ঢাকার ব্যস্ত শহরের ভেতর, এক আধুনিক ফটোস্টুডিওর দরজাটা খুললেই অন্য এক জগৎ। বাইরে গাড়ির হর্ন, ধুলাবালি, মানুষের তাড়া - আর ভিতরে একদম আলাদা নীরবতা, শুধু আলো আর শাটারের শব্দে ভরপুর।
স্টুডিওর মাঝখানে বড় একটা ব্যাকড্রপ টানানো। অফ-হোয়াইট আর ধূসর মিশ্র রঙের, যাতে আলো পড়লেই নরম ছায়া তৈরি হয়। এক পাশে বড় একটা সফ্টবক্স লাইট রাখা আছে, অন্য পাশে রিফ্লেক্টর বোর্ড। ওপরে থেকে লাইটিং রিগ ঝুলছে, ফটোগ্রাফার আলোর অ্যাঙ্গেল মিলিয়ে নিচ্ছে।
তোশা মেকআপ রুম থেকে বের হয়ে আসে। তার পড়নের ড্রেসটি খুব স্টাইলিশ, আর নিখুঁতভাবে সাজানো। নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসতেই মেকআপ আর হেয়ার স্টাইলিস্ট ফাইনাল টাচ দিতে শুরু করে। তাদের কাজ শেষ হলে তোশা সামনে তাকায়। চারপাশের লাইটিং এর কারণে সামনে তাকাতেই চোখে আলো পড়ে।
ক্যামেরাম্যান বসেছে ট্রাইপডে লাগানো হাই-এন্ড ক্যামেরা হাতে, মাঝে মাঝে লেন্স পাল্টাচ্ছে। সে ক্যামেরার দিকে চোখ রেখে বারবার বলে,
“লাইট একটু লেফট থেকে নিয়ে আসো।, , , , , হ্যাঁ, এইভাবে।, , , , পারফেক্ট!”
তারপর তোশাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “লুক হেয়ার। , , , , চিন আপ।, , , , , স্মাইল! দ্যাটস ইট!”
তার পাশে লাইটম্যান পজিশন ঠিক করছে, হালকা পাতলা গড়নের একটা ছেলে অল্প করে ফ্যান চালিয়ে দিচ্ছে যেন চুলে হাওয়া খেলে যায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে অ্যাসিস্ট্যান্টরা প্রপস ঠিক করছে। ফুল, চেয়ার আর ছোট্ট টেবিল - যেখানে তোশা হালকা ভর দিয়ে দাঁড়াবে।
ক্লিক ক্লিক ক্লিক!!! প্রতিটি ফ্ল্যাশের সাথে তোশার বিভিন্ন এঙ্গেলের ছবি ফ্রেম বন্দি করছে ক্যামেরাম্যান। মাঝে মাঝে সে আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে দেখে নেয়, সামান্য চুল ঠিক করে আবার পোজ নেয়। মিউজিক বাজছে হালকা, যাতে মুডটা আরেকটু প্রাণবন্ত হয়।
সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত, খুব মনোযোগী সমন্বয় কাজ করছে পুরো সেটে। তোশার ফটোশুট শেষ হয়। ক্যামেরাম্যানের পাশে গিয়ে তার হাতে থাকা ক্যামেরাতে ছবিগুলো দেখতে থাকে। কোনটা ভালো লেগেছে, কোনটা লাগেনি তা নিয়ে আলোচনা করে। এমন সময় বাইরে থেকে একটা মেয়েকে তাড়াহুড়ো করে ভেতরে আসতে দেখা যায়। মেয়েটা এখানেরই একজন স্টাফ। সে অস্থির ভঙ্গিতে এসে হরবরিয়ে বলে,
“ম্যাম, বাইরে একটা লোক এসেছে। আপনাকে খুজছে। আমি বলেছি আপনার ফটোসেশন চলছে, এখন বাইরের কারো ভেতরে আসা সম্ভব না, ম্যামও ফ্রি নেই। তাও লোকটা শুনছে না। শুটিং সেট উড়িয়ে দেবে বলছে। আমার মনে হয় কোন আততায়েী হবে। বুঝতে পারছি না কি করবো।”
মেয়েটির কথা শুনে সকলে তাকায়। হঠাৎ এখানে কোন আততায়ী আসবে কেন? আর এসে তোশাকেই বা খুঁজবে কি কারণে? সবাইকে বিচলিত দেখায়। হ্যাংলা পাতলা গড়নের ছেলেটা ফোনের ভিডিও অন করে দিয়েছে। যদি আসলেই কোন স ন্ত্রা স বা আততায়ী হয়? দরকার পরলে লাইভে যাবে।
সবাইকে বিচলিত দেখালেও তোশাকে তেমন একটা ভয় পেতে দেখা যায় না।
“কোন আততায়ী নয়। সাইকো একটা। তুমি বলো তোশা ম্যাম একটু আগে বেরিয়ে গেছে।” তোশা
মেয়েটিকে একটু দ্বিধান্বিত দেখায়। “কিন্তু আমিতো বলেছি আপনি ফটোশুট করছেন।”
তোশা বিরক্ত হয় কিছুটা। সে আর কিছু বলবে তার আগে দেখা যায় ইরফানকে গটগট পায়ে ভেতরে আসতে। পেছন থেকে দুটো গার্ড তাকে আটকাতে চাইছে। কিন্তু ইরফান বেপরোয়া ভঙ্গিতে হেটে ভেতরে চলে আসে তাদের উপেক্ষা করে।
ভেতরে এসে একপলক চারদিকে তাকিয়ে তোশাকে দেখতে পেয়ে তার দিকেই এগিয়ে যায়। তবে কথাটা আগে তোশাই বলে,
“কি সমস্যা? এখানেও নিজের গু ন্ডা গিরি দেখাতে হবে?”
“থাপ্রে দাঁত ফেলে দেবো বেয়াদব।” দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলে তোশাকে আপাদমস্তক দেখে। তারপর বাকিদের দিকে তাকায়। কপালের রগগুলো ফুলে উঠেছে ইরফানের। ভীষণ রেগে আছে বোঝায় যাচ্ছে।
তোশা ইরফানের রাগকে ভয় না পেলেও। মানুষজনের সামনে রাগ দেখালে খুব অপ্রস্তুত হবে। কারণ গোয়ার ছেলেটার রাগ দেখানোটাও তেমন ধরণের। তাই তাকে বাকিদের দিকে চোয়াল শক্ত করে তাকাতে দেখে তোশা সবাইকে ইশারা করে, যেন বেরিয়ে যায়। স্টুডিওটা তার মামার। বেশ বড় আর জনপ্রিয়, তার মামার স্টুডিওটা। সে নিজের ডিজাইন করা ড্রেসের মডেল হয়ে নিজে ফটোশুট করবে বলার পর তার বাবা মা কেউ মানতে চায় নি। পরে তার জেদের কাছে হার মেনে নিজের ভাইকে জানিয়েছেন মেয়ের বিষয়টা তার মা। মামা নিজেই এখানে, অর্থাৎ নিজের স্টুডিওতে ফটোশুট করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। মামারও থাকার কথা ছিল। কিন্তু একটা কাজে আটকা পরায় আর আসা হয় নি। তবে নিজের ভাগ্নির ফটোশুট চলবে আজ, তাই সর্বোচ্চ ফ্যাসালিটিজ দিয়ে রেখেছেন।
ওরা সবাই চলে গেলে ইরফান শক্ত করে তোশার বাহু ধরে তাকে কাছে টেনে নেয়। রেগে আছে সে খুব। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“ডানা গজিয়েছে না? খুব শখ মডেলিং করার। ঐ ছবিগুলোর একটাও যদি কোন সাইটে যায়। কসম তোর শেষ দিন হবে ঐ দিনটাই।”
“তোর কথা নাকি সবসময়? আর আমি ন্যাংটা ছবি তুলিনি, যে কোনো সাইটে গেলে তোর চুলকানি হবে। এসব ফালতু রাগ অন্য কোথাও গিয়ে দেখা।”
“মাথা গরম করিস না তোশা। তোকে আমি ছবি তুলতে মানা করিনি একবারো। শুধু বলছি মানুষের এটেনশন গ্রেভ করতে বিজনেসের জন্য তোলা ঐ ছবিগুলো কোথাও না দিতে। আর এটা তোকে মানতেই হবে। নাহলে আমি কি করবো তুই ভাবতেও পারছিস না।”
“তোর ইচ্ছা সব? আমার পাসপোর্ট চুরি করে শান্তি হয় নি? আমি কাজেও ফিরতে পারবো না। এখানেও নিজের জন্য কিছু করতে পারবো না। তুই চাইছিসটা কি?”
“কানাডা যেতে মানা করিনি। যাবি, আমিসহ। হানিমুনে যাবো। ওখানে তোর আর কোন কাজ দেখছিনা।”
“আমার কাজ আমিই দেখবো। তোর দেখে কাজ নেই।”
ইরফান গরম চোখে তাকায়।
“এভাবে তাকাবিনা একদম। পাসপোর্ট দিয়ে দে। আমিও আর কোন মডেলিং করবো না।”
“সম্ভব না।”
“তাহলে কি সম্ভব?”
“আমার বা*ল। নিবি? ওটা দেওয়া সম্ভব। দিই?”
তোশা চোখ খিচে মুখ বন্ধ করে ফেলে। কিছু বলেনা। রুচি আসছেনা তার। সে আরও এক সপ্তাহ আগেই ফিরে যেতে চেয়েছিল কানাডা। কিন্তু চলে যাবে ঠিক করে পাস্পোর্ট খুজতেই বুঝতে পারে কোথায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা সেটা। সে ভেবেছিল কোথাও হারিয়ে ফেলেছে ভুলবশত। কিন্তু আসলে ওটা ইরফান সরিয়ে ফেলেছে। অনেক আগেই একাজ করেছে সে। তোশা বুঝতে পারেনি। যখন চার পাচদিন আগে বুঝতে পেরে ইরফানের কাছে গিয়েছিল ওটা নিতে তখন সে দেয়নি। ঝগড়া হয় এ নিয়ে তাদের মধ্যে। তোশাকে ইরফান কানাডা যেতে দিতে চায় না। কিন্তু তোশা ফিরে যেতে চায়। ইরফান কেন তার লাইফের এসব ডিসিশন নেবে! কেন তার উপর অধিকার দেখাবে! তার লাইফে কি হবে না হবে সেসব ইরফান কেন ঠিক করবে! একপ্রকার রাগ থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখানে থেকেই ফ্যাশন ডিজাইনিং এর কাজ চালিয়ে যাবে। ইন্সটাগ্রামে তার বড় একটা একাউন্ট আছে। সেখানে নানান মডেলদের দিয়ে নিজের ডিজাইন করা ড্রেসগুলো পড়িয়ে ছবি, ভিডিও শেয়ার করে। তবে তার নিজের ব্র্যান্ড খোলার ইচ্ছে ছিল। খুলেওছিল, তবে সেটাকে একটা জায়গায় দাড় করানোর আগেই ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যার কারণে বেচে থাকারই মনোবল হারিয়ে ফেলে। বিজনেস দাড় করাবে তো দূরের বিষয়। পরে সব ছেড়েছুড়ে দেশের বাইরে চলে যায়। সেখানে বাবার পরিচিত এক আঙ্কেলের কম্পানিতে জয়েন করে, ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবেই। সোশ্যাল মিডিয়াতে তখন সেভাবে জোর দিতো না। এখন যখন দেশেই থাকতে হচ্ছে, নিজের খোলা ব্র্যান্ডটাই চালাবে স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের ড্রেস নিজে পরে ফটোশুট করার বিষয়টা মূলত ইরফানের প্রতি জেদ থেকে করেছে। যে টেবিলটাতে বসে ছবি তুলেছিল, ওখানটাই বসে তোশা। ভেতরটা রাগে ফেটে যাচ্ছে। পাশ থেকে পানির বোতল নিয়ে গলা ভেজায়।
“এটা কি পড়েছিস? পেছনে সবই তো দেখা যাচ্ছে। ইনার টিনার পড়িস নি? এসব কি ড্রেস?” বলতে বলতে পেছনের লেস আপ ব্যাকের স্ট্র্যাপে হাত দেয় সে। তোশা ঝাড়া মেরে তার হাতটা সরিয়ে দেয়।
“এটা মেয়েদের ড্রেস। তাই এসব কি ড্রেস তোর না জানলেও চলবে। যা এখান থেকে, আমার আরো কাজ আছে। ফটো সিলেক্ট করতে হবে, এডিটিং বাকি আছে। তুই যা।”
ইরফান তার চেহারার অঙ্গভঙ্গি, ঠোঁট-চোখ, সব দেখতে দেখতে কথাগুলোও মনোযোগ দিয়ে শুনে। সে এখানে আসার আগে ভীষণ রেগে ছিল। তোশার বাড়ি গিয়ে যখন তার মায়ের কাছে শুনেছে সে এখন মামার স্টুডিওতে আছে, ফটোশুট করছে। তখন থেকেই মাথা গরম তার। রাগ নিয়ে সোজা এখানেই এসেছে। তবে এর মধ্যেও সে খেয়াল করে, ড্রেসটা তোশার গাঁয়ে ভীষণ ফিট করেছে। মোহনীয় লাগছে তাকে। পিউড-পিঙ্ক কালারটা গাঁয়ের সাথে মিশে গিয়েছে একদম। তাকে দেখতেই দেখতেই কথার প্রতিউত্তরে বলে,
“এডিটিং বাকি? আমি করে দিই? স্টুডিওটার এডিট? তোর এডিট? সব কিছুর নকশা বদলে দেবো ট্রাস্ট মি, পুরো চেহারা বদলে দেবো।” বলতে বলতে তোশার চিবুকটা ধরে শক্ত করে। বৃদ্ধাঙ্গুলটা ঠোঁটের কাছে এনে একটু নাড়াচাড়াও করে।
“ছাড়।” তোশা গরম চোখে তাকিয়ে বলে।
“স্টুডিওর এডিট পরে করবো? আগে তোর এডিট করে দিই? লিপ্স্টিক থাকবে না আর। আগের চেয়ে সুন্দর দেখাবে। ন্যাচারাল গোলাপি ঠোঁটটাই দেখা যাবে। ড্রেসের সাথে খাপে খাপ। ট্রাই করবি?”
তোশা শুটিং এর জন্য সাজানো ঐ টেবিলটাতেই হালকা ভর দিয়ে বসে আছে। আর ইরফান তার সামনে। খুব কাছাকাছি। তাই দুহাত পেছনে নিয়ে টেবিলে ভর দেয়, নিজেদের মধ্যে কিছুটা দূূরত্ব রাখতে। শেষ কথাগুলো বলতে বলতে মুখ নামিয়ে তার কাছাকাছি চলে আসে ইরফান। নিঃশ্বাস এসে পড়ছে তোশার মুখে। তোশা তার শেষ কথার প্রতিউত্তর করেনা, তবে শক্ত মুখে চেয়ে থাকে। ইরফানও ওর চোখের দিকে আর ঠোঁটের দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে চেয়ে আছে। তবে হঠাৎ পায়ে উপর সূচ ফুঁটার মতো তীব্র ব্যাথায় কিছুটা খকিয়ে উঠে সে। তোশা নিজের স্টিলেটো দিয়ে তার পায়ে গুতা দিয়েছে।
“কি করলি এটা?” চোখ মুখ কুচকে বলে সে।
“সি?? আমার স্টিলেটোর কামাল। পায়ের কামাল। সামান্য হিলসের গুতা নিতে পারছিস না। আমাকে এডিট করবি?”
ইরফান পায়ের ব্যাথা সামলে তার থেকে মাথা অব্দি আবার দেখে।
“লাগতে আসিস না। পা অব্দি যেতে হবেনা। আমার মুখের কথার গুতাই তুই নিতে পারবি না।”
“ইউ ব্লাডি শি*ট হি ল! তোর মতো ক*কমং*লারের মুখে ঐ ধরণের বা*ল সাকিং কথাবার্তায় আসবে। এর চেয়ে বেশি কিছু আশাও করিনা।”
তোশার মুখে গালি শুনে ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়। চোখে চোখ রেখে বলে, “বেশি বলে ফেলছিস।”
“আরো বলবো। এস……”
“মু*র জায়গায় গুতা দিলে এত কথা বের হবে আর? শুধু শীৎকার বের হবে তখন ঐ মুখ দিয়ে। এন্ড ট্রাস্ট মি, ঐ মধুর শব্দই মানাবে তোর মুখে। এখন শুধু শুধু এসব কথা বলে আমার মুখটা খারাপ করলি।” তোশা আরও একটা গালি দিতে চেয়েছিল। তার আগে আরো কাছে এগিয়ে এসে কথাগুলো ভীষণ শান্ত ভঙ্গিতে বলে ইরফান। আর সাথে সাথে গালে একটা থাপ্পরও পরে। সে অবাক হয় না।
থাপ্পর দেওয়ার ফলে হালকা বেকে যাওয়া মাথাটা সোজা করে তাকায় তোশার দিকে। সে শক্ত চেহারায় তার দিকেই চেয়ে আছে। চোখে পানি দেখা যাচ্ছে, ঠোঁট কাপঁছে রাগে।
“বলেছিলাম, আমার কথার ভারই নিতে পারবিনা তুই।” ইরফান
“হ্যাঁ, আমার ভুল। তোর মতো ছেলের সাথে লাগতে এসেছি। আমারই ভুল। মেয়েদের সম্মান তো করতে জানিস না। উল্টে নিজের কুৎসিত রুপ দেখিয়ে কতোটা বিকৃত তোর মানসিকতা সেটা বোঝাস। অবশ্য মেয়েদের সম্মান করবি কিভাবে। মেয়েরা তো মায়ের জাত। তোর তো মাই নেই। মায়ের শিক্ষা পেলে মেয়েদের কি বলতে হয় নাহয় জানতি। তোর তো মা নেই। তাই মেয়েদের মূল্য বুঝিস না। বা স্টা র্ড একটা।”
——————————
বিকেলে প্রাণেশাদের ওখানে একজনের সাথে দেখা করে সোজা নিজের চ্যাম্বারে চলে গিয়েছিল অন্তিক। তার হাতে থাকা রানিং কেইসটা একটা মা র্ডা র কেইস। তার মক্কেল ঐ কেইসের বিবাদী। সেই কেইস নিয়েই দীর্ঘ স্টাডি করে, কিছু প্রমাণ হাতে নিয়ে এখন বাড়ি ফিরেছে সে। রাত হয়েছে মুটামুটি। ডাইনিং এ তার খাবার রেডি করে রেখেছিল মা। ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে খেয়ে নিয়ে আবার রুমে এসেছে। এবার বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। আজ শান্তির ঘুম দেবে অনেক দিন পর। প্রাণেশার সাথে মান অভিমান মিটে গিয়েছে। শান্তির ঘুম না এসে পারে?
শুয়ে বিছানা হাতড়ে ফোনটা হাতে নেয় সে। কল লাগায় প্রাণেশার ফোনে। দুই বার রিং হয়ে তারপর রিসিভ হয়। ওপাশ থেকে প্রাণেশার নিঃশ্বাসের শব্দ আসছে।
“প্রাণো?” অন্তিক ধিমি স্বরে প্রাণেশাকে ডেকে উঠে। প্রাণেশার শ্বাস প্রশ্বাস আরো গাঢ় হতে শুনা যায়। অন্তিক তার সাড়া দেওয়া বুঝে নেয়।
এক হাত মাথার নিচে রেখে আদুরে স্বরে জিজ্ঞেস করে, “কি করছ?”
উত্তর আসেনা। অন্তিক চুপ থাকে। প্রাণেশার নিঃশ্বাসের শব্দ অনুভব করতে চাইছে সে। সেকেন্ড কয়েক পার হতেই টুং করে মেসেজের শব্দ আসে। কান থেকে ফোন সরিয়ে সামনে আনে অন্তিক। প্রাণেশার মেসেজ এসেছে।
“Emn vabe jante caichen, jno ami ciliiye cilliye jobab dite parbo apnr kotar… call katun. Msg e bolun ja bolar.”
অন্তিক হাসে প্রাণেশার রাগী চেহারা মনে মনে ভেবে নিয়ে। তবে সে মেসেজে বলেনা। মুখে বলেই জবাব দেয়,
“তোমার নিঃশ্বাসের শব্দে আমি আমার জবাব খোঁজার চেষ্টায় ছিলাম। মেসেজে বলতে হবেনা।”
প্রাণেশার উত্তর আসে না। মেসেজেও না।
“কি করছিলে?” অন্তিক
“Vabchilam kichu. Ekta painting er chobi dekchilam phone e. Ami ekechilam onk age. Kintu notun kichu kuje pelam oi painting e.”
“আচ্ছা?তো নতুন কি খুজে পেলে? আমাকেও জানাও।”
“Apnk kuje peyechi.”
“আমাকে? বাহ বাহ! স্বামীকে ভালোবেসে ফেলেছ নাকি? পেইন্টিং এও তাকে খুজে পাচ্ছ আজকাল। শুনে ভালো লাগলো। বউ তো খালি পালায় পালায় করে শুরু থেকে। এখন তাহলে সে আমাকে চোখে হারাচ্ছে।”
“Isshh!! Beshi vaben. Tmn kichu na. Painting ta dkle apnio bujte parben.”
“হু দেখাও। আমিও দেখতে চাই, কোথায় আমাকে দেখতে পাচ্ছ তুমি? নিজের স্বামীকে কিসের সাথে কল্পনা করছ…”
সাথে সাথে একটা ইমেজ আসে মেসেজের পরিবর্তে। ক্লিক করে ছবিতে ঢুকে দেখতে পায়, বাচ্চা একটা মেয়ের সামনে সে দাড়িয়ে আছে। কিছু বলছে। মেয়েটার হাতে ফুল অনেকগুলো। ফুলওয়ালী হবে হয়তো। অন্তিক মন দিয়ে দেখে ছবিটা। আসলেই সে। এই জায়গায় সে কবে গিয়েছিল? বাচ্চা মেয়েটার সাথে আবার কথাও বলছে। পেইন্টিং টাতে ফুল হাতে মেয়েটা আর তাকেই হাইলাইট করা হয়েছে। তাই আশপাশ দেখে ঠিক কোথায় বোঝার উপায় নেই। তবে মস্তিষ্কে একটু চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পরে। এটা একটা পার্কের বাইরে ছিল। সে নীলয়ের সাথে গিয়েছিল একটা কাজে। তখনই এই মেয়েটা ফুল নিবে কিনা জিজ্ঞেস করছিল। কিন্তু এই দৃশ্য প্রাণেশা কবে দেখলো? আবার ক্যানভাসেও এঁকে ফেললো?
“কি হলো ব্যাপারটা? এটাতো অনেক আগের ঘটনা। ম্যাডাম কিভাবে দেখলেন এই দৃশ্য?”
“Ami toh nijei obak hocci, gallery te hotat ager painting golo dekte giye eta pelam. Eta asolei apni seta onkkn por bujechi. Tar mane apnk ami aro agei dekechi. Kintu mone cilona. Ki odvud!”
অন্তিক ভ্রু কুচকে বলে,
“হু, বুঝলাম ঘটনা। আমারো মনে পরছে আবছা। পার্কের ভেতর কাউকে ছবি আঁকতে দেখেছিলাম। এই পেইন্টিং টাতেও চোখ পরেছিল দূর থেকে। কিন্তু সম্পূর্ণ ছিল না বলে বুঝতে পারিনি হয়তো।”
“Hoito..”
“ওয়েট, তুমি কি ওখানে পাশের ক্যাফেটাতেও ঢুকেছিলে সেদিন?”
“Hu, arshi apu ar or bf chilo sate. Kno?”
“আমিও ছিলাম ওখানে। নীলয়কে নিয়ে বসেছিলাম। আহ, অবাক লাগছে। আগেও নাকি আমরা দুজনেই দুজনকে দেখেছি। অথচ কতো কাহিনী হলো। তুমি মেয়েটাকে খুঁজতে কতো কি করলাম। জীবন সত্যিই অদ্ভুদ।”
প্রাণেশা শুনে, তবে কিছু বলেনা। অন্তিক আবার জানতে চায়,
“ঐ পেইন্টিং টা এখন কোথায়? এই বাড়িতে থাকতে তো দেখিনি একবারো? তাহলে তো তখনই চোখে পড়তো।”
“Ota nei. Anini toh sedin mama bari teke. Tmn dorkari chilona. Ammur-amr sriti ace, beshi valo lagar, emn painting goloi enechilam sudu. Eta phone e pic tule rekechilam. Amr sob painting eri pic tula thake phone e.”
“আচ্ছা? মামা বাড়িতে তাহলে ওটা।”
“Hu.”
তারপর আবার লিখে,
“Oh hae. Kaal vaiya mama bari niye jabe boleche amk. Sokalei jabo. Onk din por. Kushi lagce. Kal oi painting taw niye asbo.”
প্রাণেশার কথাটা শুনে অন্তিক একটু চিন্তিত হয়। প্রাণেশা চলে যাওয়ার পর তাদের রিসিপশনের ফাংশন যেহেতু হচ্ছিল না। তাই তার মামাকে কি বলে বারণ করবে ভাবার বিষয় ছিল। তাদের ওখানেও যায় নি দেখে কিছু জানায় নি, প্রাণেশার চলে যাওয়ার ব্যাপারে। শুধু একবার গিয়ে জানিয়ে এসেছিল যে, প্রাণেশার এক্সাম পড়েছে ঐ সময়ে। তাই ফাংশনটা আরেকটু দেরিতে ফেলবে। এরপর আর কিছুই জানায় নি। এখন প্রাণেশা ভাইকে নিয়ে ও বাড়ি গেলে সমস্যা। তাদের মধ্যে পুরো বিষয়টা নিয়ে বিভ্রান্তি ঢুকে যাবে।
“মামা বাড়ি? শুনো, কাল যেওনা। তোমার মামা মামী জানেনা যে তুমি এবাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলে। তাদের জানায় নি, চিন্তা করবে তাই। দুজনকেই অসুস্থ লাগছিল সেবার। তাই আর বাড়তি টেনশন দিই নি। তুমি কাল যেওনা। আমি নিয়ে যাবো কোন একদিন। তারপর মামা, মামিকে আস্তে ধীরে সব বুঝিয়ে বলবে। ঠিক আছে? এখন তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে গেলে তাদের মধ্যে পুরো বিষয় জেনে দুশ্চিন্তা ঢুকে যাবে।”
প্রাণেশা অন্তিকের কথাগুলো মন দিয়ে শুনে। তারপর মন খারাপ করে লিখে,
“Oh. tik ace, bolcn jkn vaiyake mana kore debo. Kintu amk khub taratari niye jaben tik ace? Ami arshi apukew bolbo jno sedin ase. Amisoho gele apu mamar samne jete sahos pabe. Onk din por amra sobai eksate hobo. Onk moja hobe. Amr vabtei kushi lagce. Amk taratari niye jaben.”
অন্তিক প্রাণেশার উৎফুল্ল ভাব বুঝতে পেরে হাসে। ওকে দেখার লোভ সামলাতে না পেরে হঠাৎ কল কেটে আবার ভিডিও কল দেয়। প্রথম বারে রিসিভ হয় না। প্রাণেশা বুঝতে পারেনি হয়তো হঠাৎ কি হলো? ২য় বারে রিসিভ হয়। তবে যাকে দেখার জন্য ভিডিও কল দিয়েছে তাকে দেখা যায় না। ওপাশটা অন্ধকার। ক্যামেরা অফ করে রেখেছে হয়তো।
“কি সমস্যা? ক্যামেরা অন করো। লাইট জ্বালাও। তোমাকে দেখবো।”
প্রাণেশার উত্তর আসেনা। অন্তিক নিঃশ্বাসের শব্দই শুনে শুধু।
“প্রাণো। ক্যামেরা ঠিক করো। নাহলে কিন্তু আমি চলে আসবো।”
প্রাণেশা ঘাবড়ে যায়, তবে ক্যামেরার সামনে আসতে চাইছিল না সে একটা লেডিস শাঁর্ট পরে আছে বলে। এসব ড্রেস সচরাচর পরেনা সে। কারো সামনে তো নাই। লজ্জ্বা লাগছে তার।
নিজেকে সামলে একটা উর্ণা নেয় গাঁয়ে। তারপর ক্যামেরা ঠিক করে। সামনে এসে হাত দিয়ে ইশারা করে “কি” জানতে চায়। লজ্জা পেয়েছে তা বুঝতে দেয় না। তবে ওকে দেখবে বলে ভিডিও কল দিয়ে, খুটিয়ে খুটিয়ে না দেখলে হয়? অন্তিক আগাগোঁড়া দেখে প্রাণেশাকে। বুঝতে পারে বউ কেন সামনে আসতে চাচ্ছিল না। মনে মনে হাসি পায়। তার বাচ্চা পেটে নিয়ে শাঁর্ট পরে সামনে আসতে লজ্জ্বা পাচ্ছে।
অন্তিক নিজেও খালি গাঁয়ে আছে। তার স্বভাব খালি গাঁয়ে রাতে ঘুমানো। এতদিন পর এভাবে দেখে প্রাণেশা সংকোচ করে তার দিকে তাকাতে। ওকে নিজের দিকে না তাকাতে দেখে অন্তিক আবার হেসে উঠে কিছুটা শব্দ করে। তার হাসি দেখে প্রাণেশা এবার তাকিয়ে হাতের ইশারায় “হাসছেন কেন?” জিজ্ঞেস করে
অন্তিক মাথা নাড়িয়ে কিছুটা না বোঝায়। তারপর বলে,
“এখনো বলবেনা?”
“কি?” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
“পেটে কি যেন একটা নিয়ে আছ?”
ওমনি টুট করে ফোনটা কেটে যায়। অন্তিক হাসে আবার। ফোন পাশে রেখে উপুড় হয়ে শুয়ে পরে।