মৌনপ্রেম

পর্ব - ৩৬

🟢

প্রাণেশা নিজের বাড়ি এসেছে অব্দি এ বাড়িতেই আছে। বাইরে কোথাও যাওয়া হয়নি তার। বাড়ির প্রত্যেকে নানা কাজে, প্রয়োজনে বাইরে গেলেও সে একেবারে ঘর বন্দি ছিল এ কটা দিন। বোনের সারাদিন বাড়িতে থাকতে থাকতে একটু বাইরের আবহাওয়া না পেলে দমবন্ধ লাগবে বলে সাহিল ঠিক করে ওকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবে। নাজিয়াও যাওয়ার বায়না করলে পরে আবার তারা সব ভাই বোন মিলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাস, সবাই মিলে লেক পার্ক চলে যায় ঘুরতে। সেখানে সবাই মিলে বেশ অনেকক্ষণ সময় কাটিয়ে প্যাডল বোটিং করে। পুরো জায়গাটা অভিজ্ঞতা করে আসে। সপ্তাহান্তে কিছু ছোট ছোট প্রাইভেট ইভেন্ট বা পাবলিক অনুষ্ঠান হয় সেখানে। ওরাও তেমনই একটা ইভেন্টের দেখা পেয়েছিল। পার্কের কাছাকাছি কিছু ফুড কর্নার আছে, সেখানে তারা দুই বোন আর বড়মার ছোট ছেলে মিলে ফুঁচকা খাওয়ার প্রতিযোগিতা দেয়। প্রাণেশা সবার লাস্ট হয়েছে। তবে কম খায়নি মোটেও। যা খেয়েছে তাতেই তার অবস্থা দেখার মতো ছিল। সব মিলিয়ে সুন্দর একটা সময় কাটে প্রাণেশার তার ভাই বোনেদের সাথে। আসার পথে আবার রাস্তার ধারে সারি সারি কাশফুলের দেখা পায়। বাকিরা খেয়াল না করলেও প্রাণেশা গাড়ির কাচ নামিয়ে উৎসুক চোখে সেসব দেখে। সাহিল বোনের উৎফুল্ল চেহারা দেখে নিরিবিলি সাইডে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে সেখানেও ওদের নিয়ে কিছুক্ষণ দাড়ায়। শরৎ এর কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করে ছবি-টবি তুলে তারপর বাসায় ফিরে।

কিন্তু বাসায় ফিরেই হয় বিপত্তি। প্রতিযোগিতায় খাওয়া অতো ফুচকার ভার বেচারি নিতে পারেছেনা। সারারাত অস্বস্তির সাথে কাটে। কাউকে অবশ্য জানায় নি। রাতে খাবার খেতে না চাইলে কেউ শুনেনি। জোর করে খাইয়েছিল। না খেয়ে ঘুমালে সারারাত ক্ষুদার চোটে অস্থির লাগবে বলে। ফুচকার লোড নিয়ে রাতেও খাওয়া তার শরীরের জন্য অতিরিক্ত হয়ে যায়। সারারাত অস্বস্তি নিয়ে ঘুমায়। কিন্তু সকাল হতেই সবার জোরাজোরিতে আবার নাস্তা করতে বসলে, অর্ধেক খাওয়ায় পর পরই সব উগ্লে দেয়। বমি করতে করতে কাহিল অবস্থা হয়ে যায় তার। বড়মা ওকে ধরতে গেলে গাঁয়ে হাত দিতেই জ্বর আসার মতো হালকা গরমের আভাস পায়।

সবাই ডাক্তার ডাকতে উদ্যত হয়ে উঠে। প্রাণেশা এই সামান্য কারণে ডাক্তার দেখাতে অসম্মতি জানালেও কেউ শুনেনা। তার বাবা পারিবারিক ডাক্তারকে ফোন দিতে চায়। কিন্তু সাহিল কি মনে করে মানা করে দেয় পারিবারিক ডাক্তারকে ডাকতে। জানায় সে প্রাণেশাকে নিয়ে হস্পিটালে যাবে।

সবাই হঠাৎ ওকে হস্পিটালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলায় অবাক হয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেও সে উত্তর দেয় না। তার বোনকে নিয়ে সে যেখানে ইচ্ছে যাবে, কাউকে কৈফিয়ত দেওয়ার দরকার মনে করেনা। বাকিরা প্রাণেশার জন্য উদ্বেগ হলেও হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার মতো কিছু হয়নি, তাই আপত্তি জানাচ্ছিল। কিন্তু সাহিলের ত্যাড়ামো দেখে আর কিছু বলেনা। ছেলেটা চিরকালই এমন, কোন কিছুর কৈফিয়ত দিতে চাইবেনা, ত্যাড়ামো করবে কথায় কথায়। প্রাণেশার নিজেরও অসম্মতি ছিল সামান্য কারণে হস্পিটালে যেতে। কিন্তু সাহিল কারো কথা শুনেনা। ওকে নিয়ে চলে যায়।

মূলত সে প্রাণেশার কিছু চেক আপ করিয়ে আনতে চায়। সেদিনের পর কোনরকম সমস্যা দেখা দেয়নি যদিও। কিন্তু ওকে একবার ডক্টর দেখিয়ে আনার কথা অনেকবার ভেবেছে। তবে কি বলে নিয়ে যাবে বোনকে, সেটা নিয়ে কিছুটা দ্বিধা ছিল। এখন যখন সময়, সুযোগ দুটোই হাতে আছে। তখন সেটা মিস দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা। তার এখনো প্রাণেশার সাথে ওর আগের জীবনযাপন নিয়ে তেমন কোন কথা হয়নি। হলে অন্তত কিছুটা বুঝতে পারতো। আর ওর সাথে কি হয়েছিল না হয়েছিল সেসবও জানতে পারতো। কিন্তু সে আফসোস আর অপরাধ বোধে সেসব নিয়ে কথা বলতে পারছেনা। মামণির এত এত খোঁজ নিয়েও সে ব্যর্থ হয়েছে। একটা বোন আছে সে ব্যাপারেও জানতো না। না জানি কি কি ফেস করতে হয়েছে তার বোনকে সারাটাজীবন। কিভাবে কেটেছে এতোগুলো বছর বাবা-মা ছাড়া, তাদের ছাড়া। খুব একটা ভালো কাটেনি সে ধারণা হয়ে গিয়েছে। আচ্ছা ও আগে যে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতো সে বাড়িতেই কি কোন অমানুষ ছিল?

———————

প্রাণেশাকে সেদিনের ঐ মহিলা ডক্টরের কাছেই নিয়ে গিয়েছিল সাহিল। ওর নানান রকম চেক আপ করিয়ে এনেছে। এখন তারা গাড়িতে বসে আছে। গাড়ির ভেতরের পরিস্থিতি ভীষণ থমথমে। প্রাণেশা যেন অন্য জগতে আছে। তার সাথে কি হলো, কি হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছেনা সে। মনে হচ্ছে সময়টা এক জায়গায় আঁটকে আছে। দুনিয়াটা থমকে গিয়েছে। জীবনটা তাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেলো। আবার কোথায় নিয়ে দাড় করাতে চাচ্ছে, কিছু জানেনা সে। এটা আদৌ জীবন? এমনটা কারো সাথে হয়? সে জীবনের এমন খেলায় খুশি হবে নাকি দুঃখ পাবে কিছু জানেনা। তার ভাই এখনো কিছু জিজ্ঞেস করেনি। জানতে চাইলে কি বলবে তাও জানেনা।

সাহিল এক পলক বোনের দিকে তাকায়। তার মুখভঙ্গি ভীষণ শক্ত, তবে কিছুটা চিন্তার ছাপও দেখা যাচ্ছে। প্রাণেশার ভেতর কি চলছে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে। তবে সে বিষয়ে কিছু না বলে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে সিটে মাথা ফেলে একটু ঘুমাতে বলে। কাল সারারাত অসুস্থ বোধ করেছিল, ঘুম হয়নি নিশ্চয়।

তারপর দৃঢ় অভিব্যক্তিতে কাউকে ফোন লাগায়। রিসিভ হলে ড্রাইভারকে সাইড হয়ে এক জায়গায় গাড়ি থামাতে বলে। বোনের সামনে দলের কারো সাথে কিংবা অন্য যে কারো সাথে কথা বলতে চায় না সে। কি কারণে কোন ভাষা ব্যবহার করতে হয় তার হিসাব নেই।

সাহিল গাড়ি থেকে কিছুটা দূরত্বে গিয়ে দাড়ায় কথা বলতে। বেশ কিছুক্ষণ আলাপ সারে অপর পাশের ব্যক্তির সাথে। কিছু নিয়ে তাড়া দিচ্ছে, রাগ দেখাচ্ছে, আবার কিছু বুঝিয়েও দিচ্ছে। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে গাড়ির ভেতর বোনের দিকে নজর রাখে। হঠাৎ খেয়াল করে পেছন থেকে আরেকটা গাড়ি আসছে। বেপরোয়া গতি গাড়িটার। সাহিলের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে ওটা ইচ্ছাকৃত চালানো হচ্ছে ওভাবে। সে ডাক দিয়ে গাড়ির ড্রাইভারকে গাড়ি অন্যদিকে নিয়ে যেতে বলবে তার আগে পেছনের গাড়িটা তাদের গাড়ি বরাবর চলে এসে ধাক্কা লাগিয়ে দিতে যায়। সাহিল ঐ গাড়িটার উদ্দ্যেশে একটা বিচ্ছিরি গালি ছুড়ে ফোনটা পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে দৌড়ে ওদিকে যায়। ধাক্কা দিতে পারেনি। তাদের গাড়ির ড্রাইভার পেছন থেকে ঐ গাড়িটাকে দেখে নিয়েছিল। অস্বাভাবিক গতি বুঝে নিজেদের গাড়ি সরিয়ে ফেলেছে। সাহিল আসতে আসতে অপর গাড়িটা উদ্দেশ্য সফল করতে না পেরে চলে যায়।

প্রাণেশা ঘোরে ছিল। হঠাৎ কি হলো কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। সাহিল তাড়াতাড়ি এসে ওকে দেখে নেয়। কিছু হয়েছে কিনা দেখে নিজে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠতে যাবে তার আগে খেয়াল করে আরও একটা গাড়ি আসছে পেছন থেকে। ড্রাইভার ডেস্ক থেকে একটা রিভলবার বের করে তার হাতে দিলে সাহিল ঐ গাড়িটার টায়ারে শু ট করে দেয়। প্রাণেশা বোবা চিৎকার দিয়ে কানে হাত দেয়। আতঙ্কিত হয়ে চারপাশে তাকায়।

ঐ গাড়িটা থেমে গেলেও ভেতর থেকে কেউ ক্রমাগত গু লি ছুড়তে থাকে তাদের উদ্দেশ্যে। সাহিলও প্রাণেশাকে মাথা নামিয়ে বসে যেতে বলে পাল্টা শু ট করতে শুরু করে। আস্তে আস্তে গাড়ির অন্যপাশে গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে তাকায়। ওরা বারবার গাড়ির ভেতরে টার্গেট করছে। প্রাণেশার ক্ষতি করতে চাইছে যেকোনোভাবে তা স্পষ্ট। সাহিল ওদের উদ্দেশ্যে পাল্টা গু লি ছুড়তে ছুড়তে প্রাণেশাকে বলে, “ভয় পাস না। মাথা ঝুকিয়ে নিচে বসে যা। কিছু হবেনা আমি আছি”। ড্রাইভারও নিজেকে আড়াল করে নিয়েছে। পেছন থেকে আরো একটা গাড়ি আসলে সাহিল ওটার টায়ারেও শু ট করে। লাগেনি। চোখ মুখ কুচকে শব্দ করে উঠে “শিট” বলে। আবার শু ট করতে চায়। কিন্তু ততক্ষণে ওটা চলে এসেছে একদম কাছাকাছি। সাহিল ড্রাইভারকে ডাক দিয়ে নেমে যেতে বলে। প্রাণেশাকে ভেতরে অজ্ঞান হয়ে পরে থাকতে দেখে টেনে নামিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে দরজা খুলবে তার আগে সামনে থেকে আরেকটা গাড়ি এসে ঐ গাড়িকে ধাক্কা লাগিয়ে দেয়, আর চোখের পলকে তাদের গাড়ির দরজা খুলে প্রাণেশাকে টেনে নিজেদের গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়।

সাহিল “হেই” বলে ডাক দিয়ে উঠলেও ঐ গাড়িতে থাকা কেউ সেসব শুনার জন্য আর থাকেনা।

সাহিল অস্থির চোখে ঐ গাড়ির নাম্বার দেখে নেয়। ওটাতে কে ছিল তা সে জানেনা। তবে এই পক্ষ আর ওরা এক নয় তা সহজেই বুঝে নিলো অন্য গাড়িটাকে ধাক্কা দেওয়ায়। প্রাণেশাকে কেউ নিয়ে চলে গেলেও বেশ অনেকক্ষণ তাদের গু লা গু লি জারি থাকে। সাহিল শু ট করতে করতে কাউকে ফোন লাগিয়ে বোনের খোঁজ নিতে বলে।

——————————

প্রাণেশাকে অন্তিক নিয়ে এসেছে। ওকে ঐ গাড়ি থেকে তুলে নিয়ে সে বাড়ির উদ্দেশ্যে গাড়ি চালাতে বলে। প্রাণেশার অবস্থান অন্তিকের কোলে। অজ্ঞান হয়ে আছে। এত এত চিন্তার মধ্যে হঠাৎ এসব নিতে পারেনি। চোখের সামনে গুলাগুলি, সেসবের ভয়ঙ্কর শব্দ - সব মিলিয়ে আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়েছে। অন্তিক ওর জ্ঞান ফেরায় না। ছোট বাচ্চাদের যেভাবে কোলে নেয় সেভাবে নিয়ে নিজের বুকে ওর মাথা রাখে। একদম আগলে নেয় বুকের সাথে। মুখটা তুলে চোখের উপর আসা চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুজে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। পর পর নাকে, আবার ঠোঁটে। এভাবে ছোট ছোট আদুরে স্পর্শ দিয়ে নিজের তৃষ্ণা মেটায়।

৷৷কাল ওকে দেখেছিল। রাস্তার পাশে দাড়িয়ে ছবি তুলছে। প্রাণেশাকে ওখানে দেখে তৎক্ষণাৎ কেমন প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত বুঝতে পারেনি সে। অতি আকাঙ্ক্ষিত কিছু হঠাৎ চোখের সামনে দেখলে যেমন হয়, তেমনই স্থবির হয়ে গিয়েছিল অন্তিক। আদৌ ঠিক দেখছে কি না তা নিয়েও সন্ধেহ ছিল। স্থবির হয়ে ওকে দেখতে দেখতেই গাড়িতে উঠে তারা চলে যায়। অন্তিক গাড়িটা যত দূর অব্দি দেখা গিয়েছে চেয়ে দেখেছে। চোখের আড়াল হতেই নীলয়ের দিকে তাকায়। নীলয়ের চোখ তখনো সেদিকে। অন্তিক বুঝতে পারে ভুল কিছু দেখেনি। কি হলো? প্রাণেশা এখানে কিছু ছেলেমেয়েদের সাথে? কি হচ্ছে? কেমন হতবাক চিত্তেই ফোন বের করে। সেখানে ঐ গাড়ির নাম্বার লিখে কাউকে টেক্সট করে পাঠিয়ে দেয়। তারপর কল দিয়ে রিসিভ হতেই বলে, “কার নামে আছে গাড়িটা খুঁজে বের করো পনেরো মিনিটের মধ্যে।”

যথাসময়ে জানতে পারে রাজনীতিবিদ সাহিল ফারদিনের গাড়ি ছিল ওটা। অন্তিকের ভ্রু টানটান হয় সাহিলের নাম শুনে। বেশ কয়েক মিনিট চুপচাপ থেকে কিছু ভাবে। এর মধ্যে নীলয় বলে,

“স্যার, ঐ গাড়িতে ম্যাডাম চলে গেলো না এখন? সাহিল ফারদিনকেও তো দেখলাম। ঐ যে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি। সেবার দেখা করলেন। কি হলো ব্যাপারটা বুঝতে পারছিনা।” নীলয় দ্বিধান্বিত স্বরে বলে

অন্তিক চোখ তুলে তাকায়।

“তুমি দেখেছ? ওখানে সাহিল ফারদিনও ছিল?”

“হ্যাঁ স্যার। মাত্রই তো দেখলাম।”

অন্তিকের টানটান ভ্রু সোজা হয়। তবে চিন্তার রেখা সরেনা চেহারা থেকে।

তারপর রাতের মধ্যে খোঁজ লাগিয়ে জানতে পারে সাহিল ফারদিন প্রাণেশার ভাই। প্রাণেশার না জানা বাবা হলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সজল ফারদিন। প্রাণেশা তাহলে তার বাবা বাড়ি চলে গিয়েছিল সরোয়ার বাড়ি থেকে। কিন্তু অন্তিক ভেবেছিল প্রাণেশা নিজের বাবা বাড়ি সম্পর্কে কিছু জানেনা। তার মানে তার ধারণা ভুল ছিল। তাহলে যদি জেনেই থাকে নিজের বাবা বাড়ি থাকতো না কেন? আর তাদেরও জানায়নি কেন? সে নিজে কখনো প্রাণেশাকে জিজ্ঞেস না করলেও যতটুকু জানে বাড়ির কেউ বাবার সম্পর্কে জানতে চাইলে মেয়েটা কিছু বলতো না। তাহলে জেনেও তাদের জানায়নি? কেন?

এমন নানান প্রশ্ন মাথায় আসলেও প্রাণেশাকে খুঁজে পেয়েছে, আর সে সুরক্ষিত আছে এটা ভেবেই সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এই মেয়েটাকে নিয়ে খুব, খুব দুশ্চিন্তায় ছিল সে। উপরে উপরে না দেখালেও তার ভেতরটাও অস্থির হয় আপনজনদের বিপদে। সেখানে মেয়েটাতো তার বউ। এত সাধনার বউ। অপরিচিতা থেকেও প্রথম দিন থেকে তার মনে জায়গা করে নিয়েছিল। আবার বউ হয়ে তার মনে জায়গা করেছে। তাকে দু দুবার করে প্রেমে ফেলেছে এই মেয়েটা। এত সহজ তার কোন খোঁজখবর না জানা অবস্থায় এতোগুলো দিন পার করা? মানসিকভাবে কতটা বিধ্বস্ত ছিল সে তা এই মেয়েটা বুঝবে কখনো?

নিশ্চয় বুঝবেনা। তাকে বুঝাতে হবে। অন্তিক কারো প্রতি নিজের আবেগ-ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেনা সহজে। এ দিকটাই খুব কাচা সে। প্রাণেশাকে এত চায়, এত ভালোবাসে সে। কিন্তু তার কিছুই মেয়েটা জানেনা। শুধু জানে তার স্বামী এখন তাকে মেনে নিয়েছে। প্রাণেশা হয়তো মনে করে অন্তিক তাকে শুরুতে মেনে নিতো না, সে কথা বলতে পারেনা বলে। কিন্তু অন্তিক এ বিষয়টাকে কখনো সেভাবে গুরুত্বই দেয়নি। অন্তিকের কখনো মনেই হয়নি যে কথা বলতে না পারাটা একটা প্রতিবন্ধকতা মেয়েটার জন্য। তাহলে এই কারণে ওকে মেনে না নেওয়ার প্রশ্ন আসবে কেন? অবশ্য ভেবে দেখে তার মনে পড়ে একবার দুইবার কথা বলতে পারেনা একথা উল্লেখ করে ওকে খুচিয়েছিল। কিন্তু সেসব কিছুই অন্তিক ওকে ব্যক্তিগত ভাবে ব্যঙ্গ করে বলেনি। আর না মানসিকভাবে ভেঙে দিতে বলেছে। মেয়েটা কতো সুন্দর… এখন সে যদি, রুপ দেখিয়ে ও সবাইকে পাগল করে দিতে পারে, একথা কখনো কথায় কথায় খুচিয়ে বলে। তাহলে সেটা কি ওকে ব্যক্তিগত ভাবে ব্যঙ্গ করা হবে? নাকি ওকে মানসিকভাবে আঘাত করা হবে? কিছুই হবেনা। বরং লজ্জ্বা পাবে। অন্তিক ওকে কথা বলতে পারেনা একথা উল্লেখ করে যতবার ওকে কিছু বলেছে, কোনবারেই ওকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে এসব বলেনি। যেখানে সে ওর কথা বলতে না পারাকে একটা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখেইনা। সেখানে ঐ বিষয়টা নিয়ে সে মেয়েটাকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কিছু বলবেই কেন? সে তো নরমালি দেখে এসব।

সেসব গেলো। কিন্তু তারপর যখন আবার দেশের বাইরে থেকে এসে ওকে ডিভোর্সের কথা ভুলে যেতে বলে, তখনো নিজের অনুভুতি সম্পর্কে কিছু জানায় নি ওকে। শুধু বলেছে ডিভোর্স দেবেনা। তারপর একসাথে থাকা শুরু করলো। ভালোবাসা থেকে হোক, মুগ্ধতা থেকে হোক কিংবা কামনা থেকে - যেকোনো কারণে ওর কাছাকাছি যেতে মন চাইতো অন্তিকের। হয়তো বউ বলে। হালাল বলে ভেতর থেকে চাওয়া গুলো আসতো। নাহয় প্রাণেশা তার জীবনে আসার আগে তো এমনটা কখনো হয়নি তার সাথে। তোশা ছাড়া আর কোন মেয়ে বন্ধু ছিলই না। ফুফাতো বোন মেহেরিন ওকে ভালোবাসে জানার পরও তেমন কোন অনুভূতি হতোনা তার। একটা মেয়ে তাকে ভালোবাসে, এই বিষয়টা নিয়ে সে কখনো গভীরভাবে ভাবেইনি। ভাবার ইচ্ছেই হয়নি। প্রাণেশাকে নিয়েই যতো ভালো খারাপ অনুভূতির জন্ম হয়েছে তার মনে। ওর উপরেই ভালো খারাপ সব রকম অধিকার খাটিয়েছে।

অনুভূতি প্রকাশে কাচা বিশিষ্ট সফল আইনজীবী অন্তিক - নিজের বউকে আগে ভালোবাসি কথাটা না বলে তার সাথে দাম্পত্যের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করে নিয়েছে। আর তার বউ অভিমান করে চলে গিয়েছে বাপের বাড়ি। ওকে অপরাধ বোধে ফেলে দিয়ে বাবা-ভাইয়ের সাথে থাকছে। এলোমেলো ভাবনায় অন্তিক হঠাৎ হেসে উঠে। দুহাতে মুখটা ঘষে আকাশের দিকে তাকায়।

সে যে নিজের আবেগী বউকে আগে ভালোবাসি না বলে কাছে টেনে ভুল করেছে, সে বোধ তার আগেই এসেছে। কিন্তু স্বভাব অনুযায়ী আবেগ অনুভূতি প্রকাশে কাচা হওয়ায়, ভালো লাগা কিংবা ভালোবাসা যেমন প্রকাশ করতে পারেনি, তেমন খারাপ লাগা কিংবা অপরাধ বোধও প্রকাশে অপটু সে। এর বাইরে সেদিন বিকেলে করা ব্যবহার তো সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিলই। এবার কাছে পেলেই ক্ষমা চেয়ে নিবে। এসব ভেবে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

সে বাড়ির বাইরে দরজার কিছুটা সামনে দাড়িয়ে কথাগুলো ভাবছিল।

নিজের ইন্ট্রোভার্ট ভাই, ভাবি চলে যাওয়ায় কেমন বদ মেজাজি হয়ে গিয়েছিল। কিছু বললেই ছ্যাঁত করে রেগে যেতো। সে ভাই এখন এখানে দাড়িয়ে একা হাসছে। হাঁটতে হাঁটতে বিষয়টা দেখে ইশির কৌতূহল হলেও কিছু জিজ্ঞেস করেনা। না জানি আবার রেগে গিয়ে একটা ঝাড়ি দিয়ে দেয়। ইশি মা, চাচির পাশে গিয়ে বসে। কথায় কথায় তার মা প্রাণেশার জন্য আফসোস করেন। ছেলেটাও কেমন হয়ে গেলো ভেবে মুখ অন্ধকার করেন। তা দেখে ইশি আনমনে বলে,

“ভাইয়ার জন্য এত চিন্তা না করে ভাবির জন্য করো। ভাইয়াকে তো দেখলাম বাইরে দাড়িয়ে একা একা হাসছে। কি জানি কি হলো? নাকি ভাবির শোকে পাগল হয়ে গেলো কিছুই বুঝলাম না।”

মেয়ের কথা শুনে মিসেস আয়েশা আমিন তাকান।

“বাইরে দাড়িয়ে হাসছে মানে?”

“হু, খুশি খুশি দেখাচ্ছে। কিন্তু কি হয়েছে বুঝতে পারিনি।”

“প্রাণেশার খোঁজ পেলো নাকি?” কথাটা বলে তিনি ছেলের কাছে যান। অন্তিককে জিজ্ঞেস করলে সে কোনো বণিতা করেনা। জানিয়ে দেয় আজ ওকে দেখেছে এক জায়গায়। খোঁজ নিয়ে জেনেছে ও এখন নিজের বাড়িতে চলে গিয়েছিল। আয়েশা আমিন অধৈর্য হয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে অন্তিক তার মাকে সব জানায়। তিনি ওবাড়ির কেউ উনাদের সাথে যোগাযোগ করে কিছু জানালো না কেন জানতে চাইলে অন্তিক বলে,

“যতটুকু বুঝতে পারছি তোমার বউমা বাড়ির কাউকে জানায়নি যে সে এখন বিবাহিতা।”

“কি বলছিস? বিয়ের বিষয়টা জানালো না? রাগ অভিমানে হয়তো।’ তারপর কিছু ভেবে আবার বলেন, “সে যাক, একদিন সবাই মিলে তাহলে ও বাড়ি গিয়ে ওকে চেয়ে নেব। যা হয়েছে সব কিছু উনাদের জানিয়ে ভুল বুঝাবুঝি দূর করে ওকে নিয়ে আসতে হবে।”

অন্তিক কিছু বলেনি তখন। নীরব সম্মতি দিয়ে ভাবছিল কিভাবে ওর সাথে দেখা করা যায়। কিভাবে কথা বলা যাবে একটু। ওর মান অভিমান ভাঙিয়ে তারপর ও বাড়ি থেকে নিয়ে আসাটাই বেস্ট হবে মনে হয়েছে তার কাছে…৷৷

কালকের কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ি পৌছে যায় তারা। প্রাণেশাকে কোলে নিয়ে নেমে বাড়ির সামনে যায়। বেল বাজালে কিছুক্ষণের মধ্যে চাচি এসে দরজা খুলে দেয়।

মিসেস তাবিয়া হঠাৎ অন্তিককে একটা মেয়ে কোলে নিয়ে দরজার সামনে দেখে অবাক হন। কিন্তু মেয়েটার চেহারা দেখে অবাকতা খুশিতে পরিণত হয়। ওদের ভেতরে আসতে দিয়ে সবাইকে ডেকে আনেন। অন্তিক ততক্ষণে প্রাণেশাকে নিজের রুমে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। বাড়ির সবাই বাড়িতেই ছিল শুক্রবার হওয়ায়। মিসেস আয়েশা আমিন রাতেই সবাইকে জানিয়েছিলেন প্রাণেশার ব্যাপারে। সবাই তো আরও দুই এক দিন সময় নিয়ে ওবাড়ি গিয়ে ওকে নিয়ে আসার কথা ভেবে রেখেছিল। তাহলে ওকে আবার নিয়ে আসলো কেন কিছু বুঝতে পারছেনা। তার উপর ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। আয়েশা আমিন ভয় পেয়ে যান। ছেলেটা আবার জবরদস্তি নিয়ে আসলো না তো প্রাণেশাকে?

“ওকে তো আরও পরে সবাই মিলে গিয়ে নিয়ে আসার কথা ছিল। আজকে নিয়ে আসলি যে? আর ঘুমাচ্ছে কেন? আবার কি করেছিস?” উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি জানতে চান।

অন্তিক ওকে ঠিক করে শুইয়ে দিয়ে মায়ের দিকে তাকায়। বাবার দিকে তাকালে বুঝতে পারে তার ধারণাও একই। সবাই ভেবেছে ওর সাথে কিছু করে তুলে এনেছে জোর করে। ওদের ভাবনায় তেমন পাত্তা দেয় না সে। তবে মায়ের চিন্তিত চেহারা দেখে জবাব দেয়,

“হামলা হয়েছিল ওদের উপর। ওখান থেকে নিয়ে এসেছি। আর ও ঘুমাচ্ছেনা। অজ্ঞান হয়ে আছে। ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।”

অন্তিকের কথা শুনে সকলে বিচলিত হয়। আয়েশা আমিন ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন,

“কি বলছিস? হামলা হয়েছিল মানে? কিসের হামলা? ও কোথাও ব্যাথা পেয়েছে? অজ্ঞান হয়ে গেলো কেন?”

মি. মাহমুদ সরোয়ার স্ত্রীকে শান্ত হতে বলে ছেলেকে বলেন,

“কিসের হামলা অন্তিক। পরিষ্কার করে বলো? কে হামলা করলো? আর তুমি কিভাবে জানলে?”

“আমি ঠিক জানিনা কারা হামলা করেছে। তবে ওর ভাই সাহিল ফারদিন রাজনীতির মানুষ তাতো জানোই। এমন হামলা হর হামেশা হয়। আমি লোক লাগিয়ে রেখেছিলাম তোমার বউমার আশেপাশে। ওরা জানালো আজ সকাল সকাল নাকি সাহিল বোনকে নিয়ে হস্পিটালে গিয়েছে। ওর কিছু হয়েছে ভেবে আমিও বের হয়ে গিয়েছিলাম। তখনই দেখি এসব মাঝরাস্তায়। ওদের গু লা গু লির মাঝে ওকে নিয়ে এসেছি। ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। চিন্তা করোনা তোমরা।”

অন্তিকের কথা শুনে সবাই চিন্তিত হয়ে পরে। না জানি ওখানে এখন কি হচ্ছে। দিগন্ত সবাইকে রুম খালি করতে বলে। বেশি মানুষের গিজগিজে প্রাণেশার দমবন্ধ লাগবে। কয়েক ঘণ্টা পর আপনা আপনি ওর জ্ঞান ফিরবে।

সবাই বের হয়ে পড়ে তার কথা শুনে। অন্তিকও বের হয়ে যায়। প্রাণেশাকে সেইফলি ওখান থেকে নিয়ে আসলেও এখন কি হচ্ছে না হচ্ছে কিছু জানেনা। যদিও সাহিল ফারদিন মানুষটাকে সে আগে থেকে চেনে। এত সহজে ওর ক্ষতি করা যাবেনা সে জানে। তাই তার চিন্তা না করে আগে নিজের বউকে ওখান থেকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। তবে ওকে নিয়ে আসলেও ওখানের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটু চিন্তা থেকেই যায়।

————————

অন্তিকের ধারণায় ঠিক। হামলাকারীরা বিরোধী দলেরই লোক ছিল। সাহিলসহ তার পরিবারের উপর এমন বিভিন্ন সময় ছোট বড় আক্রমণ হয়। রাজনীতির সুবাধে তার শত্রুর অভাব নেই। তার জন্য এসব তেমন সিরিয়াস কোন ইস্যু না। সে সবসময় আগে পিছে লোক নিয়ে ঘুরে। বাড়ির সবার জন্যও সেইফটির ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু আজ কেন যে সাথে গার্ড নিয়ে যাওয়ার কথা ভুলে গেলো তা সে জানেনা। বোনের চিন্তায় ভুলে বসেছিল যখন তখন হামলা হতে পারে এই বিষয়টা। বিশেষ করে সাহিলের আপন মানুষদের উপর বেশি হামলা হয়। এতদিন সে ছিল একা। বাবার সেইফটি বিশেষভাবে দেওয়া আছে। কিন্তু আসলে বাবাও নয়। বিরোধীদলগুলো তার দূর্বল দিক খুঁজে আঘাত করার অপেক্ষায় ছিল এতদিন। সাহিলের একটা বোন আছে এই বিষয়ে তারা জানতোনা। কাল ঘুরতে বের হওয়ায় প্রাণেশা তাদের চোখে পরে। ওর প্রতি খুব যত্নশীল সাহিল, তাই যে কারো চোখে পড়বে স্বাভাবিক। ওদেরও পড়েছে। তবে তখন প্রপার সেইফটি নিশ্চিত করে বেরিয়েছিল বলে কিছু করতে পারেনি। তাছাড়া প্রাণেশা আসলে কে সে বিষয়েও তারা কিছু জানতোনা। তবে খোঁজ নিয়ে এটা সাহিল ফারদিনের বোন জেনে তারা অবাক হয়েছে। ওর যে কোন ভাই বোন আছে সে বিষয়ে পুরোপুরি অজ্ঞ ছিল তারা। বোনকে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল তাদের থেকে? তার মানে কত আদরের হবে? এটা ভেবে তাদের মূল টার্গেট হয় প্রাণেশা। আজকে সিকিউরিটি ছাড়া একা বোনকে নিয়ে বেরিয়েছে তার খবর পেয়েছে তারা। তাই সুযোগ হাত ছাড়া করেনি। প্রায় পিষেই দিয়েছিল। কিন্তু শেষে কোথা থেকে কে এসে ওকে নিয়ে গেলো তা না সাহিল বুঝতে পেরেছে। আর না বুঝতে পেরেছে হামলাকারীরা। প্রাণেশাকে নিয়ে যাওয়ার পর সাহিলের লোকজন এসে পড়েছিল ঘটনাস্থলে। তাই তাদের বিশেষ ক্ষতি করতে পারেনি। কিন্তু বোনটাকে কে নিয়ে গেলো তা ভেবে অস্থির সাহিল এক মিনিটও সময় নষ্ট করেনি। গাড়ির নাম্বার মুখস্থ করে রেখেছিল। পনেরো মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে থাকতেই জানতে পেরেছে এডভোকেট অন্তিক সরোয়ারের গাড়ি ছিল ওটা। ওর নাম দেখে ভ্রু টানটান হয় তার। অন্তিক সরোয়ার তার বোনকে তুলে নিয়ে গেলো কেন? সাহায্য করলো কি? হবে হয়তো। সামনের গাড়িটাকে ধাক্কা দিয়ে প্রাণেশাকে নিয়ে গিয়েছে। হয়তো এদিকেই ছিল, আর অতর্কিত হামলা দেখে সুযোগ বুঝে সাহায্য করেছে। সাহিল তাই ধরে নেয়। কারণ অন্তিকের সাথে তার কোন ঝামেলা নেয়। বরং তাদের মধ্যে মুটামুটি ভালো সম্পর্ক আছে। সেবার তৃণার কেইসে সেই তো সাহায্য করেছিল অন্তিক সরোয়ারকে। তার বোনকে অন্তিক নিয়ে গিয়েছে শুনে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয় সাহিল। ইতোমধ্যে নিউজ চ্যানেলগুলোতে তার উপর হওয়া হামলার ব্যাপারে খবর ছড়িয়ে পড়েছে। সাংবাদিক, পুলিশরাও এসে পড়েছে। বাড়ি থেকে ক্রমাগত ফোন আসছে দেখে সে রিসিভ করে।

“সাহিল? কোথায় তোমরা? ঠিক আছ? নিউজ চ্যানেলগুলোতে কি দেখাচ্ছে? তোমরা ঠিক আছ তো? তোমার বোন, তোমার বোন ঠিক আছে?” সজল ফারদিন একের পর প্রশ্ন করেই চলেছেন। ছেলে মেয়ে দুটোই ওখানে। চিন্তায় উনার মাথা ফেটে যাচ্ছে।

সাহিলের হাতে কিছুটা লেগেছে গু লা গু লির সময়। তালুতে কেটে গিয়েছে গভীরভাবে। জ্বালা করছে ভীষণ। সে হাতটা অল্প ঝাকিয়ে চোখ মুখ কুচকে বলে,

“প্রাণেশা ঠিক আছে। আমিও ঠিক আছে। চিন্তা করতে হবেনা। কিছুই হয়নি কারো।”

“কি বলছো? নিউজে কি কি দেখাচ্ছে। আমার মেয়েটার কোথাও লেগেছে কি না দেখো। তোমাকে দেখা যাচ্ছে টিভিতে। প্রাণেশাকে দেখাচ্ছেনা কেন? ও কোথায়?”

সাহিলকে তখন সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেছে। তার লোকেরা আঁটকে রাখছে কোনভাবে। তাদেরও একই প্রশ্ন। খবর পেয়েছে গাড়িতে সাহিল ফারদিন, তার বোন আর ড্রাইভার ছিল। ড্রাইভার আর তাকে দেখা গেলেও তার বোনকে দেখা যাচ্ছে না কেন? তাকে কি হামলাকারীরা নিয়ে গেলো? নাকি সেইফলি কোথাও সরিয়ে রেখেছে ক্যামেরা থেকে আড়াল করতে? আর হামলা কে করেছে বলে ধারণা করছে সে। এমন আরও অনেক কিছু। সে ফোনটা মুখের কাছে এনে বাবাকে কোনোভাবে বলে,

“আমি আর বোন দুজনেই ঠিক আছি। বাড়িতে কারো কোন চিন্তা করতে হবেনা। কিছুই হয়নি আমাদের। বুঝেছ? এখন রাখছি।”

এরপর তার লোকেরা সাংবাদিকদের সরিয়ে দেয়। সাহিল পুলিশদের সাথে অল্প কথা বলে গাড়িতে উঠে যায়।

সাহিল পুলিশদের সাথে কথা বলে সাংবাদিকদের উপেক্ষা করে চলে গিয়েছে তা সরোয়ার বাড়ির সবাই দেখেছে টিভিতে। কিন্তু ভাবতে পারেনি তাদের বাড়িতে চলে আসবে সোজা। আগে অন্তত নিজের বাড়ি গিয়ে স্থির হয়ে, তারপর প্রাণেশাকে নিতে আসবে ভেবেছিল। কিন্তু ছেলেটা ঘটনাস্থল থেকে না বাড়ি গেলো। আর না আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হস্পিটালে গেলো। স্পট থেকে বোনের খবর বের করে সোজা তাকে নিতে চলে এসেছে।

মিসেস আয়েশা আমিন ভেবেছিলেন মেয়েটার জ্ঞান ফিরলে একটু কথা বলবেন। মান অভিমান ভাঙিয়ে স্বামীর কাছে ফিরতে, শ্বশুর বাড়ি ফিরতে অনুরোধ করবেন। ছেলেকে যেন আরেকবার সুযোগ দেয় সে অনুরোধ করে ওদের সম্পর্কটা ঠিক করে নিতে বলবেন। তারপর খাইয়ে ধাইয়ে বাড়ির কেউ নিতে আসলে তাদের সাথে পাঠাতেন। কিন্তু কিসের কি! মেয়েটার ভাই চলে এলো আধ ঘণ্টা পার হতে না হতে।

সাহিলকে এত তাড়াতাড়ি এখানে চলে আসতে দেখে প্রত্যেকে অবাক হলেও নিজেদের সামলে তাকে ভেতরে আসতে বলে। উনাদের সাথে প্রাথমিক আলাপ সেরে সাহিল জানায় অন্তিক তার বোনকে নিয়ে এসেছে জেনে ওকে নিতেই এসেছে মূলত। মাহমুদ সরোয়ার মাথা নাড়িয়ে বলেন,

“হ্যাঁ বাবা। তোমার বোন এখন এ বাড়িতেই আছে, উপরে। অন্তিক নিয়ে এসেছে। এখনো জ্ঞান ফেরেনি। তুমি বসো। একটু আলাপ সালাপ করি।”

“হ্যাঁ, আগে একটু বসো। তোমার হাতেও বেশ লেগেছে। আমার নাতি দিগন্ত… সে ডাক্তার। তাকে ডাকছি। একটু চিকিৎসা নাও হাতে। তারপর অল্প একটু নাশ্তা খেয়ে বোনের কাছে যেয়ো। ততোক্ষণে তারও জ্ঞান ফিরুক। তুমিও একটু জিরিয়ে নাও।” দাদি

তাদের আন্তরিকতা দেখে সাহিলের ভেতরে অপরিচিত মানুষদের কাছে প্রাণেশা আছে ভেবে যে অস্থিরতা ছিল, তা কিছুটা দমন হয়। সৌজন্য হেসে সায় জানায়। তার সাথে পিয়াসও আছে।

সে উনাদের সাথে সোফায় গিয়ে বসলে দিগন্ত আসে। কেটে যাওয়া জায়গায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয়। হামলা সম্পর্কে অল্প স্বল্প আলাপে বসে তাদের সাথে। মিসেস আয়েশা আমিন সাহিলকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে। ধরতে গেলে সে আজ প্রথমবার বোনের শ্বশুর বাড়ি এসেছে। আর বিপরীতভাবে, সরোয়ার বাড়িতে বাড়ির একমাত্র বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে প্রথম কেউ এসেছে। আর এই বিষয়টা সাহিল না জানলেও উনারা তো জানেন। তাই তার আপ্যায়নের কোন ত্রুটি রাখেন না মিসেস আয়েশা আমিন।

সাহিল এত টেনশন আর ঝামেলার মধ্যে সেসব বিষয় চোখে পড়ার মতো হলেও তেমন আমলে নেয় না।

সে আলাপ বেশিদূর না টেনে বোনকে দেখতে চায়। কোথাও কোনভাবে লেগেছে কি না চোখে না দেখলে চিন্তা একেবারেই কমছে না। তার উপর বাড়ি থেকেও ফোনের উপর ফোন আসছে। ওর ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আয়েশা আমিন বাড়ির বাকিদের দিকে তাকান। অন্তিক এই মুহূর্তে বাড়িতে নেই। তার চাচা অবশ্য সাহিল আসার পর পরই ফোন করেছিল। কিন্তু সে জানিয়েছে আধ ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। হামলার স্পটে পুলিশ আর নিরাপত্তা কর্মীরা পৌছে গিয়েছে শুনে সে সেদিকে আর যায় নি। নিজের কেইসের কোন একটা দরকারি কাজে আধ ঘণ্টার জন্য বেরিয়েছে। সেও হয়তো ভাবেনি সাহিল এতো তাড়াতাড়ি চলে আসবে বোনকে নিতে। নাহলে বাড়িতেই থাকতো।

সাহিলের বোনকে দেখতে চাওয়ায়, চেয়েও আর না করতে পারেননা উনারা। অন্তিক আসলে তারপর যা কথা বলার বলতে চেয়েছিলেন উনারা। কারণ অন্তিক এখনই সাহিলকে প্রাণেশা আর তার বিষয়ে কিছু জানানোর কথা ভেবেছে কি ভাবেনি। কিংবা অন্য যেকোনো কথা সে কিভাবে, কি এবং কতোটুকু জানাতে চায় সাহিলকে - তার কিছুই জানেন। সব মিলিয়ে অন্তিক থাকলে ভালো হতো, এটাই ভাবছিলেন সবাই। তবে সাহিলের উদ্বিগ্ন চেহারা দেখে আর না করেন না। পিয়াস ছেলেটাকে নিচে বাকিদের সাথে বসিয়ে মিসেস আয়েশা আমিন যান সাহিলকে নিয়ে।

সাহিল রুমে প্রবেশ করে দেখে প্রাণেশা এখনো অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে। এসির ঠাণ্ডায় রুমটা ভীষণ শান্ত আর রিল্যাক্সড আবহাওয়া দিচ্ছে। প্রাণেশা আরামে শুয়ে আছে। সাদা একটা চাদরও গাঁয়ে দেওয়া আছে পেট অব্দি। সে গিয়ে বোনের পাশে বসে হাত পা সব দেখে। কোথাও লাগেনি দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

প্রাণেশা তার গাড়ির সামনে এসে পড়ার আগে তাকে রাস্তায় ঠিক কোথায় কোথায় দেখা গিয়েছে সেসব খোঁজ নিতে বলেছিল পিয়াসকে। কিন্তু ওর গাড়ির সামনে এসে পড়ার আগের আধ ঘণ্টার সিসিটিভি ফুঁটেজ ছাড়া তার আগের কোন তথ্য জানাতে পারে নি এখনো। তাই ওর সাথে ঠিক কি হয়েছিল তা এখনো জেনে উঠতে পারেনি। আর খোঁজ পাওয়া ঐ আধ ঘণ্টার ফুঁটেজে তেমন বিশেষ কিছু পায় নি। শুধু এলোমেলো পায়ে এদিক ওদিক করে হাঁটতে দেখেছে।

চেক আপ করিয়ে সাহিলের মাথা গরম ছিল। গাড়িতে পিয়াস যখন তাকে আবার ফোন দেয়। তখন ওর সাথে কথা বলতেই নেমেছিল সে। এর মধ্যে কতো কি হয়ে গেলো। বোনটা নিজেও কতো ভয়, দ্বিধা আর কষ্টে ছিল তা সে বুঝতে পেরেছে। এর মধ্যে চোখের সামনে এতো গু লা গু লি। এ কদিনে বোনকে সে যথেষ্ট পড়ে নিতে শিখেছে। খুব নরম আর দূর্বল মনের তা সে বুঝতে পারে। তাই হঠাৎ এসব নিতে পারেনি। সাহিল ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে প্রাণেশাকে চোখ নাড়াতে দেখে। জ্ঞান ফিরছে। সেকেন্ড কয়েক সময় লাগিয়ে আস্তে আস্তে চোখ খুলে প্রাণেশা।

সবার আগে মাথায় কারো হাতের ছোঁয়া অনুভব করে তার দিকে তাকায়। সাহিলকে দেখতে পায়। নরম চোখে তাকিয়ে চোখের পলক ফেলতেই হামলার ঘটনা মাথায় আসে। তৎক্ষণাৎ অস্থির চেহারায় ভাইকে দেখে আগাগোড়া। কিছু হয় নি দেখেও ভয়ের আভাস সরেনি চেহারা থেকে। হাতের কনুই বিছানায় ঠেকিয়ে উঠে বসে। অস্থির হয়ে ভাইকে কিছু বলতে যাবে তার আগে সাহিল ওকে শান্ত হতে বলে।

“রিল্যাক্স, কিছু হয়নি বোন। আমি ঠিক আছি, তুইও ঠিক আছিস। উই অল আর সেইফ নাও। ওখান থেকে আমরা সবাই চলে এসেছি। এতো অস্থির হোস না। দুজনেই ঠিক আছি দেখ।”

বলতে বলতে প্রাণেশার মাথাটা বুকে নিয়ে হাত বুলিয়ে দেয়। কারো কিছু হয়নি শুনে অস্থিরতা কমে গেলেও ভয় কমেনা প্রাণেশার। মা মা রা যাওয়ার পর এমন বীভৎস কোন ঘটনা প্রথমবার দেখেছে সে স্বচক্ষে। বারবার ছোটবেলার ঐ দিনটা মাথায় আসছে। কি নিষ্ঠুর ভাবেইনা নিজের মাকে ডুবে যেতে দেখেছিল চোখের সামনে। ডুবন্ত মাকে পানির উপরে হাত তুলে অসহায়ের মতো চটপট করতে দেখা ঐ দৃশ্য চোখে ভেসে আসতেই ভাইয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুফিয়ে উঠে সে। সাহিল ওকে আগলে নেয়। কিছু সময় পর আস্তে আস্তে শান্ত হলে সাহিল ওভাবেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,

“এবার কান্না থামা। বাড়ি যেতে হবে। সবাই অপেক্ষা করছে। দুশ্চিন্তা করছে। আর কাঁদতে হবেনা। আমিতো আছি।”

ভাইয়ের কথা শুনে প্রাণেশা মাথা তুলে তাকায়। তারা বাড়িতে নেই বুঝতে পেরে হসপিটালে আছে ভেবে সামনে তাকাতেই থম মেরে যায়।

মিসেস আয়েশা আমিন এখানেই ছিলেন। দাড়িয়ে দাড়িয়ে প্রাণেশাকে তার আপন কারো বুকে মাথা রেখে কাদঁতে দেখছিলেন। মেয়েটার কেউ নেই বলে তাকে নিয়ে একটু বেশিই দুশ্চিন্তা হতো উনার। বিশেষ করে ছেলের দিক থেকে বার বার হতাশ হয়ে দুশ্চিন্তা বাড়তো। যদিও ছেলের সাথে বিচ্ছেদ হোক তা তিনি কোনভাবেই চান না। কিন্তু অবশেষে ছেলে যদি ওকে জীবন থেকে বেরও করে দিতে চায় সামনে যেকোনো কারণে, তাহলেও উনারা ছাড়া মেয়েটার আর কেউ নেই এটা ভেবে আর দুশ্চিন্তা হবেনা। তিনি মন ভরে দেখে নেন ভাই বোনের দৃশ্যটা।

প্রাণেশা চোখের সামনে অন্তিকের মাকে দেখে স্তব্দ হয়ে যায় । জমে গিয়েছে তার শরীর। মাথা আপাদত কাজ করছেনা। চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে তাকায়। সাথে সাথে নিঃশ্বাস ভারী হয়। এটা অন্তিকের রুম। যেখানে কয়েকটা দিন খুব সুখে কাটিয়েছিল সে। কিছু বুঝতে পারছেনা। সে এখানে কেন? কিভাবে? কে নিয়ে আসলো? ভাইয়াও এখানে……

কি হচ্ছে এসব?

প্রাণেশা ভাইয়ের দিকে তাকায়। বোনকে বুকে রেখে ওকে শান্ত হতে বলে ড্রাইভারকে আরেকটু অপেক্ষা করতে মেসেজ করে পাঠাচ্ছিল সে। বোনের চাহনি দেখে বলে,

“রিল্যাক্স। এখানে আমরা সেইফ আছি। আমাদের বিপদ দেখে তোকে তখন গাড়ি থেকে এবাড়ির ছেলে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিল সেইফলি। এখন তাদের বাড়িতেই আছি। ডোন্ট ও্যরি। একটু পর চলে যাব।”

এবাড়ির ছেলে। মানে কে? দিগন্ত ভাইয়া? নাকি উনি……প্রাণেশা ঢোক গিলে।

মায়ের দিকে তাকায় অসহায় চোখে। সে মায়ের অপরাধী। মানুষটা তাকে খুব ভালোবাসা দিয়েছিল। এ বাড়িতে নতুন নতুন এসে এই মানুষটাই তার একমাত্র ভরসাস্থল ছিল। কিন্তু সে ঐ লোকটার উপর রাগ অভিমান থেকে হুট করে যে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। মায়ের মতো দেখে রাখা এই মানুষটাকে একবারো জানায়নি। তার এই বিষয়টা ভেবে আগে থেকেই অপরাধবোধ হতো। এখন সামনা সামনি দেখে উনার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। সে তো কিছু বলতেও পারেনা, যে ক্ষমা চাইবে। তবে আয়েশা আমিন ওর মনের কথা বুঝে যান চোখ দেখেই। মৃদু হাসেন ছেলে বউয়ের চিন্তাভাবনা বুঝতে পেরে। তবে আগের কোনো কথা তুলেন না সাহিলের সামনে।

“সাহিল, প্রাণেশাকে একটু পানি দাও। মাথা ঠাণ্ডা হোক। অস্থির লাগছে হয়তো।” মিসেস আয়েশা আমিন

সাহিল উনার কথায় বেডসাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে বোনকে পানি খাওয়ায়। তারপর ওকে নিয়ে উঠে চলে যেতে নেবে ওমনি পায়ে হালকা ব্যথা অনুভব করে প্রাণেশা। ব্যথাতুর শব্দ করে উঠতে নিয়েও আবার বসে পরে। এর মধ্যে হঠাৎ ফোনে কথা বলতে বলতে অন্তিক প্রবেশ করে রুমে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার পর দিথী তাকে বলেছিল রুমে ভাবির ভাই আর বড়মা আছে। তবে সে ফোনে মনোযোগ থাকায় দিথীর কথা সেভাবে আমলে নেয় নি। ভেবেছিল প্রাণেশার এখনো জ্ঞান ফেরেনি।

রুমে ঢুকে ফোনে কথা বলতে বলতে প্রাণেশা আর সাহিলের দিকে চোখ যায়। মাকেও দেখতে পায়। তবে অতো দিকে নজর না দিয়ে প্রাণেশাকে বসে থাকতে দেখে ওর দিকেই তাকায়। এক পলক সাহিলের দিকে তাকিয়ে আবার প্রাণেশার দিকে চোখ দেয়। ওর দিকে চেয়েই ফোনের ওপাশে কিছু একটা বলে কল কাটে।

সাহিল অন্তিককে দেখে খুশিই হয়। এসেছে যখন ওর সাথে দেখা হলে ভালো হতো এমনটাই ভাবছিল সে মনে মনে। সৌজন্য হেসে বোনকে রেখে সে উঠে দাড়ায়। হাত মিলিয়ে বলে,

“থ্যাংক্স, মি. সরোয়ার। বিপদের সময় সাহায্য করার জন্য। আপনি হুট করে এসে তখন বড় উপকার করলেন। নাহলে কেউ না কেউ ইনজুরড হতাম নিশ্চিত।”

তখন অন্তিক এসে ঐ গাড়িটাকে ধাক্কা লাগিয়ে না দিলে প্রাণেশাকে হয়তো সে নামিয়ে নিতো গাড়ি থেকে। কিন্তু তাও ধাক্কা লাগলে গাড়িটা ঠিকই তাদের দিকে এসে পড়তো। আর কোন না কোন বিপদ হতোই। অন্তিকের জন্য আজ অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। তাই মন থেকে কৃতজ্ঞ সে।

অন্তিক মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়। সাহিলের পেছনে বিছানায় বসে থাকা ভয়ার্ত প্রাণেশার দিকে চেয়ে সাহিলকে বলে,

“কোন ব্যাপার না, এত কৃতজ্ঞতা জানাতে হবেনা। দায়িত্ব ঠিকঠাক ভাবে আগে পালন না করতে না পারলেও এখন আর মিস যাবেনা। নিশ্চিন্তে থাকুন।”

সাহিল তার কথার মানে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। অন্তিক তার দৃষ্টি দেখে কথা ঘুরিয়ে বলে,

“আপনার তো হাতে লেগেছে দেখছি। আপনার বোনের কোথাও লেগেছে কিনা দেখুন। ওকে টেনে নেওয়ার সময় অল্প একটু লাগলেও লাগতে পারে।“

“হ্যাঁ, পায়ে একটু লেগেছে। তেমন বেশি না। এগেইন থ্যাংক্স টু ইউ। আপনি না আসলে একটু সমস্যায় পড়তে হতো। এখন আমরা উঠি। আপনার সাথে দেখা করে যাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলাম।”

“এখনই কি উঠবেন!! আগে আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নেয়। আপনি বসুন আপনার বোনকে নিয়ে। আরেকটু বসুন, আমিও বসি। দেখি আপনাদের। তারপর একটু জিরিয়ে নাহয় বাড়ি ফিরে যাবেন।”

অন্তিকের কথাই সাহিল হেসে মাথা নাড়ায়।

মিসেস আয়েশা আমিনও সবটা দেখেন। তিনি ভেবেছিলেন অন্তিক এবার ওদের বিষয়ে জানিয়ে দেবে। কিন্তু সে তো কিছুই বললো না। কি করতে চাইছে কি জানি ছেলেটা। বাড়ির বউ যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরবে ততোই ভালো।

তবে দুশ্চিন্তা হলেও তিনি আলাদাভাবে কিছু বলেন না।

প্রাণেশা ভাই আর বরের সব কথা শুনে। লোকটা তার খোঁজ কিভাবে পেয়েছে সে কিছু জানেনা। তার এই মুহূর্তে কি করা উচিত, কি প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত তাও জানেনা। অন্তিককে দেখার পর থেকে কেমন ঝিম ধরে গিয়েছে সে। সেইরাতের সব দৃশ্য মনে পড়ছে একে একে। এই রুমে, এই বিছানাতেই তো নিজের আসল রুপ দেখিয়েছিল অন্তিক।

কিন্তু সেসবও সে ভালোবাসা মনে করে হাসিমুখে গ্রহন করে নিতো। স্বামী যখন, অধিকার তো আছেই। সেটা প্রাণেশা জানে। একদিন না একদিন তো এমন কিছু হতোই। তাই সেকথা বাদ দিলো। কিন্তু সেদিন বিকেলে যে ব্যবহার করেছে, তার জন্য সে লোকটাকে ক্ষমা করবেনা। একদম না।

পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে নিজের দিকে অন্তিকের চাহনি লক্ষ্য করে। সাথে সাথে সে মাথা নামিয়ে নেয়। প্রাণেশা জানে সে কোন দোষ করেনি। তাও ভয় করছে কেন জানি। শরীর ঘামছে এসির এই নিম্ন তাপমাত্রাতেও। অন্তিকের ঐ ধারালো দৃষ্টি তাকে স্বস্তি দিচ্ছেনা। প্রাণেশা কাস্মিককালেও ভাবেনি এভাবে দেখা হয়ে যাবে অন্তিকের সাথে। এত নিরুপায় ভাবে, যে পালিয়েও যেতে পারবেনা, আবার কিছু বলতেও পারবে না।

তার মাথায় হঠাৎ একটা প্রশ্ন আসে। অন্তিক তার ভাইকে কি বলে দেবে যে তাদের বিয়ে হয়েছিল? ভাই যদি তাকে এবাড়িতে রেখে চলে যায়? তারপর অন্তিক যদি আবার ও কার সাথে চলে গিয়েছিল, কার সাথে পালিয়ে গিয়েছিল এমন সব প্রশ্ন করে, ওকে সন্ধেহ করে? আবার যদি ওকে অপমান করে? তাহলে প্রাণেশা সেটা মোটেও নিতে পারবেনা। লোকটা যদি আবার তার চরিত্রে আঙ্গুল তুলে তাহলে সে আরও দূরে কোথাও চলে যাবে। বাবার বাড়িতেও যাবেনা। ভাবতে ভাবতে মুখ অন্ধকার হয়ে আসে তার।

অন্তিক প্রাণেশার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি এবং প্রতিক্রিয়া ভালোভাবে পরখ করেছে। মনে মনে কি ভাবছে মেয়েটা তাও সে কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। একটু আফসোস হলেও বেশি পাত্তা দেয় না। ওর ভুল ধারণা সে খুব তাড়াতাড়ি ভাঙিয়ে দেবে। তবে হঠাৎ কিছু ভেবে ওকে আগাগোড়া দেখে নেয়। দেখতে দেখতে হালকা হাসির রেখার দেখা মেলে ঠোঁটের কিনারায়। কাবার্ড থেকে ট্রাউজার আর টি শার্ট বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।

অন্তিককে এই রুমের কাবার্ড থেকে ড্রেস বের করে ওয়াশরুমে যেতে দেখে সাহিলের চেহারা গম্ভীর হয়। বুঝতে পারে এটা অন্তিকেরই রুম। একটা অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের রুমে এনে এনারা তার অচেতন বোনকে রেখে দিয়েছে। ব্যাপারটা তার পছন্দ হয়নি। এত বড় বাড়িতে কি তার বোনকে রাখার জন্য আর কোনো রুম ছিল না? তার জানা মতে এবাড়িতে তিনটা মেয়ে আছে। তাদের কারো রুমে রাখা যেতোনা প্রাণেশাকে?

মনে মনে বিষয়টা অপছন্দ হলেও মুখে কিছু বলেনা। কারণ দেখতে গেলে এই অন্তিক সরোয়ারের কারণেই তারা দুই ভাই বোন অক্ষত অবস্থায় এখানে দাড়িয়ে আছে। কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে কিছুটা অসন্তুষ্ট হলেও তা প্রকাশ করেনা।

কিন্তু আয়েশা আমিন ওর চেহারা দেখে মনের কথাটা বুঝে যান। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ছেলে কি করতে চাইছে না চাইছে কিছু বুঝতে পারছেন না। বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিয়ের ব্যাপারটা জানিয়ে দিলে ভালো হতো। সাহিলের মনে তাদের নিয়ে অল্প হলেও যে বিরুপ চিন্তা এসেছে, তা আসতো না। সাহিলকে সব বুঝিয়ে বললে নিশ্চয় বুঝতো। তাও বললো না ছেলেটা।

প্রাণেশার যেহেতু পায়ে একটু লেগেছে তাই সাহিল ওকে ধরে সাবধানে নিয়ে যায়। অন্তিক ওকে টেনে নিজের গাড়িতে নেওয়ার সময়ই লেগেছে কিছুটা।

নিচে সবাই আছে। প্রাণেশার বাড়ির বাকি সদস্যদের সাথেও দেখা হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। সবাই ওকে দেখে একেবারেই অচেনা আচরণ না করলেও। আগের কথা তেমন তুলেনা। প্রাণেশা সবাইকে আগের কথা না তুলতে দেখে অবাক হলেও মনে মনে স্বস্তি পায়। তাকে এই মুহূর্তে কোন জটিল পরিস্থিতিতে পরতে হচ্ছেনা এর চেয়ে স্বস্তির আর কি হতে পারে?

সাহিলের সাথে পরিবারের বাকি সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নানান কথাবার্তা হয়। শুরু থেকে প্রাণেশা অবশ্য তার ভাইয়ের পাশেই বসে আছে। তাকে অনেক কিছু খেতে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সকালেই বমি করে সব ভাসিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে এত কিছু ঘটে গেলো। সব মিলিয়ে তার কিছু মুখে তুলতে ইচ্ছে করছিল না। ওর অবস্থা বুঝতে পেরে উনারা তেমন জোর করেন না। এরপর থেকেই সে কাচুমুচু হয়ে ভাইয়ের পাশে বসে আছে। অন্তিকের দৃষ্টি এত কিছুর মধ্যেও তার উপর নিবদ্ধ তা সে অনুভব করতে পারছে।

একারণে তার ভীষণ ভয় করছে। ভাই পাশে আছে তার। তাও ভয় একটুও কমছেনা। এখন ভাই পাশে আছে দেখে অন্তিক চুপ থাকলেও কেন জানি মনে হচ্ছে একা পেলেই কিছু একটা করবে। যা তার জন্য মোটেও ভালো হবেনা। এত এত মানুষের মধ্যেও অন্তিকের দৃষ্টিতে তার ভয় করছে, অস্বস্তি হচ্ছে। একা যদি তাকে পেয়ে বসে, তখন কি হবে তার?

মনে মনে নানান কিছু ভেবে প্রাণেশা কোণা চোখে একবার অন্তিকের দিকে তাকায়। সাহিলের কোন একটা কথার জবাব দিচ্ছে সে। কিন্তু তার দিকে তাকাতেই প্রাণেশার অন্তরাত্মা কেপে উঠে। প্রাণেশা ভেবেছিল কারো কথার জবাব দিচ্ছে যখন নিশ্চয় তার দিকে আর ধ্যান থাকবেনা। কিন্তু লোকটার ধারালো দৃষ্টি তার দিকে। না না। ধারালো না। নেশালো দৃষ্টি মনে হচ্ছে। পরিবারের সবার সামনে অন্তিক নেশা করে আসলো? কতো অধঃপতন হয়েছে লোকটার। ঢোক গিলে আবার তাকাতেই দেখে এখনো তার দিকে তাকিয়ে হু হাঁ উত্তর দিচ্ছে। এবার অন্তিকের ঐ দৃষ্টিতে কিছু একটা ছিল। হুট করে সেই রাতের দৃশ্য চোখে ভাসছে। লজ্জ্বার আভা ফুঁটে উঠে তার চেহারায়। চোখ নামিয়ে নেয়। অন্তিক তা দেখে ঠোঁট বাকিয়ে মৃদু হাসে।

মৌনপ্রেম পর্ব ৩৬ গল্পের ছবি