প্রাণেশার মিসক্যারেজের আলাদা কোনো কারণ নেই। ডক্টর যেমনটা বলেছেন, মিসক্যারেজ হলে এর পেছনে শারীরিক অসুস্থতা বা কোনো কমপ্লিক্যাশন থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনেক সময় শরীর নিজেই রিজেক্ট করে দেয়। প্রাণেশার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। রাতে ঘুমের ঘোরে হঠাৎ ভীষণ পেটব্যাথা উঠেছিল তার। যন্ত্রণা হচ্ছিল খুব। ঘুম ভাঙলে বুঝতে পারে হাঁটু বেয়ে রক্ত পড়ছে। ভয়ে হাত পা হীম হয়ে গেছিল। কাউকে ডাক দেবে সেই ক্ষমতাটুকু নেই প্রাণেশার। অনেক কষ্টে বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিলটা থেকে ফোন নিয়েছিল। অন্তিককে কল দিয়েছে। মেসেজ করে জানানোর মতো শক্তি ছিলনা তার শরীরে। তাই কলই দিতে পেরেছিল শুধু। কিন্তু অন্তিককে তাও কিছু বোঝাতে পারছেনা দেখে শেষে পাশের ছোট্ট টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা ফেলে দিয়েছিল। যাতে তার কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পারে।
র ’ক্তপাতের মাধ্যমে যেহেতু নিজে থেকেই পুরো টিস্যু বেরিয়ে গেছে প্রাণেশার গর্ভ থেকে। তাই আলাদা করে D&C করার দরকার পড়েনি। না তো ঔষধের দরকার পড়েছে। ভোরবেলা খবর শুনে অন্তিকের মা, চাচী আসতে চেয়েছিল। কিন্তু অন্তিক মানা করে দিয়েছে। রিলিজ দেওয়া অব্দি প্রাণেশার বড়মা, সাহিল আর সেই ছিল হসপিটালে। চার-পাঁচ ঘণ্টা পরই রিলিজ দেওয়া হয় প্রাণেশাকে। কিন্তু রিলিজের পর প্রাণেশার আর ফারদিন বাড়ি যাওয়া হয়নি। অন্তিক নিজের সাথে নিয়ে গেছে। সাহিল আর বড়মা দ্বিমত করতে চাইলেও সে শুনেনি। প্রাণেশাকে আর এক মুহূর্তও সে নিজের থেকে দূরে রাখতে চাইছেনা।
————
চারপাশে শুধু শাওয়ারের আওয়াজ। ওয়াশরুমের কৃত্রিম ঝর্নাধারা থেকে ঝুপঝাপ শব্দে পানি পড়ছে। সেই পানির নিচে থাকা দুজন মানব মানবীর শ্বাস-প্রশ্বাস মিশে যাচ্ছে একে অপরের সাথে। নিঃশ্বাসের সাথে সাথে বুক উঠানামা করছে দুজনের। পানির প্রতিটি ফোঁটা পড়ছে তাদের চুলের ফাঁক গলে ঘাড়ে, পিঠে। তারপর বুক বেয়ে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিচ্ছে। মানবটি প্রতিবারের মতো স্বাভাবিক থাকলেও, মানবী বারবার কুঁকড়ে যাচ্ছে। হয়তো শীত লাগছে তার। একফোঁটা পানি তার কপাল বেয়ে ঠোঁটে নেমে আসলে, সে হা করে শ্বাস নেয়। পানি ঢুকতে দেয়না মুখে। ঠোঁট নরম হয়ে আসে তার। মুখ দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দের সাথে আরও কিছু নিরর্থক শব্দ বের করে দূরে সরে যেতে চাইলে সম্মুখ মানব আঁটকে নেয়। শেষে উপায় না পেয়ে সেই মানবের বুকেই মুখ গুজে মানবী। নিজেকে আড়াল করতে চাইছে মনে হলো। তবে মানবের থেকে নয়, বরং কৃত্রিম ঝর্নাধারার পানি থেকে। তা বুঝতে পেরে মানবটি আলতো করে শাওয়ার বন্ধ করে দেয়।
“ঠাণ্ডা লাগছে?”
মানবী মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়।
তার কপালে চুমু একে দিয়ে মানব বলে,
“আচ্ছা, সামনের বার থেকে হিটার ইউজ করবো। তোমার এত শীত লাগবে বুঝতে পারিনি।”
কথাটা বলে উষ্ণ আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে মানব নিজে একটা টাওয়েল পেছিয়ে নেয় কোমরে। সাথে মানবীকেও বুক থেকে উরুর নিচ অব্দি টাওয়েল পেছিয়ে দিয়ে কোলে তোলে নেয়। বেরিয়ে আসে ওয়াশরুম থেকে।
বিছানায় বসিয়ে ওয়ারড্রব থেকে দুজনের পোশাক বের করে তার পাশে এনে রাখে। দুজনের শরীর বেয়ে তখনো পানি পড়ছে টুপটুপ করে। হঠাৎ একটা ফোন কল আসলে মানবটি কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ততক্ষণে মানবী আস্তে ধীরে নিজের পোশাক পরে নিয়েছে। উঠে ধীর পায়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাড়ায় সে। চেহারাসহ হাতে-পায়ে মইশ্চরাইজার লাগাতে শুরু করে।
আয়নায় পেছনে তার স্বামী; অন্তিককে দেখা যায়। বিছানায় বসে কাধ দিয়ে ফোনটা কানের সাথে চেপে ধরেছে। সেভাবেই মনোযোগী চেহারায় কথা বলতে বলতে প্যান্ট পড়ছে সে। শেষে দাড়িয়ে যায়।। টাওয়েল খুলে নিয়ে প্যান্টের জিপার লাগাতে লাগাতে তার দিকে ফিরে তাকায়। কপালে ভাঁজ পরে তার। চেহারায় নাখুশ ভাব ফুঁটে উঠে। ওপাশের জনকে কিছু একটা বলে ফোন কেটে দেয়।
“তোমাকে বলেছিলাম একেবারেই হাটাচলা না করতে একা একা। তাও কথা শুনোনা।” কথাটা বলতে বলতে প্রাণেশার পাশে এসে দাড়ায় অন্তিক। প্রাণেশা কিছু বলার আগেই আস্তে করে কোলে তুলে এনে বিছানায় বসিয়ে দেয়।
“প্রত্যেকবার এমন করেন কেন? আমি এখন খুব ভালো করে হাঁটতে পারি। একদম সমস্যা হয়না। বরং আমার তো মনে হয় আপনার কারণে আমি হাটাচলা-ই ভুলে যাবো খুব তাড়াতাড়ি।” দক্ষ হাতের ইশারায় বলে প্রাণেশা।
“কয়েকটা দিন না হাঁটলে মানুষ হাঁটতে ভুলে যায়?” অন্তিক ভেজা টাওয়েল দুটো বিছানা থেকে নিতে নিতে বউয়ের কথায় কপালে ভাঁজ ফেলে বলে।
“গোটা একটা সপ্তাহ পার হয়ে গিয়েছে। এতগুলো দিন আপনার কাছে কয়েকটা দিন মনে হচ্ছে?” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
“এতদিন এভাবে হাটাচলা বাদ দিয়ে থাকতে হতো? যদি শুরুতেই মাস্টারনি সেজে একা একা হাটতে গিয়ে অসুস্থ শরীরে আরও ব্যাথা না পেতে?”
প্রাণেশা মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্তিকের কথার বিপরীতে সে আর কিছু বলেনা। তার কথা সত্য। এতদিন অসুস্থ থাকতে হতোনা তাকে। যদি সেদিন একা হাঁটতে গিয়ে পড়ে না যেতো। প্রাণেশা মিসক্যারেজ পরবর্তী সময়টাতে মানসিকভাবে খুব বিধ্বস্ত ছিল। কিন্তু পরিবারের সবার মেন্টাল সাপোর্ট, স্বামীর আদর-যত্ন, বাবা আর মামা বাড়ির লোকজনদের আসা যাওয়া - সব মিলিয়ে বেশিদিন ট্রমাটাইজড থাকতে দেয়নি তাকে। অন্তিক তাকে হস্পিটাল থেকে সোজা নিজের সাথে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। সেই থেকে তার সবরকম দেখাশুনা করেছে নিজেই। তার বড় থেকে ছোট যেকোনো কাজ, কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয় কাজ, কোনোকিছুই বাদ রাখেনি। আর না অন্য কারো সাহায্য নিয়েছে। নিজেই করেছে সব। প্রথম প্রথম ট্রমাটাইজ থাকায় প্রাণেশার উপর সেসব তেমন প্রভাব ফেলতনা। কিন্তু আস্তে আস্তে সময়ের সাথে যখন ট্রমা কাটতে থাকে, বাস্তবতায় ফিরে আসে। তখন খুব ইতস্তত করতো। অন্তিককে মানা করতো যেন তাকে নিয়ে ব্যস্ত না হয়। মূলত লজ্জা, সংকোচ কাজ করতো তার ভেতরে। কিন্তু অন্তিক সেসবের পরোয়া না করে নিজের মতো আগলে নিয়েছিল তাকে। সেই থেকে এখনো তেমনটাই চলছে। ফলে অন্তিকের সাথে আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে সে। স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বোঝাপড়া বেড়েছে নিজেদের মধ্যে। যদিও এখন কোনো সমস্যা হয়না তার। একটু দেখেশুনে আর আস্তে ধীরে হাঁঁটলেই সে ঠিকঠাক চলাফেরা করতে পারে। কিন্তু অন্তিক তাকে এখনো সেই অনুমতি দিচ্ছেনা। পুরোপুরি ঠিক হওয়ার আগে এভাবে হাঁটতে গিয়ে আবার পড়ে গেলে?
মেহেরিন আপুর বিয়ে আজ। বিকেলে তারা দুজন ঐ বাড়ি যাবে। বাকিরা সকালেই চলে গিয়েছে। তারা দুজন যায়নি শুধু। এখন বাড়িতে সে আর অন্তিক আছে। বিকেল পর্যন্ত তার সাথে বাড়িতেই থাকবে অন্তিক। শুরুর কদিন একেবারেই বাইরে যেত না সে। অতীব দরকারি হলে মাকে এনে তার পাশে বসিয়ে রাখে। তারপর যায়। আজ যেহেতু কেউ নেই বাড়িতে। তাই প্রাণেশাকে একা রেখে কোথাও যাওয়ার প্রশ্ন আসেনা। অন্তিক বিকেল অব্দি সময়টা স্টাডি রুমে কাজ করতে করতে কাঁটাই। নিজের কাছে থাকা প্রাণেশার সেই ছোট আর্টবুকটা ধরিয়ে দিয়ে প্রাণেশাকেও তার পাশে বসিয়ে রাখে। পরে ঘুম পাচ্ছে বললে রুমে দিয়ে এসেছিল। এভাবে সময়টা কেটে যায়।
—————
সকাল থেকেই মাহদদের বাড়িটা সরগরম। ছাদের কিনারায় টাঙানো ফেয়ারি লাইটগুলো ঝিকমিক করছে। গেটের সামনে ফুলের খিলান। ড্রয়িংরুম মিনিমালিস্ট ডেকোরেশনে সাজানো। সাদা আর গোলাপি ফুল, নরম পর্দা, লাইটিং-এর মৃদু ছটা। সব মিলিয়ে বিয়ে বাড়ির পরিবেশ যেমন হয়। বরযাত্রীও এসে পড়েছে। সংখ্যায় তারাই বেশি। কনে পক্ষের মানুষ তুলনামূলক কম। কারণ তাদের নিকটাত্মীয়রাও তাদের মতোই লন্ডন স্থায়ী। এখানে যে অল্প কয়েক আত্মীয়-স্বজন আছে, তাদের নিমন্ত্রন করেছে। আর সরোয়ার বাড়ির লোকজন তো আছেই। অন্তিক আর প্রাণেশাও এসে পড়েছে।
প্রাণেশাকে মেহেরিনের রুমে দিয়ে আসে অন্তিক। সেখানে ইশি, দিথীও আছে। বউ সেজে বসে আছে মেহেরিন। প্রাণেশাকে দিতে আসলে বিছানায় একপাশে বসার জায়গা করে দেয় তাকে। যদিও তুরাগকে এতদিনে মনের কোণে জায়গা দিয়ে দিয়েছে সে। কিন্তু প্রাণেশা আর অন্তিককে দেখলে কোথাও একটা খারাপ লাগা কাজ করে এখনো। মেয়েটা নাকি অন্তিকের সন্তানের মা হতে যাচ্ছিল। আবার মিসক্যারেজও হয়ে গেলো। খারাপ লাগলেও এসব ভাবতেই অবাক লাগে তার। সেদিন তো শুনলো অন্তিক বিয়ে মানেনা। তারপর আবার কি থেকে কি হয়ে গেলো। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার ভেতর থেকে।
“মেহেরিন আপু, তোমাকে এবার থেকে ভাবি ডাকবো নাকি আপু ডাকবো কনফিউজড। ভাবিপু ডাকা যায়, কি বলো?” আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল ঠিক করতে করতে বলে ইশি। তার কথায় দিথী আর প্রাণেশাও হেসে উঠে।
“অয়ন্তি আপুর অবস্থায় পড়েছ তুমিও।” দিথী
“বেশি ফাজিল হয়েছিস দুটোই।” মেহেরিন মেকি ধমক দেয়।
ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে দিথী বলে,
“না না, আপুই থাকবে। কারণ আমরা কনে পক্ষ হিসেবে বিয়ে খেতে এসেছি। বর পক্ষ তো নয়।”
“হ্যাঁ, বরপক্ষে তো অনেকেই আছে। তাই মা বললো কনে পক্ষ হিসেবে থাকবে বিয়েতে। নাহয় আমি বরপক্ষ হিসেবে আসতে চেয়েছিলাম। বরপক্ষ হলে দাম বেশি থাকে। আপ্যায়ন বেশি পাওয়া যায়। এখন উঠতে বসতে মাহাদ ভাইয়ের ঝাড়ি খাচ্ছি।” ইশি
“আচ্ছা, অয়ন্তি কোথায় রে? ওকে সেই কবে দেখেছিলাম। আর আসলোনা এদিকে।” মেহেরিন
“সে শাশুড়ির সাথে সাথে আছে। সে কি এখন আমাদের মতো ফুফির বাড়িতে আছে নাকি? মা, বড়মা, ফুফি, আপু সবাই মেয়েদের যেখানে খাওয়ানো হচ্ছে, সেখানে আছে।” দিথী
“বিয়ে কখন পড়ানো হবে জিজ্ঞেস করেছিলাম মাহাদ ভাইকে। বলেছে কাজী সাহেব আসলেই পড়িয়ে ফেলবে। ততক্ষণে সবার খাওয়া দাওয়া শেষ করছে ওরা।” ইশি
ওদের নানাবিধ কথাবার্তার মধ্যে অয়ন্তি আসে রুমে। প্লেটে করে প্রাণেশার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে সে।
“এই নাও ভাবি। তোমার বর খাবার পাঠিয়েছে। খেয়ে নাও। আর কিছু লাগলে আমাকে বলো ঠিক আছে?”
প্রাণেশা মাথা নাড়ায়। প্লেটটা নিয়ে আস্তে ধীরে খেতে শুরু করে। অয়ন্তি ওকে খাবারটা দিয়ে চলেই যাচ্ছিল। এর মধ্যে মাহাদ আসে। দেখে মনে হচ্ছে খুব রেগে আছে। অয়ন্তিকে কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল রেগে। কিন্তু রুমে বোনেদের আর ভাবির অস্তিত্ব আছে খেয়াল হতেই দমিয়ে নেয় নিজেকে। তার বাহু ধরে টেনে একপাশে আনে। গলা নামিয়ে বলে,
“তোকে আর বাইরে যেতে হবেনা। এখানেই থাকবি ওদের সাথে। কাজী সাহেব আসলে মেহেরিনকে ডাকা হবে। তখন নামবি নিচে। এর আগে আর কোথাও বড়দের সাথে ঘুরঘুর করতে যেন না দেখি। বুঝেছিস?”
“এভাবে ধরেছ কেন? ব্যাথা পাচ্ছিতো। আর আমি ঠিক কজনের কথা শুনবো বলোতো? দাদী বলছে ফুফির সাথে সাথে থাকতে, ফুফি বলছে বিশ্রাম নিতে, মাও বলছে দাদির কথা, আবার তুমি বলছো এখানে বসে থাকতে। আমি ঠিক কার কথা শুনবো?”
মাহাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“তোর জামাইর কথা শুনবি। আর কারো কথা না। নিচে মেহমানদের মাঝে যদি আর একবার দেখি, তাহলে তোর পা ভেঙে দেবো আমি। এখন চুপচাপ এখানে বসে থাক, নাহয় রুমে যা।”
অয়ন্তিকে আর কিছু বলতে দেয়না মাহাদ। বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়েই নিচে চলে যায়।
অয়ন্তি কিছু বুঝতে পারল না। মাহাদ ভাইয়ের হঠাৎ কি হলো? একটু আগেও তো ভাইয়া আর দিগন্ত ভাইয়ের সাথে নিচে কি নিয়ে যেন আলোচনা করছিল। তখন তো রেগে আছে বা কোনো ঝামেলা হয়েছে বলে মনে হয়নি! তাহলে?
“কি হয়েছে রে অয়ন্তি? ভাইয়াকে দেখে রেগে আছে মনে হলো। ঝগড়া করেছিস দুজনে? নাকি নিচে কিছু হয়েছে?” মেহেরিন
প্রাণেশা আর ইশি-দিথীও অয়ন্তির উত্তরের আশায় চেয়ে আছে। কিন্তু সে কিছু না বলে বেরিয়ে যায়। নিজেও বুঝতে পারছেনা কি হলো। এদের আর কি বলবে! রুম থেকে বেরিয়ে দুকদম হাঁটতেই দাদিকে দেখতে পায়। সে তাড়াতাড়ি করে যায় দাদির কাছে।
“দাদী, নিচে কিছু হয়েছে? মাহাদ ভাই রেগে আছে মনে হলো যে?”
দাদী অয়ন্তির কাছেই আসছিল।
“শুনো দিদিভাই। তোমাকে আর নিচে যেতে হবেনা। ডাকলে তখনই যেয়ো। এখন আর নিচে আসতে হবেনা। বুঝেছ?”
“আশ্চর্য, তুমি নিজেই তো বলেছিলে যেন ফুফির সাথে সাথে থাকি সবসময়। হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিই। উপরে বাকিদের সাথে যেন ঘাপটি মেরে বসে না থাকি। আবার এখন বলছ নিচে না যেতে।”
“হ্যাঁ, তখন বলেছিলাম। এখন আর কাজ নেই তাই না যেতে বলছি।”
“কি লুকাচ্ছ বলো? মাহাদ ভাই এসে অযথা আমার উপর রাগ দেখিয়ে চলে গেলো। হয় কি হয়েছে বলো, নাহয় আমি নিজে গিয়ে দেখছি।”
কথাটা বলে সে দাদির পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। কিন্তু দাদী হাত ধরে আঁটকে নেয়।
“আরেহ আরেহ। আমিতো বলছি যেতে হবেনা। তাও কথা শুনছ না!! আর মাহাদ ভাই কি? স্বামীকে ভাই ডাকবেনা কতোবার বলবো?”
“মূল কথায় আসো। কি হয়েছে বলো। নয়তো আমি যাচ্ছি।”
“তোমার জন্য সম্বন্ধ আসছে তোমার স্বামীর কাছে। তাই রেগে আছে সে। হয়েছে শান্তি?”
“কি??” অয়ন্তির কপালে ভাঁজ পরে
“হ্যাঁ, তোমাকে পছন্দ হচ্ছে সবার। প্রস্তাব দিচ্ছে মাহাদ নানুভাইয়ের কাছে, যে তোমাকে তাদের বাড়ির বউ বানাতে চায় তারা। সেই থেকে মেজাজ খারাপ হয়ে আছে তার। এখন আর নিচে এসোনা। সে তোমাকে ওখানে দেখলেই রেগে যাবে। তুমি যে এই বাড়ির বউ তা এখন জানিয়ে দেওয়া হয়েছে সবাইকে। কিন্তু তাও তার মেজাজ খারাপ এখনো। তুমি নিচে যেয়োনা ঠিক আছে?”
অয়ন্তি হতবুদ্ধি চেহারা নিয়েই সায় জানায়। মাহাদ ভাইয়ের কাছে তাকে বউ বানানোর প্রস্তাব দিলো? ফিক করে হেসে দেয় সে। তারপর চলে যায় তার ননদের রুমে। সে এই বাড়িতে থাকছে বেশ কিছুদিন হলো। যদিও মাহাদদের লন্ডন ফেরার সময়ই তুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মেহেরিনের বিয়ে পড়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। নিয়ে এসেছে তাকে ফুফিরা, অর্থাৎ শ্বশুর বাড়ির লোকজন। বেশ কিছুদিন ধরেই মাহাদ ভাইয়ের কাছে থাকছে সে এবাড়িতে।
মেহেরিনের রুমে ঢুকে বোনেরা একেক প্রশ্ন করলে, তাদের কথায় পাত্তা না দিয়ে শাড়ির আঁচল কাঁধে তুলে সে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দেয়। সবাই তাও প্রশ্ন করতে থাকলে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,
“মাহাদ ভাইয়ের কাছে প্রস্তাব এসেছে আমার বিয়ের জন্য। তাই রেগে গেছে।”
তার কথা শুনে এক মুহূর্ত সবাই শান্ত থাকলেও, পরক্ষণে হো হো করে হেসে উঠে। অয়ন্তিও হেসে উঠে তাদের সাথে।
“এটা সেরা ছিল। এন্টারটেইনমেন্ট অব দা ইয়ার।” দিথী হাসতে হাসতে বলে
“একদম! আমি ভাবছি যখন প্রস্তাবটা রেখছিল, সেই মুহূর্তে মাহাদ ভাইয়ের চেহারাটা কেমন ছিল? ইশ!! যদি একটা ছবি তুলতে পারতাম।” ইশি
“চুপ কর। হে হে করবিনা আর। আমার ভাইয়ের মজা উড়াচ্ছিস সবাই। ভাইয়ের বউকে অন্য কেউ বউ বানাতে চাইছে শুনে আমারই তো রাগ হচ্ছে।” মেহেরিন
“অও, সো স্যাড অফ ইউ।”
অনেকক্ষণ হাসাহাসি করে তারা এই বিষয়ে। প্রাণেশার খাওয়া হয়ে গেছে। তার টায়ার্ড লাগছিল কোনো কারণ ছাড়া। অয়ন্তির দেখাদেখি সেও শাড়ির আঁচল তুলে বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে কিছুটা কাঁত হয়ে বসে।
হাসাহাসির মাঝে হঠাৎ দিথীর চোখ পরে অয়ন্তির পেটের দিকে। লাল হয়ে আছে।
“আপু, তোমার পেটে কি হয়েছে? এমন লাল হয়ে আছে কেন?”
দিথীর কথায় প্রত্যেকে তাকায়। ইশি একটু কাছে গিয়ে তাকাতেই মনে হলো খামচির দাগ।
“আরেহ, দেখে তো মনে হচ্ছে তোমার পেটে কেউ খামচি দিয়ে…” কথাটা বলতে বলতেই ভুল জিনিসে আগ্রহ দেখিয়ে ফেলেছে বুঝতে পেরে থেমে যায়। দাঁতে জিহ্বার কামড় দেয়। অয়ন্তি বোনেরা কিসের কথা বলছে বুঝতে পেরে স্বামীর আদর সোহাগের চিহ্ন লুকাবে, তার আগেই মেয়ে দুটো যা বলার বলে ফেললো। প্রত্যেকে থতমত খেয়ে যায়। অয়ন্তি থম মেরে থাকে এক মুহূর্ত। তারপর লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠে। তৎক্ষণাৎ উঠে বসে বিছানা থেকে। এক মিনিটও দাড়ায়না আর। নিজেদের রুমে চলে যায়।
সে চলে যেতেই ইশি-দিথী হেসে কুটিকুটি হয়। তাদের আপুটা একটু বেশিই সহজ সরল। নাহয় অন্য কেউ হলে ছোট বোনেদের এমন কথায় ঝাড়ি মেরে বসিয়ে রাখতো। অথচ তাদের বোন লজ্জ্বা পেয়ে পালালো।
এদিকে তাদের কাণ্ড দেখে প্রাণেশা শাড়ির আঁঁচল নামিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে বসেছে। যদিও তার পেটে খামচি থাকার চান্স নেই। কিন্তু কি না কি চোখে পড়ে তাদের। তারপর অন্য কিছু ভেবে তাকেও না আবার লজ্জ্বা দেয়!
ভাবির কাণ্ড দেখে দুবোনের হাসি বাড়লো বই কমলোনা। কারণ আসল জিনিস ইতোমধ্যেই তাদের চোখে পড়ে গেছে। হাসতে হাসতেই দিথী বলে,
“ভাবি, যেখানে ঢাকা দরকার সেখানে না ঢেকে অজায়গা হাইড করেছ। আমরা যা দেখার দেখে নিয়েছি।”
প্রাণেশা দ্বিধান্বিত চোখে তাকায়। কিসের কথা বলছে সে বুঝতে পারছেনা। তাও বারবার শাড়ির আঁচল ঠিক করে। পেটের দিকে ভালো করে ঢেকেঢুকে দেয়। কিন্তু তাও তাদের হাসি থামছেনা দেখে নিজেকে ঠিকঠাকভাবে দেখে। বুকের দিকে তাকাতেই কান গরম হয়ে উঠে লজ্জায়। আঁঁচল তুলে পিঠ এলিয়ে দেওয়ায় বুকের দিকেও শাড়ি এলোমেলো হয়ে গেছিল কিছুটা। সে বুঝতে পারেনি। ওখানেই বক্ষাংশের কিছুটা উপরে দাগ দেখা যাচ্ছে। কিসের দাগ তাও স্পষ্ট। সাথে ছোপ ছোপ দাগগুলো যে আরো নিচে ব্লাউজের ভেতর অব্দি গেছে তাও স্পষ্ট। প্রাণেশা তাড়াতাড়ি শাড়ি ঠিক করে। লজ্জ্বায় কেদে দেওয়ার অবস্থা তার। কোথাও যে চলে যাবে অয়ন্তি আপুর মতো, সেই সুযোগও নেই তার। ওর বিষয়টা বুঝতে পেরে মেহেরিন বোনেদের ধমক দিয়ে থামায়। প্রাণেশার খারাপ লাগলে যেন একান্তে বিশ্রাম নিতে পারে, তাই একটা রুম আগেই খালি করে রেখেছিল তার মা। সেই রুমে নিয়ে যেতে বলে তাকে ধরে ধরে। ইশিই যায়, দিয়ে আসে ভাবিকে। প্রাণেশাও না করেনা। তার এখনো লজ্জ্বা লাগছে পুরো ঘটনার কারণে। ইশি অবশ্য ওকে দিয়ে চলে আসার সময় সরি বলেছে বেশি দুষ্টুমি করে ফেলার জন্য। সাথে যেকোনো দরকারে তাকে একটা মিসড কল দিতে বলেছে। প্রাণেশা সায় জানিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় ভেতর থেকে। তার রাগ লাগছে, খুব রাগ লাগছে। তবে ননদদের প্রতি নয়। নিজের স্বামীর প্রতি। বুকের ঐ দাগগুলো আজকেরই। তখন একসাথে গোসল সেরে নানান কথা বললেও, তার একটা বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরে মন খচখচ করছিল।
যে লোক আগে কথায় কথায় তার গাঁয়ের উপর উঠে আসতে চাইতো। সে এখন কপালে, গালে, হাতে কিংবা মাথায় চুমু খাওয়ার বাইরে আর কিছুই করেনা। অথচ এ কদিনে সে পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে গেছে অন্তিকের কাছে। সময়ে অসময়ে নানান কাজ করে দিতে হয় প্রাণেশার। গোসলটুকু নিজে নিজে করতে পারতনা সে, এখনো পিছলে পরে যাবে এই ভয়ে নিজেই গোসল করিয়ে দেয় তাকে। পুরোটা সময় প্রাণেশা খোলামেলা থাকে অন্তিকের কাছে। অথচ একবারো কপালে, গালে চুমু খাওয়ার বাইরে কামনার স্পর্শ নিয়ে অন্য কোথাও হাত দেয়নি। প্রাণেশার এক মনে ভালো লাগা কাজ করলেও, অন্য মনে কিছুটা ভয় ঢুকেছিল। অন্তিকের কি তাকে এখন আর আগের মতো ভালো লাগেনা? সে বারণ সত্ত্বেও আস্তে ধীরে হেঁটে গিয়ে, খুটিয়ে খুটিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখছিল। কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা চেহারায়। শরীরের জৌলুস কমে গেছে কিনা আগের চেয়ে - এসব দেখছিল। কিন্তু অন্তিক ব্যাল্কনিতে টাওয়েল দুটো দিয়ে এসে কখন যে তার পেছনে এসে দাড়িয়েছে বুঝতে পারেনি। সে প্রাণেশার চেহারা দেখেই তার মন পড়ে নিয়েছে। আর এতেই যেন শীতল মস্তিষ্কে অনলের ছোয়া আসে। তাও নিজেকে যথাসম্ভব সংযত করে বলে,
“এতদিনেও বিশ্বাস করতে পারোনি, ভালোবাসতে পারোনি, তাইনা? নাকি আমিই তোমার প্রতি নিজের ভালোবাসা এখনো ঠিকঠাক প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছি, কোনটা?”
প্রাণেশার জবাব শুনার অপেক্ষা করেনা সে,
“আমি কি শুধু তোমার শরীর ভালোবাসি? তুমি মানুষটাকে বাসিনা? সবসময় ঐ চিন্তা কেন মাথায় আসে তোমার?”
প্রাণেশার কাছে অন্তিকের রাগ জিনিসটা একরকম ট্রমার মতো কাজ করে এখন। এই বুঝি অন্য কোনো ভুল বুঝাবুঝি তৈরি হলো তাদের মধ্যে। তারপর আবার সব এলোমেলো হয়ে গেলো। তাই কোনোকিছু না ভেবে হঠাৎ অন্তিকের বুকে মুখ গুজে দেয়। তাকে জড়িয়ে ধরে। রাগ কমানোর প্রচেষ্টা। হলোও তাই। অন্তিকের রাগ পানির মতো গলে গেলো। বউ তার রাগ কমাতে জড়িয়ে ধরেছে বুঝতে পেরে বুকের কোথাও একটা দোল খেয়ে উঠলো।
সে প্রাণেশার গা কাপঁছে বুঝতে পেরে কোলে তুলে নেয়। শীত লাগছে বলেছিল গোসলের সময়ই। তাই হয়তো গা কাপঁছে। সে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। চাঁদর দিয়ে দেয় গাঁয়ের উপর। অথচ প্রাণেশা ভেবেছে অন্তিক তখনো রেগে আছে। তাই নিজের কাছে টেনে নেয়। কপালে বেশ কয়েকটা চুমু দেয়। বুঝাতে চাইছে তার ভুল হয়ে গেছে। আর হবেনা। যেন ক্ষমা করে দেয়। অন্তিক তার রাগ ভাঙানোর ধরণ দেখে হো হো করে হেসে উঠে। তারপর তার পাশে শুয়ে পড়ে। তখনই অল্প একটু যা হয়েছে তাদের মধ্যে, তাও অনেকদিন পর।
কিন্তু এখন তার রাগ লাগছে এটা ভেবে যে, আজকেই কেন হতে হলো এসব। এতগুলো দিন সে তেমন কোথাও যেতনা। তখন হতে পারতনা? আজ একটা বিয়ে বাড়ি এসেছে। আর আজকেই……
অথচ অন্তিকের এসবে কোনো দোষ নেই। তাও তার অন্তিকের উপরই রাগ লাগছে।