ইশি ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে আছে এই মুহূর্তে, বন্ধুদের সাথে। বন্ধু নয় অবশ্য; বান্ধবী। নতুন নতুন কলেজে উঠে যে কয়েক বন্ধু বানিয়েছিল, সে বাদ গিয়েছে কয়েক মাসের মধ্যেই।
দিগন্ত ভাইয়ের অবদানে। এরপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে তার উপর। বান্ধবী বানানো যাবে, কিন্তু বন্ধু বানানো যাবেনা। বান্ধবীদের সাথে কোথাও ঘুরতে যাওয়া যাবেনা। এমন অনেক কিছু। তবে এমন না যে, ইশি তার কথা অমান্য করলে বাড়িতে বড়দের কাছে বিচার দিতো। সেসবের দ্বার ধারেনা দিগন্ত ভাই। বরং বড়দের বলে দিলেই খুশি হতো ইশি। সেও বলতো, সবার জন্য এক নিয়ম আর তার জন্য অন্য নিয়ম হবে কেন? এমন তো না যে সে ছেলে বন্ধু বানানোর জন্য মুখিয়ে আছে। বারণ যখন করেছে সামনে থেকে নাহয় আর কোন ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করতো না। কিন্তু যাদের সাথে ইতোমধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে তাদের সাথে অকারণে বন্ধুত্ব ভাঙ্গানো কোন ধরণের বাচ্চামো?
দিগন্ত বাড়ির বড়দের কাছে বিচার দিলে সেও নিজের দিক থেকে এসব কথা বলতো। কিন্তু সেসব করেনা দিগন্ত। নিজেই অধিকার দেখায়। যেন ইশির জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার। প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগতো ইশির। পরে অভ্যস্ত হয়ে পরে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আবার অন্য কিছুর আভাস পায়। নিজের মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিতো শুরুতে। পরে যখন অবচেতন মন কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। তখন নিজে সেসব মানতে চায় না। সে দিগন্তের দিক থেকে যা বুঝে, তা প্রকাশ করতো না। না বোঝার ভান ধরতো। কারণ তার ধিক্কার আসতো ভেতর থেকে, উল্টাপাল্টা ভাবছে; এমনটা চিন্তা করে। একই বাড়িতে থেকেছে ছোট থেকে। দিগন্ত ভাইয়ের চোখের সামনে বেড়ে উঠেছে সে। সবসময় ভাইয়ের নজরে দেখেছে তাকে, দিগন্তও ভাইও তো তখন তাকে আপু আর দিথীর মতো করেই আদর করতো। আলাদা কিছু দেখেনি কখনো।
তাহলে হঠাৎ বিদেশ থেকে এসে পাল্টে গেলো কিভাবে ইশি ভেবে পায় না। অবশ্য দিগন্ত ভাই দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পর পরই তার বাড়ন্ত বয়স শুরু হয়েছে। ফোনে কথা হতো বাকি সবার মতো। তখনো স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ দেশে এসে কিছুদিন পর থেকেই অন্য এক দিগন্ত ভাই হয়ে উঠে যেন। তাহলে কি এতোগুলো বছর পর দেশে ফিরে, ছোটবেলার সেই ইশির জায়গায় অন্য এক ইশিকে দেখেই দিগন্ত ভাইয়ের ভাবনা বদলেছে? পরিণত ইশিকে দেখেই কি অন্য নজরে তাকিয়েছে? এমনটাই হবে। নাহয় আগে তো ঠিকই ছিল সব। কিন্তু ইশি প্রথম প্রথম বিষয়টা নেক্কারজনক ভাবলেও, মাহাদ ভাই আর আপুর বিয়েটা হওয়ার পর থেকে মনটা নিজেকে নিজেই কেমন আশকারা দিচ্ছে। এই বিষয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে। দিগন্ত ভাইকে নিজের সাথে কল্পনা করতে ইচ্ছে করে। আর ইশির কাছে এসব বিষয় ভীষণ লজ্জ্বার; ভীষণ। কি করে এসব মাথায় আনে সে?
এসব ভাবনা চিন্তা করতে করতেই চলে যায় বান্ধবীদের পেছন পেছন। পুুরনো কথা হঠাৎ মাথায় আসছে কারণ, সে আর তার বান্ধবীরা ক্লাস বাদ দিয়ে রেস্টুরেন্টে যাচ্ছে এখন। আশেপাশের ক্যাফে হলে এত ভাবনা চিন্তার দরকার ছিল না। এতটাও বাঁধা ধরা রাখেনি দিগন্ত ভাই। যে সামান্য ক্যাফেতেও ঢুকতে পারবেনা বান্ধবীদের সাথে। কিন্তু সে যাচ্ছে বেশ দূরে। নতুন খোলা একটা বড় সড় রেস্টুরেন্টে। যেটা ইউনিভার্সিটিসহ, বাড়ি থেকেও অনেক দূরে। বান্ধবী জন্মদিন উপলক্ষে নতুন খোলা সেই রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাচ্ছে সবাইকে ট্রিট দিতে। যদিও সে আশেপাশে নয় বলে মানা করে দিয়েছিল। কিন্তু কেউ শুনতে চাইছেনা। সবাই যাবে অথচ ইশি না গেলে ভালো লাগবে কারো? তাই নানান কিছু বুঝিয়ে জোর করে রাজী করিয়েছে। ইশিও আর মানা করতে পারেনি।
ঘণ্টা খানেকের মাঝে পৌঁছে যায় তারা। পাঁচ জন মিলে এক সাইডে গিয়ে বসে। ইচ্ছেমতো একেকজন একেকরকম খাবার অর্ডার করে, বান্ধবীর পকেট খালি করার আশায়। এদিকে সেই বান্ধবীর হাঁ হুতাশের শেষ নেই। রাক্ষসীদের নিজ থেকে অফার করার দুঃখে। এমনভাবে নানান দুষ্টুমির ছলে মজা করতে থাকে, গ্রুপ ফটো নেয়, একেকজনের একেকরকম অপ্রস্তুত অবস্থা ফ্রেমবন্দি করে। অবশেষে তাদের খাবার চলে আসে। বার্থডে গার্লের জন্য কেকও অর্ডার করিয়েছিল বন্ধুরা মিলে। সবার আগে সেটা কাটে।
কেক কাঁটা শেষে একে অপরের গালে মাখিয়েও দেয় দুষ্টুমির ছলে। তবে হঠাৎ বেকায়দায় ইশির চোখে ঢুকে যায় কেকের ক্রিম।
“আউচ, শেষ করলি। আমার চোখ শেষ। রাক্ষসীগুলো কেক গালে মাখার জিনিস নয়। গেলার জিনিস। না গিলে আমার চোখটাই পেলি ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য” ইশি বিরক্তি নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলে বান্ধবীকে।
“সরি দোস্ত, খেয়াল করিনি। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম কেক মেকাপের জিনিস। তাই মুখে মাখাচ্ছিলাম।” ওর কথায় সবাই হেসে উঠে।
“বেঈমানের দল। খিকখিক বন্ধ করে একটা টিস্যু দে।”
টিস্যু দিয়ে যতটুকু পারে মুছে নেয়। কিন্তু চোখে পানি মেরে আসা দরকার। নাহয় কেমন একটা জ্বালা করছে।
“তোরা সবাই বস। আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসি। পানি ছিটকা দিতে হবে। জ্বালা করছে।”
“ওকে যা। তাড়াতাড়ি চলে আসিস। বেশি দেরি হলে তোর ভাগের খাবার উধাও হয়ে যেতে পারে।”
“আমার ভাগের খাবার উধাও হলে তোদের একটাকেও দৃশ্যমান রাখব না।” যেতে যেতে ইশি বলে। ওর কথা শুনে বাকিরাও হেসে নিজেদের মধ্যে মেতে উঠে। ছবি তুলতে থাকে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ইশি চোখ মুখ পরিষ্কার করে বেরিয়ে আসে। চুলগুলো হালকা হাতে ঝাড়তে ঝাড়তে বান্ধবীদের অবস্থানেই যাচ্ছিল। এর মধ্যে কারো পিঠের সাথে ধাক্কা লাগে। সে সাইড দিতেই যাচ্ছিল। লোকটা উল্টো দিকে থাকায় পেছনে ইশি আছে দেখতে পায় নি। তাই ইশি যে সাইডে গিয়েছে লোকটাও ঐ সাইডে যেতেই ধাক্কা লাগে। কপালে ব্যাথা পাওয়া সে কিছুটা আর্তনাদ করে উঠে সে। সামনের লোকটাকে কিছু একটা শুনিয়ে দিতেই চাচ্ছিল, কিন্তু চোখ তুলে তাকাতেই দিগন্ত ভাইকে দেখে হুশ উড়ে যায়।
ফোন কানে দিয়ে তার দিকেই চেয়ে আছে দিগন্ত ভ্রু কুচকে। সেকেন্ড দুয়েক পর ওপাশের ব্যক্তিকে কিছু একটা বলে কল কেটে দেয়। ফোন পকেটে ঢুকিয়ে ইশিকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“এখানে কি করছিস?”
ইশি বোকা বনে তাকিয়ে আছে। মানে যার সামনে পড়া মানা, তার সামনেই পড়তে হবে উষ্টা খেয়ে।
“চুপ করে আছিস কেন? ক্লাস টাইমে এখানে কি কারণে?” শেষ কথাটা হ্যান্ডওয়াচটাতে চোখ বুলিয়ে বলে।
“কার সাথে এসেছিস এত দূরে?” দিগন্ত
দিগন্ত ভাইয়ের চেহারা দেখে রেগে আছে নাকি না ঠিক ধরতে পারছেনা ইশি। কি বলবে না বলবে ভেবে না পেয়ে ইতস্তত করে,
“আমি এখানে… কিন্তু আপনিও এখানে! মানে, বান্ধবীর জন্মদিন আজ। তাই এসেছি সবাই।”
“কারো সাথে দূরে কোথাও না যেতে বারণ করেছিলাম আমি? এখানে আসার আগে আমাকে বলেছিলি?”
ইশির রাগ হয়না এভাবে বলায়। আগে হলে রেগে গিয়ে মনে মনে অনেক গালি দিতো। কিন্তু এখন অবচেতন মন দিগন্তকে নিজের অধিকার দিতে চায়। তাই উড়না খুটতে খুটতে বলে,
“সরি, আর হবেনা। এই শেষ।” মাথা তুলে তাকিয়ে আবার বলে, “কিন্তু আপনি এখানে কি করছেন দিগন্ত ভাই? আপনারো তো ডিউটি টাইম এখন।”
দিগন্ত চোখ উচিয়ে জানতে চায়, “কৈফিয়ত চাইছিস?”
“হ্যাঁ!!”
“তোকে কৈফিয়ত দেবো কেন?”
“আপনি আমার কাছে কৈফিয়ত খুঁজেন কেন?”
দিগন্ত নতুন ইশিকে দেখে নেয়। সে কিছুটা অবাক মনে মনে। এই মেয়ে সবকিছু বুঝেও অবুঝ থাকে সবসময়। আর আজ তার উপর অধিকার দেখাচ্ছে। অবাক হলেও হাসে মনে মনে।
“হঠাৎ এই বদলের কারণ?”
“আপনিও তো হঠাৎ বদলে গিয়েছিলেন।”
ইশির কথা শুনে হঠাৎ দিগন্তের সেই দিনগুলোর কথা মনে পরে, যখন নিজের অজান্তে সে ইশিকে কামনা করতো। পূর্ণাঙ্গ ইশিকে দেখে যে তার বুকের কোথাও একটা কেপে উঠেছিল তা তখন নিজেও টের পায় নি। এভাবে দিন কাটতে লাগলো, তারপর হঠাৎ একদিন রাতের অন্ধকারে মন অজান্তের স্বপ্নের রাণী তার স্বপ্নে এলো। যে বুকের কাপন সে এতোদিন টের পায়নি, তা টের পাইয়ে দিতে সেই বুকে চুমু এঁকে দিলো। এই ইঙ্গিতটুকু দিয়ে চলেই যাচ্ছিল ইশি। কিন্তু দিগন্ত যেতে দেয়নি। হাত ধরে আঁটকে নেয়। বুকের উপর ফেলে নিজের সাথে ধরে রাখে।
“কি করলি এটা। লজ্জ্বা নেই তোর?”
“না নেই। তোমার এখানটা আমার জন্য কাপে। অথচ তুমি বুঝতে পারোনা। আমার রাগ হয়।” দিগন্তের বুকে হাত রেখে ইশির অভিমানী স্বরে বলা কথা শুনে সে বিভ্রান্ত হয়।
“আমার এখানটা তোর জন্য কাপে?” নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলে সে।
“হ্যাঁ, তুমি এখনো বুঝতে পারছ না?” বড় নিষ্পাপ কণ্ঠ ইশির। দিগন্তের ভেতর ঐ কণ্ঠ সম্মোহনের মতো কাজ করেছে।
“হ্যাঁ, পারছি। নিজে এসে বুঝিয়ে দিয়েছিস না! বুঝতে পারবো না?”
ইশি ওমনি মন মোহিত করা একটা হাসি দেয়। দিগন্ত আরো কাছে টেনে নেয়।
“নির্লজ্জের মতো এসে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিস এসব। ভয় করেনি?”
“কিসের ভয়?”
“এখন যদি আমিও নির্লজ্জ হই?”
“তো হও।” তারপর? তারপরের দৃশ্যটাই তার সেরাতের স্বপ্নদোষের কারণ। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছে ইশিকে। নাকের ডগায়, চোখে, মুখে, ঠোঁটে, গালে, বুকে কোথাও বাদ দেয় নি দিগন্ত। আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছে। তারপর হঠাৎ ইশিকে নিচে ফেলে তার গাঁয়ের উপর উঠবে। ওমনি হাজারটা প্রজাপতি হয়ে তার ধরাছোয়ার বাইরে চলে যায়। কি আশ্চর্য! এটুকুর জন্য এসেছে?
“কি হলো? কি ভাবছেন?” ইশি দিগন্তের ধ্যান ভাঙায়। তারপর আবার বলে, “আচ্ছা আমি তাহলে বান্ধবীদের কাছে যায়। ওরা অপেক্ষা করছে। আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাবো। প্রমিস!”
দিগন্তের ধ্যান ভাঙে, তার কথার প্রতিউত্তর করবে তার আগেই ইশি পা বাড়ায়। কারণ অনেক দেরি করে ফেলেছে। সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে হয়তো। কিন্তু দুয়েক পা এগিয়ে হঠাৎ একটা মেয়েলী কণ্ঠে দিগন্তের নাম শুনে আবার পেছন ফিরে তাকায়। সুন্দরী একটা মেয়ে। দিগন্তের হাত ধরে বলছে,
“দিগন্ত, এখানে একা একা কি করছিস? কতোক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি তোর জন্য। চল, বাড়ি যেতে হবে। ড্রপ করে দিবি আমাকে।”
মেয়েটা দিগন্তের হাত ঝাকিয়ে অধিকারের সাথে বলছে কথাটা। যেন তাকে অপেক্ষা করানো দিগন্তের ভুল, আর ওকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়াটা দিগন্তের কর্তব্য। অন্তত ইশির তো তাই মনে হলো। সে দিগন্তের হাতের ভাঁজে গলিয়ে রাখা হাতটাই চোখ দেয়। বেশ কিছু মুহূর্ত ধরে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা দিগন্তকে কিছু বলছে তখন। দিগন্তও মনোযোগ দিয়ে শুনছে। শুনতে শুনতে হঠাৎ পকেট থেকে ফোন বের করে। কাউকে কল লাগিয়ে এদিক সেদিক নজর ঘুরাতেই ইশির দিকে চোখ পরে। সে তখনো তাদের দুজনের মিলিত হাতে দিকে চেয়ে আছে। থমকে যাওয়া ইশির নজর অনুযায়ী নিজের হাতের দিকে তাকায় সেও। তারপর আবার ইশির দিকে চোখ দেয়। তাদের হাত থেকে নজর সরিয়ে দিগন্তকে একপলক অদ্ভুদ নজরে দেখে নেয় ইশি, তারপর চলে যায় পেছন ফিরে।
দিগন্ত কি হলো বুঝতেও পারলো না। পাশের মেয়েটা তখনো কিছু বলছে। দিগন্তের সেদিকে ধ্যান নেই। সে ইশির ঐ চোখ দুটো মনে করে শুধু। যেখানে কিছু একটা ছিল। তবে দিগন্তের প্রতি অবিশ্বাস, নাকি ইশির নিজের প্রতি অবিশ্বাস ছিল তা সে বুঝতে পারেনি।
পাশের মেয়েটার হাত ছাড়িয়ে ইশির কাছে যেতে চাইবে, তার আগে ফোনে কল আসে। অন্তিকের কল দেখে রিসিভ করতে করতে ইশির উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে। পেছনের মেয়েটা বলে উঠে, “কি হলো দিগন্ত। ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস।”
দিগন্ত তার কথার উত্তর দেয় না। ইশির উদ্দেশ্যে হাঁটতে হাঁটতে ফোনে অন্তিকের কথা শুনে আবার থেমে যায়। ইরফান ভাইয়ের এক্সিডেন্ট হয়েছে। অন্তিক তাকে পুরান ঢাকার উদ্দেশ্যে যেতে বলছে হস্পিটালে বিজি না থাকলে। কারণ সে একটু দূরে আছে। ওখান থেকে যেতে যেতে অনেক সময় পেরিয়ে যাবে। দিগন্ত থেমে যায়। একবার দূর টেবিলে হইহল্লর করা বান্ধবীদের মাঝে শক্ত হয়ে বসে থাকা ইশির দিকে তাকিয়ে, তার সাথে থাকা মেয়েটাকে বলে - “তোকে নিতে রাজীব আসবে মেঘলা। এখানে কোথাও বসে অপেক্ষা কর। আমার এক রিলেটিভের এক্সিডেন্ট হয়েছে। আমাকে যেতে হবে। আসছি।” কথাটা বলেই চলে যায় সে।
ইরফানের বাবা আর দিগন্ত গিয়েছে ইরফানের কাছে। ট্রাকের সাথে ধাক্কা লাগতে চেয়েছিল। তাই আকস্মিক অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাইক ঘুরিয়ে নিতে গিয়ে গাছের সাথে ধাক্কা লেগেছে। খুব বেকায়দায় গিয়ে পড়েছিল ছেলেটা। মাথার একপাশে ফেটে গিয়েছে। হাত, পাসহ শরীরে নানান জায়গায় ভীষণ বাজেভাবে কেটে গিয়েছে। যদিও ইন্টার্নাল কোনো ইনজুরি হয়নি। কিন্তু মাথার দিকে আর বুক-পিঠ, হাত-পা এসব জায়গায় কাঁটা ছেড়ার কারণে ব্লি ডিং হয়েছে খুব। এখানকার ডক্টরের কাছে এসবই জেনে নিয়েছে দিগন্ত। ইরফানের বাবাও ছিল সাথে। ভদ্রলোক কিছুটা গম্ভীর হয়ে আছেন শুরু থেকে। কি কারণে তা আন্দাজ করতে পারছেনা দিগন্ত। ইরফান ভাইয়ের বাবা একটু অন্য ধাঁচের তা সে জানে। কিন্তু এতোটাও অন্যরকম হবে জানতো না। ছেলের এক্সিডেন্ট শুনে শক্ত হয়ে আছে। সেবার ইরফান ভাইকে যখন রিহ্যাবিটেশনে নিয়ে যায় তখন তো টেনশনে স্ট্রোক করে বসেছিল। তাহলে এখন আবার অন্য রকম কেন? কিছু হয়েছে কি? দিগন্তের মনে এসব প্রশ্ন থাকলেও সে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করেনা। তবে চিন্তিত হতে মানা করে দেয়।
“আঙ্কেল, বিচলিত হবেন না। ইন্টার্নাল কোনো ইনজুরি হয় নি ডক্টর তো বললো। যেসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা ডক্টরের পরামর্শে চললে বেশিদিন লাগবেনা সুস্থ হতে।”
“বুঝতে পেরেছি বাবা। ডক্টর তো বললোই। ওর সাথে একটু দেখা করা যাবে কি না দেখো তো। জ্ঞান আছে কি?”
“জ্ঞান আছে আঙ্কেল। ইরফান ভাই খুব স্ট্রং। জ্ঞান হারায়নি এত ইনজুরি নিয়েও। ডক্টরই ট্রিটমেন্টের সময় সেন্সলেস করে দিয়েছিল। তবে আমরা আসতে দেরি করেছি বিধায় সেসব আমাদের অনুপস্থিতিতে করেছে। এখন সেন্স আছে। আপনি চাইলে দেখা করতে পারেন। দেখা করা যাবে।”
“হ্যাঁ, একটু নিয়ে চলো আমাকে।”
“আসুন।”
দিগন্ত উনাকে নিয়ে যায়। ইরফানের দায়িত্বে থাকা ডক্টরের থেকে পারমিশন নিয়ে ইরফানের কেবিনে প্রবেশ করে। মাথায় একটা ব্যান্ডেজ, ডান হাতেও দেখা যাচ্ছে, পায়েও বেশ কেটেছে। বুকের দিকেও ক্ষত আছে, ব্যান্ডেজ লাগানো সেখানেও। সবখানে ব্যান্ডেজ। খালি গাঁয়ে থাকায় সেসব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দিগন্ত প্রবেশ করেনা ভেতরে। তার গাঁট ফিলিং বলছে বাবা ছেলের একান্তে কথা থাকতে পারে এই মুহূর্তে।
ইরফানের বাবা গিয়ে বসে তার পাশে। আস্তে করে হাতের উপর হাত রাখে। ইরফান চোখ খুলে তাকায়। তবে মাথা তুলেনা। বাবাকে দেখে আবার চোখ বন্ধ করে নেয়। নির্লিপ্ত হয়ে থাকে।
“খুব দরকার ছিল মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করার?”
“আপনার গাঁয়ে লেগেছে?” চোখ বন্ধ রেখেই বলে সে।
হালকা হেসে উঠেন ইরফানের বাবা। “আমার গাঁয়ে লাগবে কেন?”
“এক সময়কার বউ বলে কথা।”
ছেলের কথা শুনে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
“মাকে গিয়ে এসব কথা শুনানো উচিত হয়নি তোমার। নিজেও শান্তি পাওনি। তাকেও কষ্ট দিলে।”
“আমি শান্তি পায়নি আপনাকে কে বললো? আমার রুহ অব্দি ঠাণ্ডা হয়ে আছে তখন থেকেই।”
“শান্তি পেয়েছ? তাহলে এক্সিডেন্ট করলে কিভাবে?”
“আপনাকে ফোন দিয়েছিল সে? আমার নামে নালিশ জানাতে?”
“কথা ঘুরাচ্ছ?”
“ওসব ছোটলোকি কাজ আমি করিনা। প্রশ্ন পছন্দ না হলে উত্তর দিইনা, এটুকুই। আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”
“আমারো তো তোমার প্রশ্ন পছন্দ না হতে পারে। উত্তর নাও দিতে পারি।”
“মাথা খারাপ করবেন না। যা বলেছি উত্তর দিন।”
ইরফানের বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। একরোখা ছেলে। নিজে উত্তর দেবেনা। অন্যের কাছে কৈফিয়ত চাইবে। বাপকেও ছাড় দেয়না।
“নালিশ জানায়নি তোমার মা। ছেলেকে মানুষ করতে না পারলে, তার কাছে দিয়ে দিইনি কেন জানতে চেয়েছে। এত টাকা দিয়ে কি হলো যদি ছেলেকে মানুষ বানাতে না পারি, এসব বলে খোটা দিয়েছে। কেদেছে অনেক।”
“আপনি কি বলেছেন?”
“কিছু বলিনি। শুনেছি চুপচাপ। উত্তর দেওয়ার মতো মুখ কই ছিল আমার কাছে।”
“বেরিয়ে যান।” ইরফান চোখ খুলে এবার। তাকায় বাবার দিকে।
ইরফানের বাবা ছেলের রক্তলাল হওয়া চোখ দুটো দেখেন। তাকিয়ে থাকেন।
“বেরিয়ে যেতে বলেছি আমি, লিভ।”