মৌনপ্রেম

পর্ব - ৩৫

🟢

প্রাণেশা বাবা বাড়ি চলে এসেছে তিন/চারদিন হলো। পেছনে ফেলে আসা আপনজনদের জন্য মন আনচান করার বিষয়টুকু ছাড়া, বাকি ভালোই কাটছে দিনগুলো। এবাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ তাকে স্নেহ করে। কিন্তু সেসব তার ভালো লাগেনা। উপরি উপরি লাগে, বিরক্ত লাগে। বিশেষ করে যখন তার বাবা তাকে কথায় কথায় ‘আম্মু’ বলে ডাকে, আর দাদি যখন ‘দাদুমণি’ বলে ডাকে। বিরক্ত লাগে তখন তার। বড় বাবা তো তাকে ছাড়া খাবার খায় না। উনি খাবার খাওয়ার সময় প্রাণেশার ক্ষুধা না লাগলেও সামনে বসে থাকতে হবে। সারাটা সময় খাবার খেতে খেতে প্রাণেশার সাথে গল্প করবে। কিন্তু সে তো কিছু বলতে পারেনা। শুধু শুনে। প্রথম দিন সংকোচ লাগলেও, কিংবা মনে মনে বিরক্ত হলেও, আস্তে আস্তে সহজ হয়েছে সে। বড় মা, তার দুই ছেলে, ফুফি – সবাই তাকে স্নেহ করে।

প্রাণেশা কখনো এতটা ভালোবাসা পায় নি। সরোয়ার বাড়ির সবাই তাকে স্নেহ করলেও, সেটা শ্বশুর বাড়ি ছিল। তাই এখানে সবাই যতটা তাকে ভালোবাসা দেখাচ্ছে, তেমনটা সেখানে হত না। এমন না যে ওকে দেখতে পারত না তারা। কিন্তু এখানের বিষয়টা ভিন্ন। বড় বাবার ছেলে দুটো বাইরে কোথাও গেলে আসার সময় ওর জন্য চকলেট, আইস্ক্রিম কিছু না কিছু নিয়ে আসে প্রত্যেকবার। নিজের ভাইয়ের কথা আর কি বলবে। সে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বোনের খোঁজ নিচ্ছে। কি করছে, কি খেয়েছে - সব। এখনতো বোনের সাথে কথা বলার জন্য সাইন ল্যাঙ্গুয়েজও শিখছে।

সারা জীবনে যা পায়নি মনে হয় সব শোধ করে দিচ্ছে তারা। কিন্তু চাইলেই সব শোধ হবে? ওর তো মাঝে মাঝে এসব ভালোবাসা বি ষের মতো লাগছে। ওর মা যে বাড়ি থেকে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। সে বাড়িতে রাজকন্যার হালে থাকছে সে। এ কথাটা মনে পড়তেই ওর ইচ্ছে করছে সব কিছু ছেড়েছুড়ে আবার কোথাও চলে যেতে। কিন্তু যাওয়ার আর কোন জায়গা নেই তার। থাকলেও ভাইকে কি জবাব দিয়ে যাবে সে?

“আসবো?” প্রাণেশা মেয়েলি কণ্ঠে ফিরে তাকায়। ওর ফুফির মেয়ে ডাকছে। সে যেহেতু উত্তর দিতে পারবে না। তাই ঘাড় বাকিয়ে ব্যাল্কনি দরজা থেকে রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে ওকে ভেতরে আসতে বলে চোখের ইশারায়।

সে এসে প্রাণেশার হাত ধরে বলে, “তোমাকে ডাকছে ছোট মামা। কি কি জানি এনেছে। দেখবে এসো।”

কথাটা বলে নিজের সাথে নিয়ে যায় প্রাণেশাকে। বসার ঘরে সোফায় বসেছে তার বাবা। সামনে টেবিলে বড় একটা বক্স দেখা যাচ্ছে। বড় কিছু বা অনেক কিছু পার্সেল করে নিয়ে এসেছে হয়তো।

“এসেছ আম্মু? নাও। অনেক কিছু কিনে এনেছি তোমার জন্য। এগুলো সব দেখে, নিজের ইচ্ছে মতো সাজিয়ে নাও রুমটা ঠিক আছে? তুমি নাকি রং তুলি দিয়ে কিসব আঁকো শুনলাম, সেসবও নিয়ে এসেছি। দেখো তো পছন্দ হয় কি না।”

প্রাণেশাকে দেখে বক্সটা দেখিয়ে খোশমেজাজে বলেন সজল ফারদিন। পরপর ভাগ্নিকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

“নাজিয়া যা তো, একটা কা চি বা ছু রি নিয়ে আয়। খুলে দেখায় আমার মেয়েকে। পছন্দ না হলে রেখে দেবে কেমন? আমি আবার বদলে আনবো সব।”

নাজিয়া ছু রি নিয়ে এসে বক্সটা খুলতে শুরু করলে প্রাণেশার দাদি বলে,

“আস্তে আস্তে খোল নাজু। ভেতরে কিছুতে লেগে আবার জিনিসগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।”

“আরেহ এরকম কতো বক্স আনপ্যাক করেছি নানী, কিছু হবেনা।”

“বলছিলাম নাজিয়ার পাশের রুমটা খালি করে ওর সব রং তুলি ওখানে রাখলে হয়না? ঐ রুমে আঁকা আঁকি করবে আরকি। ওর সুবিধা হবে সব রং তুলি সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে। তাছাড়া ঐ রুমে বাইরের আলো-বাতাস প্রবেশ করে বেশি। ওর ঐ রুমে বসে আকঁতে ভালো লাগবে।” বড় মা

“হ্যাঁ, আমিও ভেবে দেখেছি। কিন্তু সাহিলকে তো বলতে শুনলাম প্রাণেশার পাশের স্টাডি রুমটা খালি করিয়ে সেখানে এসবের ব্যবস্থা করে দেবে। আর ওর রুমের সাথে ভেতর থেকে এটাচ করিয়ে দেবে।” বাবা

“আচ্ছা সেও ভালো।”

প্রাণেশার কিসে সুবিধা হবে না হবে সব ভেবে নিজেরা কত কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেসব দেখে সে নিঃশব্দে। তারপর প্রাণেশার বাবা ওকে নিজের পাশে বসিয়ে সব দেখায়। তার মাথায় হাত রেখে স্নেহ নিয়ে সব পছন্দ হয়েছে কিনা জানতে চাইলে সে আস্তে করে নিজের মাথা থেকে ঐ হাত সরিয়ে নেয়। তারপর একটু চোখ বুলিয়ে মুখে কৃত্রিম হাসি টেনে বোঝায় পছন্দ হয়েছে।

ব্যাপারটা সে অল্পসময়ে এবং নীরবে করলেও সবার নজরে পরে। ওরা সবাই যতোটা না আগ্রহ আর উচ্ছাস নিয়ে সব কিছু বিশ্লেষণ করছিল। প্রাণেশা ঠিক ততটাই অনাগ্রহে ব্যাপারটা ক্লোজ করে দেয়।

সবাই কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে গেলেও পরক্ষণে নিজেদের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে উঠে। কিন্তু সজল ফারদিন মেয়ের দিকে তাকান। বারে বারে মেয়েটা তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। সে শুরু থেকে। উনার খুব ইচ্ছে করে মেয়েকে একটু বুকে নিয়ে বসে থাকতে। আলিজার শেষ চিহ্নকে বুকে আগলে রাখতে। অথচ তিনি যতটা না আগলে রাখতে চান, মেয়েটা ঠিক ততটাই দূরে সরে যেতে চাই। ছেলেটাও উনার সাথে তেমন একটা কথা বলেনা কোন কালেই। যেদিন থেকে আলিজা চলে গিয়েছে, সেদিন থেকে উনার জীবনটা এভাবেই চলছে।

——————

সজল ফারদিনের প্রথম বিয়ে হয়েছিল উনার খালাতো বোনের সাথে, অল্প বয়সে।

সাহিলের মা সুজানা, সজল ফারদিনের দুই বছরের ছোট ছিলেন। সুজানাদের পারিবারিক অবস্থা আর আর্থিক অবস্থা তেমন একটা ভালো ছিল না। বাবার দ্বিতীয় পক্ষের সংসার ছিল। তাই বাড়িতে ঝামেলা লেগেই থাকত নানান কিছু নিয়ে। এদিকে তার মা অসুস্থ। একমাত্র মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে বড় কিছু বানাতে চেয়েছিলেন। সুজানারও তেমনটাই ইচ্ছে ছিল। বিয়ের প্রতি কোনরকম আগ্রহ ছিলনা তার। বিশেষ করে নিজের বাবা মায়ের বৈবাহিক অবস্থা দেখার পর আর নিজের পারিবারিক অবস্থা দেখার পর তো একদমই না।

ক্যান্সার রোগী মা খুব তাড়াতাড়ি দুনিয়া ছাড়েন। কিন্তু তার আগে বোন, অর্থাৎ সজল ফারদিনের মায়ের কাছে নিজের মেয়েকে তার ছেলে বউ করে নিয়ে যাওয়ার আবদার করেন। মৃ ত্যুযাত্রী বোনের কথা তিনি অমান্য করতে পারেননি। বড় ছেলে যেহেতু বিবাহিত, তাই তিনি বোনের মৃ ত্যুর পরদিনই নিজের ছোট ছেলের বউ করে ঘরে তুলেন সুজানাকে। অথচ সুজানা মায়ের মৃত্যুর শোকে কাতর থাকায় তেমন কিছু না বুঝে বিয়ে করে নিলেও, পরে আস্তে আস্তে বিয়ে থেকে বের হয়ে আসতে চায়। ঘর, সংসার করার ইচ্ছে তার নেই। নিজের মতো থাকবে সে। নিজের যোগ্যতায় কিছু করে একলা কাটিয়ে দেবে সারাজীবন। কিন্তু এসব ঘর, সংসারে উনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। কিন্তু এরমধ্যে তিনি নিজের গর্বে অন্য কারো অস্তিত্ব বুঝতে পারেন। স্বামীকে জানালে তিনি ভীষণ খুশি হন। কিন্তু তা বেশিক্ষণ টেকেনা।

কারণ সুজানা শর্ত দিয়েছে, হয় বাচ্চা হওয়ার পর তাকে ডিভোর্স দেবে, নাহয় এই বাচ্চা সে জন্ম দেবেনা। সজল ফারদিনের স্ত্রীর সিদ্ধান্তে নানান প্রশ্ন থাকলেও কিংবা কষ্ট পেলেও — তিনি তা মেনে নেন। সুজানার প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি জন্মাবে তার আগেই জীবন থেকে বেরিয়ে যায়, ছেলেকে জন্ম দিয়ে। এভাবে ছেলেকে নিয়ে এগারোটা বছর কাটিয়ে দেন।

আলিজা আহমেদের সঙ্গে যখন উনার বিয়ে হয় তখন বয়স ৩৫ বছর।

ব্যাবসার কাজে রাঙ্গামাটি গিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝরাস্তায় গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলে আঁটকে পড়েন একা। এদিকে আলিজা আহমেদ তখন নতুন নতুন কলেজ শেষ করে ট্যুরে গিয়েছিলেন বন্ধুদের সাথে। মাঝরাস্তায় গাড়ি থামালে সবাই নামে গাঁয়ে হাওয়া লাগাতে কিংবা নানান প্রয়োজনে। কিন্তু গাড়ি ছেড়ে দিলে কোনভাবে উনার বাস মিস হয়ে যায়।

এভাবে সজল ফারদিনের সাথে দেখা হয়। আলিজা আহমেদ উনার কাছে সাহায্য চাইলে বুঝতে পারেন তিনি নিজেও আটকা পড়েছেন। কোন একটা ব্যবস্থা না হওয়া অব্দি একসাথে থাকেন। কিন্তু খাবার-পানির সাহায্যের জন্য গ্রামের কিছুটা ভেতরে গেলে উগ্র গ্রামবাসীদের কবলে পড়েন। হয়তো উনারা যে দিকটাই গিয়েছিলেন সেদিকের মানুষজন তেমন সুবিধার ছিল না। আলিজা আহমেদের দিকে কিছু মানুষের নজর খারাপ ছিল। তা বুঝতে পেরে সজল ফারদিন ফিরে আসতে চান। কিন্তু কিছু সংখ্যক গ্রামবাসী তাদের আঁটকে নেন। একা একটা ছেলের সাথে ভ্রমণে এসেছে যে মেয়ে, তাকে নিজেদের কাছে রেখে দিলে কোন সমস্যা হবেনা, এসব বলে কটাক্ষ করে উনাকে রেখে দিতে চান। সজল ফারদিন তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে আলিজা আহমেদকে নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় দেন, তিনি নিজের স্ত্রীকে কিছুতেই তাদের হাতে তুলে দেবেন না জানান।

এতে গ্রামবাসী তারা মিথ্যে বলছে বলে ক্ষেপে যায়। প্রমাণ দিতে বলে, প্রমাণ দিতে না পারলে আবার বিয়ে করতে হবে বলে বিচ্ছিরি হাসে। যেন তারা উনাদের এভাবে হেনস্থা করতে পেরে খুব খুশি।

এভাবে নানান জুট ঝামেলায় উনাদের বিয়ে হয়ে যায়। তারপর অনেক কষ্টে সহি সলামত বাড়ি ফিরলেও আলিজা আহমেদের জন্য পরবর্তী জীবন কঠিন হয়ে উঠে। বাড়িতে এসব জেনে উনাকে ভুল বুঝে। পাড়া প্রতিবেশি সবাই মেয়ে প্রেমিক নিয়ে ঘুরতে গিয়ে বিয়ে করে এসেছে। তাও বিপত্নীক, সাথে এক বাচ্চার বাবা। নাকি অবৈধ সম্পর্ক ছিল কে জানে; এমন ধরণের কথাবার্তা বলে উনার পরিবারের মনেও নানান বিরুপ মনোভাব ঢুকিয়ে দেয়। উনার বাবা মা এত অপমান মেনে নিতে না পেরে আলিজা আহমেদকে স্বামীর সাথে চলে যেতে বলেন। আর যোগাযোগ করতে মানা করে দেন।

সজল ফারদিন সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি গেলে প্রথম প্রথম নিজের সাথে আলিজা আহমেদকে মানিয়ে নিতে ভীষণ কষ্ট হয়। আলিজা আহমেদ বিপত্নীক এবং সন্তানসহ এক পুরুষকে সহজে মেনে নেন নি। তবে সাহিলের সাথে ভাব হতে বেশি সময় লাগে না। দুজনেরই একাকিত্মের কারণে অল্পসময়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। বাচ্চাটা উনাকে মামণি বলে ডাকতে শুরু করে। সেভাবে কিছুদিন ঠিক ঠাক যায়। ততদিনে সজল ফারদিন আলিজা আহমেদের প্রেমে মত্ত। স্ত্রীর নানান ছোট ছোট বিষয়গুলো খেয়াল করা, যত্ন নেওয়া, সুবিধা অসুবিধা দেখা - সব মিলিয়ে বিভিন্নভাবে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। আস্তে আস্তে আলিজা আহমেদের মনেও উনার জন্য অনুভূতির সৃষ্টি হয়।

এদিকে উনার একমাত্র বোন সোহেলির ভাইয়ের নতুন বউয়ের সাথে তেমন একটা যায়না। সোহেলি নিজেও তখন স্বামীহারা হয়ে বাচ্চা মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি থাকছেন।

নতুন বউ নিয়ে মাতামাতি, এত যত্ন আত্তি, লোকেদের বউ দেখতে এসে তার ভাগ্য নিয়ে হা হুতাশ - এসব নিতে পারতেন না। অবচেতন মনে হিংসা করতেন।

নানা ভাবে বাড়ির সবার সামনে ভাই বউয়ের ছোট ছোট ভুল ধরে অপমান করতে শুরু করেন। ইচ্ছাকৃত সমস্যা সৃষ্টি করে আলিজা আহমেদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া, উনার দোষত্রুটি বের করে সবার সামনে খারাপ প্রমাণ করা - এমন আরও নানান কিছু।

এভাবে একদিন সাহিল অসুস্থ থাকলে, আলিজা আহমেদ তাকে জোর জবরদস্তি পড়াতে বসিয়ে, পড়া না পারলে মারছে; এমনটা বলে বাড়ির প্রত্যেকের সামনে সিনক্রিয়েট করেন। হিংসা থেকে তখন এর পরিণতি কি হতে পারে, সেটা হয়তো ভাবতেও পারেন নি।

নিজের নানান ছোট ছোট দোষত্রুটি সবার সামনে বিশেষভাবে তুলে ধরায়, মাঝে মাঝে আলিজা আহমেদ নিজেও রেগে যেতেন। ফলে খারাপ ব্যাবহার করে ফেলতেন ননদের সাথে। যদিও সোহেলি নিজেও কম নয়। কিন্তু যতোই তাদের মেয়ের দোষ থাকুক, বাড়ির মেয়ের সাথে আলিজা আহমেদের উচু গলায় কথা বলাটা বাকিরা মেনে নিতে পারতেন না। এভাবে আলিজা আহমেদের প্রতি উনাদের মনে এমনিতেও বিতৃষ্ণা ছিল। ফলে সেদিন একটু বড় ধরণের ঝামেলার সৃষ্টি হয়। বাড়ি ফিরে মা, বোনের কথায় সজল ফারদিনও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। উনাদের কথায় এসে স্ত্রীর সাথে রাগারাগী করেন। এ বাড়িতে থাকতে হলে উনার মা, বোনের সাথে মিলে থাকতে হবে এমন সব কথা বলে আলিজা আহমেদকে হুশিয়ার করেন।

আলিজা আহমেদের স্বামী নিজের মা, বোনের কথায় এসে উনাকে ভুল বুঝলেন। কিছু যাচাই না করে উনাকে দোষীসাব্যস্ত করে সবার সামনে অপমান করে দিলেন। অথচ আলিজা আহমেদ সাহিলকে জ্বর নিয়ে পড়ার জন্য কোন জোর জবরদস্তি করেন নি। বিছানায় তখন খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন। ছেলে খাবার খেতে চাচ্ছেনা বলে একটু ঝাড়ি দিয়েছিলেন শুধু। পাশে সাহিলের খুলে রাখা কিছু বইও ছিল। পেছন থেকে সোহেলি বই সামনে রেখে ঝাড়ি দিচ্ছে দেখে, ভুল বুঝে রুমের ভেতর ভাবি সাহিলকে জ্বর নিয়ে পড়ার জন্য চাপ দিচ্ছে, মারছে - এসব বলে সবাইকে বিচার দেন।

সজল ফারদিন কোন কিছু বিবেচনা না করে বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে এত গুলো কথা শুনিয়ে অপমান করে দিলেন। এসব নিতে পারেননি আলিজা আহমেদ। তার উপর তখন নতুন নতুন প্রেগ্ন্যান্সি শুরু উনার। যদিও তা তিনি নিজেও বুঝতে পারেন নি তখন। কিন্তু প্রেগ্ন্যান্সি শুরুর ঐ সময়টাতে তিনি নিজেও অল্পতে রেগে যেতেন। সেদিনও মেনে নিতে পারেননি স্বামীর ঐ আচরণ। ‘আপনার মা বোনের সাথে মিলে থাকতে না পারলে এ বাড়িতে যদি থাকা না যায়, তাহলে আমি থাকব না’ বলে এক কাপড়ে চলে আসেন ঐ বাড়ি থেকে। মাঝরাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়লে এক মহিলা হস্পিটালে নিয়ে যান। জানতে পারেন তিনি গর্ভবতী। তবে এর পরও আর ফিরে যান নি স্বামীর কাছে, বাবা মায়ের কাছে ফিরে যান। এভাবেই বিচ্ছেদ ঘটে প্রাণেশার বাবা-মায়ের।

——————

প্রাণেশা নেই আজ চারদিন। অন্তিক এ চারদিন শহরে ছিল না। ইরফানও ছিল না। তারা দুজন শহরের বাইরে গিয়েছিল প্রাণেশার খোঁজে। নিজেদের শহরে তো লোক লাগানো ছিলই। প্রাণেশাকে কোথাও দেখা গেলে সাথে সাথে খবর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে। শহরের বাইরেও তন্ন তন্ন করে খুজে, ওকে না পেয়ে দুজন ফিরে এসেছে।

ইরফান কি বলে বন্ধুকে সান্ত্বনা দেবে জানেনা। কোথাও তো বাদ রাখেনি খুঁজতে। মেয়েটা কোথায় গেলো কি জানি। সেদিন প্রাণেশা চলে যাওয়ার কারণ শুনে রাগ হলেও এখন তার বন্ধুর জন্য মায়া হচ্ছে।

প্রাণেশার সাথে জবর দ স্তি ফিজিক্যাল হয়েছে জানার পর তার ইচ্ছে করছিল অন্তিককে ঘু ষি মেরে নাক ফা টিয়ে দিতে। কিন্তু সেটা না করলেও খুব বিচ্ছিরি একটা গা লি ছুড়েছিল সে অন্তিকের উদ্দেশ্যে। ওর সে গা লি শুনে অন্তিক নিজেই ঘু ষি দেয় ইরফানকে।

“বউ হয় ও আমার। ফিজিক্যাল হওয়ার মতো সম্পর্ক আছে বলেই হয়েছি। তোর মতো বিয়ে না করে ন্যু ড দেখিনি। আর না ভিডিও করে সেসব ভাইরাল করার হুম কি দিয়েছি। তাই অজায়গায় নিজের অপ্রয়োজনীয় মতামত দিবিনা।” ঘুষি দিয়ে প্রচণ্ড রাগ নিয়ে অন্তিক কথাগুলো বলে।

“শ্লা… ভাই ডাকে ও আমাকে। মতামত তো অবশ্যই দেব।” ইরফানও প্রতিউত্তর করে, সাথে আরও নানান যুক্তি দেয় নিজের পক্ষে। এভাবে এক চোট হা তা হা তি, তর্কাতর্কি হয়ে যায় দুবন্ধুর মধ্যে।

ইরফানের মতে, প্রাণেশা এখনো বাচ্চা মেয়ে। কোন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নয় যে, পার্টনারের চাহিদা বুঝে যখন তখন ইন্টিমেসির জন্য প্রস্তুত থাকবে। ওর বয়সী মেয়েরা বেশি আবেগপ্রবণ হয়। আদর দিয়ে কথা বলে, ভালোবেসে কাছে টানতে হয়। জোরজবরদস্তি করলে ইন্টিমেসির পুরো সময়টা ওদের কাছে রোমান্স কম, ট্রমা বেশি মনে হবে। বয়সটাই এমন। তার উপর আগে থেকে রাগা-রাগী, মনোমালিন্য ছিল। সেখানে সঙ্গিনীর মান-অভিমান না ভাঙিয়ে রাত হতেই সোজা জবরদস্তি বিছানায়……

ইরফান অন্তিকের উপর ভীষণ বিরক্ত ছিল, ওর মতো একটা প্রাপ্তবয়স্ক আর ম্যাচ্যুর ছেলে কিনা বউয়ের মন বুঝে তাকে কাছে টানতে পারলোনা। উল্টো লাইফটাইম একটা ট্রমা দিয়ে ভাগিয়ে দিলো। অবশ্য সব দোষ অন্তিককেও দেওয়া যায়না। স্বামী স্ত্রীর এইজ গ্যাপ এত বেশি হলে এসব নিয়ে সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

একজন অষ্টাদশী, তো অন্যজন ত্রিশ পার করা প্রাপ্তবয়স্ক। দুই বয়সের মানব মানবীর মেন্টালিটিও দুই ধরণের, চাহিদাও দুই ধরণের। একজনের কাছে আবেগের মূল্য বেশি, তো অন্যজনের কাছে শারীরিক আর মানসিক তৃপ্তির মূল্য বেশি। সমস্যা তো হবেই।

ইরফান আর অন্তিকের দ্বন্ধ তখন তোশা থামিয়ে দিলেও, সে নিজে আরও বেশি রেগে গিয়েছিল। সব পুরুষ মানুষ এক। অন্তত এই ঘটনার পর তাই মনে হয়েছে তোশার। এই ইরফান যে কি পরিমাণ ন ষ্ট আর নোং রা মানসিকতার, তার সাক্ষী তো সে নিজে। আজ অন্তিকেরও একই রুপ বেরিয়ে আসলো। ‘অন্তিক, ইরফান দুটোকেই একই নৌকার মাঝি’ বলে সে নিজেও দুজনের উদ্দেশ্যে কিছু গা লি ছুড়ে চলে যায়। কোন অশুভ শক্তির খপ্পরে পড়ে যে, সে এমন নিম্ন প্রজাতির দুটো মানবের সাথে বন্ধুত্ব করেছিল ভেবে তার আফসোস হয়।

——————————

দেখতে দেখতে প্রাণেশা চলে যাওয়ার আটারোটা দিন কেটে গিয়েছে। এ আটারো দিনে সরোয়ার বাড়িতে কিছুই পরিবর্তন ঘটেনি। আবার অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে। কারণ প্রাণেশাকে খোঁজা বিদ্যমান, সাথে বাড়ির মানুষের মনের অবস্থার পরিবর্তন না হলেও, বিশেষ একজনের স্বভাবের খুব পরিবর্তন ঘটেছে।

অন্তিক শুরুর দিকে শান্ত মেজাজে প্রাণেশাকে খুজতো। এখনও নিজেকে শান্ত রাখতে চায় হয়তো। কিন্তু পারেনা। হুটহাট সামান্য কারণে রেগে যায়। উগ্র আচরণ করে। বাড়িতে তেমন একটা আসেনা। আসলেও নিজের মতো থেকে আবার চলে যায়।

অন্তিক ছোট থেকে কম মিশুক হলেও নিজে বেশ গুছানো স্বভাবের ছিল। এখন কেমন এলোমেলো হয়ে থাকে। কোন সময় কাজ করে, কোন সময় শরীরচর্চা করে, আবার কোন সময় খাওয়া দাওয়া করে কোন কিছুর ঠিক নেই। হুটহাট অসময়ে কাজের জন্য বেরিয়ে পড়ে। আবার অসময়ে রাত বিরেতে কখনো জিম ঘরে দেখা যায়, তো কখনো নিজের ব্যাল্কনিতে দেখা যায় পুশ আপ করতে। এভাবে ছন্নছাড়াই কাটিয়েছে আটারোটা দিন। বাড়ির সকলে এভাবে প্রাণেশাকে নিয়ে চিন্তিত। মেয়েটা কথাবার্তা বলতে পারেনা। না জানি কোথায় আছে, কোন হালে আছে। অন্তিকের প্রাণেশা চলে যাওয়ার পর এমন পরিবর্তন দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে ছেলেটা কি পরিমাণ মানসিক অশান্তিতে আছে। আয়েশা আমিনও বুঝতে পারেন ছেলের মানসিক অবস্থা। দিন রাত শুধু প্রার্থনা করেন মেয়েটার খোঁজ পাওয়ার। সহি সলামত ঘরে ফেরার।

কাল রাতে অন্তিক বাড়ি ফেরেনি। নিজের ফ্ল্যাটে ছিল। তার হাতে নতুন কেইস এসেছে। খু নের কেইস। সে নীলয়কে নিয়ে থানা থেকে নিজের ক্লায়েন্টকে জামিনে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে মাত্র। ক্লায়েন্টের সাথে দরকারি কিছু আলাপ সেরে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছে। এখন একটা নিরিবিলি জায়গায় দাড়িয়ে আছে। কারো অপেক্ষা করছে। নীলয় জানেনা তারা এখানে কি কারণে, আর কার জন্যই বা অপেক্ষা করছে। স্যারকে জিজ্ঞেস করতে মন চাইলেও নিজেকে দমিয়ে রেখেছে। কারণ এ কদিনে কারণে অকারণে স্যারকে রেগে যেতে দেখেছে সে। এখন কি কারণে দাড়িয়ে আছে সে প্রশ্ন করলেও স্যারের রাগের তোপে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তাই সে চুপচাপই আছে।

মিনিট দশেক পর অন্তিকের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি আসে।

পড়নে সাধারণ লুজ প্যান্ট, আর শার্ট। উচ্চতাও সাধারণ, মুখে বন্ধুত্বপূর্ণ হাসিও দেখা যাচ্ছে। কথা বলার সময় ভীষণ সক্রিয়, আর চোখ সবসময় চারপাশে ঘুরছে। তেমন বিশেষ কেউ নয়। ইনফর্মার মনে হচ্ছে বেশভুষায় আর আচরণে। নীলয় যেহেতু নিজেও আইনজীবী, তাই এসব ইনফর্মারদের সাথে নানান কারণে তারও কাজ করতে হয়। তাই এই লোকও ইনফর্মার হবে তা সহজেই বুঝে নিলো। কিন্তু স্যার নিজে তো কখনো কোনো ইনফর্মারের সাথে যোগাযোগ করেনা। এই ধরণের ছোটখাটো যে বিষয়গুলো কেইসে দরকার পড়ে, সেসব নীলয়ই হ্যান্ডেল করে সবসময়। ইনফর্মারদের সাথে কথা বলাও তার কাজ। আজ কি হলো?

“হু, কি বলবে বলেছিলে বলো? আর খবর পাক্কা হলে তারপর সেসব বলবে। অহেতুক আর অপ্রয়োজনীয় তথ্য যেন দিতে না দেখি। বেশি সময় নেই হাতে।” অন্তিক কিছুটা বিরক্ত মুখে বলে। ইদানিং সারাক্ষণ যেকোনো ব্যাপারে বিরক্তবোধ করা তার স্বভাবে পরিণত হয়েছে।

“এবারে পাক্কা খবর স্যার কসম। কোন খুত রাখিনাই এবার। আগে আপনি শুনেন তো। গ্যারান্টি দিচ্ছি কাজে আসবে। নাহয় আমাকে বাদ দিয়ে দিয়েন কাজ থেকে।”

লোকটার কথা শুনে অন্তিকের বিরক্তি আরও বেড়ে যায়। এসব ইনফর্মারগুলোর এই এক স্বভাব। যতোটা না মজবুদ তথ্য হাতে থাকে, ততটা রসিয়ে বলে। এই আটারো দিনে অসংখ্য বার এমন অনেক খবর এনেছে তার হায়ার করা ইনফর্মারগুলো। একটাও কাজে আসেনি।

বিরক্ত মুখে বলে তাড়া দিয়ে অন্তিক বলে,

“কথা না বাড়িয়ে কি জানতে পেরেছ তা বলো।”

“স্যার। আপনি যে মেয়েটার ছবি দিছিলেন তাকে স্কয়ার হাসপাতালে দেখা গেছে। কসম চারদিক থেকে সবরকম খবর নিয়ে তারপর আপনাকে জানাতে এসেছি। হাসপাতালের নার্সদের মুখে শুনে এই মেয়ের উপস্থিতি সম্পর্কে গ্যারান্টি নিয়ে এসেছি। আমি তো আর ডাক্তারদের ধরতে পারবোনা। আপনি গিয়ে একবার খোঁজ নেন। নিরাশ হবেননা আশা করি। খবর টাটকা। লাস্ট একবার বিশ্বাস রাখেন। এবার যদি হতাশ হন। আমি দালালি ছেড়ে দেবো।” শেষ কথাটা বলার সময় গলার কণ্ঠনালীতে হাতের আঙ্গুল ছুঁইয়ে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে লোকটা কথাগুলো বলে।

অন্তিক লোকটার অতিরক্ত আত্মবিশ্বাসে বিরক্ত হলেও মনোযোগ দিয়ে শুনে। তার এই ইনফর্মারের কথায় তেমন বিশ্বাস না হলেও খোঁজ অবশ্যই নেবে। সামান্য উপায়টাও বাদ দেয়নি সে এখনো, প্রত্যেকবার হতাশ হওয়া সত্ত্বেও নড়বড়ে খবরেরও গোঁড়া সে বের করেছে। তবে কাজ হয়নি। এবারও না হোক, কিন্তু খোঁজ অবশ্যই নেবে। আর কিছু বলার আছে কিনা জানতে চেয়ে লোকটাকে বিদায় করে সে।

দিগন্তকে ফোন দিয়ে জানায় এক ঘণ্টা পর ওর সময় হলে যেন তার সাথে একবার স্কয়ার হস্পিটালে যায়। দিগন্ত সময় হবে জানিয়েছে। অন্তিক ফোন কেটে গাড়ির দরজার সাথে হেলান দেয়, এক পা গাড়ির সাথে লাগিয়ে ‘দ’ কায়দায় দাড়ায়।

সি গা রে ট টেনেছিল। তাই শুগার-ফ্রি অরবিট চুইংগাম মুখে পুরে নেয়।

নীলয় কিছু জিজ্ঞেস করছে। সে আনমনে শুনে। তবে শুধু ‘স্যার টেনশন করবেননা। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আজ ম্যাডামের কোন খবর……’ এতটুকুই শুনেছে সে।

অদূরে কিছু ছেলে মেয়ের ওখানে চোখ যায়। তিনটা ছেলে আর দুটো মেয়ে। রাস্তার ধারে অনেক সারি সারি কাশফুল। সেখানে দাড়িয়ে ছবি তুলছে। ওখানে পরিচিত কাউকে দেখলো কি সে?

মৌনপ্রেম পর্ব ৩৫ গল্পের ছবি