সময়টা সকাল সাড়ে নয়টার কাছাকাছি। মাহাদ মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। কাল বেশ রাত করে অফিস থেকে এসেছে এ বাড়িতে। বিয়ের পর থেকে সে শুধু দুইবার এসেছে, আর থেকেছে সরোয়ার বাড়িতে। বিয়ের দিন বাসর রাতে প্রথমবার, আর প্রাণেশা যেদিন চলে গেলো বাড়ি ছেড়ে তার আগের দিন দ্বিতীয়বার। আর এবার সহ তিনবার হলো। আগামী প্রজেক্টের লোকেশন এই এলাকার কাছেই, তাই বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় এখানেই চলে এসেছে। উপরন্তু তার বড় মামা, অর্থাৎ বর্তমান শ্বশুরই তাকে ফোন করে এবাড়ি চলে আসতে বলেছে। মাহাদও ভাবে এই ফাঁকে মামাতো বউয়ের সাথে দেখা করে আসলে মন্দ হয়না। বিয়েটা হয়ে গেলেও ব্যস্ততার কারণে অয়ন্তিকে সেভাবে সময় দিতে পারেনি এখনো। এখন এক ইঞ্চি সুযোগ পেলেও সে সেটা মিস দিতে চাচ্ছেনা। তাই শ্বশুরের বাধ্য জামাই হয়ে চলে এসেছিল।
সারারাত অয়ন্তিকে দিয়ে মাথার চুল টানিয়েছে। অবশ্য আগেও একাজ করতে দিতো। তফাৎ শুধু আগে নিজে বসে ওকে দাড় করিয়ে চুল টানতে দিতো, আর এখন অয়ন্তির কোলে মাথা রেখে চুল টানায়। এই সহজ, অথচ গভীর ঘনিষ্ঠতাই অয়ন্তিকে লজ্জায় লাল করে দেয় বারবার।
বাসর রাতে ওকে যেভাবে লজ্জ্বা দিয়েছিল, এরপর থেকে নিজেকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুব গুটিয়ে রাখে।
সেদিন রাতের কথা ভাবলে তার এখনো লজ্জ্বায় কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। অয়ন্তি ভেবেছিল মাহাদ ঐ রাতে সব স্বামীদের মতো ওকে কাছে টেনে নেবে। কিন্তু ওকে চেঞ্জ করতে হেল্প করেছিল সে শুধু। আর কিছুই করেনি। আর আগের সেই ভাই বোন জোনের বাইরে গিয়ে কিছু কথাবার্তা বলে লজ্জ্বা দিয়েছিল। তারপর ওকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। অথচ অয়ন্তি কতোকিছু ভেবে ফেলেছিল। মাহাদ জানত অয়ন্তির মনে ঠিক কী চলছিল,
আর সে নিয়েই মৃদু খোঁচা দিতে ভোলেনি। তারপর থেকে মাহাদ স্বামীসুলভ আচরণ করলে অয়ন্তি না বুঝার ভান করে থাকে। মাহাদের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। আর তার অন্যরকম প্রেম প্রেম কথাবার্তাগুলোরও এমন প্রতিক্রিয়া দেয় যেন সে কিছু বুঝতে পারেনি।
কাল রাতটাও সেই ছন্দেই কেটেছে। মাহাদের মৃদু প্রেমভরা কথাবার্তা, অয়ন্তির নরম লাজ - সব মিলিয়ে বরাবরের মতোই। আজ সকালে অয়ন্তি তাড়াতাড়ি উঠে গেলেও মাহাদ বেশ দেরি করে উঠেছে। অয়ন্তির সাথে আরও সময় কাটানোর ইচ্ছে থাকলেও, সবরকম ভাবে কাছে পেতে ইচ্ছে করলেও - একেবারেই সময় নেই মাহাদের হাতে। তাই দুষ্টু মিষ্টি কথাবার্তা বলে, কথার ছলে ওর গালে চুমু খেয়ে চলে যায়। অয়ন্তি এক মুহূর্তে স্তব্ধ। কি হলো বুঝে উঠতে পারেনি।
পরক্ষণে সবটা বুঝলেও কিছু বলার থাকেনা। কারণ ততোক্ষণে মাহাদ চলে গিয়েছে।
অয়ন্তি, ইশি আর দিথীর আজ ফটোশুট করার প্ল্যান আছে। মাঝে মাঝেই এমন করে তারা তিন বোন। আজও শাড়ি পড়ে ছবি তোলার কথা তাদের। প্ল্যান অনুযায়ী মাহাদ চলে যাওয়ার পর পরই তারা শাড়ি পড়তে শুরু করে। অবশ্য ছবি বিকেলে তোলার কথা ছিল। কিন্তু আকাশের অবস্থা ভালো নেই। তাই সকালের মেঘলা আকাশ নিয়ে তুললেও এক ধরণের ভাইব আসবে, এমন ধারণা দিথীর। অয়ন্তির শাড়ি পড়া হলে আয়নায় ঘুরে ফিরে নিজেকে দেখে। হঠাৎ কল আসলে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে মাহাদ ভাই দিয়ে সেইভ করা নাম্বার থেকে কল আসছে। অয়ন্তি ভ্রু টানটান করে। মাত্রই তো গেলো। আবার ফোন দিচ্ছে কেন? মোবাইল রিসিভ করলে মাহাদ বলে যেন ওর টেবিলের নিচের ড্রয়ারে রাখা নীল ফাইলটা নিয়ে নিচে আসে। অয়ন্তি বুঝতে পারে ফাইল নিতে ভুলে গিয়েছে। তাকে বলেওছিল কাল রাতে, ঐ ফাইলটা ভীষণ ইম্পরট্যান্ট আজকের জন্য। নিতে ভুলে টুলে গেলে যেন মনে করিয়ে দেয়। এত দরকারি শুনে সে নিজেই ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখেছিল। তাও ভুলে গেলো। ভাবতে ভাবতে ফাইলটা নিয়ে নিচে যায় সে।
মাহাদ কিছুদূর গিয়ে ফাইলটা নেয়নি খেয়াল করতেই আবার ফিরে এসেছে নিতে। সে গাড়ির দরজার সাথে ঠেস দিয়ে দাড়িয়েছে। কিছুক্ষণ পর পর হাতঘড়িটার দিকে চোখ দিচ্ছে। অয়ন্তি ফাইল নিয়ে নিচে নামলে ওর দিকে চোখ যায়। ভ্রু টানটান হয় তার। শাড়ি পরে এমন রুপসী সেজে কি করছে এই মেয়ে। কোথাও যাচ্ছে নাকি?
“এই নাও মাহাদ ভাই। সরি হ্যাঁ? ড্রয়ারের ভেতর থাকায় আমার মনে ছিল না এটার কথা। আমার জন্য আবার ফিরে আসতে হলো।”
অয়ন্তি কাছে এসে হাত বাড়িয়ে ফাইলটা দিতে দিতে বলে। মাহাদ ওর সে কথা কানে তুলেনা। কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চায়,
“এমন সেজেগুজে রুপবতী হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?”
“কই সেজেছি। সাজতে পারিনি। আরও বাকি আছে এখনো। শুধু শাড়িটাই পড়লাম।”
অয়ন্তির কথা শুনে মাহাদের কুচকানো ভ্রু আরও টানটান হয়। ওর পা থেকে মাথা অব্দি দেখে। কি বাকি আছে খুজতে চেয়েও কিছু পায় না।
“আর কি দিবি। সব তো আছেই।”
অয়ন্তি বিরক্ত হয়। চ শব্দ করে।
“চুল কার্ল করবো, মেকআপ করবো, হালকা একটু জুয়েলারি পড়বো। আরও অনেক কিছু। তুমি বুঝবেনা। আমি আসছি। তোমারও দেরি হয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি যাও।”
কথাগুলো বলে পেছন ফিরতেই পিঠ খোলা ব্লাউজ হওয়ার কারণে পিঠের উন্মুক্ত অংশে চোখ পরে মাহাদের। ওর টানটান চেহারা সরব হয়। গভীর ভাবে তাকায় ঐ দৃ্শ্যমান অংশে। ব্লাউজের পাশ দিয়ে লাল ইনারের স্ট্রিপ দেখা যাচ্ছে। মাহাদ আনমনে ওদিকে চোখ রেখে শুকনো ঢোক গিলে।
পরপর চোখ নামিয়ে কোমরের দিকে তাকায়। তারপর আস্তে আস্তে আরো নিচে চোখ যেতে চাইলে সাদা শাঁর্টের সাথে পড়া গলার ব্ল্যাক টাইটা ডিলে করে দেয় অস্বস্তিভরে এদিক ওদিক তাকিয়ে। জিহ্বা বের করে ঠোঁট ভিজিয়ে হঠাৎ কিছুটা সামনে হেঁটে গিয়ে অয়ন্তির শাঁড়ির আচলটা টেনে ধরে পেছন থেকে। অয়ন্তি পিন লাগায়নি। তাই আচল সরে আসতে চাওয়ায় হাত দিয়ে কোনভাবে ধরে রাখে। ফিরে তাকালে মাহাদকে শাঁড়ির আচল ধরে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়।
“কি সমস্যা? আচল ধরে রেখেছ কেন?”
আচল হাতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে মাহাদ বলে,
“সমস্যা সৃষ্টি করে জিজ্ঞেস করছিস কি সমস্যা…”
“মানে?” কি বলছে বুঝতে পারছেনা সে। মাহাদ শাড়ির আচলে টান দিয়ে ওকে বুকে আনে। কোমরে দুহাত দিয়ে সন্তর্পণে নিজের সাথে আগলে নেয়। চুল সরিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“মানে নিজের সর্বনাশ নিজে ডেকেছিস।” কথাগুলো বলার সময় মাহাদের ঠোঁট স্পর্শ লাগে অয়ন্তির কানে।
তার পায়ের নিচটা কেমন শিরশির করে উঠে। মাহাদের বুকের কাছে শার্টে রাখা হাতটা আরও দৃঢ় হয়। চোখ তুলে মাহাদের চেহারার দিকে তাকিয়ে কোনভাবে বলে,
“কি বলছ? অফিস যাবেনা?”
“ওসব বাদ। এখন রুমে যাবো। ওখানেই বিজনেস করবো। তুই আর আমি শুধু। মানা করলে দাঁত ভেঙে দেবো একদম। নিজে ঢং করে রুপ দেখিয়েছিস।”
“কিসব বলছ? পাগল হয়ে গেছ তুমি। ছাড়ো প্লিজ, কেউ দেখে নেবে।”
ফিসফিসিয়ে বলতে বলতে সে নিজেকে মাহাদের কোলে আবিস্কার করে।
“হুশ !! কেউ দেখবেনা। দেখলেও বা কি? সবার সামনেই তো বিয়ে করেছি তোকে।” মাহাদ বেপরোয়া কণ্ঠে বলে উঠে।
অয়ন্তিকে আর কোনো কথা বলতে দেয় না সে। তার নিজের ভেতর হঠাৎ কি হচ্ছে সে জানেনা। অয়ন্তি আগে শাড়ি পড়লেও মাহাদ সেভাবে কখনো খেয়াল করেনি। শাড়ি পরে তার নজরে পড়ার মতো দিন ছিল বিয়ের দিনটাই। মাহাদও প্রেমে পরে গিয়েছিল ঐ দিনেই। তবে সে প্রেম, ভালোবাসা নিয়ে বিয়ে করলেও, অয়ন্তি সেসবের কিছু জানেনা। না মাহাদকে কখনো সেই চোখে দেখেছে। তাই সে যে ওর স্বামী, এই বিষয়টা আগে ওর মন, মস্তিষ্কে গেঁথে যাক।
তারপর স্বামী স্ত্রীর মতো সম্পর্ক গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নেবে। এমনটাই ভেবেছিল সে। কিন্তু আজকে এসব ভাবনা আর মাথায় আসছেনা। আসলেও পাত্তা দিতে মন চাইছেনা। শাড়ি পড়া এই লাস্যময়ী রমণী তার নিজেরই বউ। হালাল সম্পর্ক তাদের। এই কথাটাই মাথায় আসছে তার। তাই অতো চিন্তা ভাবনা না করে বউকে নিয়ে রুমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে মস্তিস্কের প্রতিটি নিউরন। আর সেই ইঙ্গিতে প্রবল সাড়া দিয়ে সে অধৈর্য হয়ে অয়ন্তিকে নিয়ে ভেতরে পা বাড়ায়।
ইশি সবটা দেখে কেমন বিস্মিত আর স্তম্বিত চোখে। মাহাদ ভাই আর আপুর বিয়ে হয়েছে। ওরা এখন স্বামী স্ত্রী, ভাই বোন নয়। এটা সেও ভুলে যায়। কি আশ্চর্য! মাহাদ ভাই আর আপু তো বর বউ। তাহলে এসব স্বাভাবিক। হ্যাঁ, আগে ভাই বোন থাকলেও এখন স্বামী স্ত্রী। তাই আচল ধরে টানতেই পারে। অবাক হওয়ার কিছু নেই বলে নিজেকে বুঝ দিতে চায়। কিন্তু এসব চোখের সামনে দেখে তার অবাক লেগেছে। মাহাদ ভাই আর আপু এখন বিবাহিত দম্পতি। কথাটা ভাবতে তারই অদ্ভুদ লাগে, আপুর যে কেমন অনুভূতি হয় ভেবেই মায়া হয় বেচারির জন্য। সে নিজেও শাড়ি পরে তৈরি হয়ে আছে। দিথী ছাদে। আপুকে ডাকতে এসেছিল। এখন মনে হচ্ছে শুধু তাদের দুজনকেই করতে হবে ফটোশুট। আপুকে তো মাহাদ ভাই নিয়ে গেলো। ভেবে পেছন ফিরতেই কারো বুকে কপাল ঠেকে। ইশি চমকে মাথা তুলে তাকাতেই দিগন্তকে দেখতে পায়।
“লুকিয়ে লুকিয়ে বোন আর বোন জামাইয়ের রোমান্স দেখছিস?” ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করে দিগন্ত।
তার কথায় ইশির চোখের আকার বড় হয়। পরক্ষণেই লজ্জ্বা মাথা নুইয়ে নেয়। ওদের ঐ মুহূর্ত দিগন্ত ভাইও দেখেছে তার পেছন পেছন দাড়িয়ে। ছিহ ছিহ!! এমন পরিস্থিতিতে পরতে হবে দিগন্ত ভাইয়ের সামনে, তা সে কখনো ভাবেনি। আমতা আমতা করে বলে,
“ক কই দেখছিলাম। আমিতো আপুকে ডাকতে এসেছিলাম। আমি কি জানি নাকি ওরা এখানে এসব করছে।”
দিগন্ত ইশির আপাদমস্তক দেখে। ডিপ পার্পল কালারের উপর নেভি ব্লু এমব্রয়ডারি কাজ করা তাঁতের শাড়ি। তিন বোনই মাঝে মাঝে শাড়ি পরে ছবি টবি তুলে। তাই ইশিকে আগেও অনেক বার শাড়ি পরতে দেখেছে সে। প্রতিবারই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে। আজও দেখলো প্রাণপ্রেয়সীকে। তবে ওর শেষ কথাটা শুনে ভ্রু উচিয়ে জানতে চায়,
“ওরা এখানে কীসব করছে?”
ইশি বুঝতে পারে বরাবরের মতোই তাকে কথার প্যাঁচে ফেলে লজ্জ্বা দেওয়ার ধান্দায় আছে দিগন্ত ভাই। তাই কথা কাটাতে চায় সে।
“কিছুনা। আমি আসছি। দিথী অপেক্ষা করছে।” বলেই ইশি চলে যেতে চায়। কিন্তু চুলে টান খেলে আর্তনাদ করে এক হাতে ধরে পেছন ফিরে তাকায়। দিগন্ত ভাই টেনে ধরেছে চুলের আগা। কি আশ্চর্য! হঠাৎ মাহাদ ভাই আর আপুর দৃশ্যটুকু চোখে ভেসে উঠলো তার। তার আর দিগন্ত ভাইয়ের মধ্যে মাহাদ ভাই আর আপুর প্রতিচ্ছবি দেখছে সে। মুহূর্তেই নিজেকে শাসিয়ে ঐ ভাবনা থেকে বের হয়ে আসে।
“কি সমস্যা আপনার। চুল টানছেন কেন দিগন্ত ভাই? এসব কোন ধরণের স্বভাব?”
সাথে সাথে দিগন্ত চুলে হাঁলকা টান দিয়ে ওকে নিজের দিকে টেনে জবাব দেয়,
“বাজে স্বভাব। এসব আমার বাজে স্বভাব। যা শুধু তোর জন্য আসে।”
দিগন্তের গাঁয়ের সাথে স্পর্শ না করলেও খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে তারা দুজন।
ইশি অসহায় কণ্ঠে বলে “ছাড়ুন প্লিজ। কেউ দেখলে খারাপ ভাববে।”
দিগন্ত সরু চোখে ইশির দিকে তাকায়। তবে ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে শাড়ির আচলে হাত বাড়ায়। ইশি আতঙ্কিত হয়। একদম পিছিয়ে বলে,
“কি করছেন। আচলে হাত দিচ্ছেন কেন?”
দিগন্ত বিরক্ত হয়ে শক্ত চোখে চেয়ে বলে, “সম্মানহানী করবো তোর।”
“দিগন্ত ভাই!!!” ইশির কান ঝা ঝা করে উঠে।
দিগন্ত বাহু ধরে টেনে কাছে নিয়ে আসে ওকে। কাধে ভাঁজ করে তুলে রাখা আঁচলের এক অংশ সন্তর্পণে নামিয়ে দেয়। উন্মুক্ত পেটের একপাশসহ কোমর ঢেকে যায়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে লজ্জ্বা পেলেও আর কিছু বলেনা ইশি।
“আচল তুলে ছবি তুললে দুটোকে মেরে ছবি তোলার স্বাদ জন্মের মতো মিটিয়ে দেবো।” কথাটা বলে হুশিয়ার করেই চলে যায় দিগন্ত। ইশি বুঝতে পারে তাকে আর দিথী, দুজনকেই সাবধান করা হয়েছে। সে খনিকের জন্য দিগন্ত ভাইকে নিয়ে উল্টাপাল্টা ভাবনা মাথায় এনেছিল, ভাবতেই বিভ্রত বোধ করে।
———————
অয়ন্তিকে কোলে নিয়ে রুমে প্রবেশ করে পিঠ দিয়ে ঠেলে দরজা লাগিয়ে দেয় মাহাদ। ওভাবেই দাড়িয়ে থেকে মাথা ঝুকিয়ে ওর কপালে, গালে চুমু খায়। ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে যেতেই দুহাতে মাহাদের গলা জড়িয়ে মুখ গুজে দেয় অয়ন্তি। সারা শরীর কাপঁছে তার। মাহাদ ভাই কি করতে চাচ্ছে তা সে বুঝতে পারছে। কিন্তু এই মুহুূর্তে এসব কেন? মাহাদ ভাই পাগল হয়ে গিয়েছে। এই দিনের বেলায়, অসময়ে… বাড়ির কেউ মাহাদ ভাই অফিস যায়নি কেন জিজ্ঞেস করলে, সে কি জবাব দেবে। না জানি এভাবে নিয়ে আসার সময় কে কে দেখেছে। মাহাদ ভাই এই মুহূর্তে এমন পাগলামি করলে এই মুখ সে কিভাবে দেখাবে সবাইকে। অয়ন্তির শরীরের কাঁপুনি মাহাদ স্পষ্ট টের পায়। এতে সে আরো অস্থির হয়ে উঠে। পিঠ আর উরুর নিচে থাকা হাত আরও শক্ত করে ওকে কাছে টেনে অস্থির কণ্ঠে বলে,
“মাথা তোল অয়ন্তি। একটা চুমু খাবো ঠোঁটে। মাথা তোল।”
অয়ন্তি ওভাবে থেকেই দুপাশে মাথা নাড়ায়। সে তুলবেনা মাথা।
“না। তুমি পাগল হয়ে গিয়েছ। সময়ের খেয়াল আছে? বাড়িতে সবাই আছে। তোমার অফিস আছে। অফিস বাদ দিয়ে পাগলামি করছ। কেউ বুঝতে পারলে মুখ দেখাতে পারবো না।”
মাহাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“মেজাজ খারাপ করিস না। বুঝতে পারলে কেউ আর কিছু জিজ্ঞেস করবেনা। তোর না থাকলেও এতটুকু আক্কেল বাকিদের আছে। এবার আমার দিকে তাকা।”
অয়ন্তি তাও জেদ ধরে থাকলে মাহাদ ওকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। কোন কথা না বলে অয়ন্তির মাথার পেছনে দুহাত দিয়ে শক্ত করে ধরে তার ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে দেয়। কিছু সময় গেলে আস্তে আস্তে দুহাত নামায়। এরপর সেই হাত দুটোর বিচরন ভীষণ সাংঘাতিক হয়ে উঠে। নিজের হাত দিয়ে মাহাদকে থামাতে চায় অয়ন্তি, তবে পারেনা। তার শরীরে মাহাদের হাতের স্পর্শ খুব বেপরোয়া। ঠোঁট ছাড়া পেতেই হাপাতে হাপাতে তার বুকে মাথা রেখে বলে,
“মাহাদ ভাই। রাতে প্লিজ। এখন না। তুমি বুঝতে পারছ না কেন? তোমার লজ্জ্বা না লাগলেও আমার লাগবে। আসার সময় ইশি, দিগন্ত ভাইকে দেখেছি। প্লিজ এখন ছেড়ে দাও।”
অয়ন্তির কথা শুনে থেমে যায় মাহাদ। তার কানে ঢুকেছে শুধু ‘এখন না, রাতে প্লিজ’ কথাটা। অয়ন্তি তাকে রাতে কাছে আসার আহ্বান করলো মাত্র। সে বুক থেকে তার মাথা তুলে। মুখটা দুইহাতের আজলায় নিয়ে তার সেই আতঙ্কিত, অস্থির চেহারায় চোখ বোলায়। শান্ত স্বরে বলে,
“ঠিক আছে, রাতে। কিন্তু আমার শর্ত আছে।”
অয়ন্তি একটু স্বস্তি পায়। পাগলটাকে থামাতে পারলো অবশেষে। হাঁপাতে হাঁপাতে জানতে চায়,
“কি শর্ত?”
মাহাদ অয়ন্তির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলে। অয়ন্তির কান ঝা ঝা করে উঠে। লাজে রেঙে যায় মুখটা। তবে তার কাছে এই মুহূর্তে মাহাদ ভাইয়ের পাগলামিতে সায় দেওয়ার চেয়ে শর্ত মেনে নেওয়াই ভালো হবে মনে হলো। চোখ নামিয়ে কোনভাবে সায় জানায়।
———————
ফারদিন বাড়ির আবহাওয়া অন্যরকম। কারো মনের অবস্থা ঠিক নেই। সবাই খুব চিন্তিত, উদ্বিগ্ন। প্রাণেশার প্রেগ্ন্যান্সির ব্যাপারে জানতে পেরেছে সবাই। সাহিলই বলেছে। হস্পিটালে সেদিন চেক আপ করিয়ে জানতে পেরেছিল তারা দুজন। বাড়িতেও জানিয়েছে। প্রাণেশার খারাপ কেউ চায় না এবাড়িতে। না তো মনে মনে তাকে অপছন্দ করে কেউ। বরং সে কথা বলতে পারেনা বলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মায়া কাজ করে সবার তার প্রতি। এক সময় ঈর্ষা-হিংসা থেকে ভুল করলেও, তারা মানুষ হিসেবে খারাপ- এমনটা নয়। সাহিলও তা জানে। তাই লুকানোর কিছু আছে বলে মনে হয় নি। বরং বড় মা, ফুফি, দাদি কিংবা নাজিয়া প্রাণেশার সাথে কথা বলে কিছু জানতে পারবে, ওর মন ভালো রাখতে পারবে ভেবে, ওদের জানানোটাই ভালো হবে মনে হয়েছে। সবাই জেনেছে ঠিকই, ওর সাথে কথাও বলতে চেয়েছে। কিন্তু প্রাণেশা কিছু বলতে চাইছেনা। শুধু লিখে জানিয়েছে, ওর বাচ্চা অবৈধ কিংবা নাজায়েজ নয়। তাই মনে মনে সবাই যা করার কথা ভাবছে তা যেন মুখেও না আনে। এতোটুকু বললেও বিস্তারিত কিছু জানায়নি কাউকে। সে এই বিষয় নিয়ে কথা বলার মতো, কিংবা নিজের অতীত সম্পর্কে জানিয়ে মন হালকা করার মতো সম্পর্ক এখনো কারো সাথে গড়ে তুলতে পারেনি। কম্ফোর্টেবল নয় সে এই বিষয়ে কারো সাথে কথা বলতে। তার চেয়ে বড় কথা, প্রাণেশার এটা নিয়েও কিছু যায় আসছেনা যে, তারা ওকে খারাপ মেয়ে ভাবতে পারে। কিংবা ওর সাথে খারাপ কিছু হয়েছে ভাবতে পারে। ওকে যেন কোনকিছুই আর ছুঁতে পারছে না। ব্যাল্কনিতে একটা টুলে বসে আছে সে। হাল্ফ রেলিং এ দুহাত ভাঁজ করে দিয়ে সেখানে মাথা রেখে উদাস হয়ে আকাশ দেখছে। সকালেও কেমন মেঘলা ছিল আকাশ। এখন বৃষ্টির নাম গন্ধ নেই। এই রোদ, আবার এই মেঘ। একদম তার জীবনের মতো। একটু সুখ আসলে, টুক করে আবার চলে যায়। অসহ্য!! কিছু ভালো লাগছেনা তার। কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করছে। সবার থেকে দূরে। কতো উল্টাপাল্টা ভাবনাও আসছে মাথায়। এই যেমন, অন্তিকের অংশ আছে এখন তার শরীরে, অথচ ঐ স্বার্থপর মানুষটা জানেওনা। কেমন বাবা সে? যে বাবা হবে তাই জানেনা! পরক্ষণে ভাবে, সে না জানালে জানবে কি করে? আচ্ছা যদি অন্তিক ও বাবা হবে জানতে পেরে বাচ্চাটাকে নিয়ে নেয়, ওকে বাচ্চা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তখন?
না, তাহলে সেও বাচ্চার পেছন পেছন চলে যাবে। তার বাচ্চা নিবে অথচ তাকে নিবেনা!! এমন করলে উকিল সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করবে। উদ্ভট চিন্তা ভাবনায় প্রাণেশা বিরক্ত হয়। দুতলায় রুম হওয়ায় ব্যালকনি থেকে বেশ দূর অব্দি দেখা যায়। তার মনে হলো, গেইট থেকে কিছুটা দূরে দাড়িয়ে থাকা ঐ গাড়ি থেকে কেউ তাকে দেখছে। কিন্তু কাউকে তো দেখা যাচ্ছেনা। মনের ভুল ভেবে তেমন পাত্তা না দিয়ে ভেতরে চলে যায় প্রাণেশা।
বাড়ির সবাই প্রাণেশার সম্পর্কে খারাপ কিছু ভাবছেনা। কিন্তু তার সাথে খারাপ কিছু হয়েছে এমনটাই ধরে নিয়েছে সবাই। সেদিন দুর্বল শরীরে সাহিলের গাড়ির সামনে এসে পড়েছিল। নিশ্চয় যে অমানুষের হাতে পড়েছিল তার থেকে বাচতে ওভাবে ধ্যান জ্ঞান খুইয়ে গাড়ির সামনে এসে পড়েছিল। প্রাণেশা নিজের অনাগত সন্তান নাজায়েজ নয় বললেও, সবাই মনে করেছে নিজের সন্তানের প্রতি মায়া ভালোবাসা থেকে এমন বলছে। প্রাণেশা বিবাহিত হতে পারে এমন কিছু কেউ সেভাবে মাথায় আনেনি। কি করবে না করবে সেসব নিয়ে ভীষণ চিন্তিত সবাই। লোক, সমাজ নিয়ে বাকিরা ভয় পেলেও সাহিল আর তার বাবার ঐ বিষয়ে কোন ভাবনা নেই। তাদের চিন্তা শুধু প্রাণেশাকে নিয়ে। ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কিভাবে সব জানতে পারবে তা নিয়ে। অপরাধীকে একটা বার পেলে হবে। মাটির সাথে গেড়ে দেবে একদম। কিন্তু কোনভাবেই তো জানতে পারছেনা। প্রাণেশা কিছুই তো বলছেনা। ও না বললে কিভাবে কি হবে?