“তোকে বলেছিলাম রেডি হয়ে আমার রুমে আসতে। আসিসনি। এরপর এখানে এসেও বারবার আড়াল থেকেছিস। আমি যদি এখন এর শাস্তি দিই? তোর কি একটুও ভয় করছেনা?
“দিগন্ত ভাই!! আপনার মনে হয়না কারণে অকারণে আমাদের এখন রুমে আসা যাওয়া করা অনুচিত?”
দিগন্ত একটু থমকায় ইশির কথাটার মানে বুঝতে পেরে। পরক্ষণে বলে,
“কেন? এখন আমরা প্রেমিক প্রেমিকা বলে খারাপ কিছু হয়ে যাবে ভয় পাচ্ছিস?”
ইশি চুপ থাকে। মাথা নামিয়ে নেয় নীরবে। কিছুটা লজ্জ্বার আভা দেখা যাচ্ছে চেহারায়। হয়তো সরাসরি প্রেমিক প্রেমিকা বলায় নিজেদের। তবে সে যে লজ্জ্বা পেতে চাইছেনা তা স্পষ্ট।
“ভয় পাবো কেন? আমার এমনিতেও খারাপ লাগছিল বাড়ির কেউ কিছু টের পেলে কষ্ট পাবে আমাদের থেকে। তাই আরকি! তাছাড়া রুমে এখন আর আগের মতো অবাধে যাওয়া আসা করাও ঠিক হবেনা।”
দিগন্তের আফসোস হয়। ম্যাচ্যুর মেয়েমানুষকে মন দেওয়ার ফল তাকে সামনেও ভুগতে হবে। আজ একটা নিব্বি প্রেমিকা হলে যখন তখন রুমে ঢুকিয়ে টুসটাস চুমু খাওয়া যেতো। এত উচিত অনুচিতের হিসাব করতে হতোনা।
সে হতাশা স্বরে বলে,
“তার মানে একলা বসে একটু মন ভরে চোখ ভরে দেখতেও পারবোনা যতদিন না কবুল বলে রুমে আনতে পারছি, তাইতো?”
“যা তা বলে দেন দেখছি।” ইশি কিছুটা চোখ গরম করে বলে
দিগন্ত তার রাগী চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে হাসে। মন ভোলানো সেই হাসি। ইশি চোখ শীতল হয়ে আসে ঐ হাসি দেখে। মন দিয়ে দেখে। জেন্টালম্যানদের মতো ভাইব আসে দিগন্ত ভাইয়ের প্রতিটা চালচলনে। হাসিটা খুব মানায় তাকে। আচানক তার মনে হলো, পাকিস্তানি রিয়েলিটি শো তামাশা -র সাইফ আলী খানের সাথে দিগন্ত ভাইয়ের সবকিছু খুব মিলে। দেখতে অবশ্য দিগন্ত ভাইকেই তার চেয়ে সুদর্শন লাগে। কিন্তু কণ্ঠস্বরটা হুবহু যেন কপি পেস্ট। ইশির ঐ কণ্ঠে যেকোনো কথা শুনতে ভালো লাগে। মনে হয় যেন শুনতে থাকুক। কখনো না থামুক।
“কি দেখছিস?” হঠাৎ নিজের অত্যাধিক কাছে দিগন্ত ভাইয়ের উপস্থিতি টের পায় সে। তবে অপ্রস্তুত হয়না। আরও অনুভব করে যেন।
“আপনার ভয়েসটা খুব সুন্দর দিগন্ত ভাই। আমার শুধু শুনতে ইচ্ছে করে।”
“তাই নাকি? ভয়েসও সুন্দর হয়? তাও ছেলেদের।” প্রাণেশাকে রুমে দিয়ে চলে আসার সময় দিগন্ত তাকে আঁটকে নিয়েছিল। দেয়ালে লেগে দাড়িয়ে আছে। দিগন্ত তার একপাশে হাতের ঠেস দিয়ে খুব কাছে দাড়ায়, তবে দুজনের শরীর স্পর্শ করেনা। ছুঁই ছুঁই অবস্থা। ইশির এতে নিঃশ্বাস ভারী হয়। তাও তার চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলে,
“হয়।”
“জানতাম না তো। আমি শুনেছিলাম ছেলেদের ভয়েস নাকি হট হয়।”
“ওটাই।”
“হট বলছিস?”
“হু”
তার সোজাসুজি উত্তর শুনে দিগন্ত মাথা নামিয়ে হেসে উঠে। ইশি তাও দেখে কেমন শিকারি প্রেমিকার চাহনি দিয়ে। যদিও দিগন্ত মাথা কিছুটা নামিয়ে রেখেছে ইশির বরাবর হতে। তাও তার দিকে সরাসরি তাকাতে ইশিকে মাথা তুলতে হতো। কিন্তু সে তা না করে বরং চোখের মণি তুলেই দেখছে। এমনভাবে মাথা সোজা রেখে চোখের মণি তুলে তাকানোতে, ইশির দিগন্তের প্রতি অবসেশন প্রকাশ পাচ্ছে যেন। অথচ দুদিন আগেও সে নিজের অনুভূতি অস্বীকার করতে চাইতো। শুধু শুধু দিগন্তকে কষ্টে রেখেছে এতগুলো দিন, এতগুলো বছর।
“এভাবে কি দেখছিস।” সে চোখ উচিয়ে জিজ্ঞেস করে
ইশি মাথা নাড়ায়।
“কিছুনা। আপনি আমাকে গান শুনাবেন এবার থেকে। আমি গান শুনবো আপনার কণ্ঠে।”
“যথাআজ্ঞা মাই লেডি।”
—————
মেহেরিন আর তুরাগের বিয়ে হচ্ছে। কাজী সাহেব বিয়ে পড়াচ্ছেন। বর বউ সামনে বসা। বাকিরা চারদিক থেকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছে। প্রাণেশাও সেই বাকিদের একজন। ইশি তখন তাকে নিয়ে এসেছিল। আর মেহেরিনকে দিথী অয়ন্তি। সবাই একসাথেই নেমেছে। প্রাণেশা অন্তিকের পাশে দাড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে বিয়ে পড়ানো। অয়ন্তি আপু আর মাহাদ ভাইয়ার বারেও খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিল সে। তাও বিয়ে দেখার তৃষ্ণা মেটেনা তার। বর-বউ দেখার তৃষ্ণা মেটেনা। তার একটা আফসোস, সে বউ সাজতে পারেনি নিজের বিয়েতে। না তো কোনো আনন্দ করতে পেরেছে। উল্টো কষ্ট পেয়ে ব্যথিত মন নিয়ে পাথর বনে বিয়ে বসেছিল। মেহেরিন কবুল বলার সাথে সাথে তার ধ্যান ভাঙে।
“কি হয়েছে? এত আনমনা হয়ে কি ভাবছো?” ফিসফিস করে বলে অন্তিক। প্রাণেশার লতানো কোমরখানায় তার হাত। শাড়ি ভেদ করে কোমর বেয়ে বেয়ে উষ্ণ উদরে চলে আসে ঐ হাতটা।
প্রাণেশা মাথা তুলে তাকায় স্বামীর দিকে। তার কোমর হতে উদর বেয়ে অন্তিকের হাত চলাচল করছে তা সে বুঝতে পারেনি। বিয়েতে রেখেছে সম্পূর্ণ মনোযোগ।
“কি বলছেন?” চোখের ইশারায় অবুঝ চোখে জানতে চায় সে
“বলছি এত আনমনা হয়ে কি ভাবা হচ্ছে?” আগের মতো ধিমি কণ্ঠে মদ্যপ নয়নে তার দিকে তাকিয়ে বলে সে।
“ঐ আরকি, ওরা কবুল……” দক্ষ হাতে এতটুকু ইশারা করেই থেমে যেতে হয় প্রাণেশাকে। উদরে অবাধ্য স্পর্শ টের পেয়ে। নাভিদেশের চারপাশে তার আঙ্গুল ঘুরছে, কখনো একটু নিচে নামছে। প্রাণেশা ধুরুধুরু বুকে চারপাশে চোখ বুলিয়ে কেউ তাদের দেখছে কিনা একবার দেখে নেয়। সবাই বিয়ের প্রতি মনোযোগী হয়ে আছে। সে মাথা উচিয়ে অন্তিকের দিকে তাকায়। তার হাতের উপর হাত রেখে ছাড়াতে চেয়ে বলে,
“ছাড়ুন! কেউ দেখবে।” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
“কেউ দেখবেনা। এত মানুষের ধাক্কায় হোঁচট খাবে। চুপচাপ দাড়িয়ে থাকো।”
“আমি পরবো না। ছাড়ুন না প্লিজ। কেউ দেখে নেবে।” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
অন্তিক তার কথায় পাত্তা দেয়না। প্রাণেশা হতাশ চোখে তাকায়। লোকটা ভিড়ের মধ্যে তাকে আগলে রাখতে এভাবে ধরে রেখেছে। অথচ হাত বলছে অন্য কথা।
বিয়েতে ইরফান আর তোশাও এসেছে। যদিও অন্তিকের বন্ধু হিসেবে নয়। তারা আমন্ত্রণ পেয়েছে বিজনেস পার্টনার হিসেবে। মাহাদদের দেশে এসে শুরু করা ২/৩ টা প্রজেক্টের একটাতে ইরফানদের কম্পানি থেকে ইনভেস্ট করছে। সেদিক থেকেই আমন্ত্রণ পাওয়া। ইরফানের বাবা ছেলে আর ছেলে বউকে পাঠিয়েছেন বিয়েতে। যদিও তারা আগে ডক্টরের কাছে গিয়েছিল। তোশাকে নিয়ে গেছিল ইরফান কাউন্সিলিং এর জন্য। হসপিটালে তাদের সেরাতের পর থেকে এক ধরণের মানসিক বিচ্ছিন্নতা লক্ষ্য করা যায় তোশার মধ্যে। বিয়ের পর পর অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। তারপর বাসায় এসে ডক্টরের পরামর্শে গেলে ডক্টর তার Dissociative Disorder রোগের কনফার্মেশন দিয়েছেন। অত্যধিক মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে কেমন একটা ব্যবহার করে মেয়েটা। এটা অন্তিক আর ইরফান দুজনে শুরুতেই সন্ধেহ করেছিল। আর সেটাই হয়েছে। সবসময় কেমন সচেতন থেকেও মেয়েটা অনুভূতি থেকে দূরে সরে যায়। সময় ভুলে যায়, কোথায় আছে ভুলে যায় হঠাৎ হঠাৎ। বাচ্চাদের মতো অবুঝ ধরণের আচরণ করে। ইরফান সামান্য রেগে গেছে মনে হলে কেদে ফেলে। সব মিলিয়ে অন্যরকম হয়ে গেছে সে। ডক্টর বলেছে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক পীড়ায় ছিল সে। এর মধ্যে যা চেয়েছে তা শেষে পেলেও, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হওয়ায় সেসব নিতে পারেনি। নিজস্ব নৈতিকতা, আদর্শ সব খুইয়ে একজনকে চেয়েছে, অথচ সে এসব চাইনি। নিজেকে সত্তাকে হারিয়ে ফেলতে চাইনি। এত কিছুর পর ইরফানকে ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল। তার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। অথচ তা পারেনি। সে যা চাইছে, যা করা উচিত, যা হচ্ছে, যা হয়েছে - সব মিলিয়ে দুটানায় নিজেকেই খুইয়ে ফেলেছে। অতিরিক্ত মানসিক টানাপোড়ন নিতে না পেরে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে মস্তিস্কের। ইরফান অবশ্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ওকে আগলে রাখার। খুব আদরে আদরে রাখে। তোশাকে তার ইচ্ছেমতো বউ বউ হয়ে থাকতে দেয় বাড়িতে। বাচ্চা বাচ্চা স্বভাবগুলো উপভোগ করে, বোঝায়। সে যে অসুস্থ তা তাকে বুঝতেই দেয়না। তোশা ইদানিং অনেক কিছু ভুলে যায় তা সে বুঝতে পারে। ইরফানকেও বলে, কিন্তু ইরফান সেসবও নরমালাইজ করে দিয়েছে। তারও হয় এমন। কতকিছু ভুলে যায় সে নিজেও। এমন নানান কিছু বোঝায় সে। তাও সে অসুস্থ তা বুঝতে দেয়না। যেন একটা বাচ্চা। এই তো এখনো দুজনে এক সাইডে চেয়ারে বসে আছে বিয়েবাড়িতে। ইরফান বিজনেসের কাজে দরকারি কোনো মেইল চেক করছে ফোনে, সাথে তার পাঠানো ভয়েস মেসেজ শুনছে। আর তার পাশে বসে তোশারাণী নিজেই কথা বলে যাচ্ছে তার সাথে। চারপাশে সবাইকে গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছে। একজনের হাত অন্যজনাতে। ইরফানের উষ্ণ হাতের ভাঁজে নিজের হাত নাড়াচড়া করছে মাঝেমধ্যে। ইরফান মনোযোগীভাবে এক হাতে ফোন দেখতে দেখতে তোশাকেও মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়। দরকারি কাজের মধ্যেও নিজের মনোযোগী উপস্থিতির জানান দিচ্ছে প্রিয় রমণীকে। একজন পুরুষ যেন শত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রেয়সীর জন্য সহজলভ্য।
“ইরফান?”
“হু……”
“আমাদেরও ওদের মতো করে বিয়ে হলে ভালো হতো, বল?”
“হ্যাঁ, ভালো হতো।”
“তাহলে আবার বিয়ে করি চল।”
“না, আমরা হানিমুনে যাবো। আর কোনো বিয়ে নয়। আগে হানিমুন।”
“কিন্তু হানিমুনের চেয়ে আবার বিয়ে করলে বেশি মজা হবে, আনন্দ হবে। তুই দেখ সবাই আছে বিয়েতে। এভাবে সবাই থাকলে ভালো লাগে!”
“থাকুক ওরা। আমার ওরা থাকলে ভালো লাগেনা। তুই থাকলে ভালো লাগে শুধু।”
“কিন্তু…”
“কোনো কিন্তু নয়। আমরা হানিমুনে যাবো। তোর ওখানে অনেক ভালো লাগবে।”
“আচ্ছা” ততক্ষণে ইরফানের ফোনের কাজ শেষ। সে ফোন পকেটে নিয়ে তোশার চেয়ার টেনে চেয়ারসহ তাকে আরও কাছে আনে।
“বেবিগার্ল!! এবার বল মুড অফ কেন?”
“জানিনা, বুঝতে পারছিনা। সবাই আছে কতো ভালো লাগছে। কিন্তু তাদের দেখতে ইচ্ছে করছেনা। কেমন একটা লাগছে, মনে হচ্ছে… মনে হচ্ছে ওরা সবাই চলে গেলে ভালো হতো। শুধু আমরা থাকতাম। কিন্তু আমার সবাইকে ভালো লাগে। একসাথে থাকলে ভালো লাগে।”
ইরফান মন দিয়ে শুনে তার খাপছাড়া কথা,
“সাফোকেশন লাগছে?”
“হ্যাঁ, হয়তো।” তোশা সাথে সাথে সম্মতি জানায়।
সে এটাই বলতে চাইছিল। তার সবাই একসাথে হওয়ায় ভালো লাগছে ঠিক। কিন্তু অতিরিক্ত গেদারিং এ সাফোকেশন হচ্ছে। এটাই সে ঠিকঠাক উপলব্দি করতে পারছেনা। তাই কেমন লাগছে বুঝাতে না পেরে খাপছাড়া কথা বলছে। ইরফান তার সব রকম অনুভূতি ধরতে পারে।
“উম, বুঝতে পেরেছি। তাই বলছি এমন বিয়ে টিয়ের দরকার নেই। আমরা যাবো দূরে কোথাও। অনেক দূরে। ওখানে এত মানুষজন থাকবেনা। তোরও দমবন্ধ লাগবেনা।”
কথাটা বলে সামনে এসে কেউ দাড়িয়েছে বুঝতে পেরে দুজনে তাকায়।
“আরেহ, প্রাণেশা যে!!! কেমন আছো তুমি?” ইরফান
“তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? দেখিনি তো? এসো বসো।” তোশা
প্রাণেশাকে নিজের পাশে বসায় তোশা। সে অন্তিকের পাশে দাড়িয়ে সবাইকে দেখতে দেখতে হঠাৎ এদিকে চোখ পড়ে। ইরফান ভাইয়া আর তোশা আপুকে দেখে এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিল। অনেকদিন পর দেখা পেয়েছে কি না? ওদের দিকেই পা বাড়ায় খুশি হয়ে। ওমনি কোমর জড়িয়ে কেউ বাহু বন্ধনে আটকে নেয়। তার স্বামীই। তখনের মতো ধরেই রেখেছে।
“কোথাও চলে যাচ্ছেনা ওরা। ওখানেই আছে। আস্তে ধীরে যাও। দৌড়ানোর তো দরকার নেই।” কথাটা বলে নিজেই নিয়ে আসে এখানে।
—
“আপনারা এখানে এসেছেন আমি তো জানতামও না। আপনার বন্ধু আমাকে জানায়ওনি। আমাকে ডাকেননি কেন?” ফোনে লিখে দেয় সে তোশাকে, কারন তারা প্রাণেশার সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বুঝতে পারেনা।
“তুমি উপরে ছিলে বললো অন্তিক। তাই আর ডাকা হয়নি। এখন তো দেখেছ!! কি অবস্থা তোমার?” তোশা
“আমিতো ভালোই আছি। কিন্তু আপনারা শুনেছি বিয়ে করে নিয়েছেন। আমাদের না জানিয়ে চুপি চুপি বিয়ে করে নিয়েছেন। আমি রাগ হয়েছি।”
লেখাটা পড়ে তোশা মুখ কালো করে ফেলে। কেউ তার সাথে রাগ হলে তার এখন ভালো লাগেনা। হাশফাশ লাগে। ইরফান আর অন্তিকের দিকে তাকায় সে। ইরফান তা দেখে বলে,
“রাগ হয়েছ তুমি? কিন্তু বিয়েতো কবেই করে নিয়েছি। আর কিছু করা সম্ভব না। তুমি চাইলে আমাদের সাথে বরকে নিয়ে হানিমুনে আসতে পারো। তখন তোমার তোশা আপুর প্রতি আই থিংক আর কোনো রাগ থাকবেনা। কি বলো? বেস্ট আইডিয়া না??” ইরফান শেষের কথাটা ভ্রু উচিয়ে বলে। বরকে নিয়ে বলার সময় মাথা দিয়ে সামনে থাকা অন্তিককে ইশারা করে দেখায়। প্রাণেশা লজ্জ্বায় পড়ে গেলো এভাবে হানিমুনের কথা বলায়। সে তো প্রেগন্যান্ট অব্দি ছিল অল্পকিছুদিনের জন্য। আবার এতদিন পর হানিমুনের কথা বলছে। মনে মনে লজ্জ্বা পায় সে। অন্তিকও ততক্ষণে পাশে চেয়ার টেনে তাদের সামনা সামনি বসেছে। বউ তার লজ্জ্বা পাচ্ছে দেখে হাসে মনে মনে।
“হ্যাঁ, একদম ঠিক। ওরাও আমাদের সাথে আসুক। একসাথে গেলে আলাদাই মজা। ওকে তাহলে ফাইনাল কেমন? তোরাও যাচ্ছিস অন্তিক।” তোশা প্রাণেশার লজ্জ্বা পাওয়া বা তেমন কোনোকিছু খেয়াল করেনি। সে নিজের মতো মতামত জানিয়ে দেয়। তারা সবাই গেলে ভালো হবে এটাই শেষ কথা।
ইরফান সম্মতি জানায় বউয়ের কথায়। যদিও তারা আগেই ঠিক করে রেখেছে হানিমুনের ব্যাপারে। প্রাণেশার চিকিৎসার জন্য অন্তিক বউ নিয়ে কানাডা যাওয়ার জন্য সবকিছু ঠিক করে রেখেছে এ কদিনে। প্রাণেশাই জানেনা শুধু। বাকি বড়রা জানে এই বিষয়ে।
“আরেহ এত লজ্জা পেতে হবেনা মনা। শুধু আমরা না। মাহাদ-অয়ন্তি, মেহেরিন-তুরাগ ওরাও যাবে। খুব তাড়াতাড়ি যাচ্ছি। তুমি মেন্টালি প্রিপেয়ারড হয়ে থাকো।” ইরফান
তোশা বাকিরাও যাবে শুনে খুশি হলেও প্রাণেশা অবাক হয়। এরা তো মনে হচ্ছে সব আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে। সে কিছু জানেওনা। অন্তিকের দিকে তাকায় সে। অন্তিক বিয়ের আসরের ওখানে ভাই বোনেদের পাগলামি দেখছে। তুরাগকে ঘিরে রেখেছে প্রত্যেকে। তোশাও প্রাণেশাকে নিয়ে তাদের ওখানে যায়।
“সবার তো হিল্লে হয়ে গেলো। দিগন্তকেও বিয়ে করিয়ে দে। বেচারা এখনো বোনেদের পাহারা দিতে দিতে দিন পার করছে।” ইরফান অন্তিককে বলে বিয়ের আসরের ওখানে তাদের দিকে দৃষ্টি রেখে। সবাই আয়নায় বর বউ দেখার অনুষ্ঠান করছে।
“উহু, ওর দেরি আছে।”
“মাহাদ আর ও কিন্তু প্রায় সমবয়সী। তাহলে দেরি কেন? তুরাগও তো ওদের বয়সী। আমাদের মতো বাচ্চা নেওয়ার বয়সে বিয়ে দিবি নাকি ভাইকেও?”
“ও তো নিজেই ঐ পথ বেছে নিয়েছে। নাহলে অয়ন্তির আগেই ওর বিয়ের কথা তুলতাম।”
“নিজে বেছে নিয়েছে বলতে?”
“ইশিকে পছন্দ করে।”
“তোকে বলেছে?”
“না, বুঝতে পারি।”
“তো তোর কি মত নেই?”
“সব ঠিকঠাক থাকলে ভেবে দেখবো।”
“ভেবে দেখার কি আছে? ডক্টর মানুষ। পাত্র হিসেবে সব দিক ভালো সবদিক দিয়ে। ইশিকে পছন্দ করে থাকলে বিয়ে দিয়ে দে। বাড়ির মেয়ে বাড়িতেই তো থাকবে। উল্টো নিশ্চিন্তে হলি।”
“উহু। এটা সম্ভব না। দিথী ইশির বড় হয় এক বছরের। ওকে বিয়ে না দিয়ে ইশির প্রশ্নই আসেনা। পারলে দুজনকেই একসাথে দেবো। কিন্তু বড়জনকে রেখে ছোটজনকে না।”
“কিন্তু আন্টিকে অয়ন্তির বিয়ের দিন বলতে শুনেছিলাম, দিগন্তের সিরিয়াল এবার। দিথীর কথা তো বলেনি।”
“বাড়িতে সেদিনও তুলেছিল মেয়ে দেখার কথা। দিগন্ত মানা করে দিয়েছে। দিগন্ত নিজেও আগে দিথীর বিয়ে দিয়ে তারপর ইশিকে বিয়ে করতে চাই। আর দিথীকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেবোনা। বিয়ের আগে গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করলেও অন্তত আরও এক দুই বছর কাটুক।”
“দিগন্তও এমনটা ভাবছে তোকে জানিয়েছে?”
“না।”
“তাহলে?”
“ভাই হয়, বুঝতে পারি।”
মেহেরিন আর তুরাগের বিয়ে হয়ে যায় সুন্দরমতো। বিয়ের পর হইহল্লর শেষে বউ নিয়ে চলেও গেছে বরযাত্রী। গেস্টরাও যে যার যার বাড়ি ফিরে যায়।
———
সেদিনের পর বেশ অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। প্রাণেশার দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা ছিল। কিন্তু এখানে যে চেকআপগুলো করিয়েছে তাতে রিপোর্ট নেগেটিভ কথা বলছে। তার ভোকাল কর্ড ক্ষতিগ্রস্থ। সামান্য কেটে গিয়েছে এ’ক্সি’ডে’ন্টের সময়। তাই চাইলেও কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়া সম্ভব না। প্রাণেশার মামাও নাকি ছোটবেলায় চিকিৎসা করাতে চেয়েছিল। তখনও এটা সম্ভব না জেনেই থেমে যেতে হয়েছিল উনাকে। অন্তিকের কাছে আবার চেষ্টা করেছে শুনে উনি জানিয়েছেন এসব। অন্তিক জানতো না যে ওর কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়া সম্ভব হবেনা। সাহিল আর সে মিলে এতকিছুর আয়োজন করেছিল। ভাগ্যিস প্রাণেশাকে এসবের কিছুই জানায়নি। নাহলে নতুন করে আশার আলো দেখে আবার ঠিক হবেনা জানতে পেরে ভেঙে পড়তো। যদিও মূলত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাকি দম্পতিদের সাথে তাদের দুজনের যাওয়ার কথা ছিল। সাথে ঘুরাঘুরিও হয়ে গেলো নিজেদের। এমনটাই ভেবেছিল। কিন্তু সম্ভাবনা নেই দেখে হতাশ হলেও নিজেদের যাওয়া ক্যান্সেল করেনা অন্তিক। শুধু সাহিলের যাওয়া ক্যান্সেল হয়েছে। তারও থাকার কথা ছিল বোনের চিকিৎসার সময়। কিন্তু এখানকার ডক্টর যখন কোনোকিছু সম্ভব না বলেই দিয়েছে। সেখানে ব্যাচেলর মানুষের ওখানে যাওয়ার প্রশ্ন আসেনা।
প্রাণেশার শ্বশুর বাড়িতে তার বাবা, ভাই, বড় বাবাকে প্রায়ই আসতে দেখা যায় এটা সেটা নিয়ে। বিশেষ করে সাহিল। ছেলেটা মাঝেমধ্যেই এসে বোনকে দেখে যায়। আজ তাদের বাড়ি মধুভাত বানিয়েছে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যাতে পাঠাতে পারে, তেমনভাবেই বানিয়েছে বড়মা। সেসব নিয়েই চলে এসেছে সাহিল। সাথে কিছু রং তুলিও নিয়েছে প্রাণেশার জন্য। বাড়ি এসে বেল বাজায়।
“আপনি কেন এসেছেন। চলে যান ভাইয়া প্লিজ। তাড়াতাড়ি চলে যান। আমিতো বলেছিলাম অর্ডার ক্যান্সেল করেছি। তাও এসেছেন!! আমি কোনো পার্সেল রিসিভ করতে পারবোনা। মা আরেকটা পার্সেল বাড়িতে আসলে আপনার সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে বলেছে। তাড়াতাড়ি ফুঁটেন প্লিজ।” হরবরিয়ে কথাগুলো বলে সামনে তাকাতেই অনাকাঙ্ক্ষিত কাউকে চোখে পড়ে দিথীর।
“আমার সাথে বিয়ে? কেন?”
গমগমে কণ্ঠে কথাটা শুনে দিথী হুশে ফেরে। ভুল মানুষকে কথাগুলো বলে ফেলেছে বুঝতে পারে সে।
“উ… আপনার সাথে না। অন্য কেউ ভেবেছিলাম আপনাকে। আম সরি।” কথাগুলো বলে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে যায়। আশ্চর্য!! দরজায় একজন দাড়িয়ে আছে, আর মেয়েটা তাকে ভেতরে আসতে না বলে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেলো। মাথায় সমস্যা আছে নাকি? সাহিল আবার বেল বাজায়। এবার প্রাণেশায় খুলে দরজা। ভাইকে দেখে খুশি হয় সে। বুকে ঝাপিয়ে পড়ে সবার আগে। সাহিল হাতের জিনিসগুলো সামলে তাকে ধরে।
“কেমন আছিস পিচ্চি?”
“আমি খুব ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? বাড়িতে সবাই ভালো আছে?” সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে দক্ষ হাতের ইশারায় জানতে চাই সে। সাহিল সে ভাষা খুব ভালো করে বুঝতে পারে।
“সবাই খুব ভালো আছে। তোর জন্য নতুন রং তুলি আনিয়েছি ‘Mont Marte’ ব্র্যান্ডের রং। আগে রংগুলো পছন্দ হয়েছে কিনা দেখতো। একটা আর্ট এন্ড ক্রাফট স্টোর থেকে আনিয়েছি। তুই যেটা বলেছিলি! ‘Mont Marte’ ব্র্যান্ড। ওটারই বললো। খুলে দেখ। সব ঠিকঠাক আছে কি না।”
প্রাণেশা ভাইকে নিয়ে ভেতরে এসে রংগুলো দেখে। সব ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে। এটা সে ভাইকে নিয়ে আসতে বলেছিল।
কারো আওয়াজ শুনে অন্তিকের মা, চাচী আর দাদীও বের হয়ে আসে। সাহিলকে দেখে গল্প জুড়ে দেন দাদী। অন্তিকের মা, চাচী নাস্তা পানির ব্যবস্থা করেন।
“বাড়ির সবাই কেমন আছে? তোমার বাবা, দাদী সবাই ঠিকঠাক?” দাদী
“জি দাদী। সবাই ঠিকঠাক। বাবা, দাদী দুজনেই ডায়াবেটিস রোগী। একটু দেখেশুনে চললেই ঠিকঠাক থাকে।”
“সজল সাহেবের তো বয়স হচ্ছে। রোগ বালাই ধরছে। ছেলে বউ কি দেখাবেনা তাকে?”
“ছেলে বউ কোথায় পাবো দাদী?”
“কোথায় পাবে মানে? আজকাল তো সবারই ঠিকঠাক করা থাকে। মেয়েদের ঠিক না থাকলেও ছেলেমানুষের তো থাকেই। আমার নাতি মাহাদ, তাকে তো চিনো। অয়ন্তি দিদিভাইকে পছন্দ করে আমরা কেউ জানতামও না। ওর বোন মেহেরিন? তাকেও অন্তিকের খালার ছেলে নাকি পছন্দ করতো কবে থেকে। তার সাথেই সেদিন বিয়ে হলো। আমরা এসব জানতাম না। অথচ তারা নাকি যার যার পছন্দের মেয়ে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবেনা। কি আশ্চর্য! এদের পছন্দ আছেই জানতাম না। তাও আবার বাড়ির মেয়ে। আমি তো শুনেই অবাক।”
সাহিল উনার বলার ধরণ দেখে হেসে ফেলে। ততক্ষণে কিছু নাস্তা এনে রেখেছেন চাচী সোফার সামনে টেবিলটাতে। সাহিল কফিটা নেয়, আর দাদী চা।
চায়ে চুমুক দিয়ে তিনি বলেন,
“হেসো না ছেলে, হেসো না। শুধু শুধু শেষ মুহূর্তে কতো চিন্তায় না পড়েছিলাম প্রত্যেকে। আগে জানিয়ে দিলে কি এমন হতো? আমার দিগন্ত দাদুভাইও ঐ পথে হাঁটবে বুঝা যাচ্ছে। মেয়ে দেখতে চাইলে মানা করে দেয়। কাকে পছন্দ বলেওনা। শেষে এই ছেলেও চিন্তায় ফেলবে মনে হচ্ছে। তুমিও এমন কিছু করার ধান্দায় আছো নাকি?”
“দাদী, সেরকম কেউ নেই। থাকলে লুকোচুরির খেলা খেলতাম না। সোজা ঘরে তুলতাম।”
“এই তো, এই হলো বীরপুরুষের মতো কথা। কিসের লুকোচুরি খেলাখেলি। পছন্দ থাকলে সোজা ঘরে তুলতে হবে। অতোকিছু ভেবে লাভ আছে?”
“কিন্তু দাদী, দিগন্তের তো বোন আছে? বোনের আগে হয়তো বিয়ে করতে চাইছেনা নিজে। স্বাভাবিক! আমি হলেও করতাম না।” দিগন্তের সাথে ইতোমধ্যে ভালোই পরিচয় হয়েছে তার। এ বাড়িতে আসা যাওয়া থাকায় অনেক কিছু আন্দাজও করতে পারে সে। এমনকি মাহাদ, ইরফানদের সাথেও পরিচয় হয়েছে। মাহাদের সাথে নতুন পরিচয় হলেও, ইরফানের সাথে আগের জানাশুনা আছে। সে হিসেবে এখনো সম্পর্কটা কিছুটা তেমন। আগের ঘটনাগুলোর দরুন সব বিষয়ে খুঁচা খুঁচি জারি থাকে। তবে প্রত্যেকের সাথে ভালোই সম্পর্ক সবদিক দিয়ে দেখতে গেলে।
“বোনের চিন্তা ওকে করতে হবে কেন? আমরা কি নেই? তাছাড়া আমার দুই দিদিভাইকে এখন বিয়ে দেবনা। না জানি কার হাতে গিয়ে গিয়ে পড়ে। একমাত্র মেয়েটাকেও নিয়ে গেছিল দেশের বাইরে। সে মানিয়ে নিয়েছি সময়ের সাথে। কিন্তু ওদের সাথে অয়ন্তিটাসহ কিছুদিন পর বিদেশ চলে যাবে। অতো দূরে চলে যাবে ভাবলেই কষ্ট হয় আমার। ছোট দুটোকে দেখেশুনে কাছে কোথাও দেবো।” দাদী
“ছোটটাকে তো বাড়িতেই রেখে দিতে পারেন।”
“বাড়িতে কিভাবে রাখবো দাদুভাই? মেয়েমানুষের জন্ম পরের বাড়ি যাওয়ার জন্যই হয়।”
“না, বলছিলাম। বাড়িতে বউ আনার জন্য মেয়ে দেখবেন ভাবছেন। তো ঘরেই যখন আছে মেয়ে। বাইরে খোজার কি দরকার। সেটাই বলছিলাম।”
“কিসের কথা বলছ তুমি? ঘরের মেয়ে মানে?”
“আপনি বুদ্ধিমান মানুষ। সবকিছু কি ভেঙে ভেঙে বুঝাতে হবে?”
দাদী কিছুপল ভেবে অবাক হয়ে তাকান সাহিলের দিকে।
“তুমি তো বহুত শেয়ানা আছো। এসব কিভাবে মাথায় আনলে?”
“মাথায় আনতে হবে কেন? আপনার নাতির চোখ দেখলেই তো বুঝা যায়।” বিরবিরিয়ে বলে সে। দাদী শুনতে পায়নি।
“এই বিষয়ে তো ভাবিনি!! তবে বুদ্ধিখানা ভালোই দিয়েছ। আমার ভীষণ মনে ধরেছে। কিন্তু তাতেও অপেক্ষা করতে হবে। দিগন্ত দাদুভাই না আবার রেগে যায়। তাছাড়া ইশিও দিথীর ছোট। আগে দিথীকে দিতে হবে। ওর জন্যও একটা উপযুক্ত কাউকে, সাথে ইশির মতো সুবিধা পাও কি না দেখোতো!!”
“দিথী, দিগন্তের বোন?”
“হ্যাঁ।”
“সে তো আমাকে বিয়ে করতে চাই শুনলাম একটু আগে। আমাকেই দিয়ে দিয়েন।” আবার বিরবিরিয়ে কথাটা বলে সাহিল। দাদীর কান অব্দি যায়না। যদিও সে জানে দিথী অন্য কেউ মনে করে তাকে কথাগুলো বলে ফেলেছে। আর অন্য কেউ টা যে ডেলিভারি ম্যান, সেটাও বুঝতে পেরেছে সে। নিশ্চয় বাড়ির আদরের দুলালি অনলাইনে দিনরাত শপিং করতে থাকে বলে মা হুম’কি দিয়েছে বাড়িতে আর পার্সেল আসলে ডেলিভারি ম্যানের সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে। তাই তাকে ডেলিভারি ম্যান ভেবে ওসব বলেছে।
“আচ্ছা, বলছিলাম অন্তিক কি এখনো আসেনি? একটু দরকার ছিল তার সাথে।” সাহিল
“নাতবউকে জিজ্ঞেস করো। আমিতো দেখিনি বাড়িতে।”
প্রাণেশা আর দিথী ফ্রিজে বাটি থেকে মধুভাত নিচ্ছিল নিজেদের জন্য। মা বলেছে বিকেলে খাবে সবাই মিলে। কিন্তু দিথীর তর সইছেনা। একা খেয়ে নিলে বকা শুনবে। এমনিতেও মা তার উপর রেগে আছে সকাল থেকে। তাই রিস্ক না নিয়ে ভাবিকে নিয়ে খাচ্ছে।
ড্রয়িং রুম থেকে দাদির ডাক শুনে দুজনে যার যার বাটি নিয়ে চলে আসে।
“তোর স্বামী কোথায় নাতবউ? সাহিলের তার সাথে কি দরকার আছে বলছে।”
“উনি আসছেন তো বললো। ভাইয়া আসলে জানাতে বলেছিল। আমি বলেছি। পাঁচ মিনিট লাগবে বললো আসতে।” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
প্রাণেশা বলার কয়েক মিনিট পরেই চলে আসে অন্তিক। সাহিলকে নিয়ে উপরে চলে যায়। কি দরকারি কাজ কি জানি? বাড়ির বাইরে গার্ডেন এরিয়ার ওখানে পার্গোলা সহ সিটিং চেয়ার আছে। দিথী আর প্রাণেশা সেখানে চলে যায়। দুজনে গল্প সল্প করতে করতে বেশ সময় কেটে গেছে। প্রাণেশা উঠে ভেতরে চলে যায়।
“আররেহ!! যেদিকে দেখি আপনি। আশ্চর্য!! দূরে থাকুন আমার থেকে।”
সাহিল অবাক হয়ে তাকায়। মেয়েটা পাগল হলো নাকি। তাকে দেখলেই অদ্ভুদ আচরণ করে প্রত্যেকবার। সে অন্তিকের সাথে কথা বলে বোন আর বাকিদের বিদায় জানিয়ে চলে যাচ্ছিল। দরজায় এসে দিথীর সাথে ধাক্কা লাগে আবার। স্বভাবিক! অজান্তে ধাক্কা লাগতেই পারে। এমন নাক ছিটকানোর কি আছে? যেন সে কোনো উচ্ছিষ্ট কীট। রাগ হলেও নিজেকে দমায় সে।
“সরি আই ডিডন্ মিন টু বাম্প ইনটু ইউ। ইট ওয়াস আ মিসটেক।” কথাটায় তেমন পাত্তা দেয়না দিথী। বাহুতে ধাক্কা লেগেছে বলে ওখানটা ঘষতে থাকে। ভাবির ভাইটাকে তার খুব অপছন্দ। এই লোকের চ্যাট ভাইরাল হয়েছিল তার মনে আছে। ছিঃ!! কি বাজে কথা বলেছিল একটা মেয়েকে। চরিত্রে সমস্যা। তার উপর রাজনীতি করে। সবসময় কিছু না কিছু একটা নিয়ে আলোচনায় আসে। এমন ধরণের মানুষ তার খুব অপছন্দ। বিশেষ করে চরিত্র যখন আস্তাগফিরুল্লাহ টাইপ হয়। গার্ডেনে বসে বসে রিলস দেখছিল সে। সেখানেও এই লোকের ভিডিও। অসহ্য লাগে লোকটাকে তার।
সাহিলের অবশ্য কে তাকে নিয়ে কি ভাবলো তাতে কিছু আসে যায়না। কিন্তু এই মেয়েটা শুরু থেকে তাকে দেখলে বিরক্ত হয়। যা তাকে ভাবায়। এর কারণ??
“তোমার সমস্যা কি মেয়ে? আমাকে দেখলে চেহারাটা এমন বানাও কেন? আমাকে অপছন্দের লিস্টে রাখার কারণ?”
“আমি অতি সুচরিত্রবান মানুষ অপছন্দ করি, তাই।” কথাটা বলে সে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
—————
পরদিন খুব ভোরবেলা। প্রাণেশার ঘুম ভেঙ্গে গেছে দশ/পনেরো মিনিট হবে। অন্তিকের বুকে শুয়ে আছে সে। কখনো তার বুকে আঁঁকিবুঁকি করে। কখনো গালে চুমু খায়। কখনো খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বুলায়। পুরো চেহারা খুঁটিয়ে খুটিয়ে দেখে। প্রাণেশার খুব ভালো লাগে যখন তার স্বামীর সুদর্শন মুখখানা দেখে। সে কখনো এমন বড় বাড়িতে বিয়ে হবে, সুদর্শন স্বামী পাবে, শ্বশুর বাড়ির প্রত্যেকের ভালোবাসা পাবে - এমনটা ভাবেনি। সবসময় অতি সাধারণ একটা জীবন কল্পনা করেছে। সেই সাধারণ জীবনেও অনেক ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হতে হবে ধরে নিয়েছিল সে। চালচুলোহীন প্রতিবন্ধি একটা মেয়ের জীবনে ভালো কি বা হবে? এমনটাই মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল আশেপাশের মানুষজন। তাই সে স্বপ্ন দেখতে ভয় পেতো। অথচ এখন কতো ভালোই না বাসছে প্রত্যেকে। অন্তিক; তার স্বামীও তাকে মানতো না একসময়। এখন তাকে ছাড়া এক মুহূর্তও কাটাতে চাইনা। মিনিটে মিনিটে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় তার খবর নেয়। তার যত্ন করে। সে অসুস্থ হলে সেবা করে, বমি হলে একটুও নাক না ছিটকিয়ে কি সুন্দর তাকে পরিষ্কার করে দেয়। এত ভালোবাসা, এত যত্ন পাবে সে কোনোদিন ভেবেছিল? অমানুষিকভাবে স্বামীর খেদমত করতে হবে তাকে দিনরাত - এমনটাই তো জানতো। তাকে মাতাল, কিংবা বয়স্ক কারো সাথে যেন বিয়ে দিয়ে দেয়, তা নিয়ে মামা-মামীকে লোকজন আড়ালে আবডালে কতো বুঝাতো!! প্রতিবন্ধি মেয়ে এর চেয়ে ভালো কারো সাথে বিয়ে দিতে পারবেনা। বাবা মায়ের ঠিক নেই। এমনকি ডিভোর্সি, বিপত্নীক কতোরকম লোকের জন্য প্রস্তাব আসতো!! আর আজ দেশের নামকরা একজন উকিলের ঘরণী হয়ে তার বুকে শুয়ে আছে সে। যে তাকে ভালোবেসে প্রাণ দিতে প্রস্তুত। নাহলে ভাইয়ের সাথে যখন হামলার শিকার হয়েছিল। তখন অতো গুলাগুলির মধ্যে রিস্ক নিয়ে তাকে আনতে যেতো? এত এত যত্ন, ভালোবাসার মধ্যে আছে! যে আগের কথাগুলো ভাবলেই চোখের কোণে পানি জমে। মনে হয় লোকটা আরও আগে কেন আসেনি তার জীবনে। প্রাণেশা নানান কিছু ভাবতে ভাবতে টুপটাপ চুমু খায় ঘুমন্ত অন্তিকের সারা মুখে। উন্মুক্ত বুকে ঠোঁট ছোয়ায় অনবরত।
“সকাল সকাল ফরজ গোসল করতে না চাইলে নিজেকে সামলাও প্রাণো। আমি কিন্তু সিডিওস হচ্ছি।” ঘুমঘুম কণ্ঠের হাস্কি টোন শুনে প্রাণেশা থেমে যায়। লোকটা জেগে গেছে সে বুঝতে পারেনি। লজ্জ্বা পায় কিছুটা। তবে তা বুঝতে না দিয়ে সাদা রং এর কম্ফোর্টারটা বুক থেকে আরেকটু টেনে নিজের উন্মুক্ত কাঁধ অব্দি ঢেকে নেয়। অন্তিকের বুকে মুখ লুকায়।
তারপর একেবারে সাত/আটটার দিকে উঠে দেখতে পায় সারা ঘর সাজানো। মনে হচ্ছে সাদাসিধে ভাবে কারো বিয়ে হবে। কিন্তু কার বিয়ে? সে জানলো না কেন? আর এসব সাঁজালোই বা কখন?
এরপরের সময়টা যেন স্বপ্ন ছিল তার কাছে। আজ তাদের বিয়ে। অন্তিক আর তার। সাথে ইরফান ভাইয়া আর তোশা আপুর। এবাড়িতে তাদের নতুন করে বিয়ে হবে। তাই সাজানো হয়েছে। সাহিল, অন্তিক, দিগন্ত, ইরফান - তাদেরই প্ল্যান। রাতের মধ্যে পুরো ঘর সাজিয়ে ফেলেছে লোক লাগিয়ে। কিছু পাড়া-প্রতিবেশী, নিকটাত্মীয়, বিজনেস পার্টনার - বেশ অনেক মেহমান আসবে বিয়েতে। ইরফান আর তোশা সকাল সকাল চলে এসেছে, তাদেরও বিয়ে কি না!! তাদের দুজনের পরিবার, প্রাণেশার বাবা, মামার পরিবার, অন্তিকের ফুফির পরিবার, মেহেরিনের শ্বশুর বাড়ির প্রত্যেকে - সবাই এসেছে বিয়েতে। বাড়ির মেয়েরা সবাই মিলে হইহল্লর করে মেহেদি লাগানোর অনুষ্ঠান করলো। এটা অন্তিকদের প্ল্যানের বাইরে ছিল। তাই আবার মেয়েদের জন্য মেহেদি আনানোর দরকার পড়ে। সময়মতো পার্লার থেকে মানুষ আনিয়ে তোশা আর প্রাণেশাকে বউ সাজালো। ওদের বিয়ের শপিং-ও করে রেখেছে। চারদিকে আলো, ঝকমকে বিয়ের আসর, লাল শাড়িতে বউ সেজে, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে, পরিবারের সবার মত নিয়ে - হাসি খুশি একটা বিয়ে হচ্ছে প্রাণেশার। সে হতবাক হয়ে আছে সকাল থেকে। যা কিছু হচ্ছে, বুঝতে পেরে খুশিতে কান্না পাচ্ছে তার। সে ভাবতেও পারেনি হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে এমন সারপ্রাইজ পাবে। আজকে দিনটা পুরো স্বপ্ন মনে হচ্ছে তার। দুই বধুকে সাজিয়ে দুদিক থেকে ধরে ধরে সিঁড়ি বেয়ে নামায়। নিচে প্রত্যেকে আছে। খুব সুন্দর লাগছে দুজনকেই। মনে হচ্ছে একসাথে দুটো হুর নামছে। চোখ জুড়িয়ে গেলো সকলের।
ওদের নিচে এনে বসায়। ইরফান আর অন্তিকও বর সেজেছে। দুজনের পাশে বসিয়ে দেয় যার যার বউকে।
“কি? কেমন দিলাম সারপ্রাইজ?” ইরফান তোশার কানে কানে বলে
“তুই তো বলেছিলি অন্তিক আর প্রাণেশার বিয়ে। আমাদেরও হচ্ছে যে?” তোশা
“হ্যাঁ, তোর আর আমার বিয়ে। সবাইকে নিয়ে আবার বিয়ে করবি বলেছিলি না? তাই আবার করছি।”
“কিন্তু তাহলে কি হানিমুন ক্যান্সেল? বিয়ে হচ্ছে তাই?”
“পাগলি! কিছু ক্যান্সেল না। যা চাস সব হবে। একটা ইচ্ছাও অপূর্ণ রাখবো না। আর কি চাওয়া আছে হিসেব করে রাখ। ঠিক আছে? সেসব পূরণ করার দায়িত্ব আমার।”
তোশা উৎফুল্ল মনে উপভোগ করে নিজের বিয়ে। তাকে আগে থেকে জানায়নি কারণ, অতিরিক্ত এক্সাইটমেন্ট তার শরীরের জন্য খারাপ। প্যানিক এটাক আসার সম্ভাবনা আছে বলেছিল ডক্টর। তোশাকে সবসময় নিরিবিলি পরিবেশ, শান্ত মেজাজের পরিবেশে দিতে বলেছে। তাই ওকে না জানিয়ে সবকিছু করেছে।
“কি ম্যাডাম। আবার বিয়ে করছি? এবার তো হানিমুনে যেতে কোনো দ্বিধা নেই, তাইনা? এবার কিন্তু আমরাও সদ্য বিবাহিত দম্পতি হবো। আমাদের মধ্যেও যা হবে সব নতুন ধরা হবে।” অন্তিক প্রাণেশার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ফিসফিস করে বলে।
প্রাণেশা সেসব কথা কানে তুলেনা। অন্তিকের দিকে তাকায় সে। তার চোখ মুখ বলছে আজকের বিষয়টা সে কখনো কল্পনাতেও আনেনি। সত্যি সত্যি বউ সাজা তার ভাবনার ঊর্ধ্বে ছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়েছে, এমনকি তার চাওয়া মতো বিয়েও হচ্ছে। ভীষণ খুশি সে। এত সুখ সে কোথায় রাখবে? সে মনে মনে ঠিক করে অন্তিককে তার জীবনে আসার জন্য ধন্যবাদ জানাবে। এত এত সুখ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাবে।
“ধন্যবাদ জানাতে হবেনা। বরং আপনিই ধন্যবাদ নিয়েন আমার জীবনে আসার জন্য।”
তার হাত ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ একটা অধ্যায় তুমি প্রাণো। যেটা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমার জীবনে এসে, অমূল্য হয়ে উঠেছে। তোমাকে খুব ভালোবাসি। এতটা ভালোবাসি যার কোনো সীমা নেই। আমার ভালোবাসা হয়তো বাকিদের মতো সেভাবে প্রকাশ পায়না। কিন্তু আমি বাসি। আমাকে আমার মতো করে ভালোবাসতে দিও সারাজীবন। তুমি প্রকাশ করতে না পারলেও আমি বুঝতে পারি, তুমিও আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছ। তোমার নিশ্চুপ শব্দগুলো এখন আমি বুঝতে পারি। তোমার মনে আমার জন্য যে মৌনপ্রেম পুষে রেখেছ, তাও ধরতে পারি আমি। এভাবে তুমি নীরবে আমাকে ভালোবেসে যেয়ো। আমি তোমার ভাষাহীন শব্দে প্রেম বুঝে নেবো।” প্রাণেশা তার চোখে চোখ রেখে সব কথা শুনে। হেসে উঠে খিলখিলিয়ে। অন্তিক তার হাসি তাকিয়ে দেখে প্রেমময় চোখে। সেই মুহূর্তে কেউ ছবি তুললো হয়তো। ক্যাচ করে শব্দ হয়।
কাজী সাহেব প্রথমে ইরফান আর তোশার বিয়ে পড়ায়। তারপর অন্তিক আর প্রাণেশারও বিয়ে হয়ে যায়। পুরোটা দিন হইহল্লর করে কাঁটে। নাহিদ আর আরশিও এসেছে বিয়েতে। এমনকি নীলয়কে দিয়ে প্রাণেশার একমাত্র বান্ধবী মেহাকেও আনিয়েছে অন্তিক। সবাই মিলে নানান ছবি-ভিডিও আর নাচ গানের সাথে সাথে পুরোদিন কাটায়। তবে বাকি মেহমানরা চলে গেলেও মেহেরিন-তুরাগ, পুরনো তবে সদ্য বিবাহিত দুই দম্পতি আর অয়ন্তি-মাহাদ থেকে যাবে। তাদের প্রত্যেকের জন্য একরাত ঠিকঠাক ভাবে থাকার মতো ব্যবস্থা করা হয়েছে সরোয়ার বাড়িতে। আর নিজেদের লাগেজও নিয়ে এসেছে তারা। কারণ তাদের কাল সকালে হানিমুনের ফ্লাইট। এসব শুনে দিথীর মাথায় হাত। সে কেন একটা বিয়ে করলনা। আজকে সবার সাথে বর নিয়ে হানিমুনে যেতে পারতো। জীবনযুদ্ধে একধাপ পিছিয়ে গেলো। এই নিয়ে তার আফসোসের শেষ নেই। ইশি বোনের এসব নির্লজ্জমার্কা কথাবার্তা বড়দের কানে যাতে না পৌঁছায় সে চিন্তায় মর’ ছে। পারছেনা মেয়েটার গাল চেপে ধরতে।
“ছি ছি!! জীবনে আর কি করলাম। যদি এমন একটা হানিমুন ট্রিপই দিতে না পারি সবার সাথে। এখন সবাই পাহাড়, সমুদ্রে, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াবে। আর আমরা ভার্সিটির এসাইনমেন্ট লিখবো। এর চেয়ে লজ্জ্বার আর কি আছে? ছিঃ ছিঃ! নাক কাটা যাচ্ছে আমার। ইশি বাবা-মাকে বল আমি বিয়ে করবো, হানিমুনে যাবো। নিরামিষ জীবন চাইনা।”
“তুই চুপ কর বাপ!! নিজের মান সম্মান খাবি। সাথে আমারটা নিয়েও টানাটানি। এসব কথা কেউ শুনতে পেলে প্র্যাস্টিজ থাকবে!! চিন্তা কর।”
“রাখ তোর প্র্যাস্টিজ চিন্তা। অকাজের চিন্তা করতেই করতেই আজ এই দিন দেখতে হচ্ছে। এই তুই ভাবতে পারছিস? সবাই হানিমুনে যাচ্ছে, জামাই নিয়ে ট্যুরে যাচ্ছে। তুই আর আমি বাড়ি থেকে ভার্সিটি, ভার্সিটি থেকে বাড়ি। হায় হায়!! এতগুলো দিন এসব কিভাবে সহ্য করবো আমি?”
ইশি পাশে ভাবির ভাইকে দেখে আর থাকতে পারলো না। আস্তে করে সরে যায় ওখান থেকে। মান সম্মান ডুবিয়ে দিলো পাগলটা।
সাহিল গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
“ওরা যেখানে যাবে যাক, তুমি চাইলে আমার সাথে সুইজারল্যান্ড ট্রিপে যেতে পারো। ওয়ান কাইন্ড অব হানিমুন।”
আকস্মিক সাহিলের কণ্ঠে এমন কথা শুনে দিথীর হাঁ হুতাশ থেমে যায়। কি বললো দু’শ্চরিত্র লোকটা? তার সাথে হাঁনিমুন! বিয়ে ছাড়া……
“আপনার চরিত্র খারাপ জানতাম। কিন্তু আপনার তো সাহস কম নয়! আমার বাড়িতে দাড়িয়ে আমাকে এমন বিচ্ছিরি ইঙ্গিতে কথা বলেন?”
“আরেহ চিল!! তুমি কি আমরা বিবাহিত দম্পতি নয় বলে হানিমুনের জন্য ভয় পাচ্ছ? ট্রাস্ট মি কিছু হবেনা। বিয়ে হোক না হোক, অতি চরিত্রবানরা তো আর বিয়ের পরোয়া করেনা। তাই আমারও সমস্যা নেই। শীত চলে এসেছে, সিঙ্গেল থেকে আর এদেশে পরে পরে কষ্ট পেতে হবেনা। বেয়ান সাহেবাকে আমি উম দিতে পারবো। কি বলো?? যাবে আমার সাথে সুইজারল্যান্ড ট্রিপ?”
দিথীর কান ঝা ঝা করছে এসব শুনে। সে ইশির সাথে মজা করছিল। কিন্তু এই দু’শ্চরিত্র লোক আশেপাশে আছে জানলে এখানে দাড়াতোওনা।
“আমি ভাইয়াদের বলে দেবো।” রাগে লজ্জ্বায় তার কান লাল হয়ে গেছে। সাহিল ভালোভাবে দেখে।
“দাও।”
“আমি ভাবিকেও বলে দেবো। আপনি আমার সাথে অসভ্যতামী করছেন।”
“দাও। তোমার ভাবি তার ভাইয়ের জন্য বউ আনতে অধীর আগ্রহে বসে আছে। তার ননদের সাথে লাইন মারছি জানতে পারলে বরং খুশি হবে।”
“আপনার মতো বাজে, ল’ম্প’ট ছেলে আমি আর কখনো দেখিনি। ভাবির ভাই বলে বেচে গেলেন। ফার্দার এই বাড়িতে আসলে আমার সামনে যেন না পড়েন খেয়াল রাখবেন। এমন আপ্যায়ন করবো, সারাজীবন মনে থাকবে বেয়ানের আথিতেয়তা।”
সাহিল মাথা নামিয়ে বলে,
“ইউর উইশ, ইস মাই কমান্ড। সামনের বার আসলে যেন বেয়ান সাহেবার স্পেশ্যাল আপ্যায়ন পাওয়ার সুযোগ পায়, সেই অপেক্ষায় রইলাম।”
দিথী রাগে-দুঃখে-লজ্জ্বায় গমগমিয়ে ওখান থেকে চলে যায়। সাহিল ওর যাওয়াটা দেখে মন দিয়ে। লেহেঙ্গা পড়েছে মেয়েটা। কোনো মডেল যেন র্যাম্প শো -তে হাটছে, এমনভাবে গমগমিয়ে চলে গেলো সরোয়ার কন্যা। বাঁকা হাসে সে ওর হাটাচলা দেখে। বেয়ান সাহেবা তাকে নিয়ে ভুল ভাল ধারণা মনে পুষে রেখেছে। যাক সমস্যা নেই। সেও একটু মজা নেবে বাচ্চা স্বভাবী মেয়েটার সাথে পাল্লা দিয়ে। এখানে হয়তো মৌন কোনো দন্ধ শুরু হলো।
পরদিন সকাল সকাল প্রত্যেকে উঠে যায়। রান্নাঘর থেকে ভোরের চায়ের গন্ধ ভেসে আসে, ড্রয়িং রুমে হইচই, হাসির শব্দ আর নানা কথার মিলন। চার দম্পতি হানিমুনে যাবে। সবাই কাল বাড়ি চলে গেলেও আজ আবার বিদায় দিতে আসে তাদের আপনজনেরা। যেমন ইরফানের বাবা, তোশার বাবা-মা, মাহাদের বাবা-মা এবাড়িতেই ছিল, মেহেরিনের শ্বাশুড়ি, সাহিল, তার বাবা সজল ফারদিন - প্রত্যেকে আসে ছেলে মেয়েদের বিদায় দিতে। সাহিল আর দিগন্ত ওদের এয়ারপোর্ট অব্দি এগিয়ে দিতে যাবে। দিথীর কাল থেকে মুখ অন্ধকার দেখে সবাই ভেবেছে, ভাই বোনেরা ঘুরতে যাবে কিন্তু তারা যেতে পারছেনা বলে মন খারাপ করেছে। তাই ওদের দুবোনকেও এয়ারপোর্ট নিয়ে যেতে বলেন মিসেস আয়েশা আমিন। আসার পথে তাদের দুজনকে কোথাও থেকে ঘুরিয়ে আনতে পারবে সাহিল আর দিগন্ত। দিথী অবশ্য সাফসাফ মানা করে দিয়েছিল। কিন্তু বড়বাবাও বলায় আর অমান্য করতে পারেনি। ঐ লোকটার সাথে ঘুরার উদ্দেশ্যে বের হতে হলো। সবার সব লাগেজ গাড়িতে ঢুকিয়ে নিয়েছে। লাগেজের গাড়িটা ড্রাইভার নিয়ে আসছে ড্রাইভ করে। বড় গাড়িটাতে তারা সকলে বসেছে। যাওয়ার সময় সবাই যাতে এক গাড়িতে যেতে পারে তাই বারো সিটারের Nissan Urvan ঠিক করেছিল। সেটাতেই সবাই হয়ে গেছে। গাড়িটা যখন ধীরে ধীরে সড়কে ওঠে, তখন মনে হলো যেন পুরো জীবনই এই মুহূর্তের সঙ্গে মিশে আছে। হয়তো শুরু নতুন কোনো অধ্যায়ের, তবে বিগত অধ্যায় শেষ হলো। সাথে গেলো একেকটা প্রেমের কাহিনী, এক একটা পূর্ণতার কাহিনী। কারো নিঃশব্দে প্রেম, কারো আকস্মিক প্রেম, কারো নব্য প্রেম, কারো কারো বহুল আকাঙ্ক্ষিত প্রেম। সবশেষে মনের ভেতর সুপ্ত হয়ে থাকা যার যার ভালোবাসার মানুষটার প্রতি মৌনপ্রেম। হতে পারে পুরো ভ্রমনটা তাদের এই প্রেমে অন্যধারা যোগ করবে। যেটা মৌনতাকে ছাড়িয়ে যাবে। সে এক অন্য অধ্যায়।