায়নি সে।
এভাবেই দেখে গিয়েছে শুধু। হঠাৎ আরশি তাকে বললো সে যেনো রুমের বাইরে যায়। প্রাণেশা শুনে। তারপর বিনাবাক্যে বেরিয়ে যায়। সে জানে আরশি আপু এখন রুমের দরজা লাগিয়ে কাঁদবে। নিজের ইচ্ছেমতো কাদঁবে।
যেতে যেতে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করলো যেনো সবাইকে তাদের ভাগ্যে যা আছে তা বেশি কষ্ট না দিয়ে পাইয়ে দেই।
রুহিদের দাদি বলে সৃষ্টিকর্তা বাচ্চা-কাচ্চা, অসহায় আর প্রতিবন্ধীদের কথা নাকি বেশি শুনে। তার কথাও হয়তো শুনে নিলো অন্তর্যামি।