মৌনপ্রেম

পর্ব - ৪৩

🟢

তোশা আর ইরফানের বিয়ে। যদিও প্রথমে হস্পিটালে কাজী আনার কথা ভেবেছিল অন্তিক আর ইরফান। পরে চিন্তা করে, বাড়ির উদ্দেশ্যে যেহেতু এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে। তাহলে যাওয়ার পথে কোনো একটা কাজী অফিস নামলেই ভালো হবে। সেই মোতাবেক সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তিক ইরফানের ডিসচার্জের ব্যবস্থা করতে যায়।

অন্তিকের অনেক রাগ ছিল ইরফানের প্রতি। ফাটা মাথা আবার ফাটিয়ে দেওয়ার জন্য হাত নিশপিশ করছিল তার। কিন্তু প্রাণেশা আর তার ঘটনা মনে পড়তেই উল্টে মায়া হয় ইরফানের জন্য। সে নিজেও আশেপাশে কি হচ্ছে, প্রাণেশা কি চাইছে কিছু জেনে নেওয়ার কথা একবারের জন্য চিন্তা করেনি। চিন্তা করবে কি করে। ঐ সময় তার মস্তিষ্ক অচল হয়ে পড়েছিল। যেকোনো ভাবে প্রাণেশাকে দরকার - এই কথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল তখন মাথায়। তাই ইরফানের বিষয়টা কিছুটা হলেও বুঝতে পারে। এমন সময়ে যে মাথা ঠিক থাকেনা, তা তার চেয়ে ভালো আর কে জানে? কিছু বলেনা তাই আগ বাড়িয়ে। চলে যায় সে। তোশার বাবা-মাকেও সে ভোরেই জানিয়ে দিয়েছিল যে, ইরফানের এ’ক্সি’ডে’ন্ট হয়েছে। আর তাদের মেয়ে সেখানে চলে এসেছে মাঝরাতে। কয়েক ঘণ্টা পর আবার ফিরেও যাবে।

ইরফান কেবিনের ভেতর একপাশে বসার যে চেয়ারগুলো আছে - সেখানে বসেছিল; অন্তিকের সাথে আলোচনা করছিল। সে চলে যেতেই বেডে ঘুমিয়ে থাকা তোশার দিকে তাকায়। ঘুমের মধ্যেও হঠাৎ হঠাৎ ফুঁফিয়ে উঠছে সে। দুজনে ফ্রেশ হলে, আবার ইরফানের বুকে মাথা রেখে আবোল তাবোল কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছিল তখন। অথচ ইরফানের চোখে তখন থেকে একটুও ঘুম নামেনি। যা করেছে হুশ খুইয়ে, তা মোটেও উচিত হয় নি। এতগুলো বছর যখন সংযত থাকতে পেরেছিল। তখন শেষে এসে এসব একেবারেই ঠিক হয়নি। সে নিজেও জানে - তোশা এখন একটা সুন্দর জীবনের লোভে পরে তার কাছে আত্মসমর্পণ করলেও। তাকে ক্ষমা কোনোদিন করতে পারবেনা। কাল এতটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া উচিত হয়নি। একেবারেই উচিত হয়নি। কিন্তু সেও মানুষ। তার সামনে এলোমেলো হয়ে দাড়িয়ে, কাঁদতে কাঁঁদতে ভালোবাসার দাবি জানাচ্ছে একটা মেয়ে। কখনো বুকে এসে পড়ছে, তার আঘাত দেখে কাঁদছে, কখনো যত্ন করছে, আবার আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। এসব নেওয়া যায়? যেখানে আগে থেকেই মেয়েটার উপর তার কু’নজর। চেষ্টা অনেক করেছে তাকে দূরে সরানোর। নিজেকে সংযত রাখার। কিন্তু মেয়েটা নিজেই বারবার উস্কে দিলে কি আর করার?

যখন ‘তাকে ভালো লাগছেনা কেন? তার চোখে অসুন্দর লাগছে কি না?’ এসব কথা জিজ্ঞেস করছিল তোশা। তখন আর কিভাবে প্রমাণ দিতো যে ঐ মেয়েকে নিয়ে তার চিন্তা ভাবনা মুখে প্রকাশ করার মতো নয়। তাছাড়া, তখন তার বেশ মাথায় ছিল যে কেবিনের দরজা বন্ধ, কেউ নেই, সবাই ঘুম, সে আর তোশা একা। এই কথাগুলো তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাও এড়িয়ে গিয়েছে শুধুমাত্র তোশার কথা ভেবে। অথচ তোশা নিজেই তার কাছে এটেনশন চাচ্ছিল বারবার। যেভাবে সে ইরফানকে দেয়, সেভাবে একটু গুরুত্ব চাচ্ছিল। তো দিলো…… তোশার মতো না হোক। নিজের মতো করে বুঝিয়ে দিলো কতটা ডেস্পারেট হয়ে আছে তার ভেতরটা ঐ মেয়েটাকে কাছে পাওয়ার জন্য।

তিনজনে কাজী অফিস যাওয়ার আগে একটা মলে ঢুকে। তোশার পছন্দে শাড়ি কিনে নেয়। সে বউ না সেজে বিয়ে করবেনা। অবশেষে বিয়ে হচ্ছে তার। তাও ইরফানের সাথে। এই কথাটার আগে কিছু ভাবতে পারছেনা সে। তার বয়স বোধ হয় স্বপ্নের জীবন পাওয়ার আশায় দশ বছর কমে গিয়েছে। আর নাহয় মানসিক কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। নয়তো এতকিছুর পরও, সেই ইরফানকে বিয়ে করার খুশি কিভাবে থাকে তার মনে? কি করে এত বড় একটা দূর্ঘটনা তার মনে একটুও প্রভাব ফেলছেনা? ভান করছে না তো? নাকি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে ইরফানের কাছে নিজের কোনোকিছুই গোপন নেই - কথাটার সাথে? তাই সেভাবে যায় আসছেনা তার। আসলেই?

হাসিমুখে শাড়ি পছন্দ করছে তোশা নিজের জন্য। ইরফানের মনে কিছুটা ভয় ঢুকছে। এত সহজ সবকিছু? তোশা এত সহজ কি করে আছে? মেয়েটা কি পাগল হয়ে গেলো? হঠাৎ একটা প্রশ্ন জাগে তার মাথায়। আচ্ছা তোশা কি এমন একটা পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল মানসিকভাবে? সে কি ধরেই নিয়েছিল? যে একদিন না একদিন ইরফান তার কাছ থেকে তার নিজের বাকি যা আছে সেটুকুও অন্যায়ভাবে কেঁড়ে নেবে? ইরফানকে এতটা চিনে নিয়েছিল? চিনে নাহয় নিলো। তাই বলে এতটা শান্ত? আদৌ ঠিক আছে মেয়েটা? তার হঠাৎ অন্তিকের সাথে চোখাচোখি হয়। দুজনের চোখে একই দ্বিধা। তবে অন্তিক ইরফানকে মানা করে দেয়, এই মুহূর্তে যেন আগে পরের কথা আর না তুলে। যা করতে চাচ্ছে করুক মেয়েটা।

পুরোটা সময় দুজনে চেয়েই দেখে তোশাকে। কানের দুল, চুড়ি, টিপ, খোপায় দেওয়ার জন্য ফুল, শাড়ি - সব কিনে নেয় ইরফান অন্তিক দুজনকেই নিজের সাথে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। সে কাজী অফিস যাওয়ার আগে পার্লার যাবে বলেছে। সুন্দর করে বউ সেজে তারপর বিয়ে করবে। ওরা তাও মেনে নিলো বিনা বাক্যে।

এরপর কথামতো পার্লার থেকে বউ সেজে, তারপর চলে গেলো কাজী অফিস। কাজী সাহেবকে সব তথ্য বুঝিয়ে দিলো অন্তিক। সাক্ষী যেহেতু শুধু সেই আছে তাদের তরফ থেকে। তাই বাকি সাক্ষী কাজী সাহেবই ঠিক করে দিলেন। কিছু সময় পর তোশাকে কবুল বলতে বললে সে সুন্দর করে বলে দেয়। পুরোটা সময় ইরফান চেয়ে ছিল তার দিকে। তোশাকে বউ বউ লাগছে। তবে কেন জানি এটা পুরনো তোশা নয় মনে হচ্ছে তার। ভয় লাগছে, বিপদের আভাস পাচ্ছে। এর মধ্যে কাজী সাহেবের আওয়াজ কানে আসে। তাকে কবুল বলতে বললো।

ইরফান শ্বাস টেনে তোশার দিকেই চেয়ে থাকে। তোশাও সে কবুল বলবে বলে চেয়ে আছে আগ্রহী চোখে, নরম চোখে।

“জীবনে প্রথমবার আমার কেন জানি ভয় করছে তোশা। তোকে নিয়ে ভয় করছে। তুই চোখের পলকে পাল্টে গেলি মনে হচ্ছে আমার। এমন ছিলিনা তুই। নিজেকে হারিয়ে ফেললি এক মুহূর্তেই। আমার কাছেই আছিস, তবু আগের তোকে হারিয়ে ফেললাম। কেন জানি মনে হচ্ছে - যেভাবে আমার খারাপ সময়ে আমার পাশে ছিলি তুই, এতগুলো বছর আমাকে যেভাবে দেখে রেখেছিলি! এবার থেকে সেভাবে আমাকেও তোকে দেখে রাখতে হবে। কিংবা তার চেয়েও বেশি। আজ বুঝতে পারছি। আমি তোকে যতটা না চেয়ে এসেছি এই অব্দি। তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি তুই আমি মানুষটার সাথে একটা ঘর বাধতে চেয়েছিস, সংসার করতে চেয়েছিস। আমি কথা দিচ্ছি তোশা - আমি তোকে দেবো একটা ঘর, একটা সংসার। কিন্তু এই শেষ মুহূর্তে এসে কিছু একটা হয়ে গেলো তোর। আমি আভাস পাচ্ছি তার। তোর সাথে অনেক অন্যায় করেছি এই অব্দি। কোনোদিন মাফ চাইনি। কিন্তু আজ চাইতে ইচ্ছে করছে। পারলে আমাকে মাফ করে দিস তুই।”

ইরফানকে নিজের দিকে আনমনে চেয়ে থাকতে দেখে তোশা ভ্রু উচায়। অর্থাৎ,

“কি সমস্যা? কবুল বলছিস না যে?”

ইরফান তার ইশারা দেখে মাথা নাড়ায়। যার অর্থ, “কোনো সমস্যা নেই।”

অন্তিকও তাড়া দেয়। ইরফান আর সময় নেয়না। তোশার হাত ধরে কবুল বলে সাইন করে দেয়।

—————————

ইশির খিদে পেয়েছে। কালকের দিনটা ভালো কাটেনি তার। রাতে ঠিকঠাক খেতে পারেনি। সকালেও নিচে নামেনি ব্রেকফাস্ট করতে। মা ডাকলে, পরে খাবে বলে মানা করে দিয়েছে। ঐ সময় বাড়ির সবাই উপস্থিত থাকতো সেখানে; দিগন্ত ভাইও। তাই সে যায়নি। দিগন্ত ভাইয়ের সাামনে পড়তে ইচ্ছে করছেনা তার।

আনমনে রুম থেকে বের হয়। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সামনে কাউকে পথ আঁটকে দাড়াতে দেখে দাড়িয়ে পরে। চোখ তুলে দেখে দিগন্ত ভাই। বিশেষ ভাবান্তর দেখা যায় না তার মধ্যে। যদিও মনে মনে অবাক হয়েছে দিগন্তকে এই সময় বাড়ি দেখে। ইশি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে দিগন্ত তার সামনে হাত বাড়িয়ে ধরে, পথ আঁটকে নেয়।

“কি সমস্যা?” দিগন্ত

“সেটা তো আপনি বলবেন। কি সমস্যা?” ইশি তার বাড়িয়ে রাখা হাতের দিকে ইশারা করে বলে।

“কাল রাতে খেতে নামিসনি। কফি নিয়ে রুমে আসতে বলেছিলাম। তাও আসলিনা। আজ সকালেও ডাইনিং এ দেখলামনা। সমস্যা কি তোর?”

“কাল রাতে আমি খাবার খেয়েছি দিগন্ত ভাই। আপনাকে দেখিয়ে দেখিয়ে খেতে হবে এমনতো কথা নেই। আর রাতে দিথীকে দিয়ে তো পাঠিছিলাম কফি। এখন প্লিজ পথ ছাড়ুন।”

“আমি তোকে বলেছিলাম কফি নিয়ে আসতে। দিথীকে বলিনি। আর এমন গা-ছাড়া ভাবে কথা বলছিস কেন? আমার কাছে একবারো এক্সপ্লেনেশন চেয়েছিস? কিছু না জেনে এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মানে কি?”

“আমার কিছু জানার নেই। আপনি প্লিজ পথ ছাড়ুন।”

দিগন্ত তার কথায় পাত্তা না দিয়ে বলে, “রুমে আয়। কথা আছে তোর সাথে।”

“বেয়াদবি করতে বাধ্য করবেন না প্লিজ। আমার ভালো লাগছেনা। পথ ছাড়ুন।”

ইশির কথা শুনে দিগন্ত শাণিত চোখে তাকায় তার দিকে। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে সেভাবেই বলে,

“কর বেয়াদবি। আমি দেখতে চাই।”

তার কথার ধরণ আর দৃষ্টি দেখে কিছুটা দমে যায় ইশি। চোখ নামিয়ে বলে,

“বাচ্চাদের মতো করছেন। আমার কিছু জানার ইচ্ছে নেই। খিদে পেয়েছে। নিচে যাবো। পথ ছাড়লে ভালো হয়। প্লিজ”

“বাচ্চাদের মতো করছি। করার কথা নয় কি? কাল মনের খবর অল্প একটু জানান দিয়ে আজ অচেনাদের মতো করছিস। ভুল বুঝে বসে আছিস। কিছু বলার সুযোগ দিচ্ছিস না। আর কি করবো?”

“আমি কাউকে ভুল বুঝিনি। আর আপনি কিসের মনের খবর বলছেন আমি বুঝতে পারছিনা। আমাকে যেতে দিন প্লিজ।”

চোখ বন্ধ করে নেয় দিগন্ত। আবার আগের রুপে ফিরে গেলো মেয়েটা। আবার ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে চাইছে। কিন্তু এবার তার আর ধৈর্য নেই। একেবারেই নেই। একদম না বুঝে থেকে গেলেও চলতো। সে নাহয় সময় করে নিজের করে নিতো মেয়েটাকে। তারপর ভালোবাসা আপনি আপনি হয়ে যাবে একসাথে থাকলে। কিন্তু তাকে প্রেমময় ইঙ্গিত দিয়ে, লোভ দেখিয়ে এখন নিষ্পাপ সাঁজা হচ্ছে। চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে, আবার ইশির দিকে একপলক তাকায় সে। তারপর হাত ধরে টেনে নিজের রুমে নিয়ে চলে যায়। ইশি কিছু বললেও শুনেনা। রুমে এনে দরজা বন্ধ করে দেয়।

“কি সমস্যা দিগন্ত ভাই? এসব কোন ধরণের পাগলামি। এভাবে রুমে নিয়ে আসার মানে কি?”

“অনেক সমস্যা, অনেক। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিস বারবার। আর জিজ্ঞেস করছিস কি সমস্যা?”

“আশ্চর্য! আমি কি করেছি?”

“করিস নি? এমন অবুঝ হয়ে যদি থেকেই যাবি। তাহলে কাল ঐ চোখে দিয়ে অন্য কিছু দেখিয়েছিলি কেন? আমাকে পুড়াতে এসেছিস? এত বছর পুড়িয়েও শান্তি হচ্ছেনা?”

ইশি দম আঁটকে বসে থাকে দিগন্তের এমন কথায়।

“দরকার পড়লে একেবারেই জানান দিবিনা নিজের মনের কথা। অবুঝই থেকে যাবি সারাজীবন। তাও ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে পরে থাকা চলবেনা। আমার সব কথা শুনতে হবে তোকে।”

“বলুন কি বলবেন।” থমথমে কণ্ঠে বলে ইশি।

“কালকের ঐ মেয়েটা আমার বন্ধু হয়। মেঘলা নাম ওর। কলেজ জীবনের বন্ধু। আমরা ভাই বোনের মতো। অন্য কোনো কিছু নেই যে সেই উদ্দেশ্যে হাত ধরবে। তাছাড়া, আমাদের আরেক বন্ধু রাজীব। সে মেঘলাকে পছন্দ করে। মেঘলা ডিভোর্সি। রিসেন্টলি ডিভোর্স হয়েছে ওর। তাই এর মধ্যে অন্য এক সম্পর্কে যেতে ভয় পাচ্ছে। রাজীবের সাথে দেখাও করতে চাইনা। বিশ্বাস করে ফেলবে, পছন্দ করে ফেলবে - এই ভয় থেকে। রাজীব অনুরোধ করেছিল, যেন কোনোভাবে আজ তার সাথে দেখা করিয়ে দিই। তাই রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। মেঘলা অন্য কোনো মানসিকতা নিয়ে আমার হাত ধরেনি ইশি। আমাদের মধ্যে ভাই বোনের মতো সম্পর্ক আগে থেকেই। দিথী, অয়ন্তির মতোই ভাবি ওকে।”

ইশি সব কথা শুনেও কিছু বলেনা। দিগন্ত তাকে সময় দেয় স্বাভাবিক হতে। কয়েক মুহূর্ত কেটে যায়। এরপর ইশি দাড়িয়ে পরে আস্তে ধীরে।

“আমি আসি। খিদে পেয়েছে।”

দিগন্ত মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে ইশির মনে কি চলছে তা। কিন্তু এখনো আগের চেহারা তেমন পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেনা। তাই যেতে দেয়না তাকে। হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে আসে। পুরো চেহারায় চোখ বুলিয়ে নরম স্বরে বলে,

“এখনো অভিমান কি কারণে?”

“অভিমান করতে যাবো কোন দুঃখে?”

“আচ্ছা? এখনো লুকিয়ে বেড়াবি?”

“আমি কিছু লুকাচ্ছিনা।”

“আমার ভুলটা বল। নাহয় যেতে দেবনা।”

ইশি তাও উত্তর দিচ্ছেনা দেখে দিগন্ত দম নেয়। কয়েক মুহূর্ত ইশিকে দেখে, তাকে নিজের দিকে আরেকটু এগিয়ে নেয়। মাথা নামিয়ে নিজেকে তার বরাবর করে। পুরো চেহারায় চোখ বুলিয়ে তার কানের কাছে মুখটা এগিয়ে নিয়ে বলে,

“আমার প্রতি এত উদাসীনতা দেখাসনা ইশি। এভাবে আমাকে উস্কে দিচ্ছিস তুই। এমনভাবে নিজেকে তোর সামনে জাহির করবো, যে দিনরাত মন মস্তিষ্কে শুধু আমার কথায় আসবে। পাশে পেতে মন চাইবে, কাছে পেতে ইচ্ছে করবে। ঠিক যেভাবে আমার চায়।

এত উদাসীনতা দেখিয়ে আমাকে নিজের ছাপ তোর উপর ফেলতে উস্কে দিচ্ছিস।”

ইশি চোখ তুলে তাকাবে তার আগে কানের কাছে দিগন্তের ধিমি কণ্ঠ শুনে আবেশে চোখ বুজে নেয়। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে সে। কথা বলার সময় কানের সাথে লাগছিল বারবার দিগন্তের ঠোঁট দুটো। কেমন অস্থির লাগছে। কিছু মুহূর্ত পর আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখে দিগন্ত এখনো সেভাবেই আছে। তার চেহারাটাই দেখছে মন দিয়ে। ইশি ঢোক গিলে পরপর ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। কোনোভাবে বলে,

“দূরে যান প্লিজ।”

দিগন্ত তাকে দেখতে দেখতে দূরে সরে যায়। তবে সরে আসতে সময় ইশির কানের নিচ বরাবর গলায় অল্প একটু ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়।

সাথে সাথে চোখ দুটো বন্ধ করে আবেশে মাথাটা একটু কাঁত করে নেয় সে। হাতটা আপনা-আপনি দিগন্তের বুকে শাঁর্টের উপর চলে যায়। আঁকড়ে ধরে ওখানটা। শরীরটা কেমন অসাড় লাগছে তার। তাও সময় নিয়ে কোনোভাবে বলে,

“আপনি আমাকে মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করতেও কতরকম নিষেধাজ্ঞা দেন। ছেলেদের কথা তো বাদই দিলাম। একটু কোথাও ঘুরতে গেলেও কতো সমস্যা আপনার। আর নিজে মেয়ে বান্ধবীর হাত ধরে ধরে ঘুরে বেড়ান। অথচ আমি এসব আগে জানতামো না। আমি ভেবেছিলাম আমার মতো নিজেও মেয়ে মানুষের থেকে দূরে থাকেন। যদি জানতাম আপনি আমাকে এত এত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নিজে ঠিকই সব করছেন। তাহলে আপনাকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবার কথা মাথায়ও আনতাম না।”

দিগন্ত তাকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে ভ্রু কুচকে কথাগুলোও শুনে। ইশির বলা শেষ হতেই সে চোখে হেসে উঠে।

“আমার হাতে মেঘলার হাত দেখে তোর খারাপ লেগেছে?”

ইশি জেদি ভাবে মাথা নাড়ায়, “না”

“হ্যাঁ।”

ইশি চুপ করে থাকে। সে মূলত মুখ খুলতে চাইছেনা। এদিক সেদিক কিছু বলে দিলে, দিগন্ত ভাই প্রশ্রয় পেয়ে যাবে। তাকে কথার জালে ফাসিয়ে আবার অনুভূতির ঝড় তুলে দেবে।

“আমাকে নিয়ে তাহলে অন্য কিছুও ভেবেছিলি।” দিগন্ত

“ভাবিনি।”

“এইতো বললি ভেবেছিস।”

ইশি উত্তর দেয় না। কথাগুলো বলার সময় ভুলে এই কথাটাও বলে ফেলেছে। আটকাতে পারেনি। ইশি বারবার নিজেকে সংযত করছে দেখে দিগন্ত এবার সরাসরি বলে,

“ভালোবাসি তোকে ইশি। অনেক আগে থেকে। কিন্তু তুই সেসব বুঝতিনা। তোর গণ্ডি যদি আমি নিজ অব্দি সীমাবদ্ধ না রাখতাম। তাহলে এর মধ্যে তোর মন অন্য কোথাও চলে গেলে, অন্য কারো প্রতি ভালোবাসা এসে গেলে। আমার কি হতো? বল?”

ইশি কোনো উত্তর দেয়না।

“নিজের জিনিস আগলে রাখতে হয়। বেশি ছাড় দিলে, অবহেলা করলে যদি আফসোস করতে হয় পরে! তাই নিজের জিনিস নিজে আগলে রেখেছি। ভুল করিনি একেবারেই। তুইও কেমন শিখে গেলি দেখ একদিনেই।”

ইশির এতেও মন ভরছেনা। কেন হাত ধরবে অন্য একটা মেয়ের। যতই বন্ধু হোক, বোন ভাবুক। আসলে তো নয়। সে অতোটাও মুক্তমনা মেয়ে নয় যে ব্যক্তিগত পুরুষের নিজের বান্ধবীদের হাত ধরে চলাকে স্বাভাবিকভাবে নেবে। একেবারেই নয়। ইশি ভীষণ পসেসিভ এসব ব্যাপারে। সে নিজেকে যতটা রক্ষা করবে ব্যক্তিগত পুরুষের জন্য। সে পুরুষকেও ঠিক সেভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হবে তার জন্য। এসব বিষয় তার কাছে মোটেও হেলাফেলা করার মতো নয়।

দিগন্ত ইশির মনের কথা বুঝতে পারে। হাসি ফুঁটে ঠোঁটের কোণায়। অবশেষে তাকে তার মতো করে চাইতে শুরু করলো তার স্বপ্নের প্রেয়সী। মুখটা তুলে চিবুকে হাত দেয় তার। নিজের দিকে ফেরায় ইশিকে। চোখে চোখ রেখে বলে,

“ঠিক আছে। আজ অব্দি এই ভুল ঠিক যতোবার করেছি, সেই প্রতিবারের জন্য মাফ চাইছি তোর কাছে। আর প্রমিস করছি, সামনে থেকে আর কোনোদিন এমন হবেনা। তুই ছাড়া বাকি সব সম্ভাবনাময় নারী নিজের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম আজ।”

——————————

প্রাণেশা অন্তিককে সকাল থেকে বেশ কয়েকবার মেসেজ দিয়েছে, কল করেছে। কিন্তু সে না মেসেজ সিন করছে, না কল রিসিভ করছে। ইরফান ভাইয়ার কি অবস্থা জানতে হবে তো তাকে! আজ বাড়ি ফিরবে বলেছিল। বেরিয়ে পড়েছে কি না কিছুই তো জানেনা সে। তাছাড়া কাল অন্তিককে কেদেকুটে অনেক কিছু জানিয়েছিল। এখন যে সেসব ঠিক আছে, ভাই যে তার সাথে আগের মতো ভালোবেসে কথা বলছে, যত্ন করছে। তাও তো জানাতে হবে! নাহলে শুধু শুধু আবার তার কারণে দুশ্চিন্তায় থাকবে। একথা কথা মাথায় আসতেই প্রাণেশার স্মরনে আসে বাড়ির কালকের পরিস্থিতির কথা।

—প্রেগ্ন্যান্সির বিষয়টা জানার পর থেকে বাবা-ভাইয়াসহ প্রত্যেকে প্রাণেশাকে নিয়ে অনেক চিন্তায় থাকে, তা সে বুঝতে পারে। অন্তিকের সাথে মান-অভিমান মিটে যাওয়ার পর সে ঠিক করেছিল ভাইকে সব জানাবে তার বিয়ের ব্যাপারে। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারেনি। তাছাড়া তেমন সময়ও কোথায় পেলো? এই তো দুদিন আগে সব ঠিক হলো তার আর অন্তিকের মাঝে। অন্তিক ফারদিন বাড়িতে বাবা-মাকেসহ নিয়ে এসে, তাদের ব্যাপারে জানিয়ে আগের মতো সব ঠিক করবে বললেও। প্রাণেশা চেয়েছিল তাদের আসার আগে নিজ থেকে বিয়ের বিষয়টা ভাইয়াকে জানাতে। সে অনুযায়ী কাল সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ছিল সাহিল। তখন গিয়ে তার পাশে অনেকক্ষণ বসে ছিল সোফায়। সাহিল ফোনে কারো সাথে কথা বলছিল তখন। বোনকে পাশে এসে বসতে দেখে তার মাথায় হাত রাখে। তারপর আবার ফোনে মনোযোগী হয়ে পড়ে। প্রাণেশা পুরো সময়টাই অনেক সাহস জোগায়। তারপর এক পর্যায়ে সাহিল ফোন কাটলে। সাথে সাথে ইশারায় জানায় তাকে কিছু বলতে চায় সে।

“হ্যাঁ, বল কি বলবি। শরীর খারাপ লাগছে? চেহারা এমন বানিয়ে রেখেছিস কেন?”

প্রাণেশার যতক্ষণ সে যা বলতে চাইছে তা বলতে পারছেনা, ততক্ষণ যেন শান্তি হচ্ছিল না। সে ভয়ে ভয়ে কিছুটা অস্থিরতা আর দ্বিধা নিয়ে বলে,

“তোমাকে কিছু বলতে চাই ভাইয়া। প্লিজ রাগ করবেনা। মন দিয়ে শুনবে।”(সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

সাহিল বোনের কথা শুনে হাসে। তার গাল টেনে দিয়ে বলে, “রাগ করবো কেন পাগলি। কি বলবি নির্দ্বিধায় বল। ভাইকে ভয় পাওয়ার কি আছে।”

ব্যাস, প্রাণেশা আগে পরে আর কিছু দেখেনা। এত কথা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে বোঝানো কষ্টকর। তাই ফোনে সে নিজের ব্যাপারে সব গুছিয়ে টাইপ করে রেখেছিল ভাইয়ের কাছে আসার আগেই। ওটা এগিয়ে দেয় সাহিলের দিকে।

সাহিল প্রাণেশার হঠাৎ ফোন এগিয়ে দেওয়ার কারণ না বুঝলেও, হাতে নিয়ে দেখে নোটপ্যাডে লম্বা করে কিছু টাইপ করা আছে। সময় লাগিয়ে পুরো লেখাটা পড়ে সে। প্রাণেশা পুরো সময়টা তার চেহারার ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করে। কিন্তু কিছু বোঝার উপায় নেই। প্রথম দিকে স্বভাবিকভাবে পড়লেও, কি ব্যাপারে লেখা আছে তা বোঝার পর যে গম্ভীর করেছে চেহারাটা। তা আর বদলালো না।

সে মামার বাসায় থাকতো, তারপর কিভাবে একটা বিয়েতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একজনের সাথে বিয়ে হয়ে যায়। সব লেখা আছে সেখানে। তারপর থেকে শ্বশুর বাড়ি ছিল অনেক দিন। এরপর কোনো কারণে স্বামীর সাথে ভুল বোঝাবুঝি হওয়ায় ওবাড়ি থেকে চলে এসেছিল। এসব ঘটনাও লিখেছে সে। ভাইয়ের গম্ভীর চেহারা দেখে সে চোখ নামিয়ে বসে থাকে। তার ভয় করছে। ভাইয়া কি ভুল বুঝলো তাকে? এতদিন এসব কিছু জানায়নি বলে? তাকে কি আগের মতো ভালোবাসবেনা? আগের মতো স্নেহের চোখে দেখবেনা? প্রাণেশার ভীষণ খারাপ লাগে ভাবনা গুলো মাথায় আসতেই। এত এত ভালোবাসা দিয়ে এখন সবাই যদি তাকে ভুল বুঝে ঘৃণার চোখে দেখে। তাহলে তা সে নিতে পারবেনা। এর মধ্যে ভাইয়ের গম্ভীর কণ্ঠ কানে আসে তার,

“এতদিন এসব কথা লুকানোর কারণ?”

ভাইয়ের মনে কি চলছে বুঝতে না পেরে প্রাণেশার ভেতরটা ভীষণ অস্থির লাগে। কিন্তু প্রকাশ করেনা। মনে মধ্যে ভয় আর উৎকণ্ঠা নিয়েই বোঝায়,

“আমি ভয় পেয়েছিলাম। তোমরা আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে জেনে। আমাকে আবার উনার কাছে, ওবাড়িতে দিয়ে আসবে ভেবে ভয় পেয়েছিলাম।”

তাদের কথোপকথনের মধ্যেই বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা সোফায় দুই ভাই-বোনকে এভাবে গম্ভীর হয়ে বসে থাকতে দেখে কি হয়েছে জানতে চায়। সাহিল উত্তর দেয়না। প্রাণেশাকে জিজ্ঞেস করলে সে টলমল চোখে তাকায়। সাহিল হাতে ফোন নিয়ে শক্ত হয়ে বসে আছে দেখে বড়মা ফোনটা নেয় তার থেকে। তারপর আস্তে ধীরে সবটা পড়ে হতবম্ব হয়ে বসে থাকে। বাকিরা কি হয়েছে জানতে চাইলে, তিনি হতবম্ব কণ্ঠেই বলেন। মুহূর্তেই কেমন থমথমে হয়ে উঠে পরিস্থিতি। সবাইকে প্রচণ্ড রকম বিস্মিত হতে দেখে প্রাণেশার টলমলে চোখের বাধ ভাঙে। সবার এমন ভাবভঙ্গি দেখে তার ভয়ে বুক কাপঁছে। এই যে সে এসেছে থেকে এত এত ভালোবাসলো সবাই। এত বিশ্বাস করলো তাকে। সব কি এক মুহূর্তে চলে যাবে? তার একটা মিথ্যার জন্য? সে নিতে পারছেনা। যারা তাকে এত বিশ্বাস করলো, এত ভালোবাসা দিলো অল্প কিছুদিনেই। তারা হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নিলে সে নিতে পারবেনা। তাদের সামনে প্রকাশ না করলেও, এত এত ভালোবাসা সে আদতে কোনোদিন পায়নি এত বছরের জীবনে। তারা সবাই যদি তার সত্য লুকানোর কারণে মুখ ফিরিয়ে নেয়? প্রাণেশা মনের ভেতর একরাশ ভয় নিয়ে, অস্থির হয়ে ফোনটা আবার নিয়ে সেখানে টাইপ করে,

“আমাকে ক্ষমা করে দাও প্লিজ। আমি লুকাতে চাইনি কিছু। কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম তোমরা আমার বিয়ের ব্যাপারে জানলে, আবার সেখানে পাঠিয়ে দিতে চাইবে ভেবে। আমি উনার কাছে ফিরতে চাচ্ছিলাম না তখন। তোমরা আমি এখানে আছি এ কথা উনাকে জানিয়ে দিলে, আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলে যেতো। তাই ভয় পেয়েছিলাম। আমাকে প্লিজ তোমরা ভুল বুঝোনা।”

সে লেখাটা টাইপ করে ভাইয়ের কাছেই দেয়। সাহিল পড়ে। তারপরও মুখ খুলেনা। পাশ থেকে তার বাবা ফোনটা নিয়ে বাকি লেখাটুকু পড়ে। এর মধ্যে দাদী নাজিয়াকে বলে যেন ওখানে কি লিখেছে নাতিন তা তাকে পড়ে শোনায়। নাজিয়া পড়ে শুনালে বাকিরাও শুনে সেসব। প্রাণেশা তখন একটু পরপর ফুঁফিয়ে উঠছে।

“ওবাড়ির মানুষরা তোর গাঁয়ে হাত তুলতো?” সাহিলের গম্ভীর প্রশ্নে প্রাণেশা চোখ তুলে তাকায়। তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বোঝায়।

হাতের ইশারায় বলে, “না না। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি, দাদী, ননদ-দেবর সবাই খুব ভালো মানুষ। সবাই আমাকে খুব স্নেহ করে। গাঁয়ে হাত তুলে না? সবাই খুব ভালো।” বাকিরা বুঝতে পারছেনা দেখে নাজিয়ার থেকে ফোনটা নিয়ে সেখানে আবার টাইপ করে কথাগুলো। নাজিয়া তা পড়ে শুনায় সবাইকে।

সাহিল এবার তার দিকে তাকায়। ভ্রু কুচকে বলে,

“সবাই ভালো? আর যার সাথে বিয়ে হয়েছে সে?”

প্রাণেশা ঢোক গিলে হাতের ইশারায় বোঝায় ‘সেও ভালো’।

“তাহলে ওবাড়ি থেকে চলে এসেছিলে কেন?” বাবা

প্রাণেশা এ পর্যায়ে মাথা নামিয়ে নেয়। সময় নিয়ে ইতস্তত করে বোঝায়,

“আসলে, উনার সাথে রাগ করে চলে এসেছিলাম। তারপর আর ফিরবো না ঠিক করেছিলাম। তাই আপনাদের কাউকে জানায়নি এখানে এসে। তাছাড়া, আমি ওখান থেকে বেরিয়ে মামা বাড়িতেই যেতাম। মাঝে ভাইয়ার সাথে দেখা হওয়ায় এখানে চলে আসতে হলো।”

“দিদিভাই , কি করলে এটা। আমরা কতো খারাপ চিন্তা ভাবনা মাথায় এনে ফেলেছিলাম তোমার ধারণা আছে? হায় তওবা, বাচ্চাটাকে এতদিন জা’রজ ভেবে এসেছিলাম। আল্লাহ্‌ মাফ করুক। এমন কেউ করে?” দাদী

“আজ হঠাৎ এসব জানাতে ইচ্ছে করলো কি কারণে?” সাহিল

প্রাণেশা এই কথার উত্তর দেয়না।

“এখন তুমি এখানে। একথা সে জানে?” বাবা

প্রাণেশা মাথা নাড়ায়, “হ্যাঁ।”

“রাগ করেছিলে যে। ওসব মিটিয়ে নিয়েছো তো?” বড়মা

নত মস্তিষ্কে সায় জানায় প্রাণেশা।

“যাক। দেরিতে হলেও এসব শুনে রুহ ঠাণ্ডা হলো। কতো চিন্তায় ছিলাম তোমার ভবিস্যত নিয়ে। এভাবে আর কিছু লুকাবেনা কোনোদিন। তুমি স্বামীর কাছে না ফিরতে চাইলে আমরা কি জোর করতাম নাকি? পরিবারের কাছে কোনোদিন কিছু লুকাবেনা বুঝেছ?” বড়মা

“তুমি এবাড়ি চলে আসার পর তার সাথে দেখা হলো কখন? আর কিভাবে? বাড়ির বাইরে তো কোথাও যাওনি। গেলেও ভাইয়ের সাথে, দাদির সাথে। তাহলে সে তোমার খোঁজ পেলো কি করে?” বাবা

“আমি জানিনা। সেদিন হামলার পরই তো আমি নিজেকে ওবাড়িতে পায়। কিভাবে কি হলো, আমার খোঁজ কিভাবে পেলো - কিছুই জানিনা। তারপর ভাইয়া বললো উনি আমাকে এ’ক্সি’ডে’ন্টে’র ওখান থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর সেদিন আবার এবাড়ি আসলো ভাইয়ার সাথে। তখনও আমি আসতে চাইনি। তোমরা জোর করে উনার সামনে নিয়ে এলে। আমি ভয় পেয়েছিলাম তোমাদের সব জানিয়ে দেবে ভেবে। কিন্তু সেরকম কিছু করেনি। তারপর সেদিন বিকেলে আবার দাদির সাথে যখন বের হলাম, তখনও ওখানে ছিল। তখনই কথা হয়েছে।”

প্রাণেশার লেখাটা নাজিয়ার পড়ার সাথে সাথে সবাই যেন আরেকটা ঝটকা খেলো।

“কার কথা বলছিস তুই?” সাহিল ভ্রু কুচকে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে।

প্রাণেশা এতক্ষণ পর ভাইয়ের মুখভঙ্গি বদলাতে দেখে একটু স্বস্তি পায়। নাজিয়ার থেকে ফোনটা নিয়ে আবার লিখে,

“উনাকে চিনতে পারছনা? সেদিনই তো সাথে করে বাড়ি নিয়ে এলে তুমি। ভুলে গেলে?”

“অন্তিক সরোয়ার?” হতবাক হয়ে জানতে চায় সাহিল

“হ্যাঁ, আর কে হবে। উনার কথায় তো বলছি।” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

সাহিল হতবাক হয়ে বোনকে দেখে। তবে আর কোনো কথা বলেনা। সে একটা ঘোরের মধ্যে আছে। এতদিন কি কি চিন্তা করে এসেছিল! আর আজ এক মুহূর্তে সব অবান্তর, অর্থহীন ছিল জানতে পারলো। সে কি খুশি হবে? নাকি অখুশি হবে কিছুই বুঝতে পারছেনা। বাচ্চা বোনটা নাকি বিবাহিত। এতদিন তারা স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে এই ভয়ে জানায়নি। এখন স্বামীর সাথে সব ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছে বলেই জানিয়েছে তাদের। আসলেই বাচ্চা তার বোনটা। এমন পাগলামো নাহয় কেউ করে? সে কতকিছু ভেবে ফেলেছিল! কতো খারাপ চিন্তা করেছিল।

“প্রাণেশা মা, তুমি এতদিন এই কথাগুলো ভয়ে জানাওনি? কি একটা অবস্থা। বাড়ির একমাত্র জামাই এসেছিল সেদিন বাড়িতে। আমরা জানলামও না কিছু। এটা ঠিক করলে? আর এখন তো আর রাগ নেই স্বামীর প্রতি যতটুকু বুঝতে পারছি। তাকে এবার অন্তত শশুর বাড়ি আসতে বলো। আমরাও একটু দেখা করি। কি যে করলে মামনি! এসব কথা কেউ লুকায়?” বড়বাবা

প্রাণেশা খুব কেদেছে পুরো সময়টা। নাজিয়া নানীর কথায় তাকে নিয়ে বেসিনের কাছে যায়। চোখে মুখে পানি দিতে।

ঐ সময়টাই দাদী এসে সাহিলের পাশে বসে। তার মুখভঙ্গি লক্ষ্য করে বলে,

“কি হলো? এমন চেহারা বানিয়ে রেখেছিস কেন এখনো? আমাদের তো খুশি হওয়ার কথা। যা ভেবেছিলাম তেমন কিছুই হয়নি। বরং যা কিছু অজানা ছিল তাই ভালো হয়েছে। তাও এমন চেহারা বানিয়ে রাখার মানে কি?”

“চুপ করো তো। এই ব্যাপারে এখন কথা বলতে চাচ্ছিনা। যাও এখান থেকে।” সাহিল

“যাবো মানে? আমার তো তোর চেহারা দেখেই ভয় লাগছে? কোথাও উকিলের সাথেই বিয়ে হয়েছে জেনে মাথায় উল্টাপাল্টা চিন্তা আনছিস না তো? বোনকে তার কাছে বিয়ে দিবিনা বলেছিলি আমার বেশ মনে আছে। তুই ওদের ছাড়াছাড়ি করিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছিস না তো কোনোভাবে? এমন কিছু ভুলেও মাথায় আনবিনা সাহু। শুধু বিয়েই হয়েছে এমন নয় কিন্তু। নাতনির পেটে উকিলের বাচ্চা আছে এখন। তাই কোনো শয়তানি চিন্তা করবিনা।”

সাহিল হতবাক হয়ে তাকায় দাদির দিকে। সে কি এতোই গোয়ার নাকি যে না জেনে কথা একটা বলেছিল বলে এখন বোনের সংসার ভাঙিয়ে দেবে?

“তোমার মাথা ঠিক আছে? আমি আমার বোনের সংসার ভাঙবো এই সামান্য কারণে? আমাকে এতটা অ্যারোগেন্ট মনে হয় তোমার?” অবাক কণ্ঠে জানতে চায় সে।

দাদী সাহিলের চেহারা দেখে ইতস্তত করে বলে, “করতেও পারিস। তোর বিশ্বাস আছে কোনো? সোজা পথে কোনদিন হেটেছিলি, ত্যাড়া রাস্তা ছাড়া? তাছাড়া নাতনির সাথে উকিলের বয়স যাচ্ছেনা এমনটাও তো বলেছিলি।”

“তুমি প্লিজ এখান থেকে যাও। আমার মাথাটা গরম করে দিওনা। যাও এখান থেকে।” সাহিল বিরক্ত হয়ে কথাগুলো বলে। যদিও দাদির চিন্তা অবান্তর নয়। তার এমন নীরব হয়ে পড়াই দাদিকে চিন্তায় ফেলছে সে জানে। কিন্তু দাদী তার নীরবতার যেসব কারণ দাড় করিয়েছে। সেসব সত্য নয়। তার চুপ হয়ে পড়ার কারণ অন্তিক। সে ভাবতে পারছেনা লোকটা তার কাছে এতকিছু লুকিয়ে গেলো। তার বোনের স্বামী সে। অথচ এ কদিন এতবার দেখা হয়েছে, তাও তাকে একবার জানায়নি। লুকানোর কি আছে এখানে? তার বাচ্চা বোনটা নাহয় অকারণে ভয় পেয়ে বোকামি করেছে। কিন্তু অন্তিক? একটা প্রাপ্তবয়স্ক, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের মানুষ - তার কাছে এসব লুকোচুরি সে আশা করেনি। অন্তিক তার বোনকে কেমন চাই, কতটুকু চাই - তা সে বুঝতে পারছেনা।

তবে দাদী জানিয়েছিল, বোনের দিকে সে অন্তিককে আলাদা নজরে তাকাতে দেখেছে। অন্তিকের সাথে দেখা না হওয়া অব্দি কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছেনা সে। আর না নিশ্চিন্ত হতে পারছে।

দাদী চলে যায়। প্রাণেশাকে নিয়ে নাজিয়াও সেখানে আসে ততক্ষণে। তাকে দেখে সাহিল গম্ভীর স্বরে রুমে যেতে বলে। না কেদে রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে। আর কোনো কথা বলেনা তারপর।

ব্যাস। এরপরই প্রাণেশার মনে যত চিন্তা ঢুকেছে। ভাইয়া তার সাথে গম্ভীর স্বরে কথা বললো। আগের মতো আদুরে স্বরে ডাকলো না। সব ঠাণ্ডা মাথায় শুনলেও, এতদিন লুকিয়েছে বলে তাকে ভুল বুঝেছে। বাবাকেও গম্ভীর দেখাচ্ছে। বাকিরা তার সাথে সুন্দর করে কথা বললেও। বাবা আর ভাইয়া বললোনা। তাই পুরোটা রাত তার বাবা-ভাইয়ের ভালোবাসা হারানোর ভয়ে কাঁটলো। তারা দুজন তাকে ভুল বুঝলো। এই কথা মাথায় রেখে সে দুচোখে একটুও ঘুম নামাতে পারলো না। অন্তিককে কল লাগায়। প্রাণেশা কাদঁছে বুঝতে পেরে অস্থির হয়। কি হয়েছে জানতে চাইলে সে সবকিছু জানায়। ভিডিও কলে কাঁঁদতে কাঁঁদতে সে, সব কথা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে বোঝায়। সব শুনে অন্তিক জানায় কালই আসবে ফারদিন বাড়িতে। সব ঠিক করে দেবে আশ্বাস দেয়। তার বাবা-ভাইয়াও আগের মতো ভালোবাসবে তাকে, এসব বলে কোনোরকম স্বান্তনা দিয়ে ঘুমাতে বলে তাকে। কিন্তু প্রাণেশা কল না কেটে অতো রাতে অন্তিক বাইরে কেন জানতে চায়।

“ইরফানের এক্সিডেন্ট হয়েছে। সেখানে এসেছি। তেমন কিছু হয়নি। কাল সকালেই ডিসচার্জ করে দেবে। তুমি টেনশন করোনা। নিশ্চিন্তে ঘুমাও। কাল আমি যাবো তোমাদের বাড়ি। সব ঠিক করে দেবো। এখন রাখো, ঘুমাও। অনেক রাত হয়েছে।”

তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। রাতটা কেটে যায়। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে তার ক্ষণিকের দুঃখটুকুও কেটে যায়। কারণ সে ঘুমিয়ে পড়ার পর, বাবা এসেছিল তা সে বুঝতে পেরেছে। তখন ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন ভেবেছিল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে, বিরবির করে অনেক কিছু বলেছিল। তারপর মাথায় চুমু একে দিয়ে চলে যায়। সকালে উঠে বুঝতে পেরেছে সেসব স্বপ্ন ছিলনা। আর ভাইয়াও তার সাথে আগের মতো করে কথা বলছে, ভালোবাসছে। সাথে ভয় না পেয়ে, সামনে থেকে যেকোনো কথা নির্দ্বিধায় তাকে জানাতে বললো। তারপরের সময়টুকু খুব ভালো কেটেছে। প্রাণেশার কাছ থেকে অন্তিকের পার্সোনাল নাম্বার নিয়েছে সাহিল। তার কাছে যেটা ছিল সেটাতে কল ঢুকছিল না। যদিও প্রাণেশার কাছে যেটা আছে সেটাতে ঢুকলেও রিসিভ হচ্ছেনা। প্রাণেশা তাও দিয়ে দেয় নাম্বার নিশ্চিন্তমনে। তারপর অন্তিককে মেসেজ করে জানিয়ে দেয়,

“আপনি কোথায়। আমার মেসেজ সিন করছেন না। কলও রিসিভ করছেন না। ভাইয়া একটু আগে আপনার নাম্বার নিয়েছে। ওহ হ্যাঁ, আপনাকে তো জানায়নি। ভাইয়া আর বাবা আর রাগ করে নেই। তারা আগের মতো ভালোবাসছে আমাকে। একদম আগের মতো। আপনি ইরফান ভাইয়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরলে আমাকে কল দেবেন কেমন? আমি অপেক্ষায় থাকবো।”

মৌনপ্রেম পর্ব ৪৩ গল্পের ছবি