মৌনপ্রেম

পর্ব - ৩৮

🟢

রাত প্রায় ১২ টার কাছাকাছি। অয়ন্তি রুমে ভীষণ জড়সড় হয়ে বসে আছে। গাঁয়ে স্বচ্ছ সাদা নেটের ঢিলেঢালা, তবে খুব খোলামেলা একটা পোশাক। সহজ ভাষায় নাইটি। সাধারণত নাইটি যেমন হয়, সে অনুযায়ী গলার অংশ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ বড় হওয়ায় ক্লিভেজ চোখে পড়ার মতো দৃশ্যমান। আর পোশাকটি শেষ হয়েছে হাঁটুর খুব উপরে। এসব পোশাকের সাথে অয়ন্তি কম্ফোর্টেবল নয়। তাই রুমে একা থাকা সত্ত্বেও অস্বস্তি হচ্ছে। যদিও উপরে শিয়ার রোব পরেছে সে। তবে সেটিও একই সেটের হওয়ায় স্বচ্ছ সাদা নেটের, আর সম্মুখভাগ খোলামেলা। পরা না পরা সমান। আজ রাতে মাহাদ ভাই আসবে। অয়ন্তি আগে ভাগে খেয়ে ধেয়ে রুমে চলে এসেছে। এই পোশাক পরার সাহস করতে, পরে কিভাবে মাহাদ ভাইয়ের সামনে যাবে, সব মিলিয়ে এটা সেটা ভাবতে ভাবতে তার অনেক টাইম লাগবে। তাই আগে ভাগে খেয়ে চলে এসে এক ঘণ্টা যাবত হ্যাঁ-না করতে করতে ফাইনালি নাইটিটা পরেছে। যদিও সে সকালে শর্ত মেনে নিলেও, রাতে মাহাদ আসলে ভুলে গিয়েছে বলে কাটিয়ে দেওয়ার ফন্দি এটেছিল। কিন্তু এই বিষয়টা আন্দাজ করতে পেরে মাহাদ ফোন দিয়ে অয়ন্তিকে চালাকি করলে খবর আছে বলে হুশিয়ার করেছে।

মাহাদ ভাইয়ের এতোক্ষণে চলে আসার কথা। অয়ন্তির কাছে মাহাদ আসবে শুনে মিসেস আয়েশা আমিন অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন। তবে অয়ন্তি মানা করে দিয়েছে। সে জানে মাহাদ ভাই খেয়ে আসবে।

ভাবনার মাঝেই ‘কট’ করে দরজা খোলার শব্দ হয়। শিয়ার রোবটা দিয়ে নিজেকে এদিক সেদিক নানা ভাবে ঢেকে নিতে চায় অয়ন্তি। মাহাদ রুমে ঢুকে শুধু ড্রিম লাইট অন দেখে সুইচ দিয়ে লাইট অন করে সবার আগে। তারপর অয়ন্তির খুঁজে চোখ ঘুরায়। মাহাদ এসেছে বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি বেডের কাছে এসে পাতলা চাদরটা টেনে নিয়ে নিজেকে সামনে থেকে ঢেকে নিয়েছে সে। অয়ন্তিকে ওভাবে চাদর নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে মাহাদ সরু চোখে তাকায়। ওর দিকে চোখ রেখেই দরজাটা লাগিয়ে দেয়। তারপর গলার টাই খুলতে খুলতে কাছে গিয়ে বলে,

“ওটা ধরে রেখেছিস কেন? নামা।”

অয়ন্তি মাথা নাড়ায়। “নামাব না।”

মাহাদ নিজের সরু চোখ আরও সরু করে। টাইটা খুলে ফেলে এক টানে ওর চাদরটাও সরিয়ে নেয়। অয়ন্তি ধরফরিয়ে উঠে।

“তোমার যে এত অধঃপতন হয়েছে জানতাম না মাহাদ ভাই। ছিহ! কাপড় ধরে টানাটানি করছ।” হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করতে করতে বলে সে।

আপাদমস্তক অয়ন্তিকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে মাহাদ বলে,

“অধঃপতন তোরও হবে একটু পর।”

চুল গুলো সামনে বুকের উপর এনে দিয়ে অয়ন্তি বলে,

“চাদরটা দাও।”

“চাদরের আর কাজ নেই।”

মাহাদের দৃষ্টি দেখে অয়ন্তি গচগচিয়ে বলে, “চোখ নামাও। জীবনে মেয়ে দেখো নি?”

মাহাদ ইঙ্গিতপূর্ণ হেসে আপত্তিকর জায়গায় চোখ রেখে বলে,

“দেখেছি। অনেক দেখেছি, কিন্তু এমন ভিউ চোখের সামনে কখনো দেখিনি।”

অয়ন্তির চোখের আকার বড় হয়। লজ্জ্বা পেলেও সে শুরু থেকে তা দেখাতে চাইছেনা। অথচ মাহাদের কথা শুনে স্বাভাবিক থাকতে পারছে না। এর মধ্যে মাহাদ আবার বলে, “তোকে সেই হট লাগছে, পুরাই হট এন্ড সে…”

অয়ন্তি তাড়াতাড়ি কাছে এসে মাহাদের মুখ চেপে ধরে।

“চুপ করো। আর বলবেনা। তুমি তো আগে এতো অসভ্য ছিলেনা মাহাদ ভাই।”

মাহাদ ওকে কাছে টেনে নিয়ে শিয়ার রোবের ভেতর হাত গলিয়ে দেয়। কোমরে হাত রেখে নিজের সাথে আঁটকে ধরে। কোমরসহ উন্মুক্ত পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে মুখ থেকে অয়ন্তির হাত সরিয়ে বলে,

“আগে তোর জামাইও ছিলাম না।”

শরীরে মাহাদের হাতের বিচরণ টের পেয়ে সে কাতর চোখে তাকায়।

ওর দৃষ্টি দেখে মাহাদ ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“কি? এসব তোর করার কথা ছিল। আবার এভাবে তাকাচ্ছিস কেন?”

অয়ন্তির চোখ বড় হয়। মাহাদের তা দেখে হাসি পায়। কিন্তু সে হেসে দিলে অয়ন্তি আর সিরিয়াসভাবে নেবেনা। হাসি আঁটকে বলে,

“দাড়িয়ে আছিস কেন? শর্ত একটা পূরন করলে তো হবেনা। দুটোই করতে হবে। নাহলে আমি নিজে পদক্ষেপ নেবো। তবে এখন না। কাল সকালে।”

অয়ন্তি ঘাবড়ে যায় কাল সকালের কথা বলায়। ইতস্তত করে বলে,

“তোমার কথামতো নাইটি তো পড়েছি। একটা শর্ত পূরণ করলে হয় না?”

“না, হয় না। আমি কিন্তু সকালে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলেছিলাম তুই শর্ত মেনেছিস বলে। এখন পল্টি খেলে আজ সকালের সিচুয়েশন আবার ক্রিয়েট হবে।”

অয়ন্তি চিন্তিত মুখে কিছু ভাবতে ভাবতে কাছে আসে। মাথা উচিয়ে ধীরে ধীরে মাহাদের ঠোঁটের কাছে যায়। ঢোক গিলে একপলক মাহাদের চোখের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছোয়ায়।

দুই তিন মিনিট পর ছেড়ে দিতে চাইলে মাহাদ ছাড়তে দেয় না। যেতে যেতে দশ পনেরো মিনিট যায়। তারপর মাহাদ ছাড়লে সে হাঁপাতে হাঁপাতে তার বুকে মাথা রাখে। মাহাদ নিজেও কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছে। তবে ধিমি স্বরে বলে,

“থামলি কেন? চুমু খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাস না আবার। শুরু কর। কাল আমি ধরলে কিন্তু……”

আর কিছু বলবে, তার আগে নিজের বুকে অয়ন্তির ঠোঁটের স্পর্শ পায়। পরপর তিন চারবার। আস্তে আস্তে মাহাদের শাঁর্টের বোতাম খুলে দেয়। কিন্তু তারপর গিয়ে আর কিছু করার সাহস করতে পারেনা। ঢোক গিলে তাকায় মাহাদের দিকে।

মাহাদ ওর দৃষ্টি দেখে শার্টটা গা থেকে খুলে ছুড়ে ফেলে দেয় কোথাও। কোলে তুলে নেয় অয়ন্তিকে। তারপর চলে যায় বিছানার দিকে। স্বর্গ নামিয়ে আনবে আজ সেখানে।

—————

পরদিন সকালবেলা। অন্তিক ফারদিন বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে নিজের গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে আছে। গতকালও এসেছিল এদিকে। ব্যাল্কনিতে প্রাণেশার দেখাও পেয়েছে। কিন্তু আজ ওকে দেখা যাচ্ছেনা। একটু ব্যাল্কনিতে আসলে, দেখেই চলে যেতো সে। কাল পরশুর দিকে বাবা মা সহ যাবে ফারদিন বাড়িতে। প্রাণেশা আর তার ব্যাপারে সব কিছু জানাবে। তাদের সাথে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে ওকে নিয়ে আসবে। আজই যেতো। তবে তার বাবা ব্যস্ত থাকবে আজ। তাই কাল অথবা পরশু যাবে। কিন্তু ফারদিন বাড়িতে গিয়ে প্রাণেশাকে চাওয়ার আগে, ওর সাথে একা একবার দেখা করা খুব জরুরী। ওর সাথে কথা বলে নিজেদের মধ্যকার মান অভিমান ভাঙ্গাতে হবে আগে। নাহলে তার পরিবারের কাছে ওকে চাইতে গেলো, অথচ প্রাণেশা নিজেই আসতে চাইলো না। এমন হলে ঘেটে যাবে সব। কিন্তু এই মেয়েটা বাড়ি থেকে বেরই হয় না।

সাহিল নিজের গাড়ি নিয়ে পার্টি অফিস থেকে বাড়ি ফিরছে। কাছাকাছি চলে এসেছে। গাড়ির ভেতর থেকে রাস্তার ধারে অন্তিককে গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে।

“আরেহ, অন্তিক সরোয়ার নাকি? আপনি এখানে?”

প্রাণেশার সাথে কিভাবে একান্তভাবে দেখা করা যায় তা ভাবতে ভাবতে সুখ টান দিচ্ছিল অন্তিক। কথাটা শুনে পেছনে তাকায়। সাহিলকে দেখতে পেয়ে টানটান ভ্রু সোজা হয়। হাতে থাকা সিগারেটটা ফেলে দেয়। পায়ে পিষে সাহিলকে জবাব দেয়,

“হ্যাঁ, এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম। আপনি…”

“আমিও পার্টি অফিস থেকে আসছিলাম। একটু গেলেই তো ফারদিন বাড়ি। এতো কাছে এসেছেন, বাড়ি না ঢুকে চলে যাবেন? আসুন প্লিজ। বাবা সহ সবাই আপনাকে একদিন নিয়ে আসতে বলে। সেদিন খুব উপকার করেছিলেন। আপনি এতো কাছে এসেছেন, চলুন আমার সাথে। সবাই খুব খুশি হবে।”

অন্তিক মানা করেনা। প্রাণেশার সাথে এই ফাঁকে যদি দেখা হয়ে যায়, কথা বলতে পারে - তাহলে কালই চলে আসবে বাবা মাকে নিয়ে। আর থাকা যাচ্ছেনা ওকে ছাড়া। আর এখন তো বউ একা নয়, তার অনাগত সন্তানও তার থেকে দূরে আছে। সেদিন হস্পিটালে কি কারণে গিয়েছিল তারা দুই ভাই বোন, সে খবর অন্তিক পরে নিয়েছে। অজ্ঞান প্রাণেশাকে বাড়ি রেখে দরকারে যখন বাইরে গিয়েছিল, তখনই জানতে পেরেছে এসব।

সাহিল অন্তিককে নিয়ে চলে আসে বাড়ি। তাকে দেখে সবাই প্রসন্ন হয়। অন্তিক সেদিন প্রাণেশাকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল তা সবাই জানে। অন্তিক সেদিন ঐ গাড়িটাকে ধাক্কা দিয়ে প্রাণেশাকে নিয়ে না গেলে, যেকোনো দূর্ঘটনা ঘটতে পারতো তাদের ছেলে মেয়ে দুটোর সাথে। জ্ঞান ফেরা অব্দি প্রাণেশার খেয়ালও রেখেছে বাড়ি নিয়ে গিয়ে। অন্তিকের প্রতি, তার পরিবারের প্রতি সবাই কৃতজ্ঞ।

হঠাৎ করে আসায় আগে থেকে কিছু প্রস্তুত না থাকলেও অন্তিককে আপ্যায়নের কোন ত্রুটি রাখেনা। এটুকু সময়ের মধ্যে তার জন্য অনেক কিছু করে ফেলেছে। তার বাবা-মায়ের, পরিবারের সবার খোঁজখবর নেয়। বাড়িতে কে কে আছে। প্রফেশনাল লাইফ কেমন কাটছে - এমন নানান কিছু নিয়ে কথাবার্তা হয়। কথায় কথায় সাহিল তাকে তুমি সম্বোধন করতে অনুরোধ করে। সে অন্তিকের ২/৩ বছরের ছোট। আপনি সম্বোধন ঠিক মানাচ্ছেনা। অন্তিকও মানা করেনা।

সে প্রথমবার শ্বশুর বাড়ি এসে অজান্তে হলেও জামাই আপ্যায়নের চেয়ে কম কিছু পায় না, শুধু বউয়ের দেখা পাচ্ছেনা। সে ভেবেছিল বাড়ি থেকে বের হয় না মেয়েটা। এখন দেখছে রুম থেকেও বের হয় না। বাড়িতে একটা মেহমান এসেছে। সবাই তার সাথে দেখা করছে, গল্প করছে। অথচ প্রাণেশার দেখা নেই। সবার সামনে মুখে প্রকাশ না করলেও মনে মনে সে কিছুটা বিরক্ত বোধ করছে।

প্রাণেশা পেইন্টিং করতে বসে সারা গাঁয়ে রং লাগিয়ে ফেলেছিল। তাই ভাবে গোসল করা দরকার। কিন্তু সকাল থেকে কোন কারণে তার রুমের ওয়াশরুমে পানি আসছেনা। এজন্য নিচে নাজিয়া আপুর রুমে গিয়েছিল গোসল করতে। তার রুম থেকে কিছুটা এগোলেই ড্রয়িং রুম স্পষ্ট। প্রাণেশা গোসল সেরে চুল মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসে। সবার কোলাহল শুনা যাচ্ছে। তাই চুল মুছতে মুছতেই সেদিকে চোখ দেয়। সবার মাঝে সোফায় অন্তিককে দেখতে পায়। বসে আছে সে। বাকিদের কথার হু হাঁ জবাবও দিচ্ছে মাঝে মাঝে। প্রাণেশা অবাক চিত্তে দেখে দৃশ্যটা। অন্তিক এ বাড়িতে কি করছে ভেবে তার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। বিষয়টা হজম করে সরে দাড়াবে, তার আগে অন্তিক চোখ তুলে হঠাৎ কি ভেবে এদিকে তাকাতেই প্রাণেশার চোখে চোখ পরে। প্রাণেশা তৎক্ষণাৎ ওখান থেকে সরে গিয়ে নিজেকে আড়াল করে নেয়। কিন্তু অন্তিক ওকে দেখে নিয়েছে। প্রাণেশা নিজেকে আড়াল করে নিয়েছে দেখে হঠাৎ সবার কথার মাঝে বলে উঠে,

“সাহিল তোমার বোনকে দেখছিনা যে? সে কি এখনো অসুস্থ? পায়ে যে লেগেছিল, এখন ঠিক আছে? সে কোথায়?”

অকস্মাৎ অন্তিকের কথায় সবাই তার দিকে তাকায়। নিজের দিকে সবাইকে তাকাতে দেখে অন্তিক মোটেও অপ্রস্তুত হয় না। স্বাভাবিকভাবেই আবার জানতে চায়, “তোমার বোন কোথায়?”

হঠাৎ করে তার প্রশ্নে সবাই তাকালেও, প্রাণেশার খোঁজ নেওয়াটাকে সবাই স্বভাবিকভাবেই নেয়। যাকে বাচিয়েছে সে এখন কেমন আছে জানতে চাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

সাহিলও বলে, “হ্যাঁ, বড় মা? বোন কোথায়? ওকে আসতে বলো। সবাই তো আছি এখানে। ওকেও ডাকো।”

নাজিয়া যায় প্রাণেশাকে ডাকতে। এদিকে প্রাণেশা দেয়ালের সাথে লেগে দাড়িয়ে আছে এখনো, যেখানটাই নিজেকে আড়াল করেছিল সেখানেই। একে তো অন্তিককে এখানে দেখে সে অবাক, তার উপর সবার মাঝে ওভাবে তার খোঁজ নিচ্ছে শুনে হার্ট বেরিয়ে আসার উপক্রম ছিল। কিন্তু তাদের ব্যাপারটা অন্য কেউ যেহেতু জানে না, তাই কিছু আন্দাজ করতে পারবে না স্বাভাবিক। সে শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছে। হঠাৎ নাজিয়াকে আসতে দেখে তার দিকে। নাজিয়া বলে সেদিন যে নিয়ে গিয়েছিল গাড়ি থেকে ওকে, সে এসেছে। তার খোঁজ নিচ্ছে। বলে হাত ধরে নিয়ে যায় নিজের সাথে। প্রাণেশা কি বলবে, কি প্রতিক্রিয়া দেবে বুঝে উঠবে। তার আগেই তাকে নিয়ে সবার মাঝে চলে আসে। অন্তিক খুব মন দিয়ে দেখে প্রাণেশাকে। একান্তে কথা যে বলা হবেনা এতো এতো মানুষের মাঝে তা অনেক আগেই বুঝেছে। কিন্তু এবাড়ি এসে ওকে না দেখে যাওয়ার মানেই হয় না। অন্তিক খেয়াল করে প্রাণেশা তার দিকে তাকাচ্ছেনা। অভিমানে, রাগে, ভয়ে নাকি সবার মাঝে থাকায় লজ্জ্বা-সংকোচে ঠিক বুঝল না।

অকস্মাৎ অন্তিকের সবকিছুর প্রতি বিতৃষ্ণা লাগছে। এত এত সবার মাঝে দমবন্ধ লাগে তার। কিছু ঠিক নেই। নিজের বাচ্চাকে ছুঁতে পারছে না। বাচ্চার মায়ের এখনো তার প্রতি অভিমান। হাশফাশ করে উঠে ভেতরটা। প্রাণেশার খোঁজ নেওয়ার বাহানায় সবার মাঝে তাকে ডেকে আনিয়েছিল। অথচ এখন কোন কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না। সবার মাঝে সে এক দৃষ্টিতে প্রাণেশার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর বাকিদের দিকে তাকায়। কিছু ফলমূল কেটেছিল অন্তিকের জন্য। সে খায় নি। বড় মা সেসব প্রাণেশাকে দিচ্ছে খাওয়ার জন্য। প্রাণেশা না খেতে চাইলে সাহিল মৃদু ধমক দিয়ে খেতে বলে। অন্তিক বুঝতে পারে প্রাণেশার প্রেগ্ন্যান্সির ব্যাপারে বাড়িতে সবাই জানে। এই যত্ন তার করার কথা ছিল। কিন্তু সে এখনো ছুয়েও দেখতে পারলো না বউ আর অনাগত বাচ্চাকে। অন্তিক প্রাণেশার স্বামী একথা বাড়ির কেউ জানেনা। এমনকি তার জানা মতে প্রাণেশা বিবাহিতা এই কথাটাও কেউ জানেনা। কিন্তু প্রাণেশা প্রেগন্যান্ট তা জানে। তাহলে বাড়ির সবাই তার বাচ্চাটাকে নিয়ে ঠিক কি ভাবলো? ভেবেই তার সব কিছু ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়ার মতো একটা অনুভূতি হয়। নিজের দোষে আজ এই পরিস্থিতিতে পরেছে সে। অন্তিক কিছু একটা ভেবে সবার মাঝে আবার বলে,

“সাহিল, তোমার বোনকে কি বাইরের হাওয়া বাতাস লাগাতে দাওনা? একটু হাঁটতে, ঘুরতে পাঠিয়ো বাইরে। সেদিনও তোমার গাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার সময় মনে হয়েছিল খুব দূর্বল সে। অজ্ঞানও হয়ে গেলো দেখলাম। এখনো ওকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু নিয়ে চিন্তিত, দুঃখী। বাইরের হাওয়া বাতাস গাঁয়ে লাগাতে দিও। মন ভালো থাকবে।”

অন্তিকের কথাগুলো শুনে সবাই। প্রাণেশার প্রতি তার অব্জার্বেশন চোখে পড়ার মতো মনে হলেও, অন্তিকের কথাগুলোই মন দিয়ে শুনে সবাই। ভুল কিছু বলেনি। প্রাণেশা কি নিয়ে চিন্তিত - তা তারা সবাই জানে। কিন্তু এই বিষয়টা তো তারা খেয়াল করেনি! সারাক্ষণ বাড়িতে পরে থাকতে থাকতে, আসলেই মন-মস্তিষ্কে উল্টাপাল্টা, বেদরকারি নানান চিন্তা ভাবনা আসতে পারে।

—————————

বিকেলের দিকে সময়টা। শরতের শেষের দিকে হওয়ায় গরম কম। বাতাস কিছুটা শুকনো ধরণের। তবে শীতও নয় তেমন একটা। প্রাণেশাকে নিয়ে বেরিয়েছে তার দাদি। আজ সকালেই তো অন্তিক বলেছিল ওকে বাইরের হাওয়া বাতাসে যেতে দেওয়া দরকার। ওমনি নাতনির ভালোর জন্য শুনে আজই ধরেবেধে নিয়ে এসেছে হাঁটতে। আজব কিসিমের মানুষ এই দাদি। যায় হোক, এদিকটাই মানুষ সচরাচর হাঁটতেই আসে। খুব সুন্দর আর মনোরম জায়গা। প্রাণেশা দাদির পাশে হাঁটতে হাঁটতে সবটা দেখে। ভালোই লাগছে। এখন থেকে মাঝে মাঝেই এদিকে হাঁটতে আসবে বলে ঠিক করলো সে।

তাদের প্রতিবেশি এক জনের দেখা পেয়ে সেদিকে গেলো দাদি। প্রাণেশাকে যেতে বলেছিল। সে মানা করে দিয়েছে। বৃদ্ধাদের মধ্যে গিয়ে তার কি কাজ? দাদি ওকে আসে পাশেই হাঁটতে বলে গিয়েছে। প্রাণেশা সায় জানায়। কিন্তু চারপাশটা দেখে হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা দূরে চলে যায় সে। দূরে এসেছে খেয়াল হতেই দাদিকে খুঁজতে আসে পাশে তাকায়। না তো। দেখা যাচ্ছেনা কোথাও। প্রাণেশা কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে যায়। আবার তাকায় এদিক সেদিক।

“দূরে চলে এসেছ তুমি। কিছুটা পেছনে যেতে হবে দাদিকে খুঁজতে।”

অকস্মাৎ কারো কথায় পাশে তাকিয়ে দেখে অন্তিক দাড়িয়ে আছে। পাশে গাড়িও দেখা যাচ্ছে। অন্তিক এখানে কখন এলো প্রাণেশা বুঝতে পারেনি। সে বিস্ময়ে তাকায়। প্রাণেশার অবাক চাহনি দেখে অন্তিক। সে এবার এদিকে কাজেই এসেছিল। প্রাণেশার দেখা পাবে ভাবেনি। তার কথাটা তাহলে কাজে এসেছে।

কদম ফেলে একটু এগিয়ে আসে প্রাণেশার দিকে। সেই যে চলে এসেছিল প্রাণেশা সরোয়ার বাড়ি থেকে। এরপর এই প্রথম হুশ থাকা অবস্থায় একা অন্তিকের সামনে পরেছে সে। কথাটা ভাবতেই সেই শেষবার একসাথে থাকার দৃশ্যগুলো ভেসে উঠে চোখের সামনে। ঢোক গিলে সে পেছন ফিরে চলে যেতে নেয়। ওমনি অন্তিক তার হাত ধরে ফেলে।

“কোথায় যাচ্ছ?”

প্রাণেশা কিছু বোঝায়না। তার হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়।

“শুনো প্রাণো। কথা আছে। একটু কথা বলেই চলে যাবো।”

প্রাণেশা রাগ-অভিমান মিশ্রিত চাহনিতে তাকায়। তার চোখ বলছে অন্তিক যেন তার হাত ছেড়ে দেয়।

“বলছি তো কিছু কথা বলবো শুধু। আমার কথা শুনো আগে। তারপর যাবে।”

“শুনবো না। ছেড়ে দিন। আপনার সাথে কোনরকম কথা বলতে চাইছিনা।” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

“শুনতে হবে। আজকে আমার কথা শুনবে। তারপর তুমি যা বলবে তা। এখন আমার কথা শুনবে। প্লিজ, আই রিকুয়েস্ট।”

প্রাণেশা জবরদস্তি হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়।

“হুশ, দস্তাদস্তি করো না। শান্ত হয়ে দাড়াও প্লিজ।”

প্রাণেশা ধরফরিয়ে উঠে। সে চলে যাবে। তার হঠাৎ অস্থির লাগছে, অসহ্য লাগছে। ওকে এমন করতে দেখে অন্তিক এগিয়ে এসে বুকে চেপে ধরে নিজের সাথে। “আচ্ছা আমি চলে যাবো। তুমি শান্ত হও। এমন করো না। চলে যাবো আমি।”

প্রাণেশার হঠাৎ কেদে উঠে। তার কেন কান্না পাচ্ছে সে জানেনা। অন্তিকের বুকে মাথা রেখে সে কেদে উঠে খুব। অন্তিক কিছু বলেনা। ওকে শান্ত হতে সময় দেয়। কিছু সময় পর প্রাণেশার কান্না থামে। অন্তিক তাকে বুকে রেখে নিচু স্বরে বলে,

“কাদঁছো কেন?”

প্রাণেশা তার বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরে যায়। তবে অন্তিকের থেকে ছাড় পায় না।

“আপনার মতো খারাপ আর স্বার্থপর লোক আর দুটো দেখিনি আমি। আমাকে দাদির কাছে দিয়ে আসুন।”(সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

প্রাণেশার ইশারা বুঝে অন্তিকের কিছুটা হাসি পায়। তাকে স্বার্থপর বলছে। আবার দাদির কাছে দিয়ে আসতে বলছে। তার স্বার্থ তো ওকে নিয়েই। তাহলে দিয়ে আসবে কেন?

অন্তিকের ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখে প্রাণেশা রেগে যায়। রেগে চলে যেতে নিলে আবার হাত ধরে নেয় অন্তিক।

“আচ্ছা সরি। দিয়ে আসবো দাদির কাছে। এখন আমার কথা শুনো।”

প্রাণেশা শক্ত হয়ে দাড়িয়ে থাকে।

অন্তিক ওকে কাছে টেনে হাতের আজলায় মুখটা নেয়। একটু থেমে বলে,

“আম সরি প্রাণো।”

সে কিসের জন্য সরি বলছে তা প্রাণেশা বুঝতে পারে কিছুটা। সব মনে করে হঠাৎ মন খারাপি, অভিমান আরো বেড়ে যায়।

“সেদিনের জন্য আম ভেরি সরি। আমার ভুল ছিল। ওভাবে বলা উচিত হয় নি আমার। আই এপোলোজাইস। প্লিজ আর অভিমান করে থেকো না।”

প্রাণেশার চেহারা দেখে কি ভাবছে না ভাবছে বুঝতে না পেরে সে আবার বলে,

“সেদিন মাথা ঠিক ছিল না আমার। ভুল করে ফেলেছি। ইরফানের ফোনে ভিডিও কলে ছিলাম। সেখানে দেখেছি ক্যাফেতে বসে আছো একটা ছেলের সাথে। কলেজ টাইম ছিল দেখে মেজাজ খুইয়ে ফেলেছিলাম। লোকটা তোমার পরিচিত কেউ কিংবা স্যার হতে পারে, মাথায় আসেনি। আম ভেরি সরি। অনেক শাস্তি দিয়েছ। আর না প্লিজ।”

প্রাণেশা অন্তিকের সব কথা শুনে। কিন্তু তাকে বলেছিল ভোলেভালা চেহারা নিয়ে থাকে নাকি সে। অতোটাও ভালো মেয়ে সে নয়। আরও অনেক কিছু। পায়েও ব্যাথা দিয়েছিল।

অন্তিকের দিকে তাকিয়ে বোঝায়, “আমি খারাপ মেয়ে।” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

অন্তিক সে একথা কি কারণে বলছে বেশ বুঝতে পেরেছে। তাই সাথে সাথে জবাব দেয়,

“মোটেও না। আমি খারাপ। আমার চিন্তাভাবনা খারাপ ছিল।”

“আপনার অযোগ্য আমি। ছেড়ে দিন।” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

“আমি বলেছি কখনো তুমি আমার অযোগ্য? একথা আসছে কেন?”

“বলতে হয় না। আমি বুঝতে পারি।” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

“আচ্ছা? সব বুঝতে পারো তুমি। খুব বুদ্ধিমতী। বুদ্ধিমতী হয়ে নিজেকে আমার অযোগ্য বলছো?”

প্রাণেশা তাকায় অন্তিকের দিকে।অন্তিক এভাবে ক্ষমা চেয়ে তাকে নিতে চাইবে তা ভাবেনি সে। বাড়িতে সবাইকে বলে দিয়ে তাকে নিয়ে চলে যাবে ভেবেছিল। তার ক্ষমা দেওয়া না দেওয়া গুরুত্ব দিয়ে দেখবে ভাবেনি। যায় হোক, আবেগ থেকে এসে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে গেলো, তারপর আবার তার সাথে আগের মতো আচরণ করলো। এমন হলে? ঢোক গিলে কিছু একটা ভেবে ইশারায় বোঝায়,

“আপনি মেহেরিন আপুকে ভালোবাসতেন?”

অন্তিকের ভ্রু কুচকে যায় একথা শুনে। এসব কেন বলছে? আর জানলোই বা কি করে এই ব্যাপারে?

“না, ওকে ভালোবাসবো কেন? তোমাকে কে বলেছে?”

“কেউ বলেনি। সত্যি ভালোবাসতেন না মেহেরিন আপুকে?” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

অন্তিক বিরক্ত হলেও তা প্রকাশ করেনা। এখন রাগ বিরক্তি প্রকাশ করলেই বিপদ। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলে,

“ওকে ভালোবাসতে যাবো কেন? কাউকে ভালোবাসতাম না আমি।”

“তোশা আপুকেও না?” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

অন্তিকের এবার বিস্ময়ের সীমা পার হয়। সে কি বিশ্বপ্রেমিক নাকি যে সবাইকে ভালোবাসবে। এই মেয়ে তাকে কি ভাবে?

“আশ্চর্য! তোশার কথা আসছে কেন? ওকে ভালোবাসতে যাবো কোন দুঃখে?”

“কাউকে ভালোবাসতেন না?” (সাইন ল্যাংঙ্গুয়েজ)

“ওদের কাউকে ভালোবাসিনা। বাসিওনি। ওদের কথা ছাড়ো। তোমার আমার কথা বলো। আর থাকতে পারছিনা দূরে দূরে। কাল আমার সাথে যাবে তুমি।”

“আপনি তাহলে কাকে ভালোবাসতেন?” প্রাণেশা এবার বিভ্রান্তি নিয়ে জানতে চায় ইশারায়।

অন্তিক হতাশ হয়ে বলে,

“কাউকে ভালোবাসতেই হবে কথা আছে?”

“তাহলে আমাকে অযোগ্য নয় বলছেন যে?” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

“কাউকে ভালোবাসিনা মানে তুমি অযোগ্য?” অন্তিক ভ্রু কুচকে বলে।

“আমি অযোগ্য না হলে, আপনিও কাউকে ভালো না বাসলে। আমাকে মেনে নিতেন না কেন শুরুতে?” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

অন্তিক এবার মেয়েটার মাথায় কি চলছে কিছুটা হলেও ধরতে পারে। প্রাণেশাকে হাত দিয়ে ধরে কাছে টেনে নেয়। বিভ্রান্ত চোখে তাকানো প্রাণেশার কপালের চুলগুলো সরিয়ে একটা চুমু খায়। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে ধিমি স্বরে বলে,

“বিয়ের কিছুদিন আগে একটা ইউনিভার্সিটি গিয়েছিলাম কাজের দরকারে। ওখানে একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা খেয়েছিলাম। আমি ঘোরে চলে যায় ঐ মেয়েটার শরীরের সুভাস পেয়ে। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুভাস ছিল ওটা। আর আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। চুলের ঘ্রাণ টানতে একটু কাছে টানবো, ওমনি আমার বুকে ধাক্কা দিয়ে মেয়েটা পালিয়ে গেলো। ওকে ভুলতে পারছিলাম না। মন মস্তিষ্কে শুধু দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় যে একবার ফিরে তাকিয়েছিল, ঐ দৃশ্যটা ভাসতো। আমার বুকে যে ছিল কয়েক মুহূর্ত! ঐ দৃশ্যটা ভাসতো। এক পর্যায়ে বিয়ে করবো ঠিক করে ফেলেছিলাম। কিন্তু সেদিন বেয়াদব গুলো তোমার সাথে বিয়ে পড়িয়ে দেয় মিথ্যা অপবাদ দিয়ে। তাই তোমার প্রতি রাগ ছিল। অবশ্য তোমাকেও ভালো লাগতো। এদিকে একটু দোটানায় ছিলাম। নিজেকে নিয়ে সন্ধেহ হতো। সব মিলিয়ে নিজের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে রাগ উঠলে তোমার উপর ঝেড়ে ফেলতাম। তারপর একদিন জানতে পারি, সেদিনের ঐ মেয়েটা আমার বউ হয়ে আছে ইতোমধ্যে। তখন আমার মনে হয়েছিল, আমার সব চাওয়া সৃষ্টিকর্তা আমার হাতের কাছে এনে দিয়েছে। শুধু আমি ওটাই আমার দরকার বুঝতে পারিনি। আর আমার চাওয়ার ঐ মেয়েটা তুমি বুঝতে পারার পর থেকে তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাবিনি, ট্রাস্ট মি। এটা ভালোবাসা হলে। তোমাকেই ভালোবাসি হয়তো।”

প্রাণেশা অন্তিকের ফিসফিসিয়ে বলা প্রতিটি কথা শুনে। স্তব্দ হয়ে আছে সে। ঐ ঘটনা তারও মনে আছে। একটু বেশিই মনে আছে। তার স্বামী মেয়েদের সাথে অসভ্যতামী করতো আগেও, এই নোট হিসেবেই মনে ছিল এতোদিন ঐ ঘটনা। কারণ সেদিন অন্তিককে সে দেখলেও অন্তিক তাকে দেখেনি তা সে জানতো। তার মানে অন্য মেয়েদের সাথেও এসব করে, আবার না মানা বউয়ের সাথেও। এই প্রেক্ষাপটেই তো সবসময় মনে রেখেছে ঐ ঘটনা। কিন্তু সে তোশা আপুর বিষয়টা দেখে, মেহেরিন আপুর কথা শুনে, নিজের পূর্ব অভিজ্ঞতা মনে করে, সাথে তখনকার বর্তমান অভিজ্ঞতা - সব মিলিয়ে অন্তিককে একাধিক নারীমোহ থাকা পুরুষদের একজন ধরেই নিয়েছিল একসময়। পরে কিছুটা দূর হলেও সে ভাবনা, একেবারেই সরে যায় নি কখনো। তাই অন্য কারো প্রতি অনুভূতি আছে বলে তাকে মানতো না, কিংবা সে কথা বলতে পারেনা বলে। দুটো মিলিয়ে…… এমন কিছুই ভেবেছিল সে। আর ঐ বাড়িতে কাঁটানো শেষ রাতে তো আরও স্পষ্ট লেগেছিল সব। ভেবেছিল লোকটার শুধু মেয়ে হলেই হয়। এখন এক মুহূর্তেই সব অন্যরকম হয়ে ধরা দিলো তার কাছে।

অন্তিক এখনো তার কানের কাছেই মুখ নিয়ে রেখেছে। গালের সাথে গাল লাগছে তাদের। একজনের নিঃশ্বাস অপরজনের উপর।

প্রাণেশা ঘাড় বাকিয়ে অন্তিকের দিকে তাকালে অন্তিক আবার বলে,

“তোমাকেই ভালোবাসি প্রাণো। অনেক বেশি। সেদিন রাতে আমার ভুল ছিল, সেদিন বিকেলে আমার ভুল ছিল। শুরু থেকে অনেক ভুল করেছি। তবে আর হবেনা, প্রমিস করছি।”

অন্তিক সোজা হয়ে দাড়ায় আস্তে আস্তে। প্রাণেশা অন্তিকের বুকে কপাল ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। অন্তিক বুঝতে পারে প্রাণেশা সবকিছু বুঝতে সময় নিচ্ছে। সে কোন কথা বলেনা। প্রাণেশাকে সময় দেয়। কিছু মুহূর্ত পর প্রাণেশা স্বাভাবিক হয়েছে বুঝতে পারলে আস্তে আস্তে তাকে ঘনিষ্ঠ ভাবে আগলে নেয় নিজের সাথে।

“এখনো জানাবেনা?” আগের মতো ফিসফিস করে আদুরে কণ্ঠে বলে অন্তিক।

প্রাণেশা কি জানানোর কথা বলছে জানতে চাইবে বলে সরে যেতে চায়। কিন্তু অন্তিক দেয় না। বুকের সাথে আগলে রাখে। তাই প্রাণেশা ওভাবেই মাথা তুলে তাকায়। জিজ্ঞাসু চোখের চাহনি দেখে অন্তিক আস্তে আস্তে এক হাত প্রাণেশার কোমর থেকে পেটে এনে রাখে। কামিজের ফাঁকে হাত গলিয়ে সেখানটাই হাত বুলিয়ে দেয়। কিন্তু অন্তিক বা প্রাণেশা কিছু বলবে, তার আগে দাদির কণ্ঠ শুনতে পায়।

“কি হচ্ছে এখানে? আমার নাতনিকে এভাবে গাঁয়ের সাথে লাগিয়ে রেখেছ কেন?”

প্রাণেশা দাদির কণ্ঠ শুনে তাড়াতাড়ি সরে আসতে চাইলে অন্তিক দেয় না। বরং আস্তে ধীরে নিজের থেকে সরিয়ে পাশে দাড় করায়।

“তুমি?” অন্তিককে দেখে দাদি অবাক হন। নাতনিকে খুঁজতে খুঁজতে এদিকে এসেছিলেন। কেউ তার কাছাকাছি দাড়িয়ে আছে দেখে লোকজন ডাকতেই যাচ্ছিলেন নাতনির সাথে কেউ অসভ্যতামী করছে ভেবে। মেয়েটা তো চিৎকার চেচামেচিও করতে পারেনা যে কাউকে ডাকবে। সব ভেবে তিনি ঘাবড়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু অন্তিককে দেখে অবাক হন।

“তুমি উকিল না? এখানে কি করছ? আর আমার দিদিভাইকে এভাবে ধরে রেখেছ কেন?” ভারী স্বরে জানতে চান তিনি।

অন্তিকের তেমন হেলদোল না হলেও প্রাণেশা ঘাবড়ে যায়। পেছন থেকে হালকা হাতে অন্তিকের শাঁর্ট আকড়ে ধরে।

অন্তিক তা দেখে। তারপর দাদির দিকে চোখ দেয়,

“এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম, একজনের সাথে দেখা করতে। ফিরে যেতে চাইলে দেখলাম আপনার নাতনি পথ হারিয়ে বসেছে এখানে।”

ব্যাস, দাদি নাতনিকে এতোক্ষণ অন্তিকের বুকে দেখেছে সেকথা ভুলে বসে। পথ হারিয়ে বসেছে শুনে চিন্তায় কাহিল হয়। নিজের কাছে নিয়ে আসেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। হালকা ধমকও দেন আসে পাশে হাটতে বলার পরও দূরে চলে আসায়। প্রাণেশা অন্যসময় হলে বিরক্ত হতো। কিন্তু আজ দাদির জেরা থেকে বেচে গিয়েছে বলে খুশিই হয় মনে মনে।

দাদি অন্তিককে বাবা মা সহ আরেকবার তাদের বাড়ি আসতে বলে প্রাণেশাকে নিয়ে চলে যায়। অন্তিক দাদি-নাতনির প্রস্থান দেখে ভেতরের নিঃশ্বাস ছাড়ে। গাড়িতে হেলান দিয়ে যতদূর দেখা যায় ওদের, দেখে। যেতে যেতে দুই এক বার পেছন ফিরে তাকায় প্রাণেশা। তবে আরেকবার তাকাতেই অন্তিক ঠোঁট উচিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে চুমুর ইশারা করে। প্রাণেশা থতমত খেয়ে যায়। লজ্জ্বা পেয়ে আর তাকায় না।

বাড়ির প্রত্যেকে তখন অন্তিকের কথাটা খুব গুরুত্ব দিয়ে শুনেছে। প্রাণেশাকে সবসময় ঘরের ভেতর বসিয়ে না রেখে মাঝে মাঝে হাঁটতে বের হলে ওকে নিয়ে, খুব ভালো হবে তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য। যেহেতু দাদি নাতনি কারোরই যখন তেমন কাজ নেই বিকেলে, তাই আজকেই বেরিয়েছে পরেছিল। যেদিকটাই গিয়েছিল আজকে, ওখানকার এরিয়াটা সেইফ। প্রাইভেট এলাকা হওয়ায়। তাই নিশ্চিন্তে বেরিয়েছিলেন। দাদি তখন প্রাণেশা পথ হারিয়ে ফেলেছিল বলায় ঘাবড়ে গিয়ে অন্তিক প্রাণেশাকে একসাথে দেখার কথা ভুলে গেলেও, এখন বেশ মনে করতে পারছেন। অন্তিক তার নাতনির কাছাকাছি দাড়িয়ে ছিল। সকালেও প্রাণেশার দিকে তাকাতে দেখেছেন তিনি অন্তিককে। সব মিলিয়ে উনার খটকা লাগছে। সাহিল বাড়ি আছে দেখে তার কাছে যায়। দাদিকে দেখে সাহিল একবার চোখ তুলে তাকায়। তারপর আবার ফোনে মনোযোগ দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা ভিডিও দেখছে সে। টকশোর ভিডিও। দাদি গলা খাকারি দেয় নাতির মনোযোগ আকর্ষণ করতে। সাহিল ফোনের দিকে চোখ রেখেই বলে,

“বলে ফেলো। কান খোলা আছে।”

“উকিলকে দেখেছি হাঁটতে বের হয়েছিলাম ওখানে।”

সাহিল চোখ তুলে তাকায়। বলে,

“অন্তিক সরোয়ার?”

“হ্যাঁ”

“কাজে এসেছে হয়তো। সকালেও কাজেই এসেছিল। আমি দেখে সাথে নিয়ে এসেছি।”

“হতে পারে। অন্য কিছু ভাবছিলাম।”

“ভণিতা না করে বলে ফেল।”

“দিদিভাইয়ের দিকে সকালে কিভাবে তাকাচ্ছিল খেয়াল করেছিস ঐ উকিল? আমার মনে হয় আমার দিদিভাইকে পছন্দ টছন্দ করে। কথা এগোলে মন্দ হয় না।”

সাহিল তাকায় দাদির দিকে। বিরক্ত মুখে বলে,

“পাগল নাকি? অন্তিক সরোয়ার আমার বোনের জন্য পারফেক্ট না। ওর বয়স আমার চেয়ে বেশি। ৩১+ হবে। আমার বোনের বিয়ে ওর সাথে বয়সে যাবে এমন কারো সাথেই দেবো।”

ফুফিও পাশেই বসে ছিলেন। ওদের কথোপকথন শুনে বলেন,

“বয়সে যাবে এমন কারো সাথে? খারাপভাবে নিস না। কিন্তু ওর সাথে ঘটনা একটা ঘটেছে। আবার এখন পোয়াতি। ওকে বিপত্নীক অথবা ডিভোর্সি কোন ছেলের সাথে দিতে পারবি। আর ৩০ এর নিচে এমন ছেলে পাবি? সেখানে অন্তিক ছেলেটার বয়স বাছাই করছিস!! আমার তো মনে হয় মা যেমনটা বলছে, ছেলেটা যদি আসলেই ওকে পছন্দ করে থাকে। তাহলে আমাদের নিজেদেরই ওর পরিবারের সাথে কথা বলা উচিত।”

ফুফির কথাগুলো একেবারেই অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সাহিলের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। তবু নিজেকে যথাসম্ভব ঠাণ্ডা রেখে বলে,

“আমার বোনকে অবিবাহিত ছেলের সাথেই বিয়ে দেবো। বাচ্চাসহ বিয়ে দেবো, অবিবাহিত ছেলের সাথে। মাথায় ঢুকিয়ে নাও কথাটা। আর ভবিষ্যতে ওর জন্য উল্টাপাল্টা প্রস্তাব আনতে যেন না দেখি কাউকে।”

মৌনপ্রেম পর্ব ৩৮ গল্পের ছবি