আরশিদের ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ দিকের জায়গাটা খুব সুন্দর। বিশেষ করে এমন দিনে একটু বেশি সুন্দর। কেমন দিন? এই যে, জারুল ফুল, কৃষ্ণচুড়া, সোনালু এমন এমন ফুলগুলো ফোটার দিন।
হ্যাঁ। ইউনিভার্সিটির এই দিকে একটা করে জারুল, সোনালু, আর দুটো কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে। কি সুন্দর দেখতে! আর পরিবেশটাও বেশ মনোরম। ইউনিভার্সিটির প্রায় স্টুডেন্ট এখন ক্লাসে। তবে বেশ কয়েকজন বাইরেও আছে। এদিক সেদিক কয়েকজনকে হাটতে দেখা যাচ্ছে ক্যাম্পাসে।
তবে দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ প্রাণেশা এখন যেখানে বসে আছে, সেদিকে কেউ নেই। একজন দুজন যারা আছে তারা নিজেদের মতো বসে আছে। প্রাণেশাও এখানে বসে বসে সময়টা পার করছে। আরশির ক্লাসটা শেষ হতে আরও ৩০ মিনিটের মতো লাগবে।
তাই সে এখানে নিরিবিলিতে বসে অপেক্ষা করছে। তখনকার সেই অসভ্য বাজে লোকটার থেকে পালিয়ে সে এখানেই এসেছিলো। ইশ!! মুহুর্তটা ভাবতেই প্রাণেশার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। কেমন করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল লোকটা।
আর তো আর, মুখ টাও এগিয়ে এনে কি জানি করতে চেয়েছিল। নিশ্চয় বাজেভাবে ছুঁয়ে দেওয়ার মতলব ছিল। অসভ্য লোক। মেয়ে দেখলেই হুশ থাকেনা। প্রাণেশা নিজের কোমরে হাত দেই।
এক পলক দেখে মনে মনে বলে -
"ইশ! আমার স্বামীর হকে হাত রেখে কেমন নিজের সাথে চেপে রেখেছিলো অসভ্য ইতরটা।"
সে ভাবে ঐ লোকের গালে একটা ছড় বসিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। তাহলেই এদের শিক্ষা হবে। আবার পরক্ষণেই ভাবে -" না না। থাপ্পড় দিয়ে ঝামেলায় জড়ানোর চেয়ে পালিয়ে আসাটাই ভালো ছিল।"
আরশির ক্লাসটা শেষ না হওয়া অব্দি প্রাণেশা এখানে বসে বসে নিজের ছোট মস্তিস্কে এমন কতশত চিন্তা যে করলো। শেষ হওয়ার সময় হয়ে আসতেই সে ক্লাসের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো স্যার বের হওয়ার। প্রাণেশা এখানে আগেও দুই/তিন বার এসেছে।
একবার ওর কলেজের প্রথম দিন যখন আরশির সাথে ভর্তি হতে এসেছিলো তখন ভর্তি শেষে আরশির সাথে ইউনিভার্সিটিতে এসেছিলো আরশির-ই কোনো একটা কাজে। এরপর আরও দুই একবার এসেছে এভাবে সেভাবেই। আরশির বন্ধুবান্ধবগুলো খুব ভালো।
প্রাণেশাকে খুব স্নেহ করে। ও কথা বলতে পারেনা বলে কেউ তাচ্ছিল্য চোখে দেখেনা। এজন্যই এখানে আসতে সে তেমন দ্বিধাবোধ করেনা। নাহয় তাকে যেখানে কেউ তার প্রতিবন্ধকতার কারণে অবহেলা চোখে দেখে সেখানে সে তেমন একটা যেতে চায়না।
কিংবা গেলেও নিজের উপস্থিতি তেমন জানান দেয়না। কেমন গুটিয়ে গুটিয়ে রাখে নিজেকে। ইন্সিকিউরিটি না, তবে সে তেমন লাইম্লাইট পেতে আগ্রহী না। হোক সেটা নেগেটিভ ভাবে কিংবা পজিটিভ ভাবে।
এসব ভাবতে ভাবতে আরশিদের ক্লাসরুম থেকে স্যার বের হন। প্রাণেশা ক্লাসের সামনেই দাড়িয়ে ছিল। ক্লাসরুম থেকে বের হয়েই একটা মেয়েকে বাইরে দাড়িয়ে থাকতে দেখে স্যার দাড়িয়ে গেলো। স্যারটার নাম শুভ। শুভ স্যার একটা মেয়েকে ক্লাসের বাইরে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবে হয়তো মেয়েটা তার ক্লাস বাদ দিয়ে ঘোরাফেরা করছিলো।
আর তার যাওয়ার সময় হয়েছে বলে পরবর্তী ক্লাস করতে এভাবে ক্লাসরুমের সামনে দাড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা তার ভালো লাগলোনা। দেখতেতো কেমন ভোলাভালা নিস্পাপ মেয়ে।
অথচ স্টুডেন্ট হিসেবে ইরেস্পন্সিবল - এই ভেবে সে খানিকটা কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলো -
"এই যে মেয়ে, ক্লাস না করে এভাবে বাইরে দাড়িয়ে ছিলেন কেন? কি সমস্যা?"
প্রাণেশা ভড়কে গেলো। বেচারি কি হচ্ছে বুঝতে পারছেনা। কিন্তু প্রাণেশাকে কোনো উত্তর দিতে না দেখে শুভ স্যার আবার ধমকে জিজ্ঞেস করলো -
"টিচাররা কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে হয় জানেননা? সালামও দেননি। ম্যানার্সলেস মেয়ে।"
প্রাণেশার খারাপ লাগলেও বুঝতে পারলো স্যারটা তাকে ভুল বুঝেছে। দ্বিধায় পড়ে ইশারায় যে বোঝাবে সেটুকুও মাথায় এলোনা।
কেউ একটু বাচাবে এই আশায় কোনা চোখে এদিক সেদিক তাকালো। কিন্তু কাউকেই পেলোনা। পাবে কি করে, আরশি আর ওর বন্ধুরা তো ক্লাসে এখনও। তার মনে মনে বেশ আফসোস হলো।
শুভ স্যার ওকে এভাবে এদিক সেদিক তাকাতে দেখে যেন আরও ক্ষেপে গেলো। তার কথায় পাত্তা দেইনি মেয়েটা, এই ভেবে। সে আবার ধমকে উঠলো -
"বেয়াদব মেয়ে, কথার উত্তর দাওনা। আবার একজন টিচারের সামনে সংযত হয়ে না দাড়িয়ে এভাবে এদিক সেদিক করছো। ক্লাস বাঙ্ক দাও। কি সমস্যা তোমার? লেখাপড়া করার ইচ্ছে নেই?"
প্রাণেশার যেন এবার কান্না পেলো। ইঙ্গিতে কিছু বলতে যাবে, হঠাৎ ক্লাসের দরজা বরাবর ভেতরে আরশিকে দেখে "উ..উ.." শব্দ করে ওকে ডাকতে লাগলো। শুভ স্যার ওকে হঠাৎ এমন করতে দেখে কিছুই বুঝতে পারছেনা। তবে দেখলো ক্লাসের ভেতর থেকে আরশি বাইরে মেয়েটাকে দেখতে পেয়ে ওদের দিকেই আসছে।
"কি হয়েছে প্রাণো? তুই এখানে, এই সময়। কোনো সমস্যা? কলেজ থেকে চলে এলি যে?"
প্রাণেশা কাঁদোকাঁদো মুখ করে ইঙ্গিতে পুরো কারণটা বুঝাচ্ছে। সব বুঝতে পেরে আরশি-
"আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। সব বুঝলাম। কিন্তু তুই এমন কাঁদোকাঁদো মুখ করে দাড়িয়ে আছিস কেন? কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?"
প্রাণেশা আরশির কথা শুনে পেছন ফিরে এক পলক শুভ স্যারের দিকে তাকায়। দেখতে পায় শুভ স্যার কেমন হতবম্ব ভঙ্গিতে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর কিছু বোঝার চেষ্টা করছে।
প্রাণেশা এক পলক তাকিয়ে আবার আরশির দিকে ফিরে মাথা নেড়ে বোঝাল -
"কেউ কিছু বলেনি। গরমে একটু অস্বস্থি হচ্ছিলো। ব্যাস।"
আরশি ওর কথা শুনে শুভ স্যারের দিকে তাকিয়ে -
"স্যার, আপনি কি কিছু জানতে চাচ্ছিলেন ওর কাছে? আসলে ও কথা বলতে পারেনা। তাই উত্তর দিতে পারেনি। আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেননা।"
শুভ স্যার নিজের হতবম্ব ভাব কাটিয়ে দ্বাতস্থ হয়ে বললো -
"না, সমস্যা নেই। ও কি এই ভার্সিটির স্টুডেন্ট না?"
"না স্যার। ওতো কলেজে পড়ে। ঐ তো পাশের ***কলেজে। ফার্স্ট ইয়ারে। কলেজে নাকি কোনো একটা সমস্যার কারণে ক্লাস হচ্ছেনা কারও। তাই ও আমার কাছে চলে এসেছে।"
"তোমার কি হয়?"
"বোন। আমার ফুফাতো বোন।"
"ওহ, আচ্ছা।"
"স্যার আসি?"
"হুম, যাও।"
আরশি সালাম দিয়ে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকা প্রাণেশার হাত ধরে চলে গেলো শুভর পাশ কাটিয়ে।
শুভ কয়েক সেকেন্ড প্রাণেশার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। এভাবে একটা মেয়েকে শুধু শুধু অপমান করে এতোগুলো কথা শোনালো। তার উপর ভার্সিটির স্টুডেন্ট ও না।
বাইরের একটা মেয়ে তার নিজের ভুলের জন্য তাদের ভার্সিটিতে এসে অপমানিত হয়ে চলে গেলো। মনে মনে বেশ অনুতপ্ত সে। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে চলে যেতে লাগলো, যেতে যেতে ভাবলো মেয়েটা বেশ সুন্দরী।
-----
প্রাণেশা আর আরশি আজ শপিং করে বাড়ি যাবে। সময়ের আগে যেহেতু ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাই দুজনে ভাবলো এই সুযোগে শপিং টাও সেরে নেওয়া যাক। যদিও শপিং এর টাকা গুলো সে আনেনি। তবে নিজের কাছে জমানো টাকা ছিল।
ওখান থেকে ভেঙ্গে শপিং করছে দুজন। আর ঠিক করে রেখেছে বাড়ি গিয়ে টাকাগুলো মায়ের থেকে নিয়ে নিবে। বেস্ট আইডিয়া। এই ভেবেই ওরা শপিং সেরে বাড়ি গিয়েছে।
তাছাড়া বাবার বন্ধুর মেয়ের বিয়েটাও আর বেশি দিন নেই। আজ ছিল চার তারিখ। আর বিয়েটা হবে পনেরো তারিখ। আরশি পড়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। তাই বেশি গ্যাপও দিতে পারেনা সে।
ফাইন দেওয়া লাগে। সাথে এসাইনমেন্ট এর প্যারা তো আছেই। তাই সময় সুযোগ পেয়ে হাত ছাড়া করেনি।
------
এরপর কেটে গেলো দুটো দিন। আর দুদিন পরেই ঘটলো সেই অবাক করা কাণ্ড। আরশিদের ইউনিভার্সিটির শুভ স্যার ঘটালো কাণ্ডটা। আরশিদের বাড়ি বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে, প্রাণেশার জন্য।
পরদিন হঠাৎ বাড়িতেও চলে এলো পাত্রী দেখতে। তবে সেখানে ঘটলো আরেক কাণ্ড। ওরা প্রস্তাব দিয়েছিলো প্রাণেশার জন্য। এসেওছিল ওকে দেখতে।
কিন্তু প্রাণেশার মামা মামী বড় মেয়ে রেখে ছোট মেয়ে বিয়ে দিতে নারাজ। স্বাভাবিক। জানা গেলো, ঐ বাড়ি থেকে যখন প্রস্তাব পাঠিয়েছিল বিয়ের, তখন তারা ভেবেছে প্রস্তাব টা আরশির জন্য।
তাই ওনাদের আসার অনুমতি দিয়েছে। এই ঘটনার জেরে মামা মামী দুজনেই প্রাণেশার উপর খানিকটা নারাজ। মুখে কিছু না বললেও চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এতে তো তার কোনো দোষ নেই।
তবে তারা প্রাণেশার জন্য পাত্রপক্ষকে নাকচ করে দিলে, পাত্র অর্থাৎ শুভ স্যারের মা হঠাৎ আরশিকেই চেয়ে বসেন। এতে বাড়ির পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আরশির মাথার উপর যেন বজ্রাঘাত হলো।
আরশি বা প্রাণেশা কেউই জানতোনা যে আজ পাত্রপক্ষ আসবে। জানবে কি করে। বাড়িতেই ছিলোনা। আরশির খালার বাসায় গিয়েছিলো দুজনে। এসেছে সকাল বেলা। পাত্রপক্ষ এসেছে দুপুর বেলা।
তারপর কি থেকে কি হয়ে গেলো দুজনেই কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। শকে ছিল। তার উপর প্রাণেশার জন্য যেহেতু এটা সেটা প্রস্তাব আসে মাঝে মাঝে তাই দুজনে ওর জন্যই আসছে ভেবে বসেছিল। মা বাবাও স্পষ্ট করে কিছু বলেনি।
এখন বুঝতে পারছে পুরো কাহিনী। কিন্তু সবার সামনে বেয়াদবি করলোনা সে, বরং বাবা মা-র সাথে আলাদা করে কথা বলার সুযোগ খুঁজছে। আর শুভ স্যার তো আসেনি পাত্রী দেখতে। সে তার বোনের মাধ্যমেই ফোনে সব খবরাখবর রাখছিলো এতক্ষণ। কিন্তু মা আরশির জন্য প্রস্তাব দিয়েছে শুনে সে ভীষণ ক্ষেপে গেছে।
আপাদত বাবা মায়ের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছে। মা তাকে জিজ্ঞেস না করে এক মেয়েকে দেখতে গিয়ে কিভাবে অন্য একটা মেয়ের জন্য প্রস্তাব দেই।
––––
প্রাণেশার মামা বাড়ির পরিস্থিতি এখন থমথমে। আরশি বসে আছে বাবা মায়ের সামনে সোফায়। প্রাণেশা আর আরিভও আছে একপাশে জড়োসড়ো হয়ে দাড়িয়ে।
"বলো কি বলবে।" -বাবা
"তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস না করে কিভাবে হ্যাঁ বলে দিলে ওদের? তোমাদের কি মনে হয়নি আমাকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন ছিল একবার আমার জীবনের এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে?"
"ঠিক করে কথা বলো বাবার সাথে আরশি। বাবা হয় তোমার। আর আমাদের কি তোমার জীবনে কোনো অধিকার নেই? আমরা কি এখন নিজের মেয়ের বিয়ের কথাও ভাবতে পারবো না?"– মা
"পারবেনা কেন মা। অবশ্যই পারবে। কিন্তু আমাকে কি একটা বার জিজ্ঞেস করতে পারতেনা এভাবে ওদের প্রস্তাবে রাজী হয়ে যাওয়ার আগে?"
"আমরা তোমার বাবা মা আরশি। তোমার খারাপ চাইবোনা অবশ্যই।"
-বাবা
"জানি বাবা। কিন্তু তোমরা আমাকে না জানিয়ে কিভাবে পারলে এটা করতে?"
"এখন তো জেনেছো। এবার বলো তোমার এতো আপত্তির কারণ?" - বাবা
"এতকিছু জানিনা। আমি এই বিয়ে করতে পারবোনা।" - আরশি
"কেন? ছেলে কি খারাপ? দেখতে খারাপ? নাকি পরিবার খারাপ? কোনটা বল? তোর সমস্যাটা কোথায়? আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, যথেষ্ট ভদ্র তাদের পরিবার। আর ছেলে তো তোদের ভার্সিটির-ই প্রফেসর। তোর-ই তো ভালো জানার কথা তার ব্যাপারে।" - মা
"সব জানি মা। কিন্তু আমি ওনাকে বিয়ে করতে চাইনা।"
আরশির বাবা হঠাৎ গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন -
"তোমার কি কোনো পছন্দ আছে?"
"কি বলছেন আপনি? ওর আবার কাকে পছন্দ থাকবে?" - মা
"তুমি চুপ করো।" - বাবা
এরপর আবার আরশির দিকে তাকিয়ে -
"তুমি কি কারো সাথে সম্পর্কে আছো?"
বাবার বলার ধরণ দেখে আরশি ভয় পেল। তবে অস্বীকার করলোনা নিজের ভালোবাসার কথা। মায়ের দিকে একপলক তাকিয়ে আবার বাবাকে ভয়ে ভয়ে বললো -
"হ্যাঁ, আমি একজনকে ভালোবাসি বাবা। ও খুব ভালো বিশ্বাস করো। আমাকে খুব ভালোবাসে। কর্পোরেট জব করে। আমাকে ভীষণ ভালো রাখবে দেখো।"
"আরশি, কি বলছিস তুই এসব?" -মা
আরশির বাবা নিজের স্ত্রীকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিলেন। তারপর অত্যধিক শীতল কণ্ঠে আরশির দিকে তাকিয়ে বললো -
"ভুলে যাও। ঐ ছেলের কথা যেন এই বাড়িতে ২য় বারের মতো আর না উঠে।"
উনি চলে গেলেন। আরশি বাবাকে ডাকলো, তাও থামলোনা।
আরশি তার মাকে ধরলো -
"মা প্লিজ। তুমি বাবাকে বোঝাও। নাহিদ খুব ভালো ছেলে। জব করে, প্রতিষ্ঠিত। আমি ওকে খুব ভালোবাসি। মা প্লিজ, বাবাকে বোঝাও।"
আরশির মা খুব দ্বিধায় পড়ে গেলেন। মেয়ের আকুতি মিনতি মায়ের মনে বেশ লাগছে। কিন্তু তিনি স্বামীকেও চিনেন। এও জানেন, তার স্বামী মেয়ে একটা ছেলেকে ভালোবাসে এ কথা শুনার সাথে সাথেই নাকচ করলেন কেনো। সব-ই জানেন তিনি।
স্বামীর ভয় বেশ ভালোই বুঝতে পারছেন। তার নিজেরও তো মেয়েটার জন্য ভয় হচ্ছে মেয়ে সম্পর্ক করে বিয়ে করতে চায় শুনে।
কিন্তু মেয়েটার এতো আকুতি মিনতিও ফেলতে পারছেন না। তিনি মেয়েকে শান্তনা দিয়ে চলে গেলেন স্বামীকে বোঝাতে।
–––––––––––
এদিকে শুভ এসব কাহিনী শুনার পর পর–ই বাড়ি চলে এসেছে মায়ের সাথে কথা বলতে। এখন অপেক্ষা করছে তাদের আসার।
ওর বাবা, মা, বোন বাড়িতে প্রবেশ করলে সে তৎক্ষণাৎ তাদের সামনে দাড়ায়।
"এসবের মানে কি মা? আমি বলেছিলাম প্রাণেশা মেয়েটার জন্য প্রস্তাব দিতে। তুমি ওখানে গিয়ে ঐ বাড়ির–ই অন্য একটা মেয়েকে চেয়ে আসলে? ও আমার স্টুডেন্ট হয় মা। এখন আমি ওকে ফেস করবো কিভাবে? আমার মান সম্মান কোথায় গিয়ে দাড়িয়েছে বুঝতে পারছো? – শুভ
"আস্তে কথা বল। আর আমি অবুঝ নই যে বুঝবো না কি করেছি। এমন ভাবে বলছিস যেন এই পৃথিবীতে আগে কখনও ছাত্রী–শিক্ষক এর মধ্যে বিবাহজনিত সম্পর্ক হয়নি।" – মা
"হয়নি বলছিনা। অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু সবার একটা চাওয়া পাওয়া থাকে নিজস্ব। আমি চাইনা আমার ক্ষেত্রে এমনটা হোক। আর তাছাড়া আরশি মেয়েটার কথা আসছেই বা কেনো? যেখানে আমি বলেছিলাম ওর বোনের জন্য প্রস্তাব দিতে। – শুভ
"তোর বোকামির–ই ফল এসব। তুই আমাদের কেনো বললিনা যে ঐ বাড়িতে যার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি তার বড় একটা বোন আছে? বাড়িতে বিবাহযোগ্য একটা অবিবাহিত মেয়ে রেখে ছোট মেয়ে বিয়ে দেবে ওরা? মাথা কি একেবারেই গিয়েছে তোর?" – মা
"কিন্তু মা, ওরা তো আপন বোন না।" – শুভ
"না হোক আপন বোন। কিন্তু কোনো ভদ্র বাড়ির মানুষ বাড়িতে বড় মেয়ে রেখে ছোট মেয়ে বিয়ে দেবেনা। ওনারা তো ভেবেছিলেন বড় মেয়ের জন্য–ই প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের নাক কাঁটা যাচ্ছিলো তোর বোকামির জন্য। তাই বড় বড় কথা বলিস না। আর তাছাড়া ছোটটার মতো অতো বেশি না হলেও বড় মেয়েটাও যথেস্ট সুন্দরী। আর না ওর কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে।"
"মা......"
"একদম চুপ। তোর জন্য যথেষ্ট অপমানিত হয়েছি। এখন দয়া করে ভালোই ভালোই রাজী হয়ে যা আরশি মেয়েটাকে বিয়ে করতে। যদিও প্রাণেশা মেয়েটার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকর্তার দেওয়া। এতে খারাপের কিছু নেই। কিন্তু আমি আমার ছেলের জন্য জীবন সঙ্গেী হিসেবে অবশ্যই একটা সুস্থ সবল মেয়ের আশা রাখতে পারি।"
শুভ হতাশ হয়ে দাড়িয়ে রইলো মায়ের কথা শুনে। টার প্রাণেশা মেয়েটাকে খুব ভালো লেগেছিলো। সেদিনের ঐ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর সারারাত ঐ মেয়েটার কথায় ভেবেছে সে।
মনে জায়গা করে নিয়েছিলো ঐ টুকু সময়ের মধ্যে। তাই তো মাকে বলে সোজা বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো ওর সব অপূর্ণতাকে মেনে নিয়ে। কিন্তু ওর ভাগ্যে বোধ হয় মেয়েটার নাম লেখা–ই নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।
–––––––––
অন্যদিকে আরশির মা আর বাবা সেই যে রুমে ঢুকেছিলেন এখনও অব্দি বের হন নি। বাইরে ওরা তিন ভাই বোন খুব টেনশনে আছে। তবে কেউ কারো সাথে কথা বলছেনা।
সবাই নিরব। যে যার যার মতো কিছু চিন্তা করছে। আরশি ভাবছে, না জানি তার মা বাবাকে বোঝাতে পারলো কিনা।
"কি ভাবছেন? মেয়ে তো ঐ ছেলেকে ভালোবাসে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে দিবেন? সুখী হবে?"
"তো কি বলতে চাচ্ছো? মেনে নিতে?"
"এভাবেই তো আর মেনে নিতে বলছিনা। খোঁজ খবর নিন একটু। তারপর ভালো হলে এগোবেন। নাহয় মেয়েকে বুঝিয়ে বলবেন। ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে তো মেয়ের বিয়ে দিতে পারিনা।"
"হ্যাঁ। নিজের পছন্দে বিয়ে করবে। তারপর কতটুকু সুখী হবে বেশ জানা আছে আমার।"
"আপনি এখনও সেই পুরোনো ব্যাপার নিয়ে পড়ে আছেন। এমনো তো হতে পারে ছেলেটা সত্যি সত্যি আপনার মেয়েকে ভালোবাসে। সবাই কি একরকম?"
"আমি ভাবতে পারছিনা তুমি এতকিছু দেখার পরও মেয়েকে সম্পর্ক করে বিয়েতে সম্মতি দিতে চাচ্ছো কি করে! শুনো, তুমি আমাকে হাজার বোঝালেও আমি এই সম্পর্ক মেনে নেবোনা।
আমার বোনটা যে যন্ত্রণা পেয়েছে আমি তা কখনও আমার মেয়েকে পেতে দেবোনা। দরকার হলে নিজের হাতে মেয়েকে মে/রে ফেলে একেবারেই সব শেষ করে দেবো কিন্তু মেয়ের সারাজীবনের দুঃখ, লাঞ্ছনা আমি মেনে নিতে পারবোনা।"
"কি বলছেন? থামুন। মেনে নিতে হবেনা। যেখানে ইচ্ছে বিয়ে দিন আপনার মেয়ের। তাও এমন অলুক্ষুণে কথা বলবেননা। দরকার পড়লে আমি বোঝাচ্ছি মেয়েকে। তাও মুখে লাগাম টানুন।"
আরশির মা আতংখিত চেহারা নিয়ে বাইরে চলে গেলেন। আর তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান মাথা ফেলে বসে রইলেন, চোখ বুঝে। তারছই মুহুর্তে মা, বাবা আর বোনটার কথা খুব মনে পড়ছে।
সবার আয়ু এভাবে একসাথে ফুরিয়ে যেতে হলো? তাকে একা করে দিয়ে।
আদরের বোনটার জীবন নতুন করে সাজিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে ভিন্ন ছিল। বোনটারও ইচ্ছে ছিলোনা।
বাবা মা-ই তো বেশি মুখ ভার করে রাখতো মেয়ের কষ্টে, তাই ওদের কেও নিয়ে চলে গিয়েছে। সব কষ্ট সাথে নিয়ে। আর মেয়েটাকে অসহায় করে দিয়ে।
তার চোখ দিয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পরলো মা, বাবা আর বোনের কথা ভাবতে ভাবতে।