“কাজটা কি ঠিক করলেন? আপনার কাছে এমন লুকোচুরি আশা করিনি।”
প্রাণেশার সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, একটা ফোন কল আসায় কথা বলতে বলতে চলে আসছিল অন্তিক। দুতলায় হওয়ায় করিডোরের শেষ প্রান্তে জানালা আছে, ঐদিকটা খোলামেলা। হাওয়া বাতাস চলাচল করে নির্দ্বিধায়। সেদিকেই গিয়ে অন্তিক পাঁচ/দশ মিনিটের মতো কথা বলে কারো সাথে। কল কেটে ফোনে কিছু একটা চেক করছিল, এমন সময় সাহিলের কণ্ঠে কথাটা শুনে সে পেছন ফিরে তাকায়। সাহিল খুব শান্ত অভিব্যক্তিতে আর সংযত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছে কথাটা। চেহারার হাবভাবও শান্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু সে অন্তিকের সাথে এই মুহূর্তে খোলামেলাভাবে কথা বলতে চাইছে তাও স্পষ্ট তার অভিব্যক্তিতে। অন্তিক আস্তে করে হাতের ফোনটা প্যান্টের পকেটে ঢুকায়।
“উপায় ছিলনা। তোমাকে বললে তুমিও তোমার বোনের মতোই ভুল বুঝতে।”
“এমনটা মনে হওয়ার কারণ?”
“ও আমার ওপর রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে। একথা শুনে আমি যদি কিছু বুঝিয়ে বলতামও, তুমি কি বিশ্বাস করতে? আমার তো মনে হয়না। বরং বোনের পক্ষে থাকতে, এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া প্রাণো ভয়ে ছিল। ভেবেছিল আমি হয়তো তোমাদের সব বলে দিয়ে ওকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাবো, ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এটাও তোমাকে না জানানোর একটা কারণ ছিল। আমি চেয়েছিলাম, আগে ওর রাগ-অভিমান ভাঙিয়ে, তারপর যা করার করবো। আগে ওর সঙ্গে ক্লিয়ার না হয়ে তোমাদের জানালে বিষয়টা আরও ঘেঁটে যেত। প্রাণো ভাবতো, আমি ওর মান-অভিমান বা মতামতের গুরুত্ব দিচ্ছি না। যেটা আমি একেবারেই চাইনি।” অন্তিক নির্বিকারে শান্ত ভঙ্গিতে জানায়।
তার কথা শুনে সাহিলের কুঁচকানো ভ্রু সোজা হয়। তাকে জানালে বিষয়টা ঘেঁটে যেতো তা সে নিজেও জানে। তার বোন কষ্ট পেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে জানলে ঝামেলা করতো সে। নিজের উপর এতটুকু বিশ্বাস আছে। কুঁচকানো ভ্রু কিছুটা সোজা হলেও কপালের ভাঁজ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়না তার।
“সে নাহয় বুঝলাম। কিন্তু আপনার মনে হয়না একটু বেশিই তাড়াহুড়া করে ফেলেছেন?”
অন্তিক এবার সরাসরি সাহিলের চোখে চোখ রাখে। যদিও আন্দাজ করতে পারছে কী বলতে চাইছে সে, তবুও নিশ্চিত হতে চায়।
“ওর বয়স কম। বিয়ে হয়েছেও বেশিদিন হয়নি আপনাদের। নিজস্ব বোঝাপড়ার তেমন সুযোগই পাননি যতদূর বুঝতে পারছি। এর মধ্যে পুরোপুরি সংসারে ঢুকিয়ে দিলেন ওকে। স্বামী-সন্তানের দায়িত্ব; যেমন তেমন বিষয় নয় মোটেও। আমার বোন বাকিদের মতো স্বাভাবিক হলে একটা কথা হতো। কিন্তু ওর যেহেতু একটা প্রতিবন্ধকতা আছে। আপনার মনে হয়না আগে সেটার কোনো কিছু করা যায় কিনা দেখা দরকার ছিল? যদি দেখা যেত যে ঠিক হওয়ার কোনো চান্স নেই, তারপর নাহয় এগোতেন। কিন্তু এমন দায়সারাভাবে নিচ্ছেন ওর দিকটা! সন্তান হয়ে গেলে তো হয়না শুধু। মানুষ করতে হয়। বাচ্চাটা হলে, এরপর আর নিশ্চিন্তে চিকিৎসা করা যাবে? অনেক রকম সমস্যা দেখা দেবে। ডেলিভারির কয়েক বছরেও চিকিৎসা করা সম্ভব হবে কিনা সন্ধেহ। ওর ফিজিক্যাল হেলথ সাপোর্ট করবেনা হয়তো, তার উপর মা হয়ে গেলে তো আলাদা দায়িত্ব আছেই। পুরো বিষয়টাতে আমি আপনার কোনো রকম কনসার্ন দেখতে পাচ্ছিনা। আপনি ম্যাচ্যুর মানুষ। আপনার থেকে এসব আশা করিনি।” একটু থেমে সে আবার বলে,
“আমি তো সবরকম চেক আপ করিয়ে পজিটিভ সাইন পেলে এত দিনে ওর চিকিৎসা শুরুই করে দিতাম। কিন্তু……” এতটুকু বলে সাহিল থেমে যায়।
অন্তিক পুরোটা সময় নীরব থেকে সাহিলের সব কথা শুনে। এটা যে একটা বড় ভুল হয়ে গেছে তা সেও জানে; আর মানে। বাচ্চা হওয়া নিয়ে অখুশি না হলেও। পুরো বিষয়টা নিয়ে সাহিল তার উপর ডিজেপয়েন্ট হয়ে আছে তাও বুঝতে পারছে সে।
“তোমার বিষয়টা আমি বুঝতে পারছি সাহিল। আমার গাফিলতি আছে কিছু। তবে প্রাণোর চিকিৎসা নিয়ে কিছুই ভাবিনি এমনটা নয়। পরিকল্পনা ছিল কিছু। কিন্তু ওর হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় সব এলোমেলো হয়ে গেছে। যদিও এখানেও দোষটা আমারই ছিল। কিন্তু ওর বিষয়টা নিয়ে কিছু একটা না করে, এত তাড়াতাড়ি পুরোপুরি সংসারে ঢুকিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা আমারো ছিলনা।” একটু থামে সে,
“যায় হোক, ওদিকে না যায় আর। তোমার চিন্তা হচ্ছে বুঝতে পারছি। তবুও বিশ্বাস রাখো, ওর দিকটা আমি অবহেলা করবো না। একটু সময় দাও আমাকে। আমার সন্তানটা নিরাপদে আসুক পৃথিবীতে। তারপর তোমার বোনকেও সুস্থ করে তুলবো। সংসারিক ঝামেলার কারণে ওর দিকটা নেগ্লেক্ট হতে দেবোনা। কথা দিচ্ছি!”
——————
ইরফান আর তোশা; দুজনের বাবা-মা ই খুশি হয়েছে তাদের বিয়ে করে নেওয়ায়। উনারা তো চাইছিলেনই ছেলে মেয়ে দুটো বিয়ে করে নিক। কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যেই ছিল যতো ঝামেলা। এখন অবশেষে সুবুদ্ধির উদয় যখন হয়েছে। তখন নাখুশ হওয়ার মানেই নেই। আগে তোশার বাড়িই গিয়েছিল তিনজনে। তাদের জানিয়ে তারপর ইরফানের বাড়ি যায়। ইরফানের বাবা তারা ওবাড়ি থাকতেই খবর পেয়েছে। তাই ছেলে বউকে স্বাগতম জানানোর জন্য অল্প সময়েই বিরাট আয়োজন করে ফেলেছিলেন ঘর-দোর সাজিয়ে। অন্তিক নিজের বাড়িতেও জানিয়েছে তাদের বিয়ের বিষয়টা। কিন্তু প্রাণেশার বাড়ি যাওয়ার ছিল বলে সেখানে যেতে পারেনি তারা।
রাত তখন বেশ হয়েছে। ঘড়ির কাঁটা ১২ ঘর ছুঁইছুঁই। অন্তিক ইরফানকে কল দেয়। তোশার কি অবস্থা জানতে হবে। ডক্টর তখন বলেছিল ওকে নিয়ে একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হতে। কারণ অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ওর আচার আচরণে কিছু অসংলগ্নতা প্রকাশ পাচ্ছে। আগের সত্ত্বাটার সাথে মেলানো যাচ্ছেনা একেবারেই। এখন কি অবস্থা ওখানের, এসব টুকটাক খবরাখবর নিয়ে অন্তিক স্টাডি রুমে বসে বাকি আরও কিছু কাজ সারে। প্রায় ১ টার দিকে ফ্রি হয়ে রুমে আসে। প্রাণেশা ততক্ষণে জেগে থাকবেনা ভেবে আর কল লাগায়না তাকে।
ওবাড়ির সবাই বলেছিল যেন আজকের দিনটা সে থেকে যায়। কিন্তু তার রাতের এই কেস স্টাডিটুকু দরাকারি ছিল, তাই চলে এসেছে। সে এসির টেম্পারেচার কমিয়ে গাঁয়ের শার্টটাও খুলে ফেলে। বিছানায় গা এলিয়ে দেবে, তার আগে ফোনের আওয়াজ শুনে সেদিকে তাকায়। ভ্রু কুচকে যায় তার। এত রাতে কে কল দিলো? বেডের ওপাশ থেকে ফোনটা নিয়ে প্রাণেশার কল দেখে কপালের ভাঁজ মিলিয়ে যায়। মেয়েটা জেগে আছে? অন্তিকের ঠোঁটে হাসি ফুঁটে। কল রিসিভ করে কানে ধরে, তবে কিছু বলেনা। প্রাণেশার নিঃশ্বাসের শব্দ অনুভব করার চেষ্টা করে। তাকে কিভাবে নিজের কথা বোঝায় তা দেখার অপেক্ষায় থাকে। অন্তিক মাথার পেছনে এক হাত রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। অন্য হাতে ফোন কানে ধরা। প্রাণেশার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পারছে সে এবার। চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড কাটতেই ভ্রু কুচকে চোখ মেলে অন্তিক। ওর নিঃশ্বাসের শব্দটা অন্যরকম লাগছে।
“প্রাণো? কি করছ? মেসেজে কথা বলো। আমি কলে আছি তো।” নরম কণ্ঠে বলে সে। যদিও প্রাণেশার দিক থেকে কিছু একটা অস্বাভাবিক লাগছে।
প্রাণেশার সাড়াশব্দ না পেয়ে ভ্রু কুচকে বলে,
“হ্যাঁলো, প্রাণো। মেসেজে বলো। এমনভাবে শ্বাস নিচ্ছ কেন? কিছু হয়েছে?”
তাও প্রাণেশার সাড়া পায়না সে। উল্টো কেমন জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে মনে হয় তার।
“প্রাণো? কি হয়েছে? এই মেয়ে কিছু শব্দ দাও। নাহয় মেসেজে বলো।”
“প্রাণো। এমন করছ কেন? আশ্চর্য! অসুস্থ লাগছে তোমার? বাড়ির কাউকে বলোনি?”
অন্তিকের এবার একটু কটকা লাগে। মেয়েটার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এমনটা মনে হচ্ছে তার। কিন্তু বুঝতে পারছেনা। হঠাৎ ওদিক থেকে কিছু পড়ার শব্দ হয়। অন্তিক তড়াক করে উঠে বসে। অস্থির লাগছে তার। প্রাণেশার কল কাটেনা। নিজের আরেকটা ফোন নিয়ে সাহিলকে কল লাগায়। দুইবারের মাথায় রিসিভ হয়।
“হ্যালো, সাহিল?”
সাহিল মাত্র শুয়েছে। একটু ঘুম এসেছিল। কারো কল পেয়ে না দেখেই রিসিভ করেছে। অন্তিকের কণ্ঠ শুনে চোখ মেলে একবার ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। আবার কানে দেয়,
“হ্যাঁ, বলছি। কোনো সমস্যা? এত রাতে কল দিলেন। ও বাড়িতে সব ঠিক আছে?”
অন্তিক অস্থির কণ্ঠে বলে।
“হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। তুমি একটু প্রাণোর রুমে যাও তো তাড়াতাড়ি। কি হয়েছে দেখো। ওর কিছু একটা হয়েছে। একটু প্লিজ তাড়াতাড়ি যাও। আর আমাকে জানাও। কল কেটোনা ঠিক আছে?”
অন্তিকের কথা শুনে সাহিলের ভ্রু কুচকে যায়। তবে কথা না বাড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে তাড়াহুড়া করে যায়।
ভেতর থেকে লক দেওয়া নিষেধ প্রাণেশার জন্য। তাই সাহিলের ঢুকতে অসুবিধা হয়না। একবার বাইরে থেকে ওর নাম ধরে ডেকে ঢুঁকে যায়। ভেতরে প্রাণেশাকে বিছানায় পড়ে কাতরাতে দেখে থমকে যায়। পেট চেপে ধরে বিছানায় কাতরাচ্ছে। চেহারা দেখে মনে হলো অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে তার। সাহিল তাড়াতাড়ি ওর কাছে যায়। অস্থির কণ্ঠে বলে,
“বোন, কি হয়েছে তোর? কি সমস্যা? এমন করছিস কেন?”
প্রাণেশা ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে কাতর চোখে তাকায়। চোখ, মুখ লাল হয়ে গেছে তার। কখন থেকে এভাবে পড়ে পড়ে কাঁদছে সাহিল ধরতে পারলোনা ঠিক। সে কি করবে তৎক্ষণাৎ বুঝে উঠতে পারছেনা। এদিকে অন্তিক ফোনে কি হয়েছে জানতে চাইছে বারবার।
সাহিল খেয়াল করে বিছানা র ‘ক্তা ‘ক্ত হয়ে আছে। থমকে যায় সে। প্রাণেশার দিকে তাকায়। সে কাঁদছে পেটের অসহ্য যন্ত্রণায়। আর সময় নষ্ট না করে ওকে কোলে তুলে নেয় সে। অন্তিককে জানিয়ে দেয় প্রাণেশাকে নিয়ে হসপিটাল যাচ্ছে সে। কোন হস্পিটাল নামসহ জানিয়ে সে আর অপেক্ষা করেনা।
——————
প্রাণেশাকে ভেতরের কেবিনে নেওয়া হয়েছে। পর্দার ওপাশে যন্ত্রের শব্দ। ডক্টর এখনো ভেতরে। বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে সাহিল। অস্থির ভঙ্গিতে এদিক ওদিক হাঁটছে। বাবা, বড়মা, বড়বাবা আর ফুফি চুপচাপ বসে আছে চেয়ারে। সবার চোখে আতঙ্ক আর একরাশ প্রার্থনা।
ডক্টরকে বের হয়ে আসতে দেখে প্রত্যেকে দাড়ায়। ডক্টর তাদের কাছে এসে দাড়ান।
বাবা চিন্তিত স্বরে জানতে চায়,
“ডক্টর, কেমন আছে আমার মেয়েটা?”
“আর, আর বাচ্চাটা……” সাহিলের কথাটা শুনে ডক্টর তাকান প্রত্যেকের মুখের দিকে। ততক্ষণে তিনি মুখের মাস্কটা খুলে ফেলেছেন। হাতের গ্লাভসগুলো খুলতে খুলতে বলেন,
“পেশেন্ট এখন স্টেবল আছে। র’ক্ত ক্ষরণ বন্ধ হয়েছে। কিন্তু…” একটু থেমে আবার বলেন,
“আমরা ভ্রূণটাকে রাখতে পারিনি।”
ডক্টরের কথায় চোখ বুঝে নেয় সাহিল। বাকিদের উৎসুক চোখগুলো থমকে যায়। করিডোরের বাতাসও মনে হলো নিঃশব্দ হয়ে গেছে। যদিও আগেই আন্দাজ করেছিল প্রত্যেকে, কিন্তু কোথাও একটা আশা রেখে দিয়েছিল মনে। সাহিল চোখ বন্ধ করে বেঞ্চে বসে পড়ে। বড়মা মুখে হাত দিয়ে কাঁদতে শুরু করে আস্তে আস্তে। বাবা নিরব, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে। ডক্টর নরম গলায় আরও কিছু বোঝাতে যাচ্ছিলেন, তখনই পেছন দিক থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা যায়। অন্তিক ছুটে আসে। কপালে ঘাম, চুল এলোমেলো, শার্টের উপরে কয়েকটা বোতাম খোলা।
মুখে একরাশ চিন্তা আর অস্থিরতা নিয়ে জানতে চায় সে,
“কি হয়েছে সাহিল? হস্পিটালে আনলে ওকে। ও কোথায়? কোন কেবিনে? আর কি হয়েছে?”
ডক্টর তাকান তার দিকে, ভ্রু একটু কুঁচকে যায়।
“আপনি পেশেন্টের কে হন?”
অন্তিক ডক্টরের দিকে নজর দেয় এবার,
“আমি হাসব্যান্ড, পেশেন্টের হাসব্যান্ড। কি হয়েছে ওর? এখন কেমন আছে?”
ডক্টর এক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে থাকেন। তারপর শান্ত স্বরে বলেন,
“আপনার ওয়াইফের মিসক্যারেজ হয়েছে। এখনো জ্ঞান ফেরেনি। তবে স্টেবল আছে, আর ব্লি'ডিংও বন্ধ হয়েছে। আপাদত চিন্তার কারণ নেই।”
অন্তিক থমকে যায় কথাগুলো শুনে। তাকিয়ে থাকে ডক্টরের দিকে। কি হলো বুঝতে পারছেনা সে, ডক্টর এসব কি বলছে! মিসক্যারেজ হতে যাবে কেন?
“বুঝলাম না, মিসক্যারেজ হবে কেন? আমার ওয়াইফের তো কোনোরকম শারীরিক সমস্যা বা অসুস্থতা ছিলনা। মিসক্যারেজের কথা আসছে কেন?”
“না। সবসময় শারীরিক কোন সমস্যা বা অসুস্থতা থাকতে হয়না। কখনও কখনও শরীর নিজেই রিজেক্ট করে দেয়, এটা খুব সাধারণ, তবে কষ্টকর। আপনি নিজেকে সামলান, আপনার ওয়াইফকেও তো সামলাতে হবে। সেন্স আসলে আপনাকেই সবচেয়ে বেশি দরকার পড়বে। নিজেকে সামলান।” কথাগুলো বলে ডক্টর চলে যায়। অথচ অন্তিক এখনো কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। বাকিদের দিকে তাকায় সে। সবাই মলিন চেহারায় বসে আছে। সাহিলের দিকে ফিরে সে।
“ওর কি হয়েছিল বললেনা?” শান্ত স্বরে জানতে চায় সে।
সাহিল মাথা তুলে তাকায়। দেখতে পায় অন্তিকের লাল চোখ দুটো।
“আপনি বলার পর রুমে গিয়ে দেখি বিছানায় পেট চেপে ধরে কাতরাচ্ছে। আর ব্লি'ডিং হচ্ছিল। সময় নষ্ট না করে এখানে নিয়ে আসি। তারপর…” গলার স্বর কেপে উঠে তার। “আর বাকি কথা আপনি শুনলেনই...”
অন্তিক চুপ করে থাকে। বেশ অনেকক্ষণ শব্দহীন থেকে, পরপর শুধু নিঃশব্দে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। তারপর হাত দুটো মুখে ঘষে এদিক ওদিক তাকায়। আবার দাঁতে ঠোঁট চেপে কেবিনের দিকে তাকায়।
———
ভোরের দিকে। কেবিনে নরম আলো। জানালার পর্দা টানা। মেশিনের “বিপ-বিপ” শব্দ ছাড়া সব নিস্তব্ধ। বিছানায় প্রাণেশা শুয়ে আছে। চেহারাটা ফ্যাকাসে। হাতে স্যালাইনের পাইপ, নাকে অক্সিজেন টিউব। মাথা ঝুকিয়ে চেয়ারে বসে আছে অন্তিক। দুই কনুই হাঁটুর ওপর, আঙুলে জড়ানো প্রাণেশার হাত। চোখে ঘুম নেই, মুখে ক্লান্তি আর শূন্যতা।
একটু পর প্রাণেশা হালকা নড়ে উঠে। চোখ দুটো আস্তে আস্তে খোলে, বেশ সময় লাগিয়ে চারদিকে ধাতস্ত হয়ে তাকায় সে।
মুখে অর্থহীন “আ, আ’ শব্দ করে। মনে হলো কিছু বলছে বা জিজ্ঞেস করছে।
নিস্তব্দ রুমে হঠাৎ প্রাণেশার শব্দ শুনে অন্তিক তাকায়, তাড়াতাড়ি কাছে ঝুঁকে,
“প্রাণো, এইতো আমি আছি। কেমন লাগছে তোমার? মাথা ঘুরছে?”
প্রাণেশা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর নিজের পেটের দিকে হাত রাখে। একটা মুহূর্তে তার মুখের রঙ বদলে যায়। চোখ বড় বড় হয়ে যায়, ঠোঁট কাঁপে।
অর্থহীন শব্দে কিছু একটা বলে। তাতেই ওর গলা কেপে উঠলো মনে হলো। অন্তিক এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে, কিছু বলতে পারে না।
প্রাণেশা আরও কাঁপা স্বরে শব্দ করে। অন্তিকের গলার স্বর ভারী হয়ে আসে। সে ওর হাতটা শক্ত করে ধরে। তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তার খুব কাছাকাছি চলে আসে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
“ও... ও আসেনি, প্রাণো... সময় হয়নি ওর এখনো...”