সময়টা সকাল ছয়টার ঘর পার করেছে। অন্তিক ঘুমুঘুমু চোখ খুলে। রুমে সূর্যের আলো প্রবেশ করছে। বুকটা হাল্কা হাল্কা লাগলে বুঝতে পারে প্রাণেশা নেই। ওকে আবার কাছে টেনে নেওয়ার জন্য বা পাশটা হাতরে দেখে। কিন্তু পাশে হাত দিয়ে কাউকে পায় না। অন্তিক বিরক্ত হয়। উঠে গেল মেয়েটা? আজকে আরেকটু ঘুমাতে পারতো। শরীর দূর্বল লাগবে। সবসময় ভোরে উঠতে হবে কথা আছে? অন্তিক বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে দেখে ওয়াশরুমে আছে নাকি। না, দরজা খোলা। ব্যাল্কনিতে থাকবে ভেবে “প্রাণো” বলে ডেকে উঠে। সাড়া না পেয়ে ঘুমুঘুমু গলার স্বরটা আরেকটু উচিয়ে বলে,
“প্রাণো, কোথায় তুমি? এত তাড়াতাড়ি উঠে গেলে কেন? আসো আরেকটু ঘুমাবে। সিক লাগবে নাহয়।”
প্রাণেশার উত্তর না পেয়ে সে আরও দুইবার ডাকে। কিন্তু সাড়া না পেয়ে নিচে চলে গিয়েছে ভেবে আরও বিরক্ত হয়। কাল অল্প সময়ের আদর নিয়েই কেমন নেতিয়ে গিয়েছিল, আজকে এত তাড়াতাড়ি উঠে যেতে হবে কেন? আশ্চর্য!
অন্তিক না চাইতেও উঠে পড়ে বিছানা থেকে। মেয়েটা কি করছে দেখতে হবে। কাল উন্মাদ হয়ে ভালোবেসেছিল, কেমন হুশহীন ছিল পুরোটা সময়। প্রাণেশা প্রস্তুত ছিল না বলে হঠাৎ তাকে ওভাবে নিতে পারেনি। অন্তিক তো ধারণা করেছিল, মেয়েটা আজ সারাটা দিন বিছানায় কাটাবে। বিছানা থেকে উঠার শক্তিটুকু অবশিষ্ট থাকবেনা ওর মধ্যে। আর মেয়েটা কিনা ভোরবেলা উঠে নিচে চলে গিয়েছে……
অন্তিক চিন্তিত বদনে উঠে গায়ে টি শার্ট জড়ায়। পায়ে স্লিপার পরে নিচে নামে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সারা ড্রয়িং রুমে চোখ বোলায়। কেউ নেই। বাবা কাল অসুস্থ বোধ করছিল। তাই ঘুমাতে সমস্যা হয়েছে। মাও বাবাকে অসুস্থ দেখে ঘুমাতে পারেন নি নিশ্চয়। এজন্য কাউকে দেখা যাচ্ছেনা কোথাও। ড্রয়িং রুমে না পেয়ে রান্নাঘরে যায়। না, ওখানেও নেই। প্রতিদিন সকালে দাদির কাছে গিয়ে এক কাপ চা দিয়ে আসে প্রাণেশা, অন্তিক তা জানে। তাই দাদির রুমে গিয়ে দেখে, ওখানেও নেই। দাদি ভোরবেলা উঠে নামাজ পরে আবার ঘুমান। এখনো ঘুমাচ্ছে। সেখানে না পেয়ে মায়ের রুমের সামনে গেলে ওখানে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখা যায়।
এবার অন্তিক একটু চিন্তিত হয়। মেয়েটা গেল কোথায়? কাল ওর কথা না শুনে আদর করেছিল বলে রাগ করেছে নাকি? কিন্তু রাগ করে যাবে কোথায়।
এসব ভেবে প্রাণেশা আগে যে রুমে থাকতো সেখানে যায় অন্তিক। প্রাণেশা ওখানেও নেই। তারপর একে একে বোনেদের রুমগুলো দেখে। প্রত্যেকে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। এখনো উঠেনি কেউ। ছাদ, বাগান, বাড়ির অন্যান্য পাশগুলো -সব জায়গায় দেখে নিয়ে কোথাও পায়না সে প্রাণেশাকে। কোথায় গেল মেয়েটা? অন্তিক ভাবে রেগে গিয়ে কোথায় যাবে? বাইরে হাঁটতে গেল কি? কিন্তু কাল যা হলো, মেয়েটার মাথা পাগল হলেই আজকে ভোরবেলা হাঁটতে বের হবে। তবে তা যদি না হয়, যাবে কোথায়?
অন্তিক আরও একবার ঠাণ্ডা মাথায় সারা বাড়ি খুজে দেখে। এবার অস্থির লাগছে তার। কিছুটা ভয়ও লাগছে। মেয়েটা কাল রাতের জন্য এতোটা রাগ করেছে, যে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছে কোথাও? নাকি কাল বিকেলের কথাগুলোর জন্য এখনো ক্ষমা করতে পারেনি? এ পর্যায়ে অন্তিক কিছুটা ঘাবড়ে যায়। কালকের করা আচরণের জন্য যদি ক্ষমা না করে থাকে, তাহলে তো রাতের বিষয়টা খুব জগন্য একটা ব্যাপার হয়ে দাড়াবে।
সে বাড়ির বাইরেও আনাচে কানাচে খুঁজে দেখে। কোথাও না পেয়ে আবার বাড়ির ভেতর এসে ইশি, দিথীর রুমে নক করে দরজা খুলতে বলে। ওরা খুললে সে কোন কথা না বলে নিজেই ঢুকে দেখে প্রাণেশা কোথাও ওদের কাছে আছে কি না। কিন্তু তাদের কারো রুমে পায়না।
ততক্ষণে অন্তিকের মা-চাচিও রুম থেকে বেরিয়ে আসে, বাইরে ছেলে মেয়েদের আওয়াজ শুনে। এরা আজ এত তাড়াতাড়ি উঠল ভেবে অবাক হয়। মেয়েগুলোকে প্রত্যেকদিন তিন/চারবার করে ডাকতে হয়। এরা কিনা আজ এত সকাল সকাল উঠে গেল? ছেলেগুলোর গলাও শুনা যাচ্ছে। উনারা বের হয়ে অন্তিক-দিথী-দিগন্ত এমনকি মাহাদ-অয়ন্তিকেও ইশির রুমের সামনে দেখেন। ইশি নিজেও বাইরে দাড়িয়ে আছে। ভাই হঠাৎ সকাল সকাল তাদের দরজা খুলতে বলে ভেতরে কি যেন দেখছিল। ওরা কি খুজঁছে জানতে চাইলে প্রাণেশাকে দেখেছে কি না জিজ্ঞেস করে। তারা “না” বলে কি হয়েছে জানতে চাইলে অন্তিক ওকে সারা বাড়ির কোথাও খুঁজে পাচ্ছেনা তা জানায়। মা-চাচীও আসতে আসতে ছেলের কথা শুনে ঘাবড়ে যান। খুঁজে পাচ্ছেনা মানে? কোথায় যাবে?
আস্তে আস্তে বাড়ির সবাই বের হয়ে আসে। প্রাণেশাকে খুজে পাচ্ছেনা শুনে হতবাক হয়ে অন্তিককে কিছু জিজ্ঞেস করবে, তার আগে সে কিছু ভেবে অস্থির ভঙ্গিতে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়। বাকিরাও যায় পিছু পিছু। অন্তিক রুমে গিয়ে আলমারি খুলে প্রাণেশার জামা কাপড় দেখে। আছে সব। ওকে জামাকাপড় দেখতে দেখে মা বলেন,
“কি হয়েছে অন্তিক? মেয়েটা কোথায়? সকাল সকাল কি শুরু করলি? জামা কাপড় দেখছিস কেন তুই?”
অন্তিক মায়ের প্রশ্ন শুনে উনার দিকে তাকায়। তাকে কেমন অস্থির আর চিন্তিত দেখাচ্ছে। মায়ের দিকে ফিরে সে জিজ্ঞেস করে,
“মা, কোথায় গেল ও?”
“সেটা তো আমি জানতে চাচ্ছি? কোথায়? আর কি হয়েছে? প্রাণেশা তো ভোরবেলা উঠে বাইরে কোথাও যায়না। চা বানায়, বাগানে যায় - এটুকুই। আজকে কি হয়েছে?”
“বাড়িতে কোথাও নেই ও।”
ছেলের ঠিকঠাক উত্তর না পেয়ে অন্তিকের বাবা মি. মাহমুদ ভারী স্বরে বলেন,
“বাড়িতে কোথাও নেই সেটা আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি অন্তিক। তোমার মা বাড়িতে না থাকলে কোথায় যাবে সেটাই জানতে চাচ্ছে।”
মিসেস আয়েশা আমিন অন্তিকের বাহু ধরে শক্ত মুখে জানতে চান,
“কি করেছিস আবার তুই? সেদিন তো সব ঠিকঠাক হলো। মেয়েটাও খুশি ছিল। এর মধ্যে আবার কি করলি? জামা কাপড় দেখছিস কেন? ও কি বাড়ি ছেড়ে যাবে নাকি?”
অন্তিক বাবা মায়ের কথা শুনে চিন্তিত মুখে। কিন্তু কোন উত্তর না দিয়ে আবার আলমারির একটা ড্রয়ার খুলে। যেখানে প্রাণেশার সেদিন মামা বাড়ি থেকে আনা কিছু জিনিস রাখা ছিল। অন্তিক জানেনা ওখানে কি ছিল। তাকে দেখাবে বললেও সময়ের অভাবে তা হয়ে উঠেনি। কিন্তু এই ড্রয়ারেই ওর সেসব মূল্যবান জিনিস ছিল। অন্তিক খুলে দেখে ওখানে কিছু নেই।
তা দেখে এতক্ষণের অস্থির ভাবটা মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যায়। অন্তিকের হাবভাব বাকিরা কিছু ধরতে পারছেনা। সবার চিন্তিত মুখ দেখে দিগন্ত ঠাণ্ডা স্বরে বলে,
“ভাই, কি হয়েছে বলো। এভাবে সবাইকে টেনশনে রেখে তো লাভ নেই। বড় মা, বড় বাবা সবাই চিন্তা করছে। আর ভাবি যদি কোথাও হারিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তো খুঁজতে হবে, তাইনা? একটু খুলে বলো আমাদের প্লিজ। সবাই চিন্তা করছে।”
“হারিয়ে যায়নি।” অন্তিক ভীষণ শান্ত স্বরে বলে।
“হারিয়ে না গেলে কোথায় প্রাণেশা?” মা
“চলে গিয়েছে।”
“মানে?”
“মানে ও চলে গিয়েছে মা।”
“চলে যাবে কেন? আর কোথায় যাবে? খুলে বল অন্তিক।” বাবা
“বলতে হবেনা কিছু আর। আপনার ছেলে হাবভাবে বোঝায় যাচ্ছে আবার মেয়েটার সাথে বাজে ব্যবহার করেছে। এজন্য মেয়েটা কোথাও চলে গিয়েছে হয়তো দেখুন। নাহলে এভাবে উধাও হওয়ার তো কারণ দেখছিনা।” মা
অন্তিক হঠাৎ উঠে নিচে চলে যায়। বাকিরাও নামে।
অন্তিক নিচে গিয়ে সিকিউরিটি গার্ডের কাছে প্রাণেশাকে যেতে দেখেছে কিনা জানতে চায়। কিন্তু গার্ড মাত্রই এসেছে। তার আগে নাইট ডিউটিতে যে ছিল সে মাত্র বাড়ি চলে গিয়েছে। তাই না সূচক জবাব দেয়। অন্তিকের বাবা বলেন যেন নাইট শিফটের গার্ডকে কল দিয়ে বিরক্ত না করে এখন। সময় নষ্ট হবে। এর চেয়ে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলে ভালো হবে। উনার কথায় সকলে সম্মতি জানায়। অন্তিক সিকিউরিটি রুমে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখতে পায় প্রাণেশা ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে ভোর পাঁচটার দিকে বেরিয়ে গিয়েছে বাড়ি থেকে। গার্ড তখন বসে বসে ঝিমুচ্ছিল। বুঝতেও পারেনি।
ফুটেজ দেখে সবার কাছে সব পরিস্কার হয়। কিন্তু প্রাণেশা চলে হঠাৎ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কেন সেটাই অজানা। মিসেস আয়েশা আমিন কাঁদছেন বসে বসে।
ছোটবেলায় থেকে এই ছেলেকে নিয়ে সবচেয়ে নিশ্চিন্তে ছিলেন তিনি। গর্ব করতেন সবসময়। কোনোদিন কোনো অভিযোগ আসেনি। না বন্ধুবান্ধবদের সাথে খেলাধুলায় মা রা মা রির অভিযোগ, না স্কুল-কলেজ থেকে পড়ালেখা নিয়ে কিংবা দুষ্টুমি নিয়ে অভিযোগ। যেখানে গিয়েছে সেখানে নিজের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে, শান্তভাবে যেকোনো পরিস্থিতি সামলানো এই ছেলের বা হাতের কাজ যেন। মানুষকে সহজে ম্যানিপুলেট করে নিজের মতো চালাতে উস্তাদ। আর এই ঠাণ্ডা মাথার সবচেয়ে বোঝদার ছেলেটা আজ এই বয়সে এসে নিজের সবচেয়ে উদ্দতপনার পরিচয় দিচ্ছে। বারে বারে নিজের বউকে অসম্মান, অপমান করছে। না জানি আজকে কি করেছে যে মেয়েটা বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।
এসব ভেবে মিসেস আয়েশা আমিনের আফসোস হচ্ছে। তিনি কিছুটা রেগে সবার উদ্দেশ্যে বলেন,
“এখন সবাই এখানে বসে থাকবে? নাকি মেয়েটাকে কেউ খুঁজতে যাবে?”
অন্তিক ততক্ষণে কাউকে ফোন করছে। মায়ের কথা শুনে একপলক তাকায়। তবে কিছু বলেনা।
সে কয়েকজনকে প্রাণেশার মামা বাড়ির ওখানে পাঠিয়েছে প্রাণেশা ওখানে গিয়েছে কি না তা জানতে। তবে যদি না গিয়ে থাকে তাহলে ওর মামা বাড়ির কেউ যাতে ব্যাপারটা বুঝতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে বলে।
খবর আসতে অন্তত আধ ঘণ্টা তো লাগবে। কিন্তু অন্তিকের মন বলছে প্রাণেশা ওখানে যাবেনা। তাই সে গাড়ি নিয়ে কোথাও বের হয়ে যায় । দিগন্ত আর মাহাদ ও খুঁজতে বের হয়। ওরা নিজেদের মতো চারদিকে খুঁজতে থাকে। অন্তিক গিয়ে প্রথমে তাদের বাড়ির রাস্তা থেকে প্রাণেশার মামা বাড়ির রাস্তাটা একবার চক্কর দেয়। তারপর ওকে না পেলে আশেপাশের সব জায়গায় খুঁজে দেখে। অন্তিক প্রথমে প্রাণেশাকে না পেয়ে অস্থির ছিল। তারপর ও চলে গিয়েছে বুঝতে পেরে কেমন একটা শান্ত হয়ে যায়।
মেয়েটা কাল ওকে ক্ষমা করেনি তা স্পষ্ট। অন্তিকের ভুল। কাল ইরফানের থেকে জেনেছে ক্যাফের ছেলেটা ওর বোনের স্যার হয়। এরপর ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু তখন কাজের চাপে মাথা ঠিক ছিল না। যা মুখে এসেছে বলে দিয়েছে। অন্তিকের এ পর্যায়ে কেমন পাগল পাগল লাগে নিজেকে।
প্রাণেশাকে ভালো খারাপ কিছু বললে সে তো উত্তর দিতে পারেনা। অন্তিককে কড়া গলায় জবাব দিতে পারেনা। তাই কি অবচেতন মন ওর উপর রাগ ঝাড়লে আর কি হবে এমনটা ভেবে নিয়েছিল? হবে হয়তো… না হলে আগে তো কখনো এমন স্বভাব ছিল না তার।
নিজের ভুল বুঝতে পারার পর অন্তত প্রাণেশার রাগটা ভাঙানো দরকার ছিল। অন্তিকের সেটাও তখন মাথায় আসেনি। প্রাণেশার আগে পিছে কেউ নেই বলে কি ট্যাকেন ফর গ্র্যান্টেড হিসেবে নিয়ে নিয়েছিল? নাহলে ওর রাগ ভাঙ্গানোটা যে দরকার সে কথা মাথায় আসলোনা কেন? আর সেসব গেল। কিন্তু রাতে যা হলো? খুব বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার হয়ে দাড়াচ্ছে এখন। প্রাণেশা বার বার ওকে বারণ করেছিল। কিন্তু সে শুনেনি। এখানেও ওর সম্মতিটা জরুরী একথা ভুলে গিয়েছিল।
অন্তিক “শিট” বলে গাড়ির স্টিয়ারিং এ একটা বারি দেয়। এত আফসোস ৩১ বছরের জীবনে তার আগে কখনো হয়নি। না জানি মেয়েটা অভিমান করে কোথায় চলে গিয়েছে। যতটুকু বুঝতে পারছে মামা বাড়িতে যাবেনা। কারণ ওখানে গেলে অন্তিকের কাছে আবার ওকে ফিরিয়ে আনা কঠিন কিছু হবে না। তাহলে গেল কোথায়?
অন্তিক অস্থির হয়ে উঠে। কোথায় খুঁজবে এই মেয়েকে? কোথায় চলে গেল? কালকের পর শারীরিক অবস্থাও ভালো থাকার কথা নয়। রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পরে থাকেনি তো কোথাও? উফ!! পাগল পাগল লাগছে অন্তিকের।
দিগন্তকে ফোন দিয়ে জানায় যেন আশেপাশের সব হস্পিটালে খোঁজ নেয়। আর মাহাদকে সে যেদিকে গিয়েছে ওদিকের মেইন স্ট্রিট থেকে অলি গলি সব দিকে খুঁজতে বলে। একা বের হয়ে গিয়েছে, খারাপ কারো হাতে পড়লে নির্দিষ্ট রাস্তাগুলোতে খুঁজে লাভ হবেনা। সব জায়গায় খুঁজতে হবে। এক ইঞ্চিও রিস্ক নেওয়া যাবেনা।
অন্তিক নিজে সে যেদিকটাই আছে ওদিকের সব অলি গলি থেকে মেইন স্ট্রিট কোনোটাই বাদ দেয় না। সব জায়গায় খুঁজে দেখে। কোথাও পায়নি। নীলয়কে দিয়ে ওর কলেজের একমাত্র বান্ধবী মেহার বাড়িতেও খোঁজ লাগায়, এমনকি ওর বোন আরশির শ্বশুর বাড়ি অব্দি বাদ রাখেনি। কোথাও নেই।
———————
হস্পিটালের করিডোরে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছে এক যুবক। বয়স ২৮/২৯ হবে। পাশে তার সমবয়সী কিংবা কিছুটা ছোট অন্য এক যুবককেও দেখা যাচ্ছে। উভয়েই চিন্তিত।
যে মেয়েটাকে নিয়ে তারা হস্পিটালে এসেছে তাকে তারা চেনেনা। আজই প্রথম দেখেছে। অথচ মেয়েটাকে আর এই যুবককে দেখলে কেউ একথা বিশ্বাস করবেনা, যে তারা একে অপরকে চেনে না। মেয়েটার চেহারা আর এই যুবকের চেহারা পুরো কার্বন কপি। যে কেউ বলবে তারা একই মায়ের পেটের ভাই-বোন। অথচ মেয়েটাকে আজই যুবকটা প্রথম দেখছে। তার তো কোনদিন কোন বোন ছিল না। তাহলে এই মেয়ে কে? বিষয়টা নিয়ে তারা খুব চিন্তিত।
“ভাই, আমার মনে হয় আপনার মেয়েটার সাথে একবার ডি.এন.এ টেস্ট করানো উচিত। ও আপনার রক্তের সম্পর্কের কেউ নয় এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছেনা কসম। মায়ের পেটের ভাই বোন না লাগেন, কিছু একটা তো সম্পর্ক থাকবে। একবার টেস্ট ফেস্ট করানো দরকার।”
“করাবো। আগে মেয়েটা সুস্থ হোক। জ্ঞান ফিরুক। ডাক্তার কি বলছে শুনি আগে।”
“ঐ তো, আসতেসে ডাক্তার সাহেবা।” পিয়াস নামের ছেলেটা কেবিন থেকে মহিলা ডাক্তারকে বের হতে দেখে বলে।
ড. ফাতেমা তাদের সামনে এসে বলেন,
“আপনাদের মধ্যে পেশেন্টের গার্ডিয়ান কে?”
ডাক্তারের প্রশ্নে পিয়াস প্রথম যুবকের দিকে ইশারা করে বলে,
“ভাই গার্ডিয়ান। উনাকে বলেন কি বলবেন।”
ড. ফাতেমা যুবকের দিকে তাকিয়ে তাকে নিজের কেবিনে আসতে বলেন উনার সাথে।
তিনি চেয়ারে বসে যুবককে জিজ্ঞেস করেন,
“আপনি পেশেন্টের কি হন?”
“কেউ না। গাড়ি নিয়ে পার্টি অফিস যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সামনে এসে পড়ে। আগে থেকে অসুস্থ ছিল হয়তো। সামান্য ধাক্কায় অজ্ঞান হয়ে যায়।”
“ঠিক ধরেছেন। আগে থেকে অসুস্থ। কিন্তু মেয়েটা আপনার কেউ হয়না? আসলেই?”
যুবক চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,
“আমি মেয়েটাকে আজকে প্রথম দেখালাম। কিন্তু ওর চেহারা দেখে আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছেনা আমরা একে অপরকে চিনিনা। এটা কিভাবে সম্ভব। এত মিল। আমার আগে হারিয়ে যাওয়া কোন বোনও নেই যে এই মেয়েটা আমার বোন হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু কিছু একটা তো হবে। অন্য কোন রক্তের সম্পর্ক থাকবে হয়তো। আমি আপাদত কিছু বুঝতে পারছিনা। আমাকে পরিবারের সাথে আলোচনা করতে হবে। আপনি প্লিজ ওর এখন কি অবস্থা জানান”
“উম, বিষয়টা বেশ জটিল। কিন্তু এখন আমি যা বলবো তাতে পুরো ব্যাপারটা আরো বেশি ক্রিটিকাল হতে যাচ্ছে।”
যুবক মনোযোগ দিয়ে তাকায়। সে জানতে ইচ্ছুক কি হয়েছে।
“শুনুন মি. ফারদিন। আপনাদের মধ্যে আদৌ কোন রক্তের সম্পর্ক আছে কি নেই সেসব পরের ব্যাপার। আপাদত বিষয়টা অন্য পর্যায়ের জটিলতায় আছে। মেয়েটা শাারীরিক ভাবে ভীষণ দূর্বল, তাই অজ্ঞান হয়েছে। এক্সিডেন্টে তেমন ক্ষয় ক্ষতি হয়নি।” তারপর একবার গাঢ় দৃষ্টিতে সাহিলের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করেন,
“ওর শরীরে কিছু অযাচিত এবং তাজা চিহ্ন দেখে আমরা ওকে বিবাহিত কিনা জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে তখন কিছুটা হুশে ছিল, মুখে কিছু না বললেও মাথা নাড়িয়ে না বুঝিয়েছে। তারপর কিছু টেস্ট করিয়ে যা বুঝলাম। সামওয়ান হ্যাস বিন ইন্টিমেট উইথ হার উইদিন দা লাস্ট টোয়েন্টিফোর আওয়ার্স। এখন মেয়েটা যদি বিবাহিতা না হয় তাহলে ব্যাপারটা কি দাড়াচ্ছে আই থিংক বুঝতে পারছেন। আমি প্রথমে আপনাকে ওর বাড়ির কেউ ভেবেছিলাম। কিন্তু সেটা যেহেতু নয়। আমাদের কাউকেই ওর সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে হবে।”
সাহিল ফারদিন মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনে। ওর রক্তের সম্পর্কের কেউ হবে তা সে নিশ্চিত। তাই ডক্টরের কাছে এ ধরণের কথা শুনে ধাক্কা খায় সে। যদি ওর কেউ হয়ে থাকে। তাহলে প্রথম পরিবারের কাউকে পেলো মেয়েটা, অথচ এমন বাজে একটা ঘটনার মুখোমুখি হয়ে। মেয়েটা ওর কিছু একটা হবে তা সে ধরেই নিয়েছে। তাই আপন কারো সাথে এসব হলো ভেবে তার চোয়াল শক্ত হয়।
“ওকে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন কিভাবে হলো। আর কে করেছে। নাম, চেহারা কিছু মনে আছে কি না জিজ্ঞেস করুন, তবে ফোর্স করবেন না। বলতে চাইলে বলবে, নাহলে এখন জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। আর পুলিশকে ইনফর্ম করবেন না। আমি দেখব ব্যাপারটা। আপনারা আগে আমার সাথে ওর ডি.এন.এ টেস্ট করান। দ্রুত…”
ডক্টর ডি.এন.এ টেস্ট করিয়েছে। ২৫% ডিএনএ মিলে। তার মানে মা অথবা বাবা কেউ একজন একই। কিন্তু বাবা, মা একসাথে একই নয়। সাহিল তার বাড়িতে ফোন দিয়ে বিষয়টা জানায়। তারা আসছে।
এর মধ্যে ডক্টর জানায়, মেয়েটা এসব নিয়ে মুখ খুলছেনা। কোনোরকম সেক্সুয়াল অ্যা স ল্টে র শিকার হয়েছে কিনা জানতে চাইলে সোজা না বলছে। সাহিল আপাদত এ বিষয়টা কাউকে জানায়না। ডক্টরকেও মানা করে। সব কিছু গোলেমেলে লাগছে তার। মেয়েটা হঠাৎ তার গাড়ির সামনে এসে পড়লো। অজ্ঞান হলো। তার মধ্যে কনফিউশন ঢুকিয়ে দিল। এখন জানল তারা ভাই বোন। মানে কি?
আবার অ্যা স ল্টে ড হয়েও অস্বীকার করছে। ভয় পেয়ে কি? হয়তো…এ ব্যাপারে পরে ওর সাথে কথা বলতে হবে। আগে একটু সুস্থ হয়ে স্থির হোক, ভয় কাটলে, তাদের উপর বিশ্বাস আসলে - তারপর এ ব্যাপারটা দেখা যাবে। এখন মেন্টাল সাপোর্ট দরকার সবচেয়ে বেশি।
সাহিলের বাবা, দাদি, ফুফি আর চাচা আসেন হস্পিটালে। সাহিল ঘটনা সংক্ষিপ্তভাবে তাদের জানিয়েছে। তারা সবাই এসে কেবিনে গিয়ে প্রাণেশাকে দেখে। মেয়েটা তখন ঘুম। উনারা সবাই ধারণা করতে পারেন, প্রাণেশা কে হতে পারে। এর মধ্যে নার্স প্রাণেশার কাছে যে ব্যাগ ছিল তাতে কিছু ছবি পেয়েছিল জানালে সাহিল সেসব হাতে নিয়ে দেখে। তার ছোটবেলার একটা ছবি আছে, আর মামনির ছবি।
সাহিল এসব দেখে পাথর বনে যায়। সে বাবার দিকে তাকিয়ে দেখে বাবাও মেয়েটার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। বাকিরাও সাহিলের ছোটবেলার ছবি আর আলিজা আহমেদের ছবি দেখে যা বুঝার বুঝে যায়। অবশ্য ওর চেহারা দেখেই কিছুটা ধারণা করেছিল। সাহিলের সাথে চেহারা মিললেও, চোখ দুটো হুবহু আলিজা আহমেদের মতো।
প্রাণেশা এখন তার বাবা বাড়িতে আছে। হসপিটাল থেকে এখানে আনা হয়েছে তাকে। যদিও সে আসতে চায় নি। কিন্তু ভাইয়ের কথা আর অনুরোধ অমান্য করতে পারেনি।
প্রাণেশাকে পেয়ে তার বাবা বাড়ির সবাই ভীষণ খুশি। তারা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি প্রাণেশার অস্তিত্বের ব্যাপারে। আলিজা আহমেদ যে কখনো একটা কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তারা সকলে অজ্ঞ ছিল এতদিন। প্রাণেশাকে পেয়ে তারা সকলে খুশি হলেও, প্রাণেশা নিজে তেমন একটা খুশি নয়। সে কখনো চায় নি বাবা বাড়ির কারো সাথে তার দেখা হোক।
প্রাণেশা কাল অন্তিকের তার প্রতি করা আচরণের পরই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল, যে বাড়ি ছেড়ে সে চলে যাবে। তবে তখনও দুটোদিন সময় নিবে ভেবেছিল, আর মামা বাড়ি অব্দিই ছিল তার ফিরে যাওয়ার ভাবনা। কিন্তু রাতে অন্তিক তার উপর আবার যে নিকৃষ্ট কর্তৃত্ব ফলালো, তারপর সে আর ঐ লোকের মুখোমুখি হতে চায় নি। সকালে এক আচরণ, বিকালে এক আচরণ আর রাতে আরেক, বহুরুপী লোক।
মামা বাড়ি গেলে সেখান থেকেও ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চাইতে পারে, এটা মাথায় আসার পর প্রাণেশা মেহার বাড়িতে দুটোদিন থেকে তারপর মামা বাড়ি চলে যাবে ভেবেছিল। ততোদিনে অন্তিকও ওকে না পেলে নিশ্চয় আর খুজত না। এসব ভেবে দূর্বল শরীর নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মাথায় আসে মেহার বাড়িতেও সমস্যা চলছে এখন। কালই তো বলেছিল। এখন কথাবার্তা ছাড়া সে তাদের বাড়িতে গেলে সবাই ব্যাপারটা নিশ্চয় ভালোভাবে নিবেনা। তখন টেনশনে কি করবে, কোথায় যাবে এসব ভাবতে ভাবতে একটা গাড়ির সাথে ধাক্কা খায়।
এরপর স্পষ্ট করে তেমন কিছু মনে না থাকলেও একটা ছেলে তাকে কোলে নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছে তা সে বুঝতে পারে। তারপর আরেকটু হুশ আসলে কেউ একজন তাকে বিবাহিতা কি না জানতে চাচ্ছে চাচ্ছিল। প্রাণেশা ভয় পেয়েছিল, তারা কোথাও আবার অন্তিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেনা তো ভেবে। তাই ‘না’ বলে। এরপর আরো কি কি যেন জানতে চাচ্ছিল। প্রাণেশা সেসব আমলে নেয় নি। বার বার মাথা নেড়ে ‘না’ বুঝিয়েছে, সে বিবাহিতা নয়। এর কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়লে। যখন ঘুম ভাঙে তখন প্রথমবারের মতো বাবা-চা, ভাই, দাদি-ফুফি -সবাইকে দেখে। যদিও সে তখনও চেনেনা কাউকে।
তারা নিজেরাই নিজেদের পরিচয় দিয়েছে। প্রাণেশা খুব অবাক হয় হঠাৎ অচেনা মানুষগুলোকে তার পরিবার বলে পরিচয় দেওয়ায়। সে বিশ্বাস করেনি শুরুতে। তাদের কোন কথার জবাব দেয়নি সে, আর না নিজে কিছু জানতে চেয়েছে। কিন্তু সাহিলের হাতে মা, ভাইয়ের ছবি দেখে সে ওগুলো কেঁড়ে নেয়। তারপর হাতের ইশারা-ইঙ্গিতে তার অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত জিনিস ছোয়ায় অধিকার কে দিয়েছে জানতে চায় শক্ত মুখে। ওর সে প্রশ্নের অঙ্গভঙ্গিতে সবাই বিভ্রান্তিতে পরে যায়। কারণ তারা জানে না যে, প্রাণেশা কথা বলতে পারেনা। প্রাণেশা অস্থির হয়ে ছবিগুলো নিয়ে বেড থেকে নেমে যেতে চায়। হস্পিটাল থেকে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। এতে গিয়ে সবার হুশ ফেরে।
সবাই আটকাতে চাইলে সাহিল হাত দেখিয়ে তাদের থেমে যেতে বলে। তারপর নিজে আস্তে ধীরে প্রাণেশার সামনে বসে। প্রাণেশার চেহারা সহ আপাদমস্তক স্নেহভরা দৃষ্টিতে দেখে নরম স্বরে জানতে চায়,
“তোমার নাম?”
প্রাণেশা তার দিকে তাকায়। এতক্ষণ বৃদ্ধা আর মাঝবয়সী মহিলা নিজেদের তার পরিবার বলে পরিচয় দিলেও শান্তভাবে কেউ কিছু বুঝিয়ে বলেনি। যার কারণে তার কাছে অবান্তর কথাবার্তা লেগেছে সেসব। সাহিলকে সুন্দরভাবে তার পরিচয় জানতে চাইতে দেখে সে তার দিকে তাকায়। এই ছেলেটাই তাকে হস্পিটালে নিয়ে এসেছিল। তার আবছা মনে আছে। সে চোখে মুখে দ্বিধা, আর এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য অস্থিরতা নিয়েও মন দিয়ে সাহিলের পুরো চেহারা দেখে। লোকটাকে তার ভালো মনে হচ্ছে। তার দিকে চেয়েও আছে কেমন মায়াভরা চোখে। প্রাণেশা শান্তভাবে বসে হাতের আঙ্গুল দিয়ে অক্ষর বানিয়ে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে নিজের নাম বোঝায়।
সাহিল তার হাতে ছবিগুলো দেখে যখন মেয়েটা রেগে গিয়েছিল, তখনই কিছুটা আন্দাজ করেছিল যে সে কথা বলতে পারেনা। তার ধারণা সত্যি হওয়ায় থমকে যায়। কয়েক মুহূর্ত প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজের পড়নের পাঞ্জাবি পকেট থেকে ফোন বের করে লক খুলে প্রাণেশার হাতে ধরিয়ে দেয়।
“এখানে লিখে দাও। আমি আসলে একটু গাধা ধরণের। কেউ ইশারা-ইঙ্গিতে কিছু বোঝালে ঠিক ধরতে পারিনা। ছোটবেলায় পরীক্ষার হলেও আমার বন্ধুরা কোন উত্তর ইশারায় বুঝিয়ে দিলে বুঝতাম না। তুমি একটু কষ্ট করে লিখে দাও প্লিজ।”
প্রাণেশা ছেলেটার এমন বোকা বোকা কথায় হতবম্ব হয়ে যায়। পরীক্ষার হলে করা বন্ধুর ইশারা আর তার ইশারা কি এক হলো? তার ভাষা তো নির্দিষ্ট নিয়মে তৈরি। উল্টা পাল্টা বলা যায় নাকি? আর পরীক্ষার হলে তো হাতের আঙ্গুল কিংবা মুখে ফিসফিস করে, যা পারে দেখিয়ে কোন একটা উত্তর বুঝিয়ে দেয়। কোথাকার কি তুলনা……
ভেবে সে হালকা হেসে উঠে। ওকে হাসতে দেখে সাহিলও মৃদু হেসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। প্রাণেশাকে একটু সহজ করতে চেয়েছিল সে তাদের সাথে। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে অপরিচিত মানুষদের সামনে দেখে, আবার তারা যদি নিজেদের তার পরিবার বলে পরিচয় দেয় তাহলে তার কাছে সব হযবরল লাগবে স্বাভাবিক। আর দাদি, ফুফির বোকামির পর মেয়েটার নিশ্চয় তাদের ভালো কথা শুনতেও বিরক্ত লাগবে।
প্রাণেশা মোবাইলে লিখে দেখায় তার নাম প্রাণেশা।
ওর নাম পড়ে সাহিল বলে,
“তোমার বাড়ি কোথায় জানতে পারি? তুমি আমার গাড়ির সামনে এসে পড়েছিলে হঠাৎ। তারপর এখানে নিয়ে আসি। তোমার বাড়ির কাউকে তো চিনিনা, যে ফিরিয়ে দেব। যদি বাড়ির কারো নাম্বার বা ঠিকানা দিতে তাহলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো।”
সাহিলের দাদি আর ফুফি তার কথা শুনে আপত্তি জানাতে চায়। পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবে মানে? এত দিন যেখানে থাকুক, যার বাড়িতেই থাকুক। এখন তো তারা জানে মেয়েটা তাদের বংশধর। তাহলে ফিরিয়ে দেবে কেন? তাই তারা আপত্তি জানাতে চাইলে সাহিলের বড় বাবা চোখের ইশারায় তাদের কোন কথা না বলতে বলেন। মেয়েটা এত দিন কোথায় ছিল, কিভাবে ছিল জানতে হবে তো নাকি? আর এভাবে কোন কথাবার্তা ছাড়া নিজেদের তার পরিবার দাবি করলে মেয়েটা উল্টো তাদের পাগল ভাববে, নয়তো খারাপ কারো হাতে পড়েছে ভাববে। তাই সাহিল যা করছে তা করতে দিতে তাদের চুপ থাকতে বলে।
সাহিলের কথা শুনে প্রাণেশার মুখে আধার নেমে আসে। সে নিজে চলে যেতে পারবে এমনটা লিখে দেয় ফোনে। সাহিল তার মুখভঙ্গি খেয়াল করেছে। মামনি যখন চলে গিয়েছিল, তখন সে ছোট ছিল বলে কিছু বুঝতো না। কিন্তু বড় হয়ে মামনির বাপের বাড়ির ওখানে গিয়ে খোঁজ নিয়েছিল, কাউকে পায়নি। তারা নাকি ওখানে থাকেনা। সে তাও অনেক খোঁজ নিয়েছে। বিভিন্ন ভাবে তার মামনি কোথায় থাকে জানতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। বাবার সাথে তার তেমন ভাব নেই। তাই বড় হয়ে মামনির ব্যাপারে সব তথ্য সে নিজে সংগ্রহ করে, নিজে খোঁজ করেছিল। অথচ মামনির ছায়াটুকুর দেখাও পায়নি।
আজ এত গুলো বছর পর হঠাৎ এই মেয়েটাকে পায় কাকতালীয়ভাবে। জানতে পারে মামণির মেয়ে হয় সে, তার বোন। সাহিলের যে কেমন অনুভূতি হচ্ছে তা সে বোঝাতে পারবে না কাউকে। বোনকে পেয়েছে, তার মানে মামনিকেও পাবে। কিন্তু বাড়ির লোকের কথা জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা চেহারা অন্ধকার করে নিল কেন? মামনি কি অসুস্থ?
“কি হলো? বলছ না যে? তোমার মা কোথায়? তোমরা কোথায় থাকো? আমাকে বলো, আমি তোমার মাকে নিয়ে আসি। তোমার কাছে এনে দেই। বলো?” সাহিল নিজের অস্থিরতা লুকানোর চেষ্টা করে কোনভাবে জানতে চায়। উদ্বিগ্ন চোখে চেয়ে আছে প্রাণেশার দিকে। পেছনে সাহিলের বাবা সজল ফারদিনেরও একই অবস্থা। তিনি মেয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর থেকেই পাথর বনে আছেন।
আলিজা নিজের গর্বে তার সন্তান নিয়ে অপমানিত হয়ে বাড়ি ছেড়েছিল! কথাটা মাথায় ঢুকতেই জীবনটা নিরর্থক লাগছে। এতদিন যে আফসোস আর গ্লানি নিয়ে বেচে ছিল, তা এখন নিছকই কম লাগছে উনার কাছে। তার একটা মেয়ে আছে, যে এখন তার সামনে। মেয়েকে যখন খুজে পেয়েছে, নিশ্চয় আলিজাকেও খুজে পাবে এবার। একা একা মেয়েকে মানুষ করেছে? এতগুলো বছর। একবার জানালে কি হতো। এত অভিমান? মেয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কেও জানায়নি। নিজে তো তাকে আফসোসের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে হারিয়ে গেল, সাথে মেয়েটাকেও নিয়ে নিয়েছিল? এখন কোথায় আছে? এই শহরে?
“আমার মা নেই। মা অনেক আগে মারা গিয়েছেন। আমি……”
সাহিল আর কিছু পড়তে পারেনা। তার আগে সজল ফারদিনের পাশের টেবিলে থাকা পানির বোতলটা উনার হাতে লেগে পড়ে যায়। প্রাণেশার লেখাটুকু পড়ছিল সাহিল নিজের ফোনে। তার কথা শুনে সজল ফারদিন ভারসাম্য হারিয়ে পাশে কিছু ধরতে চেয়েছিলেন। তাতেই পড়ে যায় পানির বোতলটা। সাহিল নিজেও আর পড়তে পারেনা। বাবার দিকে তার ধ্যান নেই। নিজেই শক্ত হয়ে আছে লেখাটা পড়ে।
প্রাণেশা আওয়াজ শুনে ভদ্রলোকের দিকে তাকায়। তিনি প্রাণেশার সামনে এসে ভঙ্গুর কণ্ঠে জানতে চান,
“আলিজা বেচে নেই?”
প্রাণেশা হতবম্ব হলেও মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বোঝাতে চাইবে, তার আগে উনার কথা মাথায় খেলে যেতেই আর কিছু বলেনা। কয়েক মুহূর্ত তাকায়। চেহারা পুরোপুরি দেখে নিয়ে, ভদ্রলোকের আপাদমস্তক চোখ বোলায়। কিছু বুঝতে পেরে সে থমকে যায়। তার নিঃশ্বাস আঁটকে আসে তার। পেছনে থাকা বাকিদেরও দেখে নেয়। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে যায়। তারপর ঢোক গিলে সামনে শক্ত হয়ে থাকা সাহিলের পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে কিছু টাইপ করে তার হাতে দেয়।
“আপনার নাম?”
প্রাণেশার বাবা চোখে পানি নিয়ে মৃদু হেসে জবাব দেয়,
“সজল ফারদিন। তোমার বাবা। চিনতে পেরেছো তাইনা? তোমার মা আমার কথা বলেছে?”
তারপর আবার চশমা খুলে চোখের পানি মুছে জিজ্ঞেস করেন,
“তোমার মা কবে চলে গিয়েছে?”
প্রাণেশা জবাব দেয় না। ছবি দেখেছিল সে বাবার। তাই প্রথমে চিনতে না পারলেও সন্ধেহ হওয়ার পর মনোযোগ দিয়ে দেখতেই চিনে ফেলে। এই লোকটার প্রতি তার আকাশসম রাগ। পৃথিবীতে শুধুমাত্র এই মানুষটাকেই বোধ হয় সে ঘৃণা করে।
প্রাণেশার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করছেনা এক মুহূর্তও। সে ব্যাগ খুঁজে নিয়ে আস্তে আস্তে উঠে চলে যেতে চাইলে সাহিল চোখ তুলে তাকায় তার দিকে।
“কোথায় যাচ্ছিস?”
প্রাণেশা নিজেকে শক্ত করে ভাইয়ের দিকে তাকায়।
লাল হয়ে আছে তার চোখ দুটো। মা নেই শুনে হয়তো। প্রাণেশা তো ডায়েরিতে পড়েছিল, ভাই তার মাকে খুব ভালোবাসতো। মামণি বলে ডাকতো। ভাইকে নিয়ে মায়ের অনেক স্মৃতি লেখা আছে ডায়েরির পাতায়। সেসব পড়ে পড়ে তার মনেও ভাইয়ের প্রতি আলাদা ভালোবাসা জন্মেছে। বাবার স্মৃতি ইচ্ছাকৃত হারিয়ে ফেললেও এই ভাই আর মায়ের সব স্মৃতি সে আগলে রেখেছে সবসময়। এই যে এই ছেলেটাই তার ভাই, বুঝতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে। ভাইয়ের দেখা সে এ জীবনে কখনো পাবে তা ভাবতেও পারেনি। তবে সে ভাইয়ের প্রতি নিজের দুর্বলতা দেখাতে চায় না কাউকে। তার বাবা বাড়ির কারো প্রতি কোন রকম আবেগ দেখানোর ইচ্ছে নেই।
“হস্পিটালে থেকে যাবো নাকি?” সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে ইতস্তত করে কথাটা বুঝালেও, সাহিল তা বুঝতে পারেনি। সে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক পল। তারপর হাত ধরে আস্তে করে টেনে আবার সামনে বসায়।
“মামণি নেই কবে থেকে?” কথাটার ওজন অনেক। অন্তত ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে প্রাণেশার তাই মনে হলো। নাহলে কথাগুলো বলতে ভাইয়ের এত কষ্ট হলো কেন? মা নেই বলে কষ্ট পেয়েছে বলে কি? হবে হয়তো। সে ‘মা নেই’ -এই কথাটার সাথে অভ্যস্ত। তাই তার আলাদা কোন অনুভূতি হয়না।
“আমি চার বছর থাকতে মারা গিয়েছে।” প্রাণেশা ফোনে টাইপ করে দেয়।
সাহিল লেখাটা পড়ে ঢোক গিলে বলে,
“কিভাবে?”
“এ ক্সি ডে ন্ট, রোড এ ক্সি ডে ন্ট।”
“তুই কোথায় ছিলি মা মা রা যাওয়ার পর?”
“মামা বাড়িতে।”
“মামা বাড়ি এখানে?”
“না।”
“তাহলে এখানে কি কাজে এসেছিস?”
প্রাণেশা ভাইয়ের প্রশ্ন শুনে তৎক্ষণাৎ আঙ্গুল চালাতে পারেনা। একটু সময় নিয়ে লিখে,
“কয়েক মাস ধরে তাদের এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি থাকছি। বাড়ি এখানেই।”
সাহিল মনোযোগ দিয়ে বোনের সব উত্তর দেখে।
“কাল কোথায় ছিলি?”
প্রাণেশা কি উত্তর দেবে জানে না। কাল কোথায় ছিল জানতে চাচ্ছে কেন তাও বুঝতে পারছে না। তবু সে আঙ্গুল চালায়।
“কাল আবার আলাদা করে কোথায় থাকবো? বললাম না এক আত্মীয়ের বাড়ি থাকি… ওখানেই ছিলাম।”
সাহিল লেখাটা পড়ে নীরব থাকে। তারপর হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলে,
“ঠিক আছে। আর যেতে হবে না কোন আত্মীয়ের বাড়ি। আমার সাথে চল।” তারপর দাদি, ফুফিকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ওর সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও।”
প্রাণেশা সাহিলের কথা শুনে ততক্ষণাৎ ‘না’ করে দেয়। সে তাদের সাথে কোথাও যাবে না। প্রাণেশার অনিচ্ছা দেখে সাহিল সে আবার সেই আত্মীয়ের বাড়ি যেতে চাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে প্রাণেশা জানায় মামা বাড়ি যাবে। কিন্তু সাহিল মানে না। সে জানায় মামা বাড়ি সে নিয়ে যাবে বেড়াতে, আগে নিজের বাড়ি যাক তারপর।
কিন্তু প্রাণেশা জেদ ধরেছে সে দরকারে আবার আত্মীয়ের বাড়ি যাবে কিন্তু তাদের সাথে যাবে না। প্রাণেশা বোধ হয় মা মা রা যাওয়ার পর জীবনে প্রথমবার কারো কাছে এত জেদ ধরেছে।
সাহিল নিজেও রেগে বলে,
“মার খাবি কিন্তু। আত্মীয়ের বাড়ি যাবি, তাও নিজের বাড়ি যাবিনা। এটা কেমন কথা। আশ্চর্য!”
প্রাণেশা জেদ দেখিয়ে বোঝায়,
“আমি যাবো না তোমাদের সাথে।”
“তোমার বোনের হয়তো বাড়ি নিয়ে নয়, বাড়ির মানুষ নিয়ে সমস্যা।” সজল ফারদিন বিষণ্ণ মুখে বলেন। মেয়ের চোখে নিজের জন্য রাগ আর বিরক্তি দেখেছেন তিনি। ভাইয়ের সাথে যা একটু কথা বলছে মেয়েটা। আরো চারজন যে আছে সেদিকে খেয়াল নেই। তাদের খুব করে উপেক্ষা করছে। প্রাণেশার দাদি ফুফিও ওকে তাদের সাথে যেতে বলছে বার বার। বড় বাবাও আদুরে স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করছে। অথচ মেয়েটা ওদের কথা কানেই নিচ্ছেনা। ভাইকেই জবাব দিচ্ছে।
বাবার কথায় সাহিলও কিছু আন্দাজ করতে পারে। তার বোনও তার মতো এদের প্রতি রাগ নিয়ে আছে বুঝতে পারে। হয়তো মায়ের সাথে হওয়া ঘটনা জানে সে।
সে যায় হোক, প্রাণেশার জেদ টেকেনি ভাইয়ের সামনে। প্রাণেশাকে নানান কিছু বুঝিয়ে নিয়ে এসেছে বাড়িতে। তবে প্রাণেশার এ বাড়ির মানুষদের প্রতি রাগ-ঘৃণা থাকলেও, তাদের নেই। বরং বংশের প্রথম এবং একমাত্র কন্যা সন্তান পেয়ে তারা ভীষণ খুশি। তারা পারছেনা প্রাণেশাকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতে। প্রাণেশার বাবারা দুই ভাই এক বোন। বড় ভাই আর তার স্ত্রীর দুই ছেলে। প্রাণেশার বাবা আর তার এক ছেলে, সাথে এখন সে। আর ফুফি, ফুফির মেয়ে সহ দাদি মিলে ফারদিন পরিবার।
তারা হস্পিটালে থাকতেই প্রাণেশার জন্য একটা রুম প্রস্তুত করতে বলে দিয়েছিল। সে এখন ওখানেই আছে। এই যে নতুন একটা জীবন শুরু হলো। অথচ পুরনো কিছু সে ভুলতে পারছেনা। অন্তিককে ভুলতে পারছে না কিছুতেই। লোকটা কি তাকে খুজছেনা? সে চলে এসেছে জানার পর কেমন প্রতিক্রিয়া ছিল? খুশি হয়েছিল কি? নাকি দুঃখ পেয়েছে?
খুশি হলেও মা নিশ্চয় ওকে খুঁজতে বলবে। খুজছেও হয়তো।
কিন্তু সে আর যাবেনা অন্তিকের কাছে। যার কাছে তার মূল্য নেই, তার কাছে আর ফিরবে না। কাল রাতে কি ক্ষুধার্ত জা নো য়া রে র মতো আচরণ করেছিল তার সাথে। সে কোনদিন ভুলবেনা। ভুল বুঝাবুঝি দূর করে, ভালোবেসে কাছে টানলে কি সে মানা করে দিত? সে তো চেয়েছিল অন্তিকের সাথে সংসার করতে। এভাবে কোন হিং স্র জ ন্তুর মতো আচরণের তো দরকার ছিল না।
————————
অন্তিক সারা শহর খুঁজেও প্রাণেশা পায় নি। দিগন্ত, মাহাদ কেউ পায় নি। নিজে দু দুবার করে সব জায়গায় খুজেছে। তারপরও প্রাণেশাকে না পেয়ে যখন পাগল প্রায়, তখন ছেলের অবস্থা দেখে আর প্রাণেশার চিন্তায় মিসেস আয়েশা আমিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন আবার উনাকে নিয়ে তাড়াহুড়া শুরু হয়। মাকে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখে অন্তিক আবার আগের মতো শান্ত হয়ে যায়। পরিস্থিতি প্রতিকূলে গেলে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সবটা ভাবা তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য।
দিগন্ত মিসেস আয়েশা আমিনের সবরকম চিকিৎসা করিয়ে উনাকে রেস্টে থাকতে বলে বের হয়ে আসে। মিসেস তাবিয়া আর শাইনা বেগম উনার কাছে বসে নানান কিছু বলে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
অন্তিক বাড়ির বাইরে বের হয়ে সুখ টান দিচ্ছে। দুশ্চিন্তা কাঁটাতে। যদিও কতোটুকু সম্ভব হচ্ছে তা বলা যাচ্ছেনা। তার ভেতরটা এখনো ভীষণ অস্থির। ইরফান ওর পেছনে এসে দাড়ায়।
“সারাদিন তো খুজলাম। শহরের সব রকম অন্ধকার জগৎগুলোতে খবর নেওয়া হয়েছে। সেখানেও ওর খবর পেলাম না। আমার মনে হয়না খারাপ কারো হাতে পড়েছে। পড়লে খবর চলে আসতো এতক্ষণে। সেইফভাবে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে হয়তো। চারপাশে লোক লাগানো আছে। এত টেনশন নিস না। বেশিদিন লুকিয়ে থাকতে পারবে না।”
ইরফানের কথা শেষ হতে না হতে তোশাও বের হয়ে আসে ভেতর থেকে। সে এসে অন্তিককে উদ্দেশ্য করে বলে,
“আন্টি কি বলছে এসব? তুই প্রাণেশাকে অপমান করিস? অসম্মান করিস… আরও কি কি জানি বললো। কাহিনী কি?”
তোশার কথা শুনে ইরফানও ভ্রু কুচকে তাকায় অন্তিকের দিকে,
“হু, আন্টিকে বার বার তুই ওকে অসম্মান করিস বলতে শুনা যাচ্ছে। কাহিনী কি বলতো? আর মেইন ঝামেলাটা কি নিয়ে করেছিস? যে চলে গেল?”
অন্তিকের মুখে থাকা সি গা রে ট টা ততক্ষণে শেষ হয়ে আসে। এতে সে বিরক্ত হয়। মুখে ‘চ’ সূচক শব্দ করে পকেট থেকে আরেকটা বের করে লাইটার দিয়ে আ গু ন ধরায়। তারপর একটান দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে বলে,
“হালকা ভাবে নিয়ে ভুল করে ফেলেছি।”
“কি হালকা ভাবে নিয়েছিস?”
“প্রাণোকে। আমি ভাবতাম শা লার বাচ্চা মেয়ে, কথায় কথায় এমনিতেও রেগে যায়, আবার লজ্জ্বা পায়। রাগের দৌড় বেশিতে বেশি আমার গাঁয়ে ছ্যাপ মারা অব্দি। এই মেয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ফন্দি আঁটতে পারে ভেবে অবাক হচ্ছি।”
“তোর গাঁয়ে ছ্যাপ মারে? মানে কেন?” তোশা অবাক হয়ে জানতে চায়।
অন্তিক নির্বিকারে বলে,
“চুমু খেয়েছিলাম।”
“জোর করে?” ইরফান কৌতুক স্বরে জানতে চায়।
“হু” অন্তিক ছোট করে জবাব দেয়।
তাতে ইরফান তোশাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“দেখেছিস? সেদিন কি যেন বলছিলি, ‘তবাইকে নিদেল মতো ভাবিত না। তোর মতো হায়েনার সাথে একা রুমে কোন মেয়ে বন্ধি আছে জানলে সবাই নিশ্চিন্তে থাকতো না, ব্লা ব্লা’ দেখ…… আমার চেয়ে বেশি চিনিস ব্যাটা মানুষকে? বাইরের মানুষের কাছে সাধু হলেও বউয়ের কাছে সব পুরুষ অশ্লীল বুঝেছিস? তাই যেখানে সেখানে মুখ চালাবি না এবার থেকে।” তোশাকে ব্যঙ্গ করে কথাগুলো বলে ইরফান।
“তুই জোর করে চুমুও খাস?” তোশা ইরফানের কথায় পাত্তা না দিয়ে বিভ্রান্ত স্বরে অন্তিককে বলে।
ইরফান ওর কথা শুনে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
“শুধু চুমু? আমার তো মনে হচ্ছে মেয়েটার সাথে জোর জবরদস্তি করে ইজ্জতও হাতিয়ে নিয়েছে। সাথে আন্টির কথা অনযায়ী আরও কি কি অপমান, অসম্মান করেছে দেখ। নাহলে একে বাঙালি মেয়ে, তার উপর বাচ্চা ধরণের - এমনি এমনি প্রাণের স্বামী ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে না।”
ইরফান কথাগুলো রসিকতা করে বললেও ভুল কিছু বলেছে মনে হচ্ছেনা তার। তাই সন্ধেহ নিয়ে আবার জানতে চায়,
“সত্যি করে বলতো? করেছিস কি?”
“কাল ক্যাফেতে ঐ ছেলের সাথে দেখে মাথা ঠিক ছিল না।” অন্তিক
“মানে? ঝগড়া করেছিস এটা নিয়ে?” ইরফান
“উহু, মাথা ঠিক ছিল না। যা তা বলে দিয়েছি।”
“তারপর?” ভ্রু কুচকে ইরফান জিজ্ঞেস করে।
“কাজের চাপে ঠিক করে ক্ষমা চাইতে মনে ছিল না।”
“তারপর?”
“রাতেও রাগ করেছিল বুঝতে পারিনি, তাই রাগ ভাঙায়ও নি।”
“তারপর?”
“মাথা ঠিক ছিল না। সামলাতে পারিনি।”
“ও মানা করেছিল?”
“হু”
“তাও তুই……”
“হ্যাঁ”