সাহিল সকালে ফোন দিয়েছিল অন্তিককে। অন্তিক তখন ইরফান তোশার সাথে হস্পিটালে ছিল। বিয়ের কিছুক্ষণ পরই তোশা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। পরপর ওকে নিয়ে দুজনে হসপিটালে যায় আবার। সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সকাল এগারোটার ঘর ছুঁই। পুরো সময়টাই অন্তিকের ফোন সাইলেন্ট ছিল। ব্যস্ততায় কারো কল বা মেসেজ দেখারও সময় পায়নি। ফেরার পথে গাড়িতে বসে অবশেষে ফোনটা হাতে নেয়। প্রাণেশার কল আর মেসেজ দেখে। মেসেজ পড়ে সে স্বস্তি পায়, তাই প্রাণেশাকে আর কল দেয়না তখন। একটা আননোন নাম্বার থেকে কয়েকটা কল দেখে সেটাতেই কল লাগায়। প্রাণেশা যেহেতু বলেছে সাহিল তার পার্সোনাল নাম্বার নিয়েছে। তাই ধরে নেয় ওটা সাহিল। সে কল ব্যাক দেয় ড্রাইভ করতে করতে। গাড়ির পেছনের সিটে ইরফান তখন বসেছিল তোশাকে কোলে নিয়ে। ডাক্তারের দেওয়া ঘুমের ওষুধে ও তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ইরফানের বুকে হেলে, নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছিল তোশা।
“হ্যালো”
“সাহিল ফারদিন বলছিলাম।”
“হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।”
“আজ বিকেলে একবার ফারদিন বাড়ি আসলে ভালো হয়। আর আঙ্কেলের নাম্বারটা টেক্সট করে দেবেন প্লিজ। বাবা চাইছিল উনার নাম্বার।”
“ঠিক আছে। আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর বিকালে ওবাড়ি আসছি।”
“হু, রাখছি।” কথাটা বলেই ফোন কেটে দেয় সে। বাড়তি কিছু বলেনা।
সাহিলকে তার বাবা আর বড় বাবা বলেছে প্রাণেশাকে নিয়ে তার মামা বাড়ি যেতে। আর বিকেলের দিকে তাদেরও ফারদিন বাড়িতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে। কারণ ছোট থেকে প্রাণেশাকে তারাই বড় করেছে। নিজের দুই ছেলে মেয়ের সাথে সমানতালে বড় করেছে। প্রাণেশার উপর তাদের অধিকারই সবচেয়ে বেশি। দুদিনে মেয়েকে পেয়ে সেসব তো ভুলে যেতে পারেন না। তাছাড়া তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আছে সজল ফারদিনের। তাদের কাছে অপরাধী তিনি। খুব বড় অপরাধী।
বাবার আর বড়বাবার কথা অনুযায়ী সাহিল প্রাণেশাকে নিয়ে তখনই বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু প্রাণেশার আবদার আগে আরশি আপুর শ্বশুর বাড়ি যাবে। তাকে সহ নিয়ে তারপর যাবে মামাবাড়ি। বোনের কথা অনুযায়ী তাই করলো সাহিল। নাহিদ ভাইয়ার ঠিকানা জানে প্রাণেশা। তার দেখানো রাস্তা অনুযায়ী চলে যায় দুবোন। আরশি প্রাণেশাকে দেখে খুব খুশি হয়। পরপর সাহিলকে চিনতে না পারলে প্রাণেশা সব জানায় শুরু থেকে। তার কাছে সব ঘটনা শুনে আরশি হতবাক হয়ে পড়ে। পরপর সময় ব্যয় না করে শুশুর শাশুড়ির অনুমতি নিয়ে, নাহিদকে নিয়ে তাদের সাথে চলে বাবা বাড়ির উদ্দেশ্যে। প্রাণো সাথে থাকলে তার সাহস বাড়বে বাবাকে ফেইস করতে।
কলিং বেলের শব্দে আরিভ আপেল খেতে খেতে টিভির সাউন্ড কমিয়ে দরজা খুলতে যায়। দরজা খুলে দিয়ে আবার সোফায় গিয়ে বসার উদ্দেশ্য তার। কে এসেছে তা নিয়ে আগ্রহ নেই। কারণ এই সময়ে পাড়ার আন্টিরা রাধতে গিয়ে পেয়াজ, রসুন, নুন কিংবা নানান তরী তরকারী শর্ট পড়লে একে অপরের থেকে নিতে আসে। আবার কখনো আগে যা নিয়েছিল তা ফেরত দিতে আসে। তেমনই কেউ হবে ভেবে আরিভ তেমন পাত্তা দেয়না। “আরিভ!” অতি পরিচিত কারো কণ্ঠে নিজের নাম শুনে পেছন ফিরে চলে যেতে গিয়েও থেমে যায় সে।
থেমে দাড়াতে পারলো না পুরোপুরি। তার আগে কেউ ঝাপিয়ে পড়ে তার বুকে। সে হুশে আসবে তার আগে আবার কেউ দুজনকেই জড়িয়ে ধরে। আরিভ বিস্ময়ে কিছু বলতে ভুলে গেলো যেন। কারণ সে বেশ বুঝতে পারছে তার বুকে আছে প্রাণো আপু। আবার তাদের দুজনকে ধরে আছে তার বোন আরশি। বেশ কয়েক মুহূর্ত থাকে সেভাবে। দুবোন কাঁদছে। আরশি নিজেকে সামলে নিলেও প্রাণেশা বেশ কিছুক্ষণ ফুঁফায় নীরবে।
“আপু, তোমরা?” আরিভ বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে ভাবতেও পারছেনা দুজন তার সামনে দাড়িয়ে আছে। কত চেয়েছে দুইবোন ফিরে আসুক আবার। আগের মতো থাকুক তারা। কিন্তু সম্ভব হয়নি। আর না কোনো খোঁজ ছিল এই দুজনের। মায়ের কাছে শুনেছে আপু শ্বশুর বাড়িতে খুব ভালো আছে। প্রাণো আপুও নাকি ভালো আছে সেদিন শুনলো। অথচ একটাবার তাদের খোঁজ নেয়না। এই নিয়ে খুব অভিমান পুষেছিল মনে। কিন্তু দুবোনকে হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে কাছে পেয়ে সব ভুলে গেলো খুশিতে। বাবা মাকে ডাকলো চিৎকার করে। এত খুশি কোনো বছর ঈদেও হয়নি বোধ হয় সে। বাবা মা আরিভের চিৎকারে শুনে বাইরে এসে তাদের দেখে অবাক হয়। ততক্ষণে সবাই বাড়িতে প্রবেশ করেছে।
“প্রাণো এসেছিস? কেমন আছিস মা?” মামা
প্রাণেশা মামার কাছে যায়। দক্ষ হাতের ইশারায় বোঝায়,
“হ্যাঁ মামা। এসেছি। সাথে কাকে এনেছি দেখো।” কথাটা বলে আরশিকে দেখায় সে।
তিনি হাসেন তবে নিজের মেয়ের দিকে তাকাননা। আরশির মা, মেয়েকে পেয়ে বুকে নিয়ে চোখের পানি ফেলছেন খুশিতে। সাহিল আর নাহিদকে বসতে বলেন। অবশ্য নাহিদকে চিনতে পারলেও সাহিলকে চিনতে পারেন নি তারা। তবে পরিচয় পরে জানা যাবে। আগে বাড়িতে জামাই এসেছে, তাই আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে বলেন তিনি বাড়ির কাজের মেয়েটাকে। নতুন কাজে রেখেছেন মেয়েটাকে। ইদানিং অসুস্থ থাকায় নানান কাজে অসুবিধা হয় উনার তাই। মেয়েটা কিচেনে চলে গেলে তিনি দুই মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আরশিকে কোথায় পেলো, দুজন এক সাথে কিভাবে হলো - সেসব জানতে চাইলে প্রাণেশা আরশিকে ইশারা করে চুপ থাকতে বলে। সে যতটুকু দরকার ততটুকুই জানায়। কিছুদিন আগে ভাইয়ের দেখা পেয়েছে কোনোভাবে, তার সাথে বাবার বাড়ি গিয়েছিল বেশ কিছুদিন। সেখান থেকে ভাইকে নিয়ে আজ এখানে আসার কথা চিন্তা করলে ভাবে আরশি আপুও আসুক তার সাথে। সেই ভাবনা থেকেই দুজনে একসাথে এখানে এসেছে - এমনটাই জানায় সে দক্ষ হাতের ইশারায়। এ বাড়ির প্রত্যেকে তার সবরকম ইশারা বুঝে। তাই সমস্যা হয়না সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ কথা বললে। মামা শান্ত হয়ে নির্লিপ্তভাবে বসে ছিলেন পাশে। বাবা মেয়ের মধ্যে নীরব অভিমান চলছে। যা তারা দুজনেই টের পাচ্ছে শুধু। কিন্তু প্রাণেশার কথায় মামা-মামী দুজনে সাহিলের দিকে তাকায়। এতক্ষণে সাহিল নীরবতা ভাঙে।
গলা ঝেড়ে বলে,
“কেমন আছেন মামা? আমি সাহিল। মামণির ছেলে।”
তার কথা শুনে চোখে মুখে গাম্ভীর্য নিয়ে তাকান আজমান আহমেদ। প্রাণেশার কথাগুলো শুনার পর থেকেই গম্ভীর বনে গেছেন তিনি। বোনের শশুর বাড়ির লোক, বা তার বৈবাহিক জীবন - কোনোকিছুই তিনি ভালো চোখে দেখেন না। দুটোর প্রতিই বিতৃষ্ণা। যে জীবন তার বোনকে দুঃখ ছাড়া কিছু দেয়নি। সেই জীবন বা তার সাথে জড়িত মানুষজনও ভালো চোখে দেখার প্রশ্ন উঠেনা। তবে এই ছেলেটার কথা বলতো আলিজা। খুব মনে করতো এই ছেলেটাকে। কতো কেদেছে তার বোনটা ছেলের জন্য।
“আপনাকে দেখে ভীষণ ভালো লাগলো। মামণির মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। আপনার সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে ছিল। অনেকবার মামণিকে বলেছিলাম নানা-নানী, মামা সবার সাথে দেখা করাতে। বায়না করতাম। মামণি এটা সেটা বলে বুঝ দিতো। ছোট ছিলাম, বুঝতাম না তেমন।” কথাটা বলে কিছুটা হাসে সে। “যায় হোক, আপনাকে ফাইনালি দেখতে পেয়ে ভীষণ ভালো লাগলো মামা।”
আলিজার ছেলেকে উপেক্ষা করতে পারলেন না আজমান আহমেদ। ছেলেকে খুব ভালোবাসতো কি না তার বোনটা! বোনের প্রিয় ছেলেকে উপেক্ষা করার মতো সাহস করতে পারলেন না। নরম কণ্ঠে বলেন,
“আমারো ভালো লাগলো। প্রাণোকে নিয়ে এসে খুব ভালো করেছ। যায় হোক, তোমরা বসো। খাওয়া দাওয়া করো। আমি একটু উঠছি। জরুরী ফোন আছে।” কথাটা বলে তিনি উঠে যান। কিন্তু সবার চোখে ধরা পড়লো উনার চোখের কোণের পানিটুকু। আরশি বাবার পেছন পেছন চলে যায়।
তার মা স্বামীকে এভাবে উঠে যেতে দেখে চিন্তিত হয়ে নিজেও যেতে চাচ্ছিলেন। তবে মেয়েকে বাবার পেছনে ছুটতে দেখে আর যান না। এখন বাবা মেয়ের মুহুূর্ত কাটবে ওখানে, তা বুঝতে পারেন। তাই তাদের একা ছেড়ে দেন। আরিভ, প্রাণেশা, নাহিদ আর সাহিল - সবাই মিলে খোশগল্পে মেতে উঠে। সাহিল আর নাহিদ প্রাণেশার মামীর সাথে ভালো মন্দ কথা বলেন। তারপর আরিভের সাথে খুনশুটিতে মেতে উঠে। তার ভীষণ খুশির দিন আজ। অনেক অনেক আকাঙ্ক্ষিত দিন। সে তো খুশি হবেই। তাকে নিয়ে মজার ছলে নানা গল্প করতে থাকলেও নাহিদ বউ আর শ্বশুরের মধ্যে কি কথা হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে চিন্তিত। এক পর্যায়ে সেও উঠে যায়। শাশুড়িকে বলে চলে যায় তাদের মাঝে। জামাই-মেয়ে দুজনে মিলে ক্ষমা চাইলে, মেয়েকে সুখে রাখার প্রতিজ্ঞা করে বাবা ডাকলে, সাথে নানা হওয়ার সংবাদটা পেলে মেনে না নিয়ে যাবে কোথায়? আর হলোও তাই। দুই মেয়ের কাছেই সুসংবাদ পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েন তারা।
সাহিল বিকেলে তাদের বাড়ি আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রাণেশাকে নিয়ে চলে আসে। তবে প্রাণেশার মামা বিনয়ের সঙ্গে সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন - তার পক্ষে ফারদিনদের বাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়। তবে সাহিলকে তাদের বাড়ি মাঝে মাঝে আসতে বলেন। সাহিল এতেই বুঝে গিয়েছে, মামণির জন্য তাকে সাদরে গ্রহণ করলেও। তার বাবাকে কিংবা বাকিদের ক্ষমা করছেন না মামা। এই ব্যাপারে বাড়ির লোকেদের কিংবা বাবার হয়ে আর কোনো সাফাই গাইনা দুই ভাইবোন। নিজেরা যেখানে এই বিষয় নিয়ে আপনজনদের ক্ষমা করতে অপারগ। সেখানে অন্য কারো কাছে তাদের হয়ে সুপারিশ করার মানে হয়না। বাকিরা চলে গেলেও আরশি থেকে যায় বাবা বাড়ি। প্রাণেশাকেও রেখে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রাণেশার স্বামীর অনুমতি নেই। আসলে, সে জানেই না যে প্রাণেশা আজ মামা বাড়িতে এসেছে। জানলেও হয়তো বিশেষ কিছু বলতো না, কিন্তু বিকেলে তাদের নিজ বাড়িতে অতিথি আসবে। তাই এখানে থেকে যাওয়া চাইলেও সম্ভব নয়। এই কারণেই প্রাণেশা “স্বামীর অনুমতি নেই” বলে বিষয়টা কাটিয়ে যায়।
প্রাণেশার শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামী বিশেষভাবে তার বাবার বাড়িতে আমন্ত্রিত - এ কথা সে তাদের জানায় না। কারণ, তাতে তারা জানতে পারবে যে প্রাণেশা এখন শ্বশুরবাড়িতে থাকছে না, আর এই নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠতে পারে।
সে চায় না, এসব কথা শুনে তার স্বামী কিংবা শ্বশুর বাড়ি নিয়ে তাদের মনে কোনো বিরূপ ধারণা তৈরি হোক। যদি বিকেলে তারা ফারদিন বাড়ি যেত, তাহলে সবার সামনে বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে বোঝানো যেত। সুন্দরভাবে, সম্মান বজায় রেখেই। কিন্তু যেহেতু যাওয়া হচ্ছে না, তাই প্রাণেশা চুপ থাকাই বেছে নেয়। সাথে ভাইকে আর আরশি আপুকেও মানা করে দেয় জানাতে।
—————
অন্তিকরা এখন ফারদিনদের বাড়িতে। সঙ্গে এসেছে তার বাবা-মা আর দাদী। প্রাণেশার বাবা নিজে ফোন করে সবাইকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, কিন্তু বিভিন্ন কারণে সবার আসা সম্ভব হয়নি।
ড্রয়িংরুমে বসে আছেন তারা, সামনে টেবিল ভর্তি নানারকম নাস্তা আর পানীয়। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন এলে যেমনটা হয় সাধারণত। নানান সৌজন্যমূলক কথাবার্তা সেরে আসল কথায় অন্তিকের বাবাই আসেন প্রথম। নড়েচড়ে বসে গলা ঝাড়েন,
“বলছিলাম সজল সাহেব, এবার মূল কথায় আসা যাক? বিশেষভাবে নিমন্ত্রন যখন করেছেন, বুঝতে পারছি ঘটনা জেনেই আলোচনায় বসতে চাইছেন। তবে আজ আসার পরিকল্পনা আমাদেরও আগেই ছিল। তাই ভাবলাম, যেহেতু সবাই একসঙ্গে বসেছি। আমাদের দিকটা আগে তুলে ধরি?”
মাহমুদ সরোয়ারের কথায় বাকিদের কথাবার্তার হালকা গুঞ্জন থেমে যায়। উনার দিকে মনোযোগ দেন সবাই। প্রাণেশার বড় বাবাই অনুমতিটা দেন।
“জি অবশ্যই। মূল কথায় আসা যাক। আপনারা যা বলতে চান নির্দ্বিধায় বলুন।”
“বউ মা আপনাদের সবটা জানিয়েছে বুঝতেই পারছি। আমরা আসলে আজ আপনাদের কাছে তাকেই চেয়ে নিতে এসেছি। যেহেতু বিয়ের ঘটনা জানেন, তাই পুরোনো কথায় যেতে চাচ্ছিনা। আসল কথায় বলি। সেদিন কোনো কারণে হয়তো রেগে গিয়ে ছিল বউমা। কিংবা আমার ছেলেরই দোষ ছিল হয়তো। যায় হোক, প্রাণেশার বয়স কম। আমার বাড়িতেও ওর বয়সী দুটো মেয়ে আছে। অল্পতে নানান আবেগ-অনুভূতিতে যেমন খুশি হয়। তেমনি সামান্য কষ্টেও মন ভেঙে যায়। অনেক সময় না বুঝেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। প্রাণেশার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, বুঝতেই পারছেন।” একটুখানি থেমে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেন। তারপর শান্ত স্বরে আবার বলেন,
”তো যেটা বলতে চাচ্ছি, আমরা ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমার ছেলে ঠিক কি করেছে জানিনা। এখন যেহেতু ওদের মধ্যে সব মিটমাট হয়ে গেছে, তাই অতীত ঘেঁটে কোনো লাভ নেই। তবে তখন ছোট বড় যে ভুলই করেছে অন্তিক, তার জন্য ও বাড়ি ছেড়েছে। ভাগ্যক্রমে আপনাদের কাছে এসে না পড়লে এতে অনেক রকম বিপদ হতে পারতো প্রাণেশার। তাই আমার মনে হয়, এই ঘটনায় আমাদেরই ওর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। আর আমরা সেটাই করতে চাচ্ছি। আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। এখন যেটা চাইছি, সব ভুল বোঝাবুঝি আর অতীত পেছনে ফেলে, সসম্মানে ওকে ফিরিয়ে নিতে। ওর নিজের ঠিকানায়; শ্বশুরবাড়িতে। তবে অবশ্যই আপনাদের অনুমতি নিয়েই।”
উনার কথা প্রত্যেকে মনোযোগ দিয়ে শুনেন। তৎক্ষণাৎ কিছু বলেন না। কিছুটা নড়েচড়ে বসে নীরবতা ভাঙে প্রাণেশার বাবাই,
“আপনার কথা বুঝলাম। যায় হোক না কেন, এভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসা আমার মেয়ের ভুল ছিল। যেকোনো বিপদ হতে পারতো। কিন্তু ভাই সাহেব, আমি আসলে ভীষনরকম কৃতজ্ঞ এই কারণে আপনার ছেলের কাছে। কাল ওর বিয়ের বিষয়টা জানার পর থেকেই আপনাদের প্রতি কৃ্তজ্ঞতা আসছে। আমার মেয়েটা আবেগে এই ছোট্ট ভুল না করলে হয়তো আজও আমি, আমরা ওর দেখা পেতাম না।” বলতে বলতে গলা ধরে আসে উনার। তারপরও বলেন, “সেসব দিকে যাচ্ছিনা। কিন্তু কিছু ভুল জীবনে আসলেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এভাবে মাফ চাইবেন না প্লিজ। যা হয়, সব কিছুর একটা না একটা ভালো দিক থাকে এটা তো বুঝলেন। তাই মাফ চেয়ে আমাদের এভাবে ছোট করবেন না।”
“হ্যাঁ, ভাই। এভাবে মাফ চাইতে হবেনা আপনাকে। তবে আপনারা আজই নিয়ে যেতে চাইছেন কি প্রাণেশাকে? আরেকটু সময় নিলে ভালো হতোনা? আমাদের বংশের একমাত্র মেয়ে ও। বিয়ে ধুমধাম করে দেওয়ার ভাগ্য তো হলোনা আমাদের। মেয়েটাকে কাছে পেলামও বেশিদিন হয়নি। দাদা হওয়ার সুসংবাদটাও নিশ্চয় জানেন। তো চাইছিলাম, প্রথম সন্তানটা এবাড়িতে থেকে ডেলিবারি করলে ভালো হয়না? আমাদেরও একমাত্র মেয়ে। বুঝতেই পারছেন, কিছু শখ আহ্লাদ তো আছেই।” প্রাণেশার বড় বাবা আবদারটা রাখেন সহজভাবেই।
অন্তিক এতক্ষণ মাথা নামিয়ে বসেছিল সবার মাঝে। মন দিয়ে শুনছিল প্রত্যেকের নিজ নিজ বক্তব্য। কিন্তু শেষ কথাটা শুনে তড়াক করে মাথা তুলে। গম্ভীর চেহারার কপালটাই কয়েকটা ভাঁজও পড়ে। সবার দিকে তাকায় সে। চেহারা দেখে বুঝার চেষ্টা করে কে কি ভাবছে এই বিষয়ে। ফারদিন বাড়ির প্রত্যেকে আশাবাদী প্রাণেশার ডেলিবারি এ বাড়ি থেকে হওয়া নিয়ে। অন্তিকের বাবা-মা, আর দাদী কিছুটা ইতস্তত করেন এই পর্যায়ে। তারা মোটেও চান না এমনটা। কিন্তু ফারদিন বাড়ির প্রত্যেকের উৎসুক চেহারা দেখে ‘না’ বলার সাহস করতে পারেন না। অন্তিক তা বুঝে নেয়। তাই কোনো রাখঢাক না করে বলে দেয়,
“এটা তো সম্ভব না আঙ্কেল। ও বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল আজ অনেকগুলো দিন। বুঝতেই পারছেন অনেকদিন ধরে ওকে ছাড়া থাকছি। এখন বাচ্চা হওয়া অব্দি এই বাড়িতে থাকা মানে তো বেশ অনেকগুলো মাস। তাছাড়া আপনাদের মেয়ে এখনো আমাকে বাচ্চা নিয়ে কিছুই জানায়নি। আমি নিজেই জেনে নিয়েছি সেদিন হামলার পর ঐ হস্পিটালে গিয়ে রিপোর্ট দেখে। অনেককিছু বাকি এখনো। আমি আজই ওকে সাথে নিতে চেয়েছিলাম। আর আপনারা এতগুলো মাস রেখে দিতে চাচ্ছেন!!”
অন্তিকের সোজাসুজি কথায় কিছুটা ইতস্ততবোধ করে প্রত্যেকে। তার কথায় স্পষ্ট যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সাধারণ আলাপটুকুও তারা এই অব্দি করতে পারেনি। প্রাণেশাকে তারও দরকার। কিন্তু মেয়েটা তাদের সাথে এবাড়িতেও আছে অল্প কিছুদিন। দুপক্ষই কেমন গ্যাঁড়াকলে পড়ে গেলো এ পর্যায়ে।
অন্তিককে ভালোরকম পর্যবেক্ষণ শেষে সাহিল গা ঝাড়া দিয়ে বসে। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“এবার আমি কিছু বলি? বোনের দুই বাড়িতেই অল্পদিন কেটেছে এটা তো ক্লিয়ার। তাই এবার ওকে নিয়ে টানাটানি না করে সিদ্ধান্তে আসা হোক। ও আর দুই/চার দিন থাকুক আমাদের সাথে। আজকেই চলে গেলে আমাদের ভালো লাগবেনা। দু, চারদিন পর আমি নিজেই ওকে দিয়ে আসবো। তাও বেশি সমস্যা হলে এ কদিন মি.অন্তিক নাহয় শ্বশুর বাড়িতেই থাকলো, আসলো-গেলো। আমার মনে হয়না এর চেয়ে সুন্দর সমাধান আর আছে এ মুহূর্তে।”
সাহিলের কথায় সবাই সম্মতি জানায়। ফারদিন বাড়ির প্রত্যেকের মন কিছুটা উশখুশ করলেও না মেনে উপায় নেই। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা অবহেলা করার মতো নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আর রা করলোনা কেউ। সবাইকে খাওয়া দাওয়া শুরু করতে বলেন প্রাণেশার দাদী। এসেছে অব্দি নাশ্তা মুখে তোলা হয়নি কারো। তাই এ পর্যায়ে সকলে মিলে খাওয়ার প্রস্তুতি নেন। তবে অন্তিক মানা করে দেয়। প্রাণেশা নাজিয়া আপুর সাথে উকি দিয়ে সব কথা শুনছিল। ভাইকে কারো কল পেয়ে এদিকে আসতে দেখে তারা সরে যায়। অন্তিকের ভালো লাগছেনা এসব খাওয়া-ধাওয়া। প্রাণেশাকে এসেছে অব্দি দেখতে পায়নি। তার উশখুশ লাগছে। এর মধ্যে হঠাৎ বাবার কণ্ঠ পেয়ে অস্থির মস্তিষ্ক শান্ত হয়।
“বলছিলাম, বউমাকে একটু ডেকে দিন এবার। ওর সাথে দেখা হয়নি এখনো অব্দি। ওকে নিয়ে এত আয়োজন, কথাবার্তা। অথচ এখনো দেখা পেলামনা।”
উনি বলতেই প্রাণেশার ফুফি ভেতরে গিয়ে ভাতিজিকে নিয়ে আসেন। প্রাণেশা ফুঁফির সাথে সাথে আসে গুটিগুটি পায়ে। তার লজ্জা লাগছে সত্যি বলতে। একটা ভুলের কারণে আজ কতকিছু। সবার মাঝে আসলে অন্তিকের দাদী নিজের পাশে বসান। তার চেহারায় হাত বুলিয়ে সে হাত নিজের ঠোঁটে ছোঁয়ান। আরও কি কি জানি করে এত তাড়াতাড়ি সুসংবাদ দেওয়ার জন্য সকলের সামনেই সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। প্রাণেশার তখন একদম গুটিয়ে ফেলে নিজেকে। অস্বস্তি আর লজ্জায় চোখ তুলেও তাকায়না কারো দিকে। দাদী আরও কি কি যেন উপদেশ দেন। প্রাণেশা সেসব খেয়াল করতে পারেনি। শেষকথাগুলোই কানে ঢুঁকে,
“শোন, দাদুভাইয়ের সাথে রাগ করে বাড়ি ছেড়েছিলি এই নিয়ে অনেক রেগে ছিলাম। কিন্তু সুখবর একটা দিয়ে সব রাগ মিলিয়ে দিয়েছিস। খুব বুদ্ধিমতি মেয়ে তুই। বড়দের ঝাড়ি থেকে বাচার জন্য আমার দিথী দিদিভাইয়ের মতো একদম নিঞ্জা টেকনিক এপ্লাই করা শিখেছিস। যায় হোক, বুদ্ধিখানা ভালোই ছিল।” কথাগুলো বলে প্রাণেশার কপালে চুমু খান আবার।
প্রাণেশার শ্বশুর তাকে কাছে ডাকে।
“শুনো মা, তুমি ছাড়া সরোয়ার বাড়ি খালি খালি লাগে। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। আর এবার থেকে আমার ছেলে কিছু করলে সোজা আমার কাছে আসবে বিচার নিয়ে। বুঝেছ?” মাহমুদ সরোয়ার হেসে কথাগুলো বলেন। তারপর স্ত্রীর কাছ থেকে একটা বক্স নিয়ে প্রাণেশার হাতে ধরিয়ে দেন। “এটা হচ্ছে তোমার বখশিশ। আমাদের সবাইকে সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার সংবাদ যে দিলে!! ওটার বখশিশ। আমি ভীষণ খুশি মা। রাখো এটা তুমি। আর অনেক বড় হও।”
প্রাণেশা এবারো চুপচাপ শুনে। আয়েশা আমিন তার হাত থেকে বক্সটা নিয়ে খুলেন। ডায়মণ্ডের ছোট পাথরের একটা নেকলেস আছে। সেটা প্রাণেশাকে পড়িয়ে দেন। তারপর কপালে চুমু খেয়ে সবার মতো নানান উপদেশ দেন।
“বলছিলাম, এবার অন্তিক দাদুভাইকে নিয়ে একটু রুমে যাও তো। এগারোটার দিকে বাড়ি এসেছিল। তারপর বিশ্রাম না নিয়ে আবার কাজে বেরিয়ে পড়েছে। দুপুরেও বাড়ি আসেনি, একেবারে এখানে আসার আগে বাড়িমুখো হয়েছে। একটু রুমে নিয়ে যাও দাদুভাইকে। বিশ্রাম নিক।” দাদী
উনার কথায় প্রাণেশার দাদীও সায় দেন। প্রাণেশা এতক্ষণে চোখ তুলে একপলক তাকায়। অন্তিকের চাহনিটা দেখে বুক ধক করে উঠে। সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নেয়। তারপর চলে যায় রুমের উদ্দেশ্যে। অন্তিকও এবার উঠে তার পিছু পিছু যায়।
——————
প্রাণেশা রুমে ঢুকে পেছন ফিরে অন্তিক আসলো কি না দেখে। এসেছে সে। প্রাণেশার পেছন পেছনই এসেছে। রুমে প্রবেশ করে তাকে দেখতে দেখতে সবার আগে পিঠ দিয়ে ঠেলে দরজাটা লাগায়। প্রাণেশা অন্তিকের সাথে দেখা হওয়া নিয়ে এক্সাইটেডই ছিল। কিন্তু ড্রয়িংরুমে সবাই মিলে বাচ্চার কথা তুলে এটা সেটা বলে লজ্জায় ফেলে দিলো। সে ইতস্তত করে তাকায় অন্তিকের দিকে। অন্তিক তার দিকেই চেয়ে ছিল বিছানায় একটু হেলে পেছন দিকে দুহাতে ভর দিয়ে বসে। সে তাকাতেই ভ্রু নাচায়। প্রাণেশা চোখ ফিরিয়ে নেয় তৎক্ষণাৎ। উর্ণা খুটতে খুটতে দাড়িয়ে থাকে। ভাবছে অন্তিক কিছু বলছেনা কেন? বিশ্রাম নেওয়ার হলে শুয়ে পড়তো। নাহয় ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি মেরে আসলেও শান্তি লাগতো। এভাবে বসে থেকে কি হবে? সে হাতে ইশারায় কিছু বলার উদ্দেশ্যে তার দিকে তাকায় আবার। তবে অন্তিককে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে থেমে যায়। লজ্জা, অস্বস্তি কাটিয়েই ফেলেছিল এক মুহূর্তে। কিন্তু আবার মিইয়ে গেলো। নিজেকে মন দিয়ে আপাদমস্তক খুটিয়ে খুটিয়ে কেউ দেখছে বুঝতে পারলে, যে কারোরই স্বাভাবিক থাকার কথা নয়। তবু সাহস করে হাতের ইশারায় কি জানতে চায়।
“ভাবছি।”
“কি ভাবছেন?” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
“উহুম, কিছুনা। এদিকে এসো।” সে এক হাত বাড়িয়ে প্রাণেশাকে কাছে ডাকে। প্রাণেশা এগিয়ে এসে তার হাতে হাত রাখে। অন্তিক সোজা হয়ে বসে ওকেও নিজের কোলে বসায়। এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাতে বাহু পেছিয়ে নিজের সাথে আগলে নেয়। প্রাণেশার এমন উষ্ণ আলিঙ্গনে নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠে। অন্তিকের ম্যানলি পারফিউমের ঘ্রাণটা নাকে ঠেকছে তীব্রভাবে। কোমরে রাখা হাতের স্পর্শ, আঙ্গুলগুলো একটু নড়চড় হলেও সে টের পাচ্ছে। অন্তিক প্রাণেশার চুল সরিয়ে ঘাড় উন্মুক্ত করে সেখানে চিবুক ঠেকায়। কয়েক সেকেন্ড সেভাবে থেকে স্পর্শ আরো গভীর করে, ঠোঁট ছোঁয়ায়। প্রাণেশা কেপে উঠে, অন্তিকের মাথায় হাত রেখে দৃঢ় করে।
“প্রাণো” অন্তিক সেভাবে মাথা রেখেই তাকে ডাকে।
“উম,” প্রাণেশা সম্পূর্ণরুপে ‘হুম’ উচ্চারণ করতে পারেনা। তবে চেষ্টা করে সাড়া দেওয়ার।
“আমাকে এখনো জানায়ওনি তুমি প্রাণো।” অন্তিক কথা বলার সাথে সাথে প্রত্যেকবার ঠোঁটের নড়ছড় হচ্ছে, আর প্রাণেশার গাঁয়ে স্পর্শ করছে। প্রাণেশা অন্তিকের চুলের ফাঁকে থাকা হাত আরও দৃঢ় করে অজান্তে।
প্রাণেশা মুখ দিয়ে নানানরকম শব্দ করে বোঝাতে চাই যে, ‘আপনি তো জানেন, কিছুক্ষণ আগেও ওখানে ছিলেন। আবার জানাতে হবে কেন!’ কিন্তু পরক্ষণে খেয়াল হয়, তার কথার কোনো অর্থ নেই। অর্থহীন এই ভাষা অন্তিক বুঝতে পারবেনা। শুধু অন্তিক কেন? কেউই বুঝতে পারবেনা। সেই মুহূর্তে ভীষণ আফসোস হয় তার। আগেও হয়েছে এমন। যতবার এমন আলিঙ্গন করেছে দুজনে, কিছুটা কাছাকাছি এসেছে - সেই প্রত্যেকবার হাতের ইশারায় করতে না পারলে, মনের কথা বোঝাতে ব্যর্থ হয় প্রাণেশা। সেদিন যখন তার সাথে ঘনিষ্ঠ হয় অন্তিক, তখনও যদি প্রাণেশা জোর দিয়ে মুখে ‘না’ বলতে পারতো। তাহলে সে নিশ্চিত অন্তিক থেমে যেত। তার সরাসরি অসম্মতিতে অন্তিক তাকে কাছে টানতো না। কিন্তু ঐ সময় তার ভাষা বলতে ছিল চোখের দৃষ্টি আর মাথা নাড়ানো। অন্তিক তখন অন্য ঘোরে ছিল। যার কারণে এসব চোখেও পড়েনি হয়তো। কতকিছু হয়ে গেলো সেদিনের ঐ ঘটনার কারণে। প্রাণেশার আজ মনে হচ্ছে, এই অব্দি ঘটে যাওয়া সকল সমস্যার মূল তার এই অপারগতা। এই অপারগতার কারণে ব্যক্তিগত পুরুষের সাথে আবেগ অনুভূতি আদান প্রদানে ব্যাঘাত ঘটে, প্রত্যেকবার এমন হয়; প্রত্যেকবার। কথাগুলো ভেবে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়।
“ওদের মুখে শুনে কি ঐ ফিল পাবো নাকি? যেটা তুমি বললে পাবো? বাচ্চার মায়ের কাছে বাবা হবো একথা শুনার অনুভূতি অন্যরকম। আমার বাচ্চার মা তো তুমি।”
প্রাণেশা থমকে যায়। বিস্ময়ে নড়চড় ভুলে যায়। অন্তিকের চুলের ভাঁজে থাকা হাত হালকা হয়ে উঠে। অন্তিকের দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকাতে মাথা নাড়তেই তার কালো কালো চুলগুলো চোখে পড়ে শুধু। কিছু মুহুূর্ত পর, কি হলো বুঝতে পেরে তার মুখে হাসি ফুঁটে। টুপ করে এক ফোটা পানি পড়ে চোখ দিয়ে। অন্তিকের গলায় গিয়ে পড়ে তা। সে সামান্য নড়ে উঠে উষ্ণ তরলের স্পর্শে। তবে মাথা তুলেনা।
প্রাণেশা মাথা ঝুকায়। অন্তিকের গলায় পড়ে থাকা তার চোখের পানির ফোটাটার পাশে আস্তে করে ঠোঁট ছুঁইয়ে একটা চুমু খায়। কয়েক সেকেন্ডের মতো ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখে মাথা তুলে নেয়। অন্তিক সামান্য করে মাথা তুলে প্রাণেশার দিকে তাকায়। দুজন খুব বেশি কাছাকাছি হওয়ায় নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে, হৃৎপিণ্ডের উঠানামা টের পাচ্ছে। অন্তিক তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“বাহ, বউয়ের দেখি উন্নতি হচ্ছে। নিজে নিজে চুমু খায়।”
কথাটা বলে প্রাণেশার কানের নিচে, গলার কাছাকাছি দুইবার ঠোঁট ছোঁয়ায় পরপর। প্রাণেশা চোখ বন্ধ করে ফেলে আবেশে। পরপর চোখ খুলে আবার অন্তিকের দিকে তাকায় সরাসরি। হুট করে আবার তার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে নিজের থেকে তাকে একটু দূরে সরিয়ে দেয়। তারপর নিজেই তার বুকে মুখ গুজে। অন্তিক বউয়ের কাণ্ড দেখে শব্দ করে হেসে উঠে। নিজে চুমু খেয়ে আবার নিজে লজ্জ্বা পাচ্ছে। সে হাসতে হাসতে বুঝতে পারে প্রাণেশা বুকের দিকে তার শাঁর্টের বোতাম খুলছে। হাসি থেমে যায়। কি হচ্ছে ব্যাপারটা? তার মাথায় উল্টাপাল্টা চিন্তা আসে। কিন্তু এই দিনের বেলায়, বাইরে সবাই আছে, একটু পর চলে যেতে হবে তাকে। এসব ভাবতে ভাবতে বুকে প্রাণেশার হাতের স্পর্শ পায়। ঠিক হাতের না; আঙ্গুলের। আশ্চর্য! তার বুকে আঁকিবুঁকি করতে বোতাম খুলে দিয়েছে মেয়েটা! বিরক্ত হয় নিজের ভাবনায়। কিন্তু পরপর মস্তিষ্কে কিছুর আঁচ করতে পেরে আঙ্গুলের স্পর্শগুলো অনুভব করে সে। যতক্ষণ সে আঙ্গুল চালিয়েছে তার বুকে, ততক্ষণ চুপচাপ অনুভব করে। প্রাণেশা থামতেই তার ঠোঁটে হাসি ফুঁটে। আরো আগলে নেয় মেয়েটাকে।
“আপনাকে ধন্যবাদ ম্যাডাম। খুব বড়সড় আর দামি উপহার দিতে চলেছেন। ইউ মেক মি ফিল কমপ্লিট এভরি টাইম। বাট দিস ওয়াস সামথিং ডিফ্রেন্ট। সম্পূর্ণ অন্যরকম।”
প্রাণেশা অবাক হয়। কারণ সে ভেবেছিল অন্তিক বুঝতে পারবেনা সে তার বুকে কি লিখেছে তা। আবার লিখতে হবে ধরেই নিয়েছিল ঠিকঠাক বুঝাতে। অথচ প্রথমবারেই বুঝে গেলো! যে সে “আপনি বাবা হচ্ছেন জনাব” কথাটা লিখেছে। আজকে বোধ হয় সে ক্ষণে ক্ষণে অবাক হতে হতেই দিন কাটাবে। এত ভালোবাসা কোথায় রাখবে সে? সবার এত এত ভালোবাসা। গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকে প্রাণেশা অন্তিকের বুকে। এর মধ্যে অন্তিকের ফিসফিস করে ‘সরি’ বলতে শুনে মাথা তুলতে চায়। কি হয়েছে জানতে হবে তো, এর মধ্যে আবার সরি কেন? কিন্তু অন্তিক তুলতে দেয়না। আগের মতোই আগলে রাখে। মনে মনে ভাবে,
যা ভেবে রেখেছিল মেয়েটাকে নিয়ে। তার কিছুই হয়নি। একটা ভুলের কারণে অন্য একটা সুসংবাদ পেল। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো, তার আর তার বাচ্চার কারণে অর্থাৎ সংসারের কারণে মেয়েটাকে নিজেকে খুইয়ে ফেলতে দেবেনা। আর যা ভেবে রেখেছিল তাও করবে। তার সন্তান পৃথিবীতে চলে আসলে, কিছু বছর সময় নিয়েই দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করাবে।”