মৌনপ্রেম

পর্ব - ৪২

🟢

তোশা ইরফানের পাঠানো ভয়েস রেকর্ডিংটা শুনেছে। ওটা শুনার পর থেকেই নিজেকে থাপ্রাতে মন চেয়েছে শুধু। নিজের প্রতি ঘৃণা আসছে!! সে একাজ কি করে করলো? মাকে নিয়ে কথা শুনিয়ে দিলো? গালিটা ঠিক কোন দিক থেকে ইরফানের লেগেছে তা সে বুঝতে পারছে। মায়ের কথা আর ঐ গালিটা সাথে দেওয়ায় ইরফানের ভেতর কিছু একটা হয়েছে।

ইশ!! তার জন্য একটা মা আজ কিভাবে কষ্ট পেলো। ছিহ!! নিজের প্রতি ঘৃণা আসছে তার। ইরফান কেমন সাইকো ছেলে তা তো সে জানে। আগে বোঝা উচিত ছিল পাগলটা কোনো না কোনোভাবে অন্যকে কষ্ট দিয়ে নিজে শান্তিতে থাকতে চাইবে। হলোও তাই। মায়ের প্রতি আগে থেকে মনের মধ্যে পুষে রাখা যে রাগটা ছিল, তা তোশার কথাগুলোর কারণে তাজা হয়ে উঠেছে। তার ভুলের কারণে আজ ইরফানের মা এত কষ্ট পেলো। নিজের পেটের ছেলের কাছে এসব কথা শুনার চেয়ে দুঃখের, কষ্টের - আর কি হতে পারে? তার মায়ের কথা তুলে গালি দেওয়ায় কি থেকে কি হয়ে গেলো। এসব ভেবে আত্মগ্লানিতে ভুগছে সে। ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। আজ যদি সে থাকতো ইরফানের মায়ের জায়গায়। আর ইরফানের জায়গায় তার ছেলে, তাহলে? কেমন লাগতো তার? একটা মেয়ে হিসেবে সে খুব অনুভব করতে পারছে আন্টির কষ্টটা। আর যতো অনুভব করছে - ততো নিজের প্রতি রাগ আসছে, ঘৃণা আসছে।

আত্মগ্লানিতে কান্না পাচ্ছিল তার। সময়টা তখন রাত ১২ টা পার করেছে। ইরফানের প্রতিও রাগ হয় তার। সে বলেছে, আর ওমনি মায়ের কাছে জবাবদিহি চাইতে চলে গেলো? এমনিতে তো কোনো কথা গাঁয়ে মাখেনা। তার কথার গুরুত্বই দেয়না। আর যেই রেগে গিয়ে ভুল কিছু বলে ফেললো। ওমনি পাগলটার মাথার তার ছিড়ে গেলো। ইরফানের প্রতি রাগ থেকেই ফোন হাতে নেয়। উদ্দেশ্য কিছু কথা শুনিয়ে দেবে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে পুরান ঢাকায় একটা বাইক এক্সিডেন্টের নিউজটা দেখে মাথা হ্যাং হয়ে যায় তার। ইরফানের বাইক সে চেনে, খুব করে চেনে। তার বাইক, হেলমেট, শারীরিক গঠন - সব চেনে সে, সব। হাতের ঐ ব্রেসলেটটা? কার্ব চেইনের সিলভার কালার ঐ ব্রেসলেটটা ভুল চেনার প্রশ্নই উঠেনা।

——————

ইরফানের বাবা আর দিগন্ত বাড়ি ফিরে গিয়েছে। হসপিটাল থেকে দিগন্ত আগেই অন্য একটা কাজে ছুটি নিয়ে নিয়েছিল বলে, আজ অসময়ে এতক্ষণ এখানে থাকতে পেরেছে। তার কলেজ জীবনের বন্ধু রাজীব আর মেঘলার সাথে দেখা করার কথা ছিল। যদিও মেঘলার সাথে দেখাটা হলেও রাজীবের সাথে হয়ে উঠেনি। তার আগেই এখানে চলে আসতে হলো। অন্তিক আসতেই সে ইরফানের সব অন্তিককে বুঝিয়ে দিয়ে চলে যায়। তার মন-মেজাজও ঠিক নেই এখানে আসার আগে থেকে। ইশির বিষয়টা নিয়েই। ইশি তাকে ভুল বুঝেছে তা স্পষ্ট। মাত্রই হালকা একটু অনুভূতি জানান দিয়েছিল। এর মধ্যেই আরেক ঝামেলা। দিগন্ত ভীষণ উতলা মন নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়।

অন্তিক এসে ইরফানের সাথে কথা বলেছে। ঘটনা কি ছিল? হঠাৎ এক্সিডেন্ট করে ফেললো কি কারণে? সব জানতে চাই সে। যে ছেলে মদ খেয়ে টাল হয়ে ড্রাইভ করলেও এক্সি ডেন্ট করলো না আজ অব্দি। সে নাকি আজ অকারণে এক্সি ডেন্ট করে বসলো। অদ্ভুদ না? তার চেয়ে বড় কথা পুরান ঢাকা আসার কারণই খুজে পাচ্ছেনা সে। অন্তিক ভেবেছিল বিজনেসের কোনো ডিলের কারণে এসেছে, বা অফিসের যেকোনো ধরণের দরকারে। কিন্তু ইরফানের বাবাকে জিজ্ঞেস করে বুঝলো এখানে অফিসের কোনো রকম কাজ ছিলনা, যে ইরফানকে আসতে হবে। তাহলে এখানে কি কাজ? বিষয়টা ইরফানকে জিজ্ঞেস করলে, সে উত্তর দেয়নি প্রথমে। কিন্তু বন্ধুর প্যানপ্যানানিতে থাকতে না পেরে জানিয়ে দিলো,

“মায়ের সাথে দেখা করতে এসেছি।”

“আন্টি? আন্টি দেশে আছে?” অন্তিক ভ্রু কুচকে বলে।

“হ্যাঁ, লেদা বাচ্চাগুলোকে নিয়ে ঘুরতে এসেছে। আমার আবার অন্যের এত সুখ সহ্য হয়না। তাই মরিচ ডলা দিয়ে এসেছি মুখের উপর।” নির্লিপ্তভাবে বলে ইরফান

“তো হঠাৎ উনার সুখে মরিচ ডলা দেওয়ার ভাবনা আসার কারণ? তোশার সাথে লেগেছিস?”

ইরফান চোখ ঘুরিয়ে তাকায় অন্তিকের কথায়।

“লাগিনি; লাগাবো বলেছিলাম তাই রেগে গিয়েছিল। তারপর মা তুলে কথা শুনিয়েছে।” মিথ্যা বলেনি, নির্বিকার ভঙ্গিতে সত্যটাই জানিয়ে দিলো বন্ধুকে। অথচ এত বড় একটা কাণ্ড করে কতটা নির্লিপ্ত চেহারা বানিয়ে রেখেছে। অন্তিক দেখে নেয় - কিভাবে একটা মেয়েকে এমন বাজে ইঙ্গিতে কথা বলার পরও, একটা মানুষ নিজেকে নির্দোষ মনে করতে পারে। হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে কিছু বলতে যাবে। ওমনি একজন নার্স প্রবেশ করে কেবিনে। দুই বন্ধু হঠাৎ কে আসলো দেখতে তাকায়। তরুণী একটা মেয়ে। মেয়েটা নার্স। ইরফানের দায়িত্বে আছে এই নার্সটাই। ইরফান সেই শুরু থেকে নার্সটার উপর বিরক্ত। ইরফানের দিকে অন্য নজরে চেয়ে এসেছে সেই শুরু থেকে। অযথা তার কাছে এসে সমস্যা হচ্ছে কি না, কোথায় ব্যাথা হচ্ছে - এসব কথা জানতে চাইছিল মেয়েটা। ইরফানের ঠাটিয়ে চড় মারতে ইচ্ছে করছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করেছে। তাই ওকে আবার কেবিনে দেখে সে বিরক্ত হয়। অথচ নার্স মেয়েটা ইরফানের সাথে আবার অন্য একটা হ্যান্ডসাম পুরুষকে দেখে বিমোহিত হয়। সুদর্শন পুরুষ দেখলেই কুপোকাত হওয়ার বাতিক তার। দিগন্তকে দেখেও কুপোকাত হয়েছিল খুব। অথচ ছেলেটা তাকে পাত্তাও দেয় নি। সে এই মেয়েটাকে খেয়াল করেছিল কিনাও সন্ধেহ।

অন্তিকও তেমন খেয়াল করেনা মেয়েটাকে। নার্স এবার এসেছে দরকারি কাজেই। ডক্টর তাকে একটা প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিয়ে বলেছে ১০৪ নাম্বার কেবিনের পেশেন্টের কাউকে দিয়ে মেডিসিনটা আনাতে। সে এসে অন্তিকের সামনে দাড়ায়।

“এক্সকিউজ মি। ডক্টর বলেছেন এই মেডিসিনটা নিয়ে আসতে। পেশেন্টের জন্য দরকার।”

অন্তিক ভ্রু কুচকে তাকায়।

“এই রাতে মেডিসিন? মাথা ঠিক আছে? শুরুতে যখন মেডিসিন আনতে গিয়েছিল তখন দিল না কেন? এত রাতে এখন কোথায় গিয়ে খুঁজবো?”

“সরি স্যার। আসলে ডক্টর ভেবেছিলেন এটা আমাদের কাছে মজুদ আছে। তাই আপনাদের আনতে বলেননি প্রথমে। আর এটা ঘণ্টা/দেড় ঘণ্টা পর দিতে হবে পেশেন্টকে। মাত্রই দেখলাম যে মজুদ নেই। তাই সময় নষ্ট না করে জানাতে এলাম। উই আর রিয়েলি সরি ফর আওয়ার মিস্টেক।”

অন্তিক তাদের গাফিলতিতে বিরক্ত হলেও মেয়েমানুষের উপর তা দেখায় না। কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছেনা। সে ইরফানকে বলে চলে যায় প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে।

অন্তিক চলে গেলে নার্স মেয়েটা এদিক, সেদিক করতে থাকে। ইরফানের কেমন লাগছে, ব্যাথা কমেছে কি না, কোনো হেল্প লাগবে কি না - নানান কিছু জিজ্ঞেস করে মিনমিনিয়ে। কিন্তু তেমন সুবিধা তো করতে পারলো না। উল্টো ইরফানের চেহারা দেখে ভয় পেয়ে সে আস্তে করে চলে গেলো। সহ্যের শেষ সীমায় ছিল ইরফান। ভাগ্যিস চলে গিয়েছে নিজ থেকেই। নাহলে মেয়েটার চেহারার নকশা বদলে যেতো আজ।

মিনিট দশেক পর কেবিনে আবার কারো উপস্থিতি পেয়ে বিরক্ত চোখে তাকায়। তোশাকে দেখে কিছু মুহূর্তের জন্য থমকে যায় সে। চেহারার হাল বেহাল হয়ে আছে তার। চুলের ঠিক নেই, কাপড়ের ঠিক নেই। কান্নাভেজা চোখ-মুখের উপর সামনের দিকের কিছু ছোট ছোট চুল লেপ্টে আছে। মনে হচ্ছে যেন কোনো ছোট বাচ্চা প্রিয় বস্তুর জন্য কাঁদতে কাঁঁদতে অনেক ঝড় ঝাপ্টা পার করে এসেছে। সাদা রং এর পাতলা ফিনফিনে লেডিস শার্ট গাঁয়ে, যার উপরের কয়েকটা বোতাম খুলে পরে আছে। সাথে নমনীয় একটা প্লাজু। ঘুমানোর সময় এসবই পরে তোশা। ইরফান জানে। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে ওকে আপাদমস্তক দেখে নেয়। তারপর ঠিক যেমন ভাবে মাথা ফেলে শুয়েছিল এতক্ষণ, তেমন ভাবেই আবার শুয়ে পরে; নির্বিকার ভঙ্গিতে। তোশার সেসব অবজ্ঞা চোখে পরেনা। সে ইরফানকে দেখছে। হাতের তালুতে, বাম বাহুতে, মাথায়, বুকে, পায়ের গোড়ালিতে - সবখানে বড় ছোট ব্যান্ডেজ করা। কান্নার ধমক আসছে এখনো ভেতর থেকে। ইরফানের এক্সি ডেন্ট হয়েছে জানার পর। ঐ নিউজে সে কোন হস্পিটালে আছে দেখেই চলে এসেছে। বাড়িতে কেউ জানেনা। কিভাবে যে এই রাতে ড্রাইভ করে ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার পথ এসেছে তা একমাত্র সেই জানে।

ইরফানকে শুয়ে থাকতে দেখে ডাকে,

“ইরফান?” কান্নার ফলে গলার স্বরও বদলে গিয়েছে তার। খুব ভাঙা ভাঙা শুনালো।

কিন্তু ইরফানের কোনো হেলদোল হয়না। তোশা আবার ডাকে,

“ইরফান?”

তাও সাড়া দেয়না সে।

“ইরফান…… কথা বলছিস না কেন আমার সাথে?”

“ইরফান?”

এবার বিরক্তি নিয়ে তাকায় সে। এমনিতেও শুরু থেকে বিরক্ত সে নার্স মেয়েটার কাণ্ডে। তাই মেজাজ নিয়েই বলে,

“কি সমস্যা? কানের কাছে এসে প্যানপ্যান করছিস কেন?”

তোশার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে অনেক কষ্টে কান্না আটকাচ্ছে সে। ইরফান সেদিকে পাত্তা দেয়না।

“এমন করে কথা বলছিস কেন তুই?” তোশা

“আমার ভালো লাগছেনা। সহ্য হচ্ছেনা তোকে। চোখের সামনে থেকে চলে যা।”

“যাবো না। আমার কষ্ট হচ্ছে। যাবো না কোথাও।”

ইরফান ‘নার্স’ বলে ডেকে উঠে। তোশা ওমনি গিয়ে কেবিনের দরজা লক করে দেয়। ইরফান বিরক্ত চোখে দেখে। তবে কিছু না বলে, ওকে পাত্তা না দিয়ে আবার চোখ বুজে নেয়।

তোশা এগিয়ে এসে তার পাশে বসে। কিছুমুহূর্ত বসে তাকে আরেকপলক আপাদমস্তক দেখে, তারপর আস্তে করে ইরফানের বুকে মাথা রাখে। ইরফান সাথে সাথে কিছু না বললেও, সেকেন্ড খানেক যেতেই ওকে সরিয়ে দিতে চাই। তোশা সরেনা। বরং তার বুকে মাথা রেখে ফুঁফিয়ে কেদে উঠে। ভিডিওর ঐ ছেলেটা ইরফান তা বুঝতে পেরে, তার দম আঁটকে আসছিল। পাথর বনে ছিল কিছু মুহূর্ত। অন্তিককে ফোন দিয়েছে। কিন্তু সে রিসিভ করেনি। ইরফানের বাবাকেও ফোন দিয়েছে। উনার ফোন বন্ধ বলছিল। তারপর পাগল পাগল হয়ে একা একা বেরিয়ে পড়েছে বাড়ির কাউকে না জানিয়েই। কাঁঁদতে কাঁঁদতে ভিডিওতে কোন হসপিটাল নিয়ে গিয়েছে দেখে নেয়। তারপর চলে এসেছে এভাবেই। তার বুক ফেটে যাচ্ছিল ইরফানকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে। যে ছেলে সর্বদা মাথা উচিয়ে, বুক উচিয়ে কথা বলে। যাকে শত কথা বলেও মন ভাঙা যায়না। কেউ গাঁয়ে সামান্য হাত দিলে, উল্টো তাকে রক্তা ক্ত করে ছাড়ে। সে নিজে খোলা রাস্তায় রক্তা ক্ত হয়ে পরে আছে। তোশার মনে হচ্ছিল ইরফান আর তার সাথে শক্ত শক্ত কথা বলবেনা, তাকে আর কষ্ট দেবেনা। তাকে কোনো কাজে বাঁধা দেবেনা আর কোনোদিন। দম আঁটকে আসছিল এসব ভেবে।

চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ইরফানের উন্মুক্ত বুক ভিজিয়ে দেয় সে। কয়েক মুহূর্ত সহ্য করে ইরফান আর পারেনা। ধাক্কা দিয়ে ওকে সরিয়ে দিতে চাই। কিন্তু তোশা সে সরিয়ে দিতে চাইছে বুঝতে পেরে আরো শক্ত করে আকঁড়ে ধরে। মাথা নাড়ায় - সে উঠবেনা।

“তোশা উঠ।”

“না”

“এভাবে বুকের উপর কাঁদছিস কেন? তোর শরীর কাপঁছে।”

তোশা কানে নেয়না সেসব।

ইরফান তার বাহুতে হাত দিয়ে ধরে রুক্ষ ভাবে।

“আমার গাঁয়ের উপর এভাবে কাঁপাকাঁপি করবিনা। উঠ। বলছি তো বিরক্ত লাগছে।”

তোশার রাগ হয় এভাবে বলায়। বুক থেকে মাথা তুলে তাকায় ইরফানের দিকে। সেও শক্ত মুখে চেয়ে আছে। তোশার চোখ পরে ব্যান্ডেজ করা মাথায়। ওমনি চেহারা নরম হয়ে আসে। তারপর এক পলক ইরফানের দিকে তাকিয়ে আবার তার বুকে মাথা ফেলে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকে। মনে হচ্ছে তোশা নিজেকে শান্ত করছে নিজেই। যেখানে ইরফানের তাকে স্বান্তনা দেওয়ার কথা। কান্না কমলেও থেকে থেকে ভেতর থেকে হেচকি আসছে।

“পাগলের মতো চেহারা বানিয়ে এখানে চলে এসেছিস কেন?”

“আমি পাগল তাই।”

“ঠিকঠাক কাপড়ও পরে আসতে পারলিনা? অসহ্য!”

তোশা কি এখানে কাউকে দেখাতে এসেছে নাকি যে সেজেগুজে নতুন কাপড় পরে আসবে? তার খারাপ লাগলেও কিছু বলেনা।

“তোশা চলে যা। ভালো লাগছেনা।”

সে তার কথা কর্ণপাত না করে কোথায় কোথায় লেগেছে ভালো করে দেখে। আর কান্না আটকায়।

“কয়বার বলতে হবে? তোকে আমার ভালো লাগছেনা। বিরক্ত লাগছে, দেখতে ইচ্ছে করছেনা। চোখের সামনে থেকে চলে যা প্লিজ, লিভ।”

তোশা ভীষণ কষ্ট পায় এবার। অবিশ্বাস্য লাগছে তার এসব কথা। প্রথমে পাত্তা না দিলেও এখন মনের কোথাও একটা লাগছে। তাকে এখন এতটা বিরক্ত লাগে এই ছেলের? চেহারাও দেখতে ইচ্ছে করছেনা! আসলেই? উঠে দাড়ায় সে।

“আমাকে ভালো লাগছেনা তোর? বিরক্ত লাগছে?” ভাঙা স্বরে কিছুটা অবাক হয়েই জানতে চাই সে।

ইরফান উত্তর না দিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। তা দেখে থমকে যায় সে। কিছু মুহূর্ত চুপ থাকে। ইরফানকে বুঝার চেষ্টা করে। না, মিথ্যা বলছেনা। তার দিকে তাকাচ্ছেওনা সে। অবাক হয়েই চেয়ে রয়। কোথাও তার জন্য মাকে কথা শুনিয়েছে, কষ্ট দিতে হয়েছে বলে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেনা তো? কিন্তু এখানে তার দোষ ছিল কি শুধু? ইরফানের ছিল না? ইরফান যে তাকে এত বাজে কথা বললো? তোশার কান্না পায় ইরফান তাকে এই কারণে দূরে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে ভেবে। এত তাড়াতাড়ি মন উঠে গেলো? এত অল্পতেই? আর তাকে যে এতকিছু সহ্য করতে হয়েছে সেই তার সাথে বন্ধুত্ব করার পর থেকে? সেসব? তার কান্না পায়। পরক্ষণে কান্নার মধ্যে হেসে উঠে তোশা। তাচ্ছিল্যের হাসি।

“অবশেষে তাহলে মন বদলালো তোর। শুনে ভালো লাগলো।”

কান্না আঁটকে সে আবার বলে,

“আমারো মন বলতো, এক না এক দিন তোর মন উঠে যাবে। এসব অবসেশন সারাজীবন থাকবেনা। ভালো তো বাসতে পারলিনা আজ অব্দি। তাও থেকে গিয়েছি তোর কাছে, শুধুমাত্র এক না এক দিন আমাকে বুঝবি, অন্তত আমার ভালোবাসাটা বুঝবি - এটা ভেবে। কিন্তু আমি ভাবতেও পারিনি আমাকে বোঝার আগেই তোর মন উঠে যাবে এভাবে, যে চোখের সামনেও সহ্য হচ্ছেনা এখন। এতটা বিতৃষ্ণা চলে আসলো কবে ইরফান?”

ইরফান তাও জবাব দেয় না।

তোশার রাগ হচ্ছে। কান্না পাচ্ছে। নিতে পারছেনা সে ইরফানের নীরবতা।

“আসলে তোর মতো মানুষকে ভালোবাসাটাই আমার জীবনের চরম ভুল। আমার জাস্ট নিজের প্রতি ঘৃণা আসে। কিভাবে এমন নিকৃষ্ট কাউকে মন দিলাম! আমাকে সহ্য হচ্ছেনা এখন? আমার চেহারা দেখতে ভালো লাগছেনা?” কান্না আসছে তার রাগে দুঃখে। তাও বলে যায়, “তোর জন্য নিজের জীবনের এতগুলো বছর নষ্ট করলাম। সর্বনাশ করতে কিছু বাকি রাখিস নি। তাও ঘুরেফিরে তোর কাছে এসেছি প্রতিবার। আমার জীবনটা জাস্ট হাতের খেলনা বানিয়ে দিয়ে, এখন বলছিস আমাকে ভালো লাগছেন?”

“তোর কি অন্য কাউকে ভালো লাগছে এখন? ইরফান, চুপ করে থাকবিনা, কথা বল। আমি চলে যাবো। তুই শুধু একবার বল অন্য কাউকে ভালো লাগে এখন। আচ্ছা, কে সে আমাকে বল? অল্প বয়সী কোনো মেয়ে? কলেজ, ইউনিভার্সিটির? বল না? আমাকে কেন ভালো লাগছেনা এখন? তোর জন্য কি করিনি? কত কিছু বাদ দিলাম এই জীবনের। আমার মিষ্টি… আমার মিষ্টি আমাকে বড় হয়ে তার মতো ফিল্ম ইনডাস্ট্রিতে নিয়ে যাবে বলে আগে আগে স্কুলে ভর্তি করে দিলো। নায়িকা বানাবে বলে। বড় হয়ে দেশে এসে আমার দোনমনা থাকলেও, সেদিকে যায় নি শুধুমাত্র তোর কারণে। ঐ কথা ভুলেই গিয়েছিলাম তুই ছেলেটার কারণে। নাহলে ঠিকই মিষ্টি আমাকে, বাবা-মাকে বুঝিয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়ে যেত। আমি আজ যে জায়গায় আছি, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু অর্জন করতে পারতাম। কিন্তু তোর কারণে কোন ভাবনা চিন্তা ছাড়াই ওদিকে আর পা বাড়ায়নি। আমি… আমি তো এখনো তোর মতো ৩০ পার করিনি তাই না? আটাশ চলছে। তাও ভালো লাগছেনা? ইরফান কাকে ভালো লাগে তোর। আমাকে বল প্লিজ, আমি দেখতে চাই। আমার…… আমার চেয়ে সুন্দরী সে?”

তোশা উত্তেজিত হয়ে আবার বলে উঠে, “আচ্ছা, সেসব বাদ দে। আমাকে তুই জবাব দিবি আজ। জবাব দিবি, আমার জীবনটা কেন নষ্ট করলি? অন্য কাউকেই যদি ভালো লাগবে শেষে, আমার এত এত সর্বনাশ কেন করলি? আমি কি করে বাচবো এবার? আমার তো কিছুই নেই। তোকে ভালোবেসে সব হারিয়েছি। কার কাছে যাবো? আমার এত ক্ষতি করলি কেন? জবাব দে তুই……”

সে আর কিছু বলবে, তার আগে নিজেকে বেডে আবিষ্কার করে। ইরফান ওকে টেনে নিয়ে এসেছে। হস্পিটালের ছোট্ট বেডে দুইজনের ঠিকঠাক জায়গা হবেনা। তাই ওকেই শুইয়ে দিয়ে ইরফান পাশ থেকে কিছুটা গাঁয়ের উপর উঠে তার। তোশার চোয়ালে রুক্ষ হাত রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“অনেক বলে ফেলেছিস তুই।”

তোশা চিল্লিয়ে উঠে। কান্না স্বরে বলে,

“হয়নি। আরো অনেক কিছু বাকি বলার। তুই বল আমাকে কেন ভালো লাগছেনা? কেন সহ্য হচ্ছেনা? বল? আমাকে সুন্দর লাগছেনা তোর চোখে? কাকে ভালো লাগে বল না……”

ইরফানের বাহুতে হাত দিয়ে ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে বলে সে। ইরফান রেগে হাত দুটো আঁটকে নেয়।

“এখনো এসব ফালতু কথা সহ্য করছি শুকরিয়া কর। আমার সহ্য সীমা পার হলে কেদে কুল পাবিনা। শেষ বার বলছি। শেষ বার।”

“আমি আর তোর কথা শুনবো না। কোনো কথা শুনবোনা আর। তুই আর আমার নেই। অন্য কাউকে মন দিয়েছিস। আমার সব শেষ করে এখন অন্য কাউকে মন দিয়ে…”

এরপর আর কোনো কথা বলতে পারলো না তোশা। নিজের ঠোঁটে ইরফানের ঠোঁটের অস্তিত্ব বুঝতে পেরে সে ব্যান্ডেজ করা ঐ মাথার চুল টানতে থাকে। ইরফান নিজের হাত থেকে এক টানে ক্যানোলাটি ছুটিয়ে ফেলে। হাত ধরে আঁটকে নেয় তোশাকে। তোশা তাও থামছেনা দেখে ইরফান ছেড়ে দেয় তার হাত। তোশার ধস্তাধস্তির মধ্যেই তার কাপড় খুলতে শুরু করে। বিবস্ত্র না করলেও, তার যতটুকু দরকার আয়ত্তে নিয়ে নেয়। সুস্থ তোশা চেষ্টা করেও আহত ইরফানের থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারেনা। সে তাও ইরফানকে সরাতে গিয়ে বুঝতে পারে ইরফানের হাত তার নিজেরই প্যান্টের বেল্টে। ইতোমধ্যে খুলে ফেলে দিয়েছে। তোশার মাথা ঘুরে উঠে। তারপর? তারপর ২ মিনিটের মধ্যে যা করার করে ফেললো ইরফান।

চারদিক ব্ল্যাংক লাগছে তোশার। অন্ধকার দেখতে পাচ্ছে। মাথার উপরে ফ্যানটার দিকে তাকালে তার মনে হলো ফ্যানটার সাথে সাথে সে নিজেও ঘুরছে। ইরফান তার ঠোঁট ছেড়ে দিয়েছে আগেই। সে চাইলে চিৎকার করতে পারে এখন। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো অর্থবোধক শব্দ বের করতে পারেনা। অর্থহীন শব্দ বের হয়। যেগুলোকে সভ্য জাতির মানুষজন অশ্লীল শব্দ বলে আখ্যায়িত করেছে। কিছু সময় পর জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে কিছুটা স্থির হয় সে। চোখ বুজে নেয়। ওমনি চোখের কোণা দিয়ে দুফোটা পানি গড়িয়ে পরে।

“কি করলি এটা?” ভীষণ কষ্ট হলো তার শব্দ তিনটি উচ্চারন করতে।

ইরফান শান্ত স্বরে জবাব দেয়,

“এখন বাজে রাত তিনটা। তোকে আমি দুটো অপশন দিলাম। আজ ভোরে, হয় কাজী ডেকে বিয়ে করে আমাকে স্বামী বানাবি, নাহয় পুলিশ ডেকে নিজের র‍্যাপি স্ট হিসেবে আসামী বানাবি। দুটো অপশন। যেটাই করবি, আমি টু পরিমাণ শব্দ না করে মেনে নেবো। তোর হাতে সব। তোর এত এত করা প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারবো না। এজ আই সেইড বিফোর, আমার বিরক্ত লাগছে। কোনো কথার উত্তর দেওয়ার মুড নেই। নাও ফিল দা মোমেন্ট।”

কিছু মুহুূর্ত পর তোশা বলে,

“কিসের শাস্তি দিলি?”

“আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়ার।”

“মিথ্যা কথা। তোর পবিত্র মাকে আমার কারণে কথা শুনিয়ে এসেছিস বলে, বদলা নিতে আমাকে কলঙ্কিত করলি। তাইনা?”

“ঐ মহিলার চেয়ে তুই গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে।”

“তোর নতুন অবসেশন? ঐ মেয়ে……”

“আমাকে ওয়াইল্ড হতে বাধ্য করিসনা।”

“সত্যি করে বল। মনে অন্য কাউকে রেখে আমাকে ছুঁয়ে দিসনি তো? একবার বল।”

তোশার আকুতি শুনে তার দিকে তাকায়। মায়া হয় তার।

“কেউ নেই তোশা। তুই ছাড়া কেউ নেই। এটাই সত্যি। আমি এক জীবনে তুই ছাড়া আর কোনো মেয়ের দিকে অন্য নজরে তাকায়নি। তুই জানিস তুই আমার অবসেশন, অথচ এই অবসেশন যে এত সহজে কাঁটানো যায়না সেটা জানিস না।”

তারপর থেমে আবার বলে,

“আমার মায়ের জন্য কষ্ট দিইনি তোকে। আমার সেসব নিয়ে তোকে শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবার আগে, ভাবার জন্য মস্তিষ্কটাই নষ্ট হয়ে যাক। শোন, তুই আমার বিস্তৃত কিংবা ক্ষীণ জীবনের একমাত্র নারী। তুই কালা, বোবা, ল্যাংড়া, বুড়া যায় হোস - আমার তুই হলেই চলবে। এটা মাথায় রাখবি। তোর থেকে মন উঠে যাবে। তার আগে আমার হৃৎপিণ্ডটাই নষ্ট হয়ে যাক। আচ্ছা সেসব বাদ। এখন বল, কয়েক ঘণ্টা পর আমাকে জেলে পাঠাবি বন্দি হিসেবে? নাকি নিজে আমার কাছে বন্দি হবি? আমার কোনো হস্তক্ষেপ নেই এখানে। সিদ্ধান্ত তোরই। কিন্তু অন্তিককে ফোন করে জানাতে হবে। তুই পুলিশ ডাকতে বললে পুলিশ আনতে বলবো, কাজী ডাকতে বললে কাজী আনতে বলবো।”

এতক্ষণ পর তোশা গলা ফাটিয়ে কেদে উঠে। দিন হলে ওর কান্না শুনে হয়তো অনেকে চলে আসতো। রাত হওয়ায় সবাই ঘুম। নাইট ডিউটির নার্সরা থাকলেও, আদতে সবাই কাজ চোর। তোশার আর্তনাদ দেখে ইরফান। আস্তে করে তার পাশে শুয়ে পরে, দুজন একসাথে শুতে কষ্ট হচ্ছে বিধায় তাকে নিজের ক্ষত-বিক্ষত বুকের উপর রাখে। তবে না তোশার কান্না থামানোর চেষ্টা করে, আর না স্বান্তনা দেয়। বেশ অনেকক্ষণ পর সে নিজেই একটু শান্ত হলে ইরফান জিজ্ঞেস করে,

“তাহলে পুলিশ ডাকতে বলি?”

তোশা মাথা নাড়ায়।

“তাহলে কাদছিস কেন?” ইরফান

সময় নিয়ে নিজেকে সামলায় তোশা। অনেকক্ষণ কেটে যায়। ইরফান তখনো তার উত্তরের আশায়। তা বুঝতে পেরে তোশা নিস্তেজ হয়ে বলে ,

“দুটো কারণ আছে। কোনটা শুনবি?”

“দুটোই বল।”

“প্রথম কারণ, আমি আজ মেয়ে হিসেবে ব্যর্থ প্রমাণিত হবো; একটা আত্মসম্মানহীন, মেরুদণ্ডহীন, ইজ্জতবিহীন, কলঙ্কিত মেয়ের খাতায় নাম লিখলাম। দ্বিতীয় কারণ, নিজের র‍্যাপি স্টের নামে কবুল পড়বো।”

“প্রথম কারণ মানলাম। একজীবনে সবাই সবদিক থেকে সফল হতে পারেনা। এই যেমন, আমি ছেলে হিসেবে ব্যর্থ, আমার বাবা-মা প্যারেন্টস হিসেবে ব্যর্থ। কেউ কেউ মানুষ হিসেবেই ব্যর্থ। আবার কেউ ভাই হিসেবে ব্যর্থ, বোন হিসেবে ব্যর্থ, বন্ধু হিসেবে ব্যর্থ। সো, এত প্যারা নিস না। কিন্তু দ্বিতীয় কারণে একটু অবজেকশন আছে। তোকে তো আমি অপশন দিয়েছি। হয় শুধু র‍্যাপি স্ট মানবি, নাহয় শুধু স্বামী। দুটো তো সম্ভব না। একটা চুজ করবি। স্বামী মানলে ঐ কথা মুখেও আনতে পারবি না। বুঝতে পেরেছিস? বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নে।”

“না। তোর কথা কেন হবে সবসময়। সম্ভব না এটা। আমাদের বিয়ে হবে। আমার একটা সংসারের অনেক ইচ্ছা; অনেক। তুই কল্পনাও করতে পারবিনা। ওটার অনেক লোভ আমার। তোর আমার বিয়ে হবে। কিন্তু তুই র‍্যাপি স্টই থাকবি। তাহলে আমি শান্তি পাবো। আমার জীবনের এতগুলো বছর নষ্ট করেছিস, এত কষ্ট দিয়েছিস, এত এত সর্বনাশ করেছিস - আর একটা র‍্যাপিস্ট ট্যাঁগ নিতে তোর এত সমস্যা? বল… ওটা থাকবি তুই। থাকবি…”

তোশা নিস্তেজ শরীর নিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠে কিছুটা। তবে ইরফান জবাব দেওয়ার আগে বাইরে থেকে অন্তিকের ডাক শুনা যায়। দুজনেই তাকায় দরজার দিকে। ইরফান নিজের ফোন থেকে তাকে কল লাগায়।

বাইরে অন্তিক অস্থির হয়ে দাড়িয়ে আছে। ফার্মেসি থেকে মেডিসিন নিয়ে আসার পথে প্রাণেশা কল দিয়েছিল। অনেক কিছু বলেছে কাঁঁদতে কাঁঁদতে। বাড়িতে নাকি সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে তার বিয়ের ব্যাপারে। সে ঘটনা কি শুরু থেকে জানতে চাইলে মেয়েটা সব বলেছে লম্বা মেসেজে। অন্তিক তাকে স্বান্তনা দেয়, কিছু হবেনা আশ্বাস দেয়। তারপর অনেক কিছু বুঝিয়ে সুজিয়ে কল কাটে। এর মধ্যে নিচে তোশার গাড়ি দেখে অবাক না হয়ে পারেনা। এই মেয়ে কখন এলো? তাকে তো অন্তিক জানায়নি। ইরফানকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে তারপর জানাবে ভেবেছিল। তোশার গাড়ি দেখে সে উপরে আসে। কিন্তু কেবিনের দরজা বন্ধ দেখে ইরফানকে কল লাগাবে, তার আগে ভেতর থেকে তোশার কান্নার আওয়াজ পেয়েছে সে। কিছু হয়েছে বুঝতে সময় লাগেনি। তোশার কান্না শুনে সে বেশ কিছুক্ষণ পাশের একটা সিটে বসে ছিল। টানা বেশ অনেকক্ষণ বসে, তারপর দরজা নক করেছে।

ইরফানের কল দেখে সে রিসিভ করে।

“কাজী ডেকে আন। আর দুজনের জন্য দুসেট ড্রেসও নিয়ে আসবি।”

“তোশাকে ফোন দে।”

ইরফান না করেনা। দিয়ে দেয়। কিন্তু তোশা মাথা তুলেনা। তা দেখে ইরফান লাউডে দেয় ফোন। অন্তিককে কথা বলতে বলে।

“কি করবো তোশা? কি চাচ্ছিস? স্পষ্ট বল।” অন্তিক

তোশা উত্তর দেয় না।

“আমি কি বিয়ের ব্যবস্থা করবো নাকি শাস্তির ব্যবস্থা করবো তুই বল। নাকি বাড়ি যাবি এখন? সময় নিয়ে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে তাও পারিস।”

“লাল শাড়ি নিয়ে আসবি আমার জন্য।”

অন্তিক হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে। তবে নিজ থেকে কোনো সিদ্ধান্তের জন্য সুপারিশ করেনা। সে জানেনা এদের ভবিস্যত কি? চাই কি? করবে কি? করে কি? কিছু জানেনা। ভীষণ আনপ্রেডিক্টেবল তার বন্ধু দুটো।

—————

“আমার একটা মেয়ে হলে, আমি তাকে কোনোদিন কোনো ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেবো না। যদি করে, তাহলে মারতে মারতে মে রেই ফেলবো।” ইরফানের বুকে মাথা রেখে তোশা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। সেভাবেই কথাটা বলে।

তার কথা শুনে বন্ধ চোখ দুটো খুলে তাকায় ইরফান। ভ্রু কুচকে বলে,

“আমার বুকে মাথা রেখে আমার মেয়েকেই মা রার কথা বলছিস?”

“বলছি।”

“আর যদি ছেলে হয়?”

“তাহলে তাকে তোর মতো হতে দেবো না। হলে তাকেও মে রে ফেলবো মারতে মারতে।”

“আমার বাচ্চাদের প্রতি এত রাগ? দুনিয়ায় আসার আগে থেকেই!”

“মানুষ না হলে মারবো না?”

“খোঁচা দিলি।”

“হ্যাঁ।”

“ভালো।”

“হ্যা। শোন, আমি যদি ম রে টরে যায়। তাহলে ভালো দেখে আরেকটা বিয়ে করে নিস। তাও নিজের হাতে বাচ্চাদের অমানুষ বানাস না।”

“এবার বাড়াবাড়ি করছিস।”

“হোক বাড়াবাড়ি।”

ইরফান ঐ বিষয়ে আর কথা বাড়ায়না। আজ আর কোনো প্রকার রাগ দেখাতে চাচ্ছেনা সে। তার রাগ উঠা মানেই তোশাকে কষ্ট দেওয়া কথার আঘাতে।

“আমি তোকে কোনোদিন ক্ষমা করবো না।”

“ক্ষমা না করে সংসার করে যাবি?”

“হ্যাঁ”

“আচ্ছা, দেখবো। এবার চুপ থাক। আর কোনো কথা নয়। একটু ঘুমিয়ে নে।”

ইরফানের জন্য অন্তিক বাড়ি থেকে এখানে আসার সময়ই নিয়ে এসেছিল দরকারি পোশাক। ইরফান জানতো না। কেবিনেই আছে। তাই অন্তিক সেই নার্সকে গিয়ে জাগায়। নার্স মেয়েটা বলেছিল ইরফানের মেডিসিন আছে। অথচ নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছে তাদের কিছু বুঝিয়ে না দিয়ে। ভুল একটা হয়ে গিয়েছে বুঝতে পেরে মেয়েটা ক্ষমা চায়। অন্তিক তাকে যেকোনোভাবে মেয়েদের একসেট পোশাক জোগাড় করে দিতে বলে। সে এনে দেওয়ার পর যখন ইরফানের কেবিনে বাইরে থেকে ঐ পোশাক একটা মেয়ে খুঁজলে তারপর দিতে বলে!! তখন তার বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে যাওয়ার জোগাড়। ঐ পেশেন্টের রুমে মেয়ে মানুষ ঢুকলো কবে, আর সেই মেয়েমানুষ পোশাক আশাক ছাড়া কেন? ভাবতে গিয়ে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পরে। তবে আর বেশি ঘাটায়না। কারণ প্রথমত অন্তিকের হুশিয়ারি, দ্বিতীয়ত মানুষগুলো সুবিধার লাগছেনা তার কাছে।

পাশে আরেকটা খালি কেবিন বুক করে নিয়েছিল অন্তিক। সেখানে কাটায় বাকি রাতটুকু। ঘুমাতে পারেনি অবশ্য। সে নিজেই অস্থির হয়ে আছে, প্রাণেশার কান্না দেখার পর থেকে। তার উপর দুই বন্ধুর অযাচিত কাণ্ড কারখানা। একদিনে কতকিছু হয়ে গেলো। সকাল হতেই এদের বিয়ে দিতে হবে। তারপর বাড়ি ফিরবে তিন জনে। আর বিকেলে বাবা-মাকে নিয়ে ফারদিন বাড়ি যেতে হবে।

মৌনপ্রেম পর্ব ৪২ গল্পের ছবি