মৌনপ্রেম

পর্ব - ৪০

🟢

সকাল ৫ টার দিকে ঘুম থেকে উঠেছিল অন্তিক। শরীরচর্চা করে, ফ্রেশ হয়ে ৭ টার দিকে সে নিচে নামে। আজ সে কোর্টে যাবে না। কোর্টে কোন কেইস নেই। এগারোটার দিকে নিজের চ্যাম্বারে যাবে। তার আগে ইরফানের বাড়ি যেতে হবে তাকে। ইরফানের বাবা ফোন করেছে। সে গতকাল থেকে বাড়ি নেই। কোথায় গিয়েছে কিছু বলে যায় নি।

তোশার সাথে কোন ঝামেলা হয়েছে সে বিষয়ে অন্তিক নিশ্চিত। কিন্তু ইরফান ঝগড়া করে উধাও হওয়ার মতো ছেলে নয়। বরং উধাও করার মতো ছেলে সে।

তাহলে কি এমন হলো যে ঝগড়া করে নিজে উধাও হয়ে যাওয়ার দরকার পড়লো। বিষয়টা দেখা দরকার। আর ইরফানের বাবাও তাকে একবার ডেকেছে। কিছু কথা বলতে চান তিনি।

ভাবতে ভাবতে নিচে নেমে সবার সাথে ডাইনিং এ বসে অন্তিক। ইতোমধ্যে খেতে বসেছে সবাই। সেও নিজের জায়গায় বসে খাওয়া শুরু করে।

তার মা আর চাচী সবাইকে সার্ভ করে নিজেরাও বসে পরে শাশুড়ির কথায়। আগে প্রাণেশাও এমন করতো। দুই শাশুড়ির পেছন পেছন থাকতো সবসময়। তাদের হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দেওয়া। আবার তাদের সাথেই খেতে বসা - এসব তার রোজকার নিয়ম ছিল। একদম বউ বউ। ওর কথা মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটে অন্তিকের। কবে যে বাড়ি নিয়ে আসবে। বউ বাচ্চা দুটো নিয়ে থাকবে……

“মা? বাবা আর ছোট বাবা কবে ফিরবে কিছু জানো? আজকের মধ্যে ফিরতে পারবে?” অন্তিক খেতে খেতে মাকে জিজ্ঞেস করে।

“আজ রাতে ফিরবে তো বলেছিল। এখন রাতেই ফিরবে নাকি কাল সকাল হবে তা তো জানিনা।” মা

অন্তিক ‘আচ্ছা’ বলে মাথা নাড়ায় হাঁলকা।

“কেন? কোন কাজ আছে দরকারি?” মা

“না তেমন কিছু না। তোমার বউমার বিষয়টার জন্যই। আজ বিকেল কিংবা রাতে যাওয়া যাবে কিনা দেখতে চাচ্ছিলাম। যায় হোক, কাল হলে কাল যাবো নাহয়। বাবার থাকাটা ইম্পরট্যান্ট।” অন্তিক

মিসেস আয়েশা আমিন সায় জানান। তবে খেতে খেতে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। এখনো পরিপূর্ণ ভাবে স্বস্তি পাচ্ছেন না তিনি। তারা নাহয় গেলেন ওর বাবা ভাইকে বুঝিয়ে নিয়ে আসতে। প্রাণেশাও চলে আসলো মান অভিমান ভুলে। কিন্তু এরপর আদৌ এই দ্বিতীয় সুযোগ কাজে আসবে তো? ছেলের সম্পূর্ণ দোষ না থাকলেও, কিংবা কারোরই দোষ না থাকলেও অনেক সময় সম্পর্ক আদতেই ভেঙে যাওয়ার হয় বলে ভেঙে যায়। উপরওয়ালার ঠিক করে রাখা সব কিছু। ওদের সম্পর্কটা যেন তেমন না হয় সে নিয়ে অনেক চিন্তা আয়েশা আমিনের। কারণ শুরু থেকে একটা না একটা ঝামেলা হচ্ছেই, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত। তাই উনার মনে ভয় ঢুকেছে। খুব চিন্তায় থাকেন এসব নিয়ে। অন্তিক খেতে খেতে মায়ের অন্যমনস্কতা খেয়াল করে। কি হলো ভাবতেই, নিজের ভেতর থেকে উত্তর আসে - তাদের নিয়েই চিন্তিত মা।

সে কিভাবে মাকে আশ্বস্ত করলে মা একটু নিশ্চিন্ত হবে তা জানে না। কিন্তু তাকে নিয়ে এভাবে চিন্তিত থাকতে দেখতে পারবেনা মাকে। মায়ের তাকে নিয়ে কখনো সেভাবে চিন্তায় করতে হয়নি। দুশ্চিন্তা তো দূরে থাক। আজ এভাবে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায় নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। দেখা গেলো মা ছেলের মনস্তাত্তিক চিন্তা ভাবনার মধ্যে বাকিদের ব্রেকফাস্ট শেষ। দুজনেই অল্প অল্প করে খেতে খেতে পেছনে পরে গিয়েছে। বিষয়টা খেয়াল করে অন্তিক মাকে একান্তে কিছু বলার পায়।

“মা?”

“হু? কিছু বলবি?” অন্যমনস্কতায় ছেলের ডাক শুনে তাকান তিনি।

“এত দুশ্চিন্তা করো না মা। শেষ বার আমার উপর বিশ্বাস রাখো। এবার কাউকে হতাশ করবোনা, প্রমিস করছি তোমাকে।

শেষবার বিশ্বাস রেখে নিশ্চিন্তে থাকো। দুশ্চিন্তা ছেড়ে দাও প্লিজ। তোমাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছেনা।”

মিসেস আয়েশা আমিন মৃদু হাসেন ছেলের আশ্বস্তবাণী শুনে।

“তোকে অবিশ্বাস কবে করলাম, যে শেষবার বিশ্বাস করতে হবে? আমি আমার বাড়ির সব ছেলে মেয়েদের বিশ্বাস করি। আমরা সবাই মানুষ, পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে কিংবা অবচেতন মনে সবাই টুকটাক ভুল করি। এসব স্বাভাবিক। আমার বিশ্বাস আমার ছেলেমেয়েরা বুঝে শুনে ভুল কিছু করেনা। শুধু কার ভাগ্যে কি লেখা আছে, তা নিয়ে একটু চিন্তা হয়। এই যা……” বলতে বলতে তিনি ভারী নিঃশ্বাস ফেলেন।

অন্তিক বুঝতে পারে, মায়ের মধ্যে মা সূচক চিন্তা ভাবনা গুলোই ঘুরঘুর করছে। যায় হোক, এসব চিন্তা থেকে একটু রিলিফ দিতে খুশির খবর দেওয়া ছেলে হিসেবে তার কর্তব্য। একথা ভেবে আবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে মায়ের।

“শুনো মা, একটা খবর আছে। দরকারি খবর।”

“দরকারি? কি দরকারি খবর? কিছু হয়েছে।” কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চান তিনি।

“হয়নি, হবে। খুশির খবরও বলতে পারো।”

“তো খুশির খবর মুখটা হাসি খুশি রেখে বলা যায়না? আশ্চর্য! ভয় পেয়েছিলাম।” ছেলের উপর কিছুটা চওড়া হয়ে বলেন তিনি।

অন্তিক হাসে মায়ের কথা শুনে। একপলক তাকিয়ে আবার নিজের প্লেটে মনোযোগ দেয়। খেতে খেতে স্বাভাবিক স্বরে বলে দেয়,

“তুমি বুড়ো হয়ে গিয়েছ। দাদী হচ্ছো খুব তাড়াতাড়ি।”

মিসেস আয়েশা আমিন প্রথমে কথাটা মাথায় ক্যাচ করতে পারেন নি। অন্তিকেরও আলাদা কোন এক্সপ্রেশন নেই। তাই বিভ্রান্ত চোখে তাকান। সেকেন্ড কয়েক যেতে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বিস্ময়ে তাকান।

“আসলেই?” হতবাক চিত্তে জানতে চান

অন্তিক খেতে খেতে জবাব দেয়,

“হ্যাঁ, যেদিন হামলা হলো সাহিল আর ওর উপর? সেদিন হস্পিটাল থেকে আসছিল। কি কারণে হস্পিটাল গিয়েছিল খোঁজ নিয়েছিলাম। তোমার বউমা প্রেগন্যান্ট, মা হচ্ছে সে। তুমিও দাদী হবে। নাও তোমার আশা পূরণ হলো। ছেলের বিয়ের আগেই, মেয়ে দেখার আগেই - নাতি নাতনি নিয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতে। কিছুমাস পর তোমার সে স্বপ্ন পূরণ হবে।”

হতবাক হয়েই ছেলের কথা শুনেন আয়েশা আমিন। কি অবলীলায় কথাগুলো বলে দিলো। অথচ উনার খুশিতে বুক ধরফর করছে। এমন দিনও দেখে যেতে পারবেন ভাবেননি তিনি। আগে ভাবলেও অন্তত ছেলের বিয়ের পর সে ভাবনা আর আসেনি। যেখানে তাদের সংসারটাই হবে কিনা, টিকবে কিনা সে নিয়ে দন্ধে ছিলেন ভেতরে ভেতরে।

এমনিতে খুব বিবেচক ব্যক্তিত্বের মানুষ তিনি। কিন্তু এই মুহূর্তে দাদী হওয়ার খুশির বিপরীতে আর কিছু মাথায় আসছেনা।

যা আসছে কেবল সৃষ্টিকর্তার প্রতি লাখ লাখ শুকরিয়া। একটু আগেও ছেলে মেয়ে দুটোর সংসার আদৌ উপরওয়ালা লিখে রেখেছেন কিনা তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। আর এখন সৃষ্টিকর্তা নিজেই বার্তা দিয়ে দিলো। বাচ্চা উপরওয়ালার দেওয়া সবচেয়ে সুন্দর নেয়ামত। খুশি হবেন না?

শাশুড়ি, জা সবাইকে জানান। ছেলে মেয়েরাও জানতে পারে। মুহূর্তেই বাড়িতে হইছই পরে যায়। অন্তিকের চাচী মিষ্টিমুখ করান সবাইকে। অন্তিকও ব্রেকফাস্ট সেরে উঠেছে ততক্ষণে। খবরটা জানলে এমনই অবস্থা হবে বাড়িতে তা সে জানতো।

মা বাকি খাবার রেখেই উঠে গিয়েছে সুখবর জানাতে সবাইকে। অন্তিকও উঠে পড়ে। সবাইকে একটু স্থির হয়ে বসতে বলে।

অন্তিকের কথায় সবাই শান্ত হলেও উত্তেজনা কমেনা। হঠাৎ এমন কোনো খবর পাবে তারা কেউ আশা করেনি।

প্রাণেশাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার তাড়া আরো বেড়ে যায়। অন্তিক বাবা আর ছোট বাবাকে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে চলে আসার জন্য বলতে বলে মা-চাচীকে। তারা এলেই যাবে ওবাড়ি। নিয়ে আসবে।

বাড়িতে উৎসবমুখর পরিবেশ হয়ে যায়। মাহমুদ সরোয়ার আর মুনতাসির সরোয়ার গিয়েছেন কুমিল্লা, ব্যাবসার কাজেই। আয়েশা আমিন ফোন করে ওখানকার রশমালাই নিয়ে আসার তলব করেন। স্বামী হঠাৎ এই মিষ্টান্ন খেতে চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন না। সামনা সামনি জানাবেন খুশির খবর।

অন্তিক বেরিয়ে পড়েছে। ইরফানের বাড়ির উদ্দেশ্যে। আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌছে যায়। ইরফানদের বাড়িতে মানুষ বলতে মেইডদের দেখা যায় বেশিরভাগ সময়। পরিবারে কোন মহিলা নেই। যে বাড়িতে মেয়েমানুষ থাকেনা, সেই বাড়ি যেন শ্মশান। সদস্য বলতে শুধু তারা বাবা ছেলে। ছেলে ছন্নছাড়া-বেপরোয়া স্বভাবের। আর বাবা মারাত্মক ধরণের বিজনেস পার্সন। উনার চারপাশটা শুধু কাজ, কাজ আর কাজ। যন্ত্র মানব যাকে বলে। টাকা চেনেন বেশি। এই অভিযোগ নিয়ে প্রিয়তমা স্ত্রীও ছেড়ে চলে গেলো বহু আগে। একটু সময় চেয়েছিল সে। তিনি দেন নি। টাকার পেছনে ছুটেছেন দিনরাত। তারপর যখন ভুল বুঝতে পারে, সময় দিতে চায়। তখন আর উপায় ছিল না। তারপর থেকে আরো যন্ত্রমানব হয়ে পড়েন। কিন্তু যন্ত্রমানবই হলে ছেলের জন্য মন পুড়বে কেন? ইরফান না মানলেও, তার বাবা তাকে ভালোবাসে। শাারীরিক মানসিকভাবে এত শক্ত একজন মানুষ স্ট্রোক করে ফেলেছিলেন ছেলের দুশ্চিন্তায়। কিন্তু ইরফান সেসব অদেখা করে চলে এখনো।

অন্তিক ইরফানদের বাড়ি এসে ড্রয়িং রুমে বসে। তার এবাড়িতে আসা যাওয়া হয় প্রায়সময়। প্রিয় বন্ধুর বাড়ি আসা যাওয়া না থাকলে চলে? কারণে অকারণে ছুটে আসতে হয়। এই যে এখনো এলো। সে বসে মিনিট কয়েক পর মেইড এসে কফি দিয়ে যায়। এটা প্রতিবারের নিয়ম। সে আসলেই তার ব্ল্যাক কফি মাস্ট থাকে। মেইডকে দিয়ে রুমে ইরফানের বাবার কাছে তার আসার খবর পাঠায়। মিনিট দুয়েক পর আসেন ভদ্রলোক। এসে সামনা সামনি বসেন।

“তো? কি অবস্থা ইয়াং ম্যান? বউয়ের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে?”

“জি আঙ্কেল। দুদিন হলো ওকে পেয়েছি।” অন্তিক স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দেয়। প্রিয় বন্ধুর বাবা হিসেবে তার সাথে সম্পর্ক ভালো। ইরফানের মতোই স্নেহ করে তাকে। সেও শ্রদ্ধা করে, তবে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্কটা। তাই স্বাভাবিক কথোপকথন চলে।

“তো কোথায় পেলে? কোথায় ছিল এতদিন, কিছু জানতে পেরেছ? মান অভিমান ভাঙ্গিয়েছ? এটা করতে দেরি করোনা। নাহয় পরে আফসোস ছাড়া কিছু করতে পারবেনা।”

অন্তিক উনার কথার গভীরতা বুঝতে পারে। মাথা নাড়িয়ে বলে,

“হ্যাঁ, ওর ভাইয়ের সাথে চলে গিয়েছিল বাবা বাড়ি। সামনে দুয়েকদিনের ভেতর ফিরিয়ে আনবো। মান অভিমানও ভাঙিয়ে নিয়েছি, চিন্তা করবেন না। আপনি কিছু বলবেন বলছিলেন? কোন সমস্যা হয়েছে ইরফানকে নিয়ে?”

“আরেহ তেমন কিছু না। বিচলিত হইয়োনা। তবে কাল থেকে বাড়ি আসেনি। কল ও ঢুকছেনা না। এমন তো করেনা অনেক গুলো দিন পার হয়ে গেলো। আবার কোথায় চলে গেলো বুঝতে পারছিনা।”

“চিন্তা করবেন না। আমি খোঁজ নিচ্ছি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জেনে যাবো। কিন্তু আপনি হয়তো অন্য কিছু বলতে আমাকে ডেকেছেন।”

ভদ্রলোক হাসেন অন্তিকের আন্দাজশক্তি আর কিউরিসিটি দেখে।

“হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। তোশা মা তো এবাড়ির চৌকাট পেরোইনা অনেক দিন। ওকে বাড়ি আনার কথা ভাবছিলাম, সেই বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই।”

অন্তিক উনার দিকে তাকায়। সে আন্দাজ করতে পারছে কিছুটা, তিনি কি বলতে যাচ্ছেন সেটা।

অন্তিকের বিষয়টা বুঝতে পেরে ইরফানের বাবাও হাসেন।

“ঠিক ধরেছ। বিয়ের কথায় ভাবছি। ওরা নিজেদের মধ্যে এরকম সাপে নেউলে ঝগড়া ঝাটি সারাজীবন জারি রাখবে যতদূর চিনেছি। ওদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সময় আরো দিতে থাকলে এ জীবনে আর ছেলের সংসার দেখে যাওয়া হবেনা। তাই ভাবছিলাম এবার অন্তত যেভাবে পারি বিয়েটা দিয়ে দিই। তুমি বোঝাও দুই বন্ধুকে। তুমিই ভরসা। তারপর মারামারি কা টা কা টি যা করার করুক। ঘরটা আলোকিত থাকবে মেয়েটা আসলে। এভাবে আর ভালো লাগছেনা। অনেকগুলো বছর তো কাটালাম বাবা ছেলে।”

“হুম। আমি অবশ্যই বোঝাব। আর সত্যি বলতে আমি নানান ভাবে আগেও বুঝিয়েছি। কিন্তু কাজ হয়নি। সেই ঝগড়া ঝাটি লেগে থাকে। মেইন পয়েন্ট থেকে সরে যায় এসব করতে করতে। এবারো বোঝাব। তবে দুজনেই যেহেতু প্রাপ্তবয়স্ক। তাই আল্টিমেট ডিসিশন ওদের হাতেই।”

তিনি মাথা নেড়ে সায় জানান।

“ঠিক আছে। তুমি এবার ইরফানের খোঁজ নাও একটু। না জানি কোথায় গিয়ে পরে আছে আমার ছেলেটা।”

অন্তিক ফোনে ইরফানের লোকেশন দেখতে দেখতে বেরিয়ে পরে। এখানেই ঢাকায় দেখাচ্ছে লোকেশন। পুরান ঢাকায়। কিন্তু এই ছেলে ওখানে কি করছে? কল দিলে নট রিচেবল দেখায়। তবে তাকে পুরান ঢাকায় দেখে আর ঘাটায়না। কোনো দরকারে গিয়েছে হয়তো। তারপর চলে যায় নিজের চ্যাম্বারে।

পুরান ঢাকা ইরফানের মা এসেছে। তার বর্তমান সংসারের ছেলে মেয়েদের নিয়ে ঘুরতে। বিদেশ ফেরত তারা। দেশে এসেছে কিছু দিন হলো। ঘুরতেই এসেছে সবাই মায়ের দেশে। এখন পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক জায়গাগুলো এক্সপ্লোর করছে। ঘুরাঘুরি করছিলেন ভদ্রমহিলা ছেলেমেয়েদের নিয়ে, বেশ আনন্দে। হঠাৎ ইরফান সামনে গিয়ে দাড়ালে তিনি চিনে উঠতে পারেন না। তার মেয়ে দুটো আর ছেলেটা ইরফানকে পথ আঁটকে দাড়াতে দেখে বিরক্ত হয়।

“এক্সকিউজ মি মিস্টার? হোয়াই আর ইউ ব্লকিং দা ওয়ে?”

ইরফান তাদের দিকে তাকায় না। মায়ের দিকেই চেয়ে রয়। তার মাও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তিনিও প্রথমে বিরক্ত হয়েছিলেন। পরে চেহারাটা দেখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। পলক ফেলে বলেন,

“ইরফান?”

“চিনতে পারলেন তাহলে?”

“তুমি সত্যি ইরফান?” মহিলা অবাকস্বরে জানতে চান। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ছেলের দেখা পেয়ে তিনি ভীষণ খুশি।

কিন্তু এমন নাটকে ইরফান বিরক্ত হয়। এর মধ্যে পেছন থেকে উনার বড় মেয়ে জানতে চায়,

“হু ইজ হি মম? ইউ নো হিম?”

“হি ইজ ইউর ব্রাদার অ্যানি। মাই ফার্স্ট চাইল্ড। মাই সান।” আবার হেসে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “ইরফান হিস নেইম। মিট হিম, ইউর বিগ ব্রাদার।”

অ্যানিসহ বাকি ছেলেমেয়ে দুটো মায়ের কথায় কিছুটা অবাক হয়ে তাকায় ইরফানের দিকে। তারা জানে মায়ের আরেকটা ছেলে আছে আগের ঘরের। তবে কখনো দেখেনি। প্রথম দেখল। চেহারার আদল অল্প একটু মায়ের মতো। তবে পুরোটা নয়। তাদের বিশ্লেষনের মধ্যে শুনতে পায় ইরফানের কর্কশ কণ্ঠস্বর।

“আম নট হেয়ার টু মিট ইউর এন্ড ইউর সেকেন্ড হাসব্যান্ডস প্রোডাক্টশনস। আই নিড আ স্টেটমেন্ট ফ্রম ইউ।”

তার কথা শুনে মা সহ ভাই বোনেরাও কিছুটা অবাক। এসব কেমন ধরণের কথাবার্তা?

“হোয়াট কাইন্ড অফ শিট আর ইউ টকিং?” ছেলেটা বলে।

“হুশ!! কিপ কুয়াইট। দ্যাটস মাই কাইন্ড অফ শিট!”

মা আদুরে স্বরে বলে,

“ইরফান এভাবে কথা বলছ কেন? আমার বুকে এসো প্লিজ একটু। কতোগুলো বছর পর তোমাকে দেখালাম। আমার বাচ্চা।” কথাটা বলে তার দিকে এগিয়ে আসতে চাইলে ইরফান আঁটকে দেয়।

“নাটক বন্ধ করুন। আমার একটু দরকার আছে। একটা স্টেটমেন্ট লাগবে। তারপর ছানাপোনা নিয়ে যতো ইচ্ছে ঘুরাঘুরি করুন।”

ইরফানের মা ভীষণ ব্যাথিত হন ছেলের ফিরিয়ে দেওয়ায়, আর এমন ব্যবহারে। ইরফান তাকে নাটক করছে বললো? তিনি নাটক করছেন? ছেলেকে একটু বুকে টেনে নেওয়া নাটক?

“আমার ছেলেকে একটু বুকে নিতে পারবো না? নাটক করতে হবে আমাকে?” ব্যথিত স্বরে জানতে চান।

“একদম। নাটকই এসব। এতবছরে ছেলের কথা মনে পড়েনা। একটা ছেলে আছে সে কথায় তো ভুলে বসেন। আবার এখন এসব ইমোশনাল ড্রামা করে কি বুঝাতে চাচ্ছেন? ডিজগাস্টিং!”

ইরফানের কথায় উনার বাকি ছেলেমেয়েরা রেগে যায়। তারা বাংলা না বুঝলেও মাকে অপমান করে কিছু বলছে বুঝতে পারে। এতক্ষণ তবু মায়ের ছেলে বলে চুপ ছিল। এখন ‘ইমোশনাল ড্রামা, ডিজগাস্টিং - এসব শব্দ শুনে তারা রেগে কিছু বলতে চাইলে মা আঁটকে দেয়। তিনি বুঝতে পারছেন ইরফানের মনে তাকে নিয়ে কোন ভালোবাসা নেই, টান নেই। বরং যা আছে সব বিতৃষ্ণা। এসব বুঝতে পেরে তিনি ভীষণ কষ্ট পান। তবু ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করেন,

“কিসের স্টেটমেন্ট লাগবে তোমার? কি জানতে চাও?”

“হ্যাঁ, আপনি বলবেন আমি বেজন্মা কিনা? আমি কি বাস্টার্ড?”

“ইরফান…!!!”

“চিৎকার করবেন না। জবাব দিলে হবে শুধু। আমি চলে যাবো।”

“তুমি আমাকে অপমান করছ, অসম্মান করছ।” ছলছল চোখে বলেন।

“হ্যাঁ, জানি তো। আরো একজন বলেছে। আমার জীবনের একমাত্র নারী, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নারী। সেও বলেছে আমি মেয়েদের সম্মান করতে জানিনা, মেয়েদের কি বলতে হয়, না হয় সেসব কিছু জানিনা আমি। আমার মা আমাকে সেই শিক্ষা দেয়নি।

আরো বলেছে; বলেছে আমি এসব শিখবো কি করে? জানবো কি করে? মেয়েরা তো মায়ের জাত হয়। আমার মা-ই নেই। মা না থাকলে জানবো কি করে মায়ের মূল্য, মেয়ের মূল্য; তাইনা? সত্যই বলেছে। আমিও মানি। কিন্তু সে আমাকে বাস্টার্ড ও বলেছে। এটা মানতে পারছিনা কিছুতেই। তুমি তো আমাকে জন্ম দিয়েছ। তুমি জানবে। বলো আমি বেজন্মা কিনা, বলো বলো।”

ইরফানের মা ছেলের কথা শুরুর দিকেই কাঁঁদতে শুরু করেছেন। নিতে পারছেন না এসব। কাঁঁদতে কাঁদতে বলেন,

“তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করতে। আমার কাছে কেন এসব বলতে এলে।”

“বাবা বললে যদি ও বিশ্বাস না করতে চাই? আমাকে যদি তাও বেজন্মা বলে? বাবা তো ভুলও জানতে পারে। আসল সত্য তো তুমি বলতে পারবে। তাছাড়া কেন জানি আমারো সন্ধেহ হচ্ছে। আমার জন্ম হয়তো তোমার কোন ভুল ছিল। নাহয় একটা সন্তান আছে, একথা কেউ কি করে ভুলে যেতে পারে? তুমি বলো?”

ইরফানের গালে থাপ্পড় দিয়ে কাঁদতে কাঁঁদতে মা বলতে থাকেন,

“অনেক ভালোবাসো, তাইনা? ঐ মেয়েটাকে? অনেক ভালোবাসো। ওকে বিশ্বাস করানোর জন্য মাকে কষ্ট দিতে দুবার ভাবলেনা। না, একবারো ভাবোনি তুমি। তবে ঠিক বলেছে মেয়েটা। আমি তোমাকে কোন শিক্ষা দিতে পারিনি। মেয়েদের, মায়েদের কি বলতে হয়, না হয় - কিছু শেখাতে পারিনি। আমার দোষ এসব। তোমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে আসা উচিত ছিল। খুব বড় ভুল করেছি। আর হ্যাঁ, ঐ মেয়েকে বলে দিও। তুমিও পবিত্র, আমিও পবিত্র। আমি কোনো নাজায়েজ সন্তান জন্ম দিইনি, তুমিও বেজন্মা নও। আমরা দুজনেই পবিত্র। ওকে বলে দিও। আমি খারাপ মা বলে তোমার খোঁজ নেয় নি। খারাপ মা বলে। ভুল জন্ম বলে নয়।”

ইরফান সব কথা রেকর্ড করে নিয়েছে ফোনে। শক্ত হয়ে দাড়িয়ে সব কথা শুনে ‘ধন্যবাদ’ বলে চলে আসে।

ইরফান চলে যায়। কিন্তু তার মা সেখানেই বসে পড়ে কাঁদতে কাঁঁদতে। ছেলেমেয়েরা থামাতে চাইছে। কিন্তু উনার কান্নার বাধ থামছেনা। এত কষ্ট উনার এ জীবনে কখনো হয়নি। কোনোদিন না।

ইরফানের বাবার সংসার যন্ত্রের মতো করে গেলেও হয়তো এত কষ্ট লাগতো না। ছেলের কথা ভেবে একটু মানিয়ে নিলে বোধ হয় আজ এই দিন দেখতে হতো না। তখন স্বার্থপর হয়ে একটু সুখের আশায় চলে এসেছিলেন। ইরফানের বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু যে সুখের আশায় তিনি স্বামী সন্তান ত্যাগ করে এসেছেন। সেই সুখ পেলেও। ছেলেকে যে একাকীত্মের জীবন উপহার দিয়ে এসেছিলেন সেই জীবনের সামান্য হাহাকারের উপর আজ সব সুখ তুচ্ছ হয়ে গেলো। এক লহমায় সব সুখ অনর্থক ছিল প্রমাণিত হলো। কিন্তু এসব কেন ফিরিয়ে দিলো সৃষ্টিকর্তা। সে তো ছেলেকে নিয়ে আসতে চায় নি এমনটা নয়। কিন্তু টাকার ক্ষমতার কাছে হেরে গিয়েছেন। তাহলে? কিসের শাস্তি দিলো? ইরফানের বাবা শুধ্রে যাবে বলার পরও তাকে সুযোগ না দিয়ে সংসার ভাঙার শাস্তি? অমনি চারদিক থেকে নিজের অদৃশ্য আওয়াজ পান তিনি,

“হ্যাঁ, সৃষ্টিকর্তা সবচেয়ে বেশি নারাজ হন সংসার ভাঙলে। সে তো পরকীয়ায় লিপ্ত হয়নি, না তোমাকে অভাবে রেখেছে, না মারধর করেছে। এমন কোন জগন্য অপরাধ সে করেনি। তবে সময় না দেওয়ার মতো একটা গুরুতর অপরাধ করেছে। তার জন্য ক্ষমাও চেয়েছে সে, আরেকটা সুযোগ চেয়েছে বার বার। তুমি দাওনি। তুমি দাওনি। নিজের জেদে অটল থেকেছ। ছেলের কান্না, স্বামীর নীরব হাহাকার উপেক্ষা করে এসেছ। নতুন জীবন পেয়ে ছেলেকে ভুলেছ।”

ইরফান ভয়েসটা তোশার কাছে পাঠিয়ে দেয়। নিচে লিখে দেয়, “আম নট আ বাস্টার্ড।” তারপর বাইকে স্টার্ট দেয়। কাল তোশার ওখান থেকে বের হয়ে অনেক ভেবেছে। “মা নেই তাই, মা নেই তাই” শুধু এই কথাটাই মাথায় আসছিল। শেষে সিদ্ধান্ত নেয় মায়ের মুখোমুখি হতে হবে। তার কাছেই আছে সব উত্তর। তার সব প্রশ্নের উত্তর মায়ের কাছেই থাকবে। সে তো বিদেশ যাবে ঠিক করে ফেলেছিল মায়ের মুখোমুখি হতে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে তিনি এখন দেশে আছেন। স্বামী, সন্তান নিয়ে। এসেছিল কৈফিয়ত চাইতে। কিন্তু কি কৈফিয়ত চাইবে তা সে জানেনা। কিভাবে কিভাবে চেয়ে ফেললো। কষ্ট দিয়ে এলো। যেভাবে সে এতগুলো বছর পেয়ে এসেছে।

তার সবেচেয়ে বেশি গাঁয়ে লেগেছিল মা না থাকার খোটা দেওয়ায়। এটা তার জীবনের একটা সবচেয়ে বড় না পাওয়া। আর তার সবকিছু পাওয়ার স্বভাব। না পেলে কেঁড়ে নেওয়ার স্বভাব। সেখানে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাই নেই। কেঁড়ে নেওয়ারও সাধ্য নেই। তোশার মুখে এই দূর্বলতার খোটা শুনে ভেতরটা ফেটে যাচ্ছিল, সব জালিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। মায়ের জন্য এত তড়পেছে সে, একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, রাত হলে ঘুমানোর সময় একটু মাকে কাছে পেতে, জ্বরের সময় মায়ের হাতের লোকমা খেতে, মায়ের মুখে গান শুনে ঘুমানোর অভ্যাস থাকায় সারারাত তড়পাতো মাসের পর মাস। তাও পায় নি। লজ্জ্বার কথা না? এত চেয়েও পায় নি। ইগোতে লেগেছে।

মায়ের প্রতি ভালোবাসা আসেনা তার এখন আর। সে মায়া অনেক আগে কেটেছে। বাস্টার্ড বলে সেও কতজনকে গালি দিয়েছে, আবার নিজে খেয়েছে। কিন্তু কাল কেন জানি মনে হলো - জন্মেই ভুল আছে হয়তো, নাহয় মায়েরা ভালো না বেসে পারে?

তবে আজ পেলো সে উত্তর। পারে, মায়েরা খারাপ হলে ভালোবাসেনা। সন্তানদেরও ভুলে যায়। তার জন্য বেজন্মা হতে হয় না।

আগের বিধ্বস্ততা থেকে মানসিক রিলিফ পেলেও। কেন জানি এখন নতুন অস্থিরতা কাজ করছে মন মস্তিষ্কে। নানা রকম ভাবনা চিন্তা আসছে মাথায়। শেষে নিজেই বাইক চালাতে চালাতে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলে উঠে, “না। কোন ভুল করিনি। একদম উচিত কাজ হয়েছে। এত সুখের নেশা তার। একটু দুঃখও পাক। সুখ পেতে পেতে অতিষ্ঠ হয়ে গেলে? মাকে অতিষ্ঠ হতে দেওয়া যায়? যায় না। একদম না।” চলন্ত বাইকের শাঁ শাঁ আওয়াজের সাথে তার কথাগুলো মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। অথচ মন বলছে মায়েদের কষ্ট দিয়ে কেউ ভালো থাকতে পারেনা, কেউ না। সেও শাস্তি পাবে।

এসব ভাবতে ভাবতে সামনে থেকে বড় ট্রাকটা কবে যে কাছাকাছি চলে এলো, বুঝতেও পারেনা ইরফান। সামাল দেবে তো দূরের কথা।

মৌনপ্রেম পর্ব ৪০ গল্পের ছবি